### তোর আসক্ত আমি
লেখিকা: নুসরাত জাহান রাফা
পর্ব সংখ্যা: ৩৩
### একটু বেশি আপন
সকাল আটটা। খান বাড়ির বারান্দায় বসে কফি খাচ্ছিল শাহজাদ। হাতে মোবাইল, চোখ বারবার স্ক্রিনের দিকে চলে যাচ্ছে। গত রাতে মায়া বলেছিল আজ সকালে কথা বলবে। অথচ এখনো কোনো মেসেজ আসেনি।
শাহজাদ নিজেই ফোন করল।
দুইবার রিং হওয়ার পর মায়া কল ধরল।
—হ্যালো।
—ঘুমাচ্ছিলেন?
—না, এই তো উঠলাম।
—তাহলে এত দেরি কেন?
—আপনাকে কি প্রতিদিন সকালে রিপোর্ট দিতে হবে?
শাহজাদ হেসে বলল,
—দিলে মন্দ হয় না।
—আপনি কি আমার অফিসের বস?
—না, তবে আপনার খোঁজ নেওয়ার ইচ্ছাটা একটু বেশি।
মায়া হেসে ফেলল।
—আপনি আজকাল খুব দুষ্টু হয়ে যাচ্ছেন।
—আপনার সামনে ভালো মানুষ সেজে থাকাটা কঠিন।
—তাহলে সাজতে হবে না।
—সত্যিই?
—জি।
—তাহলে সত্যিটা বলি?
—বলুন।
—আপনাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে।
মায়া চুপ হয়ে গেল। শাহজাদ আবার বলল,
—কী হলো? কথা হারিয়ে ফেললেন?
—না। ভাবছি, আপনি এত সহজে এসব কথা বলেন কীভাবে!
—যেটা অনুভব করি, সেটাই বলি।
—আচ্ছা, এখন রাখি। মা ডাকছেন।
—ঠিক আছে। তবে আজ আপনার সঙ্গে দেখা করার একটা পরিকল্পনা আছে।
—কী পরিকল্পনা?
—সেটা দেখা হলে বলব।
—আপনি সবকিছুতেই এত রহস্য করেন কেন?
—রহস্য নয়, ছোট্ট একটা চমক।
মায়া হাসতে হাসতে ফোন রেখে দিল।
দুপুরে শাহজাদ মাকে বলল,
—মা, আজ বিকেলে মায়াদের বাসায় যাব ভাবছি।
রেহানা বেগম ছেলের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন।
—কী ব্যাপার? আবার দেখা করার ইচ্ছা?
—হ্যাঁ মা। তবে আগে ওদের জানিয়ে যাব।
—সেটাই ভালো। হঠাৎ করে গিয়ে কাউকে অপ্রস্তুত করিস না।
শাহজাদ মায়াকে ফোন করে বিষয়টা জানাল। মায়া মায়ের সঙ্গে কথা বলে জানাল, বিকেলে আসতে পারেন।
বিকেল পাঁচটার দিকে শাহজাদ মায়াদের বাড়িতে পৌঁছাল। দরজা খুলল মায়া নিজেই।
শাহজাদ তাকে দেখে মৃদু হাসল।
—আসসালামু আলাইকুম।
—ওয়ালাইকুম আসসালাম। আসুন।
—আজ তো দরজা খুলেই হাসি পেলাম।
মায়া ভ্রু কুঁচকে বলল,
—কেন?
—আপনাকে দেখে।
—আপনি কি সবসময় এমন কথা বলার প্রস্তুতি নিয়ে আসেন?
—না। আপনাকে দেখলেই কথাগুলো নিজের থেকে চলে আসে।
মায়া লজ্জা পেয়ে একটু সরে দাঁড়াল।
—ভেতরে আসুন।
বসার ঘরে মায়ার মা শাহজাদকে দেখে হাসিমুখে অভ্যর্থনা জানালেন।
—এসো বাবা, কেমন আছ?
—আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?
—ভালো আছি। বসো।
কিছুক্ষণ পারিবারিক গল্প চলল। মায়া চা নিয়ে এলে শাহজাদ কাপ হাতে নিয়ে বলল,
—আজ চা আপনি বানিয়েছেন?
—জি।
—তাহলে আজকের চায়ের স্বাদ একটু আলাদা হবে।
মায়া মজা করে বলল,
—আগে খেয়ে দেখুন। তারপর প্রশংসা করবেন।
শাহজাদ এক চুমুক দিয়ে বলল,
—বেশ ভালো হয়েছে।
—সত্যি?
—একদম।
মায়ার মা হেসে বললেন,
—মায়া তো চা বানাতে বেশ পছন্দ করে।
শাহজাদ বলল,
—তাহলে তো ভালোই। আমি চা খেতে পছন্দ করি।
মায়া সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—আপনি নিজের জন্য চা বানাতে শিখে নিন। সবসময় অন্যের ওপর নির্ভর করলে চলবে না।
শাহজাদ হেসে বলল,
—আপনি শিখিয়ে দিলে শিখে নেব।
কিছুক্ষণ পর মায়ার মা রান্নাঘরে গেলেন। বসার ঘরে শাহজাদ আর মায়া বসে রইল।
শাহজাদ একটু নিচু স্বরে বলল,
—আপনাকে একটা জিনিস দেখাব?
—কী?
সে পকেট থেকে ছোট্ট একটি প্যাকেট বের করল।
মায়া অবাক হয়ে বলল,
—এটা কী?
—আপনার জন্য।
—আমার জন্য? কেন?
—এমনিই। সেদিন আপনি বলেছিলেন ছোট ছোট জিনিস আপনার ভালো লাগে। তাই ভাবলাম, আপনার জন্য কিছু নিয়ে আসি।
মায়া প্যাকেট খুলে দেখল, ভেতরে একটি সুন্দর বুকমার্ক। তাতে ছোট ছোট ফুলের নকশা করা।
—এটা খুব সুন্দর!
শাহজাদ বলল,
—আপনি তো বই পড়তে ভালোবাসেন। তাই মনে হলো কাজে লাগবে।
মায়া বুকমার্কটা হাতে নিয়ে বলল,
—আপনি এত কিছু মনে রাখেন কীভাবে?
—আপনার বলা কথাগুলো মনে রাখতে ভালো লাগে।
মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল,
—ধন্যবাদ, শাহজাদ। সত্যিই আমার খুব পছন্দ হয়েছে।
—আপনার পছন্দ হয়েছে, এটাই আমার জন্য যথেষ্ট।
মায়া বুকমার্কটা যত্ন করে নিজের বইয়ের ভেতর রেখে দিল।
শাহজাদ সেটা দেখে বলল,
—এত যত্ন করে রাখছেন?
—অবশ্যই। আপনার দেওয়া জিনিস।
কথাটা শুনে শাহজাদের মুখে এক অন্যরকম হাসি ফুটে উঠল।
—তাহলে জিনিসটা হারাবেন না কিন্তু।
—আপনি আবার নতুন করে দেবেন?
—আপনি চাইলে অনেকবার দিতে পারি।
মায়া হেসে বলল,
—বেশি বাড়াবাড়ি করবেন না।
সন্ধ্যার আগে শাহজাদ বাড়ি ফেরার জন্য উঠল। দরজার কাছে এসে মায়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
—আজ একটা কথা বলতে ভুলে গেছি।
—কী কথা?
—আপনাকে আজ খুব সুন্দর লাগছে।
মায়া একটু বিরক্তির ভান করে বলল,
—এতক্ষণে মনে পড়ল?
—না, প্রথম থেকেই মনে হয়েছে। শুধু বলার সুযোগ খুঁজছিলাম।
—আপনার কথা বলার ধরনটা সত্যিই অদ্ভুত।
—খারাপ লাগছে?
—না।
—তাহলে ভালো?
মায়া হেসে মাথা নিচু করল।
—যান এবার।
শাহজাদ মৃদু হেসে বলল,
—আচ্ছা, যাচ্ছি। ভালো থাকবেন।
—আপনিও।
রাতে শাহজাদ নিজের ঘরে বসে কাজ করছিল। হঠাৎ মায়ার মেসেজ এল।
মায়া: আপনার দেওয়া বুকমার্কটা বইয়ে লাগিয়েছি।
শাহজাদ: ছবি পাঠাবেন?
মায়া বইয়ের পাতার মধ্যে বুকমার্কটির একটি ছবি তুলে পাঠাল।
শাহজাদ: সুন্দর লাগছে।
মায়া: বুকমার্কটা, নাকি বইটা?
শাহজাদ: দুটোই। তবে যিনি ব্যবহার করছেন, তিনি সবচেয়ে সুন্দর।
মায়া কিছুক্ষণ পর লিখল,
মায়া: আপনার প্রশংসা শুনতে শুনতে একদিন সত্যিই বিশ্বাস করে ফেলব।
শাহজাদ: বিশ্বাস করতে এত ভয় কেন?
মায়া: ভয় নয়। শুধু চাই, আপনার কথাগুলো যেন সবসময় সত্যি থাকে।
শাহজাদ এবার একটু সময় নিয়ে উত্তর দিল।
শাহজাদ: আমি চাই না, শুধু কথায় আপনাকে ভালো লাগার অনুভূতি দিই। আমার আচরণেও যেন আপনি সম্মান আর যত্ন খুঁজে পান। সময়ই সেটা প্রমাণ করবে।
মায়া মেসেজটা পড়ে শান্ত হলো।
মায়া: এই উত্তরটাই আমার ভালো লাগল।
শাহজাদ: তাহলে আজকের দিনটা সফল।
মায়া: কেন?
শাহজাদ: কারণ আজ আপনাকে হাসাতে পেরেছি, আর আপনার পছন্দের একটা ছোট্ট জিনিস দিতে পেরেছি।
মায়া: শুভরাত্রি, শাহজাদ।
শাহজাদ: শুভরাত্রি। আর হ্যাঁ, বুকমার্কটা দেখে মাঝে মাঝে আমার কথা মনে করবেন।
মায়া: আপনার কথা মনে করানোর জন্য বুকমার্কের দরকার হবে না।
শাহজাদ মেসেজটা কয়েকবার পড়ল। ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
আজ প্রথমবার মায়া নিজে থেকে এমন একটা কথা বলেছে, যা তার হৃদয়ে অনেকক্ষণ থেকে যাবে।
আর মায়া?
সে বইটা বালিশের পাশে রেখে দিল। ফুলের নকশা করা বুকমার্কটার দিকে তাকিয়ে মনে মনে হাসল।
কিছু মানুষ ধীরে ধীরে জীবনের খুব আপন হয়ে ওঠে। তাদের উপস্থিতি শুধু দেখা হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; ছোট ছোট কথাতেও তারা থেকে যায়।
চলবে... ❤️