### তোর আসক্ত আমি
লেখিকা: নুসরাত জাহান রাফা
পর্ব সংখ্যা: ১৯
### সকালের প্রথম ফোন
সকালের মিষ্টি রোদ জানালার পর্দা ভেদ করে মায়ার ঘরে প্রবেশ করেছে। ঘড়িতে তখন সকাল আটটা। মায়া বিছানায় বসে ফোন দেখছিল। গত রাতে শাহজাদ কথা দিয়েছিল, আজ সকালে সে নিজে থেকে ফোন করবে। তাই মায়া বারবার ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকাচ্ছিল।
হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে শাহজাদের নাম দেখে মায়ার মুখে হাসি ফুটে উঠল।
—হ্যালো!
ওপাশ থেকে শাহজাদের শান্ত কণ্ঠ ভেসে এল।
—আসসালামু আলাইকুম। ঘুম থেকে উঠেছেন?
—ওয়ালাইকুমুস সালাম। জি, অনেকক্ষণ হলো।
—নাশতা করেছেন?
মায়া মুচকি হেসে বলল,
—আপনি ফোন করার আগেই করে ফেলেছি।
—বাহ! আজ তো আমাকে মনে করিয়ে দিতে হলো না।
—সব সময় কি আপনিই মনে করিয়ে দেবেন নাকি?
শাহজাদ হেসে বলল,
—না, তবে আপনার খেয়াল রাখতে ভালো লাগে।
মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল,
—আজ নিজে থেকে ফোন করেছেন দেখে ভালো লাগল।
—কথা দিয়েছিলাম। কথা রাখার চেষ্টা করছি।
—শুধু চেষ্টা নয়, কথা রাখতে হবে।
—জি ম্যাডাম, মনে থাকবে।
মায়া এবার হেসে ফেলল।
শাহজাদ বুঝতে পারল, মেয়েটার মনের ছোট্ট অভিমানটা আজ অনেকটাই কমে গেছে।
অন্যদিকে খান বাড়িতে রেহানা বেগম নাশতার টেবিলে বসে ছিলেন। শাহজাদ ফোনে কথা শেষ করে নিচে নেমে এল।
মা ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—কার সঙ্গে এত সকালে কথা বলছিলি?
শাহজাদ স্বাভাবিক গলায় বলল,
—মায়ার সঙ্গে।
রেহানা বেগম মৃদু হেসে বললেন,
—মেয়েটা কেমন আছে?
—ভালো আছে মা।
ঠিক তখনই শাহজাদের ছোট বোন এসে বলল,
—ভাইয়া, আপনি কি মায়া আপুর সঙ্গে কথা বলছিলেন?
শাহজাদ অবাক হয়ে তাকাল।
—তুমি কীভাবে বুঝলে?
—আপনার মুখ দেখেই বুঝেছি!
রেহানা বেগম হেসে উঠলেন। শাহজাদ বোনের দিকে তাকিয়ে বলল,
—তোমার পড়াশোনা শেষ হয়েছে?
বোন সঙ্গে সঙ্গে চুপ হয়ে গেল।
—আমি এখনই পড়তে যাচ্ছি!
তার তাড়াহুড়ো দেখে শাহজাদ আর মা দুজনেই হেসে উঠলেন।
দুপুরে মায়া নিজের ঘরে বসে পড়াশোনা করছিল। এমন সময় নীলা ফোন করল।
—কী রে, আজ এত খুশি খুশি লাগছে কেন?
মায়া বই থেকে চোখ না সরিয়েই বলল,
—এমনিই।
—এমনিই আবার কী? নিশ্চয়ই শাহজাদ সাহেবের ফোন এসেছে।
মায়া এবার হেসে বলল,
—হ্যাঁ, সকালে ফোন করেছিলেন।
—ওমা! নিজে থেকে?
—হুম। কাল কথা দিয়েছিলেন, আজ ফোন করবেন।
নীলা একটু মজা করে বলল,
—বাহ! তাহলে তো দেখছি অভিমান কাজে দিয়েছে!
মায়া হেসে বলল,
—সবকিছুতেই তুই মজা খুঁজে পাস কেন?
—কারণ তোর হাসিটা দেখতে ভালো লাগে।
মায়া এবার বন্ধুর কথায় হাসল।
কিছুক্ষণ গল্প করার পর নীলা বলল,
—আচ্ছা, একটা কথা বলি? তোরা যেভাবে ধীরে ধীরে এগোচ্ছিস, আমার ভালো লাগছে। তবে নিজের পড়াশোনার কথাও ভুলে যাস না।
মায়া বলল,
—সেটা নিয়ে চিন্তা করিস না। পড়াশোনাও চলছে।
বিকেলে শাহজাদ অফিস থেকে ফিরে মায়ের ঘরে গেল। রেহানা বেগম তখন কিছু কাপড় গুছিয়ে রাখছিলেন।
—মা, কী করছ?
—এই তো, একটু কাজ করছি। তুই অফিস থেকে ফিরেছিস?
—হ্যাঁ। আজ কাজ একটু আগেই শেষ হয়েছে।
মা ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—বাবা, একটা কথা জিজ্ঞেস করি?
—বলো মা।
—মায়ার সঙ্গে তোর পরিচয়টা এখন কেমন চলছে?
শাহজাদ একটু হেসে বলল,
—ভালোই মা। আমরা একে অপরকে বোঝার চেষ্টা করছি।
রেহানা বেগম বললেন,
—খুব ভালো। তবে একটা বিষয় মনে রাখবি, কারও জীবনে জায়গা পেতে হলে তার বিশ্বাস অর্জন করতে হয়।
শাহজাদ মায়ের পাশে বসে বলল,
—আমি চাই, মায়া আমার সঙ্গে কথা বলার সময় যেন সবকিছু নির্দ্বিধায় বলতে পারে। কোনো ভয় বা সংকোচ যেন না থাকে।
মা ছেলের কথা শুনে সন্তুষ্ট হলেন।
—আল্লাহ যেন তোদের জন্য ভালো কিছু রাখেন।
শাহজাদ মৃদু স্বরে বলল,
—আমিন।
সন্ধ্যার পর মায়া বারান্দায় বসে ছিল। আকাশে হালকা মেঘ জমেছে। বাতাসে ঠান্ডা ভাব। সে ফোন হাতে নিয়ে শাহজাদকে একটা মেসেজ দিল।
মায়া: কী করছেন?
কিছুক্ষণ পর উত্তর এল।
শাহজাদ: বারান্দায় বসে আছি। আপনি?
মায়া: আমিও বারান্দায়।
শাহজাদ: তাহলে তো দুজনের সন্ধ্যাটা একই রকম কাটছে।
মায়া: শুধু জায়গাটা আলাদা।
শাহজাদ: ঠিক বলেছেন।
কিছুক্ষণ পর শাহজাদ ফোন করল।
—মায়া, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
—জি, বলুন।
—আপনার কোনো কিছু খারাপ লাগলে আমাকে বলবেন তো?
মায়া একটু অবাক হয়ে বলল,
—হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন?
—কারণ আমি চাই না, আপনার মনে কোনো অভিমান জমে থাকুক। আপনি চুপ করে থাকলে হয়তো আমি বুঝতেই পারব না।
মায়া নরম গলায় বলল,
—আমি বলব। তবে আপনিও আপনার কথাগুলো আমার সঙ্গে ভাগ করে নেবেন।
—অবশ্যই।
—আর একটা কথা!
—বলুন।
—সব সময় এত গম্ভীর হয়ে থাকবেন না। মাঝে মাঝে একটু হাসবেন।
শাহজাদ হেসে বলল,
—আপনার এই আবদারটা মনে রাখব।
মায়া বলল,
—দেখি কত দিন মনে থাকে!
—আপনি পরীক্ষা নিতে থাকুন, আমি চেষ্টা চালিয়ে যাব।
দুজনেই হেসে উঠল।
রাতের খাবারের সময় মায়া মায়ের পাশে বসেছিল। মা তার প্লেটে খাবার তুলে দিয়ে বললেন,
—আজ বেশ হাসিখুশি দেখাচ্ছে তোকে।
মায়া বলল,
—আজ দিনটা ভালো কেটেছে মা।
—আলহামদুলিল্লাহ। সব সময় নিজের মন ভালো রাখবি। আর যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ভালোভাবে ভেবে নিবি।
মায়া মায়ের হাত ধরে বলল,
—তুমি পাশে থাকলে আমার কোনো চিন্তা নেই।
এদিকে খান বাড়িতে শাহজাদও পরিবারের সঙ্গে রাতের খাবার খাচ্ছিল। তার ছোট বোন সারাক্ষণ নানা গল্প করে সবাইকে হাসাচ্ছিল।
খাবার শেষে শাহজাদ নিজের ঘরে এসে জানালার পাশে দাঁড়াল। ফোনে মায়ার একটি মেসেজ এল।
মায়া: আজকের দিনটা সুন্দর ছিল। ধন্যবাদ।
শাহজাদ: আমাকে ধন্যবাদ কেন?
মায়া: কারণ আজ আপনি কথা রেখেছেন।
শাহজাদ: আপনার মুখে হাসি থাকলে আমারও ভালো লাগে।
মায়া মেসেজটা পড়ে মুচকি হাসল।
তাদের সম্পর্কের পথ এখনো অনেক দীর্ঘ। সামনে হয়তো আরও অভিমান আসবে, কখনো ভুল বোঝাবুঝিও হবে। কিন্তু দুজনেই ধীরে ধীরে শিখছে, সম্পর্ক সুন্দর রাখতে হলে শুধু ভালো লাগা নয়, প্রয়োজন বিশ্বাস, ধৈর্য আর একে অপরের প্রতি যত্ন।
আর শাহজাদ মনে মনে ঠিক করল, মায়ার ছোট ছোট আবদারগুলো সে কখনো অবহেলা করবে না।
চলবে... ❤️