মুহূর্তেই তার শরীর শক্ত হয়ে গেল। শ্বাস বন্ধ হয়ে এলো। সামনের পথ দিয়ে এগিয়ে আসছে একজন নারী। প্রথম দেখায় মানুষ বলেই মনে হলো না। মনে হচ্ছে বহুদিনের কোনো মৃতদেহ হেঁটে বেড়াচ্ছে। নারীটির পরনে ছেঁড়া, ময়লা ধূসর পোশাক। কোমর পর্যন্ত নেমে আসা চুলগুলো জট বেঁধে একাকার। মুখের অর্ধেক ঢেকে গেছে সেই চুলে। দুই হাতের কবজিতে মোটা লোহার শিকল।
পায়েও ভারী বেড়ি। প্রতিটি পদক্ষেপে শিকলগুলো মাটিতে ঘষা খেয়ে খরখর শব্দ হচ্ছে। মাথা নিচু করে হাঁটছিল। হঠাৎ মুখ তুলল। জান্নাতের বুকের ভেতরটা বরফ হয়ে গেল।
চোখ দুটো অস্বাভাবিক রকম ফ্যাকাশে। গভীর আর ভীষণ নিষ্ঠুর। যেন বহুদিন ধরে ঘুমায়নি।
এ যেন মানুষের চোখ নয়। কোনো শিকারি পাখির চোখ। নারীটি থেমে গেল। তারপর ধীরে ধীরে মাথা কাত করল। সরাসরি তাকাল জান্নাতের দিকে। যেন এত দূর থেকেও তাকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। জান্নাতের মনে হলো ওই চোখ দুটো তার শরীর ভেদ করে ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে। হঠাৎ নারীটির ঠোঁট নড়ল। কিন্তু কোনো শব্দ আসলো না জান্নাতের কানে। এক বিকৃত হাসি ফুটে উঠল মুখে। এমন হাসি কোনো সুস্থ মানুষের হতে পারে না। জান্নাত পিছিয়ে যেতে চাইল, পারল না। পা যেন মাটির সাথে আটকে গেছে। নারীটি এবার এক পা এগোল। তারপর আরেক পা। তার চোখ এখনো স্থির জান্নাতের মুখে। শকুন যেমন মৃতদেহের দিকে তাকিয়ে থাকে ঠিক তেমন।
হঠাৎ করেই জান্নাতের গলা ফেটে বেরিয়ে এলো এক আতঙ্কিত চিৎকার।
"আআআআআআআ!"
চিৎকারে পুরো মহল কেঁপে উঠল। চারদিক থেকে ছুটে আসতে লাগল লোকজন। প্রহরী, দাসী, শাখা সাহারা এমনকি সুনেহেরাও ঘুম জড়ানো চোখে ছুটে এলেন। সাহারা সবার আগে বারান্দায় উঠে বলল,
"কি হয়েছে আপা?"
শাখা চারপাশে তাকাল।
"কোথায়? কী হয়েছে?"
সুনেহেরা দ্রুত জান্নাতকে জড়িয়ে ধরলেন।
"জান্নাত! মা! কী হয়েছে?"
জান্নাত কাঁপা হাতে সামনে আঙুল তুলল।
"ওখানে...!"
"কোথায়?"
"ওই যে... ওই পথের উপর!"
সবাই একসাথে তাকাল। কিন্তু কিছুই নেই। শুধু কুয়াশা ভরা নির্জন পথ। কোথাও কোনো জন-মানব নেই।
“কই কাওকে দেখতে পাচ্ছি না তো”
জান্নাত হতভম্ব হয়ে গেল। সে আবার তাকাল।
ভালো করে দেখল চারিদিক। সত্যিই কেউ নেই।
যেন কিছুক্ষণ আগের দৃশ্যটাই ভূয়া ছিল। সাহারা এবার একটু চিন্তিত গলায় বলল,
"আপা, তুমি কি কাউকে দেখেছিলে?"
জান্নাতের ঠোঁট শুকিয়ে গেছে।
"আমি... আমি দেখেছি।"
"কাকে?"
"একজন নারী।"
"কোথায়?"
"ওইখানে।"
শাখা এবার গম্ভীর হয়ে গেল। কারণ জান্নাত এমন মানুষ নয় যে অকারণে ভয় পাবে আর মিথ্যাও বলবে না। সুনেহেরা ধীরে ধীরে জান্নাতের মুখের দিকে তাকালেন। মন টা বড্ড কু গাইছে। না জানি কি হতে চলেছে মহলের বাচ্চাদের সাথে। এদের ভীষণ চোখে চোখে রাখতে হবে। প্রহরীদের বাইরে দেখতে বলে সুনেহেরা জান্নাত কে নিয়ে নিজের কক্ষে যায়।
*****
গোটা দিন পেরিয়ে রাত আসে সাহাবাদ এ। চারিদিকে কেমন অস্বস্তিকর ভারী ভাব। প্রাসাদের প্রহরীরা টহল দিচ্ছে সতর্ক দৃষ্টিতে। গত ক'দিনে এত অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে যে কেউ আর নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারছে না। ঠিক তখনই ঢং! ঢং! ঢং! শব্দে বিপদ সংকেতের ঘণ্টা বেজে উঠল। শব্দ পেতেই পুরো নগরী জেগে উঠল। প্রহরীরা দৌড়ে বেরিয়ে এলো অস্ত্র হাতে। মহলের ভেতর থেকেও ছুটে এল সবাই। একজন অশ্বারোহী সৈনিক চিৎকার করে উঠল
"ডাকাত! দক্ষিণ ফটকের দিকে ডাকাত আক্রমণ করেছে!"
বাইজিদ শাহ দ্রুত বেরিয়ে এলেন। তার মুখ কঠোর।
"ফাইয়াজ?"
সাহারার চোখ চকচক করে উঠল। শাখা ইতিমধ্যে নিজের তলোয়ার কোমরে গুঁজে ফেলেছে। দুই বোনের চোখাচোখি হলো। সুনেহেরা বুঝে ফেলল বিষয় টা
"খবরদার! কেউ কোথাও যাবে না! এক পা ও যেন মহলের বাইরে না পরে”
সাহারা নিষ্পাপ মুখ করে বলল,
"আমরা কোথায় যাচ্ছি?"
শাখা গম্ভীর মুখে যোগ করল,
"ইয়ে….মনি মা। আমরা তো শুধু দেখব।"
“বাড়ির মেয়েদের এসব দেখার কোনো মানেই হয় না। দ্রুত ভেতরে যাও”
সাহারা আর শাখা লক্ষী বাচ্চার মত ভিতরে চলে হেল। সুনেহেরা মহলে যেতেই দুজনের একটাকেি আর খুঁজে পাওয়া গেল না। নগরের দক্ষিণ প্রান্তে তখন যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। ডাকাতের সংখ্যা চল্লিশেরও বেশি। মুখ ঢাকা, পরনে কালো পোশাক। হাতে লম্বা বাঁকা তলোয়ার। কয়েকটি ঘরে ইতিমধ্যে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে তারা।
চারদিকে মানুষের চিৎকার। ঘোড়ার হ্রেষাধ্বনি ইস্পাতের সংঘর্ষ। শাখা নিজের মুখ কাপড়ে ঢেকে যুদ্ধক্ষেত্রে ঢুকে পড়ল। এক আঘাতেই একজন ডাকাতের হাত থেকে অস্ত্র ছিটকে গেল। অন্যদিকে সাহারা ধনুক হাতে উঁচু জায়গায় উঠে গেছে। একটার পর একটা তীর ছুটে যাচ্ছে।
প্রতিবারই লক্ষ্যভেদ। ডাকাত সর্দার চিৎকার করে উঠল
"এই কে আছিস! ওই মেয়ে টাকে নামা!"
কিন্তু তার কথা শেষ হওয়ার আগেই তীর এসে তার পাগড়ি উড়িয়ে দিল। যুদ্ধ ক্রমেই ভয়ংকর হয়ে উঠছে। ডাকাতদের সংখ্যা বেশি। প্রহরীরা ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়ছে। ঠিক তখনই দূর থেকে শোনা গেল ঘোড়ার বজ্রগতির শব্দ। সবাই একসাথে তাকাল। দেখল কালো অশ্বে চড়ে একজন অশ্বারোহী ছুটে আসছে। ঘোড়াটাও বিশাল। আর তার আরোহীও। তাকে দেখে যুদ্ধক্ষেত্রও যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। লোকটির পরনে শুভ্র রাজকীয় পোশাক। বুকের উপর রূপালি বর্মের কারুকাজ। কাঁধে কালো আলখাল্লা। কোমরে বাঁধা অদ্ভুত নকশার তরবারি।
লম্বা দেহ, প্রশস্ত কাঁধ, পেশিবহুল বাহু, তীক্ষ্ণ চোয়াল। ঘন কালো চুল কাঁধ ছুঁয়েছে। তার চোখ অস্বাভাবিক উজ্জ্বল ধূসর। যেন ঝড়ের আগের আকাশ। ঘোড়া থামানোরও প্রয়োজন মনে করল না সে। সরাসরি শত্রুদের মাঝখানে ঢুকে পড়ল।
প্রথম আঘাতেই একজনের অস্ত্র দুই টুকরো।
লোকটার এত দ্রুত চলাফেরা যে চোখে ধরা কঠিন। সাহারা বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল। শাখাও থমকে গেছে। একজন ডাকাত পিছন থেকে আক্রমণ করতেই লোকটি না ঘুরেই তলোয়ার চালাল। পরের মুহূর্তে ডাকাতের অস্ত্র ছিটকে গিয়ে দূরে পড়ল। ডাকাতদের নেতা এবার গর্জে উঠল,
"কে তুই?"
লোকটির ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটল।
"তোদের জন্য দুঃস্বপ্ন।"
কথা শেষ করেই সে আবার ঝাঁপিয়ে পড়ল। মাত্র কয়েক মুহূর্তের মধ্যে যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দওল।
ডাকাতরা ছত্রভঙ্গ হতে শুরু করল। অবশেষে নেতা চিৎকার করে উঠল,
"পিছু হটো!"
তাদের পোষাক আক্রমণের ধরণ আর বহর চালনা সবই ভিন্ন লাগছে শাখার চোখে। বাজপাখির ন্যায় চোখ জোড়া আবিষ্কার করলো এ ফাইয়াজ এর দল নয়। অবশেষে প্রাণ বাঁচাতে তারা অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। নগর রক্ষা পেল।
সবাই যখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে, তখন শাখার চোখ স্থির হয়ে আছে ওই অশ্বারোহীর উপর।
লোকটিও যেন দূর থেকে একবার তাকাল তার দিকে।
মুখ ঢাকা থাকলেও চোখদুটো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। চোখে অদ্ভুত এক পরিচিতির ঝলক। সাহারা ফিসফিস করে বলল,
"আপা... লোকটা কে?"
শাখা দুদিকে মাথা নাড়ল।
"জানি না।"
কিন্তু তার বুকের ভেতর কেমন যেন ধকধক করছে। ঘোড়ার উপর বসে থাকা সুদর্শন অচেনা বীরটি একবার সাহাবাদের প্রাসাদের দিকে তাকাল। তারপর খুব আস্তে বলল,
"অবশেষে দেখা হলো, সাহাবাদ..."
রাত গভীর হওয়ার আগেই যুদ্ধের উত্তেজনা স্তিমিত হয়ে এলো। আহতদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে, প্রহরীরা দ্বিগুণ সতর্কতায় পাহারা বসিয়েছে নগরের চারপাশে। সাহাবাদ মহলের প্রধান প্রাঙ্গণে তখন মশালের আলো দপদপ করছে। সেখানে দাঁড়িয়ে আছেন জমিদার বাইজিদ শাহ। তার সামনে সেই অচেনা বীর। একদম ভিন্ন দেখতে। এমন পুরুষ সচরাচর দেখা যায় না।
দীর্ঘদেহী, বলিষ্ঠ গঠন। প্রশস্ত কাঁধ। তামাটে সোনালি আভাযুক্ত গায়ের রঙ। সোজা ধারালো নাক। চোয়াল যেন পাথরে খোদাই করা। গভীর কালো চোখদুটোতে একসাথে কঠোরতা আর রাজকীয় স্থিরতা। ঘন কালো চুল কাঁধ ছুঁয়েছে। দাড়িও পরিপাটি করে ছাঁটা। যুদ্ধের ধুলো মেখেও তাকে রাজপুত্র বলেই মনে হচ্ছে। বাইজিদ শাহ এগিয়ে এসে বললেন,
"আজ আপনি না থাকলে ক্ষয়ক্ষতি অনেক বড় হতো। সাহাবাদ আপনার কাছে ঋণী হয়ে রইল।"
যুবকটি বিনয়ের সাথে মাথা নত করল।
"এত বড় কথা বলবেন না, জমিদার বাবু। অন্যায়ের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরা আমার কর্তব্য ছিল মাত্র।"
তার কণ্ঠস্বরে ভীষণ ভদ্রতা। বাইজিদ শাহ মৃদু হেসে বললেন,
"আপনার নামটা তো এখনো জানা হলো না।"
যুবক উত্তর দিল
"মুয়াজ ইবনে হামজা।"
নামটা শুনে আশেপাশের কয়েকজন একে অপরের দিকে তাকাল। বাইজিদ শাহও ভ্রু কুঁচকালেন।
"মুয়াজ ইবনে হামজা?"
"জি।"
"কোনো রাজ্যের রাজপুত্র আপনি?"
মুয়াজ শান্ত গলায় বলল,
"জি, মিশর।"
বাইজিদের চোখ বড় হয়ে গেল।
"মিশর?"
মুয়াজ মাথা নেড়ে বলল,
"আমাদের বণিক কাফেলা পশ্চিমাঞ্চলের এক রাজ্যে যাচ্ছে। পথিমধ্যে সাহাবাদের ভেতর দিয়েই যেতে হচ্ছিল।"
বাইজিদ শাহ তার মুখের দিকে অপলক তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন
"আপনার পিতার নাম কি সুলতান হামজা আল নাসির?"
"জি।"
"আর আপনার ফুপু..."
কথা বলতে গিয়ে গলা কেঁপে উঠল তার।
"জাহরা আল আমিরা?"
মুয়াজের মুখ নরম হয়ে এলো।
"তিনি আমার আব্বার বড় বোন ছিলেন।"
বাইজিদ শাহ আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। তার চোখ ভিজে উঠল। আশেপাশের সবাই বিস্মিত। সাহারা, শাখা, জান্নাত সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। বাইজিদ ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলেন। তারপর দুই হাত দিয়ে মুয়াজের কাঁধ চেপে ধরলেন।
"তুমি... তুমি জাহরার রক্ত?"
মুয়াজ কিছু না বলে মাথা নত করল। বাইজিদের চোখে ১৬ বছর আগের যুদ্ধের দৃশ্য ভেসে উঠছে।
রক্তে ভেজা যুদ্ধক্ষেত্র। সেই ভয়ংকর দিনে সাহাবাদের পাশে এসে দাঁড়ানো বিদেশি সেনাদল।
তাদের নেতৃত্বে ছিলেন এক নারী। জাহরা আল আমিরা। মিশরের সিংহী। তিনি নিজের সৈন্য নিয়ে সাহাবাদকে রক্ষা করতে এসেছিলেন। শুধু সাহায্যই করেননি। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত যুদ্ধ করেছেন এবং সেই যুদ্ধেই প্রাণ দিয়েছিলেন। সাহাবাদ আজও তার ঋণ শোধ করতে পারেনি। বাইজিদের চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
"তোমার ফুপু আমাদের জন্য জীবন দিয়েছিলেন, মুয়াজ।"
"আমি জানি।"
"সাহাবাদ তার কাছে চিরঋণী।"
মুয়াজ নরম স্বরে বলল,
"ফুপু বলতেন, সাহাবাদ তার দ্বিতীয় মাতৃভূমি।"
কথাটা শুনে উপস্থিত অনেকেরই গা শিউরে উঠল। বাইজিদ শাহ এক গভীর নিঃশ্বাস ফেললেন। তারপর দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,
"আজ থেকে তুমি অতিথি নও। এই মহল তোমার নিজের মহল।"
"আপনি অতিরঞ্জিত করছেন। আমাকে লজ্জা দেবেন না”
"একদম না।"
বাইজিদ শাহ এবার প্রহরীদের দিকে ঘুরে বললেন,
"অতিথিশালার সর্বোত্তম কক্ষ প্রস্তুত করা হোক। রাজপুত্র মুয়াজ ইবনে হামজা আজ রাত সাহাবাদ মহলেই অবস্থান করবেন।"
প্রহরীরা আদেশ পেয়ে মাথা নত করল। মুয়াজ ভদ্রভাবে বলল,
"সকালেই যাত্রা করার কথা ছিল।"
“উহু উহু সেটা তো হবে না।"
বাইজিদের ঠোঁটে আন্তরিক হাসি ফুটল।
"কমপক্ষে দুইটা রাত। এটা আমার অনুরোধ নয়, দাবি।"
মুয়াজ হালকা হেসে মাথা নত করল।
"তাহলে আপনার দাবি অমান্য করার সাহস আমার নেই।"
দূরে দাঁড়িয়ে থাকা সাহারা কৌতূহলী চোখে লোকটাকে দেখল। শাখা নীরবে তাকিয়ে আছে। হচ্ছে টা কি এসব। নিয়তি নিজেই তাকে সাহাবাদে পাঠিয়েছে। অন্ধকারের আড়াল থেকে কেউ একজন সবকিছু দেখছে। সাহাবাদের চারপাশে জালের মতো ছড়িয়ে পড়া ষড়যন্ত্র এখন আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
রাতের শেষ প্রহরে অতিথিশালার বারান্দায় বসল মুয়াজ ইবনে হামজা। দূরের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে আছে সে। মরুভূমির রাজ্য থেকে আসা এই যুবরাজের চোখেও সাহাবাদের সবুজ প্রকৃতি বিস্ময় জাগিয়েছে। বাইজিদ শাহ তখনও তার সাথে গল্প করছিলেন। কথা প্রসঙ্গে মুয়াজ মৃদু হেসে বলল,
"জমিদার সাহেব, কাল আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ অতিথি আসবেন।"
বাইজিদ ভ্রু তুললেন।
"কে?"
"আমার পিতা।"
"মিশরের সম্রাট?"
"জি।
বাইজিদের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। মুয়াজ আবার বলল,
"আমিরাবাদের দিকে যাওয়ার আগে একদিন বিশ্রাম নিতে চান। পথের মধ্যে সাহাবাদ সবচেয়ে নিরাপদ এবং সুন্দর স্থান বলে এখানে থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।"
কয়েক মুহূর্ত বাইজিদ শাহ যেন বিশ্বাসই করতে পারলেন না। তারপর হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,
"এ তো আমাদের জন্য বিরাট সম্মানের বিষয়!"
মুয়াজ হাসল।
"আব্বা আমার ফুপুর কথা প্রায়ই বলেন। সাহাবাদের নাম তার কাছে অপরিচিত নয়।"
বাইজিদের বুক গর্বে ভরে উঠল।
"আগামীকালই মহলের সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেওয়া হবে।"
মুয়াজ কে বিশ্রাম নিতে বলে চলে গেল বাইজিদ।
***
শাখা আর সাহারা প্রায় দৌড়ে ঢুকল জান্নাতের কক্ষে। জান্নাত তখন জানালার পাশে বসে সূচিশিল্প করছিল। নকশি কাথা বুনন তার বড় শখের। দুই বোনের হাঁপাতে হাঁপাতে প্রবেশ দেখে সে অবাক হয়ে বলল,
"কি হয়েছে?"
সাহারা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
"আপা! জানো আজ মহলে সে এসেছে?”
"কে?"
সাহারা লাফিয়ে পালঙ্কে উঠে এলো
"আরে মিশরের যুবরাজ! কী সুপুরুষ আপা তুমি না দেখলে বুঝবে ই না। কী যুদ্ধের কায়দা। আমি তো পুরো….”
সাহারার কথা ঠেকে গেল। শাখার দিকে তাকিয়ে বলল
“এই আপা কি জানি বলে ওটাকে?”
শাখাও পালঙ্কে বসে বলল
“ফিদা”
“হ্যা হ্যা ওই। আমি তো পুরাই ফিদা”
শাখা এবার শান্ত গলায় বলল,
"আসলেই সে দারুণ যোদ্ধা। আর বেশ বিনয়ী বুঝলা”
জান্নাত হেসে ফেলল।
"আচ্ছা, বলো শুনি।"
সাহারা বিছানায় লাফিয়ে উঠল
"আমি জীবনে এমন মানুষ দেখিনি!"
"তুই তো প্রতি মাসেই একজনকে দেখে এই কথা বলিস।"
"না না, এবার সত্যি!"
শাখাও মৃদু হাসল।
"স্বীকার করতেই হবে, যুবরাজের ব্যক্তিত্ব আলাদা।"
সাহারা হাত নেড়ে বলতে লাগল,
"যুদ্ধ করার সময় মনে হচ্ছিল গল্পের কোনো বীর বেরিয়ে এসেছে। আর চেহারা….."
"সারা!"
শাখা সতর্ক করল। আপার সামনে কি সব বলছে
কিন্তু সাহারা থামল না।
"না আপা, তুমি বুঝছ না। এমন কাঁধ! এমন লম্বা মানুষ! ঘোড়ার ওপর বসলে মনে হয় যুদ্ধ না করেই জিতে গেছে। উফফফ কি চলন”
জান্নাত এবার সত্যিই হেসে ফেলল।
"তুই মানুষের বর্ণনা দিচ্ছিস নাকি যুদ্ধের হাতি?"
শাখাও হেসে উঠল। সাহারা গম্ভীর মুখে বলল,
"দূর! আমার কথা গুরুত্বই দেয় না কেউ। যাই গা"
****
পরদিন ভোর থেকেই সাহাবাদ মহলে ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেল। প্রবেশদ্বার ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করা হয়েছে।বরাজকীয় পতাকা উড়ছে মূল ফটকে।
বাইজিদ শাহ নিজে মূল ফটকে অপেক্ষা করছেন।
দূর থেকে শোনা গেল অশ্বারোহী বাহিনীর শব্দ।
দেখা গেল বিশাল কাফেলা। সোনালি ও সবুজ পতাকা বাতাসে উড়ছে। মিশরের রাজকীয় প্রতীক ঝলমল করছে সূর্যের আলোয়। অশ্বারোহী সৈন্য, উট, রথ, দেহরক্ষী পুরো বহরটাই রাজকীয় মহিমায় ভরপুর। মাঝখানে অশ্বারোহণ করে এগিয়ে আসছেন একজন পুরুষ। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। দীর্ঘ সযত্নে পরিচর্যা করা দাড়ি।
গভীর প্রজ্ঞাময় চোখ। যেন বহু দাপট শালী একজন শাসক। তিনি হলেন মিশরের সম্রাট হামজা আল নাসির। মুয়াজ এগিয়ে গিয়ে ঘোড়া থেকে নেমে সালাম করল। সম্রাট স্নেহভরে ছেলের কাঁধে হাত রাখলেন। তারপর বাইজিদ শাহ এগিয়ে এলেন। বাইজিদ মাথা নত করে বললেন,
"সাহাবাদে আপনাকে স্বাগতম, মহামান্য।"
সুলতান হামজা সঙ্গে সঙ্গে তাকে তুলে ধরলেন।
"না, না। এমন করবেন না। আপনার নাম আমি বহুবার শুনেছি।"
তার কণ্ঠ ছিল উষ্ণ।
"বিশেষ করে আমার বোন জাহরার কাছ থেকে।"
বাইজিদের চোখ আবার ভিজে উঠল। সম্রাট নিজেই তাকে আলিঙ্গন করলেন।
"আমার বোন আপনাকে এবং সাহাবাদকে নিজের পরিবার মনে করত।"
বাইজিদ আবেগময় কণ্ঠে বললেন,
"তার মত বন্ধু ভাগ্য করেই পাওয়া যায়। যা সাহাবাদ পেয়েছিল।”
কয়েক মুহূর্ত দুই প্রবীণ মানুষ স্মৃতি চারণ করলেন। অতীতের স্মৃতি যেন দুজনকেই স্পর্শ করল। তারপর শুরু হলো আপ্যায়ন। মহলের সর্বোত্তম কক্ষ দেওয়া হলো সম্রাটকে। বিশেষ ভোজের আয়োজন করা হলো।
সাহাবাদের সেরা ফল, মধু, পাহাড়ি ঝর্ণার পানি, দুর্লভ খাবার সবকিছু সাজানো হলো তার সামনে।
সুলতান হামজা চারপাশ দেখে মুগ্ধ হয়ে বললেন,
"এখন বুঝতে পারছি কেন আমার বোন এই ভূমিকে এত ভালোবাসত।"
দূরে দাঁড়িয়ে সাহারা, শাখা আর জান্নাত সব দেখছিল। সম্রাট খাবার খাচ্ছেন আর বাইজিদ এর সাথে টুকটাক আলাপ করছেন। পাশেই বসে মুয়াজ। দুজন গুরুজন এর সামনে সে ভদ্রতা বজায় রেখে কথা শুনছে। সুলতান বাইজিদ এর হাত ধরে বিনয়ী হয়ে বলল
“জনাব, আপনার কাছে এক খানা আর্জি নিয়ে এসেছিলাম”
বাইজিদ সায় দিলো।
“অবশ্যই। অকপটে বলুন মহামান্য”
সুলতান মুচকি হেসে বললেন
“আমি আমাদের এই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক কে আত্মীয়তায় রুপ দিতে চাই। কি বলেন?”
বাইজিদ সময় নিলো তাকে কথা শেষ করতে দিতে। সুলতান মুয়াজের কাঁধে হাত রেখে বলল
“আমার এক মাত্র পুত্র মুয়াজের সাথে আপনার কন্যার বিবাহের প্রস্তাব রাখছি মহামান্য। আপনার রাজ্যের মুকুট, আদরের শাহজাদী কে আমাদের ঘরে রানী করে নিয়ে যেতে চাই”
বাইজিদ এর ঠোঁট জোড়া প্রশস্ত হয়। মুয়াজ কে তারও ভীষণ পছন্দ হয়েছে।
“আপনার আবদার ফেলার ক্ষমতা আমার নেই মহামান্য। আপনার পুত্র নিঃসন্দেহে সুযোগ্য। আমি আপনার প্রস্তাব গ্রহণ করছি। কিন্তু আমাদের তিন মেয়ের কাকে আপনি পুত্রবধূ করতে ইচ্ছুক সেটা তো জানালেন না”
সম্রাট হেসে বলল
“প্রথমত আমরা পুত্রবধূ নয় একজন শাহজাদী নিয়ে যাব।”