ফন্ট সাইজ:
থিম:
শেষ রাতের চন্দ্রিমা

পর্ব 3

লেখক: ঐশানি পোলিনা

#শেষ_রাতের_চন্দ্রিমা
#পর্ব_৩
#ঐশানী_পোলিনা
[ অনুমতি ব্যতীত কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ❌ ]

দুপুর একটা। মাথার ওপর তখন কাঠফাটা রৌদ্র। এই তীব্র গরমের মধ্যে স্কুলের গেটে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে সুমাইরা আর কিয়ারা। তাদের ড্রাইভার কাকা এখনো গাড়ি নিয়ে এসে পৌঁছাননি। গরমে সুমাইরার ফর্সা মুখটা ইতিমধ্যে লাল হয়ে উঠেছে। ঠিক তখনই ধুলো উড়িয়ে একটা চেনা গাড়ি এসে থামল তাদের ঠিক সামনে। অবশেষে ড্রাইভার কাকা এসেছেন! হাঁপ ছেড়ে বাঁচল ওরা দুজন। আর এক মুহূর্তও দেরি না করে সুমাইরা ও কিয়ারা দ্রুত গাড়ির পেছনের সিটে উঠে বসল।

গাড়ি স্টার্ট হতেই কিয়ারা সুমাইরার দিকে তাকাল। সকাল থেকেই সে লক্ষ্য করছে সুমাইরা কেমন যেন চুপচাপ। কিয়ারা সুমাইরার হাতটা ছুঁয়ে জিজ্ঞেস করল, "কিরে সুমু, কী হয়েছে তোর বল তো? আজ সকাল থেকে সারাদিন কেমন যেন মুড অফ করে আছিস!"

সুমাইরা জানালার বাইরে চোখ রেখেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কাল মাঝরাতের অধীরের সেই নির্মম ধমক আর অপমান এখনো তার মনে কাঁটার মতো বিঁধে আছে। কিন্তু কিয়ারাকে সে কিছু বুঝতে দিল না। মুখের ওপর জোর করে একটা ম্লান হাসি টেনে বলল, "না রে, তেমন কিছু হয়নি। এমনিই ভালো লাগছে না শরীরটা, তাই হয়তো মুড অফ।"

বাসায় পৌঁছানোর পর তারা আর একদম সময় নষ্ট করল না। এই ভ্যাপসা গরমে চটজলদি গোসল সেরে ফ্রেশ হয়ে নিল দুজনেই। এরপর ডাইনিং টেবিলে গিয়ে দ্রুত সেরে নিল দুপুরের খাবার। সকালের ধকল আর মনের ভেতরের একরাশ ক্লান্তি—সব মিলিয়ে সুমাইরার শরীরটা বড্ড ম্যাচম্যাচ করছিল। আর সহ্য করতে না পেরে সে নিজের রুমে গিয়ে বিছানায় টানটান হয়ে শুয়ে পড়ল। চোখের পাতা দুটো ক্রমশ ভারী হয়ে এলো তার, আর কিছুক্ষণের মাঝেই সে তলিয়ে গেল গভীর ঘুমে।

কিছুক্ষণ পর যখন সুমাইরার ঘুম ভাঙল, ততক্ষণে চারপাশের আবহাওয়া পুরো বদলে গেছে। দুপুর গড়িয়ে প্রকৃতিতে এখন বিকেলের স্নিগ্ধ আগমনী বার্তা। দিনের সমস্ত ক্লান্তি আর তপ্ত রোদ শেষে প্রকৃতি যেন তার আসল রূপ ফিরে পেতে শুরু করেছে। জানালার বাইরে তাকাতেই সুমাইরার চোখ জুড়িয়ে গেল। সোনালি নরম রোদ এসে পড়েছে ঘরের কোণে, সেই সাথে বইছে এক চিলতে মিষ্টি বাতাস। দূর থেকে ভেসে আসছে মাঠে মেতে ওঠা শিশুদের খেলাধুলার আনন্দময় কোলাহল, আর আকাশে ডানা মেলে একঝাঁক পাখির আপন নীড়ে ফেরার অপরূপ দৃশ্য। দুপুর শেষ করে সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে হেলে পড়ে, তখন চারপাশের চেনা পৃথিবীটা কেমন এক জাদুকরী সোনালি আভায় ভরে যায়—ঠিক এই বিকেলটার মতো। সুমাইরার মনের ভেতরের জমানো মেঘগুলোও যেন বিকেলের এই স্নিগ্ধতায় একটু একটু করে কেটে যেতে লাগল।

বিকেলের এই মায়াবী রূপ দেখে সুমাইরার আর ঘরে মন টিকল না। সে ওয়াশরুম থেকে হাত-মুখ ধুয়ে একটু ফ্রেশ হয়ে সোজা ছাদের দিকে পা বাড়ালো।

ছাদে পা দিতেই এক চিলতে মৃদু বাতাস এসে তাকে ছুঁয়ে গেল। বিকেলের আকাশজুড়ে তখন হালকা মেঘের আনাগোনা, যা যেকোনো মানুষের মনকে মুগ্ধ করার জন্য যথেষ্ট। গ্রামের মেঠো পথে সবুজের সমারোহ, কাজ শেষে মাঠ থেকে কৃষকদের ক্লান্ত পায়ে ঘরে ফেরা, আর পাখির ঝাঁকের আপন নীড়ে ফেরার দৃশ্যগুলো খুবই সাধারণ, কিন্তু কী অদ্ভুত সুন্দর! আবার শহরের এই যান্ত্রিক জীবনের মাঝেও বিকেলের পার্কের বেঞ্চ, ছাদের ওপর প্রিয় বন্ধুদের জমজমাট আড্ডা কিংবা কফির কাপে ধোঁয়া ওঠার দৃশ্যগুলো নাগরিক মনে এক লহমায় প্রশান্তি এনে দেয়।

আর বাঙালি ঘরে বিকেলের নাস্তা মানেই তো মুড়ি-চানাচুর মাখানো, ধোঁয়া ওঠা লাল চা, গরম নুডুলস কিংবা কোনো মুখরোচক খাবারের রাজত্ব। খাবার টেবিল ঘিরে পরিবারের সবার সাথে গল্প আর হাসি-ঠাট্টায় কেটে যায় এই সুন্দর সময়টা।

ছাদের এক কোনায় রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে বিকেলের এই মায়াবী রূপ দেখতে দেখতে মনের ভেতর এসব কথাই ভাবছিল সুমাইরা। জীবনটা আসলে এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোতেই কত সুন্দর!

ঠিক তখনই চারপাশের শান্ত নীরবতা ভেঙে হঠাৎ তার কানে ভেসে এলো এক পরিচিত কণ্ঠস্বর—"সুমাইরা... ওরে সুমাইরা! কোথায় গেলি তুই?"

বলতে বলতে একপ্রকার হাঁপাতে হাঁপাতে ছাদে এসে হাজির হলো কিয়ারা। সুমাইরাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে কোমর বেঁধে বলে উঠল, "সুমু! তুই এখানে রাজকন্যের মতো দাঁড়িয়ে হাওয়া খাচ্ছিস? আর আমি ওদিকে সারা বাড়ি খুঁজে তোকে না পেয়ে জান কয়লা করে ফেললাম! জলদি চল, দিহান ভাইয়া এসেছে। তোকে নিচে ডাকছে।" বলেই সে আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে সুমাইরার হাত ধরে টানতে টানতে নিচের দিকে হাঁটা ধরল।

সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতেই সুমাইরার চোখ পড়ল ড্রয়িং রুমের সোফায় বসে থাকা যুবকটির দিকে। দীর্ঘ এক মাস পর দিহানকে দেখে সুমাইরার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে অকৃত্রিম হাসি ফুটে উঠল। সে বিনম্র সুরে বলল, "আসসালামু আলাইকুম, দিহান ভাইয়া।"

দিহান সুমাইরার দিকে চোখ বড় বড় করে তাকাল। তারপর সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে স্বভাবসুলভ দুষ্টুমি ভরা গলায় বলে উঠল, "ওয়ালাইকুম আসসালাম। তা বলি, তোকে সেই কখন থেকে ডেকে গলা ফাটিয়ে ফেলছি, অথচ কোনো সাড়াশব্দ নেই! কিরে সুমু, এক মাসের মধ্যে কানে কম শুনতে শুরু করলি নাকি পুরোপুরি বয়রা হয়ে গেলি?"

সুমাইরা লজ্জিত হেসে দুই হাত জোড় করে বলল, "আরে সরি দিহান ভাইয়া! আসলে আমি তো ছাদে ছিলাম, নিচের কোনো আওয়াজ শুনতে পাইনি।"

দিহান হেসে ফেলে সুমাইরার মাথায় আলতো একটা টোকা দিয়ে বলল, "আচ্ছা ঠিক আছে, হয়েছে। আর অত শত সরি বলতে হবে না।"

লন্ডন থেকে দিহান খালি হাতে ফেরেনি, বাড়ির সবার জন্যই সে দারুণ সব উপহার নিয়ে এসেছে। তবে কিয়ারা আর সুমাইরার জন্য তার এবারের উপহারটা ছিল একদম রাজকীয়—দুজনের জন্যই সে এনেছে লেটেস্ট মডেলের অ্যাপল ম্যাকবুক ল্যাপটপ। দামী ল্যাপটপ হাতে পেয়ে কিয়ারা তো খুশিতে নাচতে শুরু করল।

কিন্তু আসল চমক তখনো বাকি ছিল। হঠাৎ করেই ড্রয়িং রুমের সবার সামনে দিহান এক হাঁটু মুড়ে মেঝেতে বসে পড়ল। সুমাইরার দিকে তাকিয়ে গভীর চোখের দৃষ্টিতে সে অত্যন্ত নরম গলায় বলল, "সুমু, তোর পা-টা একটু আমার হাঁটুর ওপর রাখ তো।"

দিহানের এই আকস্মিক আচরণ দেখে ড্রয়িং রুমে উপস্থিত বাড়ির বড় থেকে ছোট—সবাই একদম অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। কেউ ঠিক বুঝতে পারছে না যে দিহান সবার সামনে হঠাৎ এমন কী করতে চলেছে! পুরো ঘরে এক মুহূর্তের জন্য পিনপতন নীরবতা নেমে এলো।

সুমাইরাকে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে দিহান আবার হেসে উঠে বলল, "কী হলো? হা করে কী দেখছিস? বললাম না তোর পা-টা একটু বাড়িয়ে দিতে!"

দিহানের কথায় সুমাইরা কেমন যেন এক সম্মোহনে পড়ে গেল। সে কোনো প্রশ্ন না করে একদম অবুঝ আর বাধ্য বাচ্চার মতো নিজের ফর্সা পা-টি আলতো করে দিহানের হাঁটুর ওপর বাড়িয়ে দিল। ঠিক তখনই দিহান তার শার্টের পকেট থেকে বের করে আনল খাঁটি রুপোর তৈরি একজোড়া মায়াবী নূপুর। নূপুরের ছোট্ট ঘুঙুরগুলো নড়ে উঠতেই ঝুনঝুন করে এক মিষ্টি আওয়াজ ছড়িয়ে পড়ল পুরো ডাইনিং রুমে। দিহান পরম যত্নে ও মায়ায় সুমাইয়ার পায়ে সেই নূপুর পরিয়ে দিতে লাগল এবং ঠিক সেই মুহূর্তেই সে গুনগুন করে গলা ছেড়ে গেয়ে উঠল...

"শুকনো পাতার নূপুর পায়ে / নাচিছে ঘূর্ণি বায়..." - এমন আবেগমাখা ছন্দে দিহান যখন গান গাচ্ছিল , তখন সুমাইয়া একপলকে তার দিকে চেয়ে ছিল, যেন মন্ত্রমুগ্ধ। বাড়ির সবাই দিহানের এই বিশেষ স্বভাবের সাথে পরিচিত, তাই সুমাইয়ার জন্য তার এই বিশেষ উপস্থাপনায় কেউ কোনো অবাক হওয়ার মতো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি।

এরপর "দীঘির বুকে শতদল দলি..." গানের সময় ডাইনিং সোফায় পায়ের উপর পা তুলে আয়েশি ভঙ্গিতে বসে থাকলেও, অধীরের তীক্ষ্ণ চোখ এড়ায়নি সুমাইরার মুগ্ধ চাহনি আর দিহানের কণ্ঠস্বর। যদিও সে কোনো কথা বলেনি, তবুও তার রহস্যময় নীরবতা পুরো পরিবেশের আবহকে আরও কিছুটা ভারী করে তোলে, যেন কোনো অশুভ সংকেতের ইঙ্গিত। "বন-ফুল আভরণ খুলিয়া ফেলিয়া..." গানের এই লাইনগুলোর সাথে যেন অধীরের মনের ভেতরের অচেনা কোনো ঝড় আর ষড়যন্ত্রের ছক মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছিল, যার রহস্য কেবল সেই জানে।

ঘড়িতে তখন রাত নয়টা...

— দিহানের নিজের হাতে পরম যত্নে পরিয়ে দেওয়া নূপুর পায়ে জড়িয়ে, খুশিতে সবার সামনে টইটই করে ঘুরে বেড়াচ্ছে চঞ্চল সুমাইরা... ঠিক তখনই

হঠাৎ পুরো বাড়ি কাঁপিয়ে অধীরের গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, "পিচ্চি... পিচ্চি!" অধীর সুমাইরাকে এই নামেই ডাকে। ডাক শুনে সুমাইরা মনে মনে বেশ বিরক্ত হলো। বিড়বিড় করে নিজেকেই বলল, "এখন আবার এই বুড়ো খাটাসটা আমাকে ডাকছে কেন?" কিন্তু মুখে কিছু না বলে অনিচ্ছা সত্ত্বেও সে অধীরের ঘরের দিকে পা বাড়াল।

অধীরের ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সুমাইরা বলল, "অধীর ভাইয়া, আমাকে ডাকছিলেন?" অধীর ফোনের স্ক্রিনের উপর থেকে চোখ না সরিয়েই বেশ ভারী গলায় আদেশ দিল, "এক কাপ কফি নিয়ে আয়।" সুমাইরা মনে মনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রান্নাঘরের দিকে রওনা হলো। কফি বানানো শেষে কাপটা হাতে নিয়ে সে আবার অধীরের ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল। বেশ আমতা আমতা করে দরজার বাইরে থেকেই বলল, "অধীর ভাইয়া, আপনার কফিটা নিয়ে যান।"

সুমাইরার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা দেখে অধীর এবার কিছুটা কড়া চোখে তাকিয়ে বলল, "তুই ওখানে বাইরে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? ভেতরে এসে কফিটা দিয়ে যা।" অধীরের এই দ্বিমুখী আচরণে সুমাইরা মনে মনে চরম চটে গেল। ওড়নাটা আঙুলে পেঁচাতে পেঁচাতে ফিসফিসিয়ে বলল, "শয়তান বুড়ো একটা! কালকেই বলল তার রুমে যেন আর কখনো না আসি, আর আজ বলছে রুমে এসে কফি দিয়ে যেতে! খবিশ লোক!"

হঠাৎ অধীরের তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বর সুমাইরার ভাবনায় ছেদ টানল, "কী বললি তুই?" সুমাইয়া ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে থতমত খেয়ে গেল। আমতা আমতা করে বলল, "এ... মানে... না, মানে বলছিলাম যে, আপনিই তো কাল বললেন আপনার রুমে যেন আর না আসি। তাই আরকি বাইরে থেকে কফিটা নিতে বলছিলাম।"

অধীর এবার চেয়ার ছেড়ে সোজা হয়ে বসল। তার চোখেমুখে কঠোরতা স্পষ্ট। সে বলল, "কাল বারণ করেছি, আজ আসতে বলছি। এত তর্ক করা আমার একদম পছন্দ নয়। আর একবারও যদি ভেতরে আসার কথা বলতে হয়, তবে আমার চেয়ে খারাপ আর কেউ হবে না।" অধীরের এমন রুক্ষ জবাবে সুমাইরা ভয়ে এক ঢোক গিলল। কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, "আসছি... এত রুড হচ্ছেন কেন?" এরপর অত্যন্ত ধীর পায়ে, ভয়ে ভয়ে সে অধীরের ঘরের ভেতর পা রাখল।

সুমাইরা অধীরের একদম মুখোমুখি গিয়ে কাঁপা হাতে কফির কাপটা এগিয়ে দিল। অধীর কফিটা না নিয়ে প্রথমে বেশ কিছুক্ষণ একদৃষ্টিতে সুমাইরার দিকে তাকিয়ে রইল। তার সেই গম্ভীর চাউনি সুমাইরার মনে ভয়ের কাঁপন ধরিয়ে দিল। এরপর অধীর ওর হাত থেকে কাপটা নিয়ে আলতো করে কাবোর্ডের ওপর রাখল।

কফি দেওয়া শেষ হতেই সুমাইরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে নিজের রুমের উদ্দেশ্যে যেই না পা বাড়াল, অমনি অধীরের গমগমে গলা ঘরজুড়ে প্রতিধ্বনিত হলো, "তোকে কি আমি যেতে বলেছি?" সুমাইরা থমকে দাঁড়িয়ে মাথা নিচু করে মিনমিনিয়ে বলল, "না..."। অধীর পাল্টা প্রশ্ন করল, "তাহলে যাচ্ছিস কেন?" সুমাইরা আর কোনো উত্তর খুঁজে না পেয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

অধীর ধীরে ধীরে সুমাইরার খুব কাছে এসে দাঁড়াল। তার দৃষ্টি সুমাইরার পায়ের দিকে নিবদ্ধ হলো। সে বেশ বিরক্ত স্বরে বলল, "তোর পায়ের এই নূপুরটা একটুও ভালো লাগছে না। তোর পায়ে এটা একদমই মানাচ্ছে না। এটা এক্ষুনি খুলে ফেলবি।" দিহানের দেওয়া নূপুর খোলার কথা শুনে সুমাইরার ভয় এক নিমেষে রাগে রূপ নিল। সে কিছুটা খ্যাঁকিয়ে উঠে বলল, "কেন খুলব? এটা আমাকে দিহান ভাইয়া দিয়েছে। আমি এটা কোনোভাবেই খুলতে পারব না! আমার পায়ে ভালো লাগুক বা না লাগুক, তাতে আপনার কী?"

সুমাইরার মুখে দিহানের নাম এবং এমন মুখে মুখে তর্ক করা অধীর একদম সহ্য করতে পারল না। তার চোখের মণি ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে উঠল। সে এক ঝটকায় নিজের হাতের দুই আঙুল দিয়ে সুমাইরার নরম গাল দুটো শক্ত করে চেপে ধরল। আরো রাগান্বিত হয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, "তোর সাহস হয় কী করে আমার মুখে মুখে তর্ক করার?" অধীর এতটাই জোরে গাল চেপে ধরেছিল যে সুমাইরা তীব্র ব্যথায় কুঁকড়ে উঠল। সে কোনোমতে গোঙানির সুরে বলল, "কী করছেন? ছাড়ুন... ব্যথা পাচ্ছি আমি!" অধীর দাঁতে দাঁত চেপে বলল, "ব্যথা পাওয়ার জন্যই ধরেছি।"

তীব্র যন্ত্রণায় সুমাইরার চোখের কোণ বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। সুমাইরার চোখে জল দেখে কিছুক্ষণ পর অধীর নিজেই আচমকা ওর গালটা ছেড়ে দিল। এরপর ভেতরের রাগটা চেপে ধরে কঠোর গলায় বলল, "আমার রুম থেকে এখনই বের হয়ে যা। তোকে যেন আমার সামনে আর কখনো না দেখি। ইফ ইউ কাম ইন ফ্রন্ট অফ মি এগেইন, আই উইল কিল ইউ! গেট আউট অফ মাই রুম!"

সুমাইরা আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। সে কাঁদতে কাঁদতে ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় শেষবারের মতো ঘুরে দাঁড়িয়ে ক্ষোভ উগরে দিল, "আপনি নিজেই তো ডেকে আপনার রুমে নিয়ে আসলেন! আমি কি সেধে আপনার রুমে আসছি? অসভ্য বুড়ো লোক একটা! আপনার কোনোদিন বিয়ে হবে না, দেখে নিয়েন!" বলেই সে হড়বড় করে ছুটে নিজের রুমে চলে গেল।

রুমের নিস্তব্ধ অন্ধকারে তখন নিভু নিভু করে জ্বলছিল একটি হালকা বাতি। সেই আবছা আলো-আঁধারির মাঝে এক রহস্যময় ছায়ামূর্তি ধীরপায়ে এগিয়ে গেল বুকসেলফের দিকে। অত্যন্ত সন্তর্পণে সেখান থেকে টেনে বের করল একটি পুরনো ডায়েরি। ধুলোমাখা সেই ডায়েরির মলাটের ওপর স্পষ্টাক্ষরে লেখা—‘চন্দ্রিমা’। ডায়েরিটা হাতে নিয়ে ছায়ামূর্তিটি কয়েক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে সেটির দিকে তাকিয়ে রইল, যেন স্মৃতির কোনো অতল গহ্বরে হারিয়ে গেল সে।

এরপর একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে ডায়েরির পাতাগুলো উল্টাতে শুরু করল। একটি শূন্য ও নতুন পৃষ্ঠা বের করে কলমটা তুলে নিল হাতে। নিস্তব্ধ রাতকে সাক্ষী রেখে, কাঁপানো হৃদয়ের সবটুকু আবেগ ঢেলে সে লিখতে শুরু করল—

তোমাকে পাওয়ার সাধ্য হয়তো আমার কোনোদিনই নেই। তুমি আমার কাছে এক অসাধ্য স্বপ্ন, হিরের মতো স্বচ্ছ ও অনন্য এক সৌন্দর্যের অধিকারী। তোমার এই দুর্লভ রূপ দূর থেকে কেবল মুগ্ধ চোখে অবলোকনই করা যায়, তোমাকে স্পর্শ করার কোনো অধিকার বা ক্ষমতা আমার নেই। তবে জেনে রেখো, তুমি আমার স্মৃতির ক্যানভাসে আর হৃদয়ের গভীরতম কোণে আমৃত্যু অটুট ও অম্লান হয়ে থাকবে। মহাকালের নিষ্ঠুর স্রোতে পৃথিবীর অনেক কিছু হারিয়ে গেলেও, আমার অনুভূতির আকাশে তুমি চিরকাল ধ্রুবতারার মতোই চিরভাস্বর হয়ে জ্বলবে।"

কলমের নিব ডায়েরির পাতায় যেন আরও তীব্র গতিতে চলতে লাগল। মনের ভেতর জমে থাকা বছরের পর বছর নীরব হাহাকার শব্দ হয়ে ঝরে পড়তে লাগল সেই ধবধবে সাদা পাতায়—

সময়ের নিষ্ঠুর স্রোতে পৃথিবীর অনেক কিছুই হয়তো একদিন হারিয়ে যায়, কিন্তু আমার হৃদয়ের অন্তঃস্থলে তুমি এক চিরন্তন ধ্রুবতারা হয়ে রয়ে যাবে—জন্ম থেকে জন্মান্তরে। আমি তো আজও তোমার সামনে চলৎশক্তিহীন এক অবুঝ প্রেমিক; তোমার পানে বুক ফুলিয়ে এগিয়ে আসার সেই অমোঘ জাদুমন্ত্রটি আমি আজও শিখে উঠতে পারিনি। তবে যতদিন এই বুকে নিঃশ্বাস প্রবহমান থাকবে, তোমাকে পাওয়ার দুর্নিবার তৃষ্ণায় আমি যেকোনো সীমালঙ্ঘন করতে প্রস্তুত!"

একটুখানি থেমে ছায়ামূর্তিটি ডায়েরির পাতায় হাত বুলাল। তারপর আবার শক্ত হাতে কলম কামড়ে ধরে লিখল—

প্রয়োজনে এই নিষ্ঠুর সমাজ বা নিয়তির চোখে আমি আজীবন 'খারাপ' হয়ে থাকব, তবুও আমার ভালোবাসার এই অদম্য বাজি আমি কিছুতেই হারব না। এই অবাধ্যতার পথে হাঁটতে গিয়ে যদি আমায় সমাজজুড়ে কলঙ্কিতও হতে হয়, তবে সেই অপবাদ আমি হাসিমুখে নিজের বুকে বরণ করে নেব; শুধু জেনে রেখো—তুমি শুধুই আমার।"

নিজের ঘরে ফিরে এসে সুমাইরা বেশ মন দিয়ে পড়াশোনায় ডুবে গেল। ঘড়ির কাঁটা যখন রাত একটা ছুঁল, তখন বইপত্র গুছিয়ে সে ঘুমিয়ে পড়ল। ছোটবেলা থেকেই সুমাইরা অত্যন্ত প্রখর মেধার অধিকারী এবং সব ক্লাসেই সে সবসময় প্রথম হয়ে এসেছে। তার চাচাতো বোন কিয়ারাও যথেষ্ট মেধাবী ছাত্রী, তবে সুমাইরার মতো কখনোই ক্লাস টপার হতে পারেনি।

এই বিশাল চৌধুরী বাড়িতে মূলত সুমাইরা আর কিয়ারারই রাজত্ব চলে। সারা দিন তাদের দুজনের খুনসুটি, হাসাহাসি আর দুষ্টুমিতে পুরো বাড়ি মুখরিত থাকে। তবে বাড়ির বড় ছেলে অধীর যখন বাড়িতে থাকে, তখন তাদের এই রাজত্বে কিছুটা ভাটা পড়ে। পুরো চৌধুরী বংশের মধ্যে অধীরই একমাত্র ব্যক্তি, যার মেধার ধারেকাছে আজ পর্যন্ত কেউ পৌঁছাতে পারেনি। সুমাইরা ক্লাসের সেরা ছাত্রী হওয়া সত্ত্বেও বাড়ির সবাই একবাক্যে স্বীকার করে যে, সে-ও নাকি অধীরের মতো অতটা প্রখর মেধাবী হতে পারেনি।

কিয়ারা আর সুমাইরা সমবয়সী হওয়ায় তাদের মধ্যকার বন্ডিং এবং দুষ্টুমির মাত্রাটা একটু বেশিই। যদিও বয়সের হিসেবে কিয়ারা সুমাইরার চেয়ে মাত্র দুই মাসের বড়। শুধু বাড়িতেই নয়, স্কুলেও তাদের দুজনের একচ্ছত্র রাজত্ব চলে—তারা যা বলে, সেখানে সেটাই নিয়ম। দুজন দুজনকে ছাড়া এক মুহূর্তও থাকতে পারে না। একবার সুমাইরা যখন কয়েকদিনের জন্য তার নানার বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল, কিয়ারার বিরহে সে কী কান্না! ওদিকে কিয়ারাও বাড়িতে কেঁদে কেটে একাকার করে ফেলেছিল। সেই ঘটনার পর থেকে তারা প্রতিজ্ঞা করেছে—কোথাও বেড়াতে গেলে একসাথেই যাবে, একসাথেই ফিরবে, একসাথে খাবে, অর্থাৎ যা কিছু করবে দুজনে মিলেই করবে।

#চলবে.......

সবার আগে গল্প পেতে অবশ্যই পেজটি ফলো দিয়ে রাখুন -
https://www.facebook.com/writeroishanipolina

আমার গল্প সমন্ধিত আলোচনার জন্য এই গ্রুপে জয়েন হয়ে যান।
https://facebook.com/groups/949453628116006/?mibextid=rS40aB7S9Ucbxw6v

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 3 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন