#বৃষ্টি_ভেজা_এক_সন্ধ্যায়
#নাবিলা_সৈয়দ
৬.
আড্রিয়ানের পা ভেঙে দেওয়ার পর উনি প্রায় পনেরো বিশ দিনের মতো হুইল চেয়ারে ছিলেন। ওয়াশরুমে যাওয়া আসার জন্য একটা লোক রাখলেন তার জন্য। আমি কোনো পতিভক্ত স্ত্রী নই যে স্বামীর সেবা করব। উনি শুধু আড়ে আড়ে আমার দিকে তাকাতেন আর দেখতেন আমি কী করছি! পা ভাঙার এগারো দিনের মাথায় আমাদের ডিল সম্পন্ন হওয়ার পর সম্পর্ক একটু ভালো হয়ে উঠল।
উনাকে বিছানায় ট্রান্সফার করা হলো প্রয়োজনীয় স্পেস দেওয়ার জন্য। বিছানায় শুয়ে শুয়ে সারাদিন আমার সাথে বিভিন্ন ড্রামা, সিরিজ দেখতেন। দু-জনে মিলে আলোচনা করতাম কীভাবে কী হলে আরো ব্যাপারটা ভালো হতো। আমাদের সেই আলোচনা কখনো দীর্ঘ হতো, কখনো ছোট, তবুও বন্ধু হিসেবে বেশ জমে উঠেছিল। এক রাতে এভাবেই আমরা বসেছি দু-জনে মিলে। উনি খাবার খাওয়া শেষ করে বললেন,’বেলা, আমার পা'টা একটু মুছে দাও। কেমন খিচখিচ করছে।
সম্পর্কের উন্নতি হওয়ায় উনি ইসাবেলা থেকে বেলাতে নেমে এসেছেন, এজন্য আমি কোনো টাকা চার্জ করিনি উনাকে, কিন্তু এই মুহুর্তে পা মুছে দেওয়ার কথা শুনে আমার মাথায় বজ্রপাত হলো। আতঙ্কিত চোখ মুখ বানিয়ে উনার দিকে তাকালাম। এতক্ষণের ঠান্ডা মেজাজ উবে গিয়ে ভর করল আমার আসল রুপ।। বললাম,”আপনার কী আমাকে কাজের ঝি মনে হয়?
উনি আমার এমন রুপ বদলানো দেখে বললেন,”তা মনে হবে কেন? আর তুমি এভাবে রেগে যাচ্ছো কেন?
“তো রাগব না? আপনি কোন সাহসে বললেন আমাকে আপনার পা ছোঁয়ার জন্য? আমি কারোর পা ছুতে টুতে পারব না।
আড্রিয়ান আমার দিকে কিছুক্ষণ হতবাক মুখে তাকিয়ে থেকে বললেন,”প্রতি এক মিনিটের কাজের জন্য তোমাকে দুশো করে টাকা দিব। এবার তো কাজ করবে? পা মুছে দিবে?
টাকা? টাকার কথা শুনেই লালসায় আমার চোখ জুড়িয়ে গেল। রাজী হলাম নিমেষেই। অতঃপর দশমিনিট সময় নিয়ে মুছে দিলাম আড্রিয়ানের পা জোড়া।
_
আমার শাশুড়ি খালেদা চৌধুরীর কিছু বান্ধবীরা যখন জানতে পারলেন তিনি ছেলের বিবাহ দিয়েছেন, জানার পরপরই এসে হাজির হলেন আমাকে দেখার জন্য। ভার মুখে এসে আমার শাশুড়ি বললেন,”তৈরি হয়ে এসো। তোমাকে দেখতে কয়েকজন আন্টিরা এসেছে।
আমি আরাম করে হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে ছিলাম। আমার পাশেই আড্রিয়ান। উনি ভ্রু কুঞ্চিত করে কিছু বলার আগেই আমি বললাম,”তৈরি হবো কেন?
আমার শাশুড়ি বিরক্তিতে ভরা কন্ঠে বললেন,”এই বললাম না, তোমাকে দেখতে এসেছে?
“তো আমাকে দেখতে আসবে কেন? আমি কী কোনো জাদুঘরে রাখা বস্তু নাকি প্রাচীন কোনো মূল্যবান সম্পদ যাকে দেখার জন্য আসবে আন্টিরা, কাকিরা?
শাশুড়ী আড্রিয়ানের দিকে তাকালেন। আমার উপর যে উনি ত্যক্ত বিরক্ত তা তার মুখের বলিরেখায় স্পষ্ট ফুটে ওঠেছে। উনি বললেন,”দেখ, তোর বউ আমার সাথে বেয়াদবি করছে।
আড্রিয়ান মিনমিন করে কিছু বলার আগেই আমি কেটে দিলাম। বললাম,”উনি কী দেখবে, আমাকে বউ না মানলে দেখবে? উনাকে বলে কিছু লাভ নেই।
আমার শাশুড়ি ছেলের দিকে তাকালেন। উনি কাঁধ ঝাঁকাতেই হতাশ ভঙ্গিতে ফিরে যেতে নিবেন আমি বললাম,”মিসেস চৌধুরী, আমি যাব আপনার বন্ধুদের সামনে। আপনার সম্মান বাঁচিয়ে নিব, কিন্ত…
বলে একটু সময় নিলাম। এমন ভাব যেন সাসপেন্স রাখছি। আমার শাশুড়ির পা থামল। ঘুরে আগ্রহী স্বরে জিজ্ঞেস করলেন,”কিন্তু কী?
আমি একদম স্বাভাবিক ভঙ্গিতে, ধীরে সুস্থিরে বললাম,“আমাকে এর জন্য পে করতে হবে। এখন আপনি পে করলে আমি একদম সুশীল বউ হয়ে তাদের সামনে গিয়ে দাঁড়াব।
আমার শাশুড়ি হুমড়ি খেয়ে পড়লেন। বললেন,”কতটাকা দিতে হবে?
আমি হাসলাম। হআত দিয়ে দেখালাম,”বেশি না, একটু।
খালেদা চৌধুরী আমি যে যাব সেই খুশিতে আর জানতে চাইলেন না কতটাকা আমি নিব। আমি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সাজলাম। হালকা পাতলা না, একদম ভালো করে লেপে। মাশকারা, আইলাইনার, কনসিলার ফাউন্ডেশন, মশ্চোরাইজার, প্রাইমার, একে একে সব লাগালাম। মেকআপ লেপার পর যখন আয়নায় তাকালাম আমি নিজেকে নিজে দেখে একদম ওমাগো বলে হুঁশ হারিয়ে ফেললাম। তবে হুঁশটা ভেতরে হারিয়েছিলাম। আয়নার প্রতিবিম্বে দেখলাম আমাকে অপ্সরা নারীদের মতো লাগছে। ঠোঁটে লিপস্টিক লাগিয়ে উঠে দাঁড়াতেই আড্রিয়ান বললেন,”মায়ের কাছ থেকে টাকা নেওয়া উচিত হলো কী?
আমি কাঁধ ঝাঁকালাম। নতুন বউ বলে আমি কোনো কামিজ, চুরিদার বা শাড়ি পরিনি। অভারসাইজড শার্ট আর সাদা ফ্লেয়ার প্যান্ট পরেছি। চুলগুলো বান্দানা দিয়ে বেঁধে নিলাম। সামনে দু-গাছি চুল এনে নিষ্প্রাণ কন্ঠে বললাম,”এটা আমার ব্যবসা, আড্রিয়ান। আমি এই বাড়ির বউ হয়ে আসিনি যে বউ সেজে গিয়ে বসব সবার সামনে। আমাকে টাকার জন্য নিয়ে আসা হয়েছে, এবং আমার কাজের ভালো পারফর্মেন্স এর জন্য টাকা দেওয়া হচ্ছে, সেখানে মিসেস চৌধুরীকে আমি কোনোভাবে ফ্রিতে কোনোকিছুই প্রোভাইড করতে পারিনা। এটা আমার নীতির বাহিরে।
কথাটা শেষ করে দরজা খোলার জন্য নব ঘোরালাম।। তখনই আমার হাত এক মুহুর্তের জন্য থমকে দিয়ে আড্রিয়ান বললেন,”অনন্ত আন্টি ডাকো। বড় একজন মানুষকে মিসেস চৌধুরী ডাকছ, খারাপ শোনায়।
আমি নিজেকে যথাসম্ভব স্বাভাবিক রাখলাম। বিজনেস এ কোনোপ্রকার আবেগ রাখা যাবে না। নিজেকে কঠোর রেখেই কাঠকাঠ কন্ঠে বললাম,”কথাটা ভুলে যাচ্ছেন হয়তো আড্রিয়ান আপনি, আমাদের সম্পর্কটা টাকার। এর বেশি কিছুর-ই না।
আড্রিয়ান আমার কথা চুপচাপ শুনেছিলেন, এই কথার পর আর কিছু বলার থাকে না তাই তিনি চুপ থাকাই বেছে নিলেন। আমি আমার শাশুড়িকে মিসেস চৌধুরী আর শ্বশুরকে মিস্টার চৌধুরী বলে ডাকতাম। আমার শাশুড়ি কথা রাখলেন। উনার বন্ধুদের সামনে বসে আলাপ করার জন্য আমাকে ভালো রকমের এমাউন্ট দিলেন।
এরপর কিছুদিন কাটল শান্তি মতো। আমি আর আড্রিয়ান এক বিছানায় শুলেও আমাদের মধ্যে দূরত্ব থাকত এক আকাশ পরিমাণ। সেই দূরত্ব একটুকু কমছিল না। আস্তে আস্তে আড্রিয়ান সুস্থ হয়ে উঠলেন। পা ভেঙে দেওয়ার জন্য আমাকে উনি কিছু বললেন না। উলটো ক্ষমা চাইলেন বিয়ের দিনের রুঢ় ব্যবহারের জন্য। আমি দয়ার সাগর নিয়ে ঘুরি, মানবতার খাতিরে উনাকে ক্ষমা করে দিলাম। কিন্তু আমার শ্বশুর ছিলেন ভিন্ন প্ল্যানে।।একদিন সকালে আমাদের হাতে দুটো কাঠমুন্ডুতে ঘুরে আসার জন্য টিকেট ধরিয়ে দিলেন। হানিমুনে যাওয়ার জন্য। যেখানে আমাদের দাম্পত্য জীবনের কোনো ঠিক নেই।
সবাই দেখছে যেখানে সামান্য বাতাস দিলেই ঝড়ে পড়বে সংসারটা সেখানে আমার শ্বশুরের হানিমুনের টিকেট দেওয়া যেন বিলাসিতা। চোখে লাগার মতো বিষয়।
আমার ছোটবেলা থেকে কাঠমুন্ডু যাওয়ার ভীষণ শখ ছিল। যখন তা ফলতে দেখলাম খুব খুশি হলাম, কিন্তু এক বাক্যে আড্রিয়ান না করে দিতে দেখে মুখটা কালো হয়ে গেল। সারাদিন আমি ভার মুখে ঘুরলাম। আমার শ্বশুর সূক্ষ্ম চোখে তা দেখলেন হয়তো। এরপরের দিন কী যেন হলো, যে আড্রিয়ানকে গতকাল ঠেলে পাঠানো যাচ্ছিল না সে এক পায়ে খাঁড়া হয়ে আছে হানিমুনে যাওয়ার জন্য। পেছনের কারণ আমি জানতে গেলাম না। আমার মনে হয় অনেক কিছুর কারণ না জানাই ভালো। তাই সেই নীতি মেনে আমি জানলাম না কারণ। হানিমুন ট্রিপে গেলাম। সেখানে আমরা দশ দিন ছিলাম। এই দশদিনন কীভাবে আকাশের ধূলিকণা মেঘের মতো কেটে গেল বুঝলামই না।
নেপাল থেকে বাংলাদেশ এ পা রাখতেই আমার শুরু হলো বমি, মাথা ব্যথা আর মাথা ঘোরানো। আড্রিয়ানদের বাড়িতে তখন এক বাল পাকনা মহিলা এসেছিলেন। তিনি হলেন আড্রিয়ানের ফুপি। নাম রিনা চৌধুরী। নাম রিনা চৌধুরী হলেও ব্যবহার তেমন না উনার। উনি আমার নার্ভ চেক করছিলেন, তখন আমি মাত্র বমি করে চোখ মুদে শুয়েছি। হাত পা ছড়িয়ে কচ্ছপের মতো শুতেই ভদ্রমহিলা আমাকে অষ্টম আশ্চর্যে পৌঁছে দিয়ে বলে ওঠলেন,”ওমা, বউ তো সন্তান সম্ভবা।
আমি শুয়ে ছিলাম, কথাটা কানে যেতেই লাফ দিয়ে উঠে বসলাম। চোখ বড় বড় করে শুধালাম,”কী বললেন? আবার বলুন?
ভদ্রমহিলা তখনো হাসছেন। খুশির চিলিক উনার মুখে। বললেন,”অভিনন্দন! আড্রিয়ান এর বাচ্চা তোমার পেটে বড় হইতেছে। তুমি সন্তান সম্ভবা।
চলবে…