ফন্ট সাইজ:
থিম:
রক্তমুকুট

11

লেখক: জান্নাতুল ফেরদৌস

“আমাকে বেঁধে রেখেছে কেনোওওওও? ছাড়ো আমায়। কে আছো? ছাড়ওওওও। আমার দম বন্ধ লাগছে। উফফফ”

হাত পা বাধা অবস্থায় অনবরত চেঁচাচ্ছে সাহারা। দরজার বাইরে থাকা দাসীরা বেজায় বিরক্ত। একে আবার কিছু বলাও যাবে না। সম্রাট পুত্রের কড়া আদেশ। বাধ্য হয়ে একজন প্রহরী কে পাঠালো ব্যায়ামাগারে সম্রাট পুত্র মেহরাব কে খবর দিতে। প্রহরী ভয়ে ভয়ে গেল দাসীর কথা মত। বিশাল কক্ষ টায় নানা আকৃতির সব বস্তু। ভারি দুইটা হাতুড়ির মত দুই পাশে গোলাকার বস্তু দুটি দুই হাতে করে শরীর চর্চায় ব্যাস্ত মেহরাব। রাজকীয় উজ্জ্বল শরীর খানা ফুলে ফুলে উঠছে হাত উঠা নামা করার সাথে সাথে। কপালে বাধা কালো সরু কাপর। অবাধ্য চুল গুলো ঘামে ভেজা কপালে লেপ্টে আছে। প্রহরী মাথা নিচু করে ডাকলো

“অসময়ে বিরক্ত করার জন্য দুঃখিত জাহাপনা। সাহাবাদ এর রাজকন্যার চেঁচামেচি তে মহলের লোকের টিকে থাকা দুষ্কর হয়ে পড়ছে। তাকে কোনো ভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না”

সাহারার বিষয় টা কানে যেতেই হাত থামলো মেহরাবের। হাতের ভারি লোহার দন্ড দুটো নামিয়ে গা মুছতে মুছতে বেড়িয়ে এলো কক্ষ থেকে। মহলে যেতে বিড়বিড় করলো

“সাদা বন বিড়াল টা আবার চেঁচাচ্ছে। উফফফ এর জ্বালায় কি একটুও শান্তি পাব না?”

বড় বড় পা ফেলে ঢুকলো প্রাসাদে। তার অবস্থান দেখে সকল প্রহরী মাথা ঝুকিয়ে সম্মান প্রদর্শন করলো। উদাম গায়ে কাধে তোয়ালে ঝোলানো। পরনে শুধু পাজামা যা কোমড়ের নিচ ওবদি নেমে আছে। সব দাসীরা লজ্জায় চোখ নামিয়ে ফেললেও উঠতি বয়সি কয়েকটা মেয়ে দাসী চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছে সুদর্শন পুরুষটাকে। কি শরীর বানিয়েছে। ব্যাটাছেলে হওয়ার পরও শরীর থেকে চোখ সরানো যা না।

এক নাগাড়ে হেঁটে নিজের কক্ষের সামনে গিয়ে থামলো। দরজার সামনে যেতেই সব দাসীরা সরে গেলো সেখান থেকে। তার উগ্র মেজাজ সম্পর্কে সবাই অবগত। কক্ষে ঢুকে বিশাল দরজা টা ধপ করে বন্ধ করে দিলো।

সাহারা পালঙ্কের সাথে বাঁধা। হাত দুটো পিছনে বাঁধা, পা দুটো জড় করে বাধা। পড়নে জাম রঙকের সিল্কের জামা। সাদা ফর্সা শরীরে যেন অসম্ভব মানিয়েছে রঙটা। সোনালি চুল গুলো এলোমেলো হয়ে গেছে ছটফটের দরুন। সাদা মুখটা দুই গালে লাল হয়ে গেছে। সেই সকাল থেকে এই লোকটা বেঁধে রেখেছে। বেলা গড়িয়ে দুপুর হতে চলল। খুব খিদে পেয়েছে সাহারার। আম্মা এতক্ষণে কতবার খাইয়ে ছাড়তো। সেই কাল রাত থেকে না খেয়ে আছে। মেহেরুন্নেসার মুখটা মনে পড়ছে খুব। এই লোকটা যদি আর না ছাড়ে? তখন? আম্মা তো পাগল হয়ে যাবে সারা কে খুঁজে না পেয়ে।

তক্ষুনি তার মনে পড়লো সুনেহেরার কথা।

“এই রে, মনি মা যদি জানে আমি জঙ্গলে এসেছিলাম। আমার তো আর রক্ষে নেই”

খাটে হেলান দিয়ে নেতিয়ে পড়েছে মেয়েটা। এমন সময় দরজা ধরাম করে বন্ধ হওয়ার শব্দে হচকচিয়ে উঠলো। মেহরাব কাধের তোয়ালে পালঙ্কে ছুড়ে ফেলে সাহারার সামনে এসে বসলো। ওপর নিচ পরখ করে দেখলো মেয়েটাকে। সাহারা কাচুমাচু হয়ে চোখ ছোট করে তাকিয়ে আছে মেহরাব এর দিকে। উদাম গায়ে দেখে বিব্রত হলো খুব। বিড়বিড় করে বলল

“নষ্ট ব্যাটাছেলে। গতর দেখাচ্ছে আমায়”

মেহরাব শুনলো কথাটা। হাত মুঠো করে উঁচু করে বাহু দেখালো। সাহারা ভেঙচি দিয়ে চোখ সরিয়ে নিলো। মেহরাব বলল

“না না দেখো। এত সুন্দর সুস্বাস্থ্যের অধিকারী পুরুষ দেখলে চোখ আটকাতেই পারে”

সাহারা বিরক্ত হয়ে বলল

“আগে খুলে দিন আমায়”

মেহরাব চোখ সরু করে দৃষ্টি নিবিষ্ট করে সাহারার সবুজাভ চোখ দুইটায়। এগিয়ে আসে হামেশায়। সাহারা পিছিয়ে পালঙ্কের সাথে মিশে যায়। মেহরাব সাহারার মুখের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল

“বন বিড়াল কে খাঁচায় আটকেছি। এমনি এমনি যেতে দিই কি করে বলোতো। চুপচাপ এখানে থাকো। একটু পরে খাবার পাঠানো হবে।

****

মাঝরাতে কি এক সভা ডেকেছেন সম্রাট। আমিরাবাদ প্রাসাদের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত পাথর দ্বারা বানানে, পুরোনো ভবনটি দিনের বেলাতে জনশূন্য থাকে। বাইরের কেউ জানে না এর ভূগর্ভে কী আছে। কেবল কয়েকজন বিশ্বস্ত লোক ছাড়া। সেখানে রয়েছে একটি গোপন সভাকক্ষ। এতটাই মোটা পাথরের দেয়াল যে বাইরের কোনো শব্দ ভিতরে পৌছায় না। আজকের সভাটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এজন্যই প্রথমবারের মতো আহ্বান করা হয়েছে যুবরাজ মেহরাবকে। সভাকক্ষে প্রবেশ করতেই সে দেখল ইতোমধ্যে উপস্থিত রয়েছেন সম্রাট হারুন ওয়াসেম, প্রধান নায়েব, কয়েকজন উপদেষ্টা, সেনাপতি এবং রাজকোষাধ্যক্ষ। মেহরাব প্রবেশ করতেই সবাই সম্মান জানাল। হারুন ওয়াসেম হাত তুলে তাকে নিজের পাশে বসতে বললেন।

মেহরাব নীরবে বসে পড়ল। তার তীক্ষ্ণ চোখ ঘুরে গেল উপস্থিত সকলের মুখে। কক্ষের মাঝখানে বিশাল কাঠের টেবিল। তার ওপর মেলে রাখা হয়েছে কয়েকটি মানচিত্র। কয়েকটি পার্শ্ববর্তী অঞ্চল নিয়ে বোধহয় আলোচনা হবে। প্রধান উপদেষ্টা সামনে এগিয়ে এল।

"বিগত সাত বছর ধরে আমরা একটি বৃহৎ পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছি।"

মেহরাব ভ্রু কুঁচকাল।

"কী পরিকল্পনা?"

উপদেষ্টা মানচিত্রে আঙুল রাখল।

"এই অঞ্চল।"

"সাহাবাদ?"

"হ্যাঁ।"

নায়েব এবার বলল,

"দুইটি বড় নদী। উর্বর ভূমি। পাহাড়ি এলাকা। বাণিজ্যের জন্য সর্বোত্তম অবস্থান।"

মেহরাব চুপচাপ শুনছে। তার ভেতরে অজানা অস্বস্তি জন্ম নিচ্ছে। রাজকোষাধ্যক্ষ গলা খাঁকারি দিল।

"বিদেশি বণিকেরা এ অঞ্চলের প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করেছে যুবরাজ।"

"কোন দেশি?"

উপদেষ্টা বলল,

"ইংরেজরা।"

মেহরাবের মুখ কঠিন হয়ে গেল।

"তারা কী চায়?"

"সাহাবাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ।"

"বিনিময়ে?"

নায়েবের চোখ চকচক করে উঠল।

"অসংখ্য স্বর্ণমুদ্রা। বাণিজ্যিক সুবিধা। অস্ত্র কারখানা। আর সামরিক সহযোগিতা।"

টেবিলের নিচে মেহরাবের মুঠি শক্ত হয়ে উঠল।

উপদেষ্টা আবার বলতে শুরু করল।

"নদীপথ ব্যবহার করে তারা বৃহৎ বাণিজ্য কেন্দ্র গড়ে তুলবে। আর পাহাড়ি অঞ্চলে উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন করবে। এতে আমাদের রাজকোষ কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাবে।"

কিন্তু কথাগুলো শুনে মেহরাবের চোখে কোনো উচ্ছ্বাস দেখা গেল না। বরং ক্রমশ তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠছে। জিজ্ঞেস করল,

"সাহাবাদ কি বিক্রির বস্তু?”

কেউ উত্তর দিল না। নায়েব গলা নামিয়ে বলল,

"রাজনীতি আবেগ দিয়ে চলে না যুবরাজ। রাজ্য পরিচালনা করতে হলে লাভ-ক্ষতি বুঝতে হয়। তারা আপনাদের অঙ্গরাজ্য। আপনারা যে কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেন”

মেহরাব এবার সোজা হয়ে বসল।

"সাহাবাদের বর্তমান শাসককে সরাবেন কীভাবে?"

প্রশ্নটা করতেই কক্ষের অনেকেই একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। সেনাপতি বলল,

" অনেক চেষ্টা করা হলো। এখন শেষটা করতে হবে। প্রয়োজনে যুদ্ধ, দুর্ঘটনা, বিদ্রোহ যা ই হোক না কেন? প্রয়োজনে হত্যা ও করতে হবে। নিজেদের রাজ্যের লাভের জন্য এটুকু তো দোষের নয় যুবরাজ”

মেহরাবের চোখ জ্বলে উঠল।

“বাহহহ”

কেউ কথা বলল না। সাহাবাদের জমিদার বাইজিদ শাহকে সরিয়ে দিলে পুরো অঞ্চল নাসিরাবাদের পুরোনো দাবির সঙ্গে সাহাবাদকে জুড়ে দিয়ে নতুন প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করা হবে। অতঃপর বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়া হবে অঞ্চলটি। সবকিছু বহু বছর ধরেই পরিকল্পিত।

মেহরাব উঠে দাঁড়াল। তার কণ্ঠস্বরে এখন বরফের মতো শীতলতা।

"আপনারা কি জানেন সাহাবাদের মানুষ তাদের শাসককে কতটা ভালোবাসে?"

কেউ উত্তর দিল না।

"আপনারা কি জানেন বাইজিদ শাহ কেমন মানুষ? এই কয়েক বছরে কি কি হয়েছে সেখানে?

নদী বাঁধ নির্মাণ হয়েছে। কৃষকদের কর কমানো হয়েছে। বিধবাদের ভরণপোষণ দেওয়া হয়। আর সেই মানুষটিকে আপনারা স্বর্ণমুদ্রার জন্য হত্যা করতে চান? যখন রাজ্য পিছিয়ে ছিল যোগাযোগ ব্যাবস্থায় তখন কোথায় ছিল আপনাদের ইংরেজ বণিকেরা?”

কক্ষ নিশ্চুপ। হারুন ওয়াসেম ছেলের কথূয় অসন্তুষ্ট হলেন।

"মেহরাব।"

যুবরাজ বাবার দিকে তাকাল। সম্রাটের চোখে ক্লান্তি। মেহরাব বুঝল, এই সিদ্ধান্তে সম্রাট পুরোপুরি স্বস্তিতে নেই। সে বলল,

"আব্বু, রাজ্য বাড়ানোর জন্য যুদ্ধ আমি বুঝি। অপরাধীর শাস্তি আমি বুঝি। কিন্তু একজন নির্দোষ শাসককে সরিয়ে তার জনগণকে বিক্রি করে দেওয়ার রাজনীতি আমি বুঝি না।"

মেহরাবের চোখের সামনে ভেসে উঠল সাহাবাদের মানুষদের মুখ। শাহ পরিবার এর মানুষগুলের মুখ। বাইজিদ শাহ, মেহেরুন্নেসা, জান্নাত আর সেই সোনালি চুলের দুরন্ত বনবিড়াল। তার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অস্বস্তি জন্ম নিল।

সম্রাট হারুন ওয়াসেম নিজের আসনে হেলান দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। গম্ভীর কণ্ঠে বললেন

"ব্যক্তিগত মতামত পরে আলোচনা করা যাবে। আপাতত আমাদের হাতে সময় কম।"

সবাই আবার মনোযোগ দিল। সম্রাট টেবিলের ওপর রাখা মানচিত্র ভাঁজ করতে করতে বললেন,

"আগামীকাল ইংরেজদের পক্ষ থেকে একজন প্রতিনিধি আসবে।"

নায়েব মাথা নাড়ল।

"জি, মহামান্য।"

"তিনি চূড়ান্ত চুক্তিপত্র গ্রহণ করবেন।"

মেহরাবের ভ্রু কুঁচকে গেল।

"তাহলে চুক্তি ইতোমধ্যেই প্রস্তুত?"

সম্রাট উত্তর না দিয়ে দেওয়ান সাহেবের দিকে তাকালেন।

"চুক্তিপত্রটি বের করুন। শেষবারের মতো সবাই দেখে নিক।"

দেওয়ান সাহেব সঙ্গে সঙ্গে তার পাশে রাখা ভারী কাঠের বাক্সটির দিকে এগোলেন। বাক্সটি তালাবদ্ধ ছিল। নিজের কোমর থেকে চাবি খুলে তালা খুললেন তিনি। ঢাকনা উঠল। একের পর এক নথি বের হতে লাগল। কর আদায়ের হিসাব।

বাণিজ্যিক দলিল, সীমান্ত সংক্রান্ত কাগজপত্র পুরোনো ফরমান। কিন্তু চুক্তিপত্রটি নেই। দেওয়ান সাহেব থমকে গেলেন। দ্রুত খুঁজতে থাকলেন। মুখের রঙ ধীরে ধীরে ফ্যাকাশে হয়ে উঠতে লাগল। সম্রাট কপালে ভাঁজ ফেললেন।

"কি হয়েছে? কোনো সমস্যা?”

দেওয়ান সাহেব ঢোক গিললেন।

"মহামান্য..."

"বলুন।"

"এখানে নেই সেই পত্রটা। চুক্তিপত্র এখানে নেই।"

নায়েব চেয়ার থেকে প্রায় লাফিয়ে উঠল।

"অসম্ভব! আমি নিজ হাতে রেখেছিলাম!"

দেওয়ান সাহেব কাঁপা গলায় বললেন,

"আমিও নিজ হাতে রেখেছিলাম।"

তারপর আবার বাক্সের ভেতর হাতড়াতে লাগলেন। সব কাগজ বের করে মেঝেতে ছড়িয়ে দিলেন। তবুও নেই চুক্তিপত্র উধাও। মেহরাব মাথায় হাত দিয়ে চুম খামচে ধরলো

“কি নাটক হচ্ছে এখানে? আমাকে এসব দেখাতে এনেছো আব্বু?”

গোটা সভাকক্ষ এলোমেলো হয়ে গেছে। সব নথি পরীক্ষা করা হয়েছে। বাক্স উল্টে পাল্টে দেখা হয়েছে। আশে পাশের কক্ষ গুলোও তল্লাশি করা হয়েছে। প্রহরীদের ও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।

কিন্তু চুক্তিপত্রের কোনো খোঁজ নেই। নায়েব ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বলল,

"এটা নির্ঘাত চুরি হয়েছে।"

উপদেষ্টা বলল,

"কিন্তু এ কাজ কে করবে? এই কক্ষে প্রবেশাধিকার তো হাতে গোনা কয়েকজনের।"

সম্রাটের মুখ ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। তিনি জানেন বিষয়টি কত ভয়ংকর। ওই কাগজে বাণিজ্যিক শর্তের সাথে ছিল অমূল্য গোপন প্রতিশ্রুতি। ছিল সাহাবাদ নিয়ে পরিকল্পনা।

ছিল ইংরেজদের সঙ্গে গোপন যোগাযোগের প্রমাণ। সেটি যদি ভুল মানুষের হাতে পড়ে তাহলে রাজনৈতিক সংকটের সাথে সাথে সম্রাটের সম্মানও ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। প্রজারা বিদ্রোহও করতে পারে। মিত্র রাজ্য শত্রুতে পরিণত হয়ে যাবে। সাহাবাদ সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারে। মেহরাব এতক্ষণ নীরবে সব দেখছিল।

বিরক্ত হয়ে বলল

"কবে শেষবার চুক্তিপত্র দেখা হয়েছিল?"

দেওয়ান সাহেব উত্তর দিলেন,

"দুই দিন আগে।"

"তারপর?"

"আমি নিজ হাতে বাক্সে রেখেছি।"

"আর কেউ দেখেছে?"

দেওয়ান সাহেব মাথা নাড়লেন।

"না।"

মেহরাবের চোখ সরু হয়ে এল। দুই দিন? ঠিক দুই দিন আগে। অদ্ভুতভাবে তার মনে ভেসে উঠল গভীর রাতে প্রাসাদের নিষিদ্ধ অংশে ঘুরে বেড়ানো এক দুঃসাহসী মেয়ে। দুদিন আগেই মাঝরাতে সাহারা কে এই কক্ষের সামনে পেয়েছিল মেহরাব। কিন্ত তখন এ কক্ষ তালাবদ্ধ ছিল। পরক্ষণেই সে চিন্তাটা ঝেড়ে ফেলল। সাহারা অনেক কিছু করতে পারে ঠিকই। কিন্তু এ নথির কথা তার জানার কথা নয়। তবুও সন্দেহের ক্ষীণ রেখা মনের মধ্যে থেকে গেল। সকলের সামনে প্রকাশ করলো না।

সম্রাট উঠে দাঁড়ালেন।

"সভা আপাতত স্থগিত।"

কেউ আপত্তি করল না। আর করারও উপায় নেই।

চুক্তিপত্র ছাড়া আলোচনা এগোবে না। সম্রাট গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,

"আজই ইংরেজদের কাছে পত্র পাঠানো হবে। তাদের জানানো হবে মূল নথি হারিয়ে গেছে। নতুন অনুলিপি পাঠাতে হবে।"

নায়েবের মুখ শুকিয়ে গেল। এটা রাজ্যের জন্য বিশাল অপমানজনক। কিন্তু বিকল্পও নেই। সবাই ধীরে ধীরে কক্ষ ত্যাগ করতে লাগল। সম্রাট কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইলেন। তার চোখে উদ্বেগ। চুক্তিপত্র হারানোটা কেবল দুর্ঘটনা? তা তো হতেই পারে না। এটা কোনো ইঙ্গিত। কেউ তাদের গোপন পরিকল্পনার খবর পেয়েছে। কেউ ছায়ার আড়াল থেকে খেলা শুরু করেছে। আর সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার তারা এখনো জানেই না সেই মানুষটা কে। বলে না অন্ধকার ঘরে সাপ, সব জায়গায়ই সাপ। কাওকে বিশ্বাস করার জো নেই।

সম্রাট বেড়িয়ে গেল। কক্ষের এক কোণে মশালের আগুনের আলোয় টেবিলের নিচে পড়ে থাকা এক টুকরো ছেঁড়া কাগজে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া কালির দাগ যেন ফিসফিস করে বলছে, চুক্তিপত্র হারায়নি। কেউ সেটি ছিনিয়ে নিয়েছে সম্রাট।

*****

আমিরাবাদের ভোর। দিগন্তজোড়া সোনালি বালুকাবেলা। দূরে দূরে খেজুরগাছের সারি।

রক্তিম সূর্যের আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে মরুভূমির বুক জুড়ে। দেখলে মনে হয় যেন কোনো রূপকথার রাজ্য। সেই বিশাল মরুভূমির মাঝখান দিয়ে ক্ষিপ্র বেগে ছুটে চলেছে একটি কালো অশ্ব।

অশ্বের পিঠে বসে আছে সাহারা। তার দীর্ঘ সোনালি চুল বাতাসে উড়ছে। সবুজাভ চোখে অদ্ভুত দীপ্তি। মুখে লেগে আছে কুটিল হাসি।

ঘোড়ার লাগাম আরও শক্ত করে ধরল সে।

কোমরের কাপড়ের ভাঁজে লুকিয়ে রাখা আছে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বস্তু। একটি সম্রাটের মহা মূল্যবান চুক্তিপত্র। আরেকটি সাহাবাদের পুরোনো দলিল।

গত রাতের কথা মনে পড়তেই তার চোখে বিজয়ের ঝিলিক ফুটে উঠল।

সেদিন গভীর রাতে সে প্রাসাদের নিষিদ্ধ অংশে গিয়েছিল অন্য উদ্দেশ্যে। উত্তরের প্রাসাদের রহস্যের সূত্র খুঁজতে। কিন্তু ভাগ্য যেন তাকে আরও বড় কিছুর সামনে এনে দাঁড় করায়।

একটি আধখোলা দরজার আড়াল থেকে ভেসে আসছিল কথোপকথন। দেওয়ান নায়েব সহ আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। পরে সেখানে এসে যোগ দেয় মেহরাবও। সাহারা নিঃশব্দে পাথরের স্তম্ভের আড়ালে দাঁড়িয়ে সব শুনেছিল।

প্রথমে সে ভেবেছিল সাধারণ প্রশাসনিক আলোচনা। কিন্তু কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তার বুক ঠান্ডা হয়ে যায়। সাহাবাদের বিপক্ষে অর্থের বিনিময়ে ক্ষমতার লেনদেন নিয়ে বলোচনা চলছে। সব শুনেছিল সে। সাহারার হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে উঠল। এ যে তার নিজের ঘরবাড়ি, নিজের মানুষ, নিজের মাটি বিক্রি করার পরিকল্পনা করছে। সে জানত না সব তথ্য কতটা সত্য। কিন্তু এটুকু বুঝেছিল এই নথি ভুল মানুষের হাতে থাকলে সাহাবাদের জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে।

পরদিন সুযোগ এসেছিল অপ্রত্যাশিতভাবে।

দেওয়ান সাহেব কিছু নথি পর্যবেক্ষণ করছিলো। সে নিজের কানের রত্নের দুলটি ছুড়ে মারতেই লোভি নায়েব সেদিকে যা। আর সেই সুযোগেই সে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করে। সন্ধ্যার আগেই সে নিশ্চিত হয়েছিল কোন বাক্সে নথিগুলো রাখা আছে। এরপর আর বেশি সময় লাগেনি। এখন সেই দলিল তার কাছেই।

বালুর ঢিবি পেরিয়ে ঘোড়া এগিয়ে চলেছে। সাহারা আকাশের দিকে তাকাল। তার বুকের ভেতর উত্তেজনার সাথলে ভয়ও আছে। এবারের মত না হয় ঠেকানো গেল এই ভয়ংকর জোট। কিন্তু সামান্য পত্র হারানো তে সম্রাট মোটেও বসে থাকবে না। ফের বানাবে চুক্তিপত্র।

হঠাৎ তার মনে পড়ল মেহরাবের কথা। তার মুখে অন্যদের মতো লোভ দেখেনি সাহারা। দেখেছিল আপত্তি। মেহরাব কিছুতেই সম্মত হতে পারছিল না মতের সাথে। ঘোড়ার গতি কিছুটা কমাল সাহারা। দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো।

"তুমি আসলে কোন দলে, শিকারী?"

****

সাহাবাদ প্রাসাদে যেন শোকের ছায়া নেমে এসেছিল। দুই দিন, পুরো দুই দিন ধরে ছোট শাহজাদী সাহারার কোনো খোঁজ নেই। প্রহরীরা জঙ্গল চষে ফেলেছে। নদীর পাড়, পাহাড়ি পথ এমনকি পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোতেও লোক পাঠানো হয়েছে। কিন্তু কোথাও তার সন্ধান মেলেনি।

সুনেহেরা প্রায় নির্ঘুম। মেহেরুন্নেসা অনবরত তুলে কাঁদছেন। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হলো শাখা সবটা জেনেও চুপ। কাওকে বলছে না সাহারা কে মেহরাব নিয়ে গেছে। বাইজিদ শাহ বাইরে শান্ত থাকলেও ভেতরে ভেতরে দুশ্চিন্তায় পুড়ছেন।

হঠাৎ দক্ষিণ ফটকের প্রহরীরা চিৎকার করে উঠল।

"শাহজাদী! শাহজাদী ফিরে এসেছেন!"

মুহূর্তেই পুরো প্রাসাদে খবর ছড়িয়ে পড়ল। কালো ঘোড়ার পিঠে বসে সাহারা প্রবেশ করছে।

মুখে ক্লান্তির ছাপ। পোশাকে পথের ধুলো। চোখ দুটো আগের মতোই উজ্জ্বল। সুনেহেরা আর অপেক্ষা করলেন না। প্রায় দৌড়ে গিয়ে মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন।

"তুই কোথায় ছিলি? জানিস আমরা কত চিন্তা করেছি?"

মেহেরুন্নেসাও এগিয়ে এলেন। তার চোখ ভেজা।

বাইজিদ শাহ কড়া মুখে দাঁড়িয়ে থাকলেও মেয়েকে দেখে বুকের ভেতর জমে থাকা পাথরটা নেমে গেল। চারদিক থেকে প্রশ্ন আসতে লাগল।

"কি হয়েছিল? কে নিয়ে গিয়েছিল? কোথায় ছিলে? আহত হয়েছো?"

সাহারা সবার দিকে তাকাল। তারপর ক্লান্ত কণ্ঠে বলল,

“আমি এখন খুব ক্লান্ত। আগে বিশ্রাম নিতে চাই। পরে সব বলব।"

এতটুকু বলেই সে নিজের কক্ষের দিকে চলে গেল। কেউ আর জোর করল না। কক্ষে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে দিল সাহারা। তারপর কোমরের কাপড়ের ভাঁজ থেকে বের করল দুটি দলিল। বিছানার ওপর রেখে কিছুক্ষণ নীরবে তাকিয়ে রইল। সাহাবাদের ওপর ভয়ংকর বিপদ নেমে আসছে। গোসল করে দীর্ঘ সময় নিয়ে। ভেজা চুল ঝাপটাতে ঝাপটাতে গেল ছাদের দিকে।

****

কাটাগিরির গভীর অরণ্যের মধ্যে ভগ্নপ্রায় এক পুরোনো অট্টালিকা। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় বহু বছর ধরে পরিত্যক্ত। কিন্তু অসংখ্য সশস্ত্র মানুষের আনাগোনা। এটাই মধ্যপ্রাচ্যের সব চেয়ে ক্ষমতাধর ডাকাতদলের গোপন আস্তানা। বিশাল পাথরের টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে আছে ফাইয়াজ আবরার। তার দীর্ঘদেহী অবয়ব মশালের আলোয় আরও ভয়ংকর লাগছে। প্রশস্ত কাঁধ, তীক্ষ্ণ চোয়াল, গভীর কালো চোখ। একবার তাকালে দ্বিতীয়বার চোখ ফেরাতে কষ্ট হয়। তার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে দলের প্রধান সদস্যরা।

একজন জিজ্ঞেস করল,

"সর্দার, কবে আক্রমণ করব?"

ফাইয়াজ টেবিলে কনুই ঠেকালো। সরাসরি সাহাবাদের ওপর আক্রমণ করার জন্য সম্রাট কতৃক নিমন্ত্রণ পেয়েছে বলে কথা।

“খুব শীঘ্রই। এবার পুরো শাহ পরিবারকে শেষ করতে হবে।"

কক্ষ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। একজন দ্বিধাভরে বলল

"কিন্তু সাহাবাদের সৈন্যসংখ্যা অনেক।"

ফাইয়াজ ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল। তারপর টেবিলের ওপর একটি সিলমোহর করা পত্র ছুড়ে দিল।

"আমরা একা নই।"

লোকটি পত্র খুলে পড়তেই তার চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল।

"এটা...এ…এটা আমিরাবাদ থেকে এসেছে?"

ফাইয়াজ মাথা নেড়ে বলল,

"হ্যাঁ। তাদের কিছু প্রভাবশালী লোক আমাদের সাহায্য করবে। প্রয়োজনে আরও সৈন্যও পাওয়া যাবে।"

আরেকজন বিস্মিত হয়ে বলল

“ওস্তাদ, এটা ফাঁদ ও হতে পারে। আপনি বুঝতে পারছেন সম্রাট নিজে তার অঙ্গরাজ্যে আক্রমণ করতে বলছে।”

ফাইয়াজ দরাজ কন্ঠে হাসলো। এ কথা সে ভাবেনি? ভেবেছে। কিন্তু এমন জঘন্য কাজ সম্রাটের দ্বারা সম্ভব। ফাইয়াজ পুরো পরিকল্পনাই জানে। সম্রাটের চাইতেও বড় পরিকল্পনা তার নিজের। ইংরেজ রা এদেশে আসলে তারও ও সুবিধা। তাদের বানিজ্যিক পণ্য এ অঞ্চলের মানুষের আসবাব পত্রের চেয়ে ঢের দামী। লাভ ই লাভ। সবাইকে অস্ত্র সস্ত্র প্রস্তুত করতে বলে নিজে ঘোড়া নিয়ে বেরোলো। একজন সদস্য বলল

“এত রাতে কোথায় যাচ্ছেন সর্দার?”

“কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজে”

“আমরাও আসি?”

“না, এ আমার ব্যাক্তিগত কাজ”

আর দেরি না করে ঘোড়া ছুটিয়ে চলে গেল জঙ্গল পেরিয়ে লোকালয়ের দিকে। কেন জানি না তার মন বলছে সেই নারীটি আজও আসবে।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে 11 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন