ভয়ে ভয়েও এগিয়ে যায় জান্নাত। প্রবেশদ্বার পেরিয়ে ভগ্ন মহলের ভিতরে এসে দাড়ায়। সামনে একটা ছোট্ট দালান, এক পাশ করে। সেটা পেরিয়ে অল্প সামনে গেলে মূল ভবন। তারই চূড়া থেকে ভেসে আসছে সেই বাঁশির সুর। সিড়ি গুলোকে ঠিক ভরসা করা যায়না। চড়লে যদি ভেঙে পড়ে। অবশেষে উঠলো সাত-পাঁচ না ভেবেই উঠে পড়লো জান্নাত। চুড়ায় যেতে ১৯ টা সিড়ি অতিক্রম করতে হলো। বুক ধরফড় করছে। গলা শুকিয়ে কাঠ। ভয় আর অস্থিরতা দুটোই কাজ করছে। অবশেষে সামনে দেখা মিলল সেই বর্ম পরিহিত লোকটার। জান্নাত ভয় ডর ভুলে দরাজ গলায় বলে উঠলো
“কে আপনি? কি চান এখানে?”
থামলো বাঁশির সুর। পিছনে ঘাড় ঘুরালো লোকটা। বর্মের খোলসে আবৃত মুখটাতে কেবল চোাক জোড়া দৃশ্যমান। নীলচে মনি গুলো জ্বলজ্বল করছে। জান্নাত এর বুকে হাতুড়ি পেটা শুরু হলো। লোকটা উঠে দাঁড়ালো। ধপাস ধপাস পায়ে এগিয়েও এলো কিছুটা। জান্নাত নড়ে না। তেজী গলায় প্রশ্ন করে
“চাইছেন টা কি আপনি? কেন ওই সম্মোহনী সুরে সবাইকে পাগল করতে চান? কি উদ্দেশ্য আপনার?”
লোকটার কন্ঠ শুনে বোঝা যায় সে প্রবীণ বয়সী
“এই মহল, আমার প্রাণ। আমার ভালোবাসার সমাধি স্থল। আমার প্রিয়তার কবর এটা। আমার আত্মার হত্যাকারী দের বাসস্থান। এই মহল আমার রক্তে মিশে আছে। আমার প্রণয়িনীর প্রত্যেকটা হাঁড় মজেছে এই মহলে। আমার রক্তগোলাপ খানা শুকিয়েছে এই মহলে। এই মহল আমায় ডেকে নেয় বার বার। আমি এখানে আসি তাই। তুমি ফিরে যাও কন্যা। সামনে বিবাহ তোমার, মন্দ বাতাস লাগবে গায়ে”
জান্নাত জেদ ধরে বসে
“আপনি আগে বলবেন আপনার উদ্দেশ্য কি, তারপরেই আমি যাব”
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে চেঁচিয়ে ওঠে লোকটা
“সাবধান কন্যা”
জান্নাত পিছনে তাকিয়েই এক চিৎকার দিয়ে সরে যায় সেখান থেকে। ছাদের ওপরের চিলেকোঠার মত বানানো বড় স্তম্ভ টা খসে পড়েছে। বিশাল ভবনটা কেপে উঠলো। জান্নাত সরতে গিয়ে আছড়ে পড়লো ছাদের ওপরেই। ছিলে গেল কনুই আর হাঁটু। একটুর জন্য বেঁচে গেছে। ওটার তলে চাপা পড়লে বাঁচা অসম্ভব ছিল। দ্রুত হাত পা ঝেড়ে উঠে দাঁড়িয়েই লোকটা কে আর পেল না। চারিদিকে ভো ভো করে ঘুরে খুজল। নাহহহ কোথাও নেই লোকটা। জান্নাত জোরে করে ডাকে
“কোথায় গেলেন আপনি? শুনছেন? আপনি….আপনি কোথায়য়য়?”
অনেক খুঁজেও যখন পেল না কাওকে, জান্নাত বুঝলো তাকে পালাতে হবে। কিন্তু পথ খুঁজে পাচ্ছে না এই আধারি রাতে। দম যেন বন্ধ হয়ে আসছিল। বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দ অনবরত হয়েই চলেছে। সেই অভিশপ্ত প্রাসাদ থেকে বের তো হলো, কিন্তু সে মহলে ফেরার পথ হারিয়ে ফেলেছে। চারদিকে শুধু কালো গাছ, ঘন ঝোপঝাড় আর অদ্ভুত নীরবতা। লোকটা কোথায় গেল? এক মুহূর্ত আগেও তো তার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল! জান্নাত চারদিকে খুঁজেছে । কিন্তু কোনো সারা শব্দ পায়নি। দূরে রাতজাগা পাখির ডাক ভেসে আসে। সেটাও ভয়ংকর শোনায়। ভয় পেয়ে গেছে সে। এত ভয় হয়তো জীবনে কখনও পায়নি। লম্বা ওড়না আঁকড়ে ধরে দৌড়াতে শুরু করল জান্নাত। কোথায় যাচ্ছে, কোন দিকে যাচ্ছে জানে না। তার পোশাক জঙ্গলের অন্ধকারে বারবার ঝোপে আটকে যাচ্ছে। শ্বাসপ্রশ্বাস ভারী হয়ে উঠেছে।
"আল্লাহ! আমি কোথায় এলাম। কিচ্ছু চিনতে পারছি না”
চোখে পানি চলে এলো। আজ যদি কেউ জেনে যায় সে একা একা রাতের অন্ধকারে এখানে এসেছে! মনি মা তো মেরেই ফেলবে। আজকাল নগরে বেশ ডাকাতি হচ্ছে। ডাকাত রা নাকি জঙ্গল থেকেই আসে। এসব ভাবতেই জান্নাতের ভয় আরও বেড়ে গেল। আরও দ্রুত ছুটল সে।
হঠাৎ ধাম! করে সজোরে কারও বুকে গিয়ে ধাক্কা খেল। ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যেতে নিয়েছিল। কিন্তু শক্ত একটা হাত মুহূর্তেই তার বাহু চেপে ধরল।
"সাবধা….."
কথা শেষ হওয়ার আগেই দুজনেই থমকে গেল।
জান্নাত হাঁপাতে হাঁপাতে মুখ তুলল। চাঁদের আলো গাছের ফাঁক গলে এসে পড়েছে সামনের মানুষের মুখে। সেই মুখ দেখে তার চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল।
"যু... যুবরাজ?"
মেহরাবও স্পষ্টতই অবাক। নিজের চোখ কে বিশ্বাস হচ্ছে না তার। এ কাকে দেখছে সে? সাহাবাদের জ্যেষ্ঠ শাহজাদীকে? এই গভীর রাতে? তাও আবার জঙ্গলের মাঝখানে? এ কি আদৌ বিশ্বাস যোগ্য? একেবারেই না। মেহরাব ভ্রু কুঁচকে বলল,
"আপনি এখানে কি করছেন?"
জান্নাত লজ্জা, ভয় আর অস্বস্তিতে একেবারে গুটিয়ে গেল। কি উত্তর দেবে এবার? তার কথা সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য আর অযৌক্তিক মনে হবে যে কারও কাছেই। আমতা আমতা করতে লাগল সে
"আমি... আমি..."
"আপনি কি পথ হারিয়েছেন?"
কথাটা শুনেই জান্নাতের মুখ আরও লাল হয়ে উঠল। কারণ সত্যিই সে পথ হারিয়েছে। মেহরাব দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
"আল্লাহর কসম, এদের পরিবারটা আমাকে একদিন পাগল বানিয়ে ছাড়বে।"
জান্নাত মাথা নিচু করে ফেলল।
"দুঃখিত..."
মেহরাব কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর চারপাশে তাকাল। জঙ্গলটা নিরাপদ নয়। বিশেষ করে আজকাল তো নয়ই। নিচু স্বরে বলল,
"চলুন। আপনাকে মহলে পৌঁছে দিই।"
জান্নাত দ্বিধায় পড়ে গেল।
"কিন্তু….."
"কোনো কিন্তু নয়।"
মেহরাবের ধমকানো কন্ঠ শুনে জান্নাত আর আপত্তি করল না। দুজন পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল। দুজনের মাঝখানে নীরবতা। কেউ কোনো কথা বলছে না। জান্নাত মাথা নিচু করে হাঁটছে।
মেহরাব চারপাশ পর্যবেক্ষণ করছে। কিছুদূর যাওয়ার পর মেহরাব হঠাৎ বলল,
"উত্তরের প্রাসাদে গিয়েছিলেন?"
জান্নাত থমকে গেল।
"আপনি জানলেন কীভাবে?"
মেহরাব মৃদু হেসে ফেলল।
"এই অবস্থায় আর কোথা থেকে আসবেন?"
জান্নাত কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
"জানেন আমি না মাঝেমধ্যেই এখান থেকে বাশির সুর শুনহ। আজও সেই বাঁশির সুর শুনেছিলাম।"
মেহরাবের চোখে এক ঝলক পরিবর্তন এলো।
"তারপর?"
"চূড়ায় একজনকে দেখলাম।"
"বর্ম পরা?"
"জি।"
মেহরাব এবার পুরোপুরি থেমে গেল। তার মুখের ভাব গম্ভীর হয়ে উঠল।
"লোকটার সাথে কথা হয়েছে আপনার?"
জান্নাত ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে সব বলল। তারপর হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যাওয়া। সব। সবটা শুনে মেহরাবের ভেতরে যেন নতুন এক প্রশ্নের জন্ম হলো। একই বর্ণনা সে সাহারার মুখ থেকেও শুনেছিল। এ কি কেনো ফাঁদ? এতগুলো ঘটনা কি শুধুই কাকতালীয়? দূরে সাহাবাদ মহলের আলো দেখা যাচ্ছে। মেহরাব চোখ তুলে তাকাল। আর তার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অস্বস্তি জন্ম নিল।
মনে হচ্ছে কেউ যেন অনেক দূর থেকে তাদের দেখছে। জান্নাত কিছুদূর এগিয়েই থেমে গেল।
সামনেই সাহাবাদ মহলের উঁচু প্রাচীর দেখা যাচ্ছে। রাত নিশুতি। চারপাশে গাঢ় অন্ধকার। মেহরাব ঘোড়ার লাগাম হাতে নিয়ে বলল,
"মহলের ফটক পর্যন্ত পৌঁছে দিই? নাকি সাথে যেতে হবে?”
জান্নাত সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল।
"না।"
মেহরাব ভ্রু কুঁচকাল।
"না মানে?"
জান্নাত ইতস্তত করে বলল,
"কেউ দেখে ফেললে ভুল বুঝবে।"
"ভুল বুঝবে?"
"জি।"
মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল সে।
"আমি অবিবাহিতা। আপনি যুবরাজ। এত রাতে আমাদের একসাথে দেখলে মানুষ কত কথা বলবে।"
মেহরাব বিরক্তিতে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল বড় করে
“উফফফফ, কে কি বলে সেটা আমি দেখে নিব। চলুন”
“নাআআআ, আমাকে নিয়ে কোনো কটু কথা হোক আমি চাই না। দয়া করুন। আপনি এতদূর আমায় নিয়ে এসেছেন আপনাকে ধন্যবাদ যুবরাজ”
কথাটা শুনে মেহরাব চুপ করে রইল। অদ্ভুত ব্যাপার, আগের বার এই মেয়েটাকে দেখলে তার ভিতর কেমন যেন একটা অনুভূতি জেগে উঠত।
মুগ্ধতা কৌতূহল আর অকারণ টান। কিন্তু আজ?
আজ যেন কিছুই অনুভব হচ্ছে না। জান্নাত সুন্দরী। নিশ্চয়ই সুন্দরী। কিন্তু এখন তাকে আর পাঁচটা সাধারণ নারীর মতোই লাগছে।
ভদ্র, লাজুক নরম স্বভাবের। এর বেশি কিছু নয়।
মেহরাব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল
"ঠিক আছে। তবে অন্তত কিছুটা পথ এগিয়ে দিই।"
জান্নাত আর আপত্তি করল না। দুজন ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগল। খুব বেশি কথা হলো না।
মহলের কাছাকাছি পৌঁছাতেই জান্নাত থামল।
"এবার আমি যেতে পারব।"
মেহরাব মাথা নেড়ে বলল,
"সাবধানে যাবেন।"
জান্নাত মৃদু হাসল।
"আপনিও।"
এরপর দ্রুত পায়ে মহলের দিকে এগিয়ে গেল সে।
অল্প সময়ের মধ্যেই অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেল তার অবয়ব। মেহরাব কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ঘোড়ার দিকে ফিরতে যাবে ঠিক তখনই ঝোপের আড়াল থেকে একটা পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এলো।
"উহুমমম, উহুমমম"
মেহরাব চমকে পিছনে ফিরল। ঝোপ সরিয়ে বেরিয়ে এলো সাহারা। দুই হাত কোমড়ে। মুখে ভয়ংকর গম্ভীর ভাব। যদিও চোখ দুটো কৌতূহলে চকচক করছে। মেহরাব কপাল কুঁচকে বলল,
"তুমি এখানে কি করছো?"
সাহারা নাক সিটকাল।
"আমি আগে জিজ্ঞেস করেছি।"
"কী জিজ্ঞেস করেছো?"
"ওই মেয়েটা কে?"
মেহরাব এক মুহূর্ত থমকে গেল। বুঝল সাহারা তার বোনকে চিনতেই পারেনি। আবছা অন্ধকারে মুখও দেখা যায়নি। সাহারা সামনে এগিয়ে এলো।
মেহরাব দুইহাত বুকে গুঁজে দাঁড়িয়ে বলল
“কখন জিজ্ঞেস করলে?”
“আপনি কি উহুম উহুম এর মানে বোঝেন না? অনেকক্ষণ ধরে দেখছি। মেয়েটার সাথে বেশ কথা বলছিলেন, তাও এই রাতের বেলা। কে ওটা?”
"অনেকক্ষণ কথা বলছিলাম?"
"জি হ্যাঁ।"
গর্বিত ভঙ্গিতে বলল সে।
"আমি তো বের হয়েই আপনাকে দেখেছি। কিন্তু পাশে একটা মেয়ে দেখে আর সামনে আসিনি।"
মেহরাব ভ্রু তুলল।
"তাই?"
"হ্যাঁ।"
"কেন?"
সাহারা গম্ভীর মুখে বলল,
"মানুষের ব্যক্তিগত মুহূর্তে বাধা দেওয়া ভদ্রতা নয়।"
মেহরাবের মুখে হাসি ফুটে উঠল।
"তোমার মুখে ভদ্রতার কথা শুনছি?"
"খুব হাসির কিছু বলেছি?"
"অনেক।"
সাহারা চোখ পাকাল।
"বিষয়টা ঘুরাবেন না। মেয়েটা কে ছিল?"
মেহরাব ইচ্ছে করেই বলল,
"কেন জানতে চাও?"
সাহারা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল,
"জানতে চাই না।"
"তাহলে জিজ্ঞেস করছো কেন?"
"এমনি।"
"এমনি?"
"হ্যাঁ এমনি।"
মেহরাব এবার হো হো হেসে ফেলল। সাহারার মুখ আরও কালো হয়ে গেল।
"আপনি হাসছেন কেন?"
"কিছু না।"
"অবশ্যই কিছু আছে।"
সাহারা বিরক্ত হয়ে পাথরে লাথি মারল।
"আচ্ছা ঠিক আছে। বলবেন না যখন, বলবেন না।"
তারপর ঘুরে দাঁড়াল।
"আমি চললাম।"
দুই কদম যেতেই পিছন থেকে মেহরাব বলল,
"বনবিড়াল।"
সাহারা দাঁত কিঁচিয়ে তাকাল।
“ওসব ভুল ভাল নামে ডাকলে গকদম কচু কাটা করে রেখে দেব”
“যথাআজ্ঞা মহারানী, এখন আসুন। আমরা আমাদের অভিযানে রওনা হই কি বলেন?”
সাহারা গম্ভীর মুখ করেই এগিয়ে এলো। মেহরাব টের পাচ্ছে মেয়েটাকে সাহারাট হিংসা হচ্ছে। কারণ ও জানে না ওটা ওর ই বোন।মেহরাব বললও না।
কাটাগিরির জঙ্গলের গাছের মাথায় চাঁদের আলো আটকে আছে। নিচে পৌঁছাতে পারছে না এত ঘণ গাছপালা। চারপাশে স্যাঁতসেঁতে মাটির গন্ধ।
মেহরাব নিজের অশ্বের লাগাম ধরে এগিয়ে চলেছে। তার পাশেই হাঁটছে সাহারা। মুখ ফুলিয়ে।
রাগী ভাব ধরে। অস্বাভাবিক রকম চুপচাপ।
এবং এই চুপচাপ ব্যাপারটাই মেহরাবের কাছে সবচেয়ে সন্দেহজনক লাগছে। মেহরাব আড়চোখে তাকাল। সাহারা ঠোঁট কামড়ে সামনে তাকিয়ে হাঁটছে। মাঝে মাঝে পায়ের নিচের শুকনো ডাল এমন জোরে ভাঙছে যেন ডালটারই ব্যক্তিগত অপরাধ ছিল। মেহরাবের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল।
"তোমার কি হয়েছে?"
সাহারা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
"কিছু হয়নি।"
যতই লুকাক, মেয়েটার মধ্যে স্পষ্ট একটা অস্থিরতা আছে। অদ্ভুত ব্যাপার। যেন তাকে অন্য কোনো নারীর সঙ্গে দেখে বিরক্ত হয়েছে।
হিংসাও হয়তো। কিন্তু কেন? মেহরাব ইচ্ছে করলেই বলে দিতে পারত যে মেয়েটি ছিল জান্নাত। সাহারার নিজের বড় বোন। কিন্তু বলল না। বরং বিষয়টা দেখার মজাই বেশি। সাহারা আবার বলল,
"ওই মেয়েটা খুব সুন্দর ছিল নাকি?"
মেহরাব এবার ফিক করে হেসে উঠল।
"তুমি তো বললে জানতে চাও না।"
"জানতে চাই না।"
"তাহলে?"
"এমনি জিজ্ঞেস করেছি।"
"হুমমমমমম?"
রাগে ফুঁসতে লাগল। ঠিক তখনই সামনের ঝোপ থেকে একটা পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এলো।
"আহা!"
সাহারা প্রায় লাফিয়ে উঠল। ঝোপ সরিয়ে বেরিয়ে এলো আলীরাজ। কালো পোশাক। কাঁধে ধনুক।
মুখে শয়তানি দুষ্টু হাসি। সাহারা কপাল কুঁচকে বলল,
"আপনি এখানে?"
আলীরাজ নাটকীয় ভঙ্গিতে বুক চেপে ধরল।
"কি নিষ্ঠুর কথা! আমি কি মানুষ নই? আমাকে দেখে এত অবাক হওয়ার কি আছে?"
মেহরাব বিরক্ত মুখে বলল,
"তুমি চুপ করবে?"
“না”
অবিচল উত্তর তার। সাহারা স্মিত হেসে বলল
“আপনি ভুল বুঝছেন মামা বাবু। আপনাকে দেখে বিরক্ত হচ্ছি না মোটেও। আসলে হুট করে এসেছেন তাই আরকি একটু ভড়কে….”
আলীরাজ এর সাথে এত মিষ্টি আলাপ পছন্দ হচ্ছে না মেহরাব এর। সাহারার দিকে তাকিয়ে বলল,
"শোনো বনবিড়াল, এই লোকটা কিন্তু তোমাকে নিতে চায়নি।"
সাহারা সঙ্গে সঙ্গে মেহরাবের দিকে তাকাল।
আলীরাজ চোখ বড় করল।
"এহহে জায়গা মত হাত দিছে রে। ও একদম মিথ্যে বলছে সুন্দরী। আমি আরও কোথায় বললাম তোমাকে না নিলে যাবই না”
সাহারা হেসে গর্বিত ভঙ্গিতে বলল,
"আমি কারও সাথে আসিনি। আমি এসেছি নিজের কাজে।"
"কী কাজ?"
"বলব না।"
আলীরাজ নাটকীয় দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
"আহারে। এরা দুজন দিন দিন এক রকম হয়ে যাচ্ছে।"
মেহরাব এবার সত্যিই বিরক্ত হয়ে বলল,
"কাজের কথায় আসবে?"
"আচ্ছা আচ্ছা।"
আলীরাজ হাত তুলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গি করল।
এরপর তিনজনই এগিয়ে চলল জঙ্গলের আরও গভীরে। সাহারা তখন বলল,
"আমি খবর না দিলে তো আপনারা আজ আসতেই পারতেন না।"
মেহরাব ভ্রু তুলল।
"নাহহহ সেটা ঠিক।"
দুই দিন আগে নিজের ধরা বিরল ঈগলের পায়ে ছোট্ট বার্তা বেঁধে পাঠিয়েছিল সাহারা। সেই ঈগল উড়ে গিয়ে পৌঁছেছিল আমিরাবাদে। আর বার্তায় লেখা ছিল জঙ্গলের গভীরে পরিত্যক্ত পুরোনো বাংলো। সন্দেহজনক যাতায়াত। রাতে অনুসন্ধান জরুরি। সাহারা গর্বে উজ্জ্বল হয়ে বলল,
"দেখলেন? আমার ঈগল কত কাজে লাগে।"
আলীরাজ হেসে বলল,
"হ্যাঁ, তবে ঈগলটার চেয়ে তার মালিক বেশি ভয়ংকর।"
"কেন?"
"যে মেয়ের পোষা প্রাণীর তালিকায় সজারু, ঈগল, সাপ বিচ্ছু আর কে জানে কি কি আছে, তাকে ভয় না পেয়ে উপায় আছে?"
আলীরাজ চোখ সরু করে বলল
“আচ্ছা এই ঈগল টা কোথা থেকে এনেছো? বেশ কাজের কিন্তু। অনুসন্ধান দিলে আমরাও আনাতাম। টাকা পয়সা ব্যাপার না”
সাহারা ভেংচি কেটে মেহরাব কে বলল
“আপনার কচি মামা কে বলুন পয়সার গরম না দেখাতে। ওটা কিনতে পাওয়া যায় না। ওটা আমি জঙ্গল থেকে ধরেছি”
মেহরাব এর চোখ সরু হয়প আসে। এত ভয়ংকর ঈগল সাহারা ধরেছে? আবার পোষ ও মানিয়েছে? শিকারী যুবরাজ বেশ করে বোঝে এ এত্ত সহজ নয়। সাহারা দু হাতে ঘাগড়ার অংশ উঁচু করে ধরে হাটছে। আলীরাজ গর্ব করে বলল
“অবশ্য শিকারী দের কাছে এসব কোনো ব্যাপার ই না। ভাগ্নে ধরে দিস তো একটা”
সাহারা বিদ্রূপ করে হাসলো
“শিকারী ধরতে পারলেও পোষ মানাতে পারবে না। আসছে বিশ্ববিখ্যাত শিকারী রা”
তাদের হাসি-ঠাট্টার মাঝেই পেরিয়ে গেল অনেকটা পথ। দূরে কালো অন্ধকারের মধ্যে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল একটা বিশাল অবয়ব। ভগ্নপ্রায় পুরোনো বাংলো। অর্ধেক ছাদ ভেঙে পড়েছে। জানালাগুলো ফাঁকা চোখের কোটরের মতো অন্ধকার। দেয়াল জুড়ে বুনো লতা। চাঁদের আলোয় জায়গাটাকে মনে হচ্ছে মৃত কোনো দৈত্যের কঙ্কাল। তিনজনই থেমে গেল। মেহরাবের মুখ মুহূর্তেই গম্ভীর হয়ে উঠল। আলীরাজ তলোয়ারের হাতলে হাত রাখলো। সাহারা ফিসফিস করে বলল,
"এই জায়গাটার পাশেই ঈগলটাকে পেয়েছিলাম।"
মেহরাব আলীরাজ কে বলল
“তোমার মনে আছে? সেদিন এ পথেই এসেছিলাম আমরা সেই ডাকাত দলকে তাড়া করে”
“বেশ মনে আছে, সেদিন তো ওর বোনের সাথেও দেখা হলো বল”
সাহারা ভ্রু কুচকে তাকায়
“আমার কোন বোন?”
“নাম বলেছিল শাখা নেওয়াজ”