ফন্ট সাইজ:
থিম:
রক্তমুকুট

14

লেখক: জান্নাতুল ফেরদৌস

রাত গভীর। সাহাবাদ প্রাসাদের চারপাশ নিস্তব্ধতায় ডুবে আছে। পাহাড়গুলো জোৎস্নার আলোয় রূপালি হয়ে উঠেছে। আকাশভরে উঠেছে পূর্ণিমার চাঁদ। শীতল বাতাসে দুলছে গাছের ডালপালা। সুনেহেরা হাতে এক পেয়ালা গরম দুধ নিয়ে সাহারার কক্ষের দিকে এগিয়ে এলেন প্রতিদিনের মতোই। এই মেয়েটার বয়স যতই হোক, তার কাছে এখনও শিশু। দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকতেই কপালে ভাঁজ পড়ল। ঘর ফাঁকা পালঙ্ক খালি। জানালা গুলো খোলা পর্দা বাতাসে উড়ছে।

"আবার কোথায় গেল এই মেয়ে?"

বিরক্তি নিয়ে চারপাশে তাকালো সে। কেমন অদ্ভুত একটা সুর ভেসে এলো কানে। খুব মৃদু শোনা যায়। দূর থেকে আসছে বোধহয়। কিন্তু অদ্ভুত সুন্দর সেই সুর। সুনেহেরা থমকে গেলো।

সুরটা যেন বাতাস ভেদ করে সরাসরি কানে এসে লাগছে। মায়াবী বাঁশির সুর। এমন মধুর, এমন কোমল যে শুনলে মনে হয় বুকের ভেতর জমে থাকা সব কষ্ট গলে যাচ্ছে। অজান্তেই তিনি বারান্দার দিকে এগিয়ে গেলেন। বারান্দায় এসে দাঁড়াতেই চোখ চলে গেল উত্তরের দিকে। দূরে, অনেক দূরে অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে সেই পরিত্যক্ত প্রাসাদ। উত্তরের প্রাসাদ। জোৎস্নার আলোয় কালো ছায়ার মতো লাগছে সেটাকে।

প্রাসাদের ভাঙা মিনার, ধ্বংসপ্রাপ্ত দেয়াল, অসংখ্য কালো জানালা। সব যেন মৃত কোনো দৈত্যের চোখ। সেখান থেকেই ভেসে আসছে সেই বাঁশির সুর। সুনেহেরার বুক ধড়ফড় করতে শুরু করল। শরীরের লোম কাঁটা দিয়ে উঠল। তবুও চোখ ফেরাতে পারলো না। সুরটা ধীরে ধীরে আরও স্পষ্ট হলো। সুনেহেরার মানসিক অবস্থা পরিবর্তন হতে শুরু করলো। মনে হতে লাগল ওই প্রাসাদে যেতে হবে। যেন কেউ তাকে ডাকছে। কেউ অপেক্ষা করছে। বহু বছরের অপেক্ষা।

বহু বছরের অপূর্ণতা, বহু বছরের কান্না। সুনেহেরা নিজের বুক চেপে ধরলেন।

"না...না..."

নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু সুরটা মনের গভীরে ঢুকে যাচ্ছে। সাথে দাগ কেটে যাচ্ছে অতীতের ব্যথা। সব একে একে জেগে উঠতে লাগল। দুই হাত দিয়ে কান চেপে ধরলো সে।

"থামো। কে বাজাচ্ছো থামো..."

কিন্তু আশ্চর্য! কান চেপেও সুরটা বন্ধ হলো না। আরও পরিষ্কার শোনা যাচ্ছে। যেন সুরটা বাইরে নয় তার নিজের মাথার ভেতর বাজছে। তার নিজের হৃদয়ের মধ্যে বাজছে। পা দুটো কাঁপতে শুরু করল। শ্বাস ভারী হয়ে উঠল। চোখ স্থির হয়ে গেল উত্তরের প্রাসাদের দিকে। মনে হচ্ছে একবার গেলে ক্ষতি কি? একবার গিয়ে দেখে আসলেই তো হয়। একবার শুধু একবার। অনিচ্ছায় সে পা বাড়ালো। হাতে ধরা দুধের পেয়ালাটা মেঝেতে পড়ে ভেঙে গেল। তাও খেয়ালও করলো না।

মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই। চোখে অদ্ভুত শূন্যতা। যেন সম্মোহিত হয়ে গেছেন। বারান্দা থেকে নেমে প্রাসাদের উত্তর ফটকের দিকে হাঁটতে শুরু করলেন। বাতাসে তখনও ভাসছে সেই অলৌকিক বাঁশির সুর। উত্তরের প্রাসাদের একটি ভাঙা মিনারের কালো জানালায় যেন ক্ষণিকের জন্য একটি ছায়ামূর্তি দেখা দিল। কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে অন্ধকারের মধ্যে। বাঁশির সুর ও ক্রমশ আরও মধুর হয়ে উঠছে। যেন কাউকে নিজের দিকে টেনে আনছে। বাঁশি বহুদিন পর অবশেষে সে তার পরবর্তী শিকারকে খুঁজে পেয়েছে।

***

সাহাবাদের উত্তর প্রান্ত যেন আজ অন্য এক জগতের অংশ। ঘন কুয়াশা মাটির বুক জড়িয়ে আছে। দূরের শুকনো গাছগুলোকে মৃত মানুষের হাতের মতো দেখাচ্ছে। মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে সেই অভিশপ্ত স্থাপনা উত্তরের প্রাসাদ। প্রাসাদ বললে ভুল হবে। এ যেন ধ্বংসস্তূপের বেশে ঘুমিয়ে থাকা কোনো দৈত্য। শত শত বছরের পুরোনো কালো পাথরে গড়া বিশাল অট্টালিকা। ভাঙা মিনারগুলো আকাশ ছুঁয়ে গেছে। কোথাও দেয়াল ধসে পড়েছে। জানালার খিলান অর্ধেক ঝুলে আছে। লতাগুল্ম আর বুনো বৃক্ষ দেয়াল ভেদ করে বেরিয়ে এসেছে। প্রাসাদের প্রধান লোহার ফটক মরিচায় খেয়ে লালচে হয়ে গেছে। জোৎস্নার আলোয় পুরো স্থাপনাটাকে মনে হচ্ছে কোনো মৃত সাম্রাজ্যের কবর। সেই নীরবতার মাঝেই ভেসে আসছে এক অদ্ভুত বাঁশির সুর।

মিষ্টি, সম্মোহনী আর বেদনামাখা। সাহারা সেই সুরের পিছু পিছু এগিয়ে চলেছে। তার হাতে ছোট্ট একটি লণ্ঠন। কোমরে গোঁজা ছুরি। প্রাসাদের ভেতরে ঢুকতেই ঠান্ডা একটা বাতাস শরীর কাঁপিয়ে দিল। চারপাশে অন্ধকার। ভাঙা স্তম্ভ। ধুলো জমে থাকা মেঝে। ছাদের কোথাও কোথাও বড় বড় ফাটল। সেখান দিয়ে চাঁদের আলো এসে পড়েছে। সাহারা ধীরে ধীরে এগোতে লাগল। পায়ের শব্দই যেন প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে আসছে।

কিন্তু আশ্চর্য সুরটা ক্রমশ পরিষ্কার হচ্ছে। মনে হচ্ছে উপরের কোনো জায়গা থেকে আসছে। একটা পাকানো সিঁড়ি বেয়ে উঠল সে। তারপর আরেকটা, তারপর আরও একটা। যত উপরে উঠছে, বাতাস তত ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। অবশেষে সে পৌঁছালো প্রাসাদের সর্বোচ্চ মিনারের চূড়ায়।

আর সেখানে পৌঁছে তার পা থেমে গেল।বচূড়ার কিনারায় একজন বসে আছে দুই পা ঝুলিয়ে।

চাঁদের আলোয় রূপালি হয়ে আছে তার বর্ম।

মাথায় ধাতব শিরস্ত্রাণ। পিঠ অবধি নেমে আসা কালো চাদর। হাতে বাঁশি। সে ধীর তালে বাঁশি বাজিয়ে চলেছে। যেন পৃথিবীতে আর কেউ নেই।

শত বছরের নিঃসঙ্গতা নিয়ে বসে আছে। সাহারা বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল। এই লোকটাকেই তো সে আগে দেখেছিল! সেই বর্ম পরিহিত মানুষ।

স্বপ্নে নাকি বাস্তবে আজও বুঝতে পারে না।

"এই যে!"

ডেকে উঠল সাহারা। কোনো সাড়া নেই। সে একমনে বাঁশি বাজতেই থাকল।

"শুনছেন?"

লোকটার শরীরের একটুও নড়াচড়া নেই। যেন সে শুনতেই পাচ্ছে না। সাহারা বিরক্ত হয়ে আরও কাছে গেল।

"আপনি কে? শুনছেন? কে আপনি?"

তবুও কোনো উত্তর নেই। সাহারার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল।

"এই যে বর্মওয়ালা মানুষ! আপনার সাথেই কথা বলছি!"

তবুও কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। লোকটা যেন পাথর। জীবন্ত কোনো মানুষই নয়।

ঠিক তখনই পেছন থেকে কেউ তার কাঁধে হাত রাখল। বরফের মতো ঠান্ডা। সাহারার বুকের ভেতর ধক করে উঠল। সে চিৎকার করে ঘুরে দাঁড়াল।

"আআআআ!"

চিৎকারটা শেষ হওয়ার আগেই একটা হাত এসে তার মুখ চেপে ধরল।

"চুপ!"

গম্ভীর, বিরক্ত গলা। সাহারা চোখ বড় বড় করে তাকাল। তারপর মুখ চিনতেই ক্ষেপে উঠল।

"ম্মমম!"

মেহরাব বিরক্ত মুখে হাত সরিয়ে নিল।

"তুমি কি পাগল?"

সাহারা হাঁফাতে হাঁফাতে বলল,

“নষ্ট ব্যাটা ছেলে। রাত বিরেতে মেয়ে লোকের গায়ে হাত দিতে লজ্জা করে না?”

মেহরাব ভ্রু কুঁচকাল।

“তাই বলে কান বাঁচাবো না? পিরিত করতে ধরেছি নাকি। চেঁচিয়ে কানের মাথা খাচ্ছিলে তাই ধরেছি। গলার কি জোর! যেন বুনো শকুন"

সাহারা চোখ বড় বড় করে বলে

“কি বললেন? একে তো মাঝরাতে একটা মেয়ের পেছনে পেছনে জঙ্গলে ঘুরছেন। আবার আমাকে শকুন বলছেন? আবার পাগল ও বললেন”

মেহরাব বুকে হাত গুঁজে দাঁড়াল।

"ওহ্! আচ্ছা আমি তাহলে তোমার জন্য এসেছি? নিজেকে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভাবো না।"

মেহরাব ঠান্ডা চোখে তাকাল।

“তুমি এখানে কি করছো?"

"জোৎস্না দেখতে এসেছি।"

“ভয়ংকর জায়গায়?"

"হুম।"

মেহরাব চারপাশে তাকিয়ে বলল,

"একলা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কার সাথে কথা বলছিলে?"

সাহারা অবাক।

"কার সাথে মানে? ওই লোকটার সাথে।"

"কোন লোকটা?"

"ও যে এখানে বসে বাঁশি বাজাচ্ছ…..।"

কোথাও কেউ নেই। আর না বাশির সুর আছে। মেহরাব চোখ সরু করে তাকালো।তারপর বলল,

“আমিরা বাদে ভালো হেকিম আছে। ভূত ছাড়ায় ভালো। গজারি কাঠের বারি দিয়ে। যোগাযোগ করতে বলব তোমার বাবার সাথে”

সাহারা চোখ কুঁচকাল।

"আশ্চর্য আমি কানা নাকি? সামনেই তো বসে ছিল! বর্ম পরে! বাঁশি বাজাচ্ছিল! আমি এতক্ষণ তার সাথে কথা বললাম!"

“আচ্ছা? তা কি বলছিলো সে শুনি?”

সাহারা কপাল কুচকে বলল

“উত্তর ই তো দিল না”

“কেউ থাকলে না উত্তর দিবে”

সাহারা কপাল চেপে ধরলো

“উফফফ আমি মিথ্যে কেন বলব? লোকটা ছিল এখানে বর্ম পরে বসে ছিল”

“ওওওওওওও ম্যাডাম! বর্ম যোদ্ধা রা পরে। এবার কি বলতে চাচ্ছ একজন যোদ্ধা এতই আজাইরা যে এই ভূতূড়ে বাড়ি এসে বাঁশি বাজাবে?”

সাহারা রেগে আগুন।

"তার মানে কি আমি মিথ্যে বলছি?"

"এসো!"

বলেই তার হাত ধরে সামনে টেনে নিল। চূড়ার কিনারায় দাঁড় করিয়ে দেখাল।

“কোথায়? দেখাও তো”

"এইখানে ছিল! এইখান টায় বসেছিল! এই যে এইখানে!"

মেহরাব নিচে তাকাল। চারপাশে তাকাল। তারপর আবার সাহারার দিকে।

"কোথায়?"

সাহারা সামনে তাকাল। আর তার বুক কেঁপে উঠল। পুরো জায়গাটা খালি। কেউ নেই। কোনো মানুষ নেই। কোনো পদচিহ্নও নেই। যেন কখনো কেউ এখানে ছিলই না। সাহারার মুখের রং বদলে গেল।

"না না, ছিল।বআমি দেখেছি।বআমি তার সাথে কথা বলেছি।"

মেহরাব এবার একটু গম্ভীর হলো। কারণ সাহারার চোখে এমন অস্থিরতা তার বুজরুকি মনে হলো না। এই মেয়েটা বাঘের সামনে দাঁড়িয়ে তর্ক করতে পারে। ডাকাতের পিছু নিতে পারে। রাতের জঙ্গলে এসে এসব বাজে বকার মত মেয়ে সাহারা কখনোই না। ঠিক তখনই দূর থেকে আবার ভেসে এলো সেই বাঁশির সুর। খুব ক্ষীণ। মনে হলো যেন প্রাসাদের ভেতরের কোথাও থেকে। সাহারা আর মেহরাব একসাথে ঘুরে তাকাল। মুহূর্তেই দুজনের চোখ মিলল। কারণ এবার সুরটা শুধু সাহারা নয়।

মেহরাবও শুনেছে।

মেহরাবের তীক্ষ্ণ চোখ ধীরে ধীরে সরু হয়ে এলো।

সে নিচু স্বরে বলল,

"আচ্ছা...তাহলে হয়তো তুমি পুরোপুরি পাগল হওনি।"

সাহারা ক্ষেপে গিয়ে বলল,

"হয়তো মানে? আমি কখনোই পাগল ছিলাম না!"

মেহরাবের ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটল।

"সেটা পরে দেখা যাবে বনবিড়াল। তার আগে রাতের বেলায় এমন ভন্ডামি করা খাঙ্গারির ছেলে কে আগে দেখে নিচ্ছি।”

চাঁদের আলোয় ভেসে থাকা উত্তর প্রাসাদের ভাঙা চূড়ায় দাঁড়িয়ে দুজন। সাহারা হাত গুটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মেহরাব সিঁড়ির দিকটা দেখে বলল,

"তুমি পথ চেনো তো?"

"হ্যাঁ।"

"তাহলে সামনে চলো।"

সাহারা সঙ্গে সঙ্গে মুখ বাঁকাল।

"আপনার কথা মত কেন যাব? আপনার হাত-পা কি ভেঙে গেছে যে আপনি যেতে পারছেন না?"

মেহরাব দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

"আমিও যাচ্ছি। এই প্রাসাদে ঢোকার সময় তিনটা সিঁড়ি পেয়েছি। চারটা করিডোর। আর পাঁচটা ভাঙা পথ। আমি কোন দিক দিয়ে এসেছি মনে নেই।"

সাহারা ঠোঁট টিপে হাসল। অবশেষে সুযোগ পেয়েছে।

"বেশ হয়েছে। আপনাকে কে বলেছিল এখানে আসতে? এখন ঘুরে ঘুরে সকাল হওয়া পর্যন্ত ভূত খুঁজেন।"

মেহরাব ভ্রু তুলল।

"তুমি সাহায্য করবে না?"

"না।"

"কেন?"

সাহারার মুখ চুপসে গেল

“কারণ আমিও পথ চিনি না। প্রথম বার এসেছি এখানে।”

মেহরাব চোখ পাকিয়ে তাকাতেই বলল

“তোমাদের ভুতুড়ে বাড়ি যেহেতু, সেহেতু তুমি পথ পাবে খুঁজলেই। খোঁজো চলো”

"কেন? আমাক অপহরণ করেছিলেন তখন মনে ছিল না আবার বিড়াল ও বলেছিলেন”

মেহরাব মাথা নেড়ে বলল,

"শেষের অভিযোগটা সবচেয়ে গুরুতর মনে হচ্ছে।"

"অবশ্যই।"

"তাহলে কি করা যায়?"

সাহারা বিজয়ীর হাসি হাসল।

"তুমি নিজেই বের হওয়ার রাস্তা খুঁজে নাও। তারপর আমাকে ডেকে নিও”

মেহরাব দুহাত গুটিয়ে দাঁড়াল।

"বেশ। তাহলে তোমাকেও নিয়ে যাব আজ আমিরাবাদ।"

"কি!"

"যেহেতু তুমি আমাকে সাহায্য করছো না, সেহেতু বন্দি হিসেবেই নিয়ে যাব।"

সাহারা রাগে ফুঁসছে। মনে হচ্ছে এটাকে ধাক্কা মেরে মিনার থেকে ফেলে দিলে ভাল্লাগতো। কিন্তু শক্তিতে পারবে না ভেবে আর ঝুঁকি নিলো না। দু হাতে ঘাগড়া ধরে হাঁটা ধরলো

“চলুন”

আচমকা সাহারার বাহু টেনে ধরলো মেহরাব। মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। চোখ দুটো হঠাৎ সরু হয়ে এলো। পুরো শরীর মুহূর্তে সজাগ হয়ে উঠল।

শিকারির মতো। যেমন বাঘ ঝোপের আড়ালে হরিণের শব্দ শুনলে হয়। সাহারা কিছু বলছিল।

"আমি কিন্তু..."

কথা শেষ করতে পারল না। মেহরাব আচমকা ঠোঁটে আঙুল চেপে ধরল।

"শশ্। চুপ।"

সাহারা থমকে গেল। ভাঙা দেয়ালের ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো পড়ছে। মেহরাব স্পষ্ট শুনতে পেল পদশব্দ। পুরনো পাথরের ওপর জুতার ঘর্ষণের শব্দ।বসাহারা কিছু বুঝতে না পেরে ফিসফিস করে বলল,

"কি হয়েছে?"

মেহরাব উত্তর দিল না। তার দৃষ্টি চলে গেল নিচের অন্ধকার করিডোরের দিকে। পরের মুহূর্তেই মেহরাব সাহারার কবজি ধরে টান দিল।

"এই!"

কিছু বোঝার আগেই সাহারা হোঁচট খেতে খেতে তার সাথে এগিয়ে গেল। মেহরাব দ্রুত তাকে নিয়ে সরে গেল ভাঙা এক প্রাচীরের আড়ালে। পাথরের দেয়ালটা এত মোটা যে বাইরে থেকে কাউকে দেখা যায় না। সাহারা প্রতিবাদ করতে যাচ্ছিল। কিন্তু মেহরাবের চোখ দেখে থেমে গেল। সে এখন সম্পূর্ণ অন্য মানুষ। চোখে মুখে মারাত্মক সতর্কতা। কয়েক মুহূর্ত পর তাদের আড়াল থেকে কয়েক গজ দূরের বারান্দায় একটা ছায়ামূর্তি দেখা দিল। সাহারা নিঃশ্বাস আটকে তাকিয়ে রইল। মেহরাব ধীরে ধীরে কোমরের তরবারির হাতলে হাত রাখল। তার তীক্ষ্ণ চোখ অন্ধকার ভেদ করে ছায়াগুলোকে পর্যবেক্ষণ করছে।

কে সে ? কেন এসেছে? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তারা কি এই প্রাসাদের রহস্যের সাথেও জড়িত?

ভাঙা প্রাচীরের আড়ালে পাশাপাশি বসে আছে মেহরাব আর সাহারা। দুজনের চোখ নিবদ্ধ করিডোরের দিকে। ছায়াগুলো স্পষ্ট হতে লাগল।

একজন। একজন নারী অবয়ব মাথা নিচু করে হাঁটছে। পায়ের শব্দও অস্বাভাবিক। যেন কোনো অদৃশ্য শক্তির নির্দেশে এগিয়ে চলেছে। সাহারা ফিসফিস করে বলল,

"কে ওটা?"

মেহরাব উত্তর দিল না। তার দৃষ্টি স্থির। আরও কয়েক মুহূর্ত পর চাঁদের আলো মুখে পড়তেই দুজনেই একসাথে অবাক হয়ে উঠল।

"মণি মা!"

সাহারার মুখ থেকে প্রায় চিৎকার বেরিয়ে যাচ্ছিল। মেহরাব দ্রুত তার মুখ চেপে ধরল।

"চুপ!"

সাহারা বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে রইল। সত্যিই ওটা সুনেহেরা। সাহারা শুকনো ঢোক গিলে ফিসফিস করে বলল

“এই রে! আমার খোঁজে এসেছে বোধহয়”

“উহু”

মেহরাব এর অসম্মতিতে চোখ সরু করে তাকালো সাহারা। তার কাঁধে মেহরাবের বলশালী হাত। ভয়ে কিছু বলতেও পারছে না। সুনেহেরার চলন ইশারা জরলো মেহরাব। হাত দুটো শরীরের পাশে ঝুলে আছে। সোজা সামনে তাকিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। যেন চারপাশে কিছুই দেখতে পাচ্ছেন না। জেগেও ঘুমিয়ে আছেন। সাহারার বুক ধড়ফড় করতে লাগল।

"মণি মার কি হয়েছে?"

মেহরাব ভ্রু কুঁচকাল।

“একটু চুপ থাকতে পারো না?”

"পারি। কিন্তু মনি মা এমন কর…”

সুনেহেরা তাদের থেকে কয়েক হাত দূর দিয়ে হেঁটে গেলেন। তবুও একবারও তাকালেন না।

একবারও থামলেন না। এমনকি আশপাশে মানুষের উপস্থিতি অনুভব করলেন বলেও মনে হলো না। সাহারা ফিসফিস করে বলল,

"তিনি আমাদের দেখছেন না কেন?"

"দেখলেও হয়তো চিনতে পারছেন না।"

মেহরাবের কণ্ঠ গম্ভীর। তার শিকারি সত্তা বিপদের গন্ধ পাচ্ছে। যে গন্ধ যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার আগে পাওয়া যায়। তারা আড়াল ছেড়ে ধীরে ধীরে পিছু নিল। সুনেহেরা প্রাসাদের ভেতরের দিকে এগিয়ে চলেছেন। পথটা যেন তিনি ভালো করেই জানেন।

ভাঙা সভাকক্ষ পেরিয়ে একটা বিশাল উঠোন অতিক্রম করে তিনি পৌঁছালেন প্রাসাদের মধ্যভাগে। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল শুকনো ফোয়ারা। চারদিকে ভাঙা মূর্তি, মস আর লতাপাতায় ঢাকা পাথর। জোৎস্নার আলোয় জায়গাটা আরও রহস্যময় লাগছে। হঠাৎ সুনেহেরা দাড়ালো। সাহারা আর মেহরাব ভাঙা স্তম্ভের আড়াল থেকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ আবার সেই বাঁশির সুর ভেসে এলো। আগের চেয়েও স্পষ্ট আর মধুর। সাহারার শরীর শিউরে উঠল। মেহরাবও এবার স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে।

সুরটা আসছে কোথা থেকে? চত্বরের মাঝখান থেকে সুনেহেরা ওপরে মাথা তুলল। তার ঠোঁট নড়ল। কিন্তু কণ্ঠস্বরটা যেন তার নিজের নয়।

ফিসফিস করে তিনি বললেন,

"আমি এসেছি..."

সাহারার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।

"মণি মা? কার সাথে কথা বলছেন?"

মেহরাবও স্থির হয়ে গেল। ফোয়ারার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সুনেহেরা মনে হচ্ছে কারও সাথে কথা বলছে। কিন্তু কার সাথে বলছে তা দেখতে পাচ্ছে না তারা। সাহারা উশখুশ করছে। মেহরাব তার কাঁধে হাত দিয়ে নিজের সাথে ধরে আছে। তাকে ধরে রাখছে না বিপদ থেকে আড়াল করছে বোঝা যায় না। সাহারা বিরক্ত হয়ে ডেকেই ফেলল

“মনি মা!”

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে 14 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন