"মণি মা!"
নিশুতি রাতের মধ্যে ডাকটা প্রতিধ্বনিত হলো দেওয়াল জুড়ে। সুনেহেরা যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলো। এক ঝটকায় মাথা ঘুরিয়ে পিছনে তাকালেন।
তার চোখের ঘোর ভাঙতে শুরু করল। ফাঁকা দৃষ্টি স্বাভাবিক হয়ে উঠল। তিনি চারপাশে তাকালেন।
ভাঙা দেয়াল আর জোৎস্নায় ঢাকা পরিত্যক্ত চত্বর। তার চোখ বড় হয়ে গেল।
বুকের ভেতর ধক করে উঠল।
"আমি...!এখানে?"
ততক্ষণে মেহরাব সাহারার কবজি ধরে টেনে নিয়েছে আরও গভীর আড়ালে। সাহারা প্রতিবাদ করতে গিয়েও থেমে গেল। মেহরাবের মুখ অস্বাভাবিক গম্ভীর।বসে ফিসফিস করে বলল,
"চুপচাপ যা হচ্ছে শুধু দেখো।"
দুজনেই আবার উঁকি দিল। সুনেহেরা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। মনে হচ্ছে নিজের অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্ন করছেন। কপালে হাত দিলল চোখ বন্ধ করল। মনে করার চেষ্টা করলো। কিন্তু কিছুই মনে পড়ছে না। কিভাবে তিনি এখানে এলেন? কেন এলেন? শেষ কি মনে আছে? মনে করার চেষ্টা করতেই ভেসে উঠল সাহারার কক্ষের সেই বাঁশির সুর। মধুর, সম্মোহনী, মায়াবী সুর। তারপর আর কিছুই মনে নেই। সুনেহেরার বুকের ভেতর হঠাৎ আতঙ্ক জমতে লাগল। চারদিকে তাকাল। এবার যেন জায়গাটাকে চিনতে পারল। আর চিনতেই মুখের রঙ ফ্যাকাসে হয়ে গেল। অতি ক্ষীণ স্বরে বেরিয়ে এল শব্দটা।
"না..."
তার চোখে আতঙ্ক। যেন কোনো দুঃস্বপ্ন সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘ বারো বছর! পুরো বারোটি বছর তিনি এই প্রাসাদের দিকে ফিরেও তাকাননি।
এই অভিশপ্ত স্থানকে নিজের জীবন থেকে মুছে ফেলেছিলো। তবু আজ আজ আবার সে এখানে। মহল জুড়ে ঠান্ডা বাতাস বইছে। ভাঙা বারান্দা গুলো কড়মড় শব্দ করছে। মনে হচ্ছে প্রাসাদটা নিজেই দীর্ঘশ্বাস ফেলছে। সুনেহেরা দ্রুত হাঁটা শুরু করলেন। এখান থেকে বের হতে হবে।
এখনই যত দ্রুত সম্ভব। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়। বারো বছরে প্রাসাদ ভালো রকম বদলে গেছে। অনেক অংশ ভেঙে পড়ে নতুন পথ তৈরি হয়েছে। পুরোনো মূল করিডোর বন্ধ হয়ে গেছে।
যে পথগুলো একসময় চোখ বন্ধ করে হাঁটতে পারতেন, আজ সেগুলোও অপরিচিত লাগছে।
কয়েকবার ভুল পথে ঢুকে আবার ফিরে এলো।
দেওয়ালে ঝুলছে পুরনো তরবারি। পরনো স্মৃতি দগদগ করে উঠে। অবেশেষে ছুটতে ছুটতে দূরে মূল ফটকের অবয়ব দেখা গেল। একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস বেরিয়ে এল বুক থেকে। যেন ডুবে যাওয়া মানুষ ভেসে উঠেছে। বিশাল লোহার ফটক।
জং ধরা লতাপাতায় ঢাকা। চাঁদের আলোয় দাঁড়িয়ে আছে অতীতের নীরব সাক্ষী হয়ে।
সুনেহেরা কাছে গিয়ে হাত রাখলেন পুরোনো পাথরের প্রাচীরে। আঙুল বুলিয়ে দিলেন ধীরে ধীরে। তার চোখ ভিজে উঠল।
এই প্রাচীর, এই পথ, এই মহল কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে এর সাথে। নীরবে দাঁড়িয়ে অশ্রুবিসর্জন দিল কিছুক্ষণ। তারপর খুব নিচু স্বরে বলল
"কেন ডাকছো আমাকে? এত বছর পরও কেন? আমি তো তোমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছি আজন্মের জন্য। তবুও কেন আমার প্রতি এত টান তোমার?”
উত্তর দিল না কেউ। তবু তার মনে হলো অন্ধকারের ভেতর কোথাও কেউ যেন তাকিয়ে আছে। অপেক্ষা করছে। সুনেহেরা আর দাঁড়াল না। দ্রুত পা বাড়ালেন মহলের দিকে। অল্প সময়ের মধ্যেই জোৎস্নার আলোয় তার অবয়ব মিলিয়ে গেল। দূর থেকে সবটাই দেখল মেহরাব আর সাহারা। সাহারা ফিসফিস করে বলল,
"আচ্ছা। মণি মা এই জায়গাকে এত ভয় পায় কেন?"
মেহরাবের চোখ তখনও ফটকের দিকে। কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে সে বলল
“এটার সঙ্গে গভীর রহস্য জড়িয়ে আছে। যা এখনও কেউ আমাদের বলেনি। এগুলো আমাদেরই খুজে বের করগে হবে। সাহারা তাকাল তার দিকে। তারপর সাহারা ফিসফিস করে বলল
"সেসব তো ঠিক আছে। কিন্তু মণি মা এখানে কেন এসেছিল?"
মেহরাব দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়ালো।
"সেটা তোমার মণি মাকেই জিজ্ঞেস করতে হবে।"
সাহারা নিজের গায়ের ধুলো ঝাড়তে ব্যাস্ত। মেহরাব ব্যাঙ্গ করে বলল
“আমার মনে হয় তোমার বংশ টাই পাগলের। কে কি করে না করে বোঝার উপায় নেই।”
সাহারা চেতে উঠলো
“যান না নিজের কাজে। এসেছেন কেন পাগল দের মধ্যে?”
“তার মানে স্বীকার করছো তোমরা পাগল?”
কথা শেষ করার আগেই আচমকা মেহরাবের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। চোখ দুটো হঠাৎ তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল।এই চেহারাটা সে চিনে গেছে।
যখনই মেহরাব এভাবে স্থির হয়ে যায়, কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। মেহরাব চোখ সরু করে মাথা কাত করল। এক ঝটকায় সাহারার কবজি ধরে টেনে নিল।
"এই! এই! আবার টানছেন কে…..?”
"চুপ!"
সরাসরি টেনে নিয়ে গেল একটা ভেঙে পড়া স্তম্ভের আড়ালে। সাহারা রাগে ফুঁসতে লাগল।
"আপনি কি….”
মেহরাব এবার হাত তুলে থামিয়ে দিল।
"একটা শব্দও করবে না।"
তার কণ্ঠ প্রায় ফিসফিসানি। সাহারাও চুপ করে গেল। কয়েক মুহূর্ত পর মেহরাব সামনে ইশারা করল। সাহারা তার দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকাল।
প্রথমে কিছুই বুঝতে পারল না। শুধু ভাঙা প্রাচীর লতা-পাতা আর অন্ধকার। কিন্তু তারপর তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। প্রাসাদের পশ্চিম পাশের ভাঙা বারান্দার নিচে মাটির একটা অংশ নড়ছে। যেন কোনো গোপন দরজার জন্য মাটি নিজে নিজে সরে যাচ্ছে। ফাঁকটা বড় হতে লাগল।
আর অন্ধকারের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো একটা ছায়ামূর্তি। তারপর আরেকটা, পরপর মোট পাঁচজন। সবাই কালো পোশাকে আবৃত। মুখ ঢাকা হাতে অস্ত্র। তারা অত্যন্ত সতর্কভাবে চারপাশ দেখে নিচ্ছে। যেন বহুদিনের চেনা জায়গা। তারা জানেই না যে উপরে দুজন তাদের দেখছে। সাহারা বিস্ময়ে ফিসফিস করে বলল,
"এরা কারা?"
মেহরাবের চোখ সরু হয়ে এলো।
"জানি না। কিন্তু মনে হচ্ছে না এরা এই প্রাসাদে প্রথমবার এসেছে।"
লোকগুলোর একজন মাটির নিচের পথ থেকে একটা কাঠের বাক্স বের করল। আরেকজন সেটা কাঁধে তুলে নিল। তারপর সবাই মিলে ধ্বংসস্তূপের আড়ালে মিলিয়ে যেতে লাগল। যাওয়ার আগে একজন নিচু স্বরে কিছু বলল। দূরত্বের কারণে পুরোটা শোনা গেল না। কিন্তু একটা শব্দ স্পষ্ট ভেসে এলো
“হাউস…”
মেহরাবের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।নলোকগুলো অদৃশ্য হয়ে যেতেই সাহারা মেহরাবের দিকে তাকাল।
"আমরা কি ওদের অনুসরণ করব?"
মেহরাব কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তার তীক্ষ্ণ চোখ তখনও সেই গোপন পথটার দিকে। যেখান থেকে লোকগুলো বের হয়েছিল। তারপর ধীরে ধীরে বলল,
"ওদের নয়। প্রথমে জানতে হবে..."
সে ভাঙা মাটির ফাঁকটার দিকে তাকাল।
“ওই পথটা কোথায় যায়।"
জোৎস্নার আলোয় দুজনের ছায়া দীর্ঘ হয়ে পড়ল ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রাসাদের মেঝেতে। তাদের সামনে খুলে গেল রহস্যের আরেকটি দরজা। ভাঙা স্তম্ভের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে মেহরাব আর সাহারা।নদুজনের চোখই নিবদ্ধ সেই অন্ধকার গোপন পথটার দিকে। কয়েক মুহূর্ত আগেই কালো পোশাক পরা লোকগুলো অদৃশ্য হয়েছে।
মেহরাব ভাবছিল এখনই গিয়ে পথটা পরীক্ষা করবে। কিন্তু ঠিক তখনই সাহারা তার হাত চেপে ধরল।
"ওদিকে তাকান।"
মেহরাব চোখ সরিয়ে সামনে তাকাল। আর পরমুহূর্তেই তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
অন্ধকার সুড়ঙ্গের ভেতর থেকে আবার মানুষ বের হচ্ছে। কিন্তু এরা আগের লোকগুলোর মতো নয়।
একদমই নয়। চাঁদের ফ্যাকাশে আলোয় তাদের অবয়ব স্পষ্ট হতে লাগল। প্রথম জনকে দেখেই সাহারার নিঃশ্বাস আটকে গেল। মানুষটার একটা হাত অস্বাভাবিক লম্বা। হাঁটুর নিচ পর্যন্ত নেমে এসেছে। আরেকটা হাত আবার অস্বাভাবিক রকম ছোট। মেরুদণ্ড বাঁকা। মাথাটা কাত হয়ে আছে একদিকে। হাঁটার সময় মনে হচ্ছে যে কোনো মুহূর্তে পড়ে যাবে। তার পিছনে আরেকজন। তার চেহারা আরও ভয়ংকর। মুখের অর্ধেক অংশ যেন বিকৃত। একটা চোখ অস্বাভাবিক বড়।
অন্যটা প্রায় বন্ধ। হাঁটার ভঙ্গিটাও স্বাভাবিক নয়।
যেন শরীরের ওপর নিজেরই নিয়ন্ত্রণ নেই। তারপর আরও কয়েকজন। কেউ খুঁড়িয়ে হাঁটছে। কারও শরীর অস্বাভাবিক মোটা। কারও কাঁধ একপাশে ঝুলে আছে। কেউ আবার মাথা নিচু করে অদ্ভুতভাবে এগিয়ে যাচ্ছে সারি বেঁধে।
একটার পর একটা বের হচ্ছে যেন জীবন্ত মানুষ নয়। যেন কোনো সৃষ্টির ভয়ংকর পরীক্ষার ফলাফল। সাহারা অনুভব করল তার হাত ঠান্ডা হয়ে গেছে। প্রথমবারের মতো তারও ভয় লাগছে।
ফিসফিস করে বলল,
"এরা... এরা কি মানুষ?"
মেহরাব কোনো উত্তর দিতে পারল না। তার তীক্ষ্ণ চোখে এবার বিস্ময় স্পষ্ট। যে যুবক ডাকাতের ডেরায় ঢুকে যায় নির্ভয়ে সে পর্যন্ত হতবাক।
তার মনে পড়ল ইংরেজদের ফরেস্ট হাউস গোপন গবেষণার কথা। বহুদিন ধরে হারিয়ে যাওয়া মানুষদের কথা। অদ্ভুত সব গুজব। সবকিছু যেন এক অদৃশ্য সূতোয় গাঁথা। কিন্তু প্রমাণ নেই।
কিছুই নেই। দেখছে শুধু সামনে দিয়ে হেঁটে যাওয়া ভয়ংকর দৃশ্যগুলো। সাহারা অজান্তেই একটু সরে এসে মেহরাবের কাছাকাছি বা ঘেঁষে দাঁড়াল।
দুজনেই নিঃশ্বাস আটকে অপেক্ষা করতে লাগল।
সারি বেঁধে আসা মানুষগুলো ধীরে ধীরে দূরে সরে গেল। তার মুখ অস্বাভাবিক গম্ভীর।
"চলো”
সাহারা তাকাল।
"কোথায়?"
"তোমাকে মহলে পৌঁছে দিই। যতই হোক কোনো নারী কে তো আর মাঝ রাত্তিরে এই ভূতের বাড়ি ছেড়ে যেতে পারি না”
"আর ওই লোকগুলো?"
মেহরাব ব্যাঙ্গ করে বলল
“নিয়ে যাবে সাথে করে? কোলে তুলে দিব একটা?”
সাহারা মুখ কুচকে ফেলল। এর সাথে কথায় পারবে না সে। মেহরাব সাহারার হাত ধরে বেরোতে বেরোতে বলল
"এটা বোকার মতো ঝুঁকি নেওয়ার সময় নয় সারা। আর তুমি এর মধ্যে কক্ষণও আসবে না। যা দেখার, যা খোঁজার আমি করব সব”
অদ্ভুত সাহারা তর্ক করল না। বাচ্চাদের মত হাঁটতে লাগল মেহরাব এর সাথে। আজকের রাত তাদের কল্পনার চেয়েও ভয়ংকর গেল। উত্তর প্রাসাদ ছেড়ে তারা জঙ্গলের পথে নামল।
জোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে চারপাশ। মেহরাব সামনে হাঁটছে। সাহারা পিছনে। কোনো বিপজ্জনক কিছু নজরে আসে কিনা তাই চারপাশ দেখে নিচ্ছে।
অজান্তেই যেন পাহারা দিচ্ছে সাহারা কে। অনেকটা পথ পেরিয়ে অবশেষে সাহাবাদ মহলের আলো দেখা গেল। দূরে প্রহরীদের মশাল জ্বলছে।
সাহারা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। মহলের পেছনের পথের কাছে এসে মেহরাব থামল।
"এবার যাও।"
সাহারা হাত গুটিয়ে দাঁড়াল। তার স্বভাবসুলভ তেজ আবার ফিরে এসেছে।
"শুনুন।"
"হুম?"
"আজ শুধু বিপদে পড়েছিলাম বলে আপনাকে সহ্য করলাম।"
মেহরাব ভ্রু তুলল।
"ওওও আচ্ছা তাই নাকি?"
“আজ্ঞে”
"নয়তো?"
সাহারা গর্বিত ভঙ্গিতে বলল,
"নয়তো আপনাকে এমন শিক্ষা দিতাম যুগ যুগ ধরে মনে রাখতেন সারা কি জিনিস"
মেহরাব অল্প সম ভ্রু কুচকে তাকিয়ে রইল।
তারপর হঠাৎ হেসে ফেলল। গভীর, উষ্ণ হাসি।
"বেশ। সেই দিনের অপেক্ষায় থাকলাম বনবিড়াল।"
“আমাকে বনবিড়াল বলবেন না!"
"আচ্ছা বনবিড়াল।"
"আহ!"
রাগে গজগজ করতে করতে সাহারা মহলের দিকে দৌড়ে গেল। দরজার কাছে গিয়ে একবার পিছনে তাকাল। মেহরাব তখনও দাঁড়িয়ে। ঠোঁটের কোণে হাসি। চাঁদের আলোয় তাকে অদ্ভুত সুন্দর লাগছে। যেন কোনো গল্পের শিকারি রাজপুত্র।
সাহারা ভিতরে ঢুকে যেতেই মেহরাবের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। আবার গম্ভীর হয়ে উঠল সে।
মনে ঘুরপাক খাচ্ছে সেই বিকৃত মানুষগুলো।
গোপন সুড়ঙ্গ থেকে বের হয় তা না হয় জানা গেল, কিন্তু তারা যায় কোথায়? এবং ফের কখন সুড়ঙ্গে ফিরে আসে তাও জানতে হবে। এদের উদ্দেশ্যও জানতে হবে।
সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে সে নিজের অশ্বের পিঠে চড়ে বসল। লাগাম টানতেই তেজী ঘোড়াটা হ্রেষাধ্বনি করে উঠল। তারপর মরুভূমির বাতাস কাঁপিয়ে ছুটতে শুরু করল আমিরাবাদের দিকে।
সামনে কাটাগিরির জঙ্গল। তার চলনে খুবই সাবধানতা। বলা যায় না ডাকাত দল আক্রমন করে বসতে পারে।
****
সামনের দিকে কড়া পাহারা থাকায় মহলের পেছনের পুরোনো পথ ধরে নিঃশব্দে এগিয়ে এলো সাহারা। রাত প্রায় শেষ। পূর্ব আকাশে হালকা ফ্যাকাশে আভা ফুটতে শুরু করেছে। পুরো পৃথিবী ঘুমিয়ে আছে। প্রাচীর টপকে ভিতরে ঢুকে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল সে।
"যাক আলহামদুলিল্লাহ! কেউ দেখে নি।"
চুলের ভেতর শুকনো পাতা আটকে আছে।
পোশাকেও ধুলোবালি। আজকের রাতটা যে কী ভয়ংকর কেটেছে! মাথা ঝিমঝিম করছে তার।
মহলের করিডোর ধরে পা টিপে টিপে এগোতেই আচমকা থমকে গেল সাহারা। সামনের কক্ষের দরজা খোলা। ভিতরে প্রদীপের মৃদু আলো।
জান্নাত জায়নামাজ বিছিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
তাহাজ্জুদের নামাজে মগ্ন। সাদা ওড়নায় মাথা ঢাকা। এত ভোরে তাকে দেখলে মনে হয় যেন কোনো ফেরেশতা দাঁড়িয়ে আছে। সাহারা এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল। তারপর বিড়ালের মতো পা ফেলে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে লাগল।
ঠিক তখনই
"এই যে ছোট সাহেবজাদী।"
সাহারার বুক ধক করে উঠল। পেছনে ঘুরে দেখল শাখা। দুই হাত বুকে ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে আছে।
চোখ দুটো সন্দেহে সরু। সাহারা কৃত্রিম হাসি দিল।
"সুপ্রভাত।"
“জি শাহজাদি, খুবই সুপ্রভাত।"
সাহারা কথা ঘোরাতে আমতা আমতা করে
“ইয়ে মানে আপা, ভালো আছো?”
“হাওয়া ফুস?”
সাহারার গলা শুকিয়ে গেল।
"মানে?"
শাখা ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো।
"মানে এই যে, তুমি কোথা থেকে ফিরছো?"
“আমি?"
"না আমি।"
"আমি তো..."
"হ্যাঁ?"
"আমি... আমি..."
শাখা ভ্রু তুলল।
"বলতে সমস্যা হচ্ছে?"
"না না সমস্যা হচ্ছে না। আমি তো আসলে, আমি বাইরে গিয়েছিলাম।"
"সেটা তো আমিও দেখছি।"
"তা হলে আবার জিজ্ঞেস করছো কেন?"
শাখা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
"দেখ সারা, আমাকে বোকা ভাবিস না। কেথায় গেছিলি সেটা বল”
সাহারা বুঝল পালানো কঠিন। শাখা একবার কিছু আঁচ করলে সহজে ছাড়ে না। অগত্যা মাথা চুলকে বলল,
“আমি একটা পাখি দেখেছিলাম।"
"পাখি?"
"হ্যাঁ।"
সাহারা এবার হাত নেড়ে উৎসাহ নিয়ে বলতে শুরু করল।
"খুব সুন্দর। ডানা কেমন চকচক করছিল। চোখ দুটো নীল।"
"তারপর?"
"লেজ খুব বড়। আর উড়লে মনে হয় আলো বের হচ্ছে।"
শাখা কয়েক চুপ করে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল
“কোমড়ে তলোয়ার ঝোলানো সেটা বললি না? কালো ঘোড়া নিয়ে এসেছিল যে পাখিটা। পাখিটা বোধহয় আমিরাবাদ এর না রে?”
সাহারার চোখ বিস্ফোরিত। বুঝল শাখা সব টা দেখে ফেলেছে। আর মিথ্যে বলে লাভ নেই। মাথা নিচু করে ফেলল। শাখা রাগান্বিত হয়ে বলল
“যুবরাজের সাথে চলছে টা কি তোর সারা? উত্তর দে আমায়। এই ভোর রাতে সে তোকে মহলের সামনে ছেড়ে গেল? আগের বারও যুবরামই তোকে নিয়ে গেছিলো তার প্রত্যক্ষ সাক্ষী আমি নিজে। কাওকে কিচ্ছু টি বলিনি। তবে এবার মণি মা কে না জানালেই নয়”
দুই বোনের তর্কে পাশের কক্ষ থেকে জান্নাত বেরিয়ে এলো। নামাজ শেষ করেছে। দুজনকে দেখে অবাক হয়ে বলল,
"সকাল সকালই আবার শুরু করেছিস?"
শাখা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
"আপা, এই মেয়ে ভোরে ভোরে বাইরে থেকে ফিরছে।"
জান্নাতের চোখ বড় হয়ে গেল।
"বাইরে থেকে?"
সাহারা দ্রুত বলল,
"আপা, ওর কথা শুনো না।"
"তুই কোথায় গিয়েছিলি?"
শাখা কটমট করে বলল
“যুবরাজ মেহরাব ওয়াসেম এর সঙ্গে ফিরল”
জান্নাত এর চোখ সরু হয়ে এলো। মুখ খানা যেন নুয়ে পড়া লতার মত হয়ে গেল
“উনি কি এখনও মহলেই আছে?”
শাখা সাহারার দিকে তাকিয়ে বলল
“দেখলাম তো দিয়ে ফিরে গেল”
জান্নাত সাহারা কে ইশারা করল যেতে। সাহারা ছাড়া পেয়েই ভোঁ দৌড়। জান্নাত শাখার কাঁধে হাত রেখে বলল
“ওকে চোটপাট করে বোঝানো যাবে না শাখা। ওর সাথে আমি কথা বলব। আমি নিশ্চিত ওদের দুজনের ভিতর কিছু চলছে। আগের বার যুবরাজ মহলে এসে ইচ্ছে করে নিজের গলার দামী রত্ন খানা ফেলে গেছিলো। ফের তুনীর। এগুলো সব সারার সাথে বুদ্ধি করে করা বলে মনে হচ্ছে। সেসব যাক। আপাতত ওকে নজরে রাখতে হবে। মণি মা কে বললে ওর ঘর থেকে বেরোনোই বন্ধ করে দেবে। তখন হবে আরেক জ্বালা”
শাখা বুঝল বোনের কথা। চলে গেল নিজের ঘরে। বাইরে মৃদু অন্ধকার। আলো অল্প ফুটেছে। জান্নাত জায়নামাজ ভাজ করে রেখে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো। তার কানে আসে লোহার ঘষা ঘষা শব্দ। চারিপাশে তাকিয়েও তেমন কিছু পায় না। আচমকা চোখ যায় যে পথ উত্তরের দিকে গেছে সেদিকে। চোখ জোড়া যেন কোটর ছেড়ে বেড়িয়ে আসার উপক্রম। চিৎকার করে ওঠে
“আআআআআআ”