### তোর আসক্ত আমি
লেখিকা: নুসরাত জাহান রাফা
পর্ব সংখ্যা: ১৩
### না বলা কথার অপেক্ষা
সকালের নরম আলোয় খান বাড়ির বারান্দায় বসে চা পান করছিল শাহজাদ। হাতে ফোন, চোখে যেন কারও অপেক্ষা। গতকালের মায়াদের বাড়িতে যাওয়ার পর থেকে তার মনটা বেশ ভালো।
ঠিক তখনই ছোট বোন এসে পাশে বসল।
— ভাইয়া, কী দেখছ?
শাহজাদ ফোনটা নামিয়ে বলল,
— কিছু না।
— কিছু না হলে ফোনের দিকে তাকিয়ে হাসছ কেন?
— তোর এত প্রশ্ন কেন?
— কারণ আমার ভাইয়া আজকাল রহস্যময় হয়ে গেছে!
শাহজাদ হেসে বলল,
— তোর পড়াশোনা শেষ হয়েছে?
— হয়েছে। এখন তোমার খবর নেওয়ার সময়।
— আমার কোনো খবর নেই।
বোন মুচকি হেসে বলল,
— আচ্ছা, দেখি কত দিন লুকিয়ে রাখতে পারো!
শাহজাদ মাথা নাড়িয়ে আবার চায়ের কাপে চুমুক দিল।
অন্যদিকে মায়া নিজের ঘরে বসে পড়ছিল। কিন্তু বইয়ের পাতায় মন বসছিল না। বারবার মনে পড়ছিল গতকালের কথা। রেহানা বেগমের স্নেহভরা ব্যবহার, শাহজাদের মায়ের সঙ্গে নিজের মায়ের হাসিমুখে গল্প—সব মিলিয়ে দিনটা তার ভালোই কেটেছিল।
হঠাৎ ফোনে মেসেজ এল।
শাহজাদ: সকাল থেকে কী করছেন?
মায়া: পড়ার চেষ্টা করছি।
শাহজাদ: চেষ্টা করছেন মানে?
মায়া: বই খুলে বসে আছি, কিন্তু মন বসছে না।
শাহজাদ: তাহলে একটু বিরতি নিন।
মায়া: আপনি কি সব সময় উপদেশ দেন?
শাহজাদ: প্রয়োজন হলে দিই।
মায়া: তাহলে আজ আপনার জন্য একটা উপদেশ আছে।
শাহজাদ: শুনছি।
মায়া: নিজের কাজের পাশাপাশি নিজের জন্যও সময় রাখবেন।
শাহজাদ মেসেজটা পড়ে মুচকি হাসল।
শাহজাদ: আপনার উপদেশ মেনে চলার চেষ্টা করব।
মায়া ফোন রেখে আবার বইয়ের দিকে মন দিল।
দুপুরের দিকে মায়ার মা তাকে রান্নাঘরে ডাকলেন।
— মা, একটু আয় তো।
— বলো মা।
— আজ দুপুরে রান্নাটা তুই করবি?
মায়া অবাক হয়ে বলল,
— আমি?
— হ্যাঁ। তোর হাতের রান্না খেতে ইচ্ছা করছে।
— আচ্ছা, চেষ্টা করি।
মায়া রান্না করতে শুরু করল। মাঝে মাঝে মায়ের কাছে পরামর্শ নিচ্ছিল। সবশেষে খাবার টেবিলে পরিবেশন করতেই বাবা এসে বসলেন।
প্রথম লোকমা মুখে দিয়ে বাবা বললেন,
— বাহ! আজ তো আমার মেয়ের রান্না বেশ ভালো হয়েছে।
মায়া আনন্দে বলল,
— সত্যি বাবা?
— একদম সত্যি। তবে লবণটা একটু কম হয়েছে।
মায়া মুখ ভার করে বলল,
— তাহলে আর কখনো রান্না করব না।
বাবা হেসে বললেন,
— আরে, একটু কমবেশি হতেই পারে। শেখার সময় তো ভুল হবেই।
মা বললেন,
— তোর বাবা ঠিকই বলেছে। প্রথম দিনেই সবকিছু নিখুঁত হয় না।
মায়া হাসতে হাসতে আবার খেতে শুরু করল।
বিকেলে শাহজাদ অফিস থেকে বের হওয়ার সময় রায়হানকে কিছু নির্দেশনা দিয়ে গাড়িতে উঠল। আজ তার কাজ তুলনামূলক কম ছিল। তাই বাড়ি ফেরার আগে মায়ার সঙ্গে একটু দেখা করার কথা ভাবল।
সে ফোন করল।
— হ্যালো, কেমন আছেন?
— ভালো। আপনি?
— আমিও ভালো। আজ কি একটু সময় হবে?
মায়া জানাল,
— আজ বিকেলে বাসায় কাজ আছে। তবে সন্ধ্যার আগে সময় পেতে পারি।
— তাহলে আপনার সুবিধামতো দেখা করা যায়।
— আচ্ছা।
সন্ধ্যার আগে মায়া বাড়ির কাছের একটি পরিচিত জায়গায় গেল। শাহজাদ আগে থেকেই সেখানে অপেক্ষা করছিল।
মায়াকে দেখে সে এগিয়ে এল।
— আজ পড়াশোনা কেমন হলো?
মায়া হেসে বলল,
— মোটামুটি। তবে রান্না করেছি।
— তাই নাকি? কী রান্না করেছেন?
— সেটা বলব না।
— কেন?
— বললে আপনি আবার বিচার করবেন।
শাহজাদ হেসে বলল,
— আমি কি এত খারাপ বিচারক?
— জানি না।
দুজন পাশাপাশি বসে গল্প করতে লাগল।
শাহজাদ হঠাৎ বলল,
— কাল মাকে আপনার কথা বলেছি।
মায়া অবাক হয়ে তাকাল।
— আমার কথা?
— হ্যাঁ। মা বলছিলেন, আপনার সঙ্গে আবার দেখা করতে চান।
মায়া মৃদু হেসে বলল,
— আপনার মা খুব ভালো মানুষ।
— মা আপনাকে পছন্দ করেন। আর আপনিও মাকে পছন্দ করেন, সেটা বুঝতে পেরেছি।
— আপনার মা আমাকে এতটা চেনেন না। তবুও এত ভালো ব্যবহার করেছেন।
— মা মানুষকে সম্মান করতে জানেন।
মায়া মাথা নাড়ল।
কিছুক্ষণ পর শাহজাদ একটু গম্ভীর হয়ে বলল,
— মায়া, একটা কথা জানতে চাই।
— বলুন।
— আপনি কি কখনো ভেবেছেন, আমাদের এই পরিচয়টা সামনে কোথায় গিয়ে দাঁড়াতে পারে?
মায়া হঠাৎ চুপ হয়ে গেল। প্রশ্নটা সে আশা করেনি।
— জানি না।
শাহজাদ শান্তভাবে বলল,
— আমি আপনাকে কোনো সিদ্ধান্তের জন্য চাপ দিচ্ছি না। শুধু জানতে ইচ্ছা করল।
মায়া কিছুক্ষণ পর বলল,
— সবকিছু সময়ের ওপর ছেড়ে দেওয়া ভালো। মানুষকে আগে ভালোভাবে চিনতে হয়।
শাহজাদ সম্মতি জানাল।
— আপনার কথা ঠিক। আমিও তাড়াহুড়ো করতে চাই না।
মায়া এবার একটু স্বস্তি পেল।
— আপনি রাগ করেননি তো?
— না। বরং আপনার স্পষ্ট কথা বলা আমার ভালো লেগেছে।
মায়া মৃদু হাসল।
তারা আরও কিছুক্ষণ কথা বলল। তারপর মায়া বাড়ি ফেরার জন্য উঠল।
শাহজাদ বলল,
— সাবধানে যাবেন।
— আপনি বাসায় গিয়ে মাকে সময় দেবেন। মনে আছে তো?
— মনে আছে। আজ আপনার উপদেশ পালন করব।
মায়া হেসে বিদায় নিল।
বাড়ি ফিরে শাহজাদ সত্যিই মায়ের সঙ্গে অনেকক্ষণ গল্প করল। রেহানা বেগম ছেলের পাশে বসে বললেন,
— আজ তোকে বেশ ফুরফুরে লাগছে।
— আজ কাজ কম ছিল।
— শুধু কাজ কম ছিল, নাকি অন্য কোনো কারণও আছে?
শাহজাদ হেসে বলল,
— মা, তুমি না!
রেহানা বেগমও হেসে উঠলেন।
এদিকে মায়া নিজের ঘরে এসে মায়ের সঙ্গে দিনের গল্প করছিল।
— মা, আজ শাহজাদের সঙ্গে দেখা হয়েছিল।
মা স্বাভাবিকভাবে বললেন,
— ভালো। কী কথা হলো?
— অনেক কথা।
— মানুষটাকে যত চিনবি, ততই বুঝতে পারবি। তবে নিজের পড়াশোনা আর পরিবারের দায়িত্ব ভুলে যাস না।
— আচ্ছা মা।
রাতের দিকে শাহজাদ মেসেজ দিল।
শাহজাদ: বাসায় পৌঁছেছেন?
মায়া: জি।
শাহজাদ: আজকের কথাগুলো ভালো লেগেছে।
মায়া: আমারও।
শাহজাদ: একটা কথা মনে রাখবেন, আপনার সিদ্ধান্তকে আমি সম্মান করি।
মায়া কিছুক্ষণ পর উত্তর দিল,
মায়া: আর আপনিও মনে রাখবেন, কাউকে বুঝতে সময় দিতে হয়।
শাহজাদ: অবশ্যই।
ফোন রেখে দুজনেই নিজেদের কাজে মন দিল।
কেউ কাউকে ভালোবাসার প্রতিশ্রুতি দেয়নি। কিন্তু দুজনের মধ্যে বিশ্বাসের একটা ছোট্ট জায়গা তৈরি হতে শুরু করেছে।
আর কখনো কখনো সম্পর্কের সবচেয়ে সুন্দর শুরুটা হয় ঠিক এমনভাবেই—অল্প কথায়, ধীরে ধীরে, একে অপরকে বোঝার মধ্য দিয়ে।
চলবে... ❤️