### তোর আসক্ত আমি
লেখিকা: নুসরাত জাহান রাফা
পর্ব সংখ্যা: ৩৪
### আপনাকে একটু বেশিই ভালো লাগে
সকালের দিকে শাহজাদ অফিসে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। শার্টের হাতা ঠিক করতে করতে সে মোবাইলের দিকে তাকাল। মায়ার কোনো মেসেজ নেই।
সে নিজেই কল করল।
—হ্যালো, ঘুমকাতুরী!
ওপাশ থেকে মায়ার ঘুমঘুম কণ্ঠ ভেসে এল।
—আমি ঘুমকাতুরী কেন?
—কারণ সকাল হয়ে গেছে, অথচ আপনার কোনো খবর নেই।
—আপনি কি আমার ঘুমের সময়ও ঠিক করে দেবেন?
—প্রয়োজন হলে সেটাও করে দিতে পারি।
—আপনি অফিসে যান। আমার খবর নেওয়ার দরকার নেই।
শাহজাদ হেসে বলল,
—এত রাগ কেন? সকাল সকাল একটু কথা বলতে চেয়েছিলাম।
—আপনার সঙ্গে কথা বলছি তো!
—হ্যাঁ, কিন্তু আপনার কণ্ঠে হাসি নেই।
মায়া এবার হেসে ফেলল।
—এবার হয়েছে?
—হুম। এবার ভালো লাগছে।
—আপনি অফিসে যাবেন না?
—যাব। কিন্তু যাওয়ার আগে একটা কথা শুনতে চাই।
—কী কথা?
—বলুন, আজ আমাকে একটু মিস করবেন?
মায়া চুপ করে রইল।
শাহজাদ আবার বলল,
—আচ্ছা, উত্তর দিতে হবে না। আপনার চুপ থাকাটাকেও উত্তর ধরে নিলাম।
—আপনি নিজের মতো সব বুঝে নেন কেন?
—কারণ আপনার মনের কথা জানার ইচ্ছা হয়।
মায়া মৃদু স্বরে বলল,
—হয়তো একটু মিস করব।
শাহজাদ হাসল।
—এই একটু শুনেই আজ অফিসে মন ভালো থাকবে।
অফিসে পৌঁছে শাহজাদ কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। দুপুরের দিকে মায়া তাকে একটি ছবি পাঠাল। ছবিতে তার হাতে সেই ফুলের নকশা করা বুকমার্কটি।
মায়া: আজ বই পড়তে বসেছি। আপনার দেওয়া জিনিসটা ব্যবহার করছি।
শাহজাদ: তাহলে বইয়ের চেয়ে বুকমার্কের দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন?
মায়া: কেন?
শাহজাদ: কারণ ওটা আমার দেওয়া।
মায়া: আপনার আত্মবিশ্বাস অনেক!
শাহজাদ: আপনার ব্যাপারে একটু বেশি।
মায়া হেসে উত্তর দিল,
মায়া: কাজ করুন। সারাক্ষণ আমাকে বিরক্ত করবেন না।
শাহজাদ: ঠিক আছে। তবে একটা কথা।
মায়া: আবার কী?
শাহজাদ: বিকেলে সময় হবে? আপনাকে একটা জায়গায় নিয়ে যেতে চাই।
মায়া: কোথায়?
শাহজাদ: বললে তো চমক থাকবে না।
মায়া: আপনার চমকগুলো বেশ সন্দেহজনক!
শাহজাদ: ভয় নেই। আপনার পছন্দের জায়গাই হবে।
বিকেলে মায়া মায়ের অনুমতি নিয়ে তৈরি হলো। শাহজাদ নির্দিষ্ট জায়গায় এসে অপেক্ষা করছিল।
মায়াকে দেখে সে গাড়ি থেকে নেমে বলল,
—আজ আপনাকে দেখে একটা কথা মনে পড়ল।
—কী কথা?
—সেদিন বলেছিলাম আপনার হাসিটা আমার ভালো লাগে। আজ মনে হচ্ছে, আপনার হাসির সঙ্গে আপনার অভিমানটাও বেশ মিষ্টি।
মায়া চোখ বড় করে বলল,
—আমার অভিমান মিষ্টি?
—জি।
—তাহলে আজ থেকে আরও অভিমান করব।
—করবেন। তবে বেশি সময় নয়। কারণ আপনার অভিমান ভাঙানোর দায়িত্বটাও আমার নিতে ইচ্ছে করে।
মায়া হেসে ফেলল।
শাহজাদ তাকে নিয়ে একটি সুন্দর ফুলের বাগানে গেল। চারপাশে নানা রঙের ফুল ফুটে আছে। হালকা বাতাসে ফুলের গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে।
মায়া অবাক হয়ে বলল,
—জায়গাটা খুব সুন্দর!
—আপনার ভালো লাগবে ভেবেই এনেছি।
—আপনি কীভাবে জানলেন আমার এমন জায়গা পছন্দ?
