### তোর আসক্ত আমি
লেখিকা: নুসরাত জাহান রাফা
পর্ব সংখ্যা: ২১
### পরিচয়ের নতুন অধ্যায়
সকালের দিকে খান বাড়িতে বেশ ব্যস্ততা। শাহজাদের ছোট বোন আজ স্কুলের অনুষ্ঠানে অংশ নেবে। তাই সকাল থেকেই তার আনন্দের শেষ নেই। কখনো নিজের পোশাক ঠিক করছে, কখনো মাকে ডেকে জিজ্ঞেস করছে সবকিছু ঠিক আছে কি না।
রেহানা বেগম মেয়ের চুল ঠিক করে দিতে দিতে বললেন,
—এত অস্থির হচ্ছিস কেন? এখনো তো অনেক সময় বাকি।
মেয়ে হেসে বলল,
—মা, আজ কিন্তু ভাইয়া আমার অনুষ্ঠানে আসবে। ভাইয়া না এলে আমার একদম ভালো লাগবে না।
ঠিক তখনই শাহজাদ সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এল।
—কী ব্যাপার? আমার নামে আবার কী অভিযোগ হচ্ছে?
ছোট বোন দৌড়ে এসে তার হাত ধরে বলল,
—ভাইয়া, আপনি কিন্তু কথা দিয়েছেন। আজ আসতেই হবে।
শাহজাদ হেসে বলল,
—কথা দিয়েছি যখন, যাবই।
—সত্যি?
—হ্যাঁ, এবার নিশ্চিন্ত?
বোন খুশিতে মাথা নেড়ে বলল,
—অনেক!
শাহজাদ নাশতার টেবিলে বসে মায়ের দিকে তাকাল।
—মা, অনুষ্ঠানটা কয়টায় শুরু হবে?
—বিকেল চারটায়। তুই অফিসের কাজ শেষ করে চলে আসিস।
—ঠিক আছে।
নাশতা শেষ করে শাহজাদ অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেল।
অন্যদিকে মায়া সকালে নিজের পড়াশোনা শেষ করে মায়ের সঙ্গে বসার ঘরে বসেছিল। এমন সময় ফোনে শাহজাদের মেসেজ এল।
শাহজাদ: সুপ্রভাত। আজ কেমন আছেন?
মায়া: আলহামদুলিল্লাহ, ভালো। আপনি?
শাহজাদ: ভালো আছি। আজ আমার বোনের স্কুলে অনুষ্ঠান আছে।
মায়া: ওহ! তাহলে আজ তো আপনার ব্যস্ত দিন।
শাহজাদ: হ্যাঁ। ও অনেক দিন ধরে আমাকে যাওয়ার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।
মায়া: তাহলে অবশ্যই যাবেন। ও নিশ্চয়ই খুব খুশি হবে।
শাহজাদ উত্তর দিল,
শাহজাদ: ওর আনন্দটাই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
মায়া মেসেজটা পড়ে হাসল। তারপর লিখল,
মায়া: অনুষ্ঠানটা ভালো কাটুক। আপনার বোনকে আমার শুভকামনা জানাবেন।
শাহজাদ: অবশ্যই জানাব।
কিছুক্ষণ পর শাহজাদ আবার লিখল,
শাহজাদ: আপনি আর আপনার পরিবার চাইলে অনুষ্ঠানে আসতে পারেন। তবে কোনো অসুবিধা থাকলে আসার প্রয়োজন নেই। শুধু আমন্ত্রণ জানালাম।
মায়া একটু অবাক হলো। সে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
—মা, শাহজাদের ছোট বোনের স্কুলে আজ অনুষ্ঠান। উনি আমাদের যেতে বলেছেন।
মা কিছুক্ষণ ভেবে বললেন,
—অনুষ্ঠানটা কোথায়?
মায়া জায়গার নাম জানালে মা বললেন,
—সময় হলে যেতে পারি। তবে আগে তোর বাবার সঙ্গে কথা বলি।
মায়া খুশি হয়ে শাহজাদকে জানাল,
মায়া: মা বাবার সঙ্গে কথা বলে জানাবেন। আসতে পারলে অবশ্যই যাব।
শাহজাদ: ঠিক আছে। কোনো চাপ নেই।
বিকেল চারটার একটু আগে শাহজাদ স্কুলের অনুষ্ঠানে পৌঁছে গেল। তার ছোট বোন তাকে দূর থেকেই দেখতে পেয়ে হাত নাড়ল।
—ভাইয়া! এদিকে আসুন!
শাহজাদ এগিয়ে গিয়ে বলল,
—কেমন আছ?
—অনেক ভালো! আপনি এসেছেন দেখে আরও ভালো লাগছে।
শাহজাদ তার মাথায় হাত রেখে বলল,
—তোমার অনুষ্ঠান না দেখে কি থাকা যায়?
বোন হাসতে হাসতে তাকে সামনের আসনে বসিয়ে দিল।
অনুষ্ঠান শুরু হলো। একের পর এক শিক্ষার্থীরা গান, কবিতা আবৃত্তি ও নাচ পরিবেশন করছিল। শাহজাদ মন দিয়ে সব দেখছিল। তার ছোট বোনের পরিবেশনার সময় সে ফোন বের করে কয়েকটি ছবি তুলে রাখল।
অনুষ্ঠান শেষে বোন ছুটে এসে বলল,
—ভাইয়া, কেমন হয়েছে?
শাহজাদ বলল,
—খুব সুন্দর হয়েছে। তুমি অনেক ভালো করেছ।
—সত্যি বলছেন?
—একদম সত্যি।
বোন আনন্দে মায়ের কাছে গিয়ে সব বলতে লাগল।
এদিকে মায়ার বাবা-মা আসার সিদ্ধান্ত নিলেন। মায়া মায়ের সঙ্গে তৈরি হয়ে গাড়িতে উঠল। তার মনে একটু সংকোচ কাজ করছিল। কারণ আজ শাহজাদের পরিবারের আরও কয়েকজনের সঙ্গে দেখা হতে পারে।
মা মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—এত চুপচাপ কেন?
—এমনিই মা। প্রথমবার অনেকের সঙ্গে দেখা হবে তো।
মা হেসে বললেন,
—ভয় পাওয়ার কিছু নেই। স্বাভাবিকভাবে কথা বলবি।
মায়া মাথা নেড়ে জানালার বাইরে তাকাল।
কিছুক্ষণ পর তারা অনুষ্ঠানের জায়গায় পৌঁছাল। শাহজাদ দূর থেকে মায়াকে দেখতে পেয়ে এগিয়ে এল।
—আসসালামু আলাইকুম। আপনারা এসেছেন দেখে ভালো লাগল।
মায়ার মা বললেন,
—ওয়ালাইকুমুস সালাম। আপনার বোনের অনুষ্ঠান দেখতে এলাম।
শাহজাদ বলল,
—আসুন, আপনাদের সঙ্গে মায়ের পরিচয় করিয়ে দিই।
সে তাঁদের রেহানা বেগমের কাছে নিয়ে গেল। রেহানা বেগম মায়ার মাকে দেখে আন্তরিকভাবে এগিয়ে এলেন।
—আসসালামু আলাইকুম। কেমন আছেন?
—ওয়ালাইকুমুস সালাম। ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?
—আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি। আপনারা এসেছেন, খুব ভালো লাগল।
মায়া সালাম দিল। রেহানা বেগম স্নেহের সঙ্গে বললেন,
—কেমন আছ মা?
—জি, ভালো আছি আন্টি।
—তোমাকে দেখে ভালো লাগছে।
মায়া মৃদু হেসে বলল,
—আপনাকেও।
কিছুক্ষণ পর শাহজাদের ছোট বোনও সেখানে চলে এল। সে মায়াকে দেখে বলল,
—আপনি কি মায়া আপু?
মায়া হেসে বলল,
—হ্যাঁ। তুমি কেমন আছ?
—ভালো আছি। ভাইয়া আপনার কথা বলেছে।
শাহজাদ সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—তুমি আবার কী বলছ?
বোন হেসে বলল,
—আমি তো সত্যি কথাই বলছি!
মায়া লজ্জা পেয়ে অন্যদিকে তাকাল। রেহানা বেগম হেসে বললেন,
—ওর কথা শুনে কিছু মনে কোরো না মা। ও একটু বেশি কথা বলে।
মায়া বলল,
—না আন্টি, আমার ভালোই লাগছে।
এরপর সবাই মিলে কিছুক্ষণ গল্প করল। মায়ার বাবা ও শাহজাদের বাবারও দেখা হলো। তাঁরা পরস্পরকে সালাম দিয়ে সাধারণ সৌজন্যমূলক কথাবার্তা বললেন। আগের মতোই তাঁদের পরিচয় ছিল কেবল একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে হওয়া সাধারণ পরিচিতি। এর বেশি কোনো ঘনিষ্ঠতা ছিল না।
অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর মায়ার পরিবার বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নিল। শাহজাদ তাঁদের বিদায় জানাতে এগিয়ে এল।
—আজ আসার জন্য ধন্যবাদ।
মায়ার মা বললেন,
—তোমার বোনের অনুষ্ঠান খুব সুন্দর হয়েছে। ওকে আমাদের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা জানিও।
—অবশ্যই জানাব।
মায়া যাওয়ার আগে শাহজাদের ছোট বোনকে বলল,
—তোমার পরিবেশনা খুব সুন্দর হয়েছে।
মেয়েটি খুশি হয়ে বলল,
—ধন্যবাদ আপু। আবার আসবেন কিন্তু!
মায়া হেসে বলল,
—সময় হলে অবশ্যই।
গাড়িতে ওঠার আগে শাহজাদ মায়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
—বাসায় পৌঁছে জানাবেন।
মায়া মাথা নেড়ে বলল,
—ঠিক আছে।
রাতে মায়া বাসায় ফিরে মাকে বলল,
—মা, আন্টি আর শাহজাদের বোন দুজনই অনেক ভালো।
মা হেসে বললেন,
—আমারও ভালো লেগেছে। বিশেষ করে ওর মায়ের ব্যবহারটা খুব আন্তরিক।
মায়া নিজের ঘরে এসে ফোন হাতে নিল। শাহজাদের মেসেজ এসেছে।
শাহজাদ: বাসায় পৌঁছেছেন?
মায়া: জি, পৌঁছেছি। আজ খুব ভালো লাগল।
শাহজাদ: আমারও। মা আপনার সঙ্গে দেখা করে খুব খুশি হয়েছেন।
মায়া: আমারও আন্টিকে ভালো লেগেছে। আর আপনার বোনটা খুব মিষ্টি।
শাহজাদ: ও কিন্তু আপনাকে আবার দেখার আবদার করেছে।
মায়া: তাহলে ওকে বলবেন, আবার দেখা হবে ইনশাআল্লাহ।
শাহজাদ উত্তর দিল,
শাহজাদ: ইনশাআল্লাহ।
সেদিন রাতে দুজনের মনেই ভালো লাগার অনুভূতি ছিল। শুধু শাহজাদ আর মায়ার পরিচয় নয়, দুই পরিবারের মানুষগুলোর মধ্যেও ধীরে ধীরে সৌহার্দ্য তৈরি হচ্ছিল।
তবে সামনে অপেক্ষা করছে আরও একটি বিশেষ দিন। সেদিন মায়ার একটি ছোট্ট ইচ্ছা পূরণ করার চেষ্টা করবে শাহজাদ।
চলবে... ❤️