সন্ধ্যার পর থেকেই আমিরাবাদ রাজপ্রাসাদ সেজে ওঠে নক্ষত্রের মেলা হয়ে। সারি সারি আলো দূর থেকে খৈ এর মত ফুটে থাকে। মেহরাব নিজের কক্ষের বারান্দায় দাঁড়িয়ে দূরের মরুভূমির দিকে তাকিয়ে ছিল। তার মন কোথাও স্থির হচ্ছে না। নাসিরাবাদের সবকিছু বারবার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। তখনই নিচের প্রাঙ্গণে ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দ ভেসে এলো। মেহরাব নিচে তাকাল। পরমুহূর্তেই চোখ সরু হয়ে গেল। ফাইয়াজ! কালো ঘোড়ার পিঠে বসে আছে লোকটা। আগের মতোই মুখের অর্ধেক কাপড়ে ঢাকা। চোখ দুটোতে অদ্ভুত ব্যঙ্গাত্মক হাসি। প্রাসাদের মূল ফটক পার হওয়ার সময় আচমকা ফাইয়াজ মাথা তুলে তাকালো।
সরাসরি মেহরাবের দিকে। দুই আঙুল কপালে ঠুকে অদ্ভুত ভঙ্গিতে সালাম দিল। যেন কোনো পুরোনো পরিচিতকে ঠাট্টা করছে। মেহরাবের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
"বেয়াদব..."
নিজের অজান্তেই কথাটা বেরিয়ে এলো। আমিরাবাদের রাজপ্রাসাদে দাঁড়িয়ে যুবরাজকেই ব্যঙ্গ করছে! লোকটার সাহস দেখে বিস্মিত না হয়ে উপায় নেই। নিচে দাঁড়িয়ে ফাইয়াজ আবারও মাথা ঝুঁকিয়ে হাসল। তারপর ঘোড়া এগিয়ে নিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল। মেহরাবের ভ্রু কুঁচকে গেল। লোকটাকে সে কখনোই পছন্দ করে না। প্রথম দেখাতেই অদ্ভুত লেগেছিল। আর আজ নাসিরাবাদের ঘটনার পর সন্দেহটা আরও বেড়েছে। কেন সম্রাট বারবার এই লোকটাকে ডাকে? কেন গোপন সভাগুলোতে এর উপস্থিতি থাকে? আর সবচেয়ে বড় কথা একজন ডাকাত সর্দারের সঙ্গে তার পিতা এত ঘনিষ্ঠ কেন?
এ যে ডাকাত তা তার আংটি দেখেই বুঝে ফেলেছিল মেহরাব। বেশ সময় পর প্রাসাদের পশ্চিম পাশের গোপন অঙ্গন থেকে বেরিয়ে এলো ফাইয়াজ। সাথে আমিরাবাদের কয়েকজন বিশ্বস্ত সৈনিক। আর তাদের মাঝখানে সম্রাট নিজে।
দীর্ঘ আলোচনার পর সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন সবাই।
মেহরাব দূর থেকে সবকিছু দেখছিল। ফাইয়াজ বিদায়ের আগে সম্রাটের সঙ্গে কিছুক্ষণ নিচু স্বরে কথা বলল। তারপর কালো অশ্বের পিঠে উঠে বসল। মুহূর্তেই তার লোকেরাও প্রস্তুত হয়ে গেল।
অল্প সময়ের মধ্যেই দলটা রাজপ্রাসাদ ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল। গন্তব্য কাটাগিরির জঙ্গল।
মেহরাবের চোখে তখন সন্দেহের আগুন।
"শালা! আজ তোকে ছাড়ছি না।"
পাশ থেকেই ভেসে এলো আরেকটা কণ্ঠ।
"আমাকেও ডাকতে পারতি।"
মেহরাব ঘুরে তাকাল। আলীরাজ দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার প্রত্যেকটা অভিযান এর সঙ্গী। মুখে কুটিল হাসি।
"নানার ব্যাটা তুই এখানে কি করছিস?"
"আবে বোনের ছেলে, তোর এমন শক্তিশালী মামা থাকতে ওই ব্যাটা রঘু ডাকাত কিছুতেই পালাতে পারবে না।"
বলেই নিজের বাহু ফুলিয়ে চাপড়ালো। মেহরাব কপাল কুঁচকে বলে
"বাজে কথা বাদ দাও।"
"আচ্ছা তাহলে কোথায় যাচ্ছি?"
"ফাইয়াজকে অনুসরণ করতে।"
আলীরাজের চোখ চকচক করে উঠল।
"আহা! এটাই তো চাই!"
মেহরাব দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
"তুমি আসছো কেন?"
"পরে তুই মরে টরে গেলে ভাগ্নে বউ কে কি জবাব দেব? এমন কচি একটা মামাশ্বশুর থাকতেও তার সোয়ামী অক্কা পেয়েছে? না না মামা, ও….
"বুঝেছি, বুঝেছি। এবার চুপ যা বাপের শালা!”
"হ্যাঁ। বিরক্তিতে মরেও যেতে পারিস, কারণ তোর সাথে কথা বলার কেউ থাকবে না। এমন নিরস ভাবে….”
“বুঝেছি তো। এখন চুপ কর”
মেহরাব কপালে হাত চাপা দিল। এই মানুষটার সঙ্গে যুক্তি করে লাভ নেই। রাত আরও গভীর হলো। দুটি কালো অশ্ব নিঃশব্দে বেরিয়ে এলো আমিরাবাদ থেকে। একটায় মেহরাব। অন্যটায় আলীরাজ। দুজনেই কালো পোশাকে, মুখ ঢাকা।
দূরত্ব বজায় রেখে অনুসরণ করছে ফাইয়াজদের দলকে। সামনে ধুলো উড়িয়ে এগিয়ে যাচ্ছে ডাকাত সর্দার। সে জানেও না আজ তাকে অনুসরণ করছে দুজন শিকারি। মরুভূমি পেরিয়ে পথ ঢুকে গেল কাটাগিরির অন্ধকার জঙ্গলে।
গাছগুলো এত ঘন যে চাঁদের আলোও মাটিতে পৌঁছাতে পারছে না। বাতাসে ভেসে আসছে স্যাঁতসেঁতে গন্ধ পেঁচার ডাক। ফাইয়াজের দল জঙ্গলের গভীরে ঢুকতে লাগল। মেহরাবও লাগাম আলগা করল। তার চোখ তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছে। শিকারি যখন শিকারের পিছু নেয়, তখন সে আর কিছু দেখে না দুনিয়ার। শুধু লক্ষ্য স্থির তার শিকারে। আজ তার লক্ষ্য ফাইয়াজ আবরার।
জঙ্গলের পথ যত গভীর হতে লাগল, মেহরাবের ভ্রুর ভাঁজও তত গাঢ় হতে লাগল। ঘোড়ার গতি কমিয়ে চারপাশে নজর বুলালো সে। এ পথ সে চেনে। খুব ভালো করেই চেনে। কাটাগিরির জঙ্গলের এই অংশকে সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, অভিজ্ঞ শিকারীরাও এড়িয়ে চলে। এখানে অদ্ভুত সব নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা আছে। পুরনো বহুত কাহিনি আছে বণিক থেকে শিকারীর রহস্য জনক ভাবে হারিয়ে যাওয়ার। তবে এমন কিছু গুজব ও আছে, এ নিয়ে মেহরাব কখনো মাথা ঘামায়নি।
ফাইয়াজ একবারও থামছে না। সে জানে কোথায় যাচ্ছে। এই অন্ধকার পথ তার বহুবার চেনা।
মেহরাব নিচু স্বরে বলল,
"লোকটা পাগল নাকি?"
পাশ থেকে আলীরাজ ফিসফিস করল,
"পাগল হলে ভালোই ছিল। আমার মনে হচ্ছে লোকটা আমাদের চেয়েও এই জঙ্গল ভালো করে চেনে। যাওয়ার আগে ভেবে নে ভাগ্নে।"
মেহরাব কোনো উত্তর দিল না। চোখ স্থির সামনে।
জঙ্গলের বাতাস ঠান্ডা হয়ে এসেছে। গাছের ডালগুলো বাতাসে দুলছে না অথচ কোথাও থেকে শোঁ শোঁ শব্দ ভেসে আসছে। ফাইয়াজের দল আরও কিছুদূর এগিয়ে যেতেই আচমকা তাদের গতি থেমে গেল। মেহরাব সঙ্গে সঙ্গে ঘোড়া থামিয়ে একটা বিশাল শালগাছের আড়ালে সরে গেল। আলীরাজও একই কাজ করল।
দুজনেই সামনে তাকালো। বিস্ময়ে চোখ সরু হয়ে এলো। পথের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে একজন নারী একাই। চারপাশে কেউ নেই। দেখে মনে হচ্ছে পুরো জঙ্গলটাই তার অধীন। চাঁদের আলো গাছের ফাঁক দিয়ে এসে পড়েছে তার ওপর।
যুদ্ধবেশ পরা। কালো চামড়ার বর্ম শরীরের সাথে আঁটসাঁটভাবে লেগে আছে। কোমরে দুটি ছোট তলোয়ার। পিঠে ধনুক কাঁধে তূণীর। লম্বা চুলগুলো বেণি করে বাঁধা। মুখের অর্ধেক কালো কাপড়ে ঢাকা। তাতেও তার সৌন্দর্য লুকানো যায়নি। তীক্ষ্ণ চোখ দুটো যেন অন্ধকারে জ্বলছে।
তার দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গিতে মারাত্মক আত্মবিশ্বাস। আলীরাজ ফিসফিস করল,
"আল্লাহ...!"
মেহরাব ভ্রু কুঁচকাল।
"কি?"
"আমি বুঝতে পারছি কেন ডাকাতরা এই পথে আসে।"
"মানে?"
"এমন সুন্দরী যদি রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকে, আমি নিজেও পথ ভুলে এখানে চলে আসতাম।"
মেহরাব বিরক্ত হয়ে তার পায়ের ওপর চাপা লাথি মারল। আলীরাজ মুখ চেপে ধরল।
"আহহ! আস্তে!"
সামনে তখন ফাইয়াজ ঘোড়া থেকে নেমে পড়েছে। নারীটিও ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এলো। অদ্ভুত ব্যাপার হলো দুজনের মাঝখানে কোনো শত্রুতার আভাস নেই। যেন বহুদিনের পরিচিত। ফাইয়াজ মাথা সামান্য কাত করল। নারীটিও একই ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইল। মেহরাবের সন্দেহ আরও বাড়ল। লোকটা এখানে কার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে? আর এই নারী কে? জঙ্গলের নিষিদ্ধ অংশে মাঝরাতে একা দাঁড়িয়ে আছে কেন? নারীটি কানে কানে কিছু বলল।
দূরত্বের কারণে শব্দ পরিষ্কার শোনা গেল না।
কিন্তু ফাইয়াজের মুখে তখন বিরল এক হাসি ফুটে উঠেছে।
পরক্ষণেই নারীটি ঘুরে দাঁড়াল। তার বর্মের ধাতব অংশে চাঁদের আলো ঝিলিক দিয়ে উঠল। জঙ্গলের আরও গভীর অন্ধকারের দিকে হাঁটতে শুরু করল। ফাইয়াজ কোনো দ্বিধা না করে তার পিছু নিল। মেহরাবের বুকের ভেতর সতর্ক ঘণ্টা বেজে উঠছে। এ কোনো ফাঁদ নয়তো?
তবুও সতর্ক ভঙ্গিতে হাঁটা শুরু করল দুজন। ফাইয়াজ কে দেখা যাচ্ছে না। আশ্চর্য ব্যাপার হলো নারীটি কেও হারিয়ে ফেলেছে তারা।
আচমকা শুঁউউ! করে একটি দড়ি ছুটে এলো অন্ধকার থেকে। পরমুহূর্তেই আলীরাজের কোমরে জড়িয়ে পড়ল।
"এই! এ আবার কি…."
কথা শেষ হওয়ার আগেই সে ঘোড়া থেকে উল্টে পড়ল। আরেকটি জাল ছুটে এলো সরাসরি মেহরাবের দিকে। কিন্তু শিকারীর প্রতিক্রিয়া বিদ্যুতের মতো দ্রুত। তলোয়ার ঝলসে উঠল।
ছিঁড়ে গেল জাল। ঝনঝন শব্দ তুলে তলোয়ার বের করতেই চারপাশ থেকে কয়েকজন মুখোশধারী বেরিয়ে এলো। নারীটিও মুহূর্তে তলোয়ার বের করল। তার চোখে তখন যুদ্ধের আগুন।
"তোমরা কারা?"
কঠিন কণ্ঠে প্রশ্ন করল সে।
"কেন আমাদের অনুসরণ করছো?"