—আপনি একদিন বলেছিলেন, সবুজ আর ফুলের মাঝে সময় কাটাতে আপনার ভালো লাগে। আমার মনে আছে।
মায়া তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
—আপনি সত্যিই অনেক কিছু মনে রাখেন।
—আপনার বলা কথাগুলো ভুলে যেতে ইচ্ছে করে না।
দুজন পাশাপাশি হাঁটতে লাগল। কিছুদূর গিয়ে একটি বেঞ্চে বসল।
শাহজাদ মায়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
—একটা প্রশ্ন করব?
—করুন।
—আপনি কি কখনো ভেবেছেন, আমাদের পরিচয়টা এত সুন্দরভাবে এগোবে?
মায়া একটু ভেবে বলল,
—না। প্রথমে তো আপনাকে বেশ গম্ভীর মনে হতো।
—এখন কী মনে হয়?
—এখন মনে হয়, আপনি একটু বেশি কথা বলেন।
শাহজাদ হেসে বলল,
—শুধু এতটুকু?
—আর একটু দুষ্টু।
—আর?
মায়া এবার চোখ নামিয়ে বলল,
—আর আপনার সঙ্গে সময় কাটাতে ভালো লাগে।
শাহজাদ কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
—জানেন, এই কথাটা শুনতে আমার অনেক ভালো লাগে।
—কেন?
—কারণ আমিও ঠিক একই রকম অনুভব করি।
মায়া হালকা হাসল।
কিছুক্ষণ পর শাহজাদ পাশের দোকান থেকে দুটো আইসক্রিম নিয়ে এল।
মায়া অবাক হয়ে বলল,
—এটা আবার কখন কিনলেন?
—আপনার জন্য।
—আমি তো চাইনি।
—চাইতে হবে কেন? আপনার পছন্দ মনে ছিল।
মায়া আইসক্রিম হাতে নিয়ে বলল,
—আপনি এত যত্ন করেন কেন বলুন তো?
শাহজাদ মৃদু হেসে বলল,
—আপনাকে যত্ন করতে ভালো লাগে। তবে কখনো যদি আমার কোনো আচরণ আপনার ভালো না লাগে, আমাকে বলবেন।
মায়া মাথা নাড়ল।
—বলব।
হঠাৎ শাহজাদ বলল,
—মায়া?
—জি?
—আপনাকে একটা কথা বলার আছে।
—বলুন।
—আপনাকে আমার একটু বেশিই ভালো লাগে।
মায়ার হাতের আইসক্রিমটা যেন হঠাৎ করেই বেশি মিষ্টি মনে হলো। সে লজ্জা পেয়ে অন্যদিকে তাকাল।
—আপনি আজ এসব কথা বলার জন্যই আমাকে এখানে এনেছেন?
—না। আপনাকে সময় দেওয়ার জন্য এনেছি। কথাটা শুধু মনের মধ্যে রাখতে পারলাম না।
মায়া আস্তে করে বলল,
—আমারও আপনাকে ভালো লাগে, শাহজাদ।
শাহজাদের মুখে প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল।
—সত্যি?
—না, মিথ্যা বললাম!
—আচ্ছা! তাহলে আমার মন খারাপ করা উচিত?
মায়া হেসে বলল,
—আপনার মন খারাপ হলে আমারও ভালো লাগবে না।
শাহজাদ কিছুক্ষণ চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
—তাহলে আজ আর কোনো অভিযোগ নেই।
সন্ধ্যায় মায়া বাড়ি ফিরে গেল। শাহজাদও নিজের বাড়িতে পৌঁছে মাকে সব বলল না, তবে তার মুখের হাসি দেখে রেহানা বেগম বুঝে গেলেন ছেলের দিনটা ভালো কেটেছে।
রাতে মায়ার ফোনে একটি মেসেজ এল।
শাহজাদ: আজকের বিকেলটা সুন্দর ছিল।
মায়া: আমারও ভালো লেগেছে।
শাহজাদ: একটা কথা মনে রাখবেন।
মায়া: কী?
শাহজাদ: আপনার হাসির কারণ হতে পারলে আমার দিনটা ভালো যায়।
মায়া: আর আপনি যদি আমার অভিমানের কারণ হন?
শাহজাদ: তাহলে সেই অভিমান ভাঙানোর চেষ্টা করব।
মায়া: কথা দিলেন?
শাহজাদ: কথা দিলাম।
মায়া ফোনটা পাশে রেখে হাসল।
এদিকে শাহজাদ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। তার মনে হচ্ছিল, জীবনে কিছু অনুভূতি খুব ধীরে আসে, কিন্তু একবার এলে মনজুড়ে জায়গা করে নেয়।
মায়া হয়তো এখনো জানে না, তার ছোট্ট একটি হাসি শাহজাদের কাছে কতটা মূল্যবান হয়ে উঠেছে।
চলবে... ❤️