### তোর আসক্ত আমি
লেখিকা: নুসরাত জাহান রাফা
পর্ব সংখ্যা: ১০
### ভালো লাগার নতুন অধ্যায়
সকালের মিষ্টি রোদে মায়ার ঘরটা আলোকিত হয়ে উঠেছে। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াচ্ছিল মায়া। গত রাতের অভিমানের পর আজ তার মনটা বেশ ভালো। বারবার মনে পড়ছে শাহজাদের সঙ্গে হওয়া শেষ কথাগুলো।
হঠাৎ ফোনে মেসেজ আসার শব্দ হলো।
শাহজাদ: সুপ্রভাত, মায়া। ঘুম কেমন হয়েছে?
মায়া মেসেজটা পড়ে মুচকি হাসল।
মায়া: সুপ্রভাত। ভালো হয়েছে। আপনার?
শাহজাদ: ভালো। আজ সকালটা একটু ব্যস্ততার মধ্যেই শুরু হয়েছে।
মায়া: তাহলে কাজে মন দিন। আমাকে নিয়ে ভাবতে হবে না।
শাহজাদ: আপনাকে নিয়ে ভাবতে হলে কি আলাদা সময় লাগে?
মায়া কথাটা পড়ে লজ্জা পেল। কী উত্তর দেবে বুঝতে পারল না। শেষে শুধু লিখল,
মায়া: আপনি না, সব সময় এমন কথা বলেন!
শাহজাদ হাসল। ফোনটা রেখে কাজে বেরিয়ে গেল।
এদিকে মায়া নাশতা করতে নিচে নামল। মা খাবার সাজিয়ে দিচ্ছিলেন। মায়া পাশে বসতেই মা বললেন,
— আজ তো দেখছি মুখে হাসি ফুটেছে।
— আমার মুখে কি হাসি থাকতে নেই?
— অবশ্যই থাকবে। তবে কারণটা জানতে ইচ্ছা করছে।
মায়া মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
— তোমাকে সব কথা বলা যায় না।
মা হেসে বললেন,
— একদিন নিজে থেকেই বলবি। আমি অপেক্ষা করব।
মায়া মায়ের হাত ধরে বলল,
— তুমি কিন্তু রাগ করবে না।
— তুই ভালো থাকলেই আমি খুশি।
মায়ের কথায় মায়ার মনটা ভরে গেল।
অন্যদিকে শাহজাদ অফিসে পৌঁছে দেখল রায়হান কিছু কাগজ নিয়ে অপেক্ষা করছে।
— স্যার, আজ বিকেলের মিটিংটা কি আগের সময়েই হবে?
— হ্যাঁ। প্রয়োজনীয় সব কাগজ প্রস্তুত রাখবেন।
— ঠিক আছে, স্যার।
শাহজাদ নিজের কক্ষে গিয়ে বসতেই ফোনে মায়ের কল এল।
— বাবা, আজ সন্ধ্যায় একটু তাড়াতাড়ি আসতে পারবি?
— চেষ্টা করব মা। কিছু হয়েছে?
— না, তেমন কিছু না। তোর সঙ্গে একটু সময় কাটাতে ইচ্ছা করছে।
— আচ্ছা মা। আজ তাড়াতাড়ি ফিরব।
দুপুরে মায়া নীলার সঙ্গে ফোনে কথা বলছিল।
— কিরে, আজ কী পরিকল্পনা?
— কিছু ঠিক করিনি।
— তাহলে বিকেলে আমার সঙ্গে বের হবি?
— কোথায়?
— একটু ঘুরব। তারপর কিছু খাব।
মায়া রাজি হয়ে গেল।
বিকেল পাঁচটার দিকে দুজন দেখা করল। নীলা গল্প করতে করতে বলল,
— তোর একটা কথা জানতে ইচ্ছা করছে।
— কী?
— শাহজাদ সাহেব কি তোকে পছন্দ করেন?
মায়া একটু থেমে বলল,
— জানি না।
— তুই কি তাঁকে পছন্দ করিস?
মায়া এবার চুপ করে গেল।
নীলা হাসতে হাসতে বলল,
— চুপ করে থাকার মানেই তো অনেক কিছু!
মায়া তার হাত ধরে বলল,
— আর একটা কথা বললে কিন্তু চলে যাব।
— আচ্ছা, আর বলব না।
দুজন হাসতে লাগল।
কিছুক্ষণ পর মায়ার ফোনে শাহজাদের মেসেজ এল।
শাহজাদ: কোথায় আছেন?
মায়া: নীলার সঙ্গে বাইরে।
শাহজাদ: ভালো। সময়মতো বাসায় ফিরবেন।
মায়া: আপনি কি সব সময় আমাকে বাসায় ফেরার কথা মনে করিয়ে দেবেন?
শাহজাদ: আপনি নিরাপদে থাকুন, সেটাই চাই।
মায়া উত্তর দিল,
মায়া: আচ্ছা, বুঝেছি।
নীলা পাশ থেকে বলল,
— আবার শাহজাদ সাহেবের মেসেজ?
মায়া ফোনটা লুকিয়ে ফেলল।
— তুই কিছুই দেখিস না!
— আমি তো কিছু বলিনি!
দুজনের হাসিতে জায়গাটা মুখর হয়ে উঠল।
সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে মায়া দেখল বাবা বসার ঘরে বসে আছেন। তিনি মেয়েকে দেখে বললেন,
— মা, আজ তোমার জন্য একটা জিনিস এনেছি।
মায়া অবাক হয়ে কাছে গেল।
— কী এনেছ বাবা?
বাবা একটা ছোট প্যাকেট এগিয়ে দিলেন। খুলে দেখল, তার পছন্দের একটা সুন্দর ঘড়ি।
মায়া আনন্দে বাবাকে জড়িয়ে ধরল।
— বাবা, অনেক সুন্দর হয়েছে!
— পছন্দ হয়েছে?
— খুব!
বাবা মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,
— আমার মেয়ের মুখে হাসি থাকলেই আমার ভালো লাগে।
মায়া বাবার পাশে বসে কিছুক্ষণ গল্প করল। তারপর ঘরে গিয়ে ঘড়িটা হাতে পরে আয়নার সামনে দাঁড়াল।
রাতের দিকে শাহজাদ বাসায় ফিরল। মা তার জন্য খাবার নিয়ে বসেছিলেন।
— এত দেরি হলো কেন বাবা?
— অফিসের কাজ ছিল, মা।
— হাত-মুখ ধুয়ে আয়। খাবার দিচ্ছি।
শাহজাদ তৈরি হয়ে এসে মায়ের পাশে বসল।
খাওয়া শেষে মা বললেন,
— বাবা, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
— বলো মা।
— মায়া মেয়েটাকে তোর কেমন লাগে?
শাহজাদ একটু অবাক হলো।
— হঠাৎ এই প্রশ্ন?
— এমনি। মেয়েটাকে আমার ভালো লেগেছে। তোর সঙ্গে কথা বলতে দেখেছি, বেশ ভদ্র আর সুন্দর ব্যবহার।
শাহজাদ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— আমারও ভালো লাগে মা।
রেহানা বেগম ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।
— ভালো লাগলে মানুষকে সম্মান করতে হয়। তার মতামতকে গুরুত্ব দিতে হয়।
— জানি মা।
— আর কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সময় নিয়ে ভাববি।
শাহজাদ মাথা নাড়ল।
রাতে নিজের ঘরে এসে সে মায়াকে মেসেজ দিল।
শাহজাদ: আজ দিনটা কেমন কাটল?
মায়া: খুব ভালো। বাবা আমার জন্য ঘড়ি এনেছেন।
শাহজাদ: বাহ! নিশ্চয়ই আপনার খুব পছন্দ হয়েছে?
মায়া: হ্যাঁ। বাবা আমার পছন্দগুলো খুব ভালো বোঝেন।
শাহজাদ: বাবারা এমনই হন। সন্তানের ছোট ছোট আনন্দেও তাঁদের অনেক খুশি থাকে।
মায়া: আপনার বাবা কি আপনাকে এভাবে উপহার দেন?
শাহজাদ: দেন। তবে এখন আর আগের মতো সময় পান না। তবুও পরিবারের জন্য তাঁর ভালোবাসা সব সময় অনুভব করি।
মায়া: পরিবারের ভালোবাসার তুলনা হয় না।
শাহজাদ: একদম ঠিক বলেছেন।
কিছুক্ষণ পর শাহজাদ আবার লিখল,
শাহজাদ: একটা কথা বলব?
মায়া: বলুন।
শাহজাদ: আপনার সঙ্গে কথা বলতে বলতে কখন যে সময় চলে যায়, বুঝতেই পারি না।
মায়া মেসেজটা পড়ে চুপ করে রইল। তারপর লিখল,
মায়া: আমারও আপনার সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগে।
শাহজাদের মুখে হাসি ফুটে উঠল।
শাহজাদ: তাহলে আজকের রাতটা ভালো লাগার কথা দিয়েই শেষ হোক।
মায়া: আচ্ছা। শুভরাত্রি।
শাহজাদ: শুভরাত্রি, মায়া। ভালো থাকবেন।
ফোন রেখে মায়া জানালার বাইরে তাকাল। আকাশে চাঁদ উঠেছে। তার মনে হলো, জীবনে কিছু মানুষ আসে, যাদের সঙ্গে কথা বললে মনটা অকারণেই ভালো হয়ে যায়।
আর শাহজাদ নিজের ঘরে বসে ভাবছিল, মায়াকে সে কতটা পছন্দ করে, তা এখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেনি। তবে একটা বিষয় পরিষ্কার—মায়ার হাসিটা তার কাছে বিশেষ হয়ে উঠেছে।
দুই পরিবারের মধ্যে এখনো কোনো গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়নি। শাহজাদের বাবা আর মায়ার বাবার পরিচয়ও কেবল সেই সামাজিক অনুষ্ঠানের সাধারণ পরিচয়েই সীমাবদ্ধ। কিন্তু শাহজাদ আর মায়ার পরিচয় ধীরে ধীরে নতুন এক জায়গায় পৌঁছাচ্ছে।
সামনে অপেক্ষা করছে আরও কিছু সুন্দর মুহূর্ত, কিছু অপ্রকাশিত কথা আর নতুন নতুন অনুভূতি।
চলবে... ❤️