ফন্ট সাইজ:
থিম:
শেষ রাতের চন্দ্রিমা

পর্ব 4

লেখক: ঐশানি পোলিনা

পর্ব: ৪
গল্প: শেষ রাতের চন্দ্রিমা
লেখিকা: ঐশানী পোলিনা

ঘুটঘুটে অন্ধকার একটি রুমে চুপটি করে বসে আছে কিয়ারা।

এক ঘণ্টা হয়ে গেল সে রুমের মালিকের জন্য অপেক্ষা করছে।

আসলে এই রুমটি হচ্ছে ইসরাকের। কিয়ারা এই রুমটিতে নিয়মিত আসা-যাওয়া করে।

তবে তা ইসরাকের সম্পূর্ণ অগোচরে।

যবে থেকে কিয়ারা বুঝতে শিখেছে, তবে থেকেই সে মনের গহিনে লুকিয়ে রেখেছে এই অতৃপ্ত ভালোবাসা।

সে আদৌ জানে না তার এই ভালোবাসার কথা কখনো ইসরাক বা অন্য কারো সামনে প্রকাশ করতে পারবে কি না।

তার এই ভালোবাসার কথা কেউ শুনলে হয়তো ভাববে এটি তার ভালোবাসা না, এটি কেবলই তার মোহ।

আবার কেউ কেউ হয়তো বলবে, আবেগের ভালোবাসা অল্প বয়সে শুরু হলেও, সত্যিকারের পরিপক্ব ভালোবাসা সাধারণত বয়স বাড়ার সাথে সাথেই গড়ে ওঠে।

হ্যাঁ, কিয়ারাও পুরোপুরি এই কথা বিশ্বাস করে।

সে নিজেও মানে যে, সে এখন যে বয়সটা পার করছে— তা নিছকই আবেগের বয়স। তার হৃদয়ের গভীরের অনুভূতির মতোই, সত্যিকারের পরিপক্বতা সময়ের সাথে সাথে আসবে বলে সে মনে করে।

কিয়ারার দৃঢ় বিশ্বাস— সে ইসরাকের মোহে পড়েনি, সে আসলে তার মায়ায় পড়েছে, তার ভালোবাসায় মত্ত হয়ে গিয়েছে।

তাই তো ইসরাকের অনুপস্থিতিতে সে এই ঘরের আনাচে-কানাচে ঘুরঘুর করে। মাঝে মাঝে সে আলমারি থেকে ইসরাকের শার্ট বের করে গায়ে জড়িয়ে ওখানেই ঘুমিয়ে থাকে।

অথচ অদ্ভুত বিষয় হলো, ইসরাক যখন বাড়িতে থাকে, তখন কিয়ারা ভয়ে তার ধারেকাছেও ঘেঁষে না।

তবে আজকে সে মনে মনে শক্ত পণ করে রেখেছে, ইসরাক যতক্ষণ না আসবে, সে ঠায় এখানেই বসে থাকবে।

ইসরাক দেশের একজন নামকরা সাইন্টিস্ট। গবেষণার কাজে তাকে সারাক্ষণ মগ্ন থাকতে হয়, প্রায়শই ছুটে যেতে হয় এখানে-ওখানে।

কিয়ারা মাঝে মধ্যে ভেবেই পায় না, মানুষটা এত কাজ করে কী করবে!

তার কেবলই মনে হয়, ইসরাক যদি সব সময় তার চোখের সামনে ঘুরঘুর করতো, তবে কতই না ভালো হতো!

অন্ধকারে বসে এসব ছাইপাঁশ ভাবতে ভাবতেই কিয়ারা কখন যে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল, সে টেরও পেল না।

ঠিক তখনই ল্যাব থেকে রিসার্চের কাজ শেষ করে সবেমাত্র বাড়িতে ঢুকলো ইসরাক।

টানা খাটুনিতে সে এখন ভীষণ ক্লান্ত। এই মুহূর্তে তার একমাত্র চাওয়া— নিজের রুমে গিয়ে একটা ঠান্ডা শাওয়ার নেওয়া এবং তারপর শান্তিতে কিছু খেয়ে নেওয়া।

ইসরাক যেই না নিজের রুমে পা বাড়াল, অমনি তার চোখ আটকে গেল বিছানার ওপর।

সেখানে পরম নিশ্চিন্তে এলোমেলো হয়ে শুয়ে আছে এক কিশোরী কন্যা। ফ্যানের মৃদু বাতাসে তার কপালের অবাধ্য বেবি হেয়ারগুলো এসে বারবার গালে আছড়ে পড়ছে।

দৃশ্যটি দেখে ইসরাকের খুব ইচ্ছে করল— আলতো করে চুলগুলো সরিয়ে কানের পিঠে গুঁজে দিতে।

কিন্তু এই মুহূর্তে তা সম্ভব নয়; তাকে আগে ফ্রেশ হতে হবে। গবেষণাগারে কত রকম ক্ষতিকর কেমিক্যাল তাকে নাড়াচাড়া করতে হয়েছে!

তাই সে পা টিপে টিপে রুমে ঢুকল এবং কাবোর্ড থেকে নিজের কাপড় নিয়ে শাওয়ার নেওয়ার জন্য ওয়াশরুমে চলে গেল।

দীর্ঘ ৩০ মিনিট পর ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে আসল ইসরাক। তার ভেজা চুল থেকে তখনো টুপটুপ করে পানি ঝরছে।

সে অত্যন্ত ধীর পায়ে বিছানায় ঘুমিয়ে থাকা কিশোরী কন্যার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর বিছানার পাশে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল।

পরম মায়ায়, খুব সাবধানে কিয়ারার মুখের ওপর ছিটকে পড়া বেবি হেয়ারগুলো কানের পিঠে গুঁজে দিল সে।

এরপর কিয়ারা সেই মায়ায় ভরা নিষ্পাপ মুখখানির দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ইসরাক।

সারাদিনের রাজ্যের ক্লান্তি আর গবেষণাগারের সমস্ত মানসিক চাপ যেন এই একটা মুখ দেখেই এক নিমিষে কর্পূরের মতো উড়ে গেল।

ইসরাক মনে মনে খুব ভালো করেই জানে— কিয়ারা নামের এক পরি এসে রোজ তার এই অগোছালো রুমটি গুছিয়ে দিয়ে যায়। সে এটাও বোঝে, কিয়ারা নামের পরিটির মনে তার জন্য একটা বড়সড় সফ্‌ট কর্নার তৈরি হয়েছে।

কিন্তু কি করে সে এই ছোট্ট মেয়েটাকে বোঝাবে যে সে এখন কেবলই এক আবেগের বয়স পার করছে! এটা আর কিছুই নয়, শুধুই এক রঙিন মোহ; বয়স বাড়ার সাথে সাথে মনের এই মোহ একসময় ঠিক কেটে যাবে।

তবে কিয়ারা কি আদেও জানে— তার এই ছোট ছোট মিষ্টি পাগলামিগুলো দেখে কারো মনের ভেতরেও এক তুমুল তোলপাড় শুরু হয়ে যায়? হয়তো সে এখনো তা জানে না।

তবে যেদিন জানবে, সেদিন আর কোনো ছাড় দেবে না ইসরাক; কিয়ারা নামের এই পরিকে সে চিরদিনের মতো একেবারে নিজের করে নেবে।

কিছুক্ষণ ওভাবেই তার নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে, হঠাৎ করেই কিয়ারাকে দুহাতে আলতো করে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল সে; উদ্দেশ্য, তাকে তার নিজের রুমে রেখে আসা।

পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই সুমাইরা প্রথমে ফজরের নামাজ পড়ে নিল। তারপর সে তার রুমের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল।

ভোরের সেই স্নিগ্ধ, ঠান্ডা আবহাওয়াটা বুক ভরে উপভোগ করতে লাগল সে। সুমাইরার কাছে সকালের এই শান্ত পরিবেশটা ভীষণ পছন্দের।

সুমাইরা সবসময় বিশ্বাস করে— ভোর ও সকালের প্রকৃতির এই রূপ অত্যন্ত প্রশান্তিদায়ক এবং সুন্দর, যা মানুষের মন ও শরীরকে এক নিমিষেই সতেজ ও প্রাণবন্ত করে তোলে।

ভোরবেলায় প্রকৃতির রূপ থাকে একদম শান্ত ও স্নিগ্ধ। সূর্য ওঠার ঠিক আগের মুহূর্তে পূর্ব আকাশে যে হালকা লাল বা সোনালি আভা ফুটে ওঠে, তা ভোরবেলাকে এক অপূর্ব ও স্বর্গীয় সৌন্দর্য দান করে।

সুমাইরা কিছুক্ষণ বারান্দায় দাঁড়িয়ে প্রকৃতির সেই মায়া উপভোগ করল। তারপর এসে বসল পড়ার টেবিলে।

সেখান থেকে টানা সকাল ৯টা পর্যন্ত পড়াশোনা শেষ করে সে নিজের রুমে গেল তৈরি হতে।

রেডি হয়ে নিচে নেমে সে যখন ডাইনিং টেবিলে গিয়ে বসল, ততক্ষণে বাড়ির বড় কর্তারা সবাই ব্রেকফাস্ট শেষ করে অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেছেন; আজ নাকি তাদের কী একটা জরুরি মিটিং আছে।

সুমাইরা ধীর গলায় বলল—

"বড় মা খেতে দাও, আমার খুব খিদে পেয়েছে।"

রান্নাঘর থেকে সুফিয়া বেগম উত্তর দিলেন—

"বস মা, এক্ষুনি খাবার দিচ্ছি।"

টেবিলে খাবার সাজানোর মাঝেই সুমাইরা হঠাৎ কৌতূহলী হয়ে বলে উঠল—

"কিয়ারা এখনো ওঠেনি ঘুম থেকে, বড় মা?"

সুফিয়া বেগম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—

"জানি না বাপু ঘুম থেকে উঠেছে কি না! এই মেয়েটাকে নিয়ে আমি বড় জ্বালায় পড়েছি। মেয়েটার কোনো কাণ্ডজ্ঞান নেই। কয়টা বেজেছে কোনো হিসেব আছে? স্কুলে যাবে কখন!"

ঠিক তখনই যেন সুফিয়া বেগমের কথার খেই ধরে ডাইনিং রুমে এসে হাজির হলো স্বয়ং কিয়ারা।

তাকে দেখেই সুফিয়া বেগম আবার মুখ খুললেন—

"এই সময় হলো আপনার আসার? বলি, ঘড়িতে সময়টা দেখেছো একবার? কয়টা বেজেছে?"

ওপাশ থেকে রুবিনা বেগম আদুরে গলায় বলে উঠলেন—

"থাক না আপা! একদিন একটু দেরি হয়েছে তো কী এমন হয়েছে বলতো? মেয়েটাকে সকাল সকাল শুধু শুধু বকাঝকা করছ!"

তারপর কিয়ারার দিকে তাকিয়ে বললেন—

"কিয়ারা মা বস, খাবার দিচ্ছি।"

মা আর মেজো মায়ের এই সব কথাবার্তার কোনো কিছুই অবশ্য কিয়ারার কানে যাচ্ছিল না।

তার মনের ভেতর তখন চলছে এক তুমুল ঝড়। সে কেবলই ভাবছে— কাল রাতে সে তো নিশ্চিতভাবে ইসরাকের রুমেই ঘুমিয়ে ছিল!

তবে সকালে ঘুম থেকে উঠে সে নিজেকে নিজের রুমে আবিষ্কার করল কীভাবে? ইসরাকের রুম থেকে সে মাঝরাতে তার নিজের রুমে আসলো কেমন করে?

তবে কি ইসরাক তাকে...?

"কিয়ারা মা, খেতে বস..."

হঠাৎ রুবিনা বেগমের এমন জোরালো ডাকে কিয়ারার ভাবনার ঘোর ভাঙল। সে চমকে উঠে তার মেজো মায়ের দিকে তাকাল।

ঠিক তখনই সিঁড়ি বেয়ে উপর থেকে ফর্মাল গেটআপ নিয়ে নেমে আসছে অধীর।

সুমাইরা এক পলক তার দিকে তাকিয়েই আবার নিজের প্লেটের খাবারে মনোযোগ দিল। তবে কিছুক্ষণ পরেই সে হঠাৎ অধীরের দিকে তাকিয়ে বেশ রসিকতার সুরে বলে উঠল—

"কিয়ারা জানিস, আমাদের নানু বাড়ির ওখানে এক ৩০ বছরের বুড়ো লোক এখনও বিয়ে করেননি। সবাই তাঁকে ‘বুড়ো দাদু’ বলে খেপায় আর বলে যে তাকে নাকি কেউ কোনোদিন বিয়ে করবে না। বলছি কি অধীর ভাইয়া, আপনিও তো এখন ৩০ বছরের বুড়ো! আপনাকেও কিন্তু কেউ বিয়ে করবে না। তাই আমি ভাবছি— বাবা, বড় বাবা আর ছোট বাবাকে বলব আমাদের ইসরাক ভাইকে জলদি বিয়ে করিয়ে দিতে। আর আপনার মতো ৩০ বছরের বুড়ো লোককে তো এমনিতেও কেউ বিয়ে করবে না, তাই আপনি ওভাবেই থাকুন!"

সুমাইরার এমন খোঁচা মারা কথা শুনে অধীর রাগী চোখে তার দিকে তাকাল।

তার চাউনি দেখে মনে হচ্ছিল, সে চোখ দিয়েই সুমাইরাকে একেবারে ভস্ম করে দেবে!

তবে রাগে ফুঁসলেও মুখে সে আপাতত কিছুই বলল না।

অধীরকে রাগিয়ে দিয়ে সুমাইরা এবার ইসরাকের দিকে তাকিয়ে চট করে বলে উঠল—

"ভাইয়া, তুমি রাজি তো বিয়ে করার জন্য?"

ইসরাক তখন আপনমনে খাবার খাচ্ছিল; সুমাইরার মুখে হুট করে নিজের বিয়ের কথা শুনে সে এতটাই চমকে গেল যে এক নিমেষে বিষম খেয়ে উঠল।

অবস্থা বেগতিক দেখে পাশ থেকে রাহান তড়িঘড়ি করে একটা পানির গ্লাস এগিয়ে দিল। ইসরাক ঢকঢক করে পানি খেয়ে নিজেকে সামলে নিল।

তারপর খুব সাবধানে আড় চোখে একবার কিয়ারার দিকে তাকিয়ে চট করে চোখ ফিরিয়ে নিল।

এদিকে সুমাইরার মুখে হুট করে ইসরাকের বিয়ের কথা শুনে কিয়ারার বুকের ভেতরটা যেন ধক করে উঠল; মুহূর্তের মধ্যেই তার চঞ্চল মুখখানা একেবারে চুপসে গেল।

ডাইনিং টেবিলের এই খুনসুটি আর হট্টগোল দেখে রুবিনা বেগম এবার ধমকের সুরে বললেন—

"সকাল সকাল আর কথা না বাড়িয়ে সবাই চুপচাপ খাবারটা খেয়ে নাও তো দেখি!"

মায়ের এই কথায় টেবিলে সাময়িক এক নীরবতা নেমে আসলো।

সুমাইরা আর বাড়তি কিছু বলল না; তবে প্লেট থেকে মুখ না তুলেই একবার আড় চোখে অধীরের দিকে তাকিয়ে দেখল।

অধীর তখনও ঠিক আগের মতোই একদৃষ্টিতে ওর দিকে রাগ নিয়ে তাকিয়ে আছে।

বোনকে এভাবে বড়দের সাথে কথা বলতে দেখে সুহানা পাশ থেকে ধমকের সুরে বলল—

"তোকে এইসব নিয়ে একদম ভাবতে হবে না। এগুলো ভাবার জন্য বাড়িতে অনেক বড়রা আছেন, তাঁরাই বুঝবেন।"

সুহানা আপুর তাড়া খেয়ে সুমাইরা আর কথা বাড়াল না, শুধু আলতো করে একটা মুখ ভেংচি কেটে আবার নিজের খাবার খাওয়ায় মনোযোগ দিল।

দৃশ্যের পরিবর্তন ঘটল স্কুলের মাঠে। সেখানে বৃত্তাকারে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে তুমুল হইচই আর চিৎকার করছে স্কুলের একঝাঁক স্টুডেন্ট।

তাদের সবার ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে সুমাইরা, কিয়ারা ও সাগর। আর তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে স্কুলেরই দুই সিনিয়র ভাই— রাহাত আর সিয়াম।

হঠাৎ সবাইকে চমকে দিয়ে সিয়াম নামের ছেলেটি লাল টকটকে একটা গোলাপ ফুল হাতে নিয়ে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল সুমাইরার ঠিক সামনে।

তারপর চোখের দিকে তাকিয়ে আকুতিভরা গলায় বলে উঠল—

"আই লাভ ইউ সুমাইরা! আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি। তুমি কি আমার এই ভালোবাসা গ্রহণ করবে? কথা দিচ্ছি, তোমাকে আমি পৃথিবীর সব সুখ এনে দেবো, অনেক সুখে রাখবো!"

সিয়ামের রোমান্টিক কথার শেষ বাক্যটি সম্পূর্ণ শেষ হওয়ারও সুযোগ পেল না। তার আগেই কোত্থেকে যেন এক ঝড় এসে হাজির হলো।

হঠাৎ সুঠাম দেহের অধিকারী এক যুবক এসে সজোরে সিয়ামের শার্টের কলার ধরে তাকে এক ঝটকায় দাঁড় করিয়ে দিল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ছেলেটির মুখে একের পর এক এলোপাথাড়ি ঘুসি মারতে লাগল সে।

তীব্র রাগে যুবকের চোখ-মুখ তখন লাল হয়ে উঠেছে। সে দাঁতে দাঁত চেপে রাগী গলায় গর্জে উঠল—

"তোর এত বড় সাহস হয় কী করে আমার কলিজাকে প্রপোজ করার!"

তার ভেতরের পুঞ্জীভূত রাগ যেন আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ল; সে একটানা নির্মমভাবে ঘুসি মেরেই যেতে লাগল রক্তাক্ত সিয়ামকে।

সিয়ামের ওপর এমন নির্মম অত্যাচার দেখে সুমাইরা আর স্থির থাকতে পারল না। সে ভয়ে ও আতঙ্কে চিৎকার করে বলে উঠল—

"দিহান ভাই, প্লিজ ছেড়ে দিন ওকে! মেরে ফেলবেন তো!"

সুঠাম দেহের অধিকারী সেই ক্ষ্যাপাটে যুবকটি আর কেউ নয়— সে হলো মাহাতাব দিহান শিকদার।

কিন্তু এই মুহূর্তে কে শোনে কার কথা! দিহানের কানে যেন সুমাইরার কোনো আকুতিই পৌঁছাচ্ছিল না। সে নিজের সবটুকু গায়ের জোরে, একের পর এক মেরেই যাচ্ছিল সিয়াম নামের ছেলেটাকে।

মারতে মারতে সিয়ামের অবস্থা যখন একদম আধমরা, তখন মাঠের বাকি সবাই মিলে অনেক ধরাধরি করে, টেনে-হিঁচড়ে কোনোমতে দিহানকে থামাল।

দিহান তখনও রাগে হাঁপাচ্ছিল। শরীর বেয়ে ঝরছিল ঘাম। সে সুমাইরা আর কিয়ারার দিকে রক্তচক্ষু তুলে তাকাল। সেই চাহনিতে জমে থাকা ক্রোধে গম্ভীর গলায় আদেশ দিল সে—

"তোরা আর এক মুহূর্তও এখানে দাঁড়াবি না, এখনই গাড়িতে উঠে বোস!"

তাদের আর দ্বিমত করার সাহস হলো না। এক অজানা আতঙ্কে গুটিগুটি পায়ে দুজনে গিয়ে ঝটপট গাড়িতে বসে পড়ল।

এদিকে দিহান গাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ-মুখে তখন এক চরম অস্থিরতা। পকেট থেকে ফোনটা বের করে, গম্ভীর মুখে কার সাথে যেন জরুরি কথা বলতে লাগল সে...।

এদিকে গাড়ির ভেতরে তখন অন্য এক আবহ। বাইরের এত বড় তুলকালাম কাণ্ডের পর কিয়ারা সুমাইরার দিকে তাকিয়ে একটুখানি হেসে বলে উঠল—

"সুমু, তুই এত সুন্দর কেন বলতো? আমি নিজে মেয়ে হয়েও তোর দিকে সারাক্ষণ কেবলার মতো হা করে তাকিয়ে থাকি! আর ছেলেদের কথা তো বাদই দিলাম।"

কিয়ারা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সিহাবের জন্য একটু আফসোস করে আবার বলল, "আজকের এই ছেলেটাকে নিয়ে এ পর্যন্ত কতজন যে তোকে ভালোবাসতে এসে দিহান ভাইয়ের হাতে মার খেলো, তার বোধহয় কোনো হিসেব নেই!"

সুমাইরা কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু কাঁচের ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা দিহানের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

ঢাকা পল্টন এলাকা মাতিয়ে এক কুচকুচে কালো মার্সিডিজ AMG G63 গাড়ি তীব্র গতিতে ধেয়ে যাচ্ছে ‘চৌধুরী ভিলা’র উদ্দেশে।

বিশাল সেই চৌধুরী ভিলার সামনে এসে গাড়িটি সশব্দে ব্রেক কষল। দারোয়ান কাকা চটপট এসে মেইন গেট খুলে দিতেই মার্সিডিজটি রাজকীয় ভঙ্গিতে বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল।

গাড়ি থামতেই দরজা খুলে গম্ভীর মুখে বেরিয়ে এল এক যুবক—আহনাফ অধীর চৌধুরী।

বাড়িতে ঢুকেই সে সোজা চলে গেল এই বাড়িতে দিহানের জন্য বরাদ্দকৃত নির্দিষ্ট রুমটিতে। সেখানে দিহানের সাথে জরুরি কিছু কথা সেরে অধীর চলে গেল নিজের রুমে।

ক্লান্ত শরীরটাকে একটু আরাম দিতে কাবোর্ড থেকে একটা টি-শার্ট আর ট্রাউজার বের করল সে। তারপর শাওয়ার নেওয়ার জন্য ধীরপায়ে ওয়াশরুমে ঢুকল...।

সুহানা হঠাৎ রিহানকে প্রশ্ন করল, "রিহান ভাইয়া, তুমি আজকে ভার্সিটি যাওনি কেন?"

রিহান ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে মাস্টার্সে পড়াশোনা করছে, আর সুহানা এবার ইকোনমিক্স নিয়ে অনার্স ৩য় বর্ষে। সুহানার প্রশ্নের জবাবে রিহান অলস ভঙ্গিতে সোফায় হেলান দিয়ে বলল—

"আজ শরীরটা কেমন যেন বেশি ভালো ঠেকছে না, তাই যাইনি। কেন রে, কিছু হয়েছে নাকি?"

সুহানা একটু ইতস্তত করল। পরক্ষণেই চোখ নামিয়ে বলল, "না, তেমন কিছু হয়নি।"

ঠিক তখনই পিছন থেকে সুমাইরা, কিয়ারা, রাইসা আর রাহান সবাই মিলে ফিসফিসিয়ে একসাথে বলে উঠল, "আসল কথাটা বল না আপু!"

ভাই-বোনদের এমন উসকানিতে সুহানা এবার বেশ আমতা আমতা করতে লাগল। রিহান কিছুটা কৌতুহলী হয়ে এক ভুরু উঁচিয়ে তাকাল। সুহানা এবার একটু গলা ঝেড়ে বলল—

"রিহান ভাইয়া, বলছিলাম কি... আমরা সবাই মিলে আজ রাতে একটা বারবিকিউ পার্টি দিতে চেয়েছিলাম।"

রিহান হেসেই বলল, "তা কর গে পার্টি, আমি কি বারণ করেছি তোদের?"

সুহানা ফের আমতা আমতা করে বলল, "না মানে... আসলে... মানে..."।

রিহান এবার হালকা ধমক দিয়ে বলল, "কী তখন থেকে না মানে হ্যাঁ মানে করে যাচ্ছিস! যা বলবি ভালো করে পরিষ্কার করে বল।"

সুহানা এবার সবটুকু সাহস বুকে সঞ্চয় করে বলেই ফেলল—

"বলছিলাম, তুমি যদি অধীর ভাইয়া, ইসরাক ভাইয়া আর দিহান ভাইকে একটু রাজি করিয়ে আমাদের সাথে পার্টিতে নিয়ে আসতে!"

রিহান তাদের কাঁচুমাচু মুখ দেখে মৃদু হাসল। তারপর আশ্বস্ত করে বলল, "আচ্ছা ঠিক আছে, দেখব। এখন যা তোরা এখান থেকে।"

রিহানের রুম থেকে বের হতেই সুমাইরা সুহানাকে একটু খোঁচা দিয়ে বলল, "আপু, তুইও তো দেখছি আমাদের মতোই বড় ভাইয়াদের বাঘের মতো ভয় পাস!"

সুমাইরার কথা শুনে সুহানা বেশ রাগী গলায় উত্তর দিল, "এরপর থেকে তোদের যা যা দরকার, তোরা নিজেরাই গিয়ে ভাইয়াদের বলিস। আমি আর কোনোদিন তোদের হয়ে ওকালতি করতে পারব না, বলে দিলাম!"

কিয়ারা দেখল পরিস্থিতি একটু গরম হয়ে উঠছে। সে পরিবেশটা ঠান্ডা করার জন্য নরম গলায় বলল, "আপু, তুমি শুধু শুধু রাগ করছ কেন? আমরা তো এমনি মজা করে বললাম।"

কথা ঘোরানোর উদ্দেশ্যে রাইসা এবার সুহানাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল। তারপর একটু রসিকতা করে বলল—

"আচ্ছা আপু, তুই সারাদিন রুমে একা একা কী করিস বলতো? তোকে তো খুঁজেই পাওয়া যায় না আজকাল। সত্যি করে বল, কোনো প্রেম-ট্রেম করিস নাকি?"

রাইসার এমন আচমকা আর সরাসরি প্রশ্নে সুহানা একদম থতোমতো খেয়ে গেল। তার ফর্সা মুখটা মুহূর্তেই লাল হয়ে উঠল। সে ভীষণ আমতা আমতা করে, নিজেকে সামলে নিয়ে চটজলদি বলল—

"কী... কী বলিস এইসব হাবিজাবি! আমি আবার কার সাথে প্রেম করতে যাব!"

সুহানার মুখের এই আকস্মিক পরিবর্তন আর গলার স্বরের জড়তা বাকিদের চোখ এড়াল না। তারা সবাই একে অপরের দিকে তাকিয়ে রহস্যময় এক হাসি হাসল...।

সুহানার প্রশ্নের পিঠে রাহান মুচকি হেসে বলল, "সেটা আমরা কী করে জানব? তোর মনের খবর তো তুই নিজেই ভালো জানিস!"

সুহানার লজ্জামুখের এই আলোচনার মাঝেই সুমাইরা খুশিতে লাফিয়ে উঠে বলে উঠল, "তার মানে আজকে আমাদের বারবিকিউ পার্টি ফাইনালি হচ্ছে! আঃ, কী মজা! আজকে আমরা সবাই মিলে ধুমধাম পার্টি করব।"

এই বলে কিয়ারা আর সুমাইরা আনন্দে হাত ধরাধরি করে বাচ্চাদের মতো নাচানাচি করতে লাগল। তাদের এই নিষ্পাপ আনন্দের ছোঁয়া যেন মুহূর্তেই পুরো ঘরে ছড়িয়ে পড়ল।

অবশেষে রাতের সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত এল। চৌধুরী ভিলার বিশাল ছাদে তারা সবাই মিলে জমজমাট বারবিকিউ পার্টি উপভোগ করছে।

বড়রা সবাই অবশ্য নিচেই আছেন, ছাদটা এখন শুধুই তরুণ দলের দখলে। চারদিকে চিকেন ঝলসানোর সুঘ্রাণ আর মৃদু হাসির রোল।

তবে পার্টির এত হইচইয়ের মাঝেও অধীর ছাদের একদম এক কোণায় একাকী বসে আছে। সে আপনমনে ফোনে স্ক্রল করে চলেছে, চারপাশের কোনো কিছুতেই তার যেন ভ্রূক্ষেপ নেই। এক অদ্ভুত গাম্ভীর্য তাকে ঘিরে রেখেছে।

অন্যদিকে, দিহান তো সেই কখন থেকে সুমাইরার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তার সেই গভীর চাহনি যেন সুমাইরাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলছে।

সুমাইরাও যে বিষয়টি খেয়াল করেনি তা নয়। সে-ও কিছুক্ষণ পর পর নিজের অজান্তেই বেশ লাজুক চোখে আড়চোখে দিহানকে দেখছে। দুজনের এই নীরব চোখের ইশারা আর অব্যক্ত অনুভূতি যেন রাতের ঠান্ডা বাতাসকে আরও বেশি মায়াবী করে তুলল...।

হঠাৎ করেই দিহান সুমাইরার খুব কাছে গিয়ে দাঁড়াল। তার চোখে তখন গভীর অনুভূতির ছোঁয়া, যা সুমাইরাকে যেন এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ করে দিল।

সে আলতো ঝুঁকে সুমাইরার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। তারপর মৃদু, মায়াবী গলায় বলে উঠল—

মাই হার্ট, উইল ইউ ডান্স উইথ মি?"

সুমাইরা কিছু বুঝে ওঠার বা উত্তর দেওয়ার আগেই দিহান আলতো করে নিজের শক্ত হাত দিয়ে সুমাইরার নরম হাতটি জড়িয়ে ধরল। এক টানে তাকে নিয়ে এল ছাদের ঠিক মাঝখানে।

তারপর সে রাহানের দিকে তাকিয়ে ইশারায় বলল মিউজিক স্টার্ট দিতে। রাহানও দেরি করল না, দ্রুত মিউজিক সিস্টেম অন করতেই পুরো ছাদে একটি চেনা রোমান্টিক গানের সুর প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠল।

গানের প্রথম কলি—

"ম্যায়নে তেরে লিয়ে ছোড়া হ্যায় জামানা /জারা তেরা ইরাদা তো বাতা..."

"গলি গলি মে ফিরতা হ্যায় /তু কিউ বানকে বাঞ্জারা..."

"আ মেরে দিল মে বাস জা /

সুরের সাথে তাল মিলিয়ে, চারপাশের মৃদু আলোর রোশনাইয়ের মাঝে দুজনে নিখুঁত ভঙ্গিতে নাচতে লাগল। একে অপরের চোখের দিকে তাকিয়ে স্টেপ বাই স্টেপ এগিয়ে চলল তারা। পুরো ছাদ জুড়ে তখন যেন এক মায়াবী, স্বর্গীয় রোমান্স নেমে এসেছে...।

দিহান আর সুমাইরা তাদের নিখুঁত ড্যান্স শেষ করতেই কিয়ারা চট করে সুমাইরার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।

তারপর কনুই দিয়ে হালকা গুঁতো মেরে ফিসফিসিয়ে বলল, "উফ! কী সুন্দর কাপল ডান্স ছিল রে সুমু!"

কিয়ারার এমন রসালো টিপ্পনী শুনে সুমাইরা লজ্জায় একদম লাল হয়ে গেল। নিজের লজ্জা ঢাকতে কিয়ারার পিঠে একটা মৃদু থাপ্পড় বসিয়ে দিয়ে বলল, "একদম চুপ কর, কিয়ারার বাচ্চা!"

কিয়ারা অবশ্য দমবার পাত্রী নয়। সে মুখটা একটু বাঁকিয়ে, চোখ নাচাল। তারপর মিনমিনে গলায় বলল—

"বাহ রে! তুই সবার সামনে অমন কাপল ডান্স করতে পারবি, আর আমি মুখে বললেই দোষ? একটা গান আছে না— ‘তুমি তলে তলে টেম্পো চালাও, আমরা জানলেই হরতাল’! তোর ব্যাপারটাও ঠিক সেইরকম।"

সুমাইরাকে খেপিয়ে দিয়ে কিয়ারা এবার নিজের অবাধ্য চোখ দুটো ফেরাল ইসরাকের দিকে। সে যেন কিছুক্ষণের জন্য দুনিয়া ভুলে আবারও কেবলার মতো হা করে ইসরাকের দিকে তাকিয়ে রইল।

ইসরাক কিন্তু শুরু থেকেই কিয়ারার এই চাউনি আর ছোট ছোট কাণ্ডকারখানা খেয়াল করেছে। তবে সে মুখে কিছুই বলল না। এক রহস্যময় শান্ত ভাব তার চোখে-মুখে।

আসলে সে নিজের মনেই একটা খেলা খেলছে; সে শুধু দেখতে চায় এই অনুভূতির শেষ সীমানাটা আসলে কোথায়। কিয়ারার মনের এই গভীর টান কি শুধুই এক সাময়িক মোহ, নাকি সত্যিই এক অচ্ছেদ্য মায়া...

পার্টির আমেজ শেষ হতে হতে রাত তখন বেশ গভীর। ছাদে আরও কিছুক্ষণ হইচই আর আড্ডা জমিয়ে, সবাই ধীরে ধীরে নিচে নিজের নিজের রুমে চলে গেল। চারপাশটা হুট করেই কেমন যেন ভীষণ শান্ত হয়ে এল।

কোলাহলমুক্ত সেই নিস্তব্ধ ছাদে একাই রয়ে গেল অধীর। মাথার ওপর তখন একফালি চাঁদ আর চারপাশ জুড়ে এক রহস্যময় নীরবতা।

আসলে এতক্ষণ সে সবার মাঝে বসে ফোন স্ক্রল করার ভান করলেও, তার সতর্ক চোখ দুটো চারপাশের সবকিছুই খুব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছিল।

চোখ ফোনের স্ক্রিনে আটকে থাকলেও, অবাধ্য মনটা তার সারাক্ষণ পড়ে ছিল দিহান আর সুমাইরার দিকে। তাদের প্রতিনিঝুম ছাদের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে অধীরের চোখের সামনে এখনও যেন বারবার ভেসে উঠছে একটা দৃশ্য।টা হাসি, প্রতিটা চাহনি সে আড়াল থেকে দেখেছে।

দিহান আর সুমাইরার সেই ঘনিষ্ঠ কাপল ডান্সের দৃশ্যগুলো কিছুতেই তার মন থেকে মুছে যাচ্ছে না।

দিহানের সাথে সুমাইরাকে হাসিমুখে রোমান্টিক গানের তালে তাল মিলিয়ে নাচতে দেখে অধীরের পুরো শরীরে যেন ঈর্ষার আগুন জ্বলে উঠেছিল।

সেই আগুনের উত্তাপ এতটাই তীব্র ছিল যে, তার অবাধ্য মনটা এখন পুরো বাড়িটা এক নিমেষে ধ্বংস করে দিতে চাইছে। মনে মনে এক চরম প্রতিজ্ঞায় ফেটে পড়ল সে—

"পিচ্চি, তোকে একবার হাতের কাছে পাই! আই সোয়ার, তোকে এমন শিক্ষা দেব যে বুঝবি অধীর জিনিসটা আসলে কী!"

রাগে, ক্ষোভে তার শরীরের রক্ত চলন্ত আগুনের মতো টগবগ করে ফুটছে। ভেতরের এই সীমাহীন অস্থিরতা আর কোনোভাবেই ধরে রাখতে পারল না সে ।

নিজের শরীরের সমস্ত শক্তি এক জায়গায় জড়ো করে, ছাদের শক্ত রেলিংটার ওপর সজোরে কয়েকটি ঘুসি বসিয়ে দিল অধীর। সেই শব্দে নিস্তব্ধ রাতটা যেন কেঁপে উঠল।

এমন সময় সুমাইরা সিঁড়ি ঘরে পেরিয়ে ছাদে এসে হাজির হলো।

আসলে সুহানা তার ফোনটা ছাদে ফেলে গিয়েছিল, আর সেটা খুঁজে নিয়ে আসার জন্যই সে সুমাইরাকে ওপরে পাঠিয়েছিল।

কিন্তু ছাদে পা রাখতেই অধীরের রাগে অগ্নিশর্মা রূপ এবং রেলিংয়ের ওপর সজোরে ঘুসি মারার সেই ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখে সুমাইরার পুরো শরীর ভয়ে শিউরে উঠল। তার পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেল...।

ভয় পেলেও নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ না হারিয়ে, সে কোনোমতে কিছুটা সাহস সঞ্চয় করল। তারপর আস্তে আস্তে, পা টিপে টিপে অধীরের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। কিছুটা কাঁপা কাঁপা গলায় বলে উঠল—

"অধীর ভাইয়া, কী হয়েছে আপনার

সুমাইরার এই মাসুম প্রশ্নটা অধীরের কাছে যেন কাটা ঘায়ে নুনের ছিটার মতো লাগল। তার ভেতরের পুঞ্জীভূত রাগ এক মুহূর্তে দ্বিগুণ হয়ে গেল।

অধীর আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে এক হ্যাঁচকা ঝটকা মেরে সুমাইরার নরম হাতটা টেনে ধরল। টেনে হিঁচড়ে নিয়ে ছাদের দেয়ালের সাথে শক্ত করে চেপে ধরল তাকে।

ক্রোধে অন্ধ হয়ে সুমাইরার চোখের দিকে তাকাল সে। তারপর ফিসফিসিয়ে অথচ তীব্র, ধারালো গলায় বলল—

"তোকে এত সাহস কে দিয়েছে ? তুই অন্য ছেলেদের সাথে ওভাবে নাচিস! তোকে এখন আমার সত্যি মেরে ফেলতে ইচ্ছে করছে!"

সুমাইরার হাতটা আরও শক্ত করে চেপে ধরল অধীর। ব্যথায় সুমাইরার মুখটা কুঁকড়ে গেল। তাকে আরও কাছে টেনে নিয়ে আবার শাসিয়ে উঠল—

"ফারদার কখনো যদি তোকে কোনো ছেলের ধারেকাছে যেতে দেখেছি, তাহলে আমি ভুলে যাব তুই আমার থেকে ছোট, আর তুই আমার চাচাতো বোন! মনে থাকে যেন!"

অধীর সুমাইরার হাতটা এতটাই শক্ত করে চেপে ধরেছে যে, তীব্র ব্যথায় তার চোখের কোণে নোনা পানি জমে উঠল।

সুমাইরার এই অসহায়ত্ব দেখেও অধীরের পাথর মন একটুও গলল না। বরং সে আবার তার শাসানো গলায়, ধারালো কণ্ঠে বলে উঠল—

"তোর ড্যান্স করতে খুব ভালো লাগে, তাই না? তাহলে চল, আজ রাতে আমার সাথে তুই সারা রাত হট আর রোমান্টিক গানে ড্যান্স করবি! আমিও দেখতে চাই, তুই কতক্ষণ নাচতে পারিস!"

অধীরের এই ধারালো আর অদ্ভুত কথাগুলো শুনে সুমাইরার হাত-পা ভয়ে কাঁপতে শুরু করল। বুকের ভেতর তীব্র আতঙ্ক টের পেলেও মুখ ফুটে কিছু বলার মতো সাহস সে পেল না।

অধীর তখনো সুমাইরাকে দেয়ালের সাথে শক্ত করে চেপে ধরে রেখেছে। সে এক হাতে নিজের পকেট থেকে ফোনটা বের করে 'আশিক বানায়া' গানটি ছেড়ে দিল। নিঝুম ছাদে বেজে উঠল তীব্র সুর।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 4 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন