ফন্ট সাইজ:
থিম:
বৃষ্টি ভেজা এক সন্ধ্যায়

পর্ব 7

লেখক: নাবিলা সৈয়দ

#বৃষ্টি_ভেজা_এক_সন্ধ্যায়
#নাবিলা_সৈয়দ
৭.

আমি সন্তান সম্ভবা? প্রথমে কথাটা ঠিক মানতে পারলাম না। বললাম,”আপনি কোথাও ভুল করছেন, আমি সন্তান সম্ভবা, কীভাবে?

উনি আমার দিকে চোখা নজরে তাকালেন। ভদ্রমহিলাকে বলতে পারলাম না যে আমাদের মধ্যে এখনো কিছুই হয়নি। রিনা চৌধুরী কান্ড করলেন চৌধুরীদের মতো। ঢাকঢোল পিটিয়ে চারদিকে এলান করে দিলেন আমি বাচ্চার মা হতে যাচ্ছি, তা ও আবার কার, আড্রিয়ানের। আমার শাশুড়ি কেন জানি ব্যাপারটা নিয়ে হাঙ্গামা করলেন না, তিনি মেনে নিলেন। দাদি শাশুড়ি আমাকে উপর নিচ দেখে বললেন,”দেখে তো মনে হচ্ছে বাচ্চা কাচ্চা হবে। চেহারার রঙ কেমন উজ্জ্বল হয়ে গেছে।

আমি আতঙ্কে পড়লাম। পেটে বাচ্চা আসবে কীভাবে! আমার শিওর যে ফুড পয়েজনিং এর জন্য বমি করছি, কিন্তু এই বুড়িদের এসব কে বোঝাবে, তাই ভাবলাম আড্রিয়ান আসলে এই ব্যাপার নিয়ে খোলাসা করা যাবে, ভেবে চেপে গেলাম।

আড্রিয়ান এই অতি আবেগী ঘটনা যখন ঘটে তখন বাসায় ছিলেন না। কী একটা কাজে বাহিরে বেরিয়ে গিয়েছেন। বাসায় ফিরলেন ঘন্টা খানেক পর। ফেরার পরই আমার ফাটা বাঁশ ফুপি শাশুড়ি তার কানের কাছে গিয়ে মাছির মতো ভনভন শুরু করলেন। আড্রিয়ান তাকে এমন ভনভন করতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন,”কী হয়েছে, ফুপি?

ভদ্রমহিলা এই প্রশ্নের অপেক্ষায় ছিলেন, আড্রিয়ান জিজ্ঞেস করতেই ঠাস করে বললেন,”তুই বাবা হতে চলেছিস।

গলা সূক্ষ্ম থাকা সত্ত্বেও কথাটা শুনে বিষম খেলেন। অবাক কন্ঠে শুধালেন,”কী কী বললে? আমি কী হতে চলেছি?

রিনা চৌধুরী তখনো উৎফুল্ল কন্ঠে বলতেই আছেন,”তুই বাবা হতে চলেছিস, আড্রিয়ান।

আড্রিয়ান আমার দিকে তাকালেন ক্ষেপে। আমার দিকে তাকিয়ে থেকে শুধালেন,”বেলা এই কথা আপনাকে বলেছে?

“না, সে কেন বলতে যাবে?

“তবে?

“আমি নার্ভ পরীক্ষা করে জেনেছি।

আড্রিয়ান আমার দিকে কটমটিয়ে তাকিয়ে বললেন,”ফুপি কোথাও ভুল হচ্ছে, এই কয়েকদিনের ভেতর কীভাবে বাচ্চা?

উনি মানলেনই না। বললেন,”ঈশ্বর দিতে চাইলে সব সম্ভব হয়। তুই বিশ্বাস না করলে যা প্রেগন্যান্সি টেস্ট করে আয়।

আড্রিয়ান উঠে দাঁড়ালেন লাফিয়ে। বাহিরের দিকে যেতে যেতে আমাকে ইশারা করলেন আসার জন্য। আমি ও গেলাম উনার সাথে। নিশ্চিত ছিলাম যে কোনোপ্রকার বাচ্চা টাচ্চা হবে না। অন্য কোনো ব্যাপার এটা! আমার সেই বিশ্বাস ঈশ্বর ভেঙে দিয়ে রিপোর্ট আসলো প্রেগন্যান্সি পজেটিভ। এটা দেখার পর আমি হা করে রিপোর্টের দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমাকে আড্রিয়ান শুধালেন,”রিপোর্ট কী? রিপোর্ট কী?’’ আমি সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলাম না।।উনি আমার হাত থেকে কেড়ে নিয়ে নিজে যখন দেখলেন প্রেগন্যান্সি পজেটিভ, বিস্ময়ে আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।।কেমন করে শুধালেন,”বাচ্চার বাপ কে? আর তিন মাসের বাচ্চা হলে তোমার পেট এখনো দেখা যাচ্ছে না কেন?

এরপর আর কোনো প্রশ্ন করেননি। বাসায় নিয়ে আসলেন। উনার চোখ দুটো লাল হয়ে ছিল। আমি নিজেই ভয় পাচ্ছিলাম উনার গাড়ি চালানো দেখে। পাগলের মতো গাড়ি চালিয়ে আসলেন চৌধুরী মেনশনে। গাড়ি থেকে নেমে একপ্রকার টেনে নিয়ে গেলেন আমাকে। আমি উনার দিকে বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে ছিলাম, টেনে নামানোর কী প্রয়োজন ছিল সেখানে, আমি ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। আমি তো নিজেই নেমে যেতে পারতাম। আমাকে ভেতরে নিয়ে প্রবেশ করতেই ফুপি ছুটে আসলেন। বললেন,”কী রিপোর্ট আসছে?

আড্রিয়ান তাচ্ছিল্যের নজরে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,”পজেটিভ এসেছে, মিষ্টি এনে খাও সবাই।

তারপর টানতে টানতে নিয়ে গেলেন ভেতরের ঘরে। পেছনে উল্লাসে মেতে উঠলেন সবাই। আড্রিয়ান আমাকে রুমে এনে একপ্রকার ছুঁড়ে ফেললেন। দরজা আটকে এগিয়ে আসলেন আমার দিকে। ক্রোধে মুখটা টকটক করছে। আকস্মিক আমার গলা শক্ত হাতে চেপে ধরে জিজ্ঞেস করলেন,”এই বাচ্চা আসলো কোথা থেকে? আমাদের মধ্যে তো কিছু হয়নি! তাহলে এটা কার বাচ্চা? অন্যের বাচ্চার দ্বায় আমার উপর বসাতে চাচ্ছো তুমি? নষ্ট মেয়ে!

নষ্ট মেয়ে বলায় আমার নিজের মাথায় রক্ত উঠে গেল। উনাকে বললাম উনি নষ্ট। একসময় কথা-কাটাকাটি শুরু হয় আমাদের মধ্যে। আড্রিয়ান রেগে গিয়ে আমাকে থাপ্পড় বসাতে গেলেই আমি তার হাত চেপে ধরি। বলি,”গায়ে হাত তোলার স্পর্ধা দেখালে হাত কেটে নদীতে ভাসিয়ে দিব। বাচ্চা যে কারোর হোক, আপনার এত রাগ ক্ষোভ আসছে কেন? আমার প্রেমের পড়ে গেছেন নাকি আবার?

আড্রিয়ানের মুখে তাচ্ছিল্যের হাসি খেলে গেল। বললেন শ্লেষ করে,”তোমার মতো মেয়ের প্রেমে পড়ব আমি? আমি আড্রিয়ান, যে আরেক লোকের সাথে বেড শেয়ার করে আসছে তার প্রেমে? আমার ক্লাস এত নিচেও না।

“আপনার ক্লাস নিচে না? যে মেয়ে লাথি মেরে ফেলে গেছে তার পেছনে তো কুকুরের মতো পড়ে আছেন।

কথার জবাব ঠিকঠাক দিতে পারায় মনে আলাদাই আরাম লাগল। আড্রিয়ানকে বলার সুযোগ না দিয়ে বললাম আবার,”আমাকে নষ্টা বলছেন, আপনি ও তো নষ্ট পুরুষ।

আড্রিয়ান আমার থুতনি চেপে ধরলেন। মটমট করে শব্দ হলো। মন হলো এই বুঝি ভেঙে যাবে মাড়ি। তা হলো না, উনি সামান্য ঢিল দিলেন। তারপর বললেন,”বিয়ের আগে পেটে বাচ্চা ধরে যেসব মেয়েরা, পরপুরুষের সাথে বিছানায় শুয়ে পড়ে, তাদের নষ্টা বলে না তো কী বলে?

আমি রক্ত চোখে তাকালাম আড্রিয়ানের দিকে। আবারো নষ্ট মেয়ে বলেছে আমাকে। সাবধান করলাম," মুখ সামলে আড্রিয়ান, মুখ ভেঙে ফেলব। আমার দিকে আঙুল তুলতে একশোবার ভাববেন।

আড্রিয়ান নিজেও সমান তালে খ্যাঁকিয়ে উঠলেন,"যদি তুমি ভালো হতে তাহলে বাচ্চাটা আসলো কোথা থেকে তোমার পেটে? স্বর্গ থেকে? নাকি ঈশ্বর এমনি এমনি তোমাকে বাচ্চাটা দিয়ে দিয়েছে?

“সেটাই তো প্রশ্ন,বাচ্চাটা আসলে আসলো কোথা থেকে..!

আমি থামলাম কয়েক সেকেন্ডের জন্য। অতঃপর আড্রিয়ানের দিকে তাকিয়ে সন্দেহী কন্ঠে বললাম," আমি তো আপনাকে সন্দেহ করছি। আমার ঘুমের সুযোগ নিয়ে আপনি না আমার সতীত্ব কেড়ে নিয়েছেন?

উনি থমকে গেলেন। কটমট করে বললেন,”আমাকে তোমার এমন মনে হয়?

আমি খোঁচা দিতে এক ইঞ্চি বাদ দিলাম না। বললাম,’কারোর মুখ দেখে কিছু বলা যায়।। কার মনে কী আছে এক সে ছাড়া আর কে জানে!

উনি আমার দিকে বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে রইলেন। হঠাৎ কী মনে হতেই তেড়ে এসে বললেন,”"তোমার পেটের বাচ্চার বাপ কে? ও-ই আহমেদ নাকি?

" আহমেদ হোক আর মেহমেদ হোক, আপনার তাতে কী? নিজের চরকায় তেল দেন।

"নিজের চরকায় তেল দিতে পারছি না এই মুহুর্তে। এবার পাজেল মিলছে। তুমি আমাকে বিয়ে করেছ অন্যের বাচ্চাটা আমার ঘাড়ে গছানোর জন্য, তাই না? বলো?

" আপনার বুদ্ধি দেখে আমি রীতিমতো শকড। এত বুদ্ধি, এত বুদ্ধি দেখেই তো আপনার গার্লফ্রেন্ড, আপনাকে লাথি মেরে ফেলে গেছে।

আড্রিয়ান আঙুল তুললেন,"একদম পার্সোনাল বিষয়ে যাবে না।

"আমি ও সেইম বলতে পারি, আপনি ও আমার পার্সোনাল বিষয়ে বাঁ-হাত ঢোকাবেন না। যার বাচ্চা হোক, সেটা একান্তই আমার ব্যাপার।

কথাটা বলতে বলতে আবারো সন্দেহী নজরে তাকালাম। আড্রিয়ান বললেন," কী দেখছ এভাবে?

আমি ঘুরে ঘুরে উনাকে দেখে বললাম," আমার তো আপনাকে এখনো সন্দেহ হচ্ছে, কোনোভাবে রাতের আঁধারে আপনি না আমার উপর চিতাবাঘের ন্যায় ঝাপিয়ে পড়েছেন? এখন মেহমেদ এর উপর চাপিয়ে দিতে চাচ্ছেন এই দোষ।

উনি ত্যক্ত কন্ঠে বললেন,“আমি কেন মেহমেদের উপর দোষ চাপাব?

আমি তখনো আড্রিয়ানের উপর সন্দেহ করছি। ব্যাটা আমাকে কিছু খাইয়ে টাইয়ে অজ্ঞান করে উচনিচ কিছু করেছে নাকি! করলে কেন আমি বুঝলাম না? আর যদি বাচ্চা আসলেই পেটে থেকে থাকে, তাহলে আমার পিরিয়েড সাতদিন আগে হলো কীভাবে? এক মিনিট ব্যাপারটা এতক্ষণ মাথায় না আসায় আড্রিয়ানের চুলোর মুঠি ধরে একটা বারি বসাতে ইচ্ছে হলো। এই ব্যাটার জন্য সব গুলমাল হয়েছে। তাই আগে একেই সাইজ করতে নিতে হবে। অনেক ভাবনা চিন্তার পর সিরিয়াস ভঙ্গিতে থুতনিতে হাত রেখে প্রশ্নের উত্তরে বললাম,“ কারণ আপনি তাকে হিংসে করেন। আর এই হিংসের বর্শবর্তী হয়ে কোনো এক রাতে, পাঠ খেতে আপনি আমাকে নিয়ে, পূর্ণিমা রাতে, হয়তো জঙ্গলে মঙ্গল করতে নিয়ে গেছিলেন।

চলবে…

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 7 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন