আর মাত্র পাঁচ দিন পরই সাহাবাদ মহলে বিয়ের আয়োজন। কিন্তু সেই আনন্দের মহলেই হঠাৎ নেমে এলো অশনি সংকেত। সাহারা নেই আজ ৪ দিন হতে চলল। প্রথম দিন সবাই ভেবেছিল, হয়তো আবার কোনো দুঃসাহসিক কাণ্ড করে বাইরে গেছে। সন্ধ্যার পরও যখন ফিরল না, তখন সকলেই চিন্তিত হয়ে পড়ল। দ্বিতীয় দিন পেরিয়ে গেল। তবুও সাহারার কোনো খবর নেই।
মহল, বাগান, আস্তাবল, আশপাশের পথ সবখানে খোঁজ চালানো হলো। প্রহরীরা নগরের অলিগলি পর্যন্ত তন্নতন্ন করে দেখল। জঙ্গলের কাছেও লোক পাঠানো হলো। কোথাও নেই। সুনেহেরার মাথা ফেটে যাচ্ছে দুশ্চিন্তায়
"আমার মেয়েটা কোথায় গেল?"
মেহেরুন্নেসার চোখেও ঘুম নেই। জান্নাতের অবস্থা আরও করুণ। বিয়ের প্রস্তুতি চলছে, অথচ তার মন পড়ে আছে ছোট বোনটার কাছে। কোথায় গেল মেয়েটা? দুশ্চিন্তায় পাগল প্রায় সে। কাঁদতে কাঁদতে বলল সে।
"ওর কিছু হয়েছে নাকি আম্মা?"
কেউ উত্তর দিতে পারল না। ঠিক তখনই আরও ভয়ংকর একটি সংবাদ এসে পৌঁছাল। আমিরাবাদের যুবরাজ মেহরাবও নিখোঁজ। সেই একই রাত থেকে। খবরটা ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগল না। নগরের দোকান থেকে বাজার, বাজার থেকে মহল সবখানে শুরু হলো ফিসফাস।
"শুনেছিস?"
"কি?"
"আমিরাবাদের যুবরাজ নাকি নিখোঁজ।"
"আর সাহাবাদের ছোট শাহজাদীও! দুটো ঘটনা একই রাতে ঘটেছে।"
আরেকজন চোখ বড় বড় করে বলল,
"তাহলে কি..."
কথাটা শেষ করল না। কিন্তু গুজবের তো মুখ বন্ধ থাকে না। কিছুক্ষণের মধ্যেই এ খবর ছড়িয়ে পড়ল। সম্রাটপুত্র নাকি সাহাবাদের শাহজাদী সাহারা জাহ্নবীকে নিয়ে পালিয়েছে। কেউ বলল প্রেমের কারণে, সাহাবাদের সঙ্গে আমিরাবাদের গোপন সম্পর্ক ছিল। কয়েক শ্রেণি আবার আরও এক ধাপ এগিয়ে বলল
“রাজ্যের প্রসারণের জন্য জমিদার নিজের কন্যা কে যুবরাজ এর গলায় ঝুলিয়ে দিয়েছে। তাই বিয়ের আগেই মেয়েটাকে নিয়ে পালিয়েছে যুবরাজ!"
কথাগুলো ঠিকই বাইজিদ শাহের কানে পৌঁছাল, তিনি যেন পাথর হয়ে গেলেন। তার সম্মান তার বংশের সম্মান সাহাবাদের সম্মান। সবকিছু যেন প্রশ্নের মুখে। মুষ্টিবদ্ধ হাত টেবিলের ওপর রেখে তিনি কঠিন গলায় বললেন,
"যতক্ষণ আমার মেয়ে ফিরে না আসছে, কেউ কোনো গুজবের উত্তর দেবে না।"
কিন্তু গুজব কি আদেশ মানে? মহলের বাইরে মানুষের মুখে মুখে তখন শুধু সাহারা আর মেহরাবের নাম। দিন গড়িয়ে গেল। আর মাত্র তিন দিন বাদে জান্নাতের বিয়ে। মহলের অন্দরে বিয়ের জন্য কাপড়, গয়না, খাবারের আয়োজন চলছে। কিন্তু যার বিয়ে, সেই জান্নাতের এক ফোটাও আনন্দ নেই। মন খারাপ করে জানালার পাশে বসে আছে। চোখ বারবার দরজার দিকে চলে যাচ্ছে। যদি সাহারা হঠাৎ এসে দাঁড়ায়। দরজা খুলে বলে
"আপা, আমি এসে গেছি!"
জান্নাতের চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
"তুই কোথায় গেলি সারা?"
এই দুরন্ত মেয়েটা ছাড়া মহলটা যেন প্রাণহীন।
আর মেহরাব? তারও কোনো খবর নেই। জান্নাত জানে না কেন, কিন্তু যুবরাজের নিখোঁজ হওয়ার খবরটাও তার মনে অদ্ভুত এক ভয় তৈরি করেছে।
যে রাতে ওরা নিখোঁজ হলো সে রাতে মেহরাব এর সাথে দেখা হয়েছিল জান্নাতের। মহল ওবদি পৌছেও দিয়ে গেল। তারপর কোথায় গেল যুবরাজ?
****
সাহাবাদ থেকে বহু দূরে। গভীর অরণ্যের বুকের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে ইংরেজ দের গোপন ফরেস্ট হাউস। বাইরে ঘন কুয়াশা। চারপাশে উঁচু গাছের সারি। দূরে পাহারারত ইংরেজ সৈন্যদের অবয়ব দেখা যায়। ভেতরে বন্দি তারা তিনজন। মেহরাব, সাহারা আর আলীরাজ। হাত বাঁধা, পায়ে শিকল।
তাদের আগের পালানোর পর এবার ইংরেজরা আর কোনো সুযোগ রাখেনি। ঘরের এক কোণে সাহারা দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছে।
চোখেমুখে ক্লান্তি। আলীরাজ নিচু গলায় বলল,
"এবার মনে হচ্ছে আমাদের ভাগ্যে জঙ্গলেই কবর লেখা আছে।"
মেহরাব দেয়ালের সঙ্গে হেলান দিয়ে বসে রইল।
চোখ দুটো বন্ধ। কিন্তু মাথার ভেতর একের পর এক হিসাব চলছে। এই ঘর থেকে বের হওয়ার পথ।
সাহারা মলিন স্বরে বলল
"যুবরাজ"
সে চোখ খুলল।
"কি?"
সাহারা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
"আজ কতদিন হলো?"
মেহরাবের মুখ কঠিন হয়ে গেল। সে হিসাব করল। তারপর বলল,
"তিন দিন।"
সাহারার বুক কেঁপে উঠল।
"তিন দিন?”
তার চোখের সামনে ভেসে উঠল সাহাবাদ মহল।
জান্নাত আপার মুখ খানা। বিয়ের আয়োজন চলে মহলে। মনে পড়ল আর মাত্র তিন দিন পর জান্নাতের বিয়ে। সাহারার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
"আপার বিয়ে”
মেহরাবও স্থির হয়ে গেল। আলীরাজ তাকাল দুজনের দিকে। কেউ কিছু বলল না। বাইরে অরণ্যের ওপর দিয়ে বাতাস বয়ে যাচ্ছে। কক্ষে কয়েকটা খাঁচ কাটা জানালা দিয়ো হু হু করে বাতাস ঢোকে।
*****
রাত তখন গভীর। ফরেস্ট হাউসের বিশাল ভবনটা যেন অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো মৃত প্রাসাদ। চারপাশে ঘন জঙ্গল। দূরে ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা ডাক, আবার কখনো অচেনা কোনো পাখির কর্কশ আওয়াজ। অথচ বাড়িটার ভেতরে অস্বাভাবিক নীরবতা। মেহরাবের চোখ খুলে গেল। প্রথম কয়েক মুহূর্ত সে বুঝতেই পারল না কোথায় আছে। মাথাটা ভার হয়ে আছে। শরীরের প্রতিটি অস্থিসন্ধিতে ক্লান্তি। হাত দুটো শক্ত করে বাঁধা। পিঠ দেয়ালে ঠেকানো। সে নড়েচড়ে বসার চেষ্টা করল। শিকলটা কেঁপে উঠল। মেহরাব দাঁত চেপে চোখ বন্ধ করল। নিজের কব্জির দিকে তাকাল। কিছুক্ষণ আগেই সে বুঝেছিল, বাঁধনটা আগের মতো শক্ত নেই। শরীরের ওজন সামান্য একদিকে সরিয়ে আবার চেষ্টা করতেই বাঁধনের ফাঁকটা একটু ঢিলে হলো।
তার চোখে ক্ষীণ আশার ঝিলিক দেখা দিল।
অনেক কষ্টে হাতটা বের করে আনল সে। মেহরাব সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল না। কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইল। বাইরে কোনো শব্দ আছে কিনা শুনতে লাগল। কিছুই নেই। ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। পা দুটো অবশ হয়ে এসেছে। কয়েকবার শরীরটা সামলে নিয়ে দরজার কাছে এগিয়ে গেল।
দরজাটা অল্প ফাঁক। মেহরাব ভ্রু কুঁচকাল। এতক্ষণে তার মনে হলো অস্বাভাবিক কিছু একটা হয়েছে। সে ধীরে দরজা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে এল। করিডোরটা অন্ধকার। দেয়ালের দুপাশে পুরোনো তেলের বাতি ঝুলছে, কিন্তু একটাতেও আগুন নেই। বাতাসে স্যাঁতসেঁতে কাঠের গন্ধ। কোথাও কোথাও দেয়ালের প্লাস্টার খসে পড়েছে। মেঝের ওপর ধুলোর আস্তরণ। মেহরাব পায়ের শব্দ যতটা সম্ভব কমিয়ে এগোতে লাগল।
একটা কক্ষ দেখল ফাঁকা। আরেকটা কক্ষের সামনে গেল সেখানেও কেউ নেই। তৃতীয় কক্ষের দরজা অর্ধেক খোলা। ভেতরে ঢুকতেই মেহরাব থেমে গেল। একটা বিশাল টেবিল। তার ওপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অদ্ভুত সব যন্ত্রপাতি। কাঁচের নল, ধাতব সরঞ্জাম, ছোট ছোট বোতল, কাঁচের পাত্র, অচেনা যন্ত্র। কিছু যন্ত্রের গায়ে ইংরেজি অক্ষরে কিসব লেখা। মেহরাবের চোখ সরু হয়ে এল। এখানে কিছু একটা করা হয়।
সে ধীরে ধীরে টেবিলটার কাছে এগিয়ে গেল।
এক পাশে কয়েকটি মোটা খাতা। কিছু কাগজে অদ্ভুত নকশা, সংখ্যার সারি। মানুষের শরীরের আঁকা ছবি। মেহরাব একটা কাগজ তুলে নিতেই হঠাৎ তার দৃষ্টি নিচের দিকে আটকে গেল। কক্ষের এক কোণে কয়েকটি ছোট কাঠের বাক্স। তার মধ্যে অস্বাভাবিক ছোট কিছু হাড়ের অবয়ব। মেহরাবের মুখের রঙ বদলে গেল।
সে আর কাছে গেল না। চোখ সরিয়ে নিল। বুকের ভেতরটা কেমন ভার হয়ে উঠেছে।
"আল্লাহ..."
তার ঠোঁট থেকে খুব নিচু স্বরে শব্দটা বেরিয়ে এল। এই জায়গায় নবজাতকদের নিয়ে কোনো ভয়ংকর গবেষণা চলছে? মেহরাব আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না।
কক্ষ থেকে বেরিয়ে এল সে। কিন্তু বেরোতেই নাকে এল অদ্ভুত একটা গন্ধ। কেমন যেন রাসায়নিক, স্যাঁতসেঁতে আর পচা গন্ধের মিশ্রণ। মেহরাব নাকের কাছে হাত তুলল। বিভৎস গন্ধে মুখ বাকালো। এই বাড়িটা আসলে কী? কেন এত গোপন কক্ষ? এত সরঞ্জাম? আর সবচেয়ে বড় কথা ইংরেজরা সবাই কোথায় গেল? সে আবার করিডোর ধরে এগিয়ে চলল। একটার পর একটা দরজা। খালি কাঠের বাক্স, কোথাও কাগজের স্তূপ কি সব যন্ত্রপাতি। মেহরাব বুঝতে পারছিল এখানে বহুদিন যাবৎ এই কাজ গুলো করা হচ্ছে। এর অস্তিত্ব হয়তো সাহাবাদের কেউই জানে না।
হঠাৎ একটা বড় কক্ষের দরজার সামনে এসে থামল সে। দরজাটা অন্যগুলোর চেয়ে অনেক বড়। মেহরাব হাত বাড়িয়ে ধীরে ধীরে ঠেলে দিল।
কড়ররর শব্দে দরজাটা খুলতেই বিশাল কক্ষটা তার সামনে উন্মুক্ত হলো। মাঝখানে বড় টেবিল।
টেবিলজুড়ে নানা রকম সরঞ্জাম। কিন্তু মেহরাবের দৃষ্টি এবার আটকে গেল টেবিলের ঠিক বিপরীত দেওয়ালে। সেখানে ঝোলানো একটা বিশাল তৈলচিত্র। একজন নারী র ছবি। অভিজাত পোশাক পরা। গলায় ভারী অলংকার। মাথায় পুরোনো রাজপরিবারের ধাঁচের মুকুটসদৃশ অলংকার। চোখ দুটো অদ্ভুত তীক্ষ্ণ। ঠোঁটে খুব সামান্য হাসি। মেহরাব স্থির হয়ে গেল। কেন যেন মুখটা তার চেনা লাগছে। কোথায় দেখেছে? কোথায়? সে ধীরে ধীরে ছবিটার কাছে এগিয়ে গেল। চোখ সরাতে পারছে না। হঠাৎ স্মৃতির ভেতর যেন বিদ্যুৎ ঝলকে উঠল। সাহাবাদ মহল! হ্যা হ্যা সাহাবাদ মহলের বৈঠক ঘরেরদেয়ালে ঝোলানো অসংখ্য তৈলচিত্রের মধ্যে এই নারীর মুখ দেখেছে সে। মেহরাবের চোখ বড় হয়ে গেল।
মনে পড়তেই বুকের ভেতর কেমন ধাক্কা খেল।
সাহাবাদ মহলে এই নারীর ছবি কেন? আর তারই ছবি কেন এই ইংরেজদের গোপন ফরেস্ট হাউসে? মেহরাবের চোখ ছবির নিচের অংশে গেল। সেখানে খুব ছোট করে কিছু লেখা। ধুলো জমে থাকায় পুরোটা স্পষ্ট নয়। সে হাত বাড়িয়ে ধুলো সরাল। একটি নামের কয়েকটি অক্ষর ফুটে উঠল। মেহরাবের কপালে ভাঁজ পড়ল। তারপর হঠাৎ পিছনের করিডোর থেকে থকথক শব্দ আসে। মেহরাব জমে গেল। কারও উপস্থিতি টের পেতেই ছবি খানা ফ্রেম থেকে খুলতে শুরু করল। দ্রুত ছবিটা ছাড়িয়ে গোল করে ভাজ করতে করতে চলে গেল তাদের বন্দি ঘরের দিকে।
*****
পরদিন জান্নাতের গায়ে হলুদ। ঘটা করে কোনো আয়োজন হচ্ছে না। বাইরের কাউকে জানানোও হয়নি। ঘরোয়া পরিবেশেই বড় মেয়ের বিয়ের আগের এই ছোট্ট আয়োজনটা করবে সাহাবাদ মহল।সকাল থেকেই অন্দরমহলে ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেছে। হলুদ বাটা হচ্ছে। রান্নাঘরে মিষ্টির আয়োজন চলছে। একপাশে হলুদ গেসলের জন্য সাজানো হচ্ছে। সুনেহেরা সারারাত ঘুমাতে পারেননি। জান্নাতের বিয়ে যত এগিয়ে আসছে, ততই তার বুকের ভেতরটা ভার হয়ে উঠছে। একদিকে মেয়ের জীবনের নতুন অধ্যায়, অন্যদিকে ছোট মেয়ের কোনো খোঁজ নেই।
ভোরের আলো ফুটতেই আর ঘরে বসে থাকতে পারলেন না তিনি।বসাদা ওড়নাটা মাথায় টেনে নিলেন। কাউকে বিস্তারিত কিছু না বলেই বেরিয়ে পড়লেন। প্রথমেই যাবেন জঙ্গলের দিকে।
সাহারাকে যারা চেনে, তারা জানে মেয়েটার সঙ্গে জঙ্গলের সম্পর্কটা অদ্ভুত। সাহারা কয়েক প্রহরও কাটিয়েছে একসাথে জঙ্গলে। পাখি, পশু, গাছপালা সবকিছুর মধ্যেই যেন তার নিজের একটা জগৎ আছে। তাই সুনেহেরার প্রথম সন্দেহও সেখানেই। ঘোড়ায় চড়ে জঙ্গলের পথে ঢুকতেই সকালের কুয়াশা পাতলা হয়ে আসছিল। গাছের পাতায় রাতের শিশির জমে আছে। আগের রাতের বৃষ্টির পানি পাতার ডগা থেকে টুপটাপ করে পড়ছে। সুনেহেরা চারপাশে তাকাতে তাকাতে এগোচ্ছেন।
"সাহারা..."
ডাকলেন জোরে করে, কোনো উত্তর নেই। আরও কিছুদূর গিয়ে আবার ডাকলেন।
"সারা!"
নীরব জঙ্গল। শুধু দূরে কোনো পাখির ডাক।
তিনি ঘোড়া থেকে নেমে পড়লেন। মাটির দিকে তাকিয়ে হাঁটতে লাগলেন। হয়তো কোনো চিহ্ন পাওয়া যাবে। হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল একটা ঝোপের পাশে। মাটির ওপর ছোট্ট কিছু একটা পড়ে আছে। সুনেহেরা ঝুঁকে সেটা তুলে নিলেন। এক জোড়া নুপুরের এক পাটি। চেনার জন্য দ্বিতীয়বার তাকানোর প্রয়োজন হলো না।
এটা সাহারার। তার হাত কেঁপে উঠল।
"সারা..."
নুপুরটা মুঠোর মধ্যে শক্ত করে ধরে চোখ বন্ধ করলেন তিনি। তাহলে সাহারা এখানে এসেছিল। কিন্তু কোথায় গেল? কেন গেল? কার সঙ্গে গেল? নুপুরটা কি দুর্ঘটনাবশত খুলে পড়েছে?
নাকি…? সুনেহেরা আর দেরি করলেন না।
নুপুরটা আঁচলের ভাঁজে রেখে আবার এগিয়ে গেলেন। কিছুদূর যেতেই জঙ্গলের মাটি আরও নরম হয়ে এসেছে। আগের রাতের বৃষ্টিতে জায়গাটা কাদামাটিতে পরিণত হয়েছে।
সেখানেই চোখে পড়ল অদ্ভুত কিছু দাগ।
চাকার দাগ। সুনেহেরা থেমে গেলেন। একটু ঝুঁকে মাটিটা দেখলেন। দাগগুলো বেশ গভীর। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এটা কোনো সাধারণ গরুর গাড়ির চাকার দাগ নয়। ঘোড়ার গাড়িও নয়।
চাকার আকৃতিটা অদ্ভুত। যেন ভারী কোনো গাড়ি ভেজা মাটির ওপর দিয়ে গেছে। পাশাপাশি দুটো সরু চাকার রেখা। মাঝে দূরত্বও বেশ বেশি। সুনেহেরা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলেন।
"এটা আবার কিসের?"
তার মনে সন্দেহ জাগল। সাহারা যদি এই পথে এসে থাকে, তবে এই গাড়ির সঙ্গে কি তার কোনো সম্পর্ক আছে? নাকি অন্য কেউ তাকে...চিন্তাটা শেষ করতে পারলেন না। চাকার দাগগুলো জঙ্গলের আরও গভীরে চলে গেছে। সুনেহেরা ঘোড়ায় উঠলেন। চিহ্ন হারিয়ে যাওয়ার আগেই অনুসরণ করতে হবে। জঙ্গল ক্রমশ ঘন হতে লাগল। কিছুক্ষণ পর প্রথম জঙ্গল শেষ হলো।
কিন্তু চাকার দাগ শেষ হলো না। সামনে আরও একটা জঙ্গল। এই জঙ্গলটা তাদের অচেনা।
গাছগুলো অনেক উঁচু। পথ প্রায় নেই বললেই চলে। কোথাও কাঁটাঝোপ, কোথাও নিচু জলাভূমি। দিনের আলোও ঠিকমতো মাটিতে পৌঁছাতে পারছে না। সুনেহেরা একবার থামলেন।
ফিরে যাবেন? না। সাহারার নুপুরটা এখনও তার আঁচলে। মেয়েটা যদি সত্যিই এই পথে এসে থাকে, তাহলে তাকে খুঁজে না নিয়ে তিনি ফিরবেন না।
চাকার দাগ অনুসরণ করে আবার এগিয়ে চললেন। সময় গড়িয়ে গেল। সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ল। তারপর ধীরে ধীরে চারপাশ অন্ধকার হয়ে এলো। সুনেহেরা বুঝতেই পারেননি কখন এতটা পথ চলে এসেছেন। একসময় তার মনে হলো এই জায়গাটা সাহাবাদের রাজ্যের মধ্যে নয়।
এটা সীমান্ত পেরিয়ে অন্য রাজ্যের ভূখণ্ড। তিনি ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরলেন। বুকের ভেতর অজানা ভয় ঢুকে গেল।
"আমি এতদূর চলে এসেছি?"
কিন্তু তখনও চাকার দাগ সামনে। আর সেই দাগ যেন তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারের আরও গভীরে। অবশেষে রাত পুরোপুরি নেমে এলো।
আকাশে মেঘের ফাঁকে ফ্যাকাসে চাঁদ। সুনেহেরা ঘোড়ার গতি কমিয়ে দিলেন। সামনের গাছপালার ফাঁক দিয়ে হঠাৎ একটা বিশাল কালো অবয়ব দেখা গেল। তিনি থেমে গেলেন। ঘোড়াটাও যেন অস্বস্তিতে হ্রেষাধ্বনি করে উঠল। সুনেহেরা আস্তে আস্তে সামনে এগোলেন। গাছের আড়াল সরতেই পুরো ভবনটা স্পষ্ট হলো। একটা বিশাল বাড়ি। একদম ই ভিন্ন ধাঁচের ভবন। তার চারদিকে উঁচু গাছ। কোথাও কোনো আলো নেই। বাড়িটা দেখে মনে হচ্ছে বেশ নতুন ই। সুনেহেরা ঘোড়া থেকে নামলেন। তার চোখ এবার মাটির দিকে। চাকার দাগ এসে ঠিক বাড়িটার সামনেই থেমে গেছে।
অচেনা বাড়িটার দিকে তাকিয়ে বুকের ভেতর কেমন একটা অস্বস্তি হলো।
"এখানে কে আসে? আর এই ভবন ই বা কারা বানালো এখানে?"
কিছুক্ষণ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থেকে তার মনে পড়ল সাহারা কি তবে এখানেই আছে? এই ভেবেই সুনেহের এগিয়ে গেলেন। বাড়িটার ভেতর থেকে ভেসে এলো ক্ষীণ একটা শব্দ। সুনেহেরার চোখ বড় হয়ে উঠল। এই নির্জন জঙ্গলের মাঝখানে, অন্য রাজ্যের সীমান্তে, এই অচেনা ফরেস্ট হাউসের ভেতরে সে একা এসেছে। নাহহহ সাহস হারানো যাবে না। চাঁদের আলোয় চিকচিক করে উঠলো কারি অবয়ব। সুনেহেরা চোখ পিটপিট করে তাকালো। তার থেকে কয়েক হাত দূরেই দাড়ানো বর্ম পরিহিত এক পুরুষ।