ভোরের আজানের পরপর মিশরের সুলতান হামজা আল নাসির এবং তার পুত্র মুয়াজের যাত্রার প্রস্তুতি চলছে। অশ্বগুলো প্রস্তুত। রথে মালপত্র তোলা হয়েছে। সৈন্যরাও সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে। মহলের মূল প্রাঙ্গণে উপস্থিত হয়েছেন বাইজিদ শাহ, মেহেরুন্নেসা, সুনেহেরা এবং শাহ পরিবারের অন্য সদস্যরা। বিদায়ের আগে সুলতান হামজা বাইজিদ শাহর দুই হাত ধরে বললেন,
"ইনশাআল্লাহ, আগামী শুক্রবার আবার দেখা হবে। তখন আমরা আত্মীয় হিসেবে মিলিত হব।"
বাইজিদ শাহ আবেগ নিয়ে মাথা নেড়ে বললেন,
"আপনাদের মতো মানুষের সাথে সম্পর্ক স্থাপন আমাদের জন্য সৌভাগ্যের বিষয়।"
মুয়াজও সম্মানের সাথে সালাম জানাল সকলকে।
তার চোখ একবার অজান্তেই চলে গেল মহলের উপরের বারান্দার দিকে। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে জান্নাত। মাথা নিচু। ঘোমটায় ঢাকা। মুয়াজের ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। তারপর আর দেরি না করে অশ্বের পিঠে উঠে বসল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ধুলোর মেঘ তুলে মিশরের রাজকীয় বহর দূরে মিলিয়ে গেল।
আগামী শুক্রবার, আর মাত্র সাত দিন। তারপর জান্নাতের নিকাহ। সকাল গড়িয়ে বেলা বাড়ছে।
সুনেহেরা নারী মহলের বাগানে বসে ছিল। এমন সময় তার চোখ পড়ল শাখার দিকে। শাখা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে। সঙ্গে সঙ্গে ভ্রু কুঁচকে গেল তার।
"এই শাখা!"
শাখা থমকে দাঁড়াল।
"জি মণি মা?"
"তোর পায়ে কি হয়েছে?"
শাখা নিচে তাকাল। পায়ের ক্ষতটা এখনও পুরোপুরি শুকায়নি। সে দ্রুত বলল,
"ও কিছু না। জঙ্গলে থেকে কেটে গেছে।"
কথাটা বলেই বুঝল বিপদ করেছে। সুনেহেরা ভ্রু তুললেন।
"জঙ্গলে?"
মেহেরুন্নেসাও অবাক হয়ে তাকালেন।
"তুই জঙ্গলে গেলি কখন? ঘা তো এক্কেবারে তরতাজা। আজ কালের মনে হচ্ছে"
শাখার মুখ শুকিয়ে গেল।
"মানে... আমি..."
"কাল তো সারাদিন মহলেই ছিলি।"
"হ্যাঁ... মানে..."
"তাহলে জঙ্গলে গেলে কখন?"
শাখা আমতা আমতা করতে লাগল। মণি মার জেরা মানে ভয়ংকর ব্যাপার।
"আসলে আমি..."
ঠিক তখনই ধুপধাপ করে দুইজন প্রহরী দৌড়ে এসে হাজির হলো। তাদের মুখে আতঙ্ক স্পষ্ট। ঘাম ঝরছে কপাল বেয়ে। একজন হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
"জমিদার সাহেবকে খবর দিন!"
বাইজিদ শাহ কাছেই ছিলেন, এগিয়ে এলেন।
"কি হয়েছে?"
প্রহরী ঢোক গিলল। তারপর কাঁপা গলায় বলল,
"মহলের পেছনের জঙ্গলের ধারে... দুজন বন্দিকে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে।"
চারপাশ মুহূর্তে নিস্তব্ধ হয়ে গেল। বাইজিদের কণ্ঠ কঠিন হয়ে উঠল।
"কিভাবে মারা গেছে?"
প্রহরীর মুখ ফ্যাকাসে।
"তাদের গলা কাটা হয়েছে।"
সুনেহেরা চমকে উঠলেন। মেহেরুন্নেসা মুখে হাত চাপা দিলেন। শাখার বুকের ভেতর ধক করে উঠল। বাইজিদ শাহ কয়েক পা এগিয়ে এলেন।
"কারা তারা?"
"গত মাসে ধরা পড়া দুই বন্দি, হুজুর। তাদের আমিরাবাদ সীমানা থেকে ধরা হয়েছিল"
আরেকজন প্রহরী কাঁপা কণ্ঠে বলল,
"রাতের মধ্যে কেউ কারাগার থেকে তাদের বের করেছে। তারপর মহলের পেছনের জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে হত্যা করেছে।"
বাইজিদের মুখ অন্ধকার হয়ে উঠল।
"সব ফটক বন্ধ করে দাও।"
কঠিন স্বরে আদেশ দিলেন তিনি।
"কেউ মহল থেকে বের হবে না। কেউ ঢুকবেও না।"
"জি হুজুর!"
প্রহরীরা ছুটে গেল। শাখার শরীর ঠান্ডা হয়ে আসছে। তার মনে হঠাৎ ভেসে উঠেছে গত রাতের দৃশ্যগুলো। আরও ভয়ংকর কিছু এগিয়ে আসছে সাহাবাদের দিকে। এগুলো কোথাও আমিরাবাদ এর লোকেদের কাজ নয় তো? তারা সম্রাট হওয়া সত্বেও বারবার যা ক্ষতি করার চেষ্টা করছে। শাখা সিদ্ধান্তঃ নিলে সে যাবে কারাগারে বন্দি দের সাঘে কথা বলতে। তারা নিশ্চয়ই কিছু না কিছু দেখে থাকবে।
****
কারাগারের ভেতরের বাতাসটা কেমন ভারী। স্যাঁতসেঁতে পাথরের দেয়াল, লোহার গরাদ আর পুরোনো রক্তের গন্ধ মিশে এক অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি করেছে। মহলে বিয়ের প্রস্তুতি নিয়ে উৎসবমুখর অবস্থা। শাখার মাথায় অন্য চিন্তা। বিবাহের আলোচনায় মন ই দিতে পারছে না।
দুজন বন্দির গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে।
এটা সাধারণ ঘটনা নয়। আর সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো খুন হয়েছে মহলের ঠিক পেছনে।
শাখা ধীর পায়ে এগিয়ে গেল বন্দিশালার ভেতরে। সঙ্গে দুইজন প্রহরী। গরাদের ওপাশে কয়েকজন বন্দি বসে ছিল।
শাখা থামল। তার কণ্ঠ দৃঢ়।
"আজ ভোরে যা ঘটেছে, তার বিষয়ে তোমাদের কেউ কিছু দেখেছো?"
প্রথমে কেউ মুখ খুলল না। শাখা আবার বলল,
"সত্য বললে শাস্তি কমবে। মিথ্যা বললে উল্টো হবে।"
একজন বৃদ্ধ বন্দি কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,
"শাহজাদী... আমরা সরাসরি কিছু দেখি নাই।"
"তাহলে?"
লোকটা গিলল।
"রাতের শেষ প্রহরের দিকে ঘোড়ার শব্দ শুনছিলাম।"
শাখার চোখ সরু হয়ে এলো।
“ঘোড়া? এই কারাগারের ভিতর ঘোড়া কি করে ঢোকাবে কেউ? কি বলে না বলে এরা। বাকিদের ডাকো। আশ্চর্য বেলা মাথায় চড়ে গেছে এরা এখনও ঘুমাচ্ছে?”
শাখার মাথায় এলো বিষয়টা। আসলেও তো অদ্ভুত ব্যাপার। এত বেলা ওবদি বন্দি রা ঘুমাচ্ছে কি করে? চারিদিকে চোখ বুলিয়ে দেখলো পাহারাদার গুলোও ঝিমোচ্ছে। বুদ্ধিমান মস্তিষ্ক চট করে ধরে ফেলল বিষয়টা। এজন্যই কেউ কিছু জানে না। এদের কে নিদ্রাবিষ খাওয়ানো হয়েছে।
আরেকজন বন্দি বলে উঠল,
"আমি একজন মানুষরে দেখছিলাম।"
শাখা সঙ্গে সঙ্গে তার দিকে ফিরল।
"কেমন মানুষ?"
লোকটা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
"অন্ধকার ছিল। মুখ দেখা যায় নাই। কিন্তু তার গায়ে কালো আলখাল্লা আছিল।"
"পুরুষ না নারী?"
"সেটাও বুঝি নাই।"
শাখার বিরক্ত লাগল। এমন তথ্য দিয়ে কোনো লাভ নেই। ঠিক তখন কোণের দিকে বসে থাকা এক মাঝবয়সী কয়েদি ধীরে ধীরে মাথা তুলল।
তার এক চোখে পুরোনো ক্ষতচিহ্ন। সে ফিসফিস করে বলল,
"আমি একটা জিনিস দেখছি।"
সবাই তার দিকে তাকাল। লোকটা বলল,
"খুন হওয়ার একটু আগে দুই বন্দিরে কেউ ডাইকা বাইরে নেয়।"
"কে?"
"দেখি নাই।"
"তাহলে বুঝলে কিভাবে?"
"কারণ ওরা নিজেরা বের হয় নাই। ভয় পাইছিল। কিন্তু পরে যেন কারও কথা শুনে হাঁটতে হাঁটতে গেল।"
শাখার বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল।
"কারও কথা শুনে?"
"জি।"
"কী কথা?"
লোকটা মাথা নাড়ল।
"আমার ক্যান জানি মনে হইতাছিল লোক দুইডা কোনো পরিচিত মাইনসের ডাকেই গেছে”
শাখা গরাদ ধরে দাঁড়িয়ে রইল। কথা টা মন্দ বলে নি মহিলাটা। জোর করে নিলে চ্যাচাতো, কেউ না কেউ দেখতো। আর এত নিরাপত্তা পেরিয়ে কাওকে কারাগার থেকে জোর করে বের করে নেওয়া তো অসম্ভব প্রায়। কিন্তু একটা ব্যাপার পরিষ্কার। খুনি মহলের পথঘাট ভালো করেই চেনে। আর সে এতটাই আত্মবিশ্বাসী যে দুই বন্দিকে ডেকে বাইরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করেছে।
শাখা ফিরে যাওয়ার জন্য ঘুরতেই পিছন থেকে বৃদ্ধ বন্দিটা বলল,
"শাহজাদী..."
শাখা থামল।
"কি?"
বৃদ্ধ লোকটার মুখ অস্বাভাবিক ফ্যাকাসে।
"আরেকটা কথা ছিল।"
"বলো।"
লোকটা কাঁপা কণ্ঠে বলল,
"খুনের কিছুক্ষণ আগে... উত্তরের জঙ্গল দিক থেকে বাঁশির শব্দ আসতেছিল।"
শাখার শরীর হঠাৎ ঠান্ডা হয়ে গেল। বাঁশি? সেদিন জান্নাত ও কি বাশির শব্দ শুনে ভয় পেল। আবারও সেই বাশি?
কারাগার ছেড়ে বেরিয়ে এলো শাখা। বিয়ের আয়োজন নিয়ে দাসীরা দৌড়াদৌড়ি করছে। উঠোনে রঙিন কাপড় টাঙানো হচ্ছে। সবকিছু স্বাভাবিক। শুধু তার মাথার ভেতর যেন ঝড় বইছে। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল ভোরের কথাটা। মহলের পেছনে জান্নাতের জানালার নিচে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে ছিল মুয়াজ।
সেই সময়ই তো খুন হয়েছে বন্দিরা। শাখা থমকে দাঁড়াল। পরক্ষণেই মাথা ঝাঁকাল।
"না।"
নিজেকেই বলল সে।
"অসম্ভব।"
যে মানুষটা চোখ তুলে ঠিকমতো কোনো মেয়ের দিকেও তাকায় না, যে কোরআনের তিলাওয়াত শুনতে রাতভর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে সে কেন এমন করবে?বকোনো প্রমাণও নেই। শুধু সন্দেহ? আর সন্দেহের উপর ভিত্তি করে কাউকে অভিযুক্ত করা যায় না। তবুও অস্বস্তিটা যাচ্ছে না। দূরে জান্নাতকে দেখা যাচ্ছে বারান্দায় দাঁড়িয়ে। তার হাতে একটা বই। আর মাত্র সাত দিন পরে তার বিয়ে।বশাখা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কিন্তু তার যোদ্ধার মন বলছে সাহাবাদে কিছু একটা ষড়যন্ত্র চলছে।
ঘাতক কাছের কেউ ই। তাদের চোখে আপন জনের কালো কাপড় বেঁধে ক্ষতি করে যাচ্ছে অনবরত। সিদ্ধান্ত নিলো ঘটনা টা ঘেঁটে দেখবে। বন্দি দুজনকে কবে কোথা থেকে এবং কোন অপরাধে বন্দি করা হয়েছিল সব টা আগে জানতে হবে।
***
আমিরাবাদের রাজপ্রাসাদের পশ্চিম দিকের রাজকক্ষে বসে ছিলেন সম্রাট। সামনে ছড়িয়ে রাখা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পত্র। তার মধ্যেই একটি নতুন পত্র এসে পৌঁছেছে সাহাবাদ থেকে। সোনালি সিলমোহর ভাঙতেই ঠোঁটের কোণে কুটিল হাসি ফুটে উঠল তার। পত্রে স্পষ্ট লেখা সাহাবাদের জ্যেষ্ঠ শাহজাদী জান্নাত বিনতে বাইজিদের বিবাহ। সাত দিনের মধ্যেই আয়োজন।
সম্রাট মখমলের গদিতে হেলান দিলেন।
"আল্লাহ্! কী চমৎকার সময় বেছে নিয়েছে তারা।"
পাশে দাঁড়ানো নায়েব সাবধানে জিজ্ঞেস করল,
"মহামান্য?"
সম্রাটের চোখে শয়তানি ঝিলিক।
"বিয়ের দিন পুরো রাজ্য উৎসবে ব্যস্ত থাকবে। প্রহরীদের মনোযোগ থাকবে অন্যদিকে। অতিথিদের আনাগোনা চলবে।"
তিনি টেবিলে আঙুল ঠুকলেন।
"আর ঠিক সেদিনই সাহাবাদের পতন ঘটবে।"
কক্ষে উপস্থিত কয়েকজন লোক একে অপরের দিকে তাকাল। সম্রাট নিচু স্বরে বললেন,
"যে দিন ওদের ঘরে শেহনাই বাজবে, সেদিনই ওদের রক্ত ঝরবে। হাতছাড়া হবে সাহাবাদ। যাযাবর হবে শাহ্ পরিবার “
কথাটা বলেই পত্রটা ভাঁজ করলেন। ঠিক তখনই বাইরে থেকে প্রহরীর কণ্ঠ ভেসে এলো।
"যুবরাজ মেহরাব ওয়াসেম উপস্থিত।"
সম্রাটের মুখের ভাব বদলে গেল। দ্রুত পত্রটা তুলে পাশে থাকা একটি কাঠের বাক্সে ঢুকিয়ে দিলেন।
ঢাকনা বন্ধ করে দিয়ে বাক্সটা ঠেলে দিলেন টেবিলের তলায়। পরমুহূর্তেই দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করল মেহরাব। স্বচ্ছ সাদা পোশাকে তাকে আজ বেশ গম্ভীর দেখাচ্ছে। প্রবেশ করেই সালাম দিল।
"আসসালামু আলাইকুম।"
"ওয়ালাইকুমুস সালাম।"
সম্রাট মুখে স্বাভাবিক ভাব আনার চেষ্টা করলেন।
"এসো পুত্র।"
মেহরাব সামনে এসে দাঁড়াল। কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত লাগছে তাকে। সম্রাট ভ্রু তুললেন।
"কিছু বলবে?"
মেহরাব কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বলল,
"জি।"
"বলো।"
"জাহিদার ব্যাপারে।"
সম্রাটের মুখ সামান্য গম্ভীর হলো। প্রতীক তার মৃত পুত্র। বছর কয়েকটা হতে চলল। মেহরাব ধীরে বলল,
"প্রতীক চলে গেছে অনেকদিন।"
সম্রাটের চোখ নিচু হয়ে এলো।
"হ্যাঁ।"
"জাহিদা এখনও এই মহলেই পড়ে আছে। আমার মনে হয় তাকে নতুন করে জীবন শুরু করার সুযোগ দেওয়া উচিত।"
সম্রাট কিছুক্ষণ ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর বললেন,
"তুমি বলতে চাও তার পুনর্বিবাহ হওয়া উচিত?"
"জি।"
মেহরাব শান্ত কণ্ঠে বলল,
"সে এখনও তরুণী। পুরো জীবনটা বিধবা হয়ে কাটানো তার জন্য ন্যায়সঙ্গত নয়।"
এক মুহূর্ত থেমে আবার বলল,
"প্রতীকও এটা চাইত না।"
কথাটা শুনে সম্রাটের চোখে ক্ষীণ আবেগের ছায়া ফুটে উঠল। প্রতীকের নাম এখনও তাকে নাড়া দেয়। কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর তিনি বললেন,
"তোমার কোনো পাত্র পছন্দ আছে?"
মেহরাব মাথা নাড়ল।
"না। তবে খোঁজ শুরু করা উচিত।"
সম্রাট মৃদু হাসলেন।
"অদ্ভুত।"
"কি?"
"নিজের বিয়ের কথা বললে পালিয়ে বেড়াও, আর অন্যের বিয়ের ব্যবস্থা করতে চলে এসেছ।"
মেহরাব বিরক্ত মুখে বলল,
"উফফফ…আবার শুরু করলেন”
“তোমার বয়সও কম হলো না, পুত্র।"
"আমি এসেছি জাহিদার বিষয়ে কথা বলতে।"
"আর আমি বলছি তোমার বিষয়ে।"
মেহরাব দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
"আমার বিয়ের সময় হলে আমি নিজেই বলব"
সম্রাট আসনে হেলান দিলেন।
“বিষয়টা মাথায় রাখবো। আরও কিছু বলতে চাও?”
মেহরাব না সূচক মাথা নেড়ে কক্ষ ত্যাগ করলো।
****
কাটাগিরির গভীর জঙ্গলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা পুরোনো কাঠের বাড়িটা গা ছমছমে নির্জন লাগছে। বাইরে ঝড় উঠেছে। আকাশ জুড়ে কালো মেঘের আনাগোনা। বিদ্যুৎ চমকে মাঝে মাঝে সাদা আলোয় ভেসে উঠছে বনভূমির বিশাল গাছগুলো। পরক্ষণেই আবার সব গিলে খাচ্ছে অন্ধকার। বারান্দার রেলিংয়ে এক হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে ফাইয়াজ আবরার। তার মতো মানুষের বুকেও যে এমন অস্থিরতা জমতে পারে, এ অবিশ্বাস্য তার নিজের কাছেই। চোখ বন্ধ করলেই ভেসে ওঠে এক মুখ। তেজী, একগুঁয়ে, অদ্ভুত রকম সাহসী। সেই জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানো তেজস্বী কন্যা শাখা। তার চোখ দুটো, কথা বলার সময় ভ্রু কুঁচকে ফেলার ভঙ্গি, তলোয়ার ধরার সময়ের দৃঢ়তা। যখন আঘাত পাওয়া পায়ে কাপড় বেঁধে দিয়েছিল সে। সেই অনুভূতি গুলো পিছু ছাড়ছে না যেন। ফাইয়াজ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বৃষ্টিতে ভেজা মাটির গন্ধে ভরে গেছে চারপাশ।
মনে হচ্ছে আকাশের মতো তার বুকেও ঝড় জমেছে। দুদিন, পুরো দুদিন হয়ে গেছে। শাখার কোনো দেখা নেই। না জঙ্গলে, না নগরে,
না পাহাড়ি পথে। কোথাও না। নিজেকে বহুবার বোঝানোর চেষ্টা করেছে এটা স্বাভাবিক।
একজন অচেনা মেয়ের জন্য এমন ভাবার কিছু নেই। কিন্তু হৃদয় যুক্তির কথা কবে শুনেছে?
হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকালো। ফাইয়াজের চোখের সামনে আবার ভেসে উঠল শাখার হাসি। সে বিরক্ত হয়ে মাথা ঝাঁকাল।
"ধুর!"
নিজের উপরই রাগ হলো। ডাকাত দলের সর্দার সে। নৃশংসতা তার রক্তে মিশে আছে। নারী কোমল, তাতে তার পোষাবার কথা নয়। অথচ এই পাষন্ড মস্তিষ্কে তান্ডব চালাচ্ছে এক নারী। একটা মেয়ের কথা ভেবে সে এত অস্থির হচ্ছে। রাত কাটাতে পারছে না না দেখে। ভেতরের কক্ষ থেকে তার এক সঙ্গী বেরিয়ে এলো।
"সর্দার, অশ্ব প্রস্তুত। কিন্তু ঝড় আরও বাড়ছে। এমন অবস্থায় আপনার যাওয়া টা বোধ হয় অনুচিত হবে। তেমন কোনো জরুরি দরকার হলে বলুন। আমরা আছি তো"
ফাইয়াজ উত্তর দিল না। লোকটা আবার বলল,
"সর্দার, আজ কোনোভাবেই বাইরে যাওয়া ঠিক হবে না।"
কিছুক্ষণ নীরব থেকে ফাইয়াজ হঠাৎ সোজা হয়ে দাঁড়াল। তার চোখে তখন সিদ্ধান্তের ঝলক। বারান্দা থেকে অন্ধকারের দিকে তাকাল।
দূরে কোথাও সাহাবাদের দিক। এই মুহূর্তে ঘুমিয়ে আছে পুরো নগর। হয়তো জেগে আছে সে। হয়তো বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছে। হয়তো না। কিন্তু না দেখে শান্তি নেই। লোকটাফাইয়াজ কে বেরোতে দেখে বলল
“তা সর্দার যাবেন কোথায়?”
ফাইয়াজ নিচু স্বরে বলল,
"নগরে।"
লোকটা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
"এত রাতে?"
ফাইয়াজ ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত হাসি টানল
“তোরা কি চাচ্ছিস আমি মরে যাই?"
উত্তর দিতে পারলো না সে। কি উত্তর দিবে? এমন রুপে সর্দার কে দেখেছে নাকি কখনও?
কিছুক্ষণ পরই কালো অশ্বটার পিঠে উঠে বসল সে। ঝড় তখন আরও ভয়ংকর হয়ে উঠেছে।
বৃষ্টির ফোঁটা তীরের মতো আঘাত করছে।
আকাশে বজ্র গর্জন। সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই তার।
লাগাম টানতেই অশ্বটা হ্রেষাধ্বনি করে উঠল।
ঝড়-বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে ছুটতে শুরু করল সাহাবাদের দিকে। ফাইয়াজ জানে না সে সেখানে গিয়ে কী করবে। শাখার সঙ্গে দেখা হবে কিনা তাও জানে না। শাখার ঘর কোনটা তাও জানে না।
তবু বুকের ভেতরের অস্থিরতা তাকে বসে থাকতে দিচ্ছে না। কেবল মনের ঝড় শান্ত করতে ছুটে যাচ্ছে অজানা আশঙ্কা নিয়ে। ফাইয়াজ নগরের বাজারে গিয়ে অশ্ব থামাল। চারিদিকে মুষলধারে বৃষ্টি। তার চোখ চাতকের মত খুঁজে চলেছে কাঙ্ক্ষিত নারী টিকে। ফাইয়াজ অনুভব করল, শাখাকে দেখার নেশা সবচেয়ে ভয়ংকরভাবে আহত হয়েছে তার হৃদয়।