মেহরাব বিরক্ত হয়ে বলল
"আমরাও একই প্রশ্ন করতে পারি।"
নারীটি উত্তর না দিয়ে সরাসরি ঝাঁপিয়ে পড়ল।
টাং! করে তলোয়ারে তলোয়ারে আগুন ছুটল।
মেহরাব এবার সত্যিই অবাক হলো। মেয়েটির দক্ষতা অসাধারণ। এ একজন সাধারণ যোদ্ধা নয়। দুই-তিন চাল বিনিময়ের পর নারীটির দৃষ্টি আচমকা আটকে গেল মেহরাবের তলোয়ারে।
ফলকের গোড়ায় খোদাই করা রয়েছে আমিরাবাদ রাজবংশের রাজচিহ্ন। তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। পরের বার আর আঘাত করল না। দ্রুত এক পা পিছিয়ে ধপ করে হাটু মুড়ে বসে মাথা নত করল।
"ক্ষমা করবেন, যুবরাজ।"
মেহরাব ভ্রু কুঁচকাল।
"তুমি আমাকে চেনো?"
"আপনার তলোয়ারের রাজ চিহ্ন দেখে চিনলাম।"
নারীটি সম্মানসূচক ভঙ্গিতে বলল,
"আমি ভেবেছিলাম আপনারা ছদ্মবেশী ডাকাত কিংবা গুপ্তচর।"
আলীরাজ তখনও মাটিতে বসে কোমর চেপে ধরে আছে।
"আহা! আগে জিজ্ঞেস করতে পারতে। আমার এই কোমরটা কি দোষ করেছিল?"
নারীটি বিব্রত হলো। মেহরাব তলোয়ার খাপে ঢুকিয়ে বলল,
"আমরা একদল মুখোশধারীকে অনুসরণ করছিলাম।"
"কোথায় দেখেছেন?"
"কিছুক্ষণ আগেও সামনে ছিল।"
নারীটির চোখ গম্ভীর হয়ে উঠল।
"কই, আমি তো কাউকে দেখিনি।"
আলীরাজ বলতে চাচ্ছিলো তুমিই তো কথা বলছিলে। কিন্তু মেহরাব টর ইশারায় থেমে গেল।
তিনজন মিলে অনুসন্ধান শুরু করল। অনেকক্ষণ ধরে জঙ্গলের বিভিন্ন পথ খুঁজল। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে ফাইয়াজ আর তার দলের কোনো চিহ্নই পাওয়া গেল না। যেন মাটির নিচে ঢুকে গেছে। অবশেষে মেহরাব বিরক্ত হয়ে বলল,
"এভাবে আর সময় নষ্ট করে লাভ নেই।"
নারীটিও মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।
"আজকের মতো ফিরে যাওয়াই ভালো।"
আলীরাজ বলল,
"আলহামদুলিল্লাহ। অবশেষে কেউ একটা বুদ্ধির কথা বলল।"
ফেরার সময় মেহরাব বলল
“আচ্ছা আপনার পরিচয় ই তো জানা হলো না”
“জি আমি সাহাবাদ এর শাহজাদী রত্নপ্রভা এবং নায়েব নেওয়াজে আবিদ এর কন্যা। ‘শাখা নেওয়াজ’।”
দুজনের চোখ ই বিষ্ময়ে বড় হয়ে গেল। শাখার দক্ষতা সম্পর্কে তারা ভালো করেই জানে। কিন্তু আর তার প্রমাণ সচক্ষে পেল। মেহরাব সৌজন্যতার সাথে বলল
“আচ্ছা আপনি এর আগেও আমাদের মহলে গেছিলেন। দুঃখীত আমি আপনাকে চিনতে পারিনি।”
শাখা ও বলল
“আমিও অনেক বেশি দুঃখীত”
চলে গেল যে যার গন্তব্যে। মেহরাব আর আলীরাজ আমিরাবাদের দিকে। আর শাখা সাহাবাদ এর দিকে। জঙ্গলের ভেতর দিয়ে একা ঘোড়া হাঁকিয়ে ফিরছিল শাখা। কিন্তু কিছুদূর এগোতেই ঘোড়া থামিয়ে দিল। সামনে দাঁড়িয়ে আছে আরেকটি কালো অশ্ব। অশ্বের পিঠে বসা মানুষটিকে চিনতে তার এক মুহূর্তও লাগল না।
ফাইয়াজ। মুখে আগের মতোই কাপড় বাঁধা।
"আরে বণিক সাহেব? আপনি না ফিরে গেলেন?”
ফাইয়াজ হেসে বলল,
"ভাবলাম আপনি কোথায় যাচ্ছেন এগিয়ে দি"
"আমি তো সাধারণ পথচারী। আমার কারও সাহায্য লাগে নাহ। আপনাকে ধন্যবাদ"
"না তা কি করে হয়? চলুন না। এক সাথে কিছুক্ষণ সময় ও কাটানো যাবে"
শাখা কিছু বলতে গিয়ে মুখ কুঁচকাল। পায়ের ব্যথাটায় আবার খোঁচা লেগেছে। ফাইয়াজ সঙ্গে সঙ্গে খেয়াল করে বলল
"আপনার পায়ে কি হয়েছে?"
"না! কিছু না।"
"কিছু না মানে? দেখান আমায়।"
ঘোড়া থেকে নেমে এল সে। শাখা বাধা দেওয়ার আগেই হাঁটু গেড়ে বসে ক্ষতটা দেখল। পাথরে লেগে চামড়া ছড়ে গেছে। ফাইয়াজ নিজের পাগড়ির এক অংশ ছিঁড়ে নিল। সতর্ক হাতে ক্ষতের ওপর বেঁধে দিল। শাখা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। বাধা হলে ফাইয়াজ উঠে দাঁড়াল।
"নিন। এবার হাঁটতে সুবিধা হবে।"
শাখা মুখ ফিরিয়ে বলল,
"ইশশশ। আপনি আমার পায়ে হাত দিলেন।
“ তাতে কি আসে যায়? নারী হলো দেবীর ন্যায় বুঝলেন? তাদের পা ছুলে কিছু হয় না।”
দুজনেই চুপচাপ পাশাপাশি ঘোড়া হাঁকাতে হাঁকাতে এগোতে লাগল। কেউ কোনো কথা বলছে না। শাখার অস্বস্তি বুঝে ফাইয়াজ বলল
“ এমন নিরব ভ্রমণ সঙ্গীই বুঝি আমি চেয়েছিলাম?”
শাখা ফিক করে হেসে ফেলল। ও হাসলে চোখ জোড়াও কেমন হাসে। ফাইয়াজ মুগ্ধ হয়ে দেখলো।
“আচ্ছা আপনার বাড়ি সাহাবাদ এর কোন দিকে অবস্থিত?”
শাখার হাসি মিলিয়ে গেল ফাইয়াজ এর কথায়। সে পরিচয় দিতে চায় না যে সে শাহজাদী সাহাব এর।
“ওই, নদীর দিকে”
“আচ্ছা”
সাহাবাদের মূল ফটকের আলো দেখা গেল। ফাইয়াজ থামল। এর বেশি সে যেতে পারবে না। ইচ্ছে করছিলো গোটা পথ শাখার সাথে যেতে। ইশশশ পথটা যদি শেষ না হতো।
"আপনার পথ এসে গেছে।"
শাখা লাগাম টেনে ধরল। কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল,
"ধন্যবাদ।"
ফাইয়াজ মৃদু হেসে মাথা ঝুঁকাল।
"আবার কি দেখা হবে?”
শাখার ঠোঁটের কোণেও ক্ষীণ হাসি ফুটল।
"পৃথিবী টা গোল। হয়তো হবে।"
সে ফটকের দিকে এগিয়ে গেল। ফাইয়াজ দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। যতক্ষণ না মেয়েটির অবয়ব অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। তারপর নিজের ঘোড়া ঘুরিয়ে রাতের জঙ্গলে হারিয়ে গেল সেও। শাখা তখন জঙ্গলের স্যাঁতসেঁতে বাতাসের গন্ধ নিয়ে ফিরছে। পায়ের ব্যথাটা আগের চেয়ে কমেছে বটে, তবে ফাইয়াজের বাঁধা কাপড়টা এখনও গোড়ালিতে জড়ানো। দূর থেকেই সাহাবাদ মহলের বিশাল ফটক চোখে পড়ল।
প্রহরীরা আগুনের মশাল হাতে পাহারা দিচ্ছে।
ফটক পেরোতে গিয়েই শাখার চোখ আটকে গেল।
মহলের বাইরের প্রাচীর ঘেঁষে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। দৃষ্টি নিবদ্ধ উপরের দিকে। শাখা ভ্রু কুঁচকাল। এত রাতে আবার কে? আরও কাছে যেতেই চিনতে পারল। মুয়াজ ইবনে হামজা। মিশরের ভবিষ্যৎ সুলতান। শাখা কিছুক্ষণ অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। লোকটা নড়ছেও না। এমনকি আশপাশের কোনো কিছুর প্রতিও খেয়াল নেই।
তার দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে মহলের পূর্ব পাশের একটি জানালার দিকে। জানালাটি আবার জান্নাতের কক্ষের।
শাখার ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল। আস্তে করে এগিয়ে গিয়ে গলা খাঁকারি দিল।
"উহুমম..."
মুহূর্তেই চমকে উঠল মুয়াজ। যেন হঠাৎ ঘোর ভেঙেছে। দ্রুত মাথা ঘুরিয়ে তাকাল। শাখাকে দেখে সামান্য অপ্রস্তুত হয়ে গেল।
"আ... আপনি?"
শাখা দুই হাত বুকে ভাঁজ করল।
"জি, আমি।"
তারপর আকাশের দিকে তাকানোর ভান করে বলল,
"খুব সুন্দর দৃশ্য দেখছিলেন নাকি?"
মুয়াজ বিভ্রান্ত হয়ে বলল,
"আসলে…..কি?"
"এই যে, আপার জানালার দিকে এমন এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন..."
কথা শেষ হওয়ার আগেই মুয়াজের কান পর্যন্ত লাল হয়ে গেল।
"না! না, ব্যাপারটা তা নয়।"
শাখা এবার হাসি চেপে রাখতে পারল না।
"তাহলে?"
মুয়াজ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীর স্বরে বলল
"উনি কোরআন তিলাওয়াত করছেন। আমি সেটাই শুনছিলাম।"
জবাবটা এত সরল ছিল যে কয়েক মুহূর্ত শাখা কোনো কথা খুঁজে পেল না। মুয়াজ আবার জানালার দিকে তাকাল। শাখাও মনোযোগ দিয়ে শুনল। খুব ক্ষীণ স্বরে তিলাওয়াত ভেসে আসছে।
শান্ত, সুমধুর, হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়ার মতো।
মুয়াজ নিচু স্বরে বলল,
"তার কণ্ঠ খুব সুন্দর।"
শাখা এবার ভালো করে লোকটার দিকে তাকাল।
তার চোখে কোনো চপলতা নেই।বকোনো অশোভন আগ্রহ নেই। সে সত্যিই শুধু কোরআনের তিলাওয়াত শুনছে। শাখা মুচকি হেসে বলল,
"আপনি জানেন তো, সাধারণত হবু বরেরা জানালার নিচে দাঁড়ালে, অন্য কোনো কারণে দাঁড়ায়। সেজন্যই আরকি আমি…."
মুয়াজ বিব্রত হাসল।
"আমি সেসব খুব একটা পারি না।"
"সেটা বুঝতে পারছি।"
"তাছাড়া..."
সে কিছুক্ষণ থেমে বলল,
"আল্লাহর কালাম শুনতে ভালো লাগে।"
শাখা মাথা কাত করল।
"আর আমার আপার কণ্ঠ?"
মুয়াজ এবার সত্যিই লজ্জা পেল। মাথা নিচু করে ফেলল।
"সেটাও।"
কথাটা বলেই হালকা কাশি দিল। শাখা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। খিলখিল করে হেসে উঠল। জান্নাতের কক্ষ থেকে এখনও তিলাওয়াত ভেসে আসছে। রাতের আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে দুজনেই কিছুক্ষণ নীরবে শুনল।
তারপর শাখা ধীরে ধীরে বলল,
"আচ্ছা, আমি ভেতরে যাই।"
মুয়াজ মাথা নেড়ে বলল,
"জি।"
কয়েক কদম এগিয়ে গিয়ে আবার থামল শাখা।
পিছনে না তাকিয়েই বলল,
"আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। আমার আপা পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো মানুষদের একজন।"
মুয়াজের মুখে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।
"আলহামদুলিল্লাহ।"
শাখা আর কিছু বলল না। ভেতরে ঢুকে গেল। মুয়াজের তখন খেয়াল হলো। রাত প্রায় তৃতীয় প্রহরে। এই সময় এই মেয়ে কোথা থেকে ফিরল? সেসব চিন্তা ঝেড়ে ফেলে শাল চাদরে লুকানো হাত দুটো বের করলো। রক্তে মাখামাখি। চারিদিকে দেখে নিয়ে ফোয়ারার কাছে গেল ধুতে।