সুনেহেরা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সামনের অন্ধকার ফরেস্ট হাউসটার দিকে তাকিয়ে বুকের ভেতর অজানা এক আশঙ্কা জমে উঠেছে। তার অল্প দূরেই দাঁড়িয়ে আছে একজন মানুষ। সম্পূর্ণ বর্মে আবৃত। মাথা থেকে বুক পর্যন্ত লোহার আবরণ। কোমরে তরবারি। কাঁধে পুরোনো যুদ্ধের চিহ্ন। চাঁদের অস্পষ্ট আলোয় মানুষটাকে দেখে মনে হচ্ছে কোনো যুদ্ধক্ষেত্র থেকে উঠে আসা প্রহরী। সুনেহেরার হাত সঙ্গে সঙ্গে অস্ত্রের হাতলে চলে গেল।
"কে আপনি?"
কোনো উত্তর নেই ওদিক থেকে। মানুষটা স্থির।
সুনেহেরা আরও এক পা এগিয়ে গেল।
"বলুন! আপনি কার লোক?"
এবার সন্দেহ আরও বাড়ল। সাহাবাদের সীমান্তের এত গভীরে, এই অচেনা ফরেস্ট হাউসের সামনে একজন বর্মধারী মানুষ দাঁড়িয়ে আছে এটা কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়। সুনেহেরা তরবারি বের করলেন।
"আর এক পা এগোলে ভালো হবে না।"
তবুও লোকটি কোনো প্রতিবাদ করল না। শুধু তাকিয়ে রইল। বর্মের মুখাবরণের সরু ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে তার চোখ দুটো। নীলচে মনি জোড়ায় অদ্ভুত গভীর সেই চোখ। সুনেহেরার হাত কেঁপে উঠল। কেন যেন চোখ দুটো তার পরিচিত লাগছে। অসম্ভব পরিচিত। বহু বছর আগের কোনো স্মৃতি যেন হঠাৎ এসে তার বুকের ভিতর আঘাত করল। প্রিয় পুরুষটার সাথে মিলের আভাস পেতেই অস্থির হয়ে উঠলো নারীটি। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল
"আপনার বর্ম খুলুন।"
লোকটি তাও নড়ল না। সুনেহেরার কণ্ঠ এবার কেঁপে উঠল।
"আমি বলছি বর্ম খুলুন।"
তাও কোনো উত্তর নেই অপর দিক থেকে। সুনেহেরার হৃদপিণ্ডে রক্তক্ষরণ শুরু হলো যেন।
"দ…দয়া…দয়া করে..."
কথা বেরোয় না আর। তার ভঙ্গিমার সবকিছু যেন বহু পুরোনো কোনো পরিচিত মুখের দিকে নিয়ে যাচ্ছে তাকে।
"সত্যি করে বলেন আপনি কে?"
লোকটি ধীরে ধীরে হাত তুলল। বর্মের বন্ধনী খুলতে শুরু করল। মাথার ভারী আবরণটা খুলে ফেলল। সুনেহেরা তাকিয়ে রইল। তার চোখ বড় হয়ে গেল। মুখের সমস্ত রক্ত যেন মুহূর্তে সরে গেল। ঠোঁট কাঁপছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। সামনের মানুষটি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে। লেকটার বয়স বেড়েছে। চেহারায় সময়ের ছাপ পড়েছে।
কিন্তু সেই চোখ, সেই চোখ একটুও বদলায়নি।
সুনেহেরার হাত থেকে তরবারি কখন মাটিতে পড়ে গেছে, তিনি নিজেও টের পেলেন না। কাঁপা কণ্ঠে নামটা বেরিয়ে এলো প
"মাহাদি?"
ইনিই মাহাদি ইকরাম। সাহাবাদের সাবেক সেনাপ্রধান। সুনেহেরার প্রেমিক পুরুষ। বহু বছর আগে হঠাৎ হারিয়ে যাওয়া মানুষটাকে মৃত বলেই ধরে নেওয়া হয়েছিল। এত বছরেও এই মানুষটির কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। সুনেহেরা নিজের জীবনের সবচেয়ে গভীর স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে রেখেছিলেন এই মানব টিকে। গোটা জীবন কাটালেন সঙ্গী হীনা, কুমারী হয়ে। সুনেহেরার ভালোবেসে দেওয়া নাম ছিল পাথর মানব। তার হৃদয় ছিল পাথরের মতো শক্ত। পাথরের আড়ালে মানুষটাকে কেবল সুনেহেরা চিনত, সেই মানুষটা আজ এত বছর পর তার সামনে দাঁড়িয়ে। সুনেহেরার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
“আপনি?"
মাহাদি গম্ভীর স্বরে ডাকল
“জাহ্নবী!”
এই ডাকটাই সব বাঁধ ভেঙে দিল। সুনেহেরা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। দৌড়ে গিয়ে তার বুকে আছড়ে পড়ল। বুকে মুখ লুকিয়ে কেঁদে উঠল। বহু বছরের জমে থাকা অভিমান, অপেক্ষা সব যেন অশ্রুর সঙ্গে বেরিয়ে আসতে লাগল। মাহাদি কিছুক্ষণ নির্বাক দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে বলল,
"এত গুলো বছর আমি হীনা কেমন কাটালেন শাহজাদী?”
সুনেহেরা কাঁদতে কাঁদতেই মাথা তুললেন।
"এতগুলো বছর আপনি কোথায় ছিলেন?"
মাহাদি কোনো উত্তর দিল না। ফরেস্ট হাউসটার দিকে তাকাল। তারপর খুব নিচু স্বরে বলল,
"এই জায়গাটাই আমাকে পৃথিবীর কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছিল জাহ্নবী। এটা মৃত্যুখাদ, আস্ত মানুষ গিলে নেয়।”
সুনেহেরার চোখ এবার বিস্ময়ে স্থির হয়ে গেল।
"তাহলে সাহারা?"
মাহাদির মুখ মুহূর্তে গম্ভীর হয়ে উঠল। সুনেহেরার বুক কেঁপে উঠল।
"তাহলে কোথায় ও?"
মাহাদি কে ফিরে পাওয়ার এই আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। পাথর মানব টা সুনেহেরার কাঁধ থেকে হাত সরিয়ে নিল। সুনেহেরা অবাক হয়ে তাকালেন।
"কী হলো?"
মাহাদি নীরব থেকে বলল,
"আমাকে যেতে হবে।"
সুনেহেরার মুখের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।
"যেতে হবে মানে?"
"হ্যাঁ। এখন আমার এখানে থাকা সম্ভব নয়।"
"কোথায় যাবেন আপনি?"
মাহাদি উত্তর দিল না। শুধু চারপাশে তাকাল। যেন এই জঙ্গলের প্রতিটি ছায়ার ওপর তার নজর আছে। তারপর বলল,
"আপনি এখনই সাহাবাদে ফিরে যান শাহজাদী।"
সুনেহেরা মাথা নাড়লেন।
"না না। একি বলছেন সাহারা কোথায় আমি জানি না। ওকে রেখে আমি ফিরব না। আমি খালি হাতে ফিরতেই পারব”
মাহাদি এবার তার দিকে তাকাল।
"সাহারাকে আমি আপনার কাছে ফিরিয়ে দেব।"
সুনেহেরার চোখে অবিশ্বাস।
"কখন? আর কী করে?"
"বড় মার বিয়ের আগেই।"
"জান্নাতের?"
"হ্যাঁ।"
মাহাদির দৃঢ়তা দেখে সুনেহেরা আর কিছু বলতে পারলেন না।
"আমি কথা দিচ্ছি। বড় মার বিয়ের আগেই সাহারা মহলে থাকবে।"
সুনেহেরার চোখ আবার ভিজে উঠল।
"আপনি এত বছর পর ফিরে এসেছেন। আবার কোথায় হারিয়ে যাবেন?"
মাহাদি মৃদু হেসে বলল,
"এবার আর হারাব না। শুধু সময়টা আসতে দিন"
সুনেহেরা কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু মাহাদি ইতিমধ্যেই কয়েক পা পিছিয়ে গেছে।
"মাহাদি!"
সে থামল না
"পাথর মানব..."
এই নামে ডাকতেই মাহাদি একবার ফিরে তাকাল।
সুনেহেরা চোখ মুছে বললেন,
"আবার আসবেন তো?"
মাহাদি কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল,
"আসব, জান্নাতের বিয়ের আগ মুহূর্তে।"
তারপর অন্ধকার জঙ্গলের দিকে এগিয়ে গেল।
কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তার বর্মের অবয়ব গাছের আড়ালে মিলিয়ে গেল। সুনেহেরা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। একবার মনে হলো ছুটে গিয়ে তাকে আবার ধরে রাখেন। কিন্তু পারলেন না। মাহাদি চলে গেছে। সুনেহেরা মাটিতে বসে পড়ল।
এতক্ষণ ধরে শক্ত করে রাখা বুকের বাঁধ ভেঙে গেল। দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন।
"কেন মাহাদি...? কেন আমাকে ভালোবাসবে বলে বিচ্ছেদ উপহার দিলেন? এতগুলো বছর কোথায় ছিলেন আপনি?"
জবাব দেওয়ার কেউ নেই।বচারপাশে শুধু অন্ধকার জঙ্গল। সুনেহেরা মাটিতে হাত রেখে মাথা নিচু করে কাঁদতে লাগলেন। মনে হলো এটা স্বপ্ন। মনে হলো এত বছরের দুঃখ বুঝি আজই শেষ হলো। আবার পরক্ষণেই মনে হলো সাহারা এখনও তার কাছে নেই। তিনি চোখ মুছে নিজেকে সামলালেন।
"না। এখন ভেঙে পড়লে চলবে না।"
উঠে দাঁড়িয়ে আঁচল দিয়ে চোখ মুছে ঘোড়ার কাছে এগিয়ে গেলেন। মাহাদি যাওয়ার আগে যে পথ দেখিয়ে দিয়েছে, সেটাই এখন তার ভরসা।
এই পথ ধরে গেলে অন্য পথের তুলনায় অনেক কম সময় লাগবে। ভোর হওয়ার আগেই সাহাবাদে পৌঁছানো সম্ভব। সুনেহেরা ঘোড়ার পিঠে উঠলেন।
শেষবারের মতো পিছনে তাকালেন। অন্ধকারের মধ্যে ফরেস্ট হাউসটা এখনও দাঁড়িয়ে। সেই জায়গার কোথাও তার সাহারা আছে।
সুনেহেরা লাগাম শক্ত করে ধরলেন।
"আল্লাহ, আমার মেয়েটাকে হেফাজত করো।"
ঘোড়ার খুরের শব্দে রাতের জঙ্গলের নীরবতা ভাঙে। সুনেহেরা অন্ধকার জঙ্গল পেরিয়ে ছুটে চলল সাহাবাদের দিকে। পেছনে পড়ে রইল সেই রহস্যময় ফরেস্ট হাউস। পৌছাতে পৌছাতে বেলা উঠে গেল।
আজ জান্নাতের বিয়ে। সাহাবাদ অপরুপ সাজে সেজেছে। মূল ফটক থেকে শুরু করে অন্দরমহল পর্যন্ত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়েছে। উঠোনের চারপাশে ঝুলছে রঙিন কাপড়। বারান্দার রেলিংয়ে গাঁদা আর বেলি ফুলের মালা। বাতাসে আতরের মিষ্টি গন্ধ। রান্নাঘরে সকাল থেকেই ব্যস্ততা। মিষ্টি সাজানো হচ্ছে, অতিথিদের জন্য খাবারের আয়োজন চলছে। সবকিছুই যেন উৎসবের মতো। শুধু মানুষগুলোর মুখে উৎসব নেই। মহলের প্রতিটি কোণে একটা চাপা উৎকণ্ঠা।
সাহারা এখনও ফেরেনি। আর আজই তার বড় বোনের বিয়ে। সুনেহেরা কিছুক্ষণ আগে মহলে ফিরেছেন। কিন্তু একা। ঘোড়ার শব্দ শুনে সবাই ছুটে এসেছিল। শাখা সবার আগে। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা মেহেরুন্নেসার চোখেও তখন একরাশ আশা। বাইজিদ শাহ নিজেও এগিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু সুনেহেরা ঘোড়া থেকে নামতেই যখন সবাই দেখল তার সঙ্গে সাহারা নেই।
চারপাশের মুখগুলো মুহূর্তেই মলিন হয়ে গেল।
শাখার ঠোঁট কেঁপে উঠল।
"মণি মা..."
সুনেহেরা কোনো উত্তর দিলেন না। শুধু মেয়েটার মাথায় হাত রাখলেন।
"কাঁদিস না।"
শাখার চোখে পানি চলে এলো।
"কীভাবে কাঁদব না? আজ আপার বিয়ে। আর সারা..."
মেহেরুন্নেসা কাঁপা গলায় বললেন,
"কোনো খোঁজ পেলেন?"
সুনেহেরা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন। তারপর শান্ত গলায় বললেন,
"আজই আসবে।"
সবাই অবাক হয়ে তাকাল।
"কী?"
"সাহারা আজই ফিরবে।"
বাইজিদ শাহ যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারলেন না।
"তুই এত নিশ্চিত কি করে? কি হয়েছে সবটা আমাদের বল”
সুনেহেরা মাথা নাড়ল।
"ও একা আসবে না। সঙ্গে আরও একজন থাকবে।"
কথাটা শুনে সবাই একে অপরের মুখের দিকে তাকাল। কে? সাহারার সঙ্গে আর কে আসছে?
সুনেহেরার চোখে অদ্ভুত নিশ্চয়তা। কিন্তু তিনি আর কিছু বললেন না। মাহাদির কথা কাউকে জানানো যাবে না। এখনও নয়। আজকের দিনটা জান্নাতের। এই আনন্দের দিনটাকে তিনি আরও রহস্যের ভারে ভারী করতে চান না। শুধু মনে মনে বললেন
"আর একটু অপেক্ষা করো, মা। তোমার বোন ফিরবে।"
জান্নাত সকাল থেকেই কাঁদছে। সাজানোর জন্য বসানো হয়েছে তাকে। সামনে রাখা বিয়ের পোশাক। সূক্ষ্ম কারুকাজ করা কাপড়। পাশে গয়নার বাক্স। আয়নার সামনে রাখা আতরের শিশি। কিন্তু জান্নাতের চোখ বারবার ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে অশ্রুতে। শাখা কতভাবে যে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করছে!
"আপা, আর কাঁদিস না। চোখ ফুলে গেলে কিন্তু তোকে সুন্দর লাগবে না।"
জান্নাত কান্নার মাঝেই বলল,
"আমার সাহারার কথা মনে পড়ছে।"
"সে আসবে।"
"আল্লাহ জানে আমার ছোট্ট বোন টা কি হাল এ আছে”
শাখা এবার চুপ হয়ে গেল। এই প্রশ্নের উত্তর তার নিজের কাছেও নেই। জান্নাত চোখ মুছে আবার কাঁদতে শুরু করল। শাখা তার পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল।
"সারা এমন মেয়ে না যে তোকে বিয়ের দিনে ছেড়ে থাকবে। ও আসবেই।"
জান্নাত কিছু বলল না। শুধু বিয়ের পোশাকটার দিকে তাকিয়ে রইল। হঠাৎ শাখার চোখ আটকে গেল পোশাকের পাশে রাখা একখানা অলংকারে।
কেমন যেন অদ্ভুতভাবে মনে পড়ে গেল সেই অপরিচিত মানুষটার কথা। ফারিস, সেই বণিক।
যার সঙ্গে জঙ্গলের পথে হঠাৎ দেখা হয়েছিল। শাখা অন্যমনস্ক হয়ে গেল। তার নিজের পায়ের দিকে তাকাল। এখনও সেই ক্ষত পুরোপুরি ভালো হয়নি। আর ক্ষতের ওপর বাঁধা সেই কাপড়টার কথা মনে পড়তেই বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো। ফারিস কে? কোথাকার বণিক সে? কেনই বা বারবার হঠাৎ করে তার সামনে এসে পড়ে? আর সেই ঈগলের গলায় বাঁধা রুপালি তাবিজের মতো জিনিসটা, যেটা দেখতে অবিকল ফারিসের গলায় থাকা জিনিসটার মতো।
শাখা ভ্রু কুঁচকে ভাবতে লাগল। এতদিন সাহারা কে নিয়ে ভাবতে ভাবতে ওসবে মনোযোগ ই দেওয়া হয়নি। ভুলতে বসেছিল প্রায়। আজ আপার বিয়ে টা হয়ে গেলেই এই বিষয়ে খোঁজ লাগাতে হবে।
*******
গত রাত থেকেই কাটাগিরির জঙ্গলের গভীরে থাকা পুরনো বাংলোটায় শুরু হয়েছে তোরজোর।
চারপাশে ঘন অন্ধকার। উঁচু উঁচু গাছের ডালপালা একে অপরের সঙ্গে মিশে আকাশটাকেই যেন ঢেকে রেখেছে। বাংলোটার চারপাশে কয়েকটি মশাল জ্বলছে। আলোয় মাঝে মাঝে ভেসে উঠছে মুখগুলো। ডাকাত দলের লোকজন অস্ত্র, গোলাবারুদ আর ঘোড়াগুলো প্রস্তুত করছে। আজ রাতেই তাদের গন্তব্য সাহাবাদ। গত কয়েকদিন ধরে এই আক্রমণের প্রস্তুতি চলেছে।
কিন্তু দলের সবার মাঝখানে অন্যমনষ্ক ফাইয়াজ।
বাংলোটার একপাশের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে সে। হাতে ধরা তরবারির দিকে তাকিয়ে আছে। আজকাল ক্রোধ তার হুট করেই চাপে। চারিপাশের সব কিছু ধূলিসাৎ করে দিতে ইচ্ছে করে। কিছুক্ষণ কাটে এভাবেই, ফের বিরহ চাপে মনে।
গত এক সপ্তাহ। একটা পুরো সপ্তাহ শাখার কোনো দেখা নেই। না জঙ্গলে, না নগরের পথে।
কোথাও না। প্রথম দুই দিন নিজেকে বোঝাতে পেরেছিল। দ্ভেবেছিল, হয়তো কোনো কাজে ব্যস্ত।
দিন গড়ানোর সাথে অপেক্ষাটা অস্থিরতায় বদলে গেল। প্রতিটি রাত যেন দীর্ঘ হতে লাগল।
কতবার যে সেই পরিচিত পথের দিকে তাকিয়ে থেকেছে তার হিসাব নেই। কতবার যে ঘোড়ায় চড়ে নগরের আশেপাশে ঘুরে এসেছে, তারও হিসাব নেই। কিন্তু শাখা আসেনি। ফাইয়াজ নিজের অজান্তেই দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
"কিছু কি সমস্যা সর্দার?"
পেছন থেকে একজনের কণ্ঠ ভেসে এলো। ফাইয়াজ ফিরে তাকাল না।
"কিছু হয়নি।"
এ ব্যথা কি আর বলে বোঝানো যাবে। শেষমেষ ডাকাত দলের জাত মারল বোধহয়। শেষে কিনা এক নারীর প্রেমে পড়ে জাত খোয়ালো? চোখ দুটো এতটাই কঠিন যে লোকটা আর কিছু বলল না। ফাইয়াজ রাগ নিয়ন্ত্রণ করে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
"নিজের কাজ করো।"
লোকটা সরে গেল। ফাইয়াজ আবার অন্ধকার জঙ্গলের দিকে তাকাল। আজ যদি শাখা এখানে থাকত? কেন আসছে না ও? ওর কী একবারও মনে পড়ছে না? নিজে নিজেই বিরক্ত হলো।
"আমি কেন এত ওর কথা ভাবছি?"
কঠিন মুখে নিজেকেই প্রশ্ন করল সে। কিন্তু উত্তর এল না। মনে পড়ল সেই তেজী চোখ। রাগে কাঁপতে থাকা মুখ, কথার ভঙ্গি, তার সঙ্গে তর্ক করার অদ্ভুত সাহস। ফাইয়াজ চোখ বন্ধ করল।
মনে হলো বুকের ভেতর সত্যিই ঝড় উঠেছে।
কি এক অশান্তি পেয়ে বসলো তাকে? এ কেমন দুর্বলতা? শুনেছিল লোক মুখে ভালোবাসা নাকি যন্ত্রণার। তাই বলে এত? এত বিরহ প্রেমিক রা কী করে সহ্য করে? অন্য সবার ই কি এমন হয়? কাওকে দেখার তৃষ্ণা যে কতটা ভয়াবহ ফাইয়াজ হারে হারে টের পাচ্ছে।
বছরের পর বছর নিজের অনুভূতিকে পাথর বানিয়ে রেখেছে। সে তো হমদয়হীনা। তাহলে আজ একটা মেয়ের অনুপস্থিতিতে এতটা অস্থির কেন? একজন সৈন্য এসে দাঁড়াল।
"সর্দার।"
সে চোখ খুলল।
"সব প্রস্তুত?"
তার মনে হচ্ছে সময়টা অস্বাভাবিক দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। আজ সাহাবাদে আক্রমণ হবে। খুবই গুরুত্বপূর্ণ অভিযাম। জিততেই হবে। আর ভাববে না এই বিষয়ে। তার দুর্বল হওয়া চলবে না। তরবারিটা কোমরে গুঁজে নিল। আবার সেই পুরোনো ফাইয়াজ ফিরে এলো। লোকটা মাথা নিচু করে বলল
“সর্দার, সম্রাট পত্র পাঠিয়েছেন”
ফাইয়াজ ভাবলেশহীন
“পড়ো কি লিখেছেন”
লোকটা জানালো
“সর্দার, সম্রাট পুত্র মেহরাব ওয়াসেম ৬ দিন যাবৎ নিখোঁজ। সম্রাট পুত্রশোকে অসুস্থ প্রায়। এমন সময় এমন অভিযান তিনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না। আপাতত স্থগিত রাখতে বলেছেন। পরবর্তী তে সে নিজেই জানাবে”
ফাইয়াজ বিরক্ত হয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। হাতের তলোয়ার ছুড়ে মারল মেঝেতে।
“এই সম্রাট কি আমায় হাতের পুতুল ভেবেছে? একবার সাহাবাদ জিতে নিই, আমিরাবাদ ও কেড়ে নিব তার থেকে”
গায়ের আলখাল্লা খুলে পীঠে তূনীর নিয়ে ঘোড়ায় চড়ে বেড়িয়ে পড়ল জঙ্গলের দিকে। শাখা কে খুঁজে না আনা অবদি আজ ফিরবে না। প্রয়োজনে অপহরণ করে আনবে। তবুও সামনে বসিয়ে রাখবে আজীবন। ওকে না দেখলে বাঁচা দুষ্কর।