মধ্যরাত। আকাশজুড়ে অসংখ্য নক্ষত্র। অর্ধচন্দ্রের ম্লান আলোয় কাটাগিরির জঙ্গল আজ আরও রহস্যময় লাগছে। গভীর রাতের নিস্তব্ধতার মধ্যে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর দূরের কোনো নিশাচর পাখির শব্দ শোনা যায়। জঙ্গলের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে থামল শাখা। আর একটু সামনে গেলেই সাহাবাদ মহলের পাহারাদার টহল দিতে দেখা যাবে। আজ সে এক গোপন সংবাদ পেয়েছে। গত কয়েকদিন ধরে অচেনা কিছু লোককে এই এলাকায় ঘোরাঘুরি করতে দেখা গেছে। প্রহরীদের সন্দেহ, তারা সাধারণ পথিক নয়। সেই খবর যাচাই করতেই আজ একাই বেরিয়েছে শাখা। মুখ কালো কাপড়ে ঢাকা।
পিঠে তূণীর। কোমরে তলোয়ার। চাঁদের আলোয় তার ছায়াটাও সতর্ক। চারদিকে দৃষ্টি বুলিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল সে। কিন্তু আশপাশে অস্বাভাবিক কিছু চোখে পড়ল না। ঠিক তখনই পেছন থেকে ভেসে এলো ঘোড়ার ক্ষীণ খুরের শব্দ। শাখার শরীর মুহূর্তেই সতর্ক হয়ে উঠল।
এক ঝটকায় তলোয়ার বের করে পিছনে ঘুরল সে। চাঁদের আলোয় ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হলো কালো অশ্বে আরোহী এক পুরুষ। তার মুখও ঢাকা। কাঁধে কালো চাদর। সুদীর্ঘ দেহ প্রশস্ত কাঁধ।
অবয়বটা অদ্ভুত রকম পরিচিত লাগল। লোকটাও ঘোড়া থামিয়ে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। কয়েক মুহূর্ত কেউ কোনো কথা বলল না। তারপর পুরুষটি মৃদু হেসে বলল,
"তলোয়ার নামিয়ে রাখতে পারেন।"
কণ্ঠস্বরটা শুনেই শাখার মনে পড়ে গেল। সেদিনের সেই বণিক। যাকে সে পথ দেখিয়ে নগরে এনেছিল। শাখার চোখ সরু হয়ে এলো।
"আপনি?"
ফাইয়াজের বুকের ভেতর অদ্ভুত উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ল। সে নিজেও বুঝতে পারে না কেন। সেদিনের পর থেকে মেয়েটার কথা তার মাথা থেকে সরেনি। একজন অচেনা তরুণী। নিজের পরিচয় গোপন রেখেও তার মনে জায়গা করে নিয়েছে। আজও সে আসলে কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য আসেনি। নিজেকেই বারবার বলেছে সে এসেছে খবর সংগ্রহ করতে। কিন্তু হৃদয় জানে সে এসেছে এই মেয়েটিকে আবার দেখবে বলে।
ফাইয়াজ ঘোড়া থেকে নামল।
"আবার দেখা হয়ে গেল।"
শাখাও তলোয়ার খাপে ঢুকিয়ে ফেলল।
"আপনি মাঝরাতে এখানে কি করছেন?"
ফাইয়াজ হেসে বলল,
"একই প্রশ্ন তো আমি আপনাকেও করতে পারি।"
শাখা একটু অপ্রস্তুত হলো। তারপর বলল
"আমার কাজ আছে।"
"আমারও।"
দুজনেই হেসে ফেলল। অদ্ভুত ব্যাপার। তারা একে অপরের কিছুই জানে না। তবুও কথাগুলো অচেনা লাগছে না। বাতাস এসে শাখার ওড়নার প্রান্ত উড়িয়ে দিল। ফাইয়াজের চোখ থেমে গেল তার ওপর। এই মেয়েটির মধ্যে অন্যরকম কিছু আছে। কোমলতার সাহসও আছে। দুটো একসাথে সচরাচর দেখা যায় না। শাখা বলল,
"আপনার নামটাও তো জানা হলো না সেদিন।"
ফাইয়াজ কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর বলল,
"ভুলে গেছেন বুঝি? বলেছিলাম তো ফারিস।"
মিথ্যা নাম। কিন্তু নিজের প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ করার উপায় নেই। শাখাও নিজের পরিচয় নিয়ে বলল
“আমার নামও বলেছিলাম?”
“জি, আপনি শাখা”
সত্যিটুকু বলল সে। কিন্তু নিজের পরিচয়ের বাকিটা আড়ালেই রাখল। চাঁদের আলোয় দুজনের ছায়া পাশাপাশি পড়ে আছে। অথচ তাদের মাঝখানে যোজন যোজন দূরত্ব। ফাইয়াজ জানে না এই মেয়েটিই সাহাবাদের শাহজাদী।
শাখা জানে না তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সেই মানুষ, যার নেতৃত্বে এক ভয়ংকর আক্রমণের প্রস্তুতি চলছে। ভাগ্যের খেলা কত বিচিত্র। যাদের একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর কথা তাদের পথই বারবার এসে মিলছে এক জায়গা। দূরে প্রহরীদের শিঙ্গার ক্ষীণ শব্দ ভেসে এলো।
শাখা চমকে উঠল।
"আচ্ছা আমাকে যেতে হবে।"
ফাইয়াজের অদ্ভুত লাগল। কথোপকথনটা আরও কিছুক্ষণ চলুক, সে অজান্তেই সেটা চাইছিল। তবুও মাথা নেড়ে বলল,
"আবার দেখা হবে?"
শাখা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর মৃদু হেসে বলল
"ভাগ্যে থাকলে হবে।"
পরক্ষণেই ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে দিল সে। কালো অশ্ব ছুটে গেল সাহাবাদের দিকে। ফাইয়াজ স্থির দাঁড়িয়ে রইল অনেকক্ষণ। যতক্ষণ না মেয়েটির অবয়ব অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। তারপর আকাশের দিকে তাকাল। নিজের অজান্তেই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠেছে। সে জানে না কেন। আজকের রাতটা সে ভুলতে পারবে না।
*****
আমিরাবাদের আকাশে সূর্য উঠেছে। প্রাসাদের প্রধান ফটকের সামনে অস্বাভাবিক ব্যস্ততা। সারি সারি প্রহরী দাঁড়িয়ে আছে। দূর থেকে ধুলোর মেঘ উড়িয়ে এগিয়ে আসছে কয়েকটি ঘোড়া। সামনে ইংরেজ সৈনিকদের একটি ছোট দল। তাদের মাঝখানে অশ্বারোহণ করে আসছে একজন নারী প্রতিনিধি। মহিলার বয়স ত্রিশের কাছাকাছি।
উজ্জ্বল সাদা ত্বক। তামাটে-সোনালি চুল সুচারুভাবে গুছানো। ধূসর-নীল চোখ চারিদিকে ঘুরে ঘুরে দেখছে আমিরাবাদ এর আবহাওয়া।
পরনে গাঢ় খয়েরি রঙের দীর্ঘ কোট, তার ওপর রুপালি বোতামের কাজ।
চলাফেরায় অভ্যস্ত কর্তৃত্ব। যেন সে যেখানে যায় সেখানেই নিজের প্রভাব বিস্তার করতে অভ্যস্ত।
তার নাম লেডি এলিনর গ্র্যান্ট। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিশেষ প্রতিনিধি। প্রহরীরা যথাযথ সম্মান দেখিয়ে তাদের ভিতরে নিয়ে গেল। বৈঠকখানায় আপ্যায়নের ব্যবস্থা করা হলো।
লেডি এলিনর চারপাশে তাকিয়ে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছিল। প্রাসাদের স্থাপত্য, প্রহরীদের অবস্থান, সভাসদদের আচরণ, কে কাকে সম্মান করছে, কার কথা শুনে বাকিরা আদেশ পালন করছে। সবকিছু তার তীক্ষ্ণ নজর এড়াল না। সবটা বুঝে নিবার তীব্র প্রয়াস।
মুখে ভদ্র হাসি থাকলেও মনে মনে হিসাব কষছিল । এই রাজ্যের শক্তি কোথায়? দুর্বলতা কোথায়?
কাকে প্রভাবিত করা সহজ? কার ওপর ভর করে ভবিষ্যতে আরও সুবিধা আদায় করা যাবে?
কিছুক্ষণ পর তাকে গোপন সভাকক্ষে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে উপস্থিত ছিলেন সম্রাট হারুন ওয়াসেম, নায়েব, দেওয়ান এবং অন্যান্য উপদেষ্টারা। কথাবার্তা শুরু হতেই একটি সমস্যার মুখোমুখি হলো সবাই। ইংরেজি ভাষা খুব ভালো বোঝেন এমন লোক সেখানে হাতে গোনা।
সম্রাট বললেন
"মেহরাবকে ডাকা হোক।"
কিছুক্ষণ পর সভাকক্ষে প্রবেশ করল যুবরাজ।
উঁচু দেহ, দৃঢ় পদক্ষেপ, আত্মবিশ্বাসী উপস্থিতি।
লেডি এলিনর থমকে গেল যুবরাজ এর রুপ দেখে। তারপর মনোযোগ দিয়ে যুবরাজকে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল। কিন্তু মেহরাবের মুখে কোনো আগ্রহের ছাপ নেই। সে এসে সংক্ষিপ্ত সম্ভাষণ জানিয়ে সরাসরি আলোচনার বিষয়ে মন দিল।
ইংরেজ প্রতিনিধি বিভিন্ন প্রশ্ন করতে লাগলেন।
মেহরাব সাবলীল ইংরেজিতে উত্তর দিতে লাগল।
এতে এলিনর কিছুটা বিস্মিত হলো। সে ভেবেছিল এই অঞ্চলের রাজপরিবার হয়তো বিদেশি ভাষা সম্পর্কে অজ্ঞ। কিন্তু যুবরাজের উত্তর শুনে বুঝল তার ধারণা ভুল। মেহরাব শুধু ভাষাই জানে না, রাজনৈতিক বিষয়েও যথেষ্ট সচেতন। কথোপকথনের এক পর্যায়ে এলিনর বুঝতে পারল এই সভায় উপস্থিত লোকদের মধ্যে সবচেয়ে সতর্ক মানুষটি সম্ভবত এই যুবরাজই। আর মেহরাবও দ্রুত বুঝে গেল এই নারী সাধারণ দূত নন। তিনি প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি প্রতিক্রিয়া, প্রতিটি দৃষ্টিও হিসাব করে দেখছেন। উদ্দেশ্য সুবিধার ঠেকল না। সভাকক্ষের বাতাস ধীরে ধীরে ভারী হয়ে উঠল। হঠাৎ এলিনর আগের চুক্তিপত্রের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করে বসলো। উপস্থিত কেউই জানে না হারিয়ে যাওয়া চুক্তিপত্রের রহস্য। ভুজুং ভাজং বোঝানোর উপায় নেই। তাদের বিপরীতে বসে আছেন ব্রিটিশ প্রতিনিধি লেডি এলিনর গ্র্যান্ট।
মহিলার পোশাক-আশাক, বসার ভঙ্গি, চোখের দৃষ্টি সবকিছুতেই এক ধরনের অহংকার মিশে আছে। যেন তিনি অভ্যস্ত সবাইকে নিজের চেয়ে নিচু মনে করতে। লেডি এলিনরের চোখ বারবার ঘুরে ঘুরে মেহরাব এর দিকেই যাচ্ছে। সুদর্শন যুবরাজকে উপর থেকে নিচ পর্যন্ত ভালো করে পর্যবেক্ষণ করছে সে। ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে বললেন,
"ওহ... এই তো যুবরাজ?"
লেডি এলিনর এবার নিজেই কথা শুরু করলেন।
তার বাংলা উচ্চারণ স্পষ্টই বিদেশি। শব্দগুলো ভাঙা ভাঙা। তবু বোঝা যায়।
"আমি আগে নিজের পরিচয় দিই।"
তিনি গলা সামান্য উঁচু করলেন।
"আমার পিতা লর্ড লিবার্ড গ্র্যান্ট। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বহুত বড় মানুষ। আমার দাদা স্যার উইলিয়াম গ্র্যান্ট। রানীর খুব কাছের লোক ছিল।"
নায়েব মুগ্ধ হয়ে শুনছে। এলিনর আরও বললেন,
"আমাদের পরিবার বহু জেনারেশন ধরে রাজনীতি আর ব্যবসা কন্ট্রোল করে। লন্ডন শহরে গ্র্যান্ট নাম বললে বহু দেওয়ান সাহেব মাথা নাড়লেন।
"বাহ।"
এলিনরের মুখে আত্মতৃপ্তির হাসি ফুটল।
"আমাদের কোম্পানি অনেক রাজ্য সাথে কাজ করে। অনেক রাজা আসে। অনেক রাজা যায়। কিন্তু ব্রিটিশ এম্পায়ার সব সময় থাকে।"
মেহরাব শান্তভাবে শুনছে। কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। এলিনর সেটা খেয়াল করলেন।
কিছুক্ষণ পর বললেন,
"যুবরাজ সাহেব খুব চুপচাপ। আমি ভাবছিলাম প্রশ্ন করবে।"
মেহরাব নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল,
"আপনি নিজের পরিচয় দিচ্ছেন। প্রশ্ন করার প্রয়োজন দেখছি না।"
উত্তর শুনে কয়েকজন সভাসদ একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। এলিনর সামান্য ভ্রু তুললেন।
"হুমম।”
“আপনি অন্যদের মতো না। আমি যখন ছোট ছিলাম, আমার পিতা বলত দুনিয়া দুই রকম মানুষে ভরা। একদল শাসন করে। আরেকদল শাসিত হয়। আমরা প্রথম দলে।"
কথাটা শুনে কয়েকজন সভাসদ বিব্রত হয়ে পড়ল। কিন্তু মহিলা নির্বিকার। যেন এটা স্বাভাবিক সত্য। তিনি টেবিলের ওপর আঙুল ঠুকতে ঠুকতে বললেন,
"আপনাদের দেশ সুন্দর। মাটি উর্বর। নদী আছে। পাহাড় আছে। বাণিজ্যের জন্য খুব ভালো।"
তারপর হাসলেন।
"আর ভালো সম্পদ সব সময় বড় লোকেদের নজরে পড়ে।"
কথাটা শুনে মেহরাবের চোখ সরু হয়ে এল।
এই প্রথম সে সরাসরি বলল,
"সম্পদ আর মালিক এক জিনিস নয়, লেডি।"
এলিনর কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর ধীরে ধীরে হাসলেন।
"আমি বুঝতে পারছি। আপনি দেশ নিয়ে খুব গর্বিত মানুষ। এইটা ভালো। কিন্তু রাজনীতি শুধু গর্ব দিয়ে চলে না।"
মেহরাবও শান্ত স্বরে বলল
"রাজনীতি কেবল অর্থ দিয়েও চলে না।"
দুজনের চোখে চোখ আটকে গেল। সম্রাট হারুন ওয়াসেম চুপচাপ সব দেখছেন। এলিনর এবার বিষয় পাল্টালেন। কিন্তু মনে মনে নতুন হিসাব কষতে শুরু করেছেন। তিনি ভেবেছিলেন এই রাজ্যের লোকজনকে প্রভাবিত করা সহজ হবে।
দেওয়ান, নায়েব অনেককেই তিনি ইতোমধ্যে বুঝে ফেলেছেন। কিন্তু এই যুবরাজ মানুষটাকে পড়া সহজ হবে না। আর ঠিক সেই কারণেই লেডি এলিনরের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হলো মেহরাব।
সভা চলতে থাকল।বকিন্তু টেবিলের ওপরে আলোচনার চেয়ে টেবিলের নিচে লুকিয়ে থাকা রাজনীতি আরও ভয়ংকর রূপ নিতে শুরু করেছে। লেডি এলিনর গ্র্যান্টের সঙ্গে আলোচনা তখনও চলমান।বদেওয়ান সাহেব মানচিত্র খুলে বসেছেন। সাহাবাদ এর সীমানা দেখানো হচ্ছে এলিনর কে। মেহরাব নীরবে সব শুনছে। ঠিক তখনই ধড়াম! করে সভাকক্ষের বিশাল দরজাটি খুলে গেল। মুহূর্তেই সকলের দৃষ্টি সেদিকে ঘুরে গেল। প্রহরীরাও চমকে উঠল। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক অশ্বারোহী যোদ্ধা। মাথা থেকে গলা পর্যন্ত কালো-সাদা কাপড়ে আবৃত। পরণে যুদ্ধের পোশাক। কোমরে তলোয়ার। পিঠে তূণীর।
দীর্ঘদেহী অবয়ব। চলাফেরায় অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস।
সম্রাট হারুন ওয়াসেম কপাল কুঁচকে বললেন,
"কে তুমি?"
উত্তর না দিয়ে যোদ্ধাটি ধীর পায়ে ভিতরে প্রবেশ করল। প্রহরীরা তলোয়ার বের করতে উদ্যত হতেই সে হাত তুলে থামতে বলল। তারপর সবার বিস্ময়ের মধ্যে মুখের কাপড় সরিয়ে ফেলল।
এক মুহূর্তের জন্য সভাকক্ষ নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
মেহরাব বিস্ময়ে চোখ বড় করে তাকিয়ে রইল।
হারুন ওয়াসেমও হতবাক। এ যে শাখা নেওয়াজ! সাহাবাদের শাহজাদী। লেডি এলিনরও বিস্মিত হয়ে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে রইলেন। শাখা শান্তভাবে এগিয়ে এল। তার চোখে সাধারণ রাজকন্যাদের মতো কোমলতা নেই।এক যোদ্ধার আত্মবিশ্বাস। সে সরাসরি মেহরাবের সামনে এসে দাঁড়াল। মেহরাব ভ্রু কুঁচকে বলল,
"আপনি এখানে?"
শাখা কোনো উত্তর দিল না। কোমর থেকে একটি কাপড়ে মোড়ানো বস্তু বের করল।বতারপর সেটা মেহরাবের সামনে টেবিলের ওপর রাখল।
"মনে হয় এটা আপনার।"
মেহরাব কাপড় খুলতেই চিনে ফেলল। তার মূল্যবান তূণীরের হারানো অংশ। যেটা সে সাহাবাদের অতিথিশালায় ফেলে এসেছিল। মুহূর্তেই কক্ষে ফিসফাস শুরু হয়ে গেল।
দেওয়ান অবাক নায়েব ও হতভম্ব। সম্রাটও কিছু বুঝে উঠতে পারছেন না। মেহরাব কয়েক মুহূর্ত বস্তুটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর চোখ তুলে শাখার দিকে তাকাল।
"এটা আপনার কাছে এলো কীভাবে?"
শাখার ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি ফুটল।
"যেভাবে হারিয়েছিলেন, সেভাবেই পেয়েছি।"
মেহরাব বুঝল মেয়েটা সব বলবে না। তার চোখে স্পষ্ট কৌতূহল। উদ্দেশ্য কেবল তূনীর ফেরত দেওয়া নয়। লেডি এলিনরও আগ্রহ নিয়ে দৃশ্যটা দেখছেন। শাখা এবার সম্রাটের দিকে তাকিয়ে মাথা নত করল।
"ক্ষমা করবেন, বিনা অনুমতিতে সভায় প্রবেশ করেছি। কিন্তু জিনিসটা যার, তার কাছেই ফিরিয়ে দেওয়া প্রয়োজন ছিল।"
সম্রাট কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে মৃদু হাসলেন।
“তোমার সাহস প্রশংসনীয়।"
শাখা মাথা নত করল। বেড়িয়ে যাওয়ার সময় চোখ টিপলো মেহরাব এর দিকে তাকিয়ে। মেহরাব ও মৃদু হাসলো।
****
কাটাগিরির জঙ্গলেরও বহু গভীরে এমন এক স্থান আছে, যার অস্তিত্ব সম্পর্কে সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, অনেক সৈন্যও জানে না। চারদিকে আকাশছোঁয়া বৃক্ষ। এত ঘন বন যে দুপুরের সূর্যও মাটিতে ঠিকমতো পৌঁছাতে পারে না। এই জঙ্গলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে একটি পাথরের অট্টালিকা। ইংরেজরা একে বলে ফরেস্ট হাউস।
বাইরে থেকে দেখলে সাধারণ বনবাংলো মনে হয়।
কিন্তু ভিতরের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। উঁচু লোহার ফটক। চারপাশে সশস্ত্র প্রহরা। নজরদারির জন্য কাঠের উঁচু টাওয়ার। বনের মাঝখানে যেন ছোট্ট একটি গোপন দুর্গ। এখানে বসবাস করে কয়েকজন ইংরেজ চিকিৎসক, নকশাবিদ, জরিপকারী এবং কোম্পানির বিশেষ কর্মকর্তারা।
সরকারিভাবে বলা হয় এখানে বনাঞ্চল, খনিজ সম্পদ, নদীর গতিপথ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠী সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু বাস্তবে আরও অনেক গোপন নথি সংরক্ষিত আছে সেখানে।
কক্ষের পর কক্ষ ভর্তি মানচিত্র। প্রতিটি নদী, পাহাড়, গিরিপথ লাল কালিতে চিহ্নিত।
একটি বড় ঘরে কয়েকজন ইংরেজ কর্মকর্তা আলোচনা করছে। দেয়ালে ঝোলানো বিশাল মানচিত্রের সামনে দাঁড়িয়ে মূল হোতা বলল
"এই অঞ্চল দখল করতে পারলে কোম্পানি বহু বছরের সুবিধা পাবে। নদীপথ আমাদের বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।"
টেবিলের উপর ছড়ানো রয়েছে অসংখ্য নথি।
জনসংখ্যার হিসাব, বিশেষ করে শিশুদের। শস্য উৎপাদনের হিসাব। স্থানীয় পরিবারগুলোর বংশতালিকা। এমনকি বিভিন্ন রাজপরিবার সম্পর্কেও বিস্তারিত তথ্য।
তারা শুধু ভূমি নয় পুরো অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা করছে। আর এই গোপন ফরেস্ট হাউসের অস্তিত্ব সম্পর্কে সম্রাট হারুন ওয়াসেম অনেক কিছু জানলেও মেহরাবকে সব বলেননি। ইচ্ছা করেই বলেননি। কারণ তিনি মনে করেন যুবরাজ এখনও আবেগ দিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়। প্রজাদের প্রতি মায়া তার বেশিই। এত মায়ায় রাজ্য চালনা করা যায় না। অর্থবিত্ত বাড়াতে গেলে এদের বলি দেওয়াটা দোষের নয়। তবে মেহরাব এর শিকারী চোখ ফাঁকি দেওয়া বুঝি এতই কঠিন।