সাহাবাদের মূল নগরের বাইরে পুরোনো বটগাছটার নিচে দাঁড়িয়ে ছিল ফাইয়াজ। সারা টা রাত। পুরো একটা রাত। ঝড় থেমেছে অনেক আগেই। বৃষ্টির পানি এখনও পাথরের রাস্তায় জমে আছে। দূরের মিনার থেকে কয়েকবার আজানের ধ্বনি ভেসে এসেছে। প্রহরী বদল হয়েছে। মশাল নগরের দোকানদার ডা মোকামের জন্য বের হচ্ছে। একটা দুটো মানুষ দেখা যায়। কয়েকজন টুপি হাতে মেলা করেছে মসজিদের দিকে। কিন্তু যার জন্য অপেক্ষা, তার দেখা আর মেলেনি।
অশ্বের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল সে। পথের দিকে তাকিয়েছিল আকূল অপেক্ষায়। কিন্তু কোন পথ তা জানা নেই। কেবল জানে নদীর তীরবর্তী। অতএব নগরের আশেপাশেই হবে। আর একটু অপেক্ষা করি করি করে ভোর রাত। মনের ভাবনারা অবাধ্য, হয়তো আজ দেরি হয়েছে নয়তো কোনো সমস্যায় পড়েছে। নিজেকে এমন কত শত অজুহাত দিয়েছে সে। কিন্তু রাত শেষ হয়ে গেল। আকাশ ধীরে ধীরে ফ্যাকাশে হতে শুরু করল। পূর্ব দিগন্তে আলো ফুটবে খানিক বাদেই।
তবুও শাখা এলো না। ফাইয়াজের বুকের ভেতরটা কেমন ফাঁকা হয়ে গেল। অদ্ভুত এক অনুভূতি।
যেন অনেক আশা নিয়ে মুঠো খুলে দেখেছে ভেতরে কিছুই নেই। দীর্ঘক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে থেকে অবশেষে ঘোড়ার লাগাম ধরল সে। শেষবারের মতো তাকাল সাহাবাদের দিকে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে অশ্বে চড়ে বসল। আজ তার কোনো তাড়া নেই।
ফেরার পথটুকু যেন অস্বাভাবিক দীর্ঘ লাগছে।
জঙ্গলের ভেতর দিয়ে এগোতে এগোতে সে বুঝল তার মন ভীষণ ভারী হয়ে আছে। এত ভারী আগে কখনো লাগেনি। আশ্চর্য! তার মন কবে ছিল? এই ভাবনা যেন মনকে আরও বিষিয়ে তুলল। কি এমন আছে সেই নারীর মধ্যে? মাত্র তিনটি সাক্ষাতে সর্দারের মন বিগড়ে দিল। মস্তিষ্কে তান্ডব চালাচ্ছে, দেহ মন কিচ্ছু নিজের কথা শুনছে না তার।
কাটাগিরির গভীরে ডাকাতদের ডেরা। সকাল হয়ে গেছে। অনেকে ইতিমধ্যেই ঘুম থেকে উঠেছে।
সৈন্য রা অস্ত্র পরিষ্কার করছে, রান্নার প্রস্তুতি নিচ্ছে। একজন ডেকে বলে উঠল,
"সর্দার ফিরতেছে!"
সবাই তাকাল। তারপর একে একে সবার মুখের ভাব বদলে গেল। এ কি তাদের পরিচিত ফাইয়াজ? চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ। মুখে কোনো হাসি নেই। কাঁধ ঝুঁকে আছে সামান্য। যেন এক রাতেই বহু বছরের ক্লান্তি জমেছে। শরীর ভিজে জবজবে। সারাটা রাত নগরের বাইরে দাঁড়িয়ে ভিজেছে। তার চ্যালাপ্যালা রা ভেবেছিলো ওমন ঝড় - জল উপেক্ষা করে ছুটে গেছে নিশ্চয়ই কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজে। তাহলে কি সেই কাজে ব্যর্থ হয়েছে সর্দার? তার অবস্থা দেখে কারও প্রশ্ন করার সাহস ও হয় না।
সাফিন নামের এক সঙ্গী ফিসফিস করে বলল,
"কেউ মারা গেছে নাকি?"
পাশের লোকটা কনুই মেরে বলল,
"চুপ! সর্দার শুনলে তোরই জান যাবে। ওনার কেউ আছে নাকি যে মারা যাবে?”
ফাইয়াজ কারও দিকে তাকাল না। নিঃশব্দে অশ্ব থেকে নেমে লাগাম একজনের হাতে দিল। তারপর সোজা নিজের কক্ষের দিকে হাঁটতে লাগল। সঙ্গীরা একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। এমন ফাইয়াজ তারা আগে দেখেনি। নিজ কক্ষে ঢুকেই দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিল সে।
কড়মড় শব্দে কাঠের দরজা আটকে গেল। ঘরের ভেতর আধো অন্ধকার। এক কোণে তলোয়ার, অন্য পাশে ধনুক। দেয়ালে ঝুলছে পুরোনো মানচিত্র। সব আগের মতোই আছে।
শুধু তার ভেতরটা আর আগের মতো নেই। গিয়ে জানালার পাশে বসে পড়ল। বাইরে মৃদুমন্দ গাছের ডাল দুলছে। পোষাক বদলানোর নাম নেই। তার মাথার ভেতর বারবার ভেসে উঠছে সেই একই মুখ। কোনো ভাবে তা সরাতে পারছে না। ফাইয়াজ বিরক্ত হয়ে চোখ বন্ধ করল।
"এ কী বিপদে পড়লাম আমি..."
নিজের কাছেই স্বীকার করতে কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু সত্যিটা স্পষ্ট। সে মেয়েটার জন্য অপেক্ষা করেছে সারা রাত আর আজ তার দেখা না পেয়ে বুকের ভেতরটা পুড়ছে। যেন কেউ অদৃশ্য আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। এগুলো কে কি করে অস্বীকার করবে সে? বজ্রের মৃদু শব্দ শোনা গেল। ফাইয়াজ মাথা হেলিয়ে দেয়ালে ঠেকাল। মনে হচ্ছে তলোয়ারের আঘাতের চেয়েও মারাত্মক পীড়া দেয় কাওকে দেখার আকাঙ্কখা। এক ঝলক দেখা পাওয়ার জন্য বুঝি বুক খানা এমন পোড়ে?
ডেরা ভীষণ নিরব। সর্দারের কক্ষের সামনে কেউ যাওয়ার সাহস করছে না। সবাই বুঝে গেছে, আজ ফাইয়াজের মেজাজ ভালো নয়। নিজ কক্ষে দরজা বন্ধ করে বসে আছে সে। সামনের টেবিলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কিছু মানচিত্র, কয়েকটা অস্ত্র আর অসমাপ্ত পরিকল্পনার খাতা। তার চোখ সেদিকে নেই। মনে বারবার ভেসে উঠছে শাখার চোখ জোড়া। ফাইয়াজ বিরক্ত হয়ে টেবিলে রাখা ছুরিটা তুলে ছুড়ে মারল দেয়ালে। ছুরিটা গিয়ে গেঁথে রইল কাঠে।
"ধুর!"
তার নিজের উপরই রাগ হচ্ছে। একটা মেয়ের কথা ভেবে সে এমন অস্থির হয়ে পড়েছে! ঠিক তখনই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো।
ঠক ঠক।
ফাইয়াজ বিরক্ত গলায় বলল,
"কি?"
বাইর থেকে একজন উত্তর দিল,
"সুলতান মহল থেকে দূত এসেছে সর্দার।"
ফাইয়াজ ভ্রু কুঁচকাল।
"ভিতরে পাঠাও।"
কিছুক্ষণ পর একজন লোক ভেতরে ঢুকল। হাতে সিলমোহর করা চামড়ার নল। সম্রাটের রাজচিহ্ন স্পষ্ট। লোকটা সম্মানের সাথে পত্র এগিয়ে দিল।
"জরুরি বার্তা।"
ফাইয়াজ পত্রটা নিয়ে খুলল। ভেতরে কয়েকপাতা লেখা। আমিরাবাদের সম্রাট নিজের হাতে পুরো পরিকল্পনা লিপিবদ্ধ করে পাঠিয়েছেন। সাহাবাদে আক্রমণের দিন, সৈন্যদের অবস্থান, প্রবেশপথ, রাজপ্রাসাদের মানচিত্র, কারাগার, অস্ত্রাগার সব কিছুর অবস্থান চিহ্নিত করা।
আর সবচেয়ে নিচে জমিদার পরিবারের সদস্যদের তালিকা। সাধারণত এমন কোনো পত্র এলে ফাইয়াজ ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে প্রতিটি লাইন বিশ্লেষণ করত। কিন্তু আজ আজ তার মনই বসছে না। দুই লাইন পড়ছে। তারপর আবার শাখার কথা মনে পড়ছে। পত্রটা টেবিলে ছুড়ে ফেলল। চেয়ার লাথি মেরে ফেলে দিল। কাঠের চেয়ারটা উল্টে গিয়ে ভেঙে গেল। পাশের তাক থেকে একটা পিতলের প্রদীপ ছিটকে পড়ে চূর্ণবিচূর্ণ হলো। কক্ষের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা সঙ্গীরা একে অপরের মুখের দিকে তাকাল। কেউ সাহস করে ভেতরে ঢুকল না। ফাইয়াজ পায়চারি করতে লাগল। তার ভেতরে যেন আগুন জ্বলছে। হঠাৎ টেবিলের ওপর ঘুষি মারল। নিজের উপরই ক্ষুব্ধ সে। পত্রটা মেঝেতে পড়ে আছে। খোলা অবস্থায়। বাতাসে পাতাগুলো উল্টে যাচ্ছে।
শেষের পাতায় এক এক করে সবার নাম। কিন্তু ফাইয়াজের চোখ সেদিকে একবারও গেল না।
যার জন্য বুজ পুড়ছে তার নাম টাও যে সেই সারি তেই আছে সে খেয়ালই করল না। রাগে আর অস্থিরতায় অন্ধ হয়ে আছে সে। জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। দূরে বনভূমি দেখা যায়। ফাইয়াজ এর চোখ জোড়া জ্বলছে। বিশাল লণ্ঠন টা ছুড়ে ফেলে চূর্ণবিচূর্ণ করে ফেলল।
“ঘৃণা করিন।বৃষ্টি কে আমি ঘৃণা করি। এই বৃষ্টির রাতেই আমি সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছি।”
ফাইয়াজ নিজের চুল খামচে ধরে মেঝেতে বসে পড়লো। ছটফট করতে লাগল পাগলের মত।
“আবার! আবার সেই বৃষ্টি। সেদিনও বৃষ্টি ছিল। আজও বৃষ্টি। না। না না না। এ তোমার কেমন বিচার প্রকৃতি? আমার বেলায় তুমি কেন এত নিষ্ঠুর বরাবর? আমার অসহায় দিনে কেন তুমি বৃষ্টি দাও? কেন তোমার এই মেঘ আমায় নিঃস্ব করে কেন কেন কেন?”
*****
সাহাবাদ মহলের পূর্ব দিকটা যেন এক টুকরো স্বর্গ। বিশাল ফলের বাগান। সারি সারি আম, জাম, ডালিম, আঞ্জির আর নানান অচেনা ফলের গাছ। রোদ পাতার ফাঁক গলে মাটিতে ছোপ ছোপ আলো ফেলেছে। বাতাসে পাকা ফলের মিষ্টি গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে চারপাশে। শাখা বাগানের পথ ধরে হাঁটছে। এক হাতে বাঁশের ঝুড়ি। অন্য হাতে গাছ থেকে ফল ছিঁড়ে নিচ্ছে। মন ভালো করতে শাখা ফল তুলে। কদিন পর জান্নাত টার বিয়ে। চলে যাবে আপা মহল থেকে। ভাবলেই কেমন কান্না পায়। অজান্তেই কয়েকবার চোখ চলে গেল নিজের পায়ের দিকে। এখনও কাপড়টা বাঁধা আছে সেখানে। সেই রাতের আঘাতের চিহ্নও পুরোপুরি শুকায়নি। কাপড়টার দিকে তাকাতেই আবার ভেসে উঠল একখানা পুরুষালী মুখ। গম্ভীর, শান্ত কণ্ঠের সেই বণিক ফারিস। একটা ডালিম হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ অন্যমনস্ক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। লোকটা আসলে কে? কোথাকার বণিক? প্রথম দেখা হয়েছিল সম্পূর্ণ কাকতালীয়ভাবে। তারপর আবার। প্রতিবারই যেন কোথা থেকে হুট করে এসে হাজির হয়।
অথচ নিজের সম্পর্কে তেমন কিছুই বলে না।
শাখা বিরক্ত হয়ে মাথা ঝাঁকাল।
"আমি আবার এসব কি ভাবছি!"
নিজেকেই ধমকাল সে। কিন্তু সত্যিটা অস্বীকার করা কঠিন। লোকটার সঙ্গ তার ভালো লাগে।
খুব বেশি। কথা বলার ধরনটা, হাসিটা, আচরণটা।
সবকিছুই অদ্ভুত রকম স্বস্তি দেয়।
ঠিক তখনই
"আপাআআআআআ!"
বাগান কাঁপিয়ে চিৎকার ভেসে এলো। শাখা প্রায় লাফিয়ে উঠল। পরক্ষণেই ঝোপঝাড় সরিয়ে ঝড়ের বেগে হাজির হলো সাহারা। তার অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে যুদ্ধ করে ফিরল। কাঁধে বসে আছে বিশাল এক ঈগল। শাখার চোখ কপালে উঠে গেল।
"আল্লাহ!"
স্বভাবতই এক কদম পিছিয়ে গেল সে। ঈগলটা সাধারণ কোনো পাখি নয়। ডানার বিস্তার প্রায় মানুষের সমান। সোনালি-বাদামি পালক। গলার অংশে সাদা রঙের আভা। বাঁকানো ভয়ংকর ঠোঁট। হলুদাভ সোনালি চোখ দুটো এমনভাবে চারপাশ দেখছে যেন মুহূর্তেই শিকার ছিঁড়ে ফেলবে। সাহারা গর্বে গদগদ।
"দেখেছিস?"
"এটা তুই কোথা থেকে এনেছিস?"
"ধরেছি।"
"ধরেছিস মানে?"
"ধরেছি মানে ধরেছি।"
সাহারা এমন ভাব করল যেন ঈগল ধরা তার নিত্যদিনের কাজ। ঈগল টার পেট বরাবর আঙুল বুলিয়ে দিয়ে বলল
“ও কত সুন্দর আমার কথা শোনে জানিস? এক্ষুণি বলবো কোথাও বার্তা পৌঁছে দিতে? সাইইইই করে উড়ে যাবে। আমি যা বলি তাই শুনে”
শাখার হাত-পা কাঁপছে রীতিমতো।
“সারা ফেল ওটা। নামা কাঁধ থেকে। ইশশশশশ কি হিংস্র। সারা, সারা বোন আমার। এসব নিয়ে মশকরা করতে নেই সোনা। কবে বড়সড় বিপদ….”
সাহারা আরেকটু এগিয়ে এলো
“আরে ভয় পাচ্ছিস কেন? ও খুব ভালো আমার একদম কথা শোনে। ওর নাম দিয়েছি বাজি। এই বাজি এটা আমার আপা রে। দেখ দেখ”
শাখা এবার ভালো করে পাখিটার দিকে তাকাল। অদ্ভুত সুন্দর প্রাণী। এমন ঈগল সে আগে খুব কমই দেখেছে। হয়তো পাহাড়ি অঞ্চলের বিরল কোনো প্রজাতি। হঠাৎ তার দৃষ্টি গিয়ে আটকাল ঈগলের গলায়। সেখানে সরু চামড়ার ফিতার সঙ্গে ঝুলছে একটা রুপালি বস্তু। তাবিজের মতো।
শাখা ভ্রু কুঁচকে এগিয়ে গেল।
"একটু দাঁড়া।"
সাহারা অবাক হলো।
"কি?"
শাখা ঈগলের গলার দিকে তাকিয়ে রইল। ছোট্ট রুপার খাপ। তার গায়ে সূক্ষ্ম নকশা খোদাই করা।
রোদে চকচক করছে। কেন জানি খুব চেনা লাগছে। অস্বাভাবিক চেনা। কোথায় যেন দেখেছে। অনেকবার দেখেছে। কিন্তু মনে করতে পারছে না। সে আরও কাছে গিয়ে তাকাল। তারপর হঠাৎ যেন মাথার ভেতর বিদ্যুৎ খেলে গেল।
“ফারিস”!
শাখার চোখ বড় হয়ে উঠল। তার মনে পড়ল ফারিসের গলায়ও ঠিক এমনই একটা রুপার তাবিজ ঝুলতে দেখেছিল সে। একই রকম খাপ একই নকশা একই আকৃতি।
মুহূর্তের মধ্যে বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
"সাহারা।"
"হুম?"
"ঈগলটা কোথায় পেয়েছিস?"
সাহারা গর্বিত ভঙ্গিতে বলল,
"জঙ্গলের শেষ প্রান্তে।"
"কোথায়?"
"ওই যে পরিত্যক্ত পুরোনো বাড়িটা আছে না?"
শাখার মুখের রঙ বদলে গেল।
"কোন বাড়ি?"
"আগে নাকি বিদেশি বণিক দের আপ্যায়ণ করতো সম্রাট ওই বাগান বাড়িতে। অর্ধেক ভেঙে গেছে। চারপাশে বুনো লতা উঠে গেছে।"
সাহারা ঈগলের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
"বাড়িটার পাশের শুকনো গাছের ডালে বসেছিল। অনেক কষ্টে ধরেছি।"
শাখা আর কিছু বলল না। চোখ স্থির হয়ে আছে সেই রুপার তাবিজের ওপর। মাথার ভেতর একটার পর একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগল।
ফারিসের তাবিজের সঙ্গে এর মিল কেন? এই ঈগল কি তার? তাহলে সে কি ওই পরিত্যক্ত বাড়িতে থাকে? নাকি বাড়িটার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক আছে? হঠাৎ করেই ফারিসকে আরও রহস্যময় মনে হতে লাগল। সাহারা কিছুই বুঝতে পারছে না। সে এখনও ঈগল নিয়ে ব্যস্ত। শাখা দাঁড়িয়ে আছে গভীর চিন্তায়। তার চোখে তখন কৌতূহলের ঝিলিক। ওই বাড়িটদয় যেতে হবে। তবেই বণিক ফারিসের আসল পরিচয়ের কাছে সে যেতে পারবে। কিনৃতু কাটাগিরি এতই বড় যে এক প্রান্তে চিরে অন্য প্রান্তে পৌছাতে দিন শেষ। খুঁজতে গেলে তো কয়েক দিন লেগে যাবে। সিদ্ধান্ত নিলো এবার ফারিস এলে তার পিছু নেবে সে।
******
রাত অনেক গভীর। সাহাবাদ মহলের অধিকাংশ প্রদীপ নিভে গেছে। চারপাশে নীরবতা, যেন পুরো পৃথিবী ঘুমিয়ে পড়েছে। নিজ কক্ষের জানালার পাশে বসে আছে জান্নাত। সামনে খোলা একটি বই। চাঁদের আলো এসে পড়েছে পাতার ওপর। বাতাসে জানালার পর্দা দুলছে। চারদিকে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। ঠিক তখনই একটা মিষ্টি সুর ভেসে এলো। কানে। জান্নাতের আঙুল বইয়ের পাতার ওপর স্থির হয়ে গেল। সে মাথা তুলল।
দূর থেকে ভেসে আসছে বাঁশির সুর। এমন সুর সে আগে কখনও শোনেনি। মনে হচ্ছে কেউ বাঁশির ভেতর নিজের সমস্ত বেদনা ঢেলে দিচ্ছে।
জান্নাত উঠে দাঁড়াল। জানালার কাছে গিয়ে বাইরে তাকাল। তার কক্ষ থেকে স্পষ্ট দেখা যায় উত্তরের সেই পরিত্যক্ত প্রাসাদ। চাঁদের আলোয় আজ প্রাসাদটাকে আরও ভয়ংকর লাগছে। অন্ধকার জানালাগুলো যেন শত শত মৃত চোখের মতো তাকিয়ে আছে। খেয়াল করলো সবচেয়ে উঁচু চূড়াটার ওপর একজন বসে আছে। জান্নাতের বুক ধক করে উঠল। দূরত্ব অনেক। তবুও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। লোকটা সম্পূর্ণ বর্ম পরিহিত। চাঁদের আলোয় লোহার বর্ম রুপোর মতো ঝিলমিল করছে। সে প্রাসাদের কিনারায় বসে পা ঝুলিয়ে বাঁশি বাজাচ্ছে। জান্নাত চোখ সরাতে পারল না। তার কৌতূহল ধীরে ধীরে ভয়কে ছাড়িয়ে যেতে লাগল। কে লোকটা? প্রতি রাতে কি সে-ই বাঁশি বাজায়? কেন? আর এত রাতে ওই অভিশপ্ত প্রাসাদে কি করছে? প্রশ্নগুলো মাথার ভেতর ঘুরপাক খেতে লাগল। অবশেষে বইটা বন্ধ করল জান্নাত।
"একবার দেখে এলেই বা ক্ষতি কি..."
নিজেকেই বলল সে। কয়েক মুহূর্ত পরেই কালো ওড়না গায়ে জড়িয়ে কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলো।
মহল তখন ঘুমিয়ে। নিঃশব্দে পেছনের পথ ধরে এগিয়ে গেল সে। উত্তরের দিকে যত এগোচ্ছে, ততই ঠান্ডা হয়ে আসছে বাতাস। চাঁদের আলোয় জঙ্গলটা আজ অস্বাভাবিক সাদা দেখাচ্ছে। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকও নেই পাখির শব্দও নেই। যেন পুরো বন নিঃশ্বাস আটকে অপেক্ষা করছে।
দূরে প্রাসাদটা ক্রমশ বড় হতে লাগল। ধ্বংসস্তূপের কালো অবয়ব রাতের আকাশের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে। বাঁশির সুর এখন আরও স্পষ্ট আরও সম্মোহনী। অবশেষে প্রাসাদের মূল ফটকের সামনে এসে থামল জান্নাত। তার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক চাপা উত্তেজনা। সে মাথা তুলে তাকাল। ঠিক তখনই চোখে পড়ল জিনিসটা। ফটকের ডান পাশে দাঁড়িয়ে আছে সেই পুরোনো গাছ। বহু পুরোনো পাতাহীন কালো। মোচড়ানো ডালপালা আকাশের দিকে উঠে গেছে মৃত মানুষের হাতের মতো। গাছটাকে দেখে মনে হয় বহু আগেই মরে গেছে। তবু এখনও দাঁড়িয়ে আছে। কিসের অপেক্ষায় কে জানে। আর তার এক ডালে বাঁধা আছে একখানা লাল ওড়না।
গাঢ় সিঁদুর রঙা। রাতের বাতাসে ধীরে ধীরে উড়ছে। ফড়ফড়, ফড়ফড় শব্দ করছে উড়ছে। ওড়নাটা এমন দেখাচ্ছে যেন শুকিয়ে যাওয়া রক্তের টুকরো। জান্নাতের বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠল। কেন জানি দৃশ্যটা তার ভালো লাগল না। একটা অকারণ অস্বস্তি ঘিরে ধরল। ওড়নাটা এখানে কেন? কে বেঁধেছে? আর এই মৃত গাছেই বা কেন? হঠাৎ বাতাসের ঝাপটা এলো। লাল ওড়নাটা জোরে উড়ে উঠল। জান্নাতের মনে হলো গাছটার নিচে যেন কেউ দাঁড়িয়ে ছিল। বাতাস উল্টো দিক থপকে আসতেই ওড়নার ঝাপটা তার চোখ মুখ ছুঁয়ে গেল। গায়ে কাটা দিয়ে উঠলে জান্নাতের। ঘুঙুরের ঝুপঝাপ শব্দ চারিদিকে ছুটে বেড়াচ্ছে।