### তোর আসক্ত আমি
লেখিকা: নুসরাত জাহান রাফা
পর্ব সংখ্যা: ৬
### ভালোবাসার প্রথম অভিমান
সকালের আলোয় খান বাড়ি বেশ প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। বাড়ির সবাই নাশতার টেবিলে বসে আছে। শাহজাদ চুপচাপ খাবার খাচ্ছিল। তার ছোট বোন বারবার ভাইয়ের দিকে তাকাচ্ছিল।
একসময় সে বলে উঠল,
— ভাইয়া, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
শাহজাদ চোখ তুলে বলল,
— কী?
— আপনি কি কাউকে পছন্দ করেন?
শাহজাদ খাবার খাওয়া থামিয়ে বোনের দিকে তাকাল।
— হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন?
— এমনিই। আপনার মুখে আজকাল হাসি বেশি দেখা যায়।
রেহানা বেগম হেসে বললেন,
— ওকে বিরক্ত করিস না। খেতে দে।
বোন মুচকি হেসে বলল,
— আচ্ছা মা, আর কিছু বলব না।
শাহজাদ কিছু না বলে আবার খাবারে মন দিল। কিন্তু তার মনে তখন মায়ার কথা ঘুরছিল।
অন্যদিকে মায়াদের বাড়িতে...
মায়া নিজের ঘরে বসে ফোন দেখছিল। গতকাল শাহজাদের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর থেকে তার মনটা বেশ ভালো। হঠাৎ নীলার ফোন এল।
— হ্যালো, কী করছিস?
— এই তো বসে আছি। তুই?
— তোর খবর নিতে ফোন দিয়েছি।
মায়া হেসে বলল,
— আমার আবার কী খবর?
নীলা দুষ্টুমি করে বলল,
— শাহজাদ সাহেবের সঙ্গে কথা হয়েছে?
মায়া একটু লজ্জা পেয়ে বলল,
— না।
— মিথ্যা বলিস না। তোর গলার আওয়াজ শুনেই বুঝতে পারছি।
— তুই না একদম অসহ্য!
দুজনেই হেসে উঠল।
কিছুক্ষণ গল্প করার পর মায়া ফোন রেখে পড়তে বসল।
দুপুরে শাহজাদ অফিসে বসে কাজ করছিল। এমন সময় মায়াকে একটি মেসেজ পাঠাল।
— কী করছেন?
মায়া তখন রান্নাঘরে মাকে সাহায্য করছিল। ফোনের শব্দ শুনে ঘরে এসে মেসেজটি দেখল।
সে উত্তর দিল,
— মাকে সাহায্য করছি। আপনি?
শাহজাদ লিখল,
— অফিসে। আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে ইচ্ছে করছিল।
মায়া মেসেজটি পড়ে মুচকি হাসল।
— কাজের সময় কথা বললে আপনার সমস্যা হবে না?
— আপনার সঙ্গে কথা বললে কাজের চাপ কিছুটা কম মনে হয়।
মায়া হেসে উত্তর দিল,
— বেশ কথা বলতে শিখেছেন দেখছি!
শাহজাদ লিখল,
— আপনার কাছ থেকেই শিখছি।
মায়া আর উত্তর দিল না। ফোনটা রেখে আবার মায়ের কাছে চলে গেল।
বিকেলে শাহজাদ অফিসের একটি জরুরি মিটিংয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। মায়া কয়েকবার মেসেজ পাঠাল, কিন্তু কোনো উত্তর পেল না।
প্রথমে সে ভাবল, হয়তো শাহজাদ ব্যস্ত। কিন্তু অনেকক্ষণ পেরিয়ে গেলেও কোনো উত্তর এল না।
মায়া একটু অভিমান করে ফোনটা পাশে রেখে দিল।
নিজের মনেই বলল,
— এত ব্যস্ত হলে একটা মেসেজের উত্তর দিতে কতক্ষণ লাগে!
অন্যদিকে শাহজাদ মিটিং শেষ করে ফোন হাতে নিতেই মায়ার কয়েকটি মেসেজ দেখতে পেল।
সে সঙ্গে সঙ্গে কল করল।
মায়া ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল। প্রথমবার রিসিভ করল না। দ্বিতীয়বারও না।
তৃতীয়বার ফোন আসতেই সে রিসিভ করল।
— জি, বলুন।
শাহজাদ বুঝতে পারল, মেয়েটি অভিমান করেছে।
— কী হয়েছে?
— কিছু হয়নি।
— তাহলে আমার ফোন ধরছিলেন না কেন?
— আপনি তো অনেক ব্যস্ত মানুষ। আপনাকে বিরক্ত করতে চাইনি।
শাহজাদ মৃদু হেসে বলল,
— তাই বলে অভিমান করতে হবে?
মায়া একটু রাগী গলায় বলল,
— আমি অভিমান করিনি।
— আচ্ছা, তাহলে রাগ করেছেন?
— সেটাও না।
— তাহলে কী করেছেন?
মায়া চুপ করে রইল।
শাহজাদ এবার একটু নরম গলায় বলল,
— মায়া, সত্যিই একটা জরুরি মিটিংয়ে ছিলাম। ফোন দেখার সুযোগ পাইনি। আপনাকে অপেক্ষা করানোর ইচ্ছে ছিল না।
মায়ার রাগ কিছুটা কমে গেল।
— আচ্ছা, ঠিক আছে।
— মন খারাপ করবেন না।
— করিনি তো!
শাহজাদ হেসে বলল,
— আপনার এই না-করার মধ্যেই সব বোঝা যাচ্ছে।
মায়া এবার হেসে ফেলল।
— আপনি না, একদম অসহ্য!
— আপনার কাছে অসহ্য হলেও সমস্যা নেই।
দুজনেই হেসে উঠল।
সন্ধ্যায় শাহজাদ বাড়ি ফিরে দেখল, তার মা বারান্দায় বসে আছেন। সে মায়ের পাশে গিয়ে বসল।
রেহানা বেগম ছেলের মাথায় হাত রেখে বললেন,
— বাবা, আজকাল তোমাকে খুব খুশি দেখায়। মেয়েটির সঙ্গে কথা হয়?
শাহজাদ মায়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
— জি মা, কথা হয়।
— মেয়েটি কেমন?
— খুব ভালো। পরিবারের প্রতি অনেক যত্নশীল। কথাবার্তাও সুন্দর।
রেহানা বেগম ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলেন, মেয়েটি তার ছেলের মনে জায়গা করে নিয়েছে।
তিনি বললেন,
— বাবা, কাউকে ভালো লাগলে তাকে সম্মান করতে হয়। তার অনুভূতিকেও গুরুত্ব দিতে হয়।
শাহজাদ মায়ের হাত ধরে বলল,
— জানি মা।
অন্যদিকে মায়া নিজের ঘরে বসে ছিল। তার মা এসে পাশে বসলেন।
— মা, আজ সারাদিন কী যেন ভাবছিস?
মায়া মায়ের কাঁধে মাথা রেখে বলল,
— কিছু না মা।
— কাউকে ভালো লাগতে শুরু করেছে নাকি?
মায়া চমকে মায়ের দিকে তাকাল।
— মা! তুমি এসব কী বলছ?
মা হেসে বললেন,
— মায়ের চোখকে ফাঁকি দেওয়া এত সহজ নয়।
মায়া লজ্জা পেয়ে মুখ লুকাল।
— এখনো কিছু হয়নি মা।
মা স্নেহের সঙ্গে বললেন,
— তাড়াহুড়ো করার দরকার নেই। মানুষকে সময় নিয়ে চিনবি। নিজের সম্মান আর পরিবারের বিশ্বাস সব সময় মনে রাখবি।
মায়া মাথা নেড়ে বলল,
— আচ্ছা মা।
রাত প্রায় দশটা।
শাহজাদ নিজের ঘরে বসে মায়াকে মেসেজ পাঠাল।
— ঘুমিয়ে পড়েছেন?
মায়া উত্তর দিল,
— না, এখনো না।
— আজ আমার ওপর রাগ করেছিলেন?
— একটু।
— তাহলে একটা কথা বলি?
— বলুন।
— আপনার অভিমান ভাঙানোর দায়িত্বটা কি আমাকে দেওয়া যায়?
মায়া মেসেজটি পড়ে হেসে ফেলল।
— দায়িত্ব নিতে পারবেন তো?
শাহজাদ উত্তর দিল,
— চেষ্টা করব। তবে একটা শর্ত আছে।
মায়া লিখল,
— কী শর্ত?
— মন খারাপ হলে চুপ করে না থেকে আমাকে বলবেন।
মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর লিখল,
— আচ্ছা, বলব।
শাহজাদ ফোনটা পাশে রেখে জানালার বাইরে তাকাল। তার মনে এক অদ্ভুত ভালো লাগা কাজ করছিল।
সে বুঝতে পারছিল, মায়ার সঙ্গে কথা বলা এখন তার প্রতিদিনের অভ্যাস হয়ে উঠছে।
আর মায়াও ধীরে ধীরে বুঝতে পারছিল, শাহজাদ নামের মানুষটি তার কাছে আর আগের মতো অচেনা নেই।
কিন্তু ভালো লাগার এই সুন্দর সময়ের মাঝেই সামনে অপেক্ষা করছিল নতুন কিছু ঘটনা। এমন কিছু ঘটনা, যা তাদের সম্পর্ককে আরও কাছাকাছি নিয়ে আসবে, আবার কখনো অভিমানের দেয়ালও তৈরি করবে।
চলবে... ❤️