### তোর আসক্ত আমি
লেখিকা: নুসরাত জাহান রাফা
পর্ব সংখ্যা: ১২
### দুই পরিবারের প্রথম দেখা
সকাল থেকেই মায়াদের বাড়িতে একটু ব্যস্ততা। আজ শাহজাদের মা রেহানা বেগম তাঁদের বাসায় আসবেন। মায়ার মা সকাল থেকে ঘর গোছানো আর রান্নার কাজে ব্যস্ত।
মায়া রান্নাঘরে এসে বলল,
— মা, তোমাকে একটু সাহায্য করব?
মা মেয়ের দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন,
— অবশ্যই। টেবিলটা সুন্দর করে সাজিয়ে দে।
মায়া টেবিল সাজাতে সাজাতে বলল,
— মা, তুমি কিন্তু বেশি আয়োজন করো না। তাঁরা শুধু দেখা করতে আসছেন।
— অতিথি বাড়িতে এলে একটু আয়োজন করতেই হয়।
— আচ্ছা, তুমি যা ভালো বোঝো।
মা হেসে মেয়ের হাতে একটা প্লেট দিয়ে বললেন,
— এটা নিয়ে বসার ঘরে রাখ।
মায়া প্লেটটা নিয়ে চলে গেল।
অন্যদিকে খান বাড়িতে রেহানা বেগম তৈরি হচ্ছিলেন। শাহজাদ মায়ের ঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল।
— মা, তৈরি হয়েছ?
— এই তো বাবা। আর একটু সময় লাগবে।
— ঠিক আছে। গাড়ি প্রস্তুত আছে।
রেহানা বেগম ছেলের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন।
— তুইও যাবি আমাদের সঙ্গে?
শাহজাদ একটু থেমে বলল,
— গেলে কি সমস্যা?
— সমস্যা কীসের? তবে তুই গেলে মায়ার সঙ্গে দেখা হবে।
শাহজাদ হালকা হেসে বলল,
— সে তো ভালোই।
রেহানা বেগম ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝলেন, কথাটার মধ্যে অন্যরকম আনন্দ আছে।
কিছুক্ষণ পর তাঁরা মায়াদের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলেন।
মায়া তখন বসার ঘরে বসে ছিল। দরজার ঘণ্টা বাজতেই সে উঠে দাঁড়াল। মা দরজা খুলে তাঁদের ভেতরে নিয়ে এলেন।
— আসুন, ভেতরে আসুন।
রেহানা বেগম হাসিমুখে বললেন,
— কেমন আছেন?
— আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?
— আমিও ভালো আছি।
মায়া এগিয়ে এসে সালাম দিল।
— আসসালামু আলাইকুম, আন্টি।
রেহানা বেগম স্নেহভরে বললেন,
— ওয়ালাইকুমুস সালাম। কেমন আছো মা?
— আলহামদুলিল্লাহ, ভালো।
— তোমাকে আবার দেখে খুব ভালো লাগছে।
মায়া মৃদু হেসে বলল,
— আপনাকেও।
শাহজাদ পেছনে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। মায়া তার দিকে তাকিয়ে সালাম দিল।
— আসসালামু আলাইকুম।
— ওয়ালাইকুমুস সালাম। কেমন আছেন?
— ভালো। আপনি?
— আলহামদুলিল্লাহ।
মায়ার মা তাঁদের বসতে বললেন। সবাই বসার পর চা-নাশতা পরিবেশন করা হলো।
রেহানা বেগম বললেন,
— আপনার মেয়েটা খুব সুন্দর ব্যবহার করে। সেদিন বাজারে দেখা হওয়ার পর থেকেই ওকে ভালো লেগেছে।
মায়ার মা হাসলেন।
— মায়া একটু চঞ্চল। তবে সবার সঙ্গে মিশতে ভালোবাসে।
— চঞ্চল মেয়েরাই তো বাড়ি আনন্দে ভরিয়ে রাখে।
মায়া পাশ থেকে হেসে বলল,
— আন্টি, মা কিন্তু আমার সব দুষ্টুমির কথা বলে দেবে।
সবাই হেসে উঠল।
শাহজাদ মায়ার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
কথার ফাঁকে মায়ার বাবা বসার ঘরে এলেন। তিনি অতিথিদের সালাম দিয়ে তাঁদের পাশে বসলেন।
— আপনাদের আসতে কোনো অসুবিধা হয়নি তো?
রেহানা বেগম বললেন,
— না, একদমই না। আপনার স্ত্রী তো অনেক সুন্দর করে আপ্যায়ন করেছেন।
মায়ার বাবা হেসে বললেন,
— এটা তো তাঁর অভ্যাস। অতিথি এলে আর কোনো কাজের কথা মনে থাকে না।
মায়ার মা মজা করে বললেন,
— আপনি আবার শুরু করলেন!
সবাই আবার হেসে উঠল।
কিছুক্ষণ পর মায়ার বাবা শাহজাদের বাবার কথা জানতে চাইলেন।
— আপনার পরিবারের সবাই ভালো আছেন তো?
রেহানা বেগম উত্তর দিলেন,
— জি, আলহামদুলিল্লাহ। সবাই ভালো আছেন।
মায়ার বাবা মাথা নাড়লেন। তাঁদের কথাবার্তা ছিল একেবারেই সাধারণ পরিচয়ের মতো। আগে এক সামাজিক অনুষ্ঠানে দেখা হয়েছিল, আজ আবার পরিবারের মাধ্যমে পরিচয়টা একটু বাড়ল।
এদিকে মায়া রান্নাঘর থেকে আরও কিছু খাবার নিয়ে এল। শাহজাদ তার দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল,
— এত আয়োজন করছেন কেন?
মায়া হেসে বলল,
— আমি করিনি। মা করেছেন।
— তাহলে আপনার মা খুব ভালো আয়োজন করেন।
— সেটা তো আমি জানিই।
শাহজাদ মৃদু হেসে চুপ করে গেল।
কিছুক্ষণ পর রেহানা বেগম মায়াকে পাশে বসতে বললেন।
— মা, পড়াশোনা কেমন চলছে?
— ভালোই চলছে, আন্টি।
— পড়াশোনার পাশাপাশি মাকে সাহায্য করো?
মায়া হেসে বলল,
— যতটুকু পারি।
— খুব ভালো। নিজের কাজ নিজে করতে শেখা দরকার।
মায়ার মা বললেন,
— ও এখন অনেক কিছু শিখেছে। আগে রান্নাঘরে ঢুকতেই চাইত না।
মায়া অবাক হয়ে বলল,
— মা! এসবও বলতে হবে?
আবার হাসির শব্দ ছড়িয়ে পড়ল।
শাহজাদ মনে মনে ভাবল, মায়ার এই স্বাভাবিক হাসিটাই তার সবচেয়ে ভালো লাগে।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো। রেহানা বেগম ওঠার প্রস্তুতি নিলেন।
মায়ার মা বললেন,
— আবার আসবেন। আপনার সঙ্গে কথা বলে খুব ভালো লাগল।
— অবশ্যই আসব। আপনিও একদিন আমাদের বাসায় আসবেন।
মায়া দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিল। রেহানা বেগম তার মাথায় হাত রেখে বললেন,
— ভালো থেকো মা। নিজের যত্ন নিও।
— আপনিও ভালো থাকবেন, আন্টি।
শাহজাদ গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। মায়া তার দিকে তাকাতেই সে বলল,
— পরে কথা হবে।
— আচ্ছা।
গাড়ি চলে যাওয়ার পর মায়া ঘরে ফিরে এল। মা তখন অতিথিদের দেওয়া কাপ-প্লেট গোছাচ্ছিলেন।
— মা, আন্টি কেমন লাগল তোমার?
মায়ার মা বললেন,
— খুব ভালো। ভদ্র আর আন্তরিক মানুষ।
— তাই না?
— হ্যাঁ। আর শাহজাদও বেশ শান্ত স্বভাবের মনে হলো।
মায়া কিছু না বলে মুচকি হাসল।
অন্যদিকে গাড়িতে বসে রেহানা বেগম ছেলেকে বললেন,
— মায়ার পরিবার বেশ ভালো। মেয়েটার ব্যবহারও আমার খুব পছন্দ হয়েছে।
শাহজাদ জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
— হ্যাঁ মা।
— কী রে, তোর কিছু বলার নেই?
— কী বলব?
— তুই তো সব বুঝিস। আমার কাছে লুকানোর কিছু নেই।
শাহজাদ একটু হেসে বলল,
— তুমি যা বুঝেছ, সেটা ভুল নয়।
রেহানা বেগম আর কিছু বললেন না। শুধু ছেলের মুখের হাসিটা দেখে খুশি হলেন।
রাতে মায়ার ফোনে শাহজাদের মেসেজ এল।
শাহজাদ: আজকের দিনটা কেমন লাগল?
মায়া: খুব ভালো। আপনার মা অনেক ভালো।
শাহজাদ: মা-ও আপনাকে খুব পছন্দ করেছেন।
মায়া: আমার মাকেও আপনার মা ভালো লেগেছেন।
শাহজাদ: তাহলে দুই মায়ের পরিচয়টা ভালোভাবেই হলো।
মায়া: জি। আপনার বাবা কি কিছু বলেছেন?
শাহজাদ: বাবা বলেছেন, পরিচিত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা ভালো।
মায়া মুচকি হেসে লিখল,
মায়া: তাহলে আজকের দিনটা সফল।
শাহজাদ: আমার কাছে তো আরও একটা কারণে সফল।
মায়া: কী কারণ?
শাহজাদ: আজ আপনাকে অনেকক্ষণ দেখতে পেয়েছি।
মায়া উত্তর দিতে গিয়ে থেমে গেল। তারপর লিখল,
মায়া: আপনার কথা বলার ধরনটা একদম বদলায় না।
শাহজাদ: বদলাতে হবে?
মায়া: না। থাক, যেমন আছেন তেমনই থাকুন।
শাহজাদ মেসেজটা পড়ে হাসল।
সেদিন দুই পরিবারের প্রথম ঘরোয়া দেখা সুন্দরভাবেই শেষ হলো। কোনো বড় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়নি, কোনো সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়নি। শুধু পরিচয়ের পরিধিটুকু একটু বেড়েছে।
কিন্তু শাহজাদ আর মায়ার মনে সেই দিনের স্মৃতি আলাদা জায়গা করে নিল।
চলবে... ❤️