ফন্ট সাইজ:
থিম:
রক্তমুকুট

23

লেখক: জান্নাতুল ফেরদৌস

মাথার ভেতর যেন কেউ ভারী হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করছে। কান দুটো ঝিমঝিম করছে। বুকের ভেতর শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। মেহরাব ধীরে ধীরে চোখ খুলল। চারপাশে বিদঘুটে অন্ধকার, নিজের হাতও দেখা যায় না। বাতাস ভারী। স্যাঁতসেঁতে গন্ধে পুরো ঘর ভরে আছে। পুরোনো কাঠ, পচা মাটি, মরিচা ধরা লোহার গন্ধ আর কোথাও যেন ছত্রাকের কটু দুর্গন্ধ। মাথার উপর থেকে টুপ টুপ করে পানি পড়ছে। প্রতিটি ফোঁটার শব্দ নীরবতার মাঝে অস্বাভাবিক জোরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। মেহরাব নড়তে গেল, পারল না। তার দুই হাত শক্ত করে পিছনের দিকে টেনে বাঁধা। মোটা চামড়ার বেল্ট আর লোহার শিকল দিয়ে কবজি আটকে দেওয়া হয়েছে কাঠের বিশাল এক চেয়ারের সাথে। বুকের উপর দিয়ে আরেকটি চামড়ার ফিতা টেনে আটকানো। কোমরও বাঁধা। দুই পায়ের গোড়ালিতে লোহার বৃত্ত। সেই বৃত্ত থেকে মোটা শিকল নেমে গেছে মেঝের সাথে। একবার জোরে টান দিতেই ঝনঝন! করে লোহার শিকল কেঁপে উঠল।

মেহরাব ঠোঁট শক্ত করল। অন্ধকারের সাথে চোখ অভ্যস্ত হতে কয়েক মুহূর্ত লাগল। তারপর অস্পষ্টভাবে দেখতে পেল ঘরটা বিশাল। পাথরের তৈরি গোলাকার কক্ষ। দেয়ালে জায়গায় জায়গায় শ্যাওলা জন্মেছে। বহু বছরের আর্দ্রতায় পাথরগুলো কালচে হয়ে গেছে। মাথার অনেক ওপরে ছোট্ট একটা বায়ু চলাচলের ফাঁক। সেখান দিয়ে একফোঁটা আলোও আসছে না। দিন না রাত বোঝার উপায় নেই। চারপাশে পুরোনো কাঠের বাক্স। কিছু ভাঙা খাঁচা। মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে মোটা দড়ি। লোহার যন্ত্রপাতি। কিছু অদ্ভুত আকৃতির ধাতব বস্তু, যেগুলো আগে কখনও দেখেনি সে। এক কোণে রক্তের শুকনো কালচে দাগ। দেয়ালে নখের আঁচড়। কেউ যেন মরিয়া হয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করেছিল। মেহরাবের চোখ মুহূর্তেই তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল।

"এটা সাধারণ বন্দিশালা নয়। বলা যায় এক প্রকার টর্চার সেল"

হঠাৎ ডানদিকে নজর গেল। আর তার বুক ধক করে উঠল। সাহারা কয়েক হাত দূরে আরেকটা চেয়ারে বাঁধা। মাথা কাত হয়ে ঝুলে আছে। সোনালি চুল এলোমেলো হয়ে মুখ ঢেকে ফেলেছে। দুই হাত পিছনে বাঁধা। কোমর, বুক, হাঁটু সব জায়গায় চামড়ার বেল্ট। পায়ের নিচে লোহার শিকল। মুখে প্রাণের কোনো চিহ্ন নেই। মেহরাবের গলা অনিচ্ছা সত্ত্বেও ভারী হয়ে এল।

"সাহারা..."

কোনো সাড়া নেই। আরও জোরে ডাকল।

"সাহারা!"

সে মাথা ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকাল। আলীরাজও একইভাবে বাঁধা। মাথার পাশে শুকিয়ে যাওয়া রক্ত। মনে হচ্ছে পড়ে যাওয়ার সময় কোথাও আঘাত পেয়েছে। মেহরাব এবার দাঁত চেপে ধরল।

মনে করার চেষ্টা করল শেষ কী হয়েছিল?

বাঙলোর সামনে তাদের আলোচনার সময়ে ঘন সাদা ধোঁয়ায় চারদিক মুহূর্তে ঢেকে গিয়েছিল। শ্বাস নেওয়া যাচ্ছিল না। আলীরাজ আর সাহারা কাশছিল। এরপর আর কিছুই মনে নেই। মেহরাব চোখ বন্ধ করল।

"অর্থাৎ আমাদের জীবিত অবস্থায় ধরাই ছিল উদ্দেশ্য”

তার মানে কেউ তাদের অনেক আগে থেকেই অনুসরণ করছিল এবং খুব পরিকল্পনা করেই।

সে আবার হাত নাড়ল। শিকল নড়ল কিন্তু খুলল না। মেহরাবের ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত একটা হাসি ফুটে উঠল।

"শিকারী কে বেধেছে শালারা। শালা কাপুরুষের দল। এসব বালছালের বাঁধন আমি গুনি নাকি?”

ডান হাতের কবজি বাঁকিয়ে আনল। চামড়ার বেল্ট এত শক্ত করে বাঁধা যে রক্ত চলাচল প্রায় বন্ধ। কবজি ঘষে ঘষে জ্বালা করছে। কবজির ভেতরের দিকে লুকানো চামড়ার সরু ব্রেসলেটটায় আঙুল ছুঁল। মেহরাবের ব্যক্তিগত অস্ত্র। অনেকেই দেখেছে। কিন্তু এর ভেতরের রহস্য জানে না। আঙুলের নখ দিয়ে ছোট্ট একটা চাপ দিতেই টিক করে ব্রেসলেটের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল চিকন, সরু, ধারালো এক ফলক।

আঙুলের থেকেও সরু। কিন্তু ভয়ংকর ধার। মেহরাব শ্বাস আটকে রাখল। হাত সামান্য নড়ালেই ফলাটা নিজের চামড়া কেটে দিতে পারে।

খুব সাবধানে চামড়ার বেল্টের গায়ে ফলাটা বসাল। ঘষতে শুরু করল। চামড়া এত মোটা যে সহজে কাটছে না। কবজির উপর ঘাম জমে গেছে। হাত অবশ হয়ে আসছে। চামড়ার বেল্টে ফাটল ধরল টানেই। টান দিতেই বেল্টটা কেটে গেল। ডান হাত মুক্ত। সে ধীরে ধীরে হাত বের করল। রক্ত চলাচল ফিরতেই কবজিতে তীব্র ব্যথা শুরু হলো। মুষ্টি খুলল, বন্ধ করল, আবার খুলল।

তারপর বাম হাতের বাঁধন কাটতে শুরু করল।

অল্প সময়ের মধ্যেই দুই হাতই মুক্ত। এরপর কোমরের বেল্ট। তারপর পায়ের শিকল। সব খুলে উঠে দাঁড়াতেই কয়েক মুহূর্ত মাথা ঘুরে উঠল।

এতক্ষণ একই ভঙ্গিতে বসে থাকার কারণে পা অবশ। তবুও নিজেকে সামলে নিল। প্রথমেই ছুটে গেল সাহারার কাছে। মাথার সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। চুল সরিয়ে দিল মুখ থেকে। নাকের কাছে হাত নিয়ে শ্বাস পরীক্ষা করল। মৃদু, কিন্তু আছে।

বুকের ভেতর অজান্তেই জমে থাকা চাপা উদ্বেগ কিছুটা নেমে গেল।

"বনবিড়াল! অ্যাই তোমাকে চুপচাপ ভালো লাগছে না একদমই।"

কোনো উত্তর নেই। মেহরাব দ্রুত তার হাতের বাঁধন কাটতে শুরু করল। বাধন মুক্ত হলেও জ্ঞান ফিরল না সাহারার।

মেহরাব প্নিজের বুকটা ভরে নিঃশ্বাস নিল।

বাতাসে এক ধরনের স্যাঁতসেঁতে, পচা গন্ধ। বহুদিন সূর্যের আলো ঢোকেনি এমন কোনো জায়গার গন্ধ। তার সঙ্গে মিশে আছে কাঠের ধুলো, পুরোনো রক্তের লোহাটে গন্ধ আর ছত্রাকের গন্ধ।

যে মানুষ এভাবে বেঁধেছে, সে বন্দি পালানোর সব কৌশল জানে। মেহরাব নিচু হয়ে আলীরাজের মুখে চাপড় দিল।

"আলীরাজ!"

কোনো সাড়া নেই। আরও জোরে ঝাঁকুনি দিল।

"এই! ওঠ!"

আলীরাজের ভ্রু কেঁপে উঠল। তারপর মুখ বিকৃত করে ককিয়ে উঠল,

"উফফ... কে রে? মরতে দিল না...এদের জ্বালায় মরেও শান্তি নাই”

চোখ খুলতেই সে প্রথমে ছাদের দিকে তাকাল।

তারপর মেহরাবকে দেখে বলল,

"আমরা জান্নাতে নাকি?"

মেহরাব নির্বিকার।

"না। এখনও বেঁচে আছো।"

আলীরাজ দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

"ধুর! ভাবছিলাম এত কষ্টের পর অন্তত একটু আরাম পাব।"

মেহরাব বিরক্ত হয়ে বলল,

"তুই কি একটুও সিরিয়াস হতে পারিস না?"

“ও মাআআআআ, এর মধ্যেই ইনজিরি বলছিস দেখি”

সে নিজের বাঁধনের দিকে তাকাল।

"এগুলো খুলে দে আগে।"

মেহরাব কবজির ভেতরে লুকিয়ে রাখা ক্ষুদ্র ছুরিটা দিয়ে দ্রুত চামড়ার বেল্টগুলো কেটে দিল।

মুক্ত হয়েই আলীরাজ দুই হাত ঘষতে লাগল।

"হাত দুটোই অবশ হয়ে গেছে।”

মেহরাব ইতোমধ্যে সাহারার সামনে গিয়ে বসেছে।

মেয়েটা অস্বাভাবিক নিস্তেজ। মাথাটা একদিকে কাত হয়ে আছে। মুখটা ফ্যাকাশে। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে গাল ঢেকে দিয়েছে। মেহরাব কপালে হাত রাখল। জ্ঞান ফিরছে না কেন?

সে নিচু স্বরে ডাকল,

"সাহারা..."

কোনো সাড়া নেই।

আরেকটু কাছে ঝুঁকে বলল,

"বনবিড়াল..."

আলীরাজ এগিয়ে এসে বলল,

"একটু পানি থাকলে ভালো হতো।"

মেহরাব চারদিকে তাকাল। ঘরে কোথাও পানির চিহ্নও নেই। সে আবার সাহারার গালে হালকা চাপড় দিল।

"সাহারা... শুনতে পাচ্ছো?"

এবার মেয়েটার চোখের পাতা সামান্য কাঁপল।

খুব ধীরে ঠোঁট নড়ল।

"...মেহ...রাব..."

শব্দটা এত ক্ষীণ যে না শুনলেও চলত। মেহরাব স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।

"এই তো। চোখ খোলো।”

পিট পিট করে সাহারা চোখ খুলল। সব ঝাপসা লাগছে। তারপর মেহরাবের মুখটা স্পষ্ট হলো।

কিছুক্ষণ স্থির তাকিয়ে থেকে বিড়বিড় করে বলল,

"আমরা... কোথায়?"

"সেটাই তো জানতে হবে।"

মেহরাব দ্রুত তার হাত-পায়ের বাঁধন কেটে দিল।

মুক্ত হয়েই সাহারা উঠে বসতে গেল। কিন্তু মাথা ঘুরে আবার বসে পড়ল।

আলীরাজ বলল,

"আস্তে। ধোঁয়াটা নিশ্চয়ই বিষাক্ত ছিল।"

মেহরাব এবার পুরো ঘরটা খুঁটিয়ে দেখতে শুরু করল। কোনো দরজা? হ্যাঁ। একটা আছে।

কিন্তু বাইরে থেকে মোটা লোহার শিকল লাগানো।

ধাক্কা দিল। একটুও নড়ল না। দেয়াল হাতড়ে দেখল। কোথাও কোনো গোপন ফাঁক? না। ঘরের এক কোণে কয়েকটা ভাঙা পিপে। কিছু মরিচা ধরা শিকল। আর অনেক উঁচুতে একটা ছোট্ট কাঠের জানালা। জানালাটা প্রায় ছাদের সঙ্গে লেগে আছে। মেহরাব বলল,

"ওখানে ওঠা যাবে?"

আলীরাজ চারদিকে তাকিয়ে একটা উল্টে থাকা পিপে টেনে আনল। তার ওপর আরেকটা।

তারপর দাঁড়িয়ে বলল,

"পারলে তুই ওঠ।"

মেহরাব সাবধানে উঠে দাঁড়াল। হাত বাড়িয়ে কাঠের জানালাটা ধরল। মোটা কাঠ। বাইরেও লোহার পাত বসানো। সে কোমর থেকে ছোট ছুরিটা বের করল। ফাঁকের জায়গায় ঢুকিয়ে চাপ দিল। পুরোনো কাঠ ধীরে ধীরে ফেটে যেতে লাগল। আরেকটু চাপ দিতেই একটা তক্তা ভেঙে খুলে গেল। বাইরের ঠান্ডা বাতাস হু হু করে ভেতরে ঢুকে পড়ল। তিনজনই একসঙ্গে গভীর শ্বাস নিল। মেহরাব বাইরে তাকিয়ে রইল।

তার চোখ বিস্ময়ে বড় হতে লাগল। জানালার ওপারে যতদূর দেখা যায় অসীম জঙ্গল।

ঘন, অচেনা, অন্ধকার সবুজ। বিরাট বিরাট গাছ।

এমন গাছ কাটাগিরিতে নেই। গাছের কাণ্ডে মোটা লতা জড়িয়ে আছে। দূরে কুয়াশার ভেতর পাহাড়ের অস্পষ্ট রেখা। চারদিকে অদ্ভুত সব পাখির ডাক। একটাও পরিচিত নয়। কোথাও সাহাবাদের শুকনো বন নেই। নেই মরুভূমির বাতাস। নেই কাটাগিরির সেই বিশাল শালগাছ।

মেহরাবের কপাল ধীরে ধীরে কুঁচকে গেল।

আলীরাজ নিচ থেকে প্রশ্ন করল,

"কি দেখছো?"

অনেকক্ষণ চুপ থেকে মেহরাব নিচু গলায় বলল,

"এটা... কাটাগিরির জঙ্গল নয়।"

সাহারার বুক ধক করে উঠল।

"তাহলে?"

মেহরাবের চোখ এখনও দূরের অচেনা অরণ্যে স্থির। তার কণ্ঠ ভারী হয়ে এলো।

"আমাদের অনেক দূরে এনে ফেলা হয়েছে।"

ঘরের ভেতর আবার নেমে এলো নিস্তব্ধতা।

তিনজনের মনেই একই প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগল, যারা আনলো তারা এখন কোথায়?

ঘরের স্যাঁতসেঁতে দেয়ালে প্রতিধ্বনি তুলল ভারী বুটের শব্দ। দূর থেকে ভেসে আসছে ক্রমশ কাছে।

মেহরাব বিদ্যুতের মতো জানালার ফাঁক ছেড়ে নিচে নেমে এল। হাত তুলে দুজনকে চুপ থাকার ইশারা করল। এবার স্পষ্ট শোনা গেল। কঠিন ইংরেজি উচ্চারণে কারও গলা। তারপর ধাতব কিছুর ঠোকাঠুকির শব্দ। মেহরাব আবার ধীরে ধীরে জানালার কাছে উঠে উঁকি দিল। তার চোখ মুহূর্তেই সরু হয়ে গেল। বাইরে দুইজন ইংরেজ সৈনিক। পরনে লাল কোট। কাঁধে লম্বা ভারী বন্দুক। কোমরে বেয়নেট। তারা সরাসরি এই ঘরটার দিকেই এগিয়ে আসছে। মেহরাব নিচে নেমেই ফিসফিস করে বলল,

"ইংরেজ সৈন্য।"

সাহারার কণ্ঠ শুকিয়ে গেল।

"এখন?"

মেহরাব এক মুহূর্তও দেরি করল না। চোখ দিয়ে পুরো ঘরটা মেপে নিল। তারপর দরজার ডান পাশে গিয়ে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়াল। হাতে শক্ত করে ধরল কাঠের একটা মোটা গুঁড়ি।

"দরজা খুলেই ওরা সামনে এগোবে"

আলীরাজ বুঝে গেল। দ্রুত ঘরের অপর প্রান্তে ছুটে গেল। সেখানে অন্ধকারে ছুঁড়ে ফেলা ছিল বিশাল একটা মাছ ধরার জাল। মোটা দড়িতে বোনা। সম্ভবত নদী থেকে মাছ ধরার কাজে ব্যবহার করা হয়। সে জালটা টেনে এনে কাঁধে তুলে নিল। মুখে দুষ্টু হাসি।

"আজ বানর ধরব। লাল বিদেশি বানর"

বাইরে চাবি ঘোরানোর শব্দ। কড়াৎ করে দরজা খুলে গেল। প্রথম সৈন্যটা বন্দুক উঁচু করে ভেতরে ঢুকতেই ধাম! করে মেহরাবের হাতে ধরা ভারী কাঠ সরাসরি গিয়ে পড়ল তার মাথায়। লোকটা একটা শব্দও করতে পারল না। মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। দ্বিতীয় সৈন্য বন্দুক তুলতে যাচ্ছিল।

মেহরাব ঝাঁপিয়ে পড়ে তার বুকের ওপর ধাক্কা দিল। দুজনই মেঝেতে গড়িয়ে পড়ল। বন্দুকটা ছিটকে দূরে চলে গেল। লোকটা মুষ্টি চালাতে যাবে ঠিক তখনই আলীরাজ পুরো জালটা ছুঁড়ে মারল। মোটা জাল মুহূর্তেই সৈন্যটার মাথা থেকে পা পর্যন্ত জড়িয়ে ফেলল। সে যত নড়ছে, ততই জালে আরও আটকে যাচ্ছে। মেহরাব সুযোগ বুঝে কনুই দিয়ে ঘাড়ে প্রচণ্ড আঘাত করল।

লোকটার চোখ উল্টে গেল। আলীরাজ হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,

"বাহ! জালটা কাজে দিয়েছে।"

মেহরাব দেরি করল না। দুজন সৈন্যকেই আগের চামড়ার বেল্ট আর দড়ি দিয়ে হাত-পা বেঁধে ফেলল। তারপর টেনে নিয়ে গিয়ে ঘরের এক কোণে ফেলে রাখল। মুখেও কাপড় গুঁজে দিল।

"কিছুক্ষণ অন্তত জ্ঞান ফিরবে না।"

সাহারা তখনও পুরোপুরি শক্তি ফিরে পায়নি।

উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেই আবার দুলে উঠল।

মেহরাব একবার তার দিকে তাকাল।

"হাঁটতে পারবে?"

সাহারা জেদ করে বলল,

"পারব।"

এক পা এগোতেই প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। মেহরাব দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

"উফফফ এখন জেদ করার সময় নয়।"

কথা শেষ করেই এক ঝটকায় তাকে দুই হাতে তুলে নিল পাঁজাকোলা করে। সাহারা বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল।

"এই... আমাকে নামান!"

"চুপ থাকো।"

আলীরাজ পাশ থেকে হেসে বলল,

"বাহ! বনবিড়াল আজ একেবারে বিড়ালছানা হয়ে গেছে রেএএএ।"

সাহারা চোখ রাঙাল।

"আপনি চুপ করবেন?"

"না করলে?"

"আপনাকেই আগে নদীতে ফেলে দেব।"

"বাঁচা মেহরাব! তোর বনবিড়াল কামড়াবে!"

মেহরাব বিরক্ত মুখে বলল,

"চুপ করবে তোমরা?"

আলীরাজ মুখ কালো করে বললল

“কি এক কুত্তা রাশি নিয়ে জন্মেছি। একটা ভাগ্নে বউ ও সম্মান ও দেয় না”

বাইরে বেরিয়েই বুঝল জায়গাটা আরও অদ্ভুত।

ঘন অরণ্যের ভেতর কাঠ আর পাথর দিয়ে বানানো কয়েকটি ছোট ভবন। ধোঁয়া উঠছে তার মিনার দিয়ে। সামনে ইংরেজি লেখা কাঠের ফলক। দূরে আরও সৈন্য টহল দিচ্ছে। মেহরাব নিচু হয়ে ঝোপের আড়াল ধরে এগোতে লাগল।

একবারও পেছনে তাকাল না। তার কানে শুধু পাতা নড়ার শব্দ। কিন্তু সবচেয়ে বড় সমস্যা কোন দিক দিয়ে বেরোবে? এ অরণ্য তাদের চেনা নয়।

সূর্যের অবস্থানও বোঝা যাচ্ছে না। মেহরাব থেমে চারদিকে তাকাল। তারপর বলল,

"অনুমানেই এগোতে হবে।"

তিনজন ঝোপঝাড় ভেঙে এগোতে লাগল।

কতক্ষণ হাঁটল, কারও হিসাব নেই। কলকল পানির শব্দ পাওয়া যায়। আলীরাজ বলল

"নদী!"

ঘন ঝোপ সরাতেই সামনে দেখা গেল প্রশস্ত নদী।

স্বচ্ছ জল ধীর স্রোত। তীরজুড়ে কোমরসমান সবুজ ঘাস। মেহরাব সাবধানে সাহারাকে সেই নরম ঘাসের ওপর শুইয়ে দিল।

"এখানেই থাকো।"

তারপর আলীরাজের দিকে তাকিয়ে বলল,

"পানি নিয়ে এসো।"

আলীরাজ মাথা নেড়ে নদীর দিকে দৌড়ে গেল।

নদীর পাড়ের বাতাসে সাহারার সোনালি চুলগুলো মুখের ওপর এসে পড়ছে। অচেতন নয়, তবুও প্রচণ্ড দুর্বল। চোখ দুটি আধখোলা। শ্বাস-প্রশ্বাস ধীর। মেহরাব হাঁটু গেড়ে তার পাশে বসল। অজান্তেই হাত বাড়িয়ে সাহারার গাল থেকে এলোমেলো চুল সরিয়ে দিল। অস্বাভাবিক ফর্সা গাল। ধুলো লেগে মলিন হয়ে আছে। তার আঙুল খুব ধীরে ছুঁয়ে গেল সেই গাল। মুহূর্তের জন্য যেন সময় থেমে গেল। সে স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল।

কেন যেন চোখ ফেরাতে পারছে না।

তার কঠিন শিকারির চোখে কোমলতা নেমে এলো। দূর থেকে আলীরাজের গলা ভেসে এলো

"পানি পেয়েছি!"

মেহরাব ঘোর ছেড়ে বাস্তবে ফিরে এল।

দ্রুত হাত সরিয়ে নিয়ে স্বাভাবিক মুখে উঠে দাঁড়াল।

আলীরাজ হাঁটু গেড়ে বসে দুহাত ভরে পানি তুলে আনল।

"এই! একটু পানি খাওয়া ওকে।"

মেহরাব খুব সাবধানে সাহারার মাথাটা নিজের বাহুর ওপর তুলে ধরল। মেয়েটার ঠোঁট শুকিয়ে সাদা হয়ে গেছে। চোখের পাতাগুলো ভারী।

মেহরাব হাতের তালুতে অল্প পানি নিয়ে তার ঠোঁটে ছুঁইয়ে দিল। কয়েক ফোঁটা পানি মুখে যেতেই সাহারার ভ্রু কেঁপে উঠল। মেহরাব হালকা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।

"মাথা ঘুরছে?"

সাহারা ধীরে মাথা নেড়ে বলল,

"একটু।"

"জোর করে উঠবে না।"

সে আবার সাহারাকে নরম ঘাসের ওপর হেলান দিয়ে বসিয়ে দিল।

"মনে হচ্ছে পেটগুলো বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে।"

সত্যিই তাই। শেষ কখন তারা ঠিকমতো খেয়েছে, কারও মনে নেই। রাতভর অভিযান। তারপর বন্দি। এখন শরীরে আর শক্তি নেই। আলীরাজ উঠে দাঁড়াল। চারদিকে একবার তাকিয়ে বলল,

"তোমরা এখানেই থাকো।"

মেহরাব তাকাল।

"কোথায় যাচ্ছো?"

"দেখি কিছু খাবার সংগ্রহ করতে পারি কিনা। খাবার না আনলে তিনজনেই এখানে বসে ঘাস চিবাতে হবে।"

বলেই সে কোমরের ছোট ছুরিটা ঠিক করে নিল।

"আমি ফলমূল খুঁজে আনি। নদী আছে, জঙ্গল আছে। কিছু না কিছু নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে।"

মেহরাব মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।

"সাবধানে।"

"চিন্তা করো না।"

কিছুক্ষণের মধ্যেই ঝোপের আড়ালে মিলিয়ে গেল আলীরাজ।

সাহারা আর মেহরাব বসে রইল নদীর পাড়েই। আকাশে কালো করে মেঘ সেজেছে। চারপাশ দিনের বেলাই অন্ধকার হয়ে গেছে। সাহারা চারিদিকে দেখতে দেখতে আচমকাই চোখ গেল পাইন গাছ গুলোর দিকে। ঘণ পাইম বন থেকে গড়গড় শব্দ করে বেড়িয়ে আসছে কিছু বিকৃত জন্তু। আদৌ মানুষ কিনা তা বোঝার উপায় নেই। মুখ দিয়ে লালা ঝড়ছে। একে একে কত্তগুলো বের হলো। সাহারা ভয়ে ভয়ে ইশারা করে মেহরাব কে দেখাতেই মেহরাব দ্রুত উঠলো। সাহারা কে নিয়ে লুকিয়ে পড়ল একটা ঝোপের আড়ালে। তারা নাক দিয়ে শুকছে যেন কিছু। দুজনে দম আঁটকে বসে রইল।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে 23 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন