“আমার হাত খোলা থাকবে?”
মেহরাব হেসে বলল
"সেটাই তো সমস্যা।"
নিজ কক্ষে ঢুকে দরজা বন্ধ করল সে। কক্ষের মাঝখানে বড় খাট। দামী কারুকাজ করা আসবাবপত্র। দেয়ালে ঝোলানো অস্ত্র। মশালের মৃদু আলোয় সবকিছু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। সাহারা চারদিকে তাকিয়ে মুখ বাঁকাল।
"এখানে আমাকে কেন এনেছেন?"
মেহরাব মাথা নেড়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর নিজের আলখাল্লা খুলে একপাশে রেখে বলল,
"তোমার জেদ আর আমার ধৈর্যের মধ্যে যুদ্ধ চলছে। আমাকে চেতালে তোমার খবর আছে বন বিড়াল। তবুও তোমাকে এভাবে ছাড়তে পারি না।”
মেহরাব কক্ষে থাকা একখানা নরম রেশমি ওড়না নিয়ে সাহারার কাছে এগিয়ে গেল না
"চিৎকার করবে না।"
"করব।"
"করলে সবাই জেগে যাবে, তারপর তোমাকে কি করবে বলোতো"
"সেটাই তো চাই।"
মেহরাব মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
"ইয়া আল্লাহ, এই মেয়েটাকে সামলানো যুদ্ধক্ষেত্র সামলানোর চেয়েও কঠিন। এই এটাকে বাড়ির লোকজন সহ্য করে কী করে?"
সাহারা মুখ ফিরিয়ে নিল। রাগে গাল দুটো লাল হয়ে উঠেছে। অবশেষে মেহরাব নিশ্চিত হলো যে সে কক্ষ থেকে বেরিয়ে দৌড়ে যাবে না। তবু সাবধানতার জন্য খাটের পাশের ভারী খুঁটির সঙ্গে একটি আলগা বাঁধন দিয়ে তাকে বসিয়ে রাখল যাতে সে আঘাত না পায় আর পালিয়েও যেতে না পারে। সব শেষ করে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। সাহারা চোখ রাঙিয়ে বলল,
"এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন?"
"ভাবছি।"
"কি?"
"তুমি বিড়াল সত্যিই একটা বিপদ।"
"হুহহ আপনি বিপদ।"
“দুই বিপদে এক ঘরে থাকি চলো”
“নাআআআআআআ”
মেহরাবের মুখে শয়তানি হাসি ফুটল।
"ঘুমাও।"
"না ঘুমাব না।"
“না ঘুমালে মুড়ি খাও”
কথাটা বলে সে কক্ষের দরজার দিকে এগোল।
সাহারা অবাক হয়ে বলল,
"আপনি কোথায় যাচ্ছেন?"
"পাশের কক্ষে।"
"এখানে থাকছেন না?"
মেহরাব ভ্রু তুলে তাকাল।
"তুমি চাও আমি এখানে থাকি?”
“না না না”
দরজার কাছে পৌঁছে আবার ফিরে তাকাল সে।
সাহারা এখনও রাগী মুখে বসে আছে। চোখে আগুন। মেহরাব মুচকি হেসে বলল,
"ভোর হলে তোমাকে ঘাড় টা ধরে সাহাবাদে পাঠিয়ে দেব।"
এই বলে দরজা বন্ধ করে পাশের কক্ষে চলে গেল সে। সারারাত জেগে থাকার পর শরীর ক্লান্ত। বিছানায় শোয়ার কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই ঘুম নেমে এলো তার চোখে। দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ মিলিয়ে যেতেই চোখ চিকচিক করে উঠলো সাহারার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল দুষ্টু হাসি।
"হাহহহ যুবরাজ, আমাকে এভাবে আটকে রাখা যাবে?"
চারদিকে একবার তাকিয়ে নিশ্চিত হলো কেউ নেই। পাশের কক্ষ থেকেও কোনো শব্দ আসছে না। সারারাত জেগে থাকার ক্লান্তিতে মেহরাব নিশ্চয়ই ঘুমিয়ে পড়েছে। সাহারা মাথা একটু ঝাঁকাল। ঘন সোনালি চুলের ভেতর লুকিয়ে রাখা একটি সূক্ষ্ম ধাতব কাঁটা খসে পড়ল তার হাতে।
সাধারণ চুলের কাঁটা মনে হলেও আসলে সেটি ছিল সরু ধারালো ছুরির মতো একটি বিশেষ অস্ত্র। বহুবার বিপদে কাজে লেগেছে। আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সে হাতের বাঁধন কেটে ফেলল। তারপর পায়ের।
খাটের পাশে পড়ে থাকা বাঁধনগুলোর দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
"সাহারা কে আটকানো এত সহজ?"
হাত-পা মুক্ত করে উঠে দাঁড়াল সে। তার শরীরে একটুও ক্লান্তি নেই। চোখ দুটো উত্তেজনায় চকচক করছে। কোমরের ভাঁজে গুঁজে রাখা ছোট্ট চামড়ার খাম বের করল সাহারা। সেখান থেকে ভাঁজ করা একটি পুরোনো নকশা খুলল। মশালের আলোয় মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগল। কয়েকদিন আগে ঘটনাচক্রে সে বাবা-মায়ের কথোপকথন শুনে ফেলেছিল। সেই কথাতেই প্রথম জানতে পারে উত্তরের সেই পরিত্যক্ত প্রাসাদের ইতিহাস। বহু বছর আগে সেখানে ঘটেছিল এক ভয়াবহ মর্মান্তিক ঘটনা। ঘটনার পর প্রাসাদটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। আর তখনকার আমিরাবাদের সম্রাট সেটি নিজের অধিকারে নিয়ে নেন। সেই সঙ্গে সংগ্রহ করেন প্রাসাদের গোপন কক্ষগুলোর চাবিও। কিন্তু চাবিগুলো কোথায় রাখা হয়েছে সেটা জানতেন খুব অল্প কয়েকজন। আর সেই গোপন তথ্যই কোনোভাবে পৌঁছে গেছে সাহারার কানে।
নকশার এক কোণে স্পষ্ট একটি চিহ্ন আঁকা।
তার পাশে লেখা
"পশ্চিম মহল, অস্ত্রাগারের নিচের সংরক্ষণ কক্ষ।"
সাহারা ধীরে ধীরে মাথা তুলল। তার চোখে বিজয়ের ঝিলিক।
"তাহলে সত্যিই সব চাবি এখানেই।"
যদি সে সেই চাবিগুলো পায় তাহলে উত্তরের প্রাসাদের বহুদিনের রহস্য উন্মোচন করা সম্ভব হবে। সে দরজার কাছে গিয়ে কান পাতল।
সতর্কভাবে কপাট খুলে বাইরে উঁকি দিল। দীর্ঘ করিডোর ফাঁকা। মশালের আলোয় ছায়াগুলো দীর্ঘ হয়ে পড়েছে। সাহারা আলগোছে বেরিয়ে এল। তার পদক্ষেপ এত হালকা যে শব্দই হলো না। নকশার দিকে একবার তাকাল। তারপর ডানদিকের করিডোর ধরে এগোতে লাগল।
একটার পর একটা মোড়। প্রাসাদটা বিশাল।
কিন্তু নকশা অনুযায়ী পথ খুঁজে নিতে তার অসুবিধা হলো না।
পাশের কক্ষে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন মেহরাব।
সে জানেই না তার তথাকথিত "বন্দিনী" বহু আগেই মুক্ত হয়ে গেছে। সাহারা চাইলে সেই রাতেই জঙ্গলে তার হাত ফসকে পালিয়ে যেতে পারত। চাইলে ঘোড়া ছিনিয়ে নিয়ে অদৃশ্যও হয়ে যেতে পারত। কিন্তু সে করেনি। কারণ তার লক্ষ্য ছিল অন্য। সেই লক্ষ্য এখন আমিরাবাদের এই বিশাল প্রাসাদের অন্ধকার কক্ষে অপেক্ষা করছে।
হাতে নকশা নিয়ে একের পর এক করিডোর পেরিয়ে এগিয়ে চলেছে সাহারা। অবশেষে বহু খোঁজাখুঁজির পর সে দেখতে পেলো দেয়ালের ওপর খোদাই করা একটি পুরোনো প্রতীক।
ঠিক একই প্রতীক নকশাতেও আঁকা ছিল। সাহারার চোখ জ্বলে উঠল।
"পেয়েছি!"
দরজাটা বহু বছরের পুরোনো। লোহায় মরিচা ধরেছে। তবু তালাটা বেশ মজবুত। সাহারা হাত বাড়িয়ে দরজার হাতল স্পর্শ করল।
ঠিক তখন মনে হলো পিছনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে।
মুহূর্তেই শরীর টনটন করে উঠল। ধীরে ধীরে ঘুরতে যাবে এমন সময় প্রচণ্ড শব্দে আকাশ চিরে বজ্রপাত হলো। ঝলকে চারপাশ এক মুহূর্তের জন্য আলোকিত হয়ে উঠল। অপ্রস্তুত সাহারা চমকে উঠে সামনে দাঁড়ানো মানুষটিকে জড়িয়ে ধরল।
"আআহ!"
সামনের মানুষটি একদম নড়ে না। স্থির,অনড়।
শুধু দুটো চোখ তার দিকে তাকিয়ে আছে। সাহারার হুঁশ ফিরতেই সে তাড়াতাড়ি সরে গেল।
মশালের আলোয় মুখটা স্পষ্ট হতেই মুখ শুকিয়ে গেল।
"আপনি!"
মেহরাব ভ্রু তুলে দাঁড়িয়ে আছে।নদুই হাত বুকের ওপর ভাঁজ করা। চোখে বিদ্রূপ
"কি বনবিড়াল? পালানোর চেষ্টা করছো?"
সাহারা দ্রুত মাথা নাড়ল।
"না।"
“ও তাহলে আমাকে খুজছিলে?”
সাহারা উত্তর দিল না। নকশাটা দ্রুত পেছনে লুকিয়ে ফেলল। মেহরাব সেটা লক্ষ্য করলেও কিছু বলল না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
"আমি ঘুম থেকে উঠে দেখি বন্দিনী উধাও।"
"আপনারই তো দোষ। এত ঢিলেঢালা বাঁধন দিলে পালাব না?"
মেহরাব চোখ সরু করে বলল
“আচ্ছা পালাও”
সাহারা পিছিয়ে দৌড় দিতেই মেহরাব এক লহমায় তাকে ধরে ফেলল।
"ছাড়ুন!"
সাহারা রাগে ফুঁসতে লাগল। মেহরাব জোর করে সাহারাকে কাঁধে তুলে নিল।
“এই আমাকে ধরবেন না। নামান, আমাকে নামান!"
সাহারার আপত্তি, অভিযোগ আর রাগ উপেক্ষা করে সে সোজা নিজের কক্ষের দিকে হাঁটতে লাগল। সাহারা কে ভিতরে দিয়ে কক্ষের দরজা আবার বন্ধ করে দিলো। নিরাপত্তা আরও নিশ্চিত করতে বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে দিল। দরজার ওপাশ থেকে বলল,
"ভোর পর্যন্ত এখানেই থাকবে।"
সাহারা চেচিৈ বলল
"আপনি যুবরাজ বলে যা খুশি তাই করছেন। আমি আপনাকে কক্ষনও ক্ষমা করব না।"
"আমি ক্ষমা চাইওনি। ক্ষমা পেতে যেন বয়েই গেছে আমার। আরেকটা শব্দ করলে কাটাগিরির নদীতে নিয়ে ফেলে দিয়ে আসবো"
তার পদশব্দ মিলিয়ে গেল। কক্ষে একা বসে রইল সাহারা। রাগে গজগজ করতে করতে দরজা খুলতে চেষ্টা করল। জানালা পরীক্ষা করল।
শেষ পর্যন্ত বুঝল আপাতত বের হওয়া সম্ভব নয়।
হতাশ হয়ে সে বিছানার দিকে এগিয়ে গেল।
পালঙ্কটা বড় নরম, রাজকীয়। অনিচ্ছা সত্ত্বেও বসে পড়ল। তারপর শুয়ে গেল। ঘরটাতে এক ধরনের পরিচ্ছন্ন কাঠের গন্ধ আছে। তার সঙ্গে মিশে আছে কোনো বিশেষ সুগন্ধির হালকা সুবাস। সম্ভবত মেহরাব ব্যবহার করে। সারা দিন জঙ্গল, ঘোড়া আর ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার পর শরীরও ক্লান্ত। সাহারা ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল। মনে মনে বিরক্ত হয়ে বলল,
"কী অহংকারী যুবরাজ। হুশশশ"
কক্ষের দরজার ঠিক সামনে পৌঁছেও কেন সে ব্যর্থ হলো? আর তার থেকেও বড় প্রশ্ন মেহরাব কি সত্যিই ঘুমিয়ে ছিল? নাকি শুরু থেকেই তার সবকিছু নজরে রেখেছিল? এই ভাবনাগুলো নিয়েই ভোর হতে চলল তার।
ভোরের আজানের ধ্বনি দূর থেকে ভেসে আসছে।
সাহারা কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল নিজেও জানে না।
চোখ খুলতেই কয়েক মুহূর্ত লাগল বুঝতে সে কোথায় আছে। তারপর সব মনে পড়ে গেল।
সঙ্গে সঙ্গে উঠে বসল সে। দরজার কাছে গিয়ে দেখল সত্যিই বাইরে থেকে তালা দেওয়া।
ঠোঁট ফুলিয়ে আবার ফিরে এল। তখনই তার চোখ পড়ল দেয়ালের এক কোণে। গতরাতে অন্ধকারে খেয়াল করেনি। সেখানে ঝুলছে কয়েকটি পুরোনো প্রতিকৃতি। কৌতূহলবশত এগিয়ে গেল। প্রথম দুটো সম্রাটদের ছবি। তৃতীয়টিতে এসে থমকে গেল। একজন রাজপুরুষ
দীর্ঘদেহী। গভীর চোখ। কাধ ওবদি বাবরি কালো চুল। গায়ে রাজকীয় বর্ম। নিচে ক্ষয়ে যাওয়া অক্ষরে নাম লেখা
"শাহজাদা নাসির ইবনে সালার"
সাহারার বুকের ভেতর ধক করে উঠল।ননাসির?
নাসিরাবাদ? আরও ঝুঁকে দেখল। ছবিটার এক কোণে অদ্ভুত একটি চিহ্ন খোদাই করা। ঠিক একই চিহ্ন। যেটা সে গতরাতে সেই গোপন কক্ষের দরজায় দেখেছে। নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠল। নাসিরাবাদের সঙ্গে আমিরাবাদের সরাসরি সম্পর্ক আছে। এই সম্পর্কটা কি লুকানো হচ্ছে? সাহাবাদ এর দুরবস্থার জন্য নাসিরাবাদ কতখানি দায়ী তা শুনেছে সাহারা। এের যদি যোগসূত্র থাকে তাহলে আমিরাবাদও বিপজ্জনক তাদের জন্য
মেহরাব ঘুম থেকে উঠেই গতরাতের ঘটনাগুলো নিয়ে ভাবছিল। তার মনে বারবার একই প্রশ্ন ঘুরছে। সাহারা পালাতে চাইলে প্রাসাদ ছেড়ে বেরিয়ে যেতে পারত। তাহলে সে গেল না কেন?
বরং সরাসরি সেই নিষিদ্ধ অংশে গেল। আর তার হাতে থাকা নকশাটা ওটা কোথা থেকে পেল?
মুখ ধুয়ে দ্রুত নিজের কক্ষের দিকে রওনা দিল সে। দরজা খুলতেই দেখল সাহারা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে। চুলগুলো খোলা। ঘুম ঘুম আদলে বড্ড আদূরে লাগছে তাকে।
মেহরাব বলল,
“কাল রাতে কোথায় ঢোকার চেষ্টা করছিলে?”
সাহারা ভ্রু কুচকে বলল
“বের হতে চাইছিলাম এখান থেকে। তাছাড়া আর কোথায় যাব?”
“বের হতে চাইলে মূল ফটকে না গিয়ে ওইদিকে কেন গেছিলে?”
“আশ্চর্য, আমি চিনি নাকি কোন দিকে কি?
মেহরাব চোখ সরু করে এগিয়ে আসে সাহারার দিকে। সাহারা পিছিয়ে যায়।
“যে জঙ্গল টাও হাতের তালুর মত চিনে, সে যে পথ দিয়ে এসেছে সে পথ দিয়ে ফিরতে পারবে না এটাও আমাকে বিশ্বাস করতে হবে?”
সাহারা ধরা পড়া চোরের মত মিইয়ে গেল।মেহরাব বাকা হেসে বলল
“যতদিন না আমি তোমার এবং নাসিরাবাদ এর রহস্য উদঘাটন করতে পারছি, তুমি এখানেই থাকবে”
দুপুরে মেহরাব দেওয়ানখানার পুরোনো নথিপত্র দেখতে গেল। সম্রাটদের ইতিহাস, রাজ্য বিস্তারের বিবরণ, পুরোনো যুদ্ধ সব খুঁজে দেখল। অবশেষে এক জায়গায় এসে পেলো একটি বিবর্ণ নথি। প্রায় ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম। সেখানে লেখা "নাসিরাবাদের পতনের পর রাজপ্রাসাদের সমস্ত চাবি, দলিল এবং রক্তমুকুট সংক্রান্ত নথি আমিরাবাদের রাজভাণ্ডারে স্থানান্তর করা হয়।"
মেহরাবের চোখ সরু হয়ে এল। “রক্তমুকুট”?
এটা তো আগে কখনও শোনেনি আরও পড়তে যাবে ঠিক তখনই পৃষ্ঠার অর্ধেক অংশ ছেঁড়া দেখতে পেল। বাকি অংশ নেই। কেউ ইচ্ছে করেই সরিয়েছে। সে কাগজটা ভাঁজ করল। সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার কেউ এত বছর ধরে এই সত্যটা লুকিয়ে রেখেছে। মলসাহারাও কোনো না কোনোভাবে একই রহস্যের পেছনে ছুটছে। এই ব্যাপারটাই তাকে সবচেয়ে বেশি অবাক করছে।
একজন জমিদারকন্যা, যে দিনের বেলায় পশুপাখি নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, কথা বার্তায় কত সরলতা। অথচ ভিতরে কত গভীর ফাঁদ এই নারীর। সাংঘাতিক চালাক। বিষয়টা মোটেও সাধারণ নয়। সে সাহারার দিকে তাকাল।
"আচ্ছা তুমি ঠিক কী কী জানো বলোতো নাসিরাবাদ এর বিষয়ে?"
সাহারা উত্তর দেওয়ার আগেই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো। মেহরাব বিরক্ত হয়ে বলল,
"কে?"
বাইর থেকে পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এলো।
"আমি। দরজা খোল মেহু।"
আয়েশা বেগম। মেহরাব কপালে হাত ঠেকাল।
এখনই আসতে হলো! সাহারা ফিসফিস করে বলল,
"আমাকে লুকান।"
"কোথায়?"
"আমি জানি নাকি!"
আবার কড়া নাড়ল আয়েশা।
"মেহু, দরজা খুলবি?"
উপায় না দেখে মেহরাব দরজা খুলে দিল। আয়েশা বেগম হাতে সকালের নাস্তার থালা নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলেন। ভিতরে ঢুকে তাজ্জব বনে গেল। দৃষ্টি গিয়ে আটকাল জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সাহারার ওপর। মেহরাব এর লজ্জায় মাটির তলায় ঢুকে যেতে ইচ্ছা করছে। সাহারাও অস্বস্তিতে দাঁড়িয়ে আছে। আয়েশা বেগমের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে উঠল। এমন রূপ তিনি জীবনে খুব কমই দেখেছেন। সোনালি চুলগুলো যেন ঝলমল করছে। দুধে-আলতা গায়ের রঙ। সবুজাভ চোখ। মার্জিত চেহারা।
দেখলে মনে হয় যেন কোনো দূর দেশের রাজকন্যা ভুল করে এখানে এসে দাঁড়িয়েছে।
আয়েশা বেগমের মুখ দিয়ে অজান্তেই বেরিয়ে গেল
"মাশাআল্লাহ..."
সাহারা লজ্জায় চোখ নামিয়ে ফেলল। আর মেহরাব বুঝে গেল, পরিস্থিতি ভয়ংকর দিকে যাচ্ছে। আয়েশা বেগম ধীরে ধীরে ছেলের দিকে তাকালেন। তারপর আবার মেয়েটির দিকে। আবার ছেলের দিকে। মুখে এমন এক অভিব্যক্তি, যা দেখে মেহরাবের মাথা ধরে গেল।
"আম্মা...তুমি যা ভাবছো, বিষয়টা তা না।"
"আমি আবার কি ভাবছি?"
"তুমি যা ভাবছো ঠিক সেটাই।"
আয়েশা বেগম ঠোঁট চেপে হাসি আটকানোর চেষ্টা করলেন।
"আমি তো কিছুই ভাবছি না।"
মেহরাব দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সাহারা অবাক হয়ে দুজনের কথোপকথন দেখছে। কিছুই বুঝতে পারছে না
আয়েশা বেগম এবার সাহারার কাছে গিয়ে নরম গলায় বললেন,
"মা, তোমার নাম কি?"
"জি সাহারা। সাহার জাহ্নবী"
"সুন্দর নাম।"
তারপর মৃদু হেসে বললেন,
“তুমি নিশ্চয়ই খুব বিশেষ কেউ। নয়তো আমার ছেলের কক্ষে…… না না অসম্ভব”
মেহরাব প্রায় লাফিয়ে উঠল।
"আম্মা!"
"আচ্ছা আচ্ছা, চেঁচাস না।"
তারপর ছেলের কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বললেন,
"এই জন্যই বুঝি হঠাৎ বিয়ে করতে রাজি হয়েছিলি?"
"আম্মা!"
"এই জন্যই বুঝি সেদিন বলেছিলি একটা মেয়ে পছন্দ হয়েছে?"
"আম্মা, আল্লাহর ওয়াস্তে..."
আয়েশা বেগম এবার আর হাসি আটকাতে পারলেন না। তার চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।
মনে মনে তিনি ইতোমধ্যে কত কিছু ভেবে ফেলেছেন। নাতি-নাতনি বিয়ে উৎসব।
মেহরাব দ্রুত ঠেলে নিয়ে গেল দরজার দিকে
"আম্মা তুমি এখন যাও, তোমাকে পরে সবটা বোঝাচ্ছি।"
দরজা পর্যন্ত গিয়ে আবার একবার ফিরে তাকালেন তিনি। সাহারার দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে বললেন,
"মা, পরে কিন্তু তোমার সঙ্গে অনেক কথা বলব।"
এই বলে বেরিয়ে গেলেন। দরজা বন্ধ হতেই মেহরাব দুহাতে মুখ ঢাকল। সে জানে।
এখন পুরো প্রাসাদে কিছু ছড়াক আর না ছড়াক তার মা অন্তত নিশ্চিত হয়ে গেছেন যে এই মেয়েটির সঙ্গে তার কোনো গভীর সম্পর্ক আছে।
আর একবার যদি আয়েশা বেগম কোনো কিছু বিশ্বাস করে বসেন সেটা পরিবর্তন করা যুদ্ধ জেতার চেয়েও কঠিন। করিডোর ধরে হেঁটে যেতে যেতে আয়েশা বেগম নিজের মনে বললেন,
"হায় আল্লাহ, কী সুন্দর মেয়ে! আমার মেহুর জন্য এমন মেয়েই তো দরকার।
তারপর হঠাৎ থেমে গেলেন। চোখ বড় বড় হয়ে উঠল।
“ সে সব তো ঠিক আছে কিন্তু ওরা এক ঘরে কি করছে? ওরা কি ভুলভাল কিছু করে ফেলল? ইয়া আল্লাহ, ওরা কি এক কক্ষে রাত কাটিয়েছে?”
মনের নানা ভাবনা কে প্রশ্রয় দিয়ে আয়েশা বেগ ছুটে যায় ছেলের কক্ষের দিকে
“মেহুউউউউউ”