#নিষিদ্ধ_প্রণয় (সিজন ২)
#পর্বঃ০৯
#কলমে_সোনালিকা_আইজা
(⛔ সকল প্রকার কপি কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ)
-------
তুবা হতভম্ব! বাকরুদ্ধ। কাঠের পুতুলের মতো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে সামনে। চোখের সামনে জ্বলজ্বল করছে বড়সড় একটা নেমপ্লেট। তাকে গোটা গোটা শব্দে লেখা "কাজি অফিস"। এই নামটা দেখার জন্য তুবা মোটেও প্রস্তুত ছিলো না। কৌশিক যে তুবাকে সোজা কাজি অফিসে নিয়ে আসবে সেটা ছিলো তুবার কল্পনার বাইরে। তুবার ভাবনার মাঝেই কৌশিক আলতো করে ওর হাতটা চেপে ধরলো। মৃদু কন্ঠে বললো,
" চল।"
কিন্তু তুবা গেলো না। এক পাও সামনে আগালো না। বরং বরফের মতো জমে দাঁড়িয়ে রইলো সেখানেই। হাতে টান পড়ায় কৌশিক ভ্রু কুঁচকে পেছন ফিরে তাকালো। হতভম্ব তুবার চোখের দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
"কি?"
"আমরা এখানে কেনো এসেছি?"
অবোধের মতো প্রশ্ন করে বসলো তুবা। চোখে মুখে তখনও বিস্ময় লেপ্টে আছে। বিপরীতে কৌশিক মৃদু হাসলো। দু কদম এগিয়ে এসে তুবার মুখোমুখি হয়ে দাঁড়ালো। তুবার চোখে চোখ রেখে বলল,
"কাজি অফিসে মানুষ কি করতে আসে?"
"বি..বিয়ে করতে। সাক্ষী হিসেবেও আসে।"
"আপাতত সাক্ষী নয়। আমরা বিয়ে করতে এসেছি।"
এটুকু বলে থামলো কৌশিক। তুবা তখনও অবুঝের মতো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। ওর এমন চাহনি দেখে কৌশিক আলতো হাসলো। ডান হাতে তুবার বাম গাল আগলে ধরে মোহনীয় কন্ঠে বললো,
"আজ তোর মনের সব ভয় দূর করে দেবো জান। নিজেকে পার্মানেন্টলি তোর নামে লিখে দেবো। একটা স্বচ্ছ সাদা কাগজে বড় বড় করে লিখে দেবো "আজ থেকে এই কৌশিক ভুঁইয়া শুধু মাত্র তুবা আফরিনের। কৌশিকের ওপর দখলদারি থাকবে এক এবং একমাত্র তুবার।"
বলতে বলতে স্বচ্ছ হাসলো কৌশিক। তুবা নির্মিশেষ তাকিয়ে রইলো কৌশিকের সমুদ্রের ন্যায়ে গভীর দুই চোখে। যেই চোখ তুবাকে বারে বারে প্রেমের অনুভুতি বোঝায়। তুবা হারিয়ে যায় অজানা রাজ্যে। মুখের খেই হারায়। শুধু নয়নে ছড়িয়ে পড়ে মুগ্ধতা। তুবাকে আবারও ঘোরের মধ্যে ডুবতে দেখে ঠোঁট কামড়ে হাসলো কৌশিক। তুবার একটা হাত আলতো করে মুঠোয় পুরে নিয়ে কাজি অফিসের ভেতরে চলে গেলো।
-
-
ভেতরে গিয়ে আরও একদফা চমকে গেলো তুবা। আজ যেনো তার চমকানোর দিবস। ভেতরে অলরেডি মৌমিতা, নীরব, রিয়া, রিমি উপস্থিত আছে। সবার থেকে নজর সরিয়ে তুবার নজর গেলো একদম পেছনে। সেখানে দুটো গোলাপের মালা হাতে ভুতের মতো দাঁড়িয়ে আছে রবিন। এই মুহুর্তে এই জায়গায় রবিনকে তুবা মোটেও আশা করেনি। তুবা ভেবে পাচ্ছে না এই আগাছা গড়াগড়ি করতে করতে এখানে পৌঁছালো কিভাবে? ভয় ভয় চোখে একবার কৌশিকের দিকে তাকালো তুবা। কৌশিকের নজর আগে থেকেই তুবার দিকে ছিলো। দুজনের চোখাচোখি হতেই কৌশিক ঠোঁট ছড়িয়ে হাসলো। সামান্য ঝুঁকে তুবার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
"ডোন্ট ওয়ারি জান। রবিনকে আমিই ডেকে এনেছি। আমার তরফ থেকে সাক্ষী লাগবে তো। ও আমার সাক্ষী হবে।"
তুবা আরও একবার হতভম্ব নয়নে তাকালো। সবকিছু মেয়েটার মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছে। তুবার চিন্তা ভাবনায় ইতি টানতে ওকে হাত ধরে একটা চেয়ারে বসিয়ে দিলো কৌশিক। নীরবের হাতে একটা শপিং ব্যাগ ছিলো। কৌশিক সেই ব্যাগ থেকে একটা লাল রঙের বৌ ওড়না বের করলো। চেয়ারে গুটিশুটি মেরে বসে থাকা তুবার মাথায় নিজ হাতে ওড়নাটা ছড়িয়ে দিলো। একটা হাত টেবিলে রেখে অন্য হাত তুবার চেয়ারে রেখে সামনে ঝুঁকল কৌশিক। অর্ধ ঘোমটার আড়ালে তুবার মুখটা একবার দেখে মুগ্ধ কন্ঠে বললো,
"পার্ফেক্ট! এবার বউ বউ লাগছে।"
এর পরপরই নিজে গিয়ে তুবার পাশের চেয়ার টেনে বসলো। সামনেই বসে আছেন দাঁড়ি ওয়ালা টুপি পরিহিত একজন মাঝবয়েসী লোক। কৌশিক তাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
"কাজি সাহেব। বিয়ের কাজ শুরু করুন।"
ধর্মীয় নিয়ম অনুযায়ী বিয়ের কাজ সম্পন্ন করা হলো। কবুল বলার সময় কৌশিক ছিলো সুপার ফাস্ট। কিন্তু তুবা ছিলো তার সম্পুর্ন বিপরীত। অত্যন্ত ধীরে সুস্থে কবুল বলেছে মেয়েটা। মাথায় তার একগাদা চিন্তা। পরিবারের অগোচরে বিয়ের মতো একটা সাঙ্ঘাতিক কান্ড ঘটিয়ে ফেললো দুজন। বাড়ির সবাই যখন জানবে তখন কি হবে? হাজারও চিন্তা ভাবনা নিয়ে রেজিস্ট্রি পেপারেও সাইন করলো তুবা। উপস্থিত সবাই সাক্ষীহিসেবে সাইন করলো। মৌমিতা দুই পক্ষেরই সাক্ষীর খাতায় নাম লেখা দিয়েছে। সবশেষে রবিন এগিয়ে এলো সামনে। বেচারার চেহারা ফ্যাকাশে। ওর হাত থেকে একটা মালা নিয়ে কৌশিক তুবার গলার পড়িয়ে দিলো। এরপর অপর মালাটা তুবার হাতে ধরিয়ে দিলো। ইশারায় বোঝালো, "এবার এটা আমাকে পড়া"।
তুবা ধীরে সুস্থে পায়ের পাতায় ভর দিয়ে কৌশিকের গলায় মালা পড়িয়ে দিলো। সঙ্গে সঙ্গে হাত তালির শব্দ প্রতিধ্বনি হলো চারিদিকে। তুবা লাজুক চাহনিতে একবার তাকালো কৌশিকের দিকে। হঠাৎ করেই কেমন যেনো লজ্জা লজ্জা লাগছে। গাল দুটো থেকে গরম ধোঁয়া বের হচ্ছে। তুবার লজ্জা আরও একধাপ বাড়িয়ে দিতে আচমকা কৌশিক হাঁটু মুড়ে বসে পড়লো মাটিতে। হাতে একটা ফুটন্ত লাল গোলাপ। কৌশিকের চোখে মুগ্ধতা। কন্ঠে এক আকাশ সমান প্রেম,
"আমার জান! আমার হৃদয়ের মালকিন। আমার প্রেম রাজ্যের একমাত্র রানী। আজ এই আকাশ, এই বাতাস, এই ভূখন্ড, এই পৃথিবী এবং আমার দেহে বয়ে চলা প্রতিটা নিঃশ্বাসকে সাক্ষী রেখে এই আমিটাকে তোর নামে লিখে দিলাম। কৌশিক তুবার। শুধুই তুবার। এর বাইরে কৌশিকের আর কোনো আশ্রয় নেই। কৌশিকের পৃথিবী তুবার থেকে শুরু এবং তুবার কাছেই সমাপ্ত। বাকিসব মরিচীকা, চোখের ভুল অথবা মনের ভ্রুম।
আমার মনের সকল প্রেম, সকল পাগলামি, সকল ব্যাকুলতা, সাথে এই পুরো আমি টাকে নিজের আঁচলে বাঁধতে প্রস্তুত তো জান? পারবি তো, এই অগোছালো পাগল ছেলেটাকে সামলাতে? পারবি তো, আমার ভালোবাসার অত্যাচার সহ্য করতে? অবশ্য এই ক্ষমতা শুধু তোর মধ্যেই আছে। তুই ছাড়া আর কেউ কৌশিককে সামলাবার কাবিল নয়। নিজের করে নিবি এই পাগল প্রেমিকটাকে? ওয়াদা করছি, তোকে সারাজীবন ভালোবাসবো। বুকের ভেতর খুব যত্ন করে আগলে রাখবো। কোনো দুঃখ, কোনো কষ্ট, কোনো আফসোস তোকে ছুঁতে পারবে না।
আজ থেকে আমার ভাগের সকল সুখ আমি তোর নামে লিখে দিলাম। আর তোর ভাগের সকল দুঃখ আমি আপন করে নিলাম। থাকবি তো সারাজীবন আমার সাথে?"
এক বিশাল আবেগী আকুলতা ঢেলে বাক্যগুলো আওড়াল কৌশিক। নিজের বক্তব্য শেষ করে তুবার দিকে হাপিত্যেশ নয়নে তাকিয়ে রইলো। হাতে এখনও ধরে রাখা গোলাপ। অধীর আগ্রহে কৌশিক অপেক্ষা করলো তুবার জবাবের।
এদিকে তুবার যেনো খুশিতে মরে যেতে মন চাইছে। সে শুধু কৌশিকের থেকে একটু ভালোবাসা চেয়েছিলাম। বিনিময়ে কৌশিক যে এতো ভালোবাসা ঢেলে দেবো সেটা ছিলো তুবার ধারণার বাইরে। আজ যেনো তুবার শুধু অবাক হওয়ার দিন। অত্যাধিক আনন্দে কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে মেয়েটা। শুধু ছলছল নয়নে কৌশিকের চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। কৌশিক অধৈর্য্যে হলো। আকুল ভরা কন্ঠে বললো,
"জবাব দিবি না জান? আমি অপেক্ষা করছি।"
আচমকা তুবার যেনো হাত পা ভেঙে এলো। শরীরের শক্তি ফুরিয়ে যেতে চাইছে। বুকটা চিনচিন করে উঠছে। এতো সুখ সুখ অনুভুতি তুবা আগে কখনও অনুভব করেনি। ভালোবাসায় সে এতো সুখ, তুবা আগে বোঝেনি।
মুহুর্তেই সামনের সবকিছু ভেঙে চুড়ে তুবা আছড়ে পড়লো হাঁটু মুড়ে বসে থাকা কৌশিকের বুকে। শক্তিহীন দেহটা ছেড়ে দিলো প্রসস্ত বাহুর জিম্মায়। কৌশিক সঙ্গে সঙ্গে ধরে ফেলল তুবাকে। এক প্রেমময় আলিঙ্গনে জড়িয়ে নিলো নিজের সাথে। তুবার চোখের জল বাঁধ ভাঙলো। কৌশিককে জড়িয়ে ধরে ফুপিয়ে কেঁদে উঠলো তুবা। ভাঙা কন্ঠে আওড়ালো,
"আই লাভ ইউ কৌশিক ভাই।"
ব্যাস! কৌশিকের আর কি চাই? এই একটা বাক্য শোনার জন্য বছরের পর বছর তার কান জোড়া চাতকের ন্যায়ে অপেক্ষা করছিল। আজ এতোগুলা বছর পর অপেক্ষার অবসান ঘটলো। কৌশিক শক্ত করে নিজের সাথে জড়িয়ে নিলো তুবাকে। তুবার মাথায় ছোট্ট করে চুমু খেয়ে বিড়বিড় করে আওড়ালো,
"ব্যাস! আর কিছু চাইনা আমার। বেশি না, তুই শুধু একটু ভালোবাসা দিস জান। বাকিটা আমি আমার ভালোবাসা দিয়ে পুষিয়ে নেবো।"
দুজনে একে অপরের সঙ্গে কতক্ষণ এভাবে লেপ্টে ছিলো কে জানে? অনুভুতির সাগরে ভাসতে ভাসতে দিন দুনিয়ার চিন্তাই ভুলে বসেছে দুজন। ওদের ভাসমান অবস্থা থেকে মাটিতে নামাতে মৌমিতা গলা খাকড়ি দিয়ে উঠলো। কারোর গলার আওয়াজ শুনে হকচকিয়ে গেলো তুবা। তড়িঘড়ি করে কৌশিকের থেকে দূরে সরে দাঁড়ালো। একবার আঁড়চোখে তাকিয়ে দেখলো সবাই ওদের দিকে তাকিয়ে মিটমিট করে হাসছে। তুবা পুরো ঘরে নজর বুলালো। বর্তমানে এখানে কাজি সাহেব অনুপস্থিত। লজ্জায় হতভম্ব তুবা ধপ করে চেয়ারে বসে দুই হাতে মুখ ঢেকে নিলো। এই লজ্জা থেকে বাঁচতে কি করবে মেয়েটা? দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যাবে? নাকি মাটি খুঁঁড়ে মাটির নিচে ঢুকে যাবে। ভেবে চিন্তে উপযুক্ত জবাব না পেয়ে মুখ ঢেকে আর্তনাদ করে উঠলো তুবা।
অপরদিকে কৌশিক যেনো পুরোই তুবার বিপরীত। যেখানে সবার সামনে এমন অপ্রিতিকর পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় লজ্জায় তুবা মুখ লুকাতে ব্যাস্ত। সেখানে কৌশিক যেনো পুরোই ভাবলেশহীন। বরং চোখে মুখে তার বিরক্তি। একবুক বিরক্তি নিয়েই মৌমিতার বিরুদ্ধে অভিযোগ করলো,
"মানে, আমার সুখ তোর সহ্য হয় না তাই মৌ? যেই দেখলি তোর ভাই বহু বছরের প্রতিক্ষার পর একটু সুখের দেখা পেয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে ব্যাগড়া দিতে হাজির। শাঁকচুন্নি একটা।"
কৌশিকের খোঁচা মারা কথা শুনে রেগে গেলো মৌমিতা। তেড়ে এসে বলল,
"কি বললি তুই?"
"কানে কম শুনছিস? চল ডাক্তার দেখাই।"
"একদম বাজে কথা বলবি না ভাই। ভুলে যাস না আমি তোর বড়। একটু তো সম্মান দে।"
"তোকে বড় মানে কে? আমি তো কোনো কালেই মানি না।"
"তুই না মানলেও আমি তোর বড়।"
"এতই যদি বড় হতিস তাহলে এটুকু জ্ঞান থাকতো, দুজন কাপল রোমান্স করার সময় তাদের ডিস্টার্ব করতে হয় না। চুপচাপ সেখান থেকে কেটে পড়তে হয়। সেই ম্যানার্স তো তোর মধ্যে নেই। যেটা আমার মধ্যে ভরপুর আছে। এখান থেকেই প্রমাণ হয় তুই আমার ছোটো।"
মৌমিতা জবাব দেয়ার ভাষা হারিয়ে ফেললো। আঙ্গুল তুলে শাসিয়ে কিছু বলতে গিয়েও ভেবে পেলো না কি বলবে। ঝগড়ায় হেরে গিয়ে অতিষ্ট ভঙ্গিতে বলল,
"তুই....তুই একটা অসভ্য।"
"সভ্য কোনো কালেই ছিলাম না। আর না নিজেকে কখনো সভ্য প্রমাণ করার চেষ্টা করেছি। ইউ নো না। তোর থেকে ভালো আমাকে আর কে চেনে? মায়ের পেট থেকেই তো আমার লেজ ধরে ঘুরছিস।"
কৌশিকের ভাবলেশহীন উত্তর। মৌমিতা নিজের মেজাজ হারালো। আর এক মুহুর্তও সেখানে দাঁড়ালো না। সোজা তুবার হাতটা চেপে ধরে হনহন করে বেরিয়ে গেলো সেখান থেকে। পেছন থেকে কৌশিক চেঁচিয়ে উঠলো,
"ওই হাতি! আস্তে। আমার পিপড়ের মতো বউটার ব্যথা লাগবে।"
চলবে?