### তোর আসক্ত আমি
লেখিকা: নুসরাত জাহান রাফা
পর্ব সংখ্যা: ২৩
### কিছু কথা, কিছু অভিমান
সকালের আলো জানালার পর্দা ভেদ করে মায়ার ঘরে এসে পড়েছে। মায়া বিছানায় বসে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে। গত রাতের কথাগুলো বারবার মনে পড়ছে। শাহজাদ তাকে বলেছিল, ব্যস্ত থাকলেও অন্তত একবার জানিয়ে দেবে। কথাটা শুনে মায়ার মনটা ভালো হয়েছিল।
কিন্তু আজ সকাল থেকে এখন পর্যন্ত কোনো ফোন বা মেসেজ আসেনি।
মায়া ফোনটা পাশে রেখে আয়নার সামনে দাঁড়াল। চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে নিজেকেই বলল,
— মানুষটা কি সত্যিই এত ব্যস্ত, নাকি আমাকে বিরক্তিকর মনে হচ্ছে?
ঠিক তখনই নীলা ফোন করল।
— হ্যালো, কী করছিস?
— কিছু না। বসে আছি।
— গলার আওয়াজ এমন কেন? আবার শাহজাদ সাহেবের কোনো খবর নেই?
মায়া একটু বিরক্ত হয়ে বলল,
— তুই সব বুঝে যাস কীভাবে?
নীলা হেসে উঠল।
— কারণ তোর মুখে এখন একটাই নাম ঘোরে। বল, কী হয়েছে?
— কিছু হয়নি। সকাল থেকে একটা মেসেজও দেয়নি।
— তুই দিয়েছিস?
— না।
— তাহলে দুজনেই অপেক্ষা করছিস কেন? একটা মেসেজ দিতে তো সমস্যা নেই।
মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল,
— সব সময় আমিই আগে কথা শুরু করব, এমন তো হতে পারে না।
নীলা এবার একটু গম্ভীর হয়ে বলল,
— ঠিক আছে, তোর কথাও ঠিক। তবে শুধু অভিমান জমিয়ে রাখিস না। সম্পর্ক সুন্দর রাখতে দুজনেরই চেষ্টা দরকার।
কথাটা মায়ার মনে ধরল।
অন্যদিকে খানবাড়িতে শাহজাদ অফিসের জন্য তৈরি হচ্ছে। শার্টের হাতা ঠিক করতে করতে সে ঘড়ির দিকে তাকাল। টেবিলের ওপর ফোন পড়ে আছে। ফোন হাতে নিয়ে মায়ার নামটা দেখল। কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে ফোনটা আবার রেখে দিল।
তার ছোট বোন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল।
— ভাইয়া!
— কী?
— আপনি কি কারও মেসেজের অপেক্ষা করছেন?
শাহজাদ ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
— তোমার এত প্রশ্ন কেন?
— এমনিই। তবে আপনার মুখ দেখে মনে হচ্ছে কেউ আপনাকে খুব ভাবাচ্ছে।
শাহজাদ মৃদু হেসে বলল,
— নিজের পড়াশোনায় মন দাও।
— বুঝেছি! নিশ্চয়ই মায়া আপু!
শাহজাদ এবার আর কিছু বলল না। শুধু বোনের দিকে তাকিয়ে হালকা হাসল।
নিচে নেমে সে মায়ের সঙ্গে নাশতার টেবিলে বসল। রেহানা বেগম ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— কী হয়েছে বাবা? আজ এত চুপচাপ কেন?
— কিছু হয়নি মা। অফিসে একটু কাজ আছে।
— কাজ তো প্রতিদিনই থাকে। কিন্তু মানুষের জীবনে কাজের বাইরেও কিছু বিষয় থাকে। সেগুলোর দিকেও খেয়াল রাখতে হয়।
শাহজাদ মায়ের দিকে তাকাল।
— তুমি কী বলতে চাইছ?
রেহানা বেগম মৃদু হেসে বললেন,
— আমি শুধু চাই, তুমি নিজের মনের কথাগুলো বুঝতে শেখো। কাউকে ভালো লাগলে তার প্রতি যত্নশীল হওয়া জরুরি। তবে তার নিজের সময় আর ইচ্ছাকেও সম্মান করতে হয়।
শাহজাদ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— আমি চেষ্টা করছি মা।
— সেটাই তো চাই।
অফিসে পৌঁছে শাহজাদ কাজের মধ্যে ডুবে গেল। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মিটিং ছিল। রায়হান এসে প্রয়োজনীয় ফাইলগুলো টেবিলে রাখল।
— স্যার, এগুলোতে আপনার সই লাগবে।
— টেবিলে রেখে যান।
রায়হান চলে যাওয়ার পর শাহজাদ ফোনটা হাতে নিল। মায়ার নাম খুলে লিখল,
“সকালটা কেমন কাটছে?”
মেসেজ পাঠিয়ে আবার কাজে মন দিল।
কিছুক্ষণ পর মায়ার ফোনে মেসেজটি এল। সে তখন মায়ের সঙ্গে রান্নাঘরে ছিল। ফোন হাতে নিয়ে মেসেজ দেখে তার মুখে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।
মা জিজ্ঞেস করলেন,
— কী হয়েছে? এত হাসছিস কেন?
— কিছু না মা।
— কিছু না হলে মানুষ এভাবে হাসে?
মায়া লজ্জা পেয়ে ফোনটা রেখে দিল।
দুপুরের দিকে সে উত্তর দিল,
“ভালোই। আপনার কী খবর?”
শাহজাদ তখন মিটিংয়ে। তাই উত্তর দিতে একটু দেরি হলো। মায়া ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকলেও এবার নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করল। সে মায়ের সঙ্গে বসে দুপুরের খাবার তৈরি করল। খাবার টেবিলে সবাই একসঙ্গে বসতেই বাবা বললেন,
— মায়া, আজকাল তোকে বেশ হাসিখুশি দেখা যায়।
মায়া পানি খেতে গিয়ে থমকে গেল।
— আমি কি আগে হাসতাম না?
বাবা হেসে বললেন,
— হাসতি, তবে এখন মনে হয় মনটা আরও ভালো থাকে।
মা মেয়ের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন। মায়া আর কোনো উত্তর দিল না।
বিকেলে শাহজাদ অবশেষে ফোন করল।
— হ্যালো, কী করছেন?
মায়া একটু অভিমানী গলায় বলল,
— বসে আছি। আপনি?
— অফিস থেকে বের হয়েছি। সকালে মেসেজের উত্তর দিতে দেরি হয়েছে, দুঃখিত।
— সমস্যা নেই। আপনার তো অনেক কাজ।
শাহজাদ তার কণ্ঠের পরিবর্তন বুঝতে পারল।
— মায়া, আপনি কি আবার অভিমান করেছেন?
— না তো।
— আপনার এই ‘না তো’ কথাটার মানে আমি একটু একটু করে বুঝতে শিখছি।
মায়া হেসে ফেলল।
— তাহলে বলুন, মানে কী?
— মানে আপনি কিছু একটা বলতে চান, কিন্তু বলছেন না।
মায়া এবার শান্ত গলায় বলল,
— আসলে আমি চাই না আপনার ব্যস্ততার মধ্যে বিরক্ত করতে। আবার এটাও চাই না যে সারাদিন কথা না হলেও আপনি একবারও আমাকে মনে করবেন না।
শাহজাদ কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল,
— আপনাকে মনে করার জন্য আলাদা সময় বের করতে হয় না, মায়া। তবে কাজের চাপে কখনো কখনো সেটা প্রকাশ করতে পারি না। আমি চেষ্টা করব, যেন আপনাকে এমন অনুভব করতে না হয়।
মায়ার মনটা নরম হয়ে গেল।
— আমিও চেষ্টা করব অল্পতেই অভিমান না করতে।
— তাহলে একটা চুক্তি করা যাক?
— কী চুক্তি?
— কোনো কথা খারাপ লাগলে চুপ করে না থেকে সরাসরি বলবেন। আমিও তাই করব।
— ঠিক আছে।
— আর আজ সন্ধ্যায় সময় থাকলে পরিবারের সঙ্গে একটু বসবেন। মা আপনার মায়ের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছেন।
মায়া অবাক হয়ে বলল,
— আমার মায়ের সঙ্গে?
— হ্যাঁ। মা বলছিলেন, আপনাদের সঙ্গে আবার দেখা হলে ভালো লাগবে।
মায়া হাসল।
— আমি মাকে বলব।
সন্ধ্যায় শাহজাদ বাড়ি ফিরতেই রেহানা বেগম তাকে নিজের ঘরে ডাকলেন। শাহজাদ মায়ের পাশে বসে বলল,
— কিছু বলবে মা?
রেহানা বেগম ছেলের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললেন,
— আজ মায়ার মায়ের সঙ্গে কথা হয়েছে। উনি বলেছেন, দুই পরিবার একদিন একসঙ্গে বসতে পারলে ভালো হয়।
শাহজাদ মনোযোগ দিয়ে শুনল।
— তারপর?
— উনি আরও বলেছেন, মেয়েটার মতামত আর স্বাচ্ছন্দ্যকে যেন সব সময় গুরুত্ব দেওয়া হয়। আমি তাঁকে বলেছি, আমাদেরও সেটাই ইচ্ছা।
শাহজাদ মাথা নেড়ে বলল,
— অবশ্যই মা। মায়ার ইচ্ছার বাইরে আমি কিছুই করতে চাই না।
রেহানা বেগম ছেলের মাথায় হাত রেখে বললেন,
— এটাই তোমার সবচেয়ে ভালো দিক। কাউকে জীবনে জায়গা দিতে চাইলে আগে তাকে সম্মান করতে শিখতে হয়।
শাহজাদ মায়ের হাতের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
রাতে মায়া ফোন হাতে বসে ছিল। কিছুক্ষণ পর শাহজাদের মেসেজ এল।
“মা আজ আপনার মায়ের সঙ্গে কথা বলেছেন। সবাই মিলে একদিন বসার কথা হয়েছে।”
মায়া উত্তর দিল,
“জানি। মা আমাকে বলেছেন। দেখা হলে ভালো লাগবে।”
শাহজাদ লিখল,
“আমারও ভালো লাগবে। তবে একটা কথা মনে রাখবেন, কোনো কিছুতেই তাড়াহুড়ো নেই।”
মায়া মেসেজটি পড়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর লিখল,
“আপনার এই কথাটাই আমার ভালো লাগে। আপনি আমাকে সময় দেন।”
শাহজাদ উত্তর দিল,
“কারণ আপনার হাসিটা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।”
মায়ার গাল লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। সে ফোনটা বুকে জড়িয়ে ধরল না, বরং যত্ন করে টেবিলের ওপর রেখে দিল। জানালার বাইরে রাতের আকাশে চাঁদ উঠেছে।
দুজনের জীবনেই এখনো অনেক পথ বাকি। অনেক কথা বলা বাকি, অনেক কিছু বোঝা বাকি। কিন্তু আজ তারা দুজনেই বুঝতে পারল, শুধু ভালো লাগা দিয়ে সবকিছু সুন্দর হয় না; সুন্দর হয় বিশ্বাস, সম্মান আর একে অপরকে সময় দেওয়ার মাধ্যমে।
আর শাহজাদের মনে সেদিন একটি নতুন উপলব্ধি জন্ম নিল—মায়াকে খুশি রাখার সবচেয়ে বড় উপায় তাকে নিজের মতো করে হাসতে দেওয়া।
চলবে... ❤️