ফন্ট সাইজ:
থিম:
রক্তমুকুট

17-2

লেখক: জান্নাতুল ফেরদৌস

নাসিরাবাদের ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রাসাদটা দূর থেকে আবছা দেখা যাচ্ছিল। চাঁদের ফ্যাকাশে আলোয় বিশাল কালো এক ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে।

মনে হয় শত বছর ধরে অন্ধকারের মধ্যে বসে অপেক্ষা করছে কারও জন্য। চারপাশের জঙ্গল অস্বাভাবিক নীরব। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক পর্যন্ত নেই। বাতাসও যেন এখানে গা ছমছমে হয়ে গেছে। ঘোড়ার খুরের শব্দ শুনে দূরের কয়েকটা নিশাচর পাখি উড়ে গেল। সাহারা অজান্তেই একটু গা ঘেঁষে বসল মেহরাবের। মেহরাব সেটা টের পেলেও কিছু বলল না। তার তীক্ষ্ণ চোখ প্রাসাদের উপরেই স্থির। তার শিকারীর প্রবৃত্তি বারবার সতর্ক সংকেত দিচ্ছে। যেন এই ধ্বংসস্তূপের ভেতরে কেউ তাদের আগেই অপেক্ষা করছে।

প্রাসাদের সামনে এসে ঘোড়া থামালো মেহরাব।

নেমে লাগামটা একটা শুকনো গাছের সাথে বেঁধে দিল। সাহারাও নেমে এলো। পায়ের ক্ষত এখনও ব্যথা করছে।বমেহরাব একবার তাকিয়ে বলল,

"হাঁটতে পারবে?"

সাহারা মুখ কুঁচকে বলল,

"না পারলে কি কোলে করে নিয়ে যাবেন?"

মেহরাব নির্বিকার গলায় বলল,

"প্রয়োজন হলে তাই করতে হবে।"

সঙ্গে সঙ্গে সাহারা চুপ। এই মানুষটার সাথে ঝগড়া করতে গেলেই সমস্যা। কোনো কথারই ঠিকঠাক উত্তর দেয় না। সামনে বিশাল মূল ফটক। একসময় হয়তো রাজ্যের সবচেয়ে গৌরবময় প্রবেশদ্বার ছিল। এখন জং ধরা লোহার পাত ঝুলে আছে একপাশে। ভাঙা পাথরের ফাঁকে ফাঁকে জন্মেছে বুনো গাছ। লতাপাতা পুরো প্রাচীর গিলে ফেলেছে। দূরে কোথা থেকে পেঁচার ডাক ভেসে এলো। সাহারার বুকের ভেতরটা কেমন ঠান্ডা হয়ে গেল। ফিসফিস করে বলল,

"এই জায়গাটা নয়, আমার একদমই ভালো লাগছে।"

মেহরাব সামনে এগোতে এগোতে বলল,

"চুপচাপ চলে। বিয়ের দাওয়াত খেতে আসিনি”

মূল ফটক পেরিয়ে তারা ঢুকে পড়ল প্রাসাদের ভিতরে। ভাঙা চত্বর, ধসে পড়া স্তম্ভ, মাটিতে ছড়িয়ে থাকা পাথরের খণ্ড সবকিছু যেন মৃত।

কিন্তু সেই মৃত্যুর মধ্যেও কেমন একটা অদ্ভুত উপস্থিতি অনুভূত হচ্ছে। যেন অসংখ্য চোখ অন্ধকার থেকে তাকিয়ে আছে। সামনের করিডোরটা পুরো ভেঙে গেছে। একপাশের দেয়াল ধসে পড়েছে। দূরের ছাদে বাদুড় ঝুলছে শত শত। হঠাৎ তাদের একজন ডানা ঝাপটাতেই বাকিরাও একসাথে উড়ল। ফড়ফড় শব্দে পুরো প্রাসাদ কেঁপে উঠল। সাহারা চমকে গিয়ে মেহরাবের বাহু আঁকড়ে ধরল। মেহরাব মুখ ঘুরিয়ে মুচকি হাসল।

"কি হলো?"

সাহারা দ্রুত হাত সরিয়ে নিল।

"কিছু না।"

"ভয় পেয়েছো?"

দুদিকে চটপট পাথা নাড়াল। এই লোকটার সামনে এমন ভান করতে হবে যেন সে খুব সাহসী। যদি একবার বুঝতে পারে যে সে ভয় পাচ্ছে তাহলে আরও ক্ষ্যাপাতে থাকবে। মেহরাব মৃদু গলা খাকারি দিয়ে বলল

“হাত ধরতে আপতি থাকলে ওড়নার প্রান্ত দিন। ধরে নিয়ে যাই”

আরও ভেতরে ঢুকল দুজন। এখানে বাতাসে একটা স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধ। পুরোনো কাঠ, ধুলো, আর বহুদিন বন্ধ থাকা কোনো স্থানের গন্ধ।

দেয়ালের অনেক জায়গায় অদ্ভুত সব চিহ্ন আঁকা।

কিছু জায়গায় পুরোনো আরবি খোদাই। কোনো জায়গায় মুছে যাওয়া প্রতীক। মেহরাব থেমে থেমে সব দেখছে। মনে রাখছে। অবশেষে সাহারা কোমর থেকে ভাঁজ করা মানচিত্রটা বের করল।

চাঁদের আলোয় খুলে ধরতেই মেহরাব কাছে এগিয়ে এলো। দুজনের মাথা প্রায় একসাথে ঝুঁকে পড়ল মানচিত্রের উপর। সাহারা আঙুল রাখল।

"দেখুন। এখানে এই চিহ্নটা। এটাই পল্লরী নামের সেই ঘর”

মেহরাব তাকিয়ে বলল,

"আর আমরা এখন আছি এখানে।"

"মানে?"

"মানে আমরা ভুল পথে এসেছি।"

সাহারা চোখ বড় বড় করল।

"কি!"

"এদিক থেকে পল্লরী রে ঢোকার কোনো পথ নেই। এদিক দিয়ে গেলে ভাঙা হেঁশেল, আর বাম পাশ দিয়ে কারাগারের রাস্তা। আমাদের উত্তর থেকে ঢুকতে হতো”

"আগে বললেন না কেন?"

"তুমি খুব আত্মবিশ্বাস নিয়ে পথ দেখাচ্ছিলে। তাই আর মহারানী কে বিরক্ত করলাম না”

"আপনি না, আসলে একটা অসহ্য লোক!"

“যাবে? নাকি এখানে দাঁড়িয়েই বকবক করবে?”

আবার পথ বদলালো তারা। ভাঙা সিঁড়ি পেরোল।

ধসে যাওয়া বারান্দা ঘুরে গেল। একটা পুরোনো জলাধারের পাশ দিয়ে এগোল। কালো পানি জমে আছে বছরের পর বছর। চাঁদের আলোয় পানিটাকে রক্তের মতো লাগছে। অনেকক্ষণ খোঁজার পর অবশেষে তারা পৌঁছাল প্রাসাদের উত্তর-পূর্ব কোণের এক পরিত্যক্ত অংশে। এখানে ধ্বংসস্তূপ তুলনামূলক কম। দেয়ালগুলো শক্তপোক্ত ই দাঁড়িয়ে আছে। মোটা ধুলোর স্তর জমে আছে মেঝেতে। মানুষের পায়ের ছাপও নেই। সাহারা মানচিত্রের দিকে তাকিয়ে বলল,

"না! এখানেই তো হওয়ার কথা।"

মেহরাব চারপাশ দেখল। একটা পুরোনো দরজা।

দুই পাশে ভাঙা মশালদণ্ড, ফাটল ধরা দেয়াল। হঠাৎ তার চোখ থেমে গেল। দরজার উপরের অংশে। খুব ছোট একটা প্রতীক। প্রায় ধুলোয় ঢাকা। কিন্তু মানচিত্রেও ঠিক একই প্রতীক আঁকা আছে। একটা অর্ধচন্দ্র। তার মাঝখানে খোদাই করা মুকুট। সাহারার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে গেল।

"পেয়েছি..."

মেহরাব ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল। হাত দিয়ে ধুলো সরাল। প্রতীকটা স্পষ্ট হয়ে উঠল। ঠিক মানচিত্রের মতো একদম হুবহু। দুজন একবার একে অপরের দিকে তাকাল। দীর্ঘক্ষণ ধরে যে কক্ষটা খুঁজছিল তা পেয়ে গেল। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো দরজার নিচের ধুলোয় স্পষ্ট পায়ের ছাপ দেখা যাচ্ছে। খুব সাম্প্রতিক। কারও না কারও তো অবশ্যই। কেউ কি তাদের আগেই এখানে এসেছে? সম্ভবত খুব বেশি সময় আগে নয়। মেহরাবের চোখ সরু হয়ে এলো। তার হাত তরবারির হাতলে গিয়ে থামল। সাহারাও সেটা দেখে সতর্ক হয়ে গেল। দরজার ওপাশ থেকে ভেসে এলো ধাতব কিছু ঘষে যাওয়ার ক্ষীণ শব্দ।

যেন বন্ধ অন্ধকার কক্ষে মধ্যে কেউ ধাতব কিছু ঘষছে।

শব্দটা বিলিন হয়ে যায় তৎক্ষণাৎ। মেহরাব কক্ষের দরজার সামনে কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইল। তার তীক্ষ্ণ চোখ চারপাশ পর্যবেক্ষণ করছে।

কক্ষটা অস্বাভাবিক বড়। ছাদের কাঠের বিমগুলো অর্ধেক পচে গেছে। কোথাও কোথাও ঝুলে আছে মাকড়সার জাল। দেয়ালের চুন খসে পড়ে কালচে হয়ে গেছে। বহু বছরের স্যাঁতসেঁতে গন্ধে শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। আর সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয়

এতক্ষণ ধরে যে শব্দটা শুনছিল তারা, এই কক্ষে ঢুকতেই সেটা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। সাহারা ফিসফিস করে বলল,

"শুনলেন?"

"হুম।"

"শব্দটা নেই।"

মেহরাবের চোখ সরু হয়ে এলো।

"মানে আমরা যেখানে আসতে চেয়েছিলাম, ঠিক সেখানেই এসেছি।"

সাহারা কিছু বুঝল না।

"কিভাবে?"

মেহরাব একটা লোহার বাক্সের কাছে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসল।

"কারণ শব্দটা আমাদের ঘুরিয়ে রাখছিল। আমাদের এই কক্ষ থেকে দূরে রাখার জন্য।"

সাহারার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।

চারপাশে তাকালো সে। সত্যিই তো! এই মহলের ভিতরে ঢোকার পর থেকে যতবারই শব্দের দিকে এগিয়েছে, ততবারই ভুল পথে গেছে। মনে হয়েছে ডানদিক থেকে আসছে। সেদিকে গেলে আবার বামদিকে। বামদিকে গেলে আবার পেছনে।

যেন কেউ ইচ্ছা করে তাদের নিয়ে খেলছিল।

মেহরাব বলল,

"যে এই জায়গা বানিয়েছে সে ভীষণ ভেবে চিনৃতে বানিয়েছে বুঝলেন শাহজাদী”

সাহারা নিচু স্বরে বলল,

"সে তো ঠিক আছে। কিন্তু শব্দটা?"

"কোনো যান্ত্রিক ব্যবস্থা হতে পারে।"

মেহরাব বাক্সের ওপর জমে থাকা ধুলোয় হাত বুলিয়ে দিল। আঙুলের নিচে পরিষ্কার দাগ ফুটে উঠল। সে মুহূর্তেই তার মুখ কঠিন হয়ে গেল।

"এগুলো সম্প্রতি খোলা হয়েছে।"

সাহারা এগিয়ে এলো।

"মানে?"

"কেউ নিয়মিত আসে এখানে।"

দুজনেই একে অপরের দিকে তাকালো। তারপর মেহরাব প্রথম বাক্সটার তালা ভাঙল। কড়াৎ করে শব্দ হলো। ঢাকনা উঠতেই দুজনের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। ভেতরে সারি সারি নথি। চামড়ায় বাঁধানো খাতা। কিছু কাগজ এত পুরনো যে স্পর্শ করলেই ভেঙে যাবে মনে হয়। সাহারা দ্রুত একটা দলিল তুলে ধুলো ঝেড়ে খুলতেই তার নিঃশ্বাস আটকে গেল।

"এটা..."

"কি?"

"নাসিরাবাদের ভূমি খসড়া।"

মেহরাব তাড়াতাড়ি এগিয়ে এলো। সত্যিই। উপরে বড় অক্ষরে লেখা নাসিরাবাদ নগরীর রাজস্ব খতিয়ান। আরও কয়েকটা দলিল খুলতেই দেখা গেল পুরনো বংশতালিকা। জমির সীমানা। গোপন পথের নকশা। প্রাসাদের নির্মাণ পরিকল্পনা। মেহরাব নিচু স্বরে বলল,

"এগুলো যদি বাইরে যায়..."

সাহারা চেচিয়ে উঠলো। পায়ের কাছে ঠান্ডা নরম কি যেন পেয়েছে। মেহরাব চোখ সরু করে তাকিয়ে বলল

“মহারানী আপনি আমার পায়ে পা দিয়েছেন”

তারা দ্বিতীয় বাক্স খুলতেই দুজনেই স্তব্ধ হয়ে গেল। এটার ভেতরে কাগজ নেই। শুধুই অস্ত্র।

লম্বা রাইফেল বিদেশি পিস্তল তীক্ষ্ণ বেয়নেট বারুদের থলে ধাতব গোলক। আর কিছু অদ্ভুত যন্ত্র, যা সাহারা আগে কখনও দেখেনি। সাহারা অবিশ্বাস নিয়ে বলল,

"এগুলো এখানে কেন?"

মেহরাব একটা রাইফেল হাতে তুলে নিল।

তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।

"এগুলো ইংরেজদের অস্ত্র।"

সাহারা ধীরে ধীরে বলল,

"তার মানে কেউ এখানে অস্ত্র জমা করছে?"

"অনেকদিন ধরে।"

"কিন্তু কারা বলুন তোহহ?"

মেহরাব উত্তর দিল না। তার নিজের মাথাতেও একই প্রশ্ন ঘুরছে। এতদিন তারা ভাবছিল রহস্যটা শুধু পরিত্যক্ত প্রাসাদ নিয়ে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে নাসিরাবাদ কেবল একটা ধ্বংসপ্রাপ্ত নগরী নয়।

এটা কোনো বিশাল পরিকল্পনার কেন্দ্র। কেউ বছরের পর বছর ধরে এই মৃত নগরীকে ব্যবহার করছে অবৈধ মালামাল আর গোপন যোগাযোগের ঘাঁটি হিসেবে।

ঠিক তখনই ঠুক ঠুক শব্দটা আবার ভেসে এলো।

খুব কাছে থেকে শোনালো শব্দটা। এতটাই কাছে যে মনে হলো কক্ষের দেয়ালের ওপাশ থেকেই কেউ আঘাত করছে। সাহারা আর মেহরাব একসাথে মাথা ঘুরিয়ে তাকাল।

দেয়ালের দিকে। আচমকা শব্দে দুজনেরই শরীর কেঁপে উঠল। দেয়ালের এক অংশ যেন অতি সূক্ষ্মভাবে কাঁপছে। মেহরাব দেয়ালের গায়ে হাত বুলিয়ে দেখল। পাথরের গাঁথুনির এক কোণে ক্ষীণ ফাঁক। সাহারা কৌতূহল নিয়ে এগিয়ে এলো।

"কি পেলেন?"

মেহরাব উত্তর দিল না। কোমরের ছুরি বের করে পাথরের ফাঁকে ঢুকিয়ে চাপ দিতেই কড়মড় শব্দ করে দেয়ালের একটা অংশ সরে গেল। দুজনেই বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল। ভেতরে আরেকটা সরু পথ। অন্ধকারে ঢাকা। মনে হচ্ছে বহু বছর সূর্যের আলো ঢোকেনি সেখানে। সাহারা ফিসফিস করে বলল,

"এটা আবার কোথায় যায়?"

মেহরাব মশাল উঁচু করে ধরল। আলো বেশি দূর পর্যন্ত পৌঁছালো না। পথটা সরু হয়ে গভীর অন্ধকারে হারিয়ে গেছে। কক্ষের কোণে ছড়িয়ে থাকা নকশাগুলোর মধ্যে একটা তুলে নিল সে। ধুলো ঝেড়ে খুলতেই আঁকাবাঁকা রেখা চোখে পড়ল। সাহারা তার কাঁধের ওপর দিয়ে উঁকি দিল।

"এটা কি?"

"মনে তো হচ্ছে কোনো গোপন সুড়ঙ্গপথের নকশা।"

সাহারার চোখ বড় হয়ে গেল। নকশা অনুযায়ী নাসিরাবাদের পরিত্যক্ত মহলের নিচ থেকে একটি দীর্ঘ ভূগর্ভস্থ পথ জঙ্গলের দিকে চলে গেছে। কিন্তু কিছুদূর পরেই রেখাটা হঠাৎ শেষ। পরে কোনো নির্দেশনা নেই। কোথায় গিয়ে পথের সমাপ্তি হয়েছে তার উল্লেখও নেই। মেহরাব ভ্রু কুঁচকে বলল,

"ইচ্ছে করেই শেষ অংশটা বাদ দেওয়া হয়েছে।"

"কেন?"

"যাতে নকশা চুরি হলেও পুরো পথ কেউ না জানতে পারে।"

সাহারা ঠোঁট কামড়ে ভাবল। এর মানে কেউ এখনও এই পথ ব্যবহার করে। নয়তো এত সতর্কতা থাকব কেন?

মেহরাব আবার বাক্সের ভেতর হাত ঢুকিয়ে আরও কয়েকটা কাগজ বের করল। একটার পর একটা উল্টেপাল্টে দেখতে লাগল। একটা মোটা কাগজ মেলে ধরল। সাহারা তাকিয়েই বুঝল এটা পরিচিত কোনো প্রাসাদ বা দুর্গের নকশা নয়। অদ্ভুত ধরনের স্থাপনা। চারদিকে উঁচু বারান্দা। মাঝখানে বড় হলঘর। পিছনে ছোট ছোট অনেকগুলো কক্ষ। আর পুরো জায়গাটা ঘিরে রয়েছে কাঠের বেড়া। মেহরাব নিচু স্বরে বলল,

"এই ধরনের স্থাপত্য আমি আগে দেখেছি।"

"কোথায়?"

"ইংরেজদের নির্মাণে।"

সাহারার মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।

"ফরেস্ট হাউস?"

মেহরাব ধীরে মাথা নেড়ে বলল,

"সম্ভবত।"

নকশার এক কোণে ইংরেজি অক্ষরে কিছু লেখা।

অর্ধেক মুছে গেছে। ঠিক তখনই সাহারা বিরক্ত হয়ে তার হাত থেকে কাগজ টেনে নিল।

"ব্যস! ব্যস যথেষ্ট হয়েছে। রাত শেষ হয়ে যাচ্ছে।"

সাহারা কক্ষের ভাঙা জানালার দিকে আঙুল দেখাল। দূরের আকাশে ফ্যাকাশে নীল আভা ফুটতে শুরু করেছে। রাতের শেষ প্রহর। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই ফজরের আলো ছড়িয়ে পড়বে। সাহারা তাড়াহুড়ো করে বলল,

"আলো ফুটে গেলে আমি মহলে ফিরব কি করে শুনি?"

"ফিরবে হেঁটে।"

"আপনাকে আমি….."

ঘুরে দাঁড়াল মেহরাব

"কি করবে?"

সাহারা দাঁত কিঁচিয়ে তাকাল। এমন রাগী মুখ দেখলেই যেন মেহরাব এর মজাই লাগে। সাহারা এবার সত্যিই রেগে গেল।

"আপনি যদি এখনই না বের হন, তাহলে আমি একাই চলে যাচ্ছি।"

“থাক মগারানী হারিয়ে গেলে আবার জমিদার আমার গর্দান নেবে।”

“এই কি বললেন?”

মেহরাব মুচকি হাসলো

“বললাম মহারাণী”

“আমি স্পষ্ট শুনেছি আপনি মগারানী বলেছেন”

“শুনেছ ই যখন। আবার শুনতে চাচ্ছো কেন? ভালো লাগছে ডাকটা?”

মেহরাব কাগজগুলো গুছিয়ে নিল। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটা নকশা নিজের সাথে রেখে বাকিগুলো আগের মতোই রেখে দিল। কারণ এখনই সব সরিয়ে ফেললে যারা এখানে আসে তারা সতর্ক হয়ে যাবে।

"চলো।"

সাহারা যেন প্রাণ ফিরে পেল। দুজন দ্রুত কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলো। তাদের চোখের অগোচরে ভাঙা খিলানের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা বর্মপরিহিত সেই অবয়বটি আবারও তাদের দেখছে একদৃষ্টে। তার ধাতব মুখোশের ফাঁক দিয়ে জ্বলজ্বল করছে দুটি অস্বাভাবিক চোখ।

পূর্ব আকাশে ফ্যাকাশে আলো ফুটতে শুরু করেছে। রাত আর ভোরের মাঝামাঝি মনোরম সুন্দর সময়। চারপাশে কুয়াশার আস্তরণ। দূরের গাছগুলোকে দেখে মনে হচ্ছে কোনো বিশাল ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে আছে। মেহরাব অশ্বের লাগাম হাতে নিয়ে এগিয়ে চলেছে। সাহারা তার সামনে বসে। দুজনেই ভীষণ চুপচাপ। কিন্তু তা বেশিক্ষণ টিকল না। ঝোপের আড়াল থেকে একটা হরিণ বেরিয়ে এলো। ভোর রাতের শিশিরে ভেজা গা।

মেহরাবের চোখে চকচক করে উঠল শিকারীর প্রবৃত্তি। এক নিমিষে পিঠ থেকে ধনুক নামিয়ে ফেলল। সাহারা সেটা দেখেই বুঝে গেল। এই বার এটা শেষ

"আরে শু……!"

মেহরাব তীর লাগিয়ে ফেলেছে ইতিমধ্যে। সাহারা চিৎকার করে উঠল। হরিণটা মাত্র দুই কদম দৌড়াতে পেরেছিল। ধপ করে পড়ে গেল মাটিতে। নির্জন জঙ্গল আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল।বসাহারা কয়েক মুহূর্ত হতবাক হয়ে দৌড়ে গেল হরিণটার কাছে। নরম বাদামি পশমে হাত রাখল। চোখ জোড়া মুহূর্তেই ভিজে উঠল।

"আহারে..."

মেহরাব ঘোড়া থেকে নেমে নির্বিকার ভঙ্গিতে শিকারটা পরীক্ষা করছে। সাহারা ঘুরে তাকাল।

"নির্দয়, অত্যাচারি, অসভ্য লোক। কি করলেন আপনি এটা?”

মেহরাব ভ্রু কুঁচকাল।

“কি করলাম আবার?”

"ও আপনাকে কিছু করেছিল?”

“ ছিঃ ও আবার আমাকে কি করবে। আমি পুরুষ মানুষ”

সাহারা কথার গতি অন্যপথ বুঝে আরো ক্ষেপে উঠল

"আপনি এই নিরীহ পশু টাকে হত্যা করলেন?”

মেয়েটার চোখ দিয়ে সত্যি সত্যিই পানি পড়ছে।

হাঁটু গেড়ে বসে মৃত হরিণটার পাশে বসে কাঁদছে।

মেহরাব মাথা চুলকাল। জীবনে অনেক কিছু দেখেছে। কিন্তু একটা হরিণের জন্য কেউ এভাবে কাঁদতে পারে এটা তার ধারণার বাইরে।

অবশেষে হরিণটাকে একটা মোটা কাপড়ে মুড়ে থলেতে ভরল সে। ঘোড়ার পেছনে বেঁধে দিল নিয়ে যাবে বলে। সাহারা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদল সারাপথ।

"ওর তো একটা পরিবারও থাকতে পারে। ওর বাচ্চাও থাকতে পারে। আপনার কি একটুও খারাপ লাগছে না?"

মেহরাব আকাশের দিকে তাকাল। মনে মনে নলে

“আল্লাহ, এ কোন জ্বালায় পড়লাম আমি!

একটা হরিণের জন্য কেউ এতক্ষণ ধরে কাঁদে নাকি?”

সাহাবাদ মহলের কাছাকাছি পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় ভোর হয়ে এসেছে। আকাশে নীলচে আলো ছড়িয়ে পড়ছে। দূরে ফজরের আজানের প্রস্তুতি চলছে। সাহারা দ্রুত নেমে পড়ল ঘোড়া থেকে। “আমি গেলাম”

বলে ছুট লাগাতেই ধপাস করে বারি খেল শক্তপোক্ত কোনো পুরুষালী বুকের সাথে। চেঁচিয়ে উঠলো সামান্য

“মা গোওওও”

মেহরাব চকিতে চাইল তার দিকে। পুরুষটি সাহারা কে ধরে ফেলেছে পড়ে যাওয়ার আগেই। হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে আসে মেহরাব এর।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে 17-2 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন