### তোর আসক্ত আমি
লেখিকা: নুসরাত জাহান রাফা
পর্ব সংখ্যা: ২২
### ছোট্ট ইচ্ছের পূর্ণতা
সকালের মিষ্টি রোদে মায়ার ঘরটা আলোকিত হয়ে আছে। জানালার পাশে বসে সে নিজের পছন্দের একটি বই পড়ছিল। হঠাৎ ফোনে শাহজাদের মেসেজ এল।
শাহজাদ: সুপ্রভাত। আজ কী করছেন?
মায়া: বই পড়ছি। আপনি?
শাহজাদ: অফিসে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। আচ্ছা, আপনার একটা পছন্দের জায়গার কথা জানতে চাই।
মায়া অবাক হয়ে উত্তর দিল।
মায়া: হঠাৎ পছন্দের জায়গা কেন?
শাহজাদ: এমনিই জানতে ইচ্ছা হলো।
মায়া: আমার একটা জায়গা খুব পছন্দ। সেখানে অনেক গাছপালা আছে, চারপাশটা শান্ত। সুযোগ পেলেই যেতে ইচ্ছা করে।
শাহজাদ: জায়গাটার নাম কী?
মায়া জায়গাটার নাম জানিয়ে দিল। শাহজাদ উত্তর দিল,
শাহজাদ: বুঝলাম। আপনার পছন্দটা মনে রাখলাম।
মায়া আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। ফোনটা রেখে আবার বই পড়তে শুরু করল।
অন্যদিকে খান বাড়িতে রেহানা বেগম সকালের নাশতা তৈরি করছিলেন। শাহজাদ নিচে নেমে মায়ের পাশে এসে দাঁড়াল।
—মা, আজ বিকেলে একটু বাইরে যেতে হবে।
রেহানা বেগম তাকিয়ে বললেন,
—কোথায় বাবা?
—একটা জায়গায়। কাজটা শেষ করে তাড়াতাড়ি ফিরে আসব।
—ঠিক আছে। তবে নিজের যত্ন নিস।
শাহজাদ হেসে বলল,
—তুমি সব সময় একই কথা বলো।
মা মৃদু হেসে উত্তর দিলেন,
—মা বলে কথা। ছেলের চিন্তা কি কখনো কমে?
শাহজাদ মায়ের কাঁধে হাত রেখে বলল,
—তুমি চিন্তা কোরো না। আমি ভালো আছি।
ঠিক তখনই তার ছোট বোন এসে বলল,
—ভাইয়া, আজ কোথায় যাচ্ছেন?
—একটু বাইরে।
—আমাকেও নিয়ে যাবেন?
—আজ নয়। অন্যদিন তোমাকে নিয়ে যাব।
বোন মুখ ভার করে বলল,
—আপনি সব সময় অন্যদিন বলেন!
শাহজাদ হেসে বলল,
—এইবার সত্যিই নিয়ে যাব।
দুপুরে মায়া মায়ের সঙ্গে রান্নাঘরে ছিল। মা রান্না করতে করতে বললেন,
—আজ তোর মুখে বেশ হাসি দেখছি।
মায়া হেসে বলল,
—এমনিই মা।
—শাহজাদের সঙ্গে কথা হয়েছে?
মায়া একটু লজ্জা পেয়ে বলল,
—হ্যাঁ। সকালে কথা হয়েছে।
মা মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—ওরা কেমন আছে?
—ভালো আছে। আন্টিও ভালো আছেন।
মা বললেন,
—ওর মায়ের সঙ্গে আবার দেখা হলে ভালো লাগবে। ভদ্রমহিলা বেশ আন্তরিক।
মায়া মাথা নেড়ে বলল,
—আমারও তাই মনে হয়েছে।
কিছুক্ষণ পর মায়া নিজের ঘরে ফিরে পড়তে বসল। কিন্তু তার মনে একটা প্রশ্ন ঘুরছিল। শাহজাদ হঠাৎ তার পছন্দের জায়গার কথা জানতে চাইল কেন?
সে অবশ্য বেশি কিছু ভাবল না।
বিকেল চারটার দিকে শাহজাদ ফোন করল।
—মায়া, একটু সময় হবে?
—জি, বলুন।
—আপনি কি বিকেলে একটু বাইরে যেতে পারবেন? আপনার পরিবারের অনুমতি থাকলে।
মায়া বলল,
—কোথায় যাব?
—আপনার পছন্দের জায়গাটায়।
মায়া অবাক হয়ে গেল।
—আপনি জায়গাটা মনে রেখেছেন?
—আপনার বলা কথাগুলো মনে রাখার চেষ্টা করি।
মায়ার মুখে হাসি ফুটে উঠল।
—আমি মাকে জিজ্ঞেস করে জানাচ্ছি।
কিছুক্ষণ পর মায়া আবার ফোন করল।
—মা বলেছেন, আজ সম্ভব হবে না। তবে অন্যদিন যেতে পারব।
শাহজাদ শান্ত গলায় বলল,
—কোনো সমস্যা নেই। আপনার সুবিধামতোই হবে।
মায়া একটু থেমে বলল,
—আপনি কি মন খারাপ করলেন?
—একদম না। আপনার পরিবারের সিদ্ধান্তকে সম্মান করি।
—তাহলে অন্যদিন যাবেন কিন্তু!
শাহজাদ হেসে বলল,
—অবশ্যই।
পরদিন বিকেলে মায়ার মা নিজেই বললেন,
—আজ যদি সময় থাকে, তাহলে তোর পছন্দের জায়গায় ঘুরে আসতে পারিস। তবে বেশি দেরি করবি না।
মায়া খুশি হয়ে বলল,
—সত্যি মা?
—হ্যাঁ। আর সাবধানে যাবি।
মায়া সঙ্গে সঙ্গে শাহজাদকে খবর দিল। দুজনের পরিবারের সম্মতিতে বিকেলে দেখা করার সময় ঠিক হলো।
শাহজাদ নির্ধারিত সময়ের একটু আগেই পৌঁছে গেল। কিছুক্ষণ পর মায়া এলো। আজ তার মুখে অন্যরকম আনন্দ।
—অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেছেন?
—না। এই তো এলেন।
মায়া চারপাশে তাকিয়ে বলল,
—জায়গাটা সত্যিই সুন্দর।
শাহজাদ বলল,
—আপনার পছন্দের জায়গা বলে হয়তো আরও সুন্দর লাগছে।
মায়া হেসে বলল,
—সব কথায় এমন উত্তর দেন কীভাবে?
—আপনার প্রশ্নগুলোই তো এমন!
দুজনেই হেসে উঠল।
তারা কিছুক্ষণ হাঁটল। চারপাশে সবুজ গাছ, সুন্দর ফুল আর পাখির ডাক। মায়া বেশ আনন্দ নিয়ে সবকিছু দেখছিল।
শাহজাদ তার আনন্দ দেখে বলল,
—আপনাকে আজ বেশ খুশি লাগছে।
—কারণ জায়গাটা আমার খুব পছন্দের।
—তাহলে আজকের বিকেলটা আপনার জন্য সফল।
মায়া হেসে বলল,
—শুধু আমার জন্য নয়। আপনিও তো এসেছেন।
শাহজাদ মৃদু হেসে বলল,
—আপনার আনন্দ দেখেই আমার ভালো লাগছে।
একসময় তারা একটি বেঞ্চে বসে পড়ল। মায়া চারপাশের গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে বলল,
—জানেন, ছোটবেলা থেকেই আমার এমন জায়গা ভালো লাগে। যেখানে অনেক গাছ থাকবে, বাতাস থাকবে, আর কোনো তাড়াহুড়ো থাকবে না।
শাহজাদ মন দিয়ে শুনছিল।
—আপনার আর কী কী ভালো লাগে?
মায়া একটু ভেবে বলল,
—পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে ভালো লাগে। বৃষ্টির দিন ভালো লাগে। আর কেউ যদি ছোট ছোট বিষয় মনে রাখে, সেটাও ভালো লাগে।
শাহজাদ হেসে বলল,
—তাহলে আজকের বিষয়টা আপনার ভালো লাগার তালিকায় যোগ হলো?
মায়া মৃদু হেসে বলল,
—হয়তো।
কিছুক্ষণ পর শাহজাদ বলল,
—আমারও আপনার একটা অভ্যাস ভালো লাগে।
—কোনটা?
—আপনি ছোট ছোট বিষয়েও আনন্দ খুঁজে পান।
মায়া কিছুটা লজ্জা পেয়ে বলল,
—আপনি আবার শুরু করলেন!
শাহজাদ হেসে চুপ করে গেল।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার আগেই তারা ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিল। যাওয়ার আগে মায়া বলল,
—আজকের জন্য ধন্যবাদ।
—ধন্যবাদ কেন?
—আমার ছোট্ট ইচ্ছেটা মনে রাখার জন্য।
শাহজাদ বলল,
—আপনার পছন্দের বিষয়গুলো মনে রাখা আমার কাছে কঠিন কিছু নয়।
মায়া মুচকি হেসে বিদায় নিল।
বাসায় ফিরে সে মাকে পুরো বিকেলের গল্প শোনাল। মা মেয়ের আনন্দ দেখে বললেন,
—ভালো লাগল শুনে। তবে সব সময় নিজের পড়াশোনা আর পরিবারের দায়িত্বের কথাও মনে রাখবি।
মায়া বলল,
—জি মা, মনে থাকবে।
অন্যদিকে শাহজাদ বাড়িতে ফিরে রেহানা বেগমকে বলল,
—মা, আজ মায়ার পছন্দের জায়গায় গিয়েছিলাম।
রেহানা বেগম হেসে বললেন,
—তাহলে নিশ্চয়ই মেয়েটা খুশি হয়েছে?
—হ্যাঁ মা। ওকে খুশি দেখে আমারও ভালো লেগেছে।
মা ছেলের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,
—ছোট ছোট যত্নই অনেক সময় মানুষের মনে বড় জায়গা করে নেয়।
শাহজাদ মায়ের কথায় মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
সেদিন রাতে মায়ার ফোনে আবার মেসেজ এল।
শাহজাদ: আজকের বিকেলটা মনে থাকবে।
মায়া: আমারও। তবে পরেরবার আপনার পছন্দের জায়গায় যাব।
শাহজাদ: তাহলে সেই দিনের অপেক্ষায় রইলাম।
দুজনের মুখেই হাসি ফুটে উঠল।
কিন্তু তারা জানত না, খুব শিগগিরই মায়ার একটি ছোট্ট অভিমান শাহজাদকে এমন একটি সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করবে, যা তাদের সম্পর্কের নতুন একটি দিক খুলে দেবে।
চলবে... ❤️