ফন্ট সাইজ:
থিম:
রক্তমুকুট

8

লেখক: জান্নাতুল ফেরদৌস

চাঁদের আলোয় স্নান করা বাগানজুড়ে নিস্তব্ধতা।

মেহরাব বিশাল অশ্বত্থ গাছের আড়াল থেকে সতর্ক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। কালো পোশাকে মোড়া সেই রহস্যময়ী তরুণী ঠিক সামনেই। হঠাৎ সে কাঁধের ওপর দিয়ে পেছনে তাকাল। যেন কারও উপস্থিতি অনুভব করেছে। মেহরাব আর অপেক্ষা করল না। বিদ্যুতের মতো দ্রুত গাছের আড়াল ছেড়ে সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ল। কিন্তু এই মুহূর্তটার জন্যই যেন প্রস্তুত ছিল মেয়েটি। সে এক মুহূর্তও স্থির থাকল না। পাশের কাঞ্চন গাছের ওপর ভর দিয়ে শরীর ঘুরিয়ে এক লাফে মার্বেলের সরু বেদির ওপরে উঠে গেল। মেহরাবও পিছু নিল। দুজনের মাঝখানে এখন মাত্র কয়েক হাত দূরত্ব। ঠিক তখনই মেয়েটি ওড়নার এক প্রান্ত ছুড়ে দিল পাশের মশালের দিকে। ঝলসে ওঠা আগুনে আলো ছড়িয়ে পড়ল। মেহরাব স্বভাবতই চোখ ঢেকে ফেলল। সেই ক্ষণিক সুযোগেই তরুণীটি অন্য দিকে লাফিয়ে পড়ল। মেহরাব দ্রুত আবার ছুটল। সামনে পৌঁছে দেখে কেউ নেই।

চারদিকে কেবল ফুলের গন্ধ। পাতার মৃদু শব্দ। চাঁদের আলোয় সে চারপাশে তাকাল।

ঝোপের আড়ালে পাথরের স্তম্ভের পাশে কোথাও নেই। এতক্ষণ আগেও যে মেয়েটি চোখের সামনে ছিল, সে যেন বাতাসে মিলিয়ে গেছে। মেহরাব ভ্রু কুঁচকে মাটির দিকে তাকাল। কয়েকটি ক্ষীণ পায়ের ছাপ। সেগুলোও হঠাৎ শেষ। মনে হচ্ছে ইচ্ছে করেই নিজের চিহ্ন মুছে দিয়েছে। সে প্রাসাদের চারপাশে আরও অনেকক্ষণ খুঁজল।

পাহারাদারদেরও কিছু জিজ্ঞেস করল।

কেউ কাউকে দেখেনি। অবশেষে ক্লান্ত হয়ে বাগানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

নিজের মনেই বিড়বিড় করে বলল,

"অবিশ্বাস্য...এ আবার হয় নাকি? একজন শিকারিকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরিয়ে বেড়াচ্ছে একটা মেয়ে!"

নিজের ওপরই ভীষণ বিরক্ত লাগছিল। এত তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। এত বছরের শিকার করার অভিজ্ঞতা। তবুও বারবার সেই সোনালি চুলের রহস্যময়ী তার চোখের সামনে এসে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। সে মুঠো শক্ত করল।

"একদিন না একদিন তোমাকে আমি খুঁজে বের করবই।"

শেষবারের মতো চারপাশে তাকিয়ে ধীরে ধীরে অতিথিশালার দিকে ফিরে গেল মেহরাব। সেই রাতেও তার ঘুম এল অনেক দেরিতে। চোখ বন্ধ করলেই ভেসে উঠছিল অধরা এক জোড়া পদচিহ্ন।

পরদিন সকাল। রাজদরবারে বাণিজ্যিক চুক্তির শেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হলো। দুই রাজ্যের প্রতিনিধিরা একে একে নথিতে স্বাক্ষর করলেন।

বাণিজ্যপথ, করব্যবস্থা, নিরাপত্তা ও পারস্পরিক সহযোগিতা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার পর অবশেষে চুক্তি সম্পন্ন হলো। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে মেহরাব সম্রাট হারুন ওয়াসেমের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা ও উপঢৌকন তুলে দিল। আয়োজক রাজাও আন্তরিক বিদায় জানালেন। দুপুরের কিছু পরই রাজকীয় কাফেলা আমিরাবাদের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করল। প্রাসাদের বিশাল ফটক ধীরে ধীরে পেছনে মিলিয়ে যেতে লাগল। ঘোড়ার গাড়ির জানালা দিয়ে শেষবারের মতো চারদিকে তাকাল মেহরাব।

হয়তো আর একবার দেখা মিলবে। কিন্তু না। সেই রহস্যময়ী সোনালি চুলের তরুণী যেন আবারও বাতাসের মতো অদৃশ্য। মেহরাব ধীরে পর্দা টেনে দিল। তার সামনে এখন দীর্ঘ পথ

**

দীর্ঘ সফর শেষে বিকেলে আমিরাবাদের রাজকীয় কাফেলা প্রাসাদে প্রবেশ করল। প্রহরীদের কণ্ঠে ধ্বনিত হলো অভ্যর্থনার ঘোষণা। দাস-দাসীরা ছুটে এসে লাগাম ধরল। রাজকীয় কর্মচারীরা বাণিজ্যিক সফরের মালামাল নামাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কিন্তু মেহরাব সেদিকে একবারও তাকাল না। ঘোড়ার গাড়ি থেকে নেমেই দ্রুত পায়ে হাঁটতে শুরু করল। তার গন্তব্য দেওয়ানখানা। প্রাসাদের যাবতীয় সরকারি ও ব্যক্তিগত চিঠিপত্র প্রথমে সেখানেই জমা হয়। বুকের ভেতর অদ্ভুত এক প্রত্যাশা কাজ করছে। হয়তো একটা চিঠি এসেছে। হয়তো জান্নাত উত্তর পাঠিয়েছে।

দেওয়ানখানায় ঢুকতেই বৃদ্ধ দেওয়ান উঠে সালাম জানালেন।

"আসসালামু আলাইকুম, যুবরাজ।"

"ওয়ালাইকুমুস সালাম।"

মেহরাব চারদিকে একবার তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,

"আমার নামে কোনো চিঠি এসেছে?"

বৃদ্ধ দেওয়ান কিছুক্ষণ নথিপত্র উল্টেপাল্টে দেখলেন। তারপর মাথা নেড়ে বললেন,

"না, যুবরাজ। আপনার নামে কোনো পত্র আসেনি।”

মেহরাব নিশ্চুপ হয়ে গেল।আরও একবার উত্তর শোনার অপেক্ষা করছিল।

"ভালো করে দেখেছেন?"

"জি, যুবরাজ। আজ নয়, গত কয়েক দিনেও আপনার নামে কোনো বার্তা আসেনি।"

মেহরাব মৃদু মাথা নাড়ল।

"আচ্ছা।"

তার কণ্ঠে হতাশা স্পষ্ট। দেওয়ানখানা থেকে বেরিয়ে ধীরে ধীরে সরু বারান্দা ধরে হাঁটতে লাগল। মনে হলো বুকের ভেতরটা হঠাৎ ফাঁকা হয়ে গেছে। সে কি চিঠিটাই পায়নি? নাকি পেয়েও উত্তর দিতে চায়নি? অগণিত প্রশ্ন এসে ভিড় করল তার মনে।

পেছন থেকে ভেসে এলো পরিচিত কণ্ঠ।

"এই যে আমাদের বিরহে কাতর যুবরাজ!"

মেহরাব চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

"ইয়া আল্লাহ..."

ঘুরে তাকাতেই আলীরাজ দাঁড়িয়ে মুখে সেই দুষ্টু হাসি নিয়ে।

"কি রে? মুখটা এমন কাঁচা করলার মতো কেন?"

মেহরাব গম্ভীর গলায় বলল,

"কিছু না।"

"ওহ্! কিছু না?"

আলী নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,

"তাহলে নিশ্চয়ই সাহাবাদ থেকে পায়রা এসে চিঠি দিয়ে গেছে!"

মেহরাব চুপ। আলী আবার বলল,

"না কি পায়রাটা মাঝপথে অন্য পায়রার প্রেমে পড়ে গেছে?"

মেহরাব এবার কপালে হাত ঠেকাল।

"মামা..."

"হুম?"

"একদিন কিন্তু আমি সত্যিই তোমাকে জঙ্গলে ফেলে রেখে চলে আসব।"

আলী হেসে উঠল।

"তার আগে আমাকে বলে যাস। আমি অন্তত একটা বালিশ আর কম্বল নিয়ে যাব।"

মেহরাব হাঁটতে শুরু করল। আলী পিছু নিল।

"আচ্ছা, সত্যি বল না। মন খারাপ?"

কোনো উত্তর নেই। আলী এবার একটু নরম গলায় বলল,

"চিঠি আসেনি?"

মেহরাব শুধু একবার তার দিকে তাকাল। উত্তর না দিলেও আলীরাজ সব বুঝে গেল। মেহরাব গম্ভীর মুখে বলল

“তুমি তো মহলেই ছিলে। সব জানতেই যখন, খোজ রাখোনি কেন চিঠিটার?”

সে মৃদু হেসে মেহরাবের কাঁধে হাত রাখল।

“রাখিনি ভাবছিস? এই জন্যই বলি, প্রেম বড় জ্বালার জিনিস।"

"আমি প্রেম করিনি।"

"নাহহ তুই প্রেম করিসনি। প্রেম তোকে করেছে।"

মেহরাব বিরক্ত মুখে সামনে তাকাল। আলী আবার হেসে বলল,

"এই মুখ নিয়ে মহলে বসে থাকলে হবে? চল।"

"কোথায়?"

"শিকারে।"

মেহরাব ভ্রু তুলল।

“কি ব্যাপার বলোতো। এমনিতে তো বললে ছ্যাত করে ওঠো”

"হ্যাঁ। তোর মন ভালো করার ওষুধ আমার জানা আছে।"

সে আঙুল তুলে বলল,

"সাহাবাদের জঙ্গল।"

মেহরাবের চোখে হালকা ঝিলিক ফুটল। সাহাবাদ এই নামটার সঙ্গেই যেন এখন অনেক স্মৃতি জড়িয়ে গেছে। জান্নাত, সোনালি চুলের সেই তরুণী আর নাসিরাবাদের মানচিত্র। সবকিছুই যেন সেই জঙ্গলের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে জড়িত। আলী খিলখিল করে হেসে বলল,

"চল, হরিণও দেখা হবে..."

একটু থেমে চোখ টিপে যোগ করল,

"আর যদি ভাগ্য খুব ভালো থাকে, তাহলে কারও সোনালি চুলও দেখা হয়ে যেতে পারে।"

মেহরাব এবার আর কিছু বলল না। শুধু ঠোঁটের কোণে অজান্তেই একটুখানি হাসি ফুটে উঠল।

দুপুর গড়িয়ে বিকেলের আলো নরম হতে শুরু করেছে। সাহাবাদের কাটাগিরির জঙ্গল বড়ই রহস্যময়। ঘন শাল, সেগুন আর গর্জন গাছের ফাঁক গলে সূর্যের আলো মাটিতে ছোপ ছোপ নকশা এঁকে দিয়েছে। দূরে পাহাড়ি ঝরনার কলকল শব্দ। পাখিদের ডাক। বাতাসে বুনো ফুলের গন্ধ। মেহরাব আর আলীরাজ ধীরে ধীরে ঘোড়া এগিয়ে নিয়ে জঙ্গলের আরও গভীরে ঢুকছে। আলী চারদিকে তাকিয়ে বলল,

"এই জঙ্গলটায় ঢুকলেই আমার বুক ধড়ফড় করে।"

মেহরাব হেসে বলল

“প্রস্তত থেকো মামা। আজ বোধহয় বড়সড় কোনো ডাকাত হামলা হবে”

মূলত আলীকে ভয় দেখাতেই কথা টা বলল মেহরাব। আলী তাতেই ফুস! মেহরাব ওর অবস্থা দেখে হেসে সামনে তাকাল। ঠিক তখনই ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো এক অপূর্ব শিংওয়ালা হরিণ। সতর্ক হয়ে গেল সে। নিঃশব্দে ধনুকে তীর সংযোজন করল। নিশানা স্থির।

পরের মুহূর্তেই সাঁই! করে তীর ছুটে গেল।

হরিণটি কয়েক কদম দৌড়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।

আলী উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল,

"বাহ! এই জন্যই তোকে সঙ্গে আনি।"

দু'জন ঘোড়া থেকে নেমে হরিণটির দিকে এগোতেই একটি দৃঢ় কণ্ঠ ভেসে এলো।

"থামুন!"

দু'জনেই একসঙ্গে ঘুরে দাঁড়াল। সামনের দৃশ্য দেখে মুহূর্তের জন্য যেন সময় থমকে গেল।

একটি কালো অশ্বের পাশে দাঁড়িয়ে আছে এক তরুণী। তার দীর্ঘ সোনালি চুল কোমর ছাড়িয়ে নেমে এসেছে। বনের আলো-ছায়ায় চুলগুলো যেন সোনার সুতোয় বোনা। চোখ দুটি বিরল সবুজাভ আভায় দীপ্ত। স্বচ্ছ, তীক্ষ্ণ,অদ্ভুত সুন্দর। গায়ে কালো পোশাক। কোমরে ঝোলানো তলোয়ার।

পিঠে ধনুক আর তূণীর। মেহরাব স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। এতদিন ধরে যাকে কেবল দূর থেকে দেখেছে, আজ সে সামনাসামনি দাঁড়িয়ে।

আলীরাজ ধীরে ধীরে ফিসফিস করে বলল,

"মেহু! এই সেই?"

মেহরাব উত্তর দিল না। তার চোখ তখনও তরুণীর ওপর স্থির। অন্যদিকে সাহারাও দু'জনকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছিল। তারপর মাটিতে পড়ে থাকা হরিণটির দিকে তাকিয়ে মুখ গম্ভীর হয়ে গেল। সে এগিয়ে এসে কড়া গলায় বলল,

"শুধু আনন্দের জন্য একটা নিরীহ প্রাণীকে মেরে ফেললেন?"

মেহরাব শান্ত স্বরে বলল,

"শিকার….."

কথা শেষ করার আগেই সাহারা বলে উঠল,

"শিকার মানেই কি অকারণে হত্যা?"

তার চোখে স্পষ্ট ক্ষোভ।

"এরা নিজেদের মতো বনে বাঁচছিল। আপনাদের কী ক্ষতি করেছিল?"

আলীরাজ আস্তে করে বলল,

"এই মেয়েটার সাহস আছে কিন্তু!"

সাহারা শুনেও পাত্তা দিল না। সে চারদিকে তাকিয়ে একটি লম্বা গাছের ছাল থেকে তৈরি মোটা দড়ির মতো বোনা বাঁধন তুলে নিল। মেহরাব বিস্মিত হয়ে দেখল।

"এটা দিয়ে কী করবেন?"

সাহারা দৃঢ় গলায় বলল,

"শাস্তি।"

আলীরাজ চোখ বড় বড় করে তাকাল।

"শাস্তি?"

মুহূর্তের মধ্যে সাহারা মেহরাবকে একটি বড় গাছের পাশে দাঁড়াতে ইশারা করল। আশ্চর্যের বিষয় মেহরাব কোনো বাধাই দিল না। শান্ত মুখে দাঁড়িয়ে রইল। সাহারা অত্যন্ত দক্ষ হাতে গাছের বাকল দিয়ে তৈরি শক্ত বাঁধন তার দুই হাতের ওপর দিয়ে গাছের কাণ্ডে বেঁধে দিল। কাজটা এমন দ্রুত করল, বোঝাই যায় আগে বহুবার এ ধরনের গিঁট বেঁধেছে। মেহরাব শুধু মুচকি হেসে তার কাজ দেখা ছাড়া আর কিছুই করল না।

তার মুখে বিরক্তির লেশ মাত্র নেই, কেবলই কৌতূহল। এই ছোট্ট মেয়েটা জানেই না, চাইলেই যুবরাজ এক ঝটকায় এই বাঁধন ছিঁড়ে ফেলতে পারে। এমনকি তাকে আঘাত না করেই নিজেকে মুক্ত করতে পারে। এই পুঁচকে টাকে ছুড়ে মারলে কয় মাইল দূরে পড়বে তার ঠিক নাই। কিন্তু সে তা করল না।

কারণ এই প্রথম সে রহস্যময়ী তরুণীটিকে এত কাছে থেকে দেখছে। আলীরাজ তো হতবাক।

সে একবার সাহারার দিকে, একবার মেহরাবের দিকে তাকিয়ে বলল,

"এই মেহু? তুই কিছু বলছিস না কেন?"

মেহরাব হেসেই বলল,

"বলতে দাও ওকে।"

আলীরাজ বিড়বিড় করল,

"এটা কি আমার সেই রগচটা ভাগ্নে? নাকি এই জঙ্গলে এসে মানুষ বদলে যায়? ইয়া মাবুদ, আমাকে বাচিয়ে নাও”

সাহারা তখনও জানে না যাকে সে বাধছে তিনি সাধারণ কোনো শিকারি নন। তিনি মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী সাম্রাজ্যের সম্রাটপুত্র। আর মেহরাবও নিজের পরিচয় গোপন রেখেই নীরবে সেই দৃশ্য উপভোগ করে যাচ্ছে।

সাহারার চোখেমুখে বিজয়ের হাসি। অনেক দিন থেকে দুটোকে শায়েস্তা করার শখ। আজ তা পূরণ করতে পারলো। এত সহজে পারবে তা ভাবতেও পারেনি। তারপর বলল,

"আজ সারাদিন এখানেই দাঁড়িয়ে ভাববেন, প্রাণ নেওয়া কত সহজ আর প্রাণের মূল্য কত বড়।"

মেহরাবের ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি। একটিও প্রতিবাদ করল না। সাহারা ভেবেই নিল, লোকটা নিশ্চয়ই ভয় পেয়েছে। সে নিজের কালো অশ্বের পিঠে লাফিয়ে উঠে লাগাম টানল। দীর্ঘ সোনালি চুল বাতাসে উড়িয়ে মুহূর্তেই গাছের আড়ালে মিলিয়ে গেল। মেহরাব অপলক তাকিয়ে রইল তার চলে যাওয়ার দিকে। অনেকক্ষণ। তারপর ধীরে ধীরে নিজের মনেই বলল,

"সাদা বনবিড়াল..."

চোখে চিকচিক করে উঠল শিকারির পরিচিত দীপ্তি।

"তোকে একদিন শায়েস্তা করতেই হবে।"

পাশেই দাঁড়িয়ে আলীরাজ হতাশ মুখে বলল,

"আমার তো মনে হচ্ছে, তোকে ও নয় , তুই-ই ওর হাতে শায়েস্তা হচ্ছিস।"

মেহরাব হেসে ফেলল। তারপর খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে গাছের বাকলের বাঁধনটায় সামান্য চাপ দিল। ছিঁড়ে গেল। মোটা বাকলের বোনা দড়ি যেন শুকনো লতার মতো ছিন্ন হয়ে মাটিতে পড়ল।

আলীরাজ চোখ কপালে তুলে বলল,

“তুই তো আগেই খুলতে পারতিস!"

"পারতাম।"

"তাহলে দাঁড়িয়ে ছিলি কেন?"

মেহরাব ঘোড়ার লাগাম হাতে নিয়ে বলল,

"ইচ্ছে হয়েছে।"

“ইচ্ছে হয়েছে মানে? মামা বাড়ি নাকি?”

মেহরাব ওর দিকে তাকাতেই মুখ লুকালো। নিজের কথায় নিজেই ফেঁসে গেছে। সে ই তো মেহরাব এর মামা। মেহরাব বলল

"নাহহহ দেখতে ভালোই লাগছিল। দেখছিলাম ওর শক্তি কত খানি”

আলী দুই হাত তুলে আকাশের দিকে তাকাল।

"ইয়া রব! এই ছেলেটা আর বাঁচল না। তুমি আমায় ক্ষমা করে দিও মালিক। আমি আমার ভাগ্নে কে বাঁচাতে পারলাম না”

মেহরাব শুধু হেসে ঘোড়ায় চড়ল।

এদিকে সাহারা বেশ নিশ্চিন্ত মনেই মহলে ফিরে এসেছে। পেছনের ছোট ফটক দিয়ে ভেতরে ঢুকে নিজের ঘরে গিয়ে পোশাক বদলে নিল। মুখে বিজয়ী হাসি। মনে মনে বলল,

"আজ ওই নিষ্ঠুর শিকারির শিক্ষা হয়ে গেছে।"

সে একবারও বুঝতে পারেনি, কাকে বেঁধে এসেছে।

বিকেলের কিছু পরেই পুরো সাহাবাদ প্রাসাদ কেঁপে উঠল সুনেহেরার বজ্রকণ্ঠে।

"সবাই নিচে এসো! এক্ষুনি!"

সুনেহেরার এমন ডাক সচরাচর শোনা যায় না।

এক এক করে নিচে নেমে এলেন বাইজিদ শাহ, মেহেরুন্নেসা, জান্নাত, শাখা, সাহারা এবং মহলের আরও অনেকে।

প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকজন প্রহরী। তাদের মুখে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট। প্রধান প্রহরী মাথা নিচু করে বলল,

"বেগম সাহেবা... বড় সর্বনাশ হয়ে গেছে।"

সুনেহেরা কড়া গলায় বললেন,

"কি হয়েছে সবটা বলো সবার সামনে”

প্রহরী ইতস্তত করে বলল,

"আজ জঙ্গলে ছোট শাহজাদি..."

সাহারা নির্বিকার।

"আমি কী করেছি?"

প্রহরী ঢোক গিলে বলল,

"আপনি... সম্রাটপুত্রকে... গাছের সঙ্গে বেঁধে রেখে এসেছেন।"

মুহূর্তেই চারপাশ নিস্তব্ধ। সাহারার ঠোঁটের হাসি মিলিয়ে গেল। জান্নাতের হাত থেকে পানির পেয়ালা পড়ে ভেঙে গেল। শাখা হতবাক হয়ে বোনের দিকে তাকিয়ে রইল। মেহেরুন্নেসার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। বাইজিদ যেন পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। অবিশ্বাসের স্বরে বললেন,

"কি বললে?"

প্রহরী কাঁপা কাঁপা গলায় উত্তর দিল,

"জি... জঙ্গলে থাকা কয়েকজন কাঠুরে সব দেখেছে। পরে তারা আমাদের জানিয়েছে। যাকে ছোট শাহজাদি শিকারি ভেবে বেঁধেছিলেন... তিনি আমিরাবাদের যুবরাজ মেহরাব ওয়াসেম।"

সুনেহেরা নিজের কপালে হাত চাপা দিলেন।

"ইয়া আল্লাহ..."

মেহেরুন্নেসা ধপ করে চৌকির ওপর বসে পড়লেন। জান্নাতের বুক ধড়ফড় করছে। শাখা ফিসফিস করে বলল,

"এবার... বুঝি রাজ্যটাই গেল!"

সাহারা স্থির দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখের সমস্ত রঙ উধাও। সে বিড়বিড় করে বলল,

"অসম্ভব! ওই শিকারিই সম্রাটপুত্র?"

কিন্তু তার চেয়েও আশ্চর্যের খবর তখনও কেউ জানত না। প্রহরীদের ধারণার বিপরীতে, মেহরাব সাহাবাদ প্রাসাদে ফিরে এই ঘটনার একটি কথাও বলেনি। কোনো অভিযোগ, কোনো অপমানের কথা বলেনি। ইচ্ছে করেই বিষয়টি গোপন রেখেছে। আমিরাবাদে ফিরে গিয়েও কাউকে কিছু জানায়নি। কারণ সে অপেক্ষায় আছে। তার দৃঢ় বিশ্বাস সেই সাদা বনবিড়াল আবারও একদিন জঙ্গলে আসবে। আর সেদিন শিকারি আর শিকার, কার অবস্থান বদলাবে, সেটাই দেখার বিষয়। মেহরাব মোচরানো গোফ মুচড়ে মুচড়ে আয়নায় দেখে বলল

“কখনও বন বিড়াল শিকার করা হয়নি|

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে 8 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন