### তোর আসক্ত আমি
লেখিকা: নুসরাত জাহান রাফা
পর্ব সংখ্যা: ৯
### অভিমানের প্রথম ছোঁয়া
সকালের আলো জানালার কাঁচ ভেদ করে মায়ার ঘরে এসে পড়েছে। ঘুম থেকে উঠে মায়া প্রথমেই ফোনটা হাতে নিল। প্রতিদিনের মতো আজও তার মনে হলো, শাহজাদের কোনো মেসেজ এসেছে কি না। কিন্তু ফোনের স্ক্রিনে কোনো নতুন বার্তা নেই।
মায়া কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে ফোনটা রেখে দিল। নিজেকে বোঝাল, মানুষটা নিশ্চয়ই কাজে ব্যস্ত। সব সময় তো আর ফোন হাতে নিয়ে বসে থাকা সম্ভব নয়।
নাশতার টেবিলে মা মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— কী হয়েছে? আজ এত চুপচাপ কেন?
— কিছু হয়নি মা।
— কিছু না হলে খাবার নিয়ে এমন অন্যমনস্ক হয়ে আছিস কেন?
মায়া মৃদু হেসে বলল,
— একটু ঘুম ঘুম লাগছে।
মা আর কিছু বললেন না। তবে মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝলেন, তার মনে অন্য কিছু চলছে।
অন্যদিকে শাহজাদ সকাল থেকেই অফিসের কাজে ব্যস্ত। একটা গুরুত্বপূর্ণ মিটিং থাকায় সে ফোন দেখার সুযোগ পাচ্ছিল না। রায়হান কয়েকবার কাজের কাগজ নিয়ে তার কক্ষে এল।
— স্যার, এই ফাইলগুলোতে আপনার সই লাগবে।
শাহজাদ কাগজগুলো হাতে নিয়ে বলল,
— টেবিলে রেখে যান। আমি দেখে দিচ্ছি।
— স্যার, মিটিং শুরু হতে আর দশ মিনিট বাকি।
— ঠিক আছে। আমি আসছি।
মিটিং শেষ হতে হতে দুপুর গড়িয়ে গেল। নিজের কক্ষে ফিরে শাহজাদ ফোন হাতে নিতেই দেখল মায়ার কোনো মেসেজ নেই। সে নিজেই মেসেজ লিখল।
শাহজাদ: কেমন আছেন?
মায়া তখন নিজের ঘরে বসে ছিল। মেসেজটা দেখে উত্তর দিল।
মায়া: ভালো।
শাহজাদ: আজ এত ছোট উত্তর কেন?
মায়া: কিছু না।
শাহজাদ: কিছু হয়েছে?
মায়া: না তো।
শাহজাদ বুঝতে পারল, মায়ার কথার মধ্যে অভিমান আছে। কিন্তু কী কারণে অভিমান, সেটা বুঝতে পারল না।
শাহজাদ: আমার ওপর রাগ করেছেন?
মায়া কিছুক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর লিখল,
মায়া: আপনার ওপর রাগ করার অধিকার কি আমার আছে?
শাহজাদ মেসেজটা পড়ে থেমে গেল। প্রশ্নটা তার মনে দাগ কাটল।
শাহজাদ: অধিকার আছে কি না জানি না, তবে আপনার অভিমানটা জানতে ইচ্ছা করে।
মায়া এবার উত্তর দিল না।
বিকেলের দিকে শাহজাদ আবার মেসেজ দিল।
শাহজাদ: আজ কি আপনার সঙ্গে একটু কথা বলা যাবে?
মায়া ফোন হাতে নিয়েই বসে ছিল। কিন্তু ইচ্ছা করেই কিছুক্ষণ উত্তর দিল না। তার মনে হচ্ছিল, শাহজাদ যদি সত্যিই কথা বলতে চাইত, তাহলে সকালেই একটা মেসেজ দিতে পারত।
অবশেষে সে লিখল,
মায়া: আপনি ব্যস্ত থাকলে কথা বলার দরকার নেই।
শাহজাদ সঙ্গে সঙ্গে বুঝল, তার ব্যস্ততার কারণেই মায়ার মন খারাপ হয়েছে।
শাহজাদ: আজ অফিসে মিটিং ছিল। ফোন দেখার সুযোগ পাইনি। আপনাকে অবহেলা করার ইচ্ছা আমার ছিল না।
মায়া মেসেজটা পড়ল। তার অভিমান কিছুটা কমলেও মুখে সেটা প্রকাশ করল না।
মায়া: আমি তো কিছু বলিনি।
শাহজাদ: আপনি না বললেও আপনার কথার ধরন বলে দিচ্ছে।
মায়া এবার একটু হেসে ফেলল। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে সামলে নিল।
মায়া: আপনি সব বুঝে যান নাকি?
শাহজাদ: সব বুঝি না। তবে আপনার মন খারাপ হলে সেটা বুঝতে চেষ্টা করি।
মায়া আর কোনো উত্তর দিল না। ফোনটা পাশে রেখে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
সন্ধ্যায় শাহজাদ অফিস থেকে বের হওয়ার আগে মাকে ফোন করল।
— মা, আজ ফিরতে একটু দেরি হবে।
— কেন বাবা?
— একটা কাজ আছে।
— ঠিক আছে। সাবধানে আসিস।
ফোন রেখে শাহজাদ কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর মায়াকে মেসেজ দিল।
শাহজাদ: আপনি কি আজ একটু সময় দিতে পারবেন?
মায়া উত্তর দিল,
মায়া: কেন?
শাহজাদ: আপনার সঙ্গে সামনাসামনি কথা বলতে চাই।
মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে লিখল,
মায়া: আজ সম্ভব হবে না।
শাহজাদ আর জোর করল না।
শাহজাদ: ঠিক আছে। যখন আপনার সুবিধা হবে, জানাবেন।
মায়া ফোনটা হাতে নিয়ে বসে রইল। তার ইচ্ছা ছিল শাহজাদ আরেকবার অনুরোধ করুক। কিন্তু মানুষটা তাকে কোনো বিষয়ে চাপ দিল না।
রাতের খাবারের পর মায়া মায়ের পাশে বসে টেলিভিশন দেখছিল। মা হঠাৎ বললেন,
— মা, তোর মন খারাপ নাকি?
মায়া মাথা নাড়ল।
— না তো।
— তাহলে আজ সারাদিন এমন চুপচাপ কেন?
মায়া একটু ভেবে বলল,
— মা, কাউকে ভালো লাগলে কি তার ছোট ছোট বিষয়ও অনেক বড় মনে হয়?
মা মেয়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।
— হয়তো হয়। তবে কাউকে ভালো লাগলেই তার কাছ থেকে সব সময় একই রকম সময় বা মনোযোগ আশা করা ঠিক নয়। মানুষের নিজের কাজও থাকে, দায়িত্বও থাকে।
মায়া চুপ করে মায়ের কথা শুনল।
— তবে কোনো কিছু খারাপ লাগলে সেটা সুন্দরভাবে বুঝিয়ে বলতে হয়। অভিমান জমিয়ে রাখলে ভুল বোঝাবুঝি বাড়ে।
মায়া মায়ের কাঁধে মাথা রাখল।
— তুমি সব বুঝে ফেলো কীভাবে?
মা মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
— মায়েরা মেয়েদের মুখ দেখেই অনেক কিছু বুঝতে পারে।
অন্যদিকে শাহজাদ নিজের ঘরে বসে ছিল। তার মা এসে পাশে বসলেন।
— কী ভাবছিস বাবা?
— কিছু না মা।
— তোর মুখ দেখে তো মনে হচ্ছে অনেক কিছু ভাবছিস।
শাহজাদ মৃদু হেসে বলল,
— একজনের মন খারাপ করেছি মনে হয়।
মা কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
— কে সে?
— একজন পরিচিত মানুষ।
রেহানা বেগম ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— পরিচিত মানুষদের মনও যত্ন করে রাখতে হয়। তবে নিজের কথাটাও পরিষ্কার করে বলতে হয়।
শাহজাদ মাথা নাড়ল।
রাত আরও গভীর হলো। মায়া ঘুমাতে যাওয়ার আগে ফোন হাতে নিল। দেখল শাহজাদের একটি মেসেজ এসেছে।
শাহজাদ: আজ যদি আমার কোনো কথায় আপনার মন খারাপ হয়ে থাকে, তাহলে দুঃখিত। আমি চাই না ছোটখাটো ভুল বোঝাবুঝির কারণে আমাদের কথা বলা বন্ধ হয়ে যাক। ভালো থাকবেন।
মায়া মেসেজটা কয়েকবার পড়ল। তারপর লিখল,
মায়া: আমি রাগ করিনি। শুধু আপনার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছা করছিল।
শাহজাদ উত্তর দিল,
শাহজাদ: তাহলে আগে বললেই পারতেন।
মায়া: সব কথা কি বলা যায়?
শাহজাদ: চেষ্টা করে দেখতে পারেন। আমি শুনব।
মায়ার মুখে আবার হাসি ফুটে উঠল।
মায়া: আচ্ছা, তাহলে কাল কথা হবে।
শাহজাদ: অবশ্যই। শুভরাত্রি, মায়া।
মায়া: শুভরাত্রি।
ফোনটা পাশে রেখে মায়া চোখ বন্ধ করল। আজকের ছোট্ট অভিমান তাকে একটা বিষয় বুঝিয়ে দিল—কাউকে ভালো লাগা মানে শুধু তার সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগা নয়; তার ব্যস্ততা বোঝা, তার অনুভূতিকে সম্মান করা এবং নিজের মনের কথাও সুন্দরভাবে প্রকাশ করা।
শাহজাদও জানালার পাশে দাঁড়িয়ে রাতের আকাশের দিকে তাকাল। তার মনে হলো, মায়ার সঙ্গে পরিচয়টা আর সাধারণ পরিচয়ের মধ্যে আটকে নেই। মেয়েটির হাসি, অভিমান, ছোট ছোট প্রশ্ন—সবকিছুই ধীরে ধীরে তার প্রতিদিনের ভাবনার অংশ হয়ে উঠছে।
তবে ভালো লাগার এই পথটা যে সব সময় সহজ হবে না, সেটা দুজনের কেউই তখনো জানত না।
চলবে... ❤️