রাত অনেক গভীর। সাহাবাদ মহল নিরব। এক এক করে সব কক্ষের আলো নিভে গেছে। প্রহরীরা নিজেদের নির্ধারিত স্থানে টহল দিচ্ছে। দিনের ঘটনায় এখনও মহলের পরিবেশ ভারী।
সুনেহেরা কয়েকবার সাহারাকে সাবধান করে দিয়েছেন। মেহেরুন্নেসাও কঠোর হয়ে বলে গেছে
আর কোনো বাউণ্ডুলেপনা যাতে না করে। কিন্তু সাহারা কি আর সাহারা না হলে চলে?
সন্ধ্যার পর থেকেই তার মাথায় এক অদ্ভুত চিন্তা ঘুরছে। কয়েকদিন আগে গভীর রাতে জঙ্গল থেকে ফেরার সময় সে নদীর ওপারে অদ্ভুত আলো দেখেছিল। কী এক অদ্ভুত রকম আলো। ওখানে কি আছে তা নিয়ে তার ভীষণ কৌতূহল। কেউ কি বসবাস করছে সেখানে? কিন্তু সেই দিকটায় তো কোনো জনপদ নেই। তাহলে আলো কার? প্রশ্নটা তখন থেকেই তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। আর আজ সে উত্তর না জেনে ঘুমাবে না।
রাত মধ্য প্রহর পেরোতেই সাহারা বেরোনোর পথ খুঁজতে শুরু করল। চাদর গায়ে জড়িয়ে কোমরে ছোট তলোয়ার গুঁজল। পিঠে ধনুক ঝুলিয়ে নিল।
তারপর নিজের কক্ষে থাকা জানালার পথ ধরে বেরিয়ে গেল। পেছনের দেয়াল টপকাতে তার বেশি সময় লাগল না। মুহূর্তের মধ্যে সে প্রাসাদের সীমানার বাইরে। জ্যোৎস্না আজ খুব একটা নেই।
আকাশ মেঘলা। ফলে চারপাশে অদ্ভুত অন্ধকার।
শুধু দূরে দূরে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। আর মাঝে মাঝে রাতচরা পাখির আওয়াজ। সাহারা দ্রুত পা চালাল। তার গন্তব্য কাটাগিরির জঙ্গলের পূর্ব প্রান্ত। যেখানে নদী বয়ে গেছে। যেখানে সে সেই রহস্যময় আলো দেখেছিল।
জঙ্গলের ভেতর যত এগোচ্ছে, পরিবেশ ততই ঘন হয়ে উঠছে। গাছের ছায়া যেন মাটির ওপর লম্বা দানবের মতো পড়েছে। বাতাসেও কেমন একটা শীতলতা। তবুও সাহারার চোখে ভয় নেই। আরও কিছু দূর গেলে তবে নদী।
হঠাৎ পিছন থেকে যেন একটা ছায়া নড়ল। সাহারা থমকে দাঁড়াল। চারদিকে তাকাল।
কিছুই নেই। আবার হাঁটতে শুরু করল। আচমকা একটা শক্ত হাত পিছন থেকে এসে মুহূর্তে তার মুখ চেপে ধরল। সাহারা তলোয়ারের দিকে হাত বাড়ানোর আগেই আরেকটি বাহু তার দুই হাত আটকে ফেলল। সবকিছু এত দ্রুত ঘটল যে প্রতিরোধের সুযোগই পেল না। তার বুক ধকধক করতে লাগল। লাথি মারল পায়ের দিকটায়।
ছাড়ানোর চেষ্টা করল। কিন্তু লোকটার শক্তির সঙ্গে পেরে ওঠা অসম্ভব। সাহারার মুখ কাপড়ে বাঁধা। কণ্ঠ থেকে অস্পষ্ট শব্দ বেরোল। অন্ধকারে লোকটাকে দেখা যাচ্ছে না। শুধু বুঝতে পারছে সে অসাধারণ শক্তিশালী। কয়েক মুহূর্ত পরে লোকটা তাকে একটি বিশাল গাছের কাণ্ডের পাশে দাঁড় করাল।
তারপর শান্ত গলায় বলল,
"এত রাতে একা একা জঙ্গলে ঘোরা একদম ভালো কথা নয় শাহজাদী।"
কণ্ঠস্বরটা শুনে সাহারা স্থির হয়ে গেল। কোথায় যেন শুনেছে। খুব পরিচিত লাগছে কন্ঠটা। তারপর লোকটা মুখের কাপড়টা সরিয়ে দিল। চাঁদের আলো পড়ল তার মুখে। সাহারার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
"আপনি!"
সামনে দাঁড়িয়ে আছে মেহরাব। তার তীক্ষ্ণ কালো চোখ দুটো সরাসরি সাহারার দিকে নিবদ্ধ।
ঠোঁটের কোণে পরিচিত মুচকি হাসি। আজ মুখ ঢাকা নেই। মেহরাব দুহাত বুকের সামনে ভাঁজ করে দাঁড়াল।
"অবশেষে ধরা পড়লে, সাদা বনবিড়াল।"
“এই এই! আপনি সেই শিকারী টা না? আপনি নাকি সম্রাট পুত্র। তা যখন বাঁধছিলাম তখন বললেন না কেন? বাধাও তো দিলেন না। এখন আবার আমায় বাঁধছেন কেন?”
লোকটা বুকে হাত ভাজ করে আরেকটা গাছে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে শুনলো সাহারার কথা। চাঁদের আলোয় মেয়েটার উন্মুক্ত সোনালী চুল গুলো ঝলমল করছে। সাহারা তাকে তাকিয়ে থাকতে দেখে অবাক হয়। সাহারার থেকে পুরুষটা কম করে হলেও এক হাত লম্বা। জোৎস্নার আলোয় যতদূর দেখা যায় বেশ শক্তপোক্ত চওড়া লোকটা। পুরো শরীর কালো পোষাকে আবৃত। মুখ কপালও টুপির মত কিছু একটায় ঢাকা ছিল। কেবল চোখ জোড়া দেখা যায়। সাহারা হাত মোচড়ামুচড়ি করে
“কি হলো খুলুন বাঁধন। আপনি এভাবে একজন নিরপরাধ কে বাঁধতে পারেন না”
“ওহহহ আচ্ছা? আর আমি বুঝি খুব অপরাধ করেছিলাম?”
লোকটার গম্ভীর রাশভারি কন্ঠ শুনে একটু ভয় পেল সাহারা। তবুও মুখের ওপর বলল
“আপনি হরিণ শিকার করেছেন। অবশ্যই অপরাধ করেছেন। সীমানার ওখানে লেখা দেখেন নি? নাকি পড়তে পারেন না?”
লোকটা অল্প এগিয়ে এলো। সাহারা এবার সত্যিই ভয় পায়। হাজার হোক সে একজন নারী। লোকটা অল্প দূরত্ব রেখে দাড়িয়ে বলল
“এই জঙ্গল টা আমার বাবার অধীন। আমি এখানে শিকার করার সম্পূর্ণ অধিকার রাখি”
“আ…আমি কোনো ক্ষমতা অধীন নিয়ে কথা বলছি না। আমি এই জঙ্গলের পশু পাখিদের ভালোবাসি। কেউ তাদের হত্যা করলে আমার কষ্ট হয়”
লোকটা ভ্রু উঁচিয়ে বলল
“খুব তো নিজেকে বীরকন্যা দাবি করো। কেউ নাকি তোমার চেয়ে চতুরতা, শক্তি আর সংঘর্ষে পারদর্শী নয়। আমার তো এক মূহুর্ত লাগলো তোমায় বন্দি করতে।”
সাহারা কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল
“এতদিন তো তাই জানতাম। আজকের পর থেকে আর বলব না। বলব আপনিই সবচেয়ে বেশি পারদর্শী। তাও ছেড়ে দিন। এতক্ষণে মহলে আমায় খোঁজাখুজি শুরু হয়ে গেছে”
লোকটা চোখ সরু করে তাকিয়ে আছে সাহারার দিকে। সাহারা এবার সত্যিই কেঁদে ফেলবে
“কি হলো? ছেড়ে দিন না”
“আমি যতদূর জানি জমিদার বাইজিদ শাহ্ এদেশীয়। তবে কি তোমার মা বিদেশিনী?”
সাহারা লোকটার উদ্ভট কথায় বেশ বিরক্ত হয়
“আমার মা কেন বিদেশিনী হতে যাবে? আমার মা এই অঞ্চলের ই।”
মেহরাব তাকে আগাগোড়া দেখে বলল
“তাহলে এদেশি গাছ থেকে ওমন বিদেশি ফল কি করে তৈরি হলো? চোখ, চুল, গায়ের রং। কোনো কিছুই তো এই অঞ্চলের সাথে মিলছে না। তুমি মানুষ তো আদৌ? নাকী পরি টরি বাধলাম”
সাহারার গায়ে প্রচন্ড রাগ হয় লোকটার আজাইরা কথায়
“ আপনি খুলে দিন আমার হাত। একবার ছাড়া পাই তারপর আপনার মজা…”
“হুমম বলো বলো, কি মজা দেখাবে? আমার জিম্মি তে থেকে আমাকেই হুমকি দেওয়া হচ্ছে”
সাহারার রাগ হলো নিজের বোকামির ওপর। বোকামি কথাটা মাথা আসতেই এক বুদ্ধি এলো। লোকটাকে বোকা বানাতে হবে। কিছু বলতে যাবে এমন সময় পুরুষ টি আরো একটু এগিয়ে এলো
“তখন তোমায় বাধা দিই নি কারণ আমি দেখছিলাম তোমার সাহস আর শক্তি কতটুকু। আমার দেখা হয়ে গেছে। এবার তোমার খবর আছে শাহজাদি”
সাহারার চোখ জোড়া চিকচিক করে ওঠে পানিতে। নিজেকে বড্ড অসহায় লাগতে শুরু করে। এই ঘণ জঙ্গলে কে বাঁচাবে তাকে? মেহরাব ভারিক্কি গলায় বলল
“ছাড়তে পারি এক শর্তে”
বহুদিনের অধরা রহস্যময়ী আজ তার সামনে দাঁড়িয়ে। আর আজ অন্তত তাকে চোখের আড়াল করার সুযোগ সহজে দেবে না সে।
আর সাহারার মুখে বিরক্তি, অস্বস্তি আর উদ্বেগের মিশ্র ছাপ।
"কি চান আপনি?"
মেহরাব উত্তর না দিয়ে পাশের একটি গাছের দিকে তাকাল। তারপর বলল
"তুমি আমাকে গাছের সঙ্গে বেঁধে রেখে গিয়েছিলে।"
সাহারা সঙ্গে সঙ্গে চোখ নামিয়ে ফেলল। এখন বিষয়টা মনে পড়তেই অস্বস্তি লাগছে।
"আমি জানতাম না আপনি সম্রাটপুত্র।"
"ওহ্? তাহলে যদি সাধারণ শিকারি হতাম, বেঁধে রাখা ঠিক ছিল?"
সাহারা এবার চুপ করে গেল। মেহরাব গাছের বাকল দিয়ে বানানো পুরোনো এক বাঁধন তুলে নিয়ে মজা করে বলল
"শাস্তি হিসেবে কি একই ব্যবস্থা করা উচিত?"
সাহারা চোখ বড় বড় করে তাকাল।
"না!"
মেহরাব হেসে ফেলল।
"ভয় পেয়েছ?"
"উহুউউউ, আমি ভয় পাই না।"
"অবশ্যই না। তুমি তো আবার রাতের অন্ধকারে একা জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানো মানুষ।"
কথাটা শুনে সাহারা ভ্রু কুঁচকাল। তারপর বলল
"আমি সত্যিই দুঃখিত। সেদিন যা করেছি..."
মেহরাব কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর মুচকি হেসে বলল
"ক্ষমা চাওয়া গ্রহণ করা হলো।"
সাহারা যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। কিন্তু সেই স্বস্তি বেশিক্ষণ টিকল না। মেহরাব চারপাশে তাকিয়ে বলল
"এখন বলো, এত রাতে এখানে কেন এসেছ?"
সাহারা নদীর ওপারের ক্ষীণ আলোগুলোর দিকে ইশারা করল।
"ওগুলো দেখতে।"
মেহরাবও তাকাল। দূরে সত্যিই কিছু আলো জ্বলছে। বিষয়টা তার কাছেও অস্বাভাবিক লাগল। কিন্তু রাত গভীর হয়ে গেছে। জঙ্গলও নিরাপদ নয়। সে গম্ভীর হয়ে বলল,
"উহুম আজ নয়।"
মেহরাব মাথা নেড়ে নিজের ঘোড়ার দিকে এগিয়ে গেল। তারপর বলল,
"চলো। আমি তোমাকে নিরাপদে পৌঁছে দিচ্ছি।"
"আমার দরকার নেই।"
"তোমার দরকার আছে কি নেই সেটা পরে দেখা যাবে। এখন তোমার পরিবার অর্ধেক পাগল হয়ে আছে।"
সাহারা থমকে গেল।
"কি?"
"তোমার সম্রাটপুত্র-বন্দি করার কীর্তি ইতোমধ্যে পুরো মহলে পৌঁছে গেছে।"
সাহারা মুখ ঢেকে ফেলল।
"হায় আল্লাহ...আপনি তো খুব খারাপ মানুষ। ছিঃ বাড়ির লোক কি ভাববে বলেন তো”
মেহরাব হাসল।
"চলো, বনবিড়াল। আজ আর তোমার কোনো রহস্যের পেছনে দৌড়ানো হবে না।"
কিছুক্ষণ অনিচ্ছা দেখালেও শেষ পর্যন্ত সাহারা ঘোড়ায় উঠে বসল। মেহরাব নিজের ঘোড়ার লাগাম ধরল। দুজন জঙ্গলের পথ ধরে ফিরে চলল। দূরে নদীর ওপারের আলো অমীমাংসিত সাহারার কাছে। মেহরাবের মনে দৃঢ় হলো এক নতুন সিদ্ধান্ত, নাসিরাবাদের রহস্য এবং নদীর ওপারের ওই আলোগুলোর উৎস একদিন তাকে খুঁজে বের করতেই হবে। সাহারা টা বাজলো ঝামেলা। এটাকে আটকাতে হবে।
মেহরাব আর সাহারা ঘোড়া নিয়ে কাটাগিরির সরু পথ ধরে এগিয়ে চলেছে। সাহারা বারবার পিছনে তাকাচ্ছে। তার মোটেও ইচ্ছে নেই এভাবে ধরা পড়ে ফিরে যাওয়ার। মেহরাব সেটা বুঝেও কিছু বলছে না। শুধু সতর্ক দৃষ্টিতে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করছে। কিছুক্ষন যেতেই সাহারা খেয়াল করলো তারা মোটেও সাহাবাদ প্রাসাদের দিকে যাচ্ছে না। কোনো এক অচেনা রাস্তা ধরে ছুটে চলেছে মেহরাব এর অশ্ব। সাহারা গাইগুই করে ওঠে
“এই এই আপনি কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমায়। নষ্ট ব্যাটাছেলে, বজ্জাত লোক। নামান বলছি ঘোড়া থেকে”
আচমকা অন্ধকার চিরে একটা তীর ছুটে এলো তাদের দিকে। মেহরাব সাহারাকে সহ পাশে হেলে গেল। মুহূর্তেই মেহরাবের শিকারি প্রবৃত্তি জেগে উঠল। সে ঘোড়া ঘুরিয়ে তীর এড়াল। একটি তীর তার কাঁধ ছুঁয়ে চলে গেল।
"নিচু হও!"
চিৎকার করে উঠল সে। সাহারা ঘোড়ার গলায় ঝুঁকে পড়ল। পরক্ষণেই মেহরাব নিজের ধনুক তুলে নিল। একটার পর একটা তীর ছুটে গেল অন্ধকারের দিকে। কিন্তু আক্রমণকারীকে দেখা যাচ্ছে না। গাছের আড়াল থেকে অত্যন্ত দক্ষ হাতে তীর ছোঁড়া হচ্ছে। মেহরাবের চোখ সরু হয়ে এলো। এ কোনো সাধারণ দস্যু নয়। এই সুযোগেই সাহারা সিদ্ধান্ত নিল। এখন পালানো না হলে আর কখনোই নয়। সে ঘোড়া থেকে নেমে বিপরীত দিকে ছুটে দিল। মেহরাব সেটা চোখের কোণ দিয়ে দেখেই বিরক্ত হলো।
"এই মেয়ে!"
আরেকটা তীর প্রতিহত করে সে নিজের ঘোড়া ছুটিয়ে দিল সাহারার পিছু। কিছু দূর গিয়ে সাহারার চাদর ধরে ফেলল
"ছাড়ুন! আশ্চর্য আমায় কেন ধরছেন? ওই দস্যুর হাতে মারবেন নাকি আমায়?
সাহারা আচমকা কোমর থেকে ছোট তলোয়ার বের করল। চাঁদের আলোয় ঝলসে উঠল ফলক।
মেহরাব ভ্রু তুলল
"আমার সঙ্গেই যুদ্ধ করবে?"
মুহূর্তেই সাহারা আক্রমণ করে বসলো ক্ষিপ্র অবিশ্বাস্য গতিতে। মেহরাব সহজেই প্রতিহত করে ফেলল তাকে। তবুও তার চোখে বিস্ময় ফুটে উঠল। মেয়েটা সত্যিই প্রশিক্ষিত। বন বিড়াল কেবল জেদি ই নয় দক্ষও। কয়েক মুহূর্ত ধরে তলোয়ারের ঝনঝন শব্দে মুখর হয়ে উঠল জঙ্গল। শেষমেশ মেহরাব একটা ফাঁক পেয়ে সাহারার অস্ত্র সরিয়ে দিল। তলোয়ারটা দূরে পড়ে গেল। তারপর এক হাতেই সাহারার কব্জি আটকে ফেলল।
"শেষ? পানি খাবেন? আহা হাপিয়ে গেছে মেয়েটা"
সাহারা রাগে ফুঁসছে। মেহরাবের মুখে দুষ্টু হাসি। সাহারা দাঁত কিড়মিড় করল। কিন্তু এবার আর মুক্ত হতে পারল না। দু হাত পিছনে বেঁধে ঘোড়ায় চড়ে রওনা হলো সাহারা কে নিয়ে।
*****
জঙ্গলের অন্য পাশে ঘন অন্ধকারের মধ্যে কালো পোশাক পরা একজন দ্রুত বাহিরের দিকে যাচ্ছে। তার হাতে ধনুক। পিঠে তূণীর। মুখ কাপড়ে ঢাকা।
সে আর কেউ নয়, সাহাবাদ এর দুর্ধর্ষ যোদ্ধা শাখা নেওয়াজ। দূর থেকে সবকিছু দেখে বোনকে উদ্ধার করতে এসেছিল। কিন্তু মেহরাবকে সে যতটা সহজ ভেবেছিল, ততটা নয়। তার প্রতিটি তীর লক্ষ্যভেদ করলেও লোকটা যেন আগেই সব বুঝে ফেলছিল।
অবশেষে ব্যর্থ হয়ে তাকে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হলো। সামনের পথ আটকে দাঁড়াল এক অশ্বারোহী। কালো ঘোড়া। লম্বা দেহ।নমাথা থেকে পা পর্যন্ত কালো পোশাকে আবৃত। শুধু জোড়া চোখ দেখা যাচ্ছে। লোকটাএকদম শান্ত। শাখা সঙ্গে সঙ্গে ধনুক তুলল।
"কে? কে আপনি?”
কোনো উত্তর এলো না। অশ্বারোহী স্থির দাঁড়িয়ে রইল। শাখার আঙুল ধনুকের তারে শক্ত হয়ে উঠল। চাঁদের আলোয় অদ্ভুতভাবে ঝলসে উঠল তাহার চোখ জোড়া। শাখার বুকের ভেতর কিছু টা কাঁপন জাগল। কেন জানি মনে হলোবএই মানুষটিকে সে আগে কোথাও দেখেছে অথবা তার সম্পর্কে কোনো পুরোনো গল্প শুনেছে। চেহারার মিল গুলো কেমন নজরে আসে শাখার।
শাখা এখনও ধনুক তাক করে দাঁড়িয়ে আছে। সামনের অশ্বারোহী ও নিশ্চুপ। শুধু দু'জোড়া চোখ একে অপরকে পর্যবেক্ষণ করছে। কয়েক মুহূর্তের নীরবতার পর অশ্বারোহী নিজেই বলল,
"অস্ত্র নামাতে পারেন। আমি শত্রু নই।"
কণ্ঠস্বরটা গভীর এবং আত্মবিশ্বাসী। শাখা ধনুক পুরো নামাল না। শুধু বলল,
"রাতের অন্ধকারে মুখ ঢেকে চলাফেরা করা মানুষকে সহজে বিশ্বাস করা যায় না।"
অশ্বারোহী হালকা হেসে উঠল।
"তাহলে আমরা দুজনই একই সমস্যায় আছি।"
শাখা একটু থমকে গেল। কথাটা মন্দ বলেনি লোকটা। কারণ তার নিজের মুখও তো ঢাকা।
লোকটি আবার বলল,
"আমি পথ হারিয়েছি।"
"এই জঙ্গলে?"
"হ্যাঁ।"
"এই রাতে?"
"দুর্ভাগ্য কখন সময় দেখে আসে?"
শাখার ঠোঁটের কোণে অল্প হাসি ফুটল। লোকটার কথাবার্তায় একটা অদ্ভুত ভদ্রতা আছে। আবার একই সঙ্গে সতর্কতাও।
"আপনি কে আসলে?"
লোকটি সামান্য মাথা নত করল।
"আমি একজন বণিক।"
মিথ্যাটা এমন স্বাভাবিকভাবে বলল যে সন্দেহ করার উপায় রইল না। আসলে সে আর কেউ নয়। ডাকাত সর্দার ফাইয়াজ আবরার। কিন্তু মুখ ঢাকা থাকায় কেউ কাউকে চিনতে পারছে না।
ফাইয়াজও জানে না তার সামনে দাঁড়ানো মেয়েটি সাহাবাদের শাহজাদী। আর শাখাও জানে না সে যার সঙ্গে কথা বলছে, সে-ই বহুদিন ধরে সাহাবাদ অঞ্চলে আতঙ্ক ছড়ানো ডাকাতদলের নেতা।
ফাইয়াজ বলল,
"নগরে যাওয়ার পথটা জানেন?"
"হ্যা বেশ ভালো করেই জানি।"
"আমাকে কি একটু সাহায্য করবেন?"
শাখা ভ্রু তুলল।
"একজন অচেনা মানুষকে?"
"আজ আপনি না সাহায্য করলে হয়তো ভোর পর্যন্ত এই জঙ্গলেই ঘুরতে হবে।"
শাখা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল,
"আচ্ছা। আমি ওই দিকেই যাচ্ছি।"
ফাইয়াজ মৃদু হাসল।
"তাহলে আজ আমার ভাগ্য ভালো।"
দুজন পাশাপাশি ঘোড়া চালাতে শুরু করল। জঙ্গলের সরু পথ ধরে এগিয়ে চলল তারা।
কিছুক্ষণ নীরবতার পর ফাইয়াজ বলল,
"আপনি এই জঙ্গল ভালো চেনেন মনে হচ্ছে।"
"জি চিনি।"
"তা রাতের বেলায় একা একা ঘুরতে ভয় লাগে না?"
"হা হা ভয় কেন লাগবে?"
“এখানে কত হিংস্র পশু আছে।"
“হিংস্র পশুর চেয়ে মানুষ বেশি ভয়ংকর।"
উত্তর শুনে ফাইয়াজ হেসে ফেলল।
"এটা ঠিক বলেছেন।"
শাখা এবার পাল্টা জিজ্ঞেস করল,
"আপনি কোন রাজ্য থেকে এসেছেন?"
"অনেক দূরের পথ।"
"উত্তরটা বেশ কৌশলী।"
"ব্যবসা করতে গেলে কৌশলী হতেই হয়।"
শাখা আবার হাসল। লোকটার কথা বলার ধরন অদ্ভুত সুন্দর। না বেশি বাড়াবাড়ি না বেশি গম্ভীর।
কেমন যেন সহজ। একসময় জঙ্গল একটু ফাঁকা হলো। বোধহয় শেষের দিকে এসে গেছে। ফাইয়াজ আড়চোখে তাকাল শাখার দিকে।
মুখ ঢাকা। তবু চোখ দুটো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
অস্বাভাবিক সুন্দর। অন্যদিকে শাখাও লক্ষ্য করছিল লোকটাকে। লম্বা দেহ, প্রশস্ত কাঁধ ঘোড়া নিয়ন্ত্রণের ভঙ্গি দেখে বোঝা যায় অভিজ্ঞ অশ্বারোহী। সাধারণ বণিকদের মতো মনে হচ্ছে না। মাঝরাতে একটা মেয়ের সান্নিধ্যেও তার মধ্যে কোনো অশোভন আচরণ নেই। বেশ ভদ্র।
কিছু দূর যাওয়ার পর ফাইয়াজ বলল,
"আপনার নামটা জানতে পারি?"
শাখা সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক হলো। হুটহাট কাওকে পরিচয় দেওয়া ঠিক না।
"নাম জানলে কি পথ চিনতে সুবিধা হবে?"
ফাইয়াজ হেসে বলল,
"না। তবে যে মানুষ সাহায্য করে, তার নাম জানার ইচ্ছে হয়।"
শাখা কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
"আমাকে শাখা বলেই ডাকতে পারেন।"
আসল পরিচয় গোপনই রাখল। ফাইয়াজও নিজের পরিচয় দিল না।
"আমি ফায়ে..."
মুহূর্তেই থেমে গেল। তারপর কথা ঘুরিয়ে বলল,
"ফারিস।"
মিথ্যা নাম। উচ্চারণে কোনো দ্বিধা নেই দেখে শাখা কিছু বুঝল না। বিশ্বাস করলো।
নগরের আলো দূর থেকে দেখা যেতে শুরু করেছে। সাহাবাদের প্রাচীর আর প্রহরী টাওয়ারও চোখে পড়ছে। ফাইয়াজ ধীরে ঘোড়ার গতি কমাল। আজ তার উদ্দেশ্য পূরণ হয়েছে। সে জঙ্গল এর মাঝখান দিয়ে নগরের প্রবেশপথ দেখে ফেলেছে। আর তার চেয়েও অদ্ভুত ব্যাপার এই রহস্যময়ী তরুণীর সঙ্গে কথা বলে তার বেশ ভালোই লেগেছে। শাখারও একই রকম অনুভূতি হচ্ছে। অচেনা একজন মানুষ তবুও কথাগুলো অদ্ভুতভাবে স্বাভাবিক লেগেছে। বিদায়ের আগে ফাইয়াজ বলল,
"ভালো থাকবেন। হয়তো আর দেখা হবে না।"
শাখা উত্তর দিল,
"পৃথিবী টা গোল। হয়তো হতেও পারে"
দুজনেই বিপরীত দিকে ঘোড়া ঘুরিয়ে দিল। আজকের এই সাধারণ পরিচয় ভবিষ্যতে তাদের জীবনের গতিপথ বড়ভাবে বদলে দিতে পারে। এমনকি তারা এটাও জানে না তাদের একজন সাহাবাদের শাহজাদী। আর অন্যজন সেই ডাকাত সর্দার, যার খোঁজে পুরো রাজ্য পাগল হয়ে ঘুরছে।
*****
রাত শেষ হয়ে ভোরের আলো ফুটতে এখনও খানিকটা বাকি। আমিরাবাদের বিশাল প্রাসাদ তখন প্রায় নিস্তব্ধ। প্রহরীরা অলস চোখে টহল দিচ্ছে। সেই সময় পেছনের প্রবেশপথ দিয়ে ঘোড়া নিয়ে প্রবেশ করল মেহরাব। তার কালো অশ্ব ক্লান্ত হলেও এখনও তেজস্বী। আর ঘোড়ার পিঠে বসে আছে ভীষণ বিরক্ত মুখের সাহারা। সারা পথ জুড়ে সে যতবার প্রতিবাদ করেছে, মেহরাব ততবার নির্বিকার থেকেছে। শেষ পর্যন্ত কথা বলা বন্ধই করে দিয়েছে সে। প্রাসাদের ভেতরে ঢুকে মেহরাব চারদিকে একবার তাকাল। নাহহ এদিকপ কেউ জেগে নেই। সে ঘোড়ার লাগাম একজন বিশ্বস্ত প্রহরীর হাতে দিয়ে বলল,
"কাউকে জাগানোর দরকার নেই।"
প্রহরী মাথা নত করল।
"জি যুবরাজ।"
তারপর মেহরাব সাহারাকে নিয়ে দ্রুত নিজের মহলের দিকে এগিয়ে গেল। সাহারা চেচাতে গেলে মেহরাব বলে
“এাকন যদি এভাবে চেচাও, আর সবাই তোমার গলদ পেয়ে ছুটে আসে। আমি কিন্তু সবাইকে বলে দিব তুমি আমাকে কীভাবে বেঁধে রেখেছিলে। তখন তোমাকে কি করবে তারা বুঝতেই পারছো”
সাহারা ফিসফিস করে বলল,
“না না এমন করবেন না। কিন্তু আমাকে নিয়ে যাচ্ছেন টা কোথায়?”
“চুপ চাপ আমার সাথে চলো। নয়তো ও্রহরী দোর হাতে পড়লে কেটে কুমিরের খানা করে দিবে”
"হুহহ, আমি কিন্তু সুযোগ পেলেই পালাব।"