বাইজিদ শাহ যেন হতবাক হয়ে বসে রইলেন।
মিশরের ভবিষ্যৎ সুলতান মুয়াজ।
বর্তমান সুলতান তার পুত্রের জন্য সাহাবাদের কন্যার প্রস্তাব এনেছেন! তার মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
"মহামান্য, এটা তো আমাদের জন্য বিরাট সম্মানের বিষয়!"
সুলতান হেসে বললেন,
"তাহলে আপনি সম্মত?"
"নিশ্চয়ই।"
বাইজিদ শাহ্ একটু ইতস্তত করে বললেন,
"তবে জানতে চাইছিলাম আমার তিন কন্যার মধ্যে কোন জনকে আপনার পুত্রবধূ হিসেবে চান?"
সুলতান মৃদু হাসলেন।
"সেটা আপনার ওপর ছেড়ে দিলাম। আপনি যাকে বিবাহ উপযুক্ত মনে করেন, তাকেই দিন।"
বাইজিদ বিস্মিত হলেন। সাধারণত রাজপরিবারগুলো আগে রূপ, বংশ, গুণ সব যাচাই করে। অথচ এই মানুষটি যেন এসব নিয়ে বিন্দুমাত্র চিন্তিত নন। কিছুক্ষণ ভেবে তিনি বললেন,
"তাহলে আমি আমার জ্যেষ্ঠ কন্যা জান্নাতের প্রস্তাব রাখতে চাই।"
সুলতান সন্তুষ্টির সাথে মাথা নেড়ে বললেন,
"আলহামদুলিল্লাহ”
"তবে আগে মুয়াজের মতামত নেওয়া প্রয়োজন।"
"অবশ্যই।"
মুয়াজ চুপচাপ বসে শুনছে সবটা। সুলতান মুয়াজের কাঁধে হাত রেখে বলল
"মুয়াজ, আমি তোমার জন্য জমিদার কন্যা জান্নাতের প্রস্তাব গ্রহণ করেছি। তোমার মতামত কি?"
মুয়াজ একবার পিতার দিকে তাকাল। তারপর শান্তভাবে বলল,
“আপনার মতই আমার মত, আব্বা।"
বাইজিদ শাহ হাসলেন।
“তাহলে আপত্তি নেই?"
"জি, না।"
"তুমি কি আগে তাকে দেখতে চাও?"
মুয়াজ একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেল। মাথা নিচু করে হালকা হাসল।
"না, প্রয়োজন নেই।"
বাইজিদ আরেক দফা অবাক হলেন।
"প্রয়োজন নেই?"
মুয়াজ এবার মাথা নিচু করেই বলল,
"চেহারা মানুষের সব কিছু নয়।"
কক্ষের সবাই নীরবে তার দিকে তাকিয়ে আছে। সে আবার বলল,
"যদি তিনি সৎ হন, চরিত্রবান হন, পরিবারকে সম্মান করতে জানেন তাহলে সেটাই যথেষ্ট। একজন উত্তম জীবন সঙ্গী কে সুন্দর হতেই হবে এ কোথাও উল্লেখ নেই। কাজেই আমার এসব নিয়ে কোনো মাতামাতি নেই”
সুলতান হামজার চোখে গর্বের ঝিলিক দেখা গেল। তিনি জানতেন, তার পুত্র ছোটবেলা থেকেই মানুষের বাহ্যিক সৌন্দর্যের চেয়ে অন্তরের মূল্য দিতে শিখেছে। বাইজিদ শাহ আবেগ নিয়ে বললেন,
"আল্লাহ তোমাকে উত্তম প্রতিদান দিবেন পুত্র। আজকাল এমন কথা খুব কম যুবকের মুখে শোনা যায়।"
মুয়াজ মাথা নত করল। এই খবর তখনও মহলের নারী মহলে পৌঁছায়নি। জান্নাত নিজের কক্ষে বসে কোরআন তিলাওয়াত করছে। শাখা বারান্দায় দাঁড়িয়ে দূরের পাহাড় দেখছে। এর মনে রণক্ষেত্র ছাড়া অন্য কিছু ঘোরে না। সাহারা বাগানে নিজের পোষা সজারুকে নিয়ে যুদ্ধ করছে।
আর নিয়তির অদ্ভুত খেলায়, যার জন্য প্রস্তাব এসেছে সেই জান্নাতের হৃদয়ের এক কোণে এখনও শিকারি যুবরাজের স্মৃতি নীরবে জায়গা করে বসে আছে। অন্দরে খবর জানানো হলো। সকলে বেশ উৎফুল্ল। এমন রাজবংশে আত্মীয় করার সৌভাগ্য জুটছে। বিশেষ করে মুয়াজের ব্যবহার আর আচরণে বড্ড বেশিই খুশি সাবেক সম্রাজ্ঞী জমিদারের অর্ধাঙ্গিনী মেহেরুন্নেসা। জান্নাতের বয়স ২৪ চলে। যদিও তাহার রুপ লাবণ্যে এখনও কিশোরী ছাপ। কিন্ত প্রাপ্তবয়স্কা কন্যার বিবাহ দেওয়ার জন্য বহুদিন ধরেই পাত্র খুজছিলেন তারা। অবশেষে এমন একজন পাত্র পাওয়া গেছে। বংশ মর্যাদা, জ্ঞান, শিক্ষা কোনো দিক দিয়ে মুয়াজ কমতি রাখে না এ নিয়ে তাদের মনে বিন্দুমাত্র সংশয় নেই।
জান্নাত কোরআন তিলাওয়াত শেষে মাথায় ঘোমটা দিয়ে হেঁশেলে ঢুকলো। কিছু খাবার সে নিজ হাতে রান্না করবে। সাহারা যা বলল সেদিন তা সত্যি হলে আজ মেহরাব আসবে। তারই জন্য কিছু তৈরি করতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু তার আম্মা আর মণি মা তাকে হেঁশেল থেকে ঘরে নিয়ে গেল টেনে। জান্নাত কিছু না বুঝেই তাদের সাথে গেল। সুনেহেরা তাকে আয়নার সামনে বসিয়ে বলল
“আমি যেই পোষাক টা বের করে দিচ্ছি। এটা পরে তৈরি হয়ে বৈঠক ঘরে আয়”
জান্নাত সহজ সরল ভাবে জিজ্ঞেস করে
“কেন মণি মা? আমরা কি কেথাও যাচ্ছি?”
মেহেরুন্নেসা মুচকি হেসে বলেন
“মিশরের সুলতান নিজে তার পুত্রের জন্য জন্য তোমার সম্বন্ধ নিয়ে এসেছে মা। তৈরি হয়ে নাও জলদি”
সুনেহেরা আয়নার সামনে বসা জান্নাতের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন
"মা, ছেলেটাকে আমার খুবই পছন্দ হয়েছে।"
মেহেরুন্নেসাও মৃদু হাসলেন।
"রাজপুত্র তো বটেই, কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা তার ব্যবহার।"
জান্নাত মাথা নিচু করে বসে রইল। গাল দুটো ইতোমধ্যে লাল হয়ে উঠেছে। সাহারা পাশে বসে ফিসফিস করল
"আপা, এখনো সময় আছে। পালিয়ে যাবি নাকি?"
পরক্ষণেই মাথায় হালকা চাপড় খেল।
"একদম বদ বুদ্ধি দিবি না একে”
সাহারা বাচ্চা সুলভ আচরণ করে গিয়ে জড়িয়ে ধরলো সুনেহেরা কে
“আআআআআ মা। এখনি আপার বিয়ে কেন দিতে হবে? আমি আপনাকে ছাড়া থাকতেই পারবো না আআআআআ।”
হাত পা ছোড়াছুড়ি শুরু করলো বাচ্চাদের মত। সুনেহেরা বড় দুই মেয়েকে শাসন করতে পারলেও এর বেলায় সে ভীষণ নাজুক। সাহারার দিকে তাকালে মনে হয় সে কিশোরি নিজেকে দেখছে। যৌবন কালে আয়নায় তাকালে যেই অবয়ব টা দেখতো, তা এখন সাহারার নুখের দিকে তাকালে দেখে। মেয়েকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে বলল
“মা, আপা সারাজীবন কাছে থাকে না সোনা। তাছাড়া জান্নাত গেলেও শাখা তো আছে”
“ও বকে আমায়”
শাখা চোখ পাকিয়ে বলল
“ বলব? মনি মা কে বলব?”
“এই না না না না। সমস্যা নেই। চলবে চলবে। তুমি আপাকে বিয়ে দিয়েই দাও”
***
সন্ধ্যার কিছুক্ষণ পরেই দুই পরিবারের সিদ্ধান্তে জান্নাত ও মুয়াজকে আলাদা করে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হলো। তবে শরীয়াহর পর্দার বিধান মেনে। মাঝখানে ভারী পর্দা টাঙানো হলো। দুই পাশে দুটি আসন। একপাশে মুয়াজ। অন্যপাশে জান্নাত। যদিও বিবাহের পূর্বে ছেলে মেয়ে একে অপরকে দেখে নিতে পারে। কিন্তু মুয়াজ নিজেই চায় নি তা। পর্দার বাইরে দূরে দাঁড়িয়ে আছেন মেহেরুন্নেসা, সুনেহেরা ও কয়েকজন বয়োজ্যেষ্ঠা নারী। অবশ্য সাহারা আর শাখাকে অনেক কষ্টে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে। মেয়ে আর হবু জামাই এর ব্যক্তিগত আলাপের আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেহেরুন্নেসার কাছে ভীষণ দৃষ্টি কটূ লাগছে। কিন্তু কিচ্ছু করার নেই। বিচ্ছু দুটো যে কোনো সময় হুড়মুড় করে ঢুকে কোনো কান্ড বাধিয়ে দেবে।
ঘরের ভেতর পিনপতন নীরবতা। পর্দার এপাশে জান্নাত নিজের ওড়নার কিনারা মুচড়ে চলেছে।
ওপাশে মুয়াজ নিজের আঙুলের আংটি ঘোরাচ্ছে। কেউ কিছু বলছে না। একটু পর মুয়াজ গলা পরিষ্কার করল। জান্নাতের বুক ধক করে উঠল। মনে হলো এবার কিছু বলবে। কিন্তু না। আবার নীরবতা। আরও কয়েক মুহূর্ত কেটে গেল।
জান্নাত সাহস সঞ্চয় করল। আসসালামু আলাইকুম বলবে ভেবেছিল। কিন্তু শব্দ বের হওয়ার আগেই গলা আটকে গেল। ওপাশে মুয়াজও একই অবস্থায়। বিরোধী দল কে যুক্তিতর্কে থ বানিয়ে বসিয়ে রাখা যুবরাজ আজ একটা বাক্য বলতেও অস্বস্তি বোধ করছে। অবশেষে খুব নিচু স্বরে বলল
"আসসালামু আলাইকুম।"
জান্নাত প্রায় ফিসফিস করে উত্তর দিল,
"ওয়া আলাইকুমুস সালাম।"
তারপর আবার চুপ। মাঝে মাঝে শ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে। এর বেশি কিছু নয়। জানালায় কান পেতে দাঁড়িয়ে থাকা সাহারা ফিসফিস করে বলল,
"এরা কি ঘুমিয়ে গেছে?"
শাখা কনুই মেরে থামিয়ে দিল। অবশেষে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর সুনেহেরা ভেতরে উঁকি দিলেন। দেখলেন দুজনই মাথা নিচু করে বসে আছে। সাহারা ঠোঁট বাকায়। ও হলে এতক্ষণ প্রশ্ন করে পাগল করে ফেলতো লোক টাকে। কিন্তু আপা কিচ্ছু বলছে না। আচমকে কানে টান লাগতেই জানালা ছেড়ে সরে সরে এলো। দুটোর কান ধরে এনে দাড় করালো সুনেহেরা।
“তোমাদের লজ্জা করে না? বোন আর তার হবুর কথা শুনছ?”
শাখা মাথা নিচু করে থাকলেও সাহারা বলল
“ওরা কথা কোথায় বলছে। আমার তো লাগছিলো দুটো ঘুমিয়ে পড়েছে…”
শাখা ঘাড়ে গাঁট্টা মারলো। সুনেহেরা দুটো কে কড়া নিষেধাজ্ঞা দিয়ে দিল যাতে সারা রাতে ঘরের বাইরে পা না ফেলে।
ওরা যাওয়ার পর সুনেহেরা জান্নাত আর মুয়াজ যে কক্ষে আছে সেখানে গেল
"আচ্ছা, তোমরা এখন যাও।"
মুয়াজ প্রথমে উঠে দাঁড়াল। ভদ্রভাবে সালাম জানিয়ে বেরিয়ে গেল। জান্নাতও মাথা নিচু করে বেরিয়ে এলো। দুজনেরই অবস্থা এমন, যেন যুদ্ধ জিতে এসেছে কিন্তু কথা বলতে পারেনি। নিজ নিজ কক্ষে ফেরার পরও দুজনের মুখে লজ্জার ভার কমছে না।
জান্নাত কে না ঝাড়া পর্যন্ত সাহারা শান্তি পাচ্ছে না। শাখা আরাম চেয়ারে বসে দোল খাচ্ছে আর ও ঘরের মধ্যে পায়চারি করছে আর বিরবির করছে
“ও আসলেই আমার বোন তো ছ্যা ছ্যা ছ্যাহহ। ইজ্জতের চচ্চড়ি করে দিলো পুরো। ওর কি গলা দিয়ে কথা টথা বেরোয় না? খাবার খাইয়ে পাঠায়নি নাকি? আবার মণি মা ও আমাকে আপার কাছে যেতে দিচ্ছে না। কি জ্বালা রে বাবা”
শাখা কপাল কুচকে বলল
“সারা চুপ করবি তুই? কখন থেকে বকেই যাচ্ছে বকেই যাচ্ছে”
সাহারা কোমড়ে হাত দিয়ে এগিয়ে আসলো
“তুই এখানে কি করছিস? যা না নিজের কক্ষে”
শাখা দুলতে দুলতে বলল
“এখন থেকে রোজ রাতে আমি তোর সাথে থাকব। আপা বলেছে তোকে পাহাড়া দিয়ে রাখতে”
সাহারার খুব ইচ্ছে করছে দুই পা মেলে বসে বসে জোরে জোরে কাঁদতে। এ কি জ্বালায় পড়ল।
***
পরদিনই দুই পরিবার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করল।
শুক্রবার জুম্মার দিন। ইসলামী শরীয়াহ অনুযায়ী সম্পূর্ণ ঘরোয়া পরিবেশে নিকাহ সম্পন্ন হবে।
কোনো জাঁকজমক, অযথা প্রদর্শন, রাজকীয় শোভাযাত্রা ছাড়াই। যখন এ নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল, তখন সুলতান হামজা মৃদু হেসে বললেন,
"আমার পুত্রের ইচ্ছাও ঠিক এটাই।"
বাইজিদ শাহ জিজ্ঞেস করলেন,
"কেমন?"
মুয়াজ শান্ত স্বরে বলল,
"আমি ঢাকঢোল পিটিয়ে আমার স্ত্রীকে মানুষের সামনে প্রদর্শন করতে চাই না।"
ঘর যেন নিস্তব্ধ হয়ে গেল। এই যুবক টা ক্ষণে ক্ষণে সবাইকে মুগ্ধ করে চলেছে। তারপর বলল,
"আল্লাহ যাকে আমার জন্য হালাল করেছেন, তাকে সম্মান করাই আমার দায়িত্ব। লোক দেখানো আয়োজন এর প্রয়োজন নেই আমার। আমাদের বিশেষ এই দিনে এতিম এবং গরীব দের গৃহে খাবার, পোষাক পৌছে দেওয়া হবে”
সুলতান হামজার মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটল। মেহেরুন্নেসা ও সুনেহেরা একে অপরের দিকে তাকালেন। তাদের মন আরও নরম হয়ে গেল ছেলেটির প্রতি।
রাত অনেক আগেই নেমেছে সাহাবাদের আকাশে। মহলের অধিকাংশ প্রদীপ নিভে গেছে। জান্নাতের বিয়ে ঠিক হয়েছে। আর মাত্র কয়েকদিন পরেই বড় আপা এই মহল ছেড়ে চলে যাবে। ভাবতেই বুকের ভেতরটা কেমন খালি খালি লাগে। শাখার অবস্থাও একই। যদিও দুজনেই প্রকাশ করছে না। সারাদিন সাহারা যতই হাসি-ঠাট্টা করুক, মাঝে মাঝেই চোখ চলে যায় জান্নাতের দিকে। জান্নাত অবশ্য আগের মতোই শান্ত। তার কিছু নিয়ে কোনো অভিযোগ নেই। সবকিছু কেমন নীরবে মেনে নিচ্ছে।
আজকের রাতে নাসিরাবাদ প্রাসাদে যাওয়ার কথা। দক্ষিণের সেই রহস্যময় ধ্বংসপ্রাপ্ত নগরী আবার টেনে নিয়ে যাচ্ছে সাহারাকে। মহলের সবাই গভীর ঘুমে ডুবে যেতেই সে বেরোনোর সিদ্ধান্ত নিলো। কালো পোশাক পরে নিল অন্ধকারের সাথে মিশে যেতে। সোনালি চুল গুলোও বেঁধে নিলো। মুখ আংশিক ঢেকে নিল কাপড়ে। জানালা দিয়ে একবার চারপাশ দেখে নিল। কেউ জেগে নেই। প্রহরী রা বল্লম আকড়ে ঘুমে লুটিয়ে পড়েছে। নেমে গেল জানালা দিয়ে।
অভ্যাস হয়ে গেছে এখন। প্রাসাদের পেছনের পথ পেরিয়ে প্রাচীরের ভাঙা অংশ দিয়ে বেড়িয়ে এলো রাস্তায়। সবকিছু এখন চোখ বন্ধ করেও পার হতে পারে এখন। কিছুক্ষণের মধ্যেই মহল ছেড়ে বেরিয়ে এলো সাহারা।
সাহাবাদ নগরী রাতেও সুন্দর। সরু পাথরের রাস্তা। বন্ধ বাজারের দুই পাশে সারি সারি ঝুলন্ত লণ্ঠন। মাঝে মাঝে প্রহরীদের টহল সামনে পরে।
তাদের লুকিয়ে দ্রুত এগিয়ে চলল সাহারা।
নগরের শেষ প্রান্তে এসে একটি পুরনো মোড় আছে। সেখানে পৌঁছে তবেই থামলো। দূর থেকে একটি কালো অশ্বকে দেখা যাচ্ছে। অশ্বটি স্থির দাঁড়িয়ে। তার পিঠে বসে আছে একজন অশ্বারোহী। সাহারা তাকে চিনতে ভুল করল না।
অশ্বারোহী স্বয়ং মেহরাব ওয়াসেম। দেহে যুদ্ধবেশ।
বুকে বর্ম, কোমরে দীর্ঘ তরবারি, পিঠে ধনুক, কাঁধে তূণীর। মুখের নিচের অংশ কালো কাপড়ে ঢাকা। শুধু চোখ দুটো দেখা যাচ্ছে। অন্ধকারেও অস্বাভাবিক উজ্জ্বল। শিকারীর চোখ বলে কথা।
একবার কোনো লক্ষ্য স্থির করলে সহজে ছেড়ে দেয় না।
সাহারা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইল। লোকটা যেন রাতের অন্ধকারের অংশ হয়ে বসে আছে।
হাওয়ায় তার কালো আলখাল্লার অংশ দুলছে।
অশ্বটাও ভীষণ শান্ত। যেন মালিকের মতোই ধৈর্যশীল। মেহরাব ভ্রু কুচকে বলল
“সময় জ্ঞান নেই তোমার? কখন থেকে অপেক্ষা করছি ধারণা আছে?”
সাহারা ভ্রু কুঁচকাল।
“মেয়ে হলে বুঝতেন। সবাই ঘুমিয়ে যাওয়ার পর প্রহরীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে জানালায় ওড়না বেঁধে তারপর নিচে নেমে…..”
কথা শোস হওয়ার আগেই মেহরাব ঠাস করে তালি দেওয়ার মত করে দুই হাত জড় করলো সাহারার সামনে। অর্থাৎ সে বিরক্ত, শুনতে চায় না এসব। সাহারা মুখ কালো করে মাথা নিচু করলো। মেহরাব ঘোড়ার লাগাম ধরে বলল
“দেরি করেছো না? হেঁটে যাবে সারা পথ”
সাহারা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলল
“অ্যা?”
মেহরাব কিছু না বলেই গতি কমিয়ে ঘোড়া চালাতে শুরু করল। সাহারা পিছু পিছু দ্রুত হাঁটতে হাঁটতে বলল
"আচ্ছা আমাকে কষ্ট দেওয়া ছাড়া আপনার আর কোনো কাজ নেই?"
কে জানে মেহরাব শুনল কিনা। ছুটছে নিজের মত। সাহার প্রায় এক প্রকার দৌড়ে তার সঙ্গ দিচ্ছে। সামনে ঘন জঙ্গল। তারও ওপারে নাসিরাবাদের পরিত্যক্ত প্রাসাদ। সাহারার পা আর চলে না। পাথরের ঘষায় ইতিমধ্যেই রক্ত ঝড়তে শুরু করেছে পা থেকে। তবুও চলেছে মেহরাব এর পিছু পিছু। আচমকা পায়ের নিচে ধারালো কিছু পড়তেই ব্যথায় কুঁকড়ে বসে পড়ল।
“আআআহহহ”
গলগল করে রক্ত পড়তে শুরু করল। মেহরাব ততক্ষণে বেশ খানিকটা এগিয়ে গেছে। সাহারা কে না দেখে থামালো ঘোড়া। পিছনে ঘুরে দেখলো সাহারা পাথুরে রাস্তায় বসে পঠেছে। ঘোড়া থেকে নেমে দ্রুত এগিয়ে এসে হাঁটু গেড়ে বসল।
"কতটা কেটেছে দেখি।"
"সরুন আপনি, আপনার দরকার নেই।"
প্রচন্ড ক্রোধে কথাটা বলল সাহারা। চোখ পানিতে টইটম্বুর। মেহরাব নিজের আলখাল্লার এক অংশ ছিড়ে বলল
"চুপ করে বসো।"
সাহারা মুখ ফুলিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল।
মেহরাব তার পায়ের কাপড় একটু সরিয়ে দেখল।
চামড়া ছড়ে গেছে। রক্তও বের হয়েছে বেশ।
অত গভীর নয়, তবে হাঁটলে ব্যথা করবে। মেহরাব দীর্ঘশ্বাস ফেলল। অদ্ভুত যত্নে ক্ষতটা বেঁধে দিতে লাগল।বসাহারা প্রথমে প্রতিবাদ করতে চেয়েছিল। কিন্তু পরে চুপ হয়ে গেল। শিকারীর মতো কঠিন মানুষটা মনোযোগ দিয়ে ক্ষত তে কাপড় বাঁধছে, তাকে কি শান্ত দেখাচ্ছে। বাঁধা শেষ করে মেহরাব মাথা তুলল।
"এবার? হাঁটতে পারবে?"
সাহারা উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল। দুই পা এগোতেই মুখ কুঁচকে গেল। মেহরাবের ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটল।
"হাসছেন কেন?"
মেহরাব কথা না বাড়িয়ে অশ্বটার কাছে এগিয়ে গেল। লাগাম ধরে দাঁড়াল। স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
"ওঠো।"
“হ্যা?”
সাহারা কে অবাক করে দিয়ে মেহরাব চট করে পাঁজা কোলে তুলে নিলো সাহারা কে। বসিয়ে দিলো ঘোড়া পিঠে। সাহারা কে সামনে বসিয়ে
নিজে উঠে বসল পেছনে। সাহারা অস্বস্তি বোধ করল।
বিরক্তও হচ্ছে বটে। লোকটা ঝগড়াও ঠিকমতো করে না। এমন মরার মত চুপচাপ যেতে ভালো লাগছে না মোটেও। তবুও এগিয়ে চলেছে ঘোড়ায় করে। উঁচু ভিটার ওপর দাঁড়িয়ে আছে এক বর্ম পরিহিত হৃষ্টপুষ্ট অবয়ব। এক দৃষ্টে দেখছে তাদের চলন। চাঁদের আলোয় তলোয়ার এর ফলা ঝিলিক দিয়ে ওঠে।