বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার আগেই সাহাবাদ মহলের মূল ফটকের সামনে একে একে এসে থামলো রাজকীয় অশ্ব আর রথ। দূর থেকেই বোঝা যাচ্ছিল বিবাহের বরযাত্রী। সামনের অশ্বারোহীদের পরনে রাজকীয় পোশাক। কোমরে ঝুলছে তরবারি। মাথায় পাগড়ি, তাতে রাজচিহ্ন খচিত। তাদের চলনেও এক ধরনের প্রশিক্ষিত শৃঙ্খলা। পিছনে সোনালি কারুকাজ করা রাজকীয় রথ। রথের চারপাশে মিশরের পতাকার রঙে সাজানো কাপড় বাতাসে উড়ছে। সাহাবাদ মহলের প্রহরীরা সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। বাইজিদ শাহ নিজেই এগিয়ে গেলেন অতিথিদের বরণ করতে। মেহেরুন্নেসা, সুনেহেরা, শাখা সকলেই অন্দরমহলের বারান্দা থেকে তাকিয়ে আছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই রথ থামল। প্রথমে নামলেন সুলতান হামজা আল নাসির। তার ব্যক্তিত্বে রাজকীয় গাম্ভীর্য অটুট। বয়স তাকে কিছুটা ভারী করেছে, কিন্তু চোখের দৃঢ়তা একটুও কমেনি। তারপর রথের পাশ থেকে নামল মুয়াজ। তাকে দেখতে যেন অন্যরকম লাগছে। যে যুবককে এতদিন সাধারণ রাজপুত্রের বেশে দেখা গেছে, আজ সে সম্পূর্ণ বরবেশে।
গাঢ় মেরুন রঙের রাজকীয় শেরওয়ানি। তার ওপর সূক্ষ্ম সোনালি কারুকাজ। কোমরে অলংকৃত তরবারি। মাথায় রাজকীয় পাগড়ি, তার একপাশে ছোট্ট লাল পাথর বসানো। চেহারায় কোনো অতিরিক্ত সাজ নেই। তবুও তাকে দেখে চোখ সরিয়ে নেওয়া কