সাহাবাদ প্রাসাদের এসেছে এক অশনি সংকেত।
সকাল থেকেই রাজপ্রাসাদে অস্বাভাবিক ব্যস্ততা।
ভোরেই একটি গোপন বার্তা এসে পৌঁছেছে। সেই বার্তা উদ্বেগ ছড়িয়ে দিয়েছে পুরো শাহ পরিবারে।
দেওয়ানখানায় বসে বার্তাটি আবার পড়লেন বাইজিদ শাহ। তার কপালের ভাঁজ ক্রমশ গভীর হচ্ছে। বার্তায় স্পষ্ট লেখা
"খুব শীঘ্রই সাহাবাদের বিরুদ্ধে বৃহৎ আক্রমণ পরিচালিত হবে।"
কিন্তু আক্রমণকারী কারা? কোন রাজ্য? কোন দিক থেকে? সেসবের কোনো উল্লেখ নেই। শুধু সতর্কবার্তা। এবং সেটাও এমন এক গুপ্তচরের কাছ থেকে এসেছে যার তথ্য অতীতে কখনো ভুল প্রমাণিত হয়নি।
মেহেরুন্নেসা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
বাগানের দিকে তাকিয়ে থাকলেও তার মন অন্যত্র। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললেন,
"এত বড় বার্তা, অথচ শত্রুর নামটাও জানা গেল না?"
বাইজিদ শাহ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“সেটাই তো চিন্তার বিষয়। যাকে চেনা যায়, তার বিরুদ্ধে প্রস্তুতি নেওয়া সহজ। কিন্তু অচেনা শত্রুই সবচেয়ে ভয়ংকর।"
সুনেহেরা এতক্ষণ নীরবে বসে ছিলেন। হঠাৎ বললেন,
"আমার ভয় হচ্ছে বড্ড ভাইজান। সাধারণ যুদ্ধ হলে এত গোপনীয়তা থাকত না। নিশ্চয়ই বড় কিছু ঘটতে যাচ্ছে।"
কারও কাছে সুনির্দিষ্ট উত্তর নেই। ঠিক তখনই কক্ষে প্রবেশ করল শাখা, জান্নাত ও সাহারা।
সাহারা আগের মতোই চঞ্চল। তবু আজ তার চোখেও অস্বাভাবিক গম্ভীরতা। শাখা সরাসরি জিজ্ঞেস করল,
"কোনো খবর পাওয়া গেছে?"
বাইজিদ শাহ মাথা নাড়লেন।
"শুধু আক্রমণের খবর ই বোঝা যাচ্ছে। গুপ্তচর আক্রমণকারী কে চিনলে অবশ্যই জানাতো"
সাহারা ভ্রু কুঁচকে বলল,
"তাহলে আমরা আগে থেকে আক্রমণকারীকে খুঁজে বের করব।"
মেহেরুন্নেসা সঙ্গে সঙ্গে বললেন,
"শাখা! তুমি কোথাও যাবে না।"
সাহারা মুখ বাঁকিয়ে চুপ করে গেল। জান্নাত নিঃশব্দে মায়ের পাশে এসে দাঁড়াল। তার চোখেও চিন্তার ছাপ। যুদ্ধ মানেই রক্তপাত। প্রাণহানি। পরিবার হারানো। এই শব্দগুলো তার ভালো লাগে না।
বাইজিদ শাহ উঠে দাঁড়ালেন। দৃঢ় কন্ঠে বললেন
"আমাদের সেনাবাহিনী দুর্বল নয়। সাহাবাদের দুর্গও শক্তিশালী। যদিও অহংকার করা বোকামি। তবে এটাই সত্য।”
তিনি টেবিলের ওপর ছড়ানো কাগজ থেকে একটা তুলে নিল
"আমিরাবাদকে জানাতে হবে। আমরা তাদেরই অঙ্গরাজ্য। যুদ্ধে আমাদের পরাজয় মানে তাদেরও সম্মানহানি। তাছাড়াও সম্রাট হারুন ওয়াসেম আমাদের মিত্র। তাদের সাহায্য প্রয়োজন হতে পারে।"
সুনেহেরা মাথা নাড়লেন।
"সিদ্ধান্ত টা কিন্তু মন্দ নয় ভাইজান।"
মেহেরুন্নেসাও সম্মতি দিলেন।
"আগেভাগে জানানোই ভালো।"
সেদিন বিকেলেই রাজমোহরযুক্ত এক বিশেষ পত্র প্রস্তুত করা হলো। পত্রে আক্রমণের সম্ভাবনা, গুপ্ত সংবাদ এবং সামরিক সহযোগিতার অনুরোধ বিস্তারিত লেখা হলো। রাজ্যের দ্রুততম অশ্বারোহী দূতকে ডাকা হলো। বাইজিদ শাহ নিজ হাতে পত্রটি তার হাতে তুলে দিয়ে বললেন,
"এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে সরাসরি আমিরাবাদে যাবে। এই বার্তা সম্রাটের হাতে পৌঁছাতেই হবে।"
দূত মাথা নত করল। পরক্ষণেই ঘোড়ার খুরের শব্দ তুলে বেরিয়ে গেল প্রাসাদ থেকে। সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে। প্রাসাদের সর্বোচ্চ বারান্দায় দাঁড়িয়ে দূরের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন বাইজিদ শাহ। তার অভিজ্ঞ মন বলছে ঝড় আসছে, বড় ঝড়। শুধু ভূমি বা ক্ষমতার জন্য নয়। এর পেছনে আরও গভীর কোনো ষড়যন্ত্র আছে।
*****
আমিরাবাদ প্রাসাদ যেন নিজেই এক বিস্ময়।
সোনালি পাথরে গড়া উঁচু মিনার। নকশা করা খিলান আর অসংখ্য বারান্দা, যেখান থেকে দূর পর্যন্ত মরুভূমি দেখা যায়। বিকেলের আলোয় সেই মরুভূমি যেন গলিত সোনার সমুদ্র। সেই দৃশ্যই দেখছিল লেডি এলিনর গ্র্যান্ট। প্রাসাদের সর্বোচ্চ ছাদে দাঁড়িয়ে তার চোখে বিস্ময়ের ঝিলিক।
"বিউটিফুল..."
নিজের অজান্তেই বলে উঠল সে। পাশে থাকা দাসী কিছুই বুঝল না। এলিনর মুচকি হেসে আবার দিগন্তের দিকে তাকাল। এমন রাজ্য সে অনেক দেখেছে। কিন্তু আমিরাবাদের মধ্যে অন্যরকম এক আভিজাত্য আছে। এখানকার মানুষদের মধ্যেও আছে অদ্ভুত এক আত্মমর্যাদা।
যেটা তার কাছে সুবিধাজনকও হতে পারে, আবার সমস্যাও।
ছাদ থেকে নামতে নামতে তার মনে একটা চিন্তা বড় ঘুরপাক খাচ্ছে। যুবরাজকে যতটা সহজ ভেবেছিল, সে মোটেও ততটা নয়। সভাসদ রা তো তার দুটো প্রশংসাতেই গলে যাচ্ছে। কিন্তু মেহরাব?
লোকটা যেন ইচ্ছে করেই দূরে থাকে। প্রয়োজন ছাড়া কথা বলে না। রাজকীয় ভদ্রতার বাইরে একটিও অতিরিক্ত বাক্য ব্যয় করে না। এভাবে চলতে থাকলে তাকে হাত করবে কি করে। ইংরেজ দের নারী প্রতিনিধি পাঠানোর একটাই উদ্দেশ্য। সেটা হচ্ছে নারীরা নিজেদের সৌন্দর্য আর বচন ভঙ্গিতে অপর পক্ষ কে প্রভাবিত করতে পারে।
পরদিন দুপুরে বাগানের এক প্রান্তে দেখা পেল তাকে। মেহরাব ঘোড়ার জিন ঠিক করছে।
পাশে দাঁড়িয়ে আছে আলীরাজ। কিছু একটা বলছে আর নিজেই হেসে কুটিকুটি হচ্ছে।
এলিনর ধীর পায়ে এগিয়ে গেল।
"যুবরাজ।"
মেহরাব ঘুরে তাকাল। ভদ্রতার খাতিরে সাড়া দিল
"জি”
ব্যস এইটুকুই। এরপর আবার ঘোড়ার দিকে মন দিল। এলিনরের ঠোঁট শক্ত হয়ে এলো। সে বলল
"আপনার রাজ্য সত্যিই খুব সুন্দর।"
"ধন্যবাদ।"
"আমি ভাবছিলাম আজ বিকেলে যদি..."
"ক্ষমা করবেন।"
মেহরাব কথা কেটে দিয়ে বলল,
"আমার কিছু কাজ আছে।"
আলীরাজ মুখ ঘুরিয়ে কষ্টে হাসি চেপে রেখেছে। এখন হেসে ফেললে রাজার ব্যাটা ওকে মেরেই ফেলবে। এলিনরের মুখের অভিব্যক্তি দেখার মতো। মহিলাটি স্পষ্টই অভ্যস্ত, তার কথা কেউ এভাবে মাঝপথে কেটে দেয় না। মেহরাব ঘোড়ার লাগাম ধরে এগোতে এগোতে আলীরাজ কে ছোট করে বলল
“এসো”
আলীরাজ এলিনর কে দাঁত কেলিয়ে বলল
“বলছি আমি কিন্তু আজাইরাই আছি। চাইলে আমাকে নিয়ে রাজ্য ঘুরে দেখতে পারেন”
এলিনর ভেংচি কেটে বলল
“নো, থ্যাংকস”
আলীরাজ ঠোঁট কামড়ে ব্যাঙ্গ করে বলল
“এমনেই বানরের মত চেহারা। আবার ভেংচি মারায়। ইংরেজি শালী। চাপার উপ্রে আচ্ছা করে কয়টা দেওয়া লাগে”
একা একাই এলিনর কে বকতে বকতে এগিয়ে আসে। মেহরাব বলে
“কাকে গালাগাল করছো?”
“ওই সাদা দুম্বা ডা রে। শালী ঢ্যামনা আছে”
দুজনে চলে গেল নগরের বাজারের দিকে।
সন্ধ্যায় এলিনর আবার চেষ্টা করে যুবরাজ এর মুখোমুখি হতে। এইবার গ্রন্থাগারে যায় সে। কিন্তু সেখানে গিয়ে জানতে পারল যুবরাজ কয়েক ঘণ্টা আগেই বেরিয়ে গেছে। রাত হয়ে গেল কতখানি তাও তার দেখা নেই। এমনিতেই মেহরাব আজকাল মহলে বেশি সময় থাকে না। আয়েশা চেপে ধরে সাহারার কথা এটা ওটা জিজ্ঞেস করে। এলিনর বিরক্ত প্রায়। আয়েশা বেগমের সামনেই জিজ্ঞেস করে ফেলল,
"যুবরাজ কোথায়?"
আয়েশা বেগম ছেলের গা ঘেষা নারী মোটেও পছন্দ করেন না। তবুও হেসে বললেন
"ওকে কি আর খুঁজে পাওয়া যায় মা? ও নিজের মতো থাকে। তাছাড়াও ক'দিন পর থেকে রাজ্য সামলাবে, সিংহাসনে বসবে। এখন ওর বহুত কাজ”
রাতে নিজের কক্ষে বসে রাগে টেবিলে আঙুল ঠুকছিল এলিনর। জানালার বাইরে মরুভূমির রাত। আকাশভরা তারা। তার সামনে ছড়ানো নথিপত্র। কিন্তু মনোযোগ নেই। কপালে আঙুল ঘষে বলল
"স্ট্রেঞ্জ ম্যান..."
পাশে দাঁড়ানো ইংরেজ সহকারী বলল,
"ম্যাডাম?"
এলিনর চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার চোখে চিন্তার ঝিলিক।
“ম্যাডাম সম্রান হারুন ওয়াসেম যে স্টেপ নিয়াছে তাহার সম্পর্কে প্রিন্স অবগত নয়। হামাদের সমস্যা হইতে পারে”
এলিনর ও তাই ভাবছিল। তার অভিজ্ঞ রাজনৈতিক মন বুঝে গেছে যদি কখনো আমিরাবাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় সিদ্ধান্ত আসে,
তাহলে হারুন ওয়াসেমের বিপক্ষে সবচেয়ে বড় বাধা হবে মেহরাব। আর তাকে নিজের পক্ষে আনতে পারলে অনেক পথ সহজ হয়ে যাবে।
কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত যুবরাজ মেহরাব কে পাচ্ছেই না এলিনর।
*****
ভোর হতেই আমিরাবাদ প্রাসাদের পশ্চিম ফটকে এক অদ্ভুত অতিথির আগমন ঘটল। লোকটি একা নয় সঙ্গে আছে দুজন অশ্বারোহী। তবে তাদের পোশাক সাধারণ বণিকদের মতো। দূর থেকে দেখলে কোনো সন্দেহই জাগে না। কিন্তু মেহরাবের শিকারি চোখে কিছু বিষয় সঙ্গে সঙ্গেই ধরা পড়ে বেল। লোকটার চলাফেরা। ঘোড়া থেকে নামার ভঙ্গি। কোমরে বাঁধা অস্ত্রের চিহ্ন। আর সবচেয়ে বড় কথা তারা কোনো রাজ্যের পতাকা বহন করছে না। মেহরাব দূরের বারান্দা থেকে তাকিয়ে দেখছে। ভ্রু কুঁচকে বলল,
"লোকটা কে?"
পাশের প্রহরী উত্তর দিল,
"সম্রাটের বিশেষ অতিথি। নাম ফারিস বলে শুনেছি।"
মেহরাবের সন্দেহ আরও বাড়ল। ঠিক তখনই সম্রাট হারুন ওয়াসেম নিজেই নিচে এসে অতিথিকে অভ্যর্থনা জানালেন। এ দৃশ্য দেখে মেহরাব বিস্মিত হলো। কারণ সাধারণ অতিথির জন্য সম্রাট নিজে খুব কমই আসেন। কিছুক্ষণ পর সম্রাট অতিথিকে নিয়ে নিজের ব্যক্তিগত কক্ষে চলে গেলেন। দরজা বন্ধ, প্রহরী মোতায়েন।
কাউকে ভিতরে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না।
এমনকি নায়েবকেও না। মেহরাব বিষয়টা মোটেও স্বাভাবিক মনে করল না। সে এগোতেই প্রহরীরা পথ রোধ কর
"ক্ষমা করবেন যুবরাজ। সম্রাটের নির্দেশ।"
মেহরাব ঠান্ডা চোখে দরজার দিকে তাকাল।
তার মনে হচ্ছে কিছু একটা লুকানো হচ্ছে তার থেকে। উপায় না পেয়ে চলে গেল সেখান থেকে।
কক্ষের ভিতরে বসে আছে ফাইয়াজ। আজও সে নিজের প্রকৃত পরিচয় গোপন রেখেছে। সম্রাটের সঙ্গে তার আলোচনা চলছে সীমান্ত পরিস্থিতি, বাণিজ্যপথ এবং সাম্প্রতিক অস্থিরতা নিয়ে।
টেবিলের ওপর ছড়িয়ে আছে জমিজমার সব দলিল। ফাইয়াজ মনোযোগ দিয়ে সব দেখছে।
ঠিক তখনই ঠক ঠক ঠক করে দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো। সম্রাট বিরক্ত গলায় বললেন,
"কি ব্যাপার?"
বাইরে থেকে প্রহরীর কণ্ঠ ভেসে এলো।
"জরুরি সংবাদ, জাহাপনা। সাহাবাদ থেকে দূত এসেছে।"
কক্ষের ভিতর ছোটখাটো এক বিস্ফোরণ ঘটলো।
ফাইয়াজের চোখ সরু হয়ে গেল। সম্রাটও সোজা হয়ে বসলেন।
"কি সংবাদ?"
প্রহরী বলল,
"সাহাবাদের জমিদার বাইজিদ শাহের পত্র। অত্যন্ত জরুরি বলে জানিয়েছেন।"
সম্রাট কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন
"ভিতরে পাঠাও।"
দরজা খুলে দূত প্রবেশ করল। ধুলোয় মাখা পোশাক। দীর্ঘ পথ অতিক্রম করার ক্লান্তি মুখে স্পষ্ট। সে হাঁটু গেড়ে বসে সিলমোহরযুক্ত পত্রটি এগিয়ে দিল। সম্রাট পত্র খুললেন। পড়তে পড়তে তার মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল। ভ্রু কুঁচকে উঠল। দৃষ্টি কঠিন হয়ে এলো। পত্রে লেখা সাহাবাদের কাছে নির্ভরযোগ্য সূত্রে খবর এসেছে, অজ্ঞাত শক্তি খুব শীঘ্রই তাদের ওপর আক্রমণের পরিকল্পনা করছে। তারা মিত্র হিসেবে আমিরাবাদের সহযোগিতা চেয়েছে।
সম্রাট পত্রটি ভাঁজ করলেন। ফাইয়াজ নীরবে তার প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করতে লাগল। দুজনের কেউই খেয়াল করল না কক্ষের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মেহরাবের মনে সন্দেহের আগুন আরও প্রবল হয়ে উঠেছে। নিশ্বঃব্দে সবটা শুনে নিল সে। সম্রাট তাদের পক্ষপাতিত্ব না করলেও, সে অবশ্যই করবে।
***
ভোরবেলা সাহাবাদ প্রাসাদের পিছনের বাগানে জান্নাত ফুল গাছে পানি দিচ্ছিল। তার স্বভাবই এমন। মহলের হট্টগোলের চেয়ে গাছপালা, পাখি আর ফুলের সঙ্গেই তার বেশি সখ্য। ঠিক তখনই পেছন থেকে ভেসে এলো সাহারার উচ্ছ্বসিত কণ্ঠ
"আপা! আপা! দেখ আমি কি এনেছি!"
জান্নাত ঘুরে দাঁড়াতেই দেখল সাহারা দুই হাতে কিছু একটা আগলে ধরে দৌড়ে আসছে।
মুখভরা হাসি। জান্নাতের কপালে ভাঁজ পড়ল।
"আবার কি ধরেছিস?"
"আগে দেখ না!"
বলেই সাহারা হাত সরিয়ে দিল।
"আআআআ!"
চিৎকার করে উঠল জান্নাত। তার সামনে কাঁটায় ভরা এক সজারু ছানা!
ভয়ে পিছিয়ে যেতে গিয়ে পা হড়কে গেল তার।
সজারুটাও বোধহয় ভয় পেয়ে গেল। ফুঁসফুঁস শব্দ করে এক দৌড়ে গিয়ে সাহারার পায়ের পিছনে লুকালো। যেন সে-ই বেচারা! সাহারা হতভম্ব।
"আরে আপা! ভয় পাও কেন? ও খুব ভালো! কামড়ায় না!"
জান্নাত চোখ বড় বড় করে বলল,
"এটা ভালো? এটাকে তুই ভালো বলছিস? আর এই জিনিস কোথা থেকে আনলি?"
সাহারা নির্লজ্জ ভঙ্গিতে হেসে বলল,
"জঙ্গল থেকে। একা একা ঘুরছিল, তাই নিয়ে এলাম।"
জান্নাত কপালে হাত দিল।
"হে আল্লাহ!"
তর্কাতর্কির মাঝেই সজারুর একটি কাঁটা এসে জান্নাতের পায়ে বিঁধল।
"উফ!"
ব্যথায় মুখ কুঁচকে গেল তার। সঙ্গে সঙ্গে সাহারার হাসি মিলিয়ে গেল। সে ছুটে এসে জান্নাতের পায়ে ধরল।
"আপা! লেগেছে?"
জান্নাত কিছু বলার আগেই সাহারার মুখ মলিন হয়ে গেল। সে যতই দুরন্ত হোক, জান্নাতের কষ্ট সে একদমই সহ্য করতে পারে না। মেহেরুন্নেসা এসে দেখলো জান্নাতের পায়ে সজারুর কাটা ফুটে গলগল করে রক্ত পড়ছে। সাহারা কে এত্ত গুলা বকাবকি করে জান্নাতকে ভিতরে নিয়ে গেল। সারাদিন সাহারাকে অস্বাভাবিক চুপচাপ দেখা গেল। জান্নাতও বিষয়টা খেয়াল করল। সারাদিন মেয়েটা আসেও নি জান্নাতের কক্ষে। বোধহয় মায়ের ভয়ে। হঠাৎ দরজার আড়াল থেকে সাহারা উঁকি দিল। তার হাতে ছোট্ট একটি কাঠের খাঁচা।
চোখে রহস্যময় হাসি।
"আপা?"
"হুমমমম?"
"রাগ করেছো?"
জান্নাত হাসল।
"না।"
সাহারা যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। তারপর খাঁচাটা সামনে ধরল।
"তোমার জন্য এনেছি।"
জান্নাত অবাক হয়ে খাঁচার দিকে তাকাল। বিস্ময়ে নিঃশ্বাস আটকে গেল। ভিতরে একটি প্রজাপতি।
কিন্তু সাধারণ প্রজাপতি নয়। তার ডানায় নীল, রূপালি আর সবুজ রঙ এমনভাবে মিশে আছে যেন চাঁদের আলো গলে বসে আছে তার ওপর।
আলো পড়লেই রঙ বদলে যাচ্ছে। মুহূর্তে নীল।
মুহূর্তে সবুজ আবার রূপালি। এমন প্রজাপতি জীবনে দেখেনি জান্নাত।
"সুবহানআল্লাহ..."
অবচেতনেই বলে উঠল সে। সাহারা গর্বিত মুখে বলল,
"তোমার জন্য ধরেছি। আঘাত লাগার ক্ষতিপূরণ।"
জান্নাত হেসে ফেলল। তারপর ছোট বোনটাকে জড়িয়ে ধরল। সাহারার মুখ মুহূর্তেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সন্ধ্যায় তারা মহলের মূল অংশে ফিরল। সুনেহেরা বসে ছিলো জলচৌকি তে। জান্নাত খাঁচাটা টেবিলের ওপর রাখতেই সুনেহেরার চোখ সেখানে আটকে গেল। এটা দেখেই যেন মুখের রঙ বদলে গেছে।
"এটা কোথায় পেয়েছ?"
সাহারা উৎফুল্ল হয়ে বলল
"জঙ্গলে।"
সুনেহেরা খাঁচার কাছে এগিয়ে এলেন।
তার চোখে অবিশ্বাস।
"অসম্ভব...অসম্ভব এ তুই কি করে পেলি?
মেহেরুন্নেসাও পাশে এসে দাঁড়ালেন।
"কি হয়েছে?"
সুনেহেরা নিচু স্বরে বললেন,
"এই প্রজাতিটা আমি শেষ দেখেছিলাম প্রায় পনেরো বছর আগে।”
সাহারা ভ্রু কুঁচকে বলল,
"উফফফ একটা প্রজাপতি নিয়ে এত অবাক হওয়ার কি আছে?"
সুনেহেরা খাঁচার দিকে তাকালেন।
“তুমি জানো না। এই প্রজাপতির খোঁজ বহু বছর ধরে বিদেশিরা করছে। বিশেষ করে ইংরেজরা।"
জান্নাত বিস্মিত।
"কেন?"
সুনেহেরা কিছুক্ষণ চুপ রইলেন।
তারপর বললেন,
"শোনা যায় এই প্রজাতি কেবল সাহাবাদের নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে পাওয়া যায় এবং যেখানে এরা বাসা বাঁধে, সেখানে বিরল কিছু উদ্ভিদও জন্মায়।"
সেই উদ্ভিদ নিয়েই ইংরেজদের আগ্রহ।"
সাহারার চোখ চকচক করে উঠল।
"মানে এটা খুব বিরল?"
"খুবই।"
মেহেরুন্নেসা এবার কড়া স্বরে বললেন,
"আর এই কারণেই কাল সকালেই এটাকে যেখানে পেয়েছ সেখানে ছেড়ে দিয়ে আসবে।"
সাহারা সঙ্গে সঙ্গে মুখ ফুলিয়ে ফেলল।
"কি? এত কষ্ট করে ধরেছি! নাআআআ! ও মনি মা মাকে বলো না। আমি এটা ছাড়ব না।
সুনেহেরা মৃদু হেসে বললেন,
"প্রকৃতির জিনিস প্রকৃতিতেই সুন্দর।"
সাহারা প্রতিবাদ করতে গিয়েও থেমে গেল।
কিন্তু তার মনে তখন অন্য প্রশ্ন। সে প্রজাপতিটা পেয়েছে জঙ্গলের এমন এক অংশে—
যেখানে সাধারণত কেউ যায় না। আর সেখানে যদি সত্যিই এমন কিছু থাকে, যার জন্য এত বছর ধরে ইংরেজরা খোঁজ করছে তাহলে কি সেই জঙ্গলের গভীরে আরও কোনো গোপন রহস্য লুকিয়ে আছে?
****
বাগানের মাঝখানে পাথরের তৈরি ফোয়ারার পাশে দাঁড়িয়ে আছে মেহরাব। হাতে বাজপাখির চামড়ার দস্তানা। তার প্রিয় শিকারি বাজটাকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছিল। ঠিক তখনই পিছন থেকে এলিনর এর কণ্ঠ ভেসে এলো।
"প্রিন্স”
মেহরাব চোখ না ঘুরিয়েই বলল,
“আপনি? কী চাই?"
লেডি এলিনর ঠোঁট চেপে হাসল।
“সব সময় কি চাইতেই আসি নাকি?”
"কোনো না কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে তো অবশ্যই আসেন।"
এলিনর ভ্রু তুলল।
"অন্য সবাই কি উদ্দেশ্য ছাড়া কথা বলে?"
"হ্যাঁ। অন্তত আমার রাজ্যে বেশিরভাগ মানুষ তাই করে।"
এবার এলিনর হেসে ফেলল।
"ইন্টারেস্টিং।"
মেহরাব বাজপাখিটাকে উড়িয়ে দিল। পাখিটি আকাশে কয়েক পাক ঘুরে আবার তার হাতে ফিরে এলো। এলিনর মুগ্ধ হয়ে দেখল।
"আপনি শিকার খুব ভালোবাসেন?"
“হ্যাঁ।"
“আই সি। অনেক বিপজ্জনক জায়গায় শিকার করেছেন নিশ্চয়ই?”
"সবচেয়ে বিপজ্জনক শিকার হলো রাজনীতি।"
এলিনর চুপ করে গেল। অনুভব করল লোকটা একটা কথার আড়ালে আরেকটা কথা লুকিয়ে রাখতে জানে। কথার মারপ্যাচ বড় ভয়ংকর।
এলিনর ফোয়ারার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
"আমি শুনেছি সাহাবাদ খুব সুন্দর জায়গা।"
মেহরাবের চোখে সন্দেহের ঝিলিক দেখা দিল।
কিন্তু সে সেটা প্রকাশ করল না।
"হ্যা সুন্দর।"
"আপনি প্রায়ই যান?"
"না। যখন প্রয়োজন হয়।"
এলিনর মেহরাব এর কাঁধে হাত রেখে বলল
“আমি যেতে চাইবো বলে আগেই দরকার এর অযুহাত দিচ্ছেন?”
মেহরাব তার হাতটা সরিয়ে দিয়ে ফিচেল হাসলো "আপনার পর্যবেক্ষণ শক্তি বেশ ভালো।"
"ধন্যবাদ।"
এলিনর কিছু বলবে তার আগেই আলীরাজ সেখানে হাজির
“ভাগ্নে, তুই এই বিদেশি মেয়ে ছেলের সাথে কি করছিস?”
মেহরাব বাজপাখি টার পালক টানতে টানতে বলল
“মামা, ওনার খুব কবিতা শোনার শখ জেগেছে। তুমি তল খুব ভালো কবিতা শোনাও। যদি ওনাকে একটু…..?
আলীরাজ এলিনর এর দিকে তাকিয়ে মুখ বাকালো
“এসব কচুপোড়া মহিলাদের জন্য আমার কবিতা আসে না। কপাল ডা দেখ। মনে হয় শুকনা ঠাডা পড়ে ছড়াই গেছে। শ্যাহহ।”
মেহরাব হো হো করে হেসে উঠলো। এলিনর কতদূর বুঝেছে কে জানে। বিরবির করে গালি দিল
“স্টুপিড”
গলা ঝেড়ে নিজের মুখে আবার আবেদনময়ী ঝিলিক ফুটিয়ে তুলে মধুর সুরে বলল
“প্রিন্স, ডু ইউ নো ইংলিশ?”
মেহরাব বাঁকা হেসে যেতে যেতে বলল
“ইয়েস, ফা*ক ইউ”