### তোর আসক্ত আমি
লেখিকা: নুসরাত জাহান রাফা
পর্ব সংখ্যা: ১১
### পরিবারের সামনে প্রথম পরিচয়
সকালের নাশতার টেবিলে বসে শাহজাদ মায়ের সঙ্গে কথা বলছিল। রেহানা বেগম ছেলের পছন্দের পরোটা আর ডিম ভাজি তৈরি করেছেন। শাহজাদ খেতে খেতে বলল,
— মা, আজ তোমার রান্নাটা বেশ ভালো হয়েছে।
মা হেসে বললেন,
— শুধু আজই ভালো হয়েছে? প্রতিদিন তো তোর জন্য রান্না করি।
— প্রতিদিনই ভালো হয়। আজ একটু বেশি ভালো হয়েছে।
— আচ্ছা, বুঝেছি। আজকাল তুই কথাও বেশ সুন্দর করে বলতে শিখেছিস।
শাহজাদ মৃদু হাসল।
ঠিক তখনই তার ছোট বোন নাশতার টেবিলে এসে বসল। ভাইয়ের মুখের হাসি দেখে সে বলল,
— ভাইয়া, আজকাল তোমাকে অনেক খুশি খুশি লাগে!
শাহজাদ তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— তোর নাশতা খাওয়া হয়েছে?
— হয়েছে। কিন্তু আমার প্রশ্নের উত্তর দিলে না।
— সব প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় না।
বোন হেসে বলল,
— বুঝেছি! নিশ্চয়ই কোনো ব্যাপার আছে।
রেহানা বেগম মেয়েকে থামিয়ে দিলেন।
— তোরা দুজন সকাল সকাল শুরু করেছিস কেন? শান্তিতে নাশতা করতে দে।
শাহজাদ আর কথা বাড়াল না।
অন্যদিকে মায়া ঘুম থেকে উঠে মায়ের সঙ্গে সকালের কাজে সাহায্য করছিল। কাজ শেষ করে নিজের ঘরে এসে ফোন হাতে নিতেই শাহজাদের মেসেজ পেল।
শাহজাদ: সুপ্রভাত। আজকের দিনটা ভালো কাটুক।
মায়া: সুপ্রভাত। আপনার দিনটাও ভালো কাটুক।
শাহজাদ: আজ একটা কথা ছিল।
মায়া: কী কথা?
শাহজাদ: মা আপনার মায়ের সঙ্গে দেখা করতে চাইছেন।
মায়া একটু অবাক হলো।
মায়া: সত্যি?
শাহজাদ: জি। সেদিন আপনার মায়ের সঙ্গে দেখা করার কথা বলেছিলেন।
মায়া কিছুক্ষণ ভেবে উত্তর দিল,
মায়া: আমি মাকে জানাব। তবে উনি রাজি হবেন কি না জানি না।
শাহজাদ: কোনো সমস্যা নেই। সময় নিয়ে বলবেন।
মায়া ফোন রেখে মায়ের কাছে গেল।
— মা, তোমাকে একটা কথা বলব?
— বল মা।
— শাহজাদের মা তোমার সঙ্গে দেখা করতে চান।
মা একটু অবাক হয়ে বললেন,
— তাই নাকি? কেন?
— এমনি দেখা করতে চান। তোমার সঙ্গে পরিচিত হতে চান।
মা মৃদু হেসে বললেন,
— দেখা করতে চাইলে সমস্যা কী? সময় মিলিয়ে একদিন দেখা করা যাবে।
মায়া আনন্দিত হয়ে বলল,
— সত্যি মা?
— হ্যাঁ। তবে আগে তাঁর সঙ্গে কথা বলে সময় ঠিক করতে হবে।
মায়া সঙ্গে সঙ্গে শাহজাদকে জানাল।
মায়া: মা রাজি হয়েছেন। একদিন দেখা করা যাবে।
শাহজাদ: তাহলে মাকে জানিয়ে দিচ্ছি।
মায়া: আচ্ছা।
শাহজাদ মায়ের কাছে গিয়ে খবরটা দিল।
— মা, মায়ার মা দেখা করতে রাজি হয়েছেন।
রেহানা বেগম খুশি হয়ে বললেন,
— আলহামদুলিল্লাহ! তাহলে একদিন সময় ঠিক করে তাঁদের বাসায় যাব।
— তুমি যেদিন সুবিধা মনে করো।
— আগে ফোন করে কথা বলব। হুট করে কারও বাসায় যাওয়া ঠিক নয়।
শাহজাদ মায়ের কথায় সম্মতি জানাল।
দুপুরে মায়া নিজের ঘরে বসে পড়ছিল। এমন সময় নীলা ফোন করল।
— কী খবর? আজকাল তো তোর সঙ্গে কথাই হয় না!
— এই তো পড়ছিলাম।
— শাহজাদ সাহেবের সঙ্গে কথা হয়েছে?
মায়া হেসে বলল,
— হয়েছে।
— কী বলেছে?
— তাঁর মা আমার মায়ের সঙ্গে দেখা করতে চান।
নীলা অবাক হয়ে বলল,
— বাহ! তাহলে তো দুই পরিবারের পরিচয় হতে যাচ্ছে!
— পরিচয় হবে, কিন্তু তুই আবার বেশি কিছু ভেবে বসিস না।
— আমি কিছু ভাবছি না। শুধু বলছি, ব্যাপারটা সুন্দর।
মায়া হেসে ফোন রেখে দিল।
বিকেলে শাহজাদের মা মায়ার মাকে ফোন করলেন। দুজনের মধ্যে বেশ কিছুক্ষণ কথা হলো। প্রথমে সাধারণ কুশল বিনিময়, তারপর পরিবারের কথা, রান্নাবান্না আর দৈনন্দিন জীবনের গল্প।
রেহানা বেগম বললেন,
— আপনার মেয়ের সঙ্গে আমার একদিন দেখা হয়েছিল। মেয়েটা খুব সুন্দর ব্যবহার করেছে।
মায়ার মা হাসতে হাসতে বললেন,
— মায়া একটু চঞ্চল। তবে মনটা ভালো।
— আমারও ওকে বেশ ভালো লেগেছে।
— আপনাদের সঙ্গেও পরিচিত হয়ে ভালো লাগল।
দুজন ঠিক করলেন, পরের সপ্তাহে একদিন দেখা করবেন।
ফোন রাখার পর মায়ার মা মেয়েকে ডেকে বললেন,
— মা, শাহজাদের মায়ের সঙ্গে কথা হলো। খুব ভালো মানুষ মনে হলো।
মায়া মায়ের পাশে বসে বলল,
— তাই নাকি?
— হ্যাঁ। পরের সপ্তাহে দেখা করার কথা হয়েছে।
মায়া চুপচাপ হাসল। তার মনে হলো, শাহজাদের পরিবারের সঙ্গে পরিচয় হওয়াটা হয়তো তাদের সম্পর্কের একটা নতুন অধ্যায় হয়ে উঠবে।
সন্ধ্যায় শাহজাদ মায়াকে ফোন করল।
— আপনার মায়ের সঙ্গে আমাদের মায়ের কথা হয়েছে?
— জি। মা আমাকে সব বলেছেন।
— তাহলে তো ভালোই হলো।
— আপনার মা নাকি আমাকে পছন্দ করেন?
শাহজাদ একটু হেসে বলল,
— শুধু মা নন, আমিও করি।
মায়া লজ্জা পেয়ে বলল,
— আপনি আবার শুরু করলেন!
— সত্যি কথা বললে কি শুরু করা হয়?
— সব সত্যি কথা সব সময় বলতে হয় না।
— তাহলে কোন কথাগুলো বলতে হয়?
মায়া মুচকি হেসে বলল,
— সেটা আপনাকেই বুঝে নিতে হবে।
শাহজাদ হাসল।
— আচ্ছা, চেষ্টা করব।
কিছুক্ষণ পর মায়া জিজ্ঞেস করল,
— আপনার বাবা কি জানেন যে আপনার মা আমার মায়ের সঙ্গে দেখা করবেন?
— এখনো বিস্তারিত বলিনি। তবে জানাব।
— আপনার বাবা কি আপত্তি করবেন?
— আপত্তি করার কোনো কারণ নেই। মা কারও সঙ্গে পরিচিত হতে চাইলে বাবা বাধা দেবেন না।
মায়া মাথা নাড়ল।
— আচ্ছা।
শাহজাদ বলল,
— তবে একটা কথা।
— কী?
— আপনি কিন্তু আমাদের বাসায় এলে মায়ের সঙ্গে ভালো করে গল্প করবেন। মা গল্প করতে বেশ পছন্দ করেন।
— আমি চেষ্টা করব।
— আর ভয় পাওয়ার কিছু নেই। মা খুব সহজেই সবার সঙ্গে মিশে যেতে পারেন।
মায়া হেসে বলল,
— আমি ভয় পাচ্ছি না।
— তাহলে ভালো।
রাতের দিকে শাহজাদ বাবার সঙ্গে বসার ঘরে বসে কথা বলছিল। বাবা খবরের কাগজ পড়ছিলেন। শাহজাদ বলল,
— বাবা, মা আগামী সপ্তাহে একজনের সঙ্গে দেখা করতে যাবেন।
বাবা কাগজ থেকে চোখ তুলে বললেন,
— কার সঙ্গে?
— একজন পরিচিত মেয়ের মা। মা তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন।
— ও আচ্ছা। ভালো কথা। পরিচিত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা ভালো।
শাহজাদ মাথা নাড়ল।
বাবা আবার নিজের কাজে মন দিলেন। শাহজাদও আর কিছু বলল না।
এদিকে মায়া ঘুমানোর আগে মায়ের সঙ্গে গল্প করছিল। মা বললেন,
— মেয়েটা, মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে হলে আগে সম্মান আর বিশ্বাস থাকতে হয়।
মায়া মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
— আমি জানি মা।
— কাউকে ভালো লাগলে তার পরিবারকেও সম্মান করতে হয়। আর নিজের পরিবারকেও সব সময় গুরুত্ব দিতে হয়।
মায়া মায়ের হাত ধরে বলল,
— তুমি চিন্তা করো না। আমি সব বুঝি।
মা মেয়ের কপালে চুমু দিয়ে বললেন,
— আল্লাহ তোকে ভালো রাখুন।
সেদিন রাতে শাহজাদ ও মায়া দুজনেই ঘুমাতে গেল এক অদ্ভুত আনন্দ নিয়ে। আগামী সপ্তাহে দুই পরিবারের মায়েদের দেখা হবে। হয়তো সেই দেখা থেকেই তৈরি হবে নতুন পরিচয়, নতুন সম্পর্কের সুযোগ।
তবে তাদের কেউই জানত না, এই পরিচয়ের পর সামনে এমন একটি দিন আসবে, যেদিন শাহজাদকে মায়ার সামনে নিজের মনের কথা আরও স্পষ্ট করে বলতে হবে।
চলবে... ❤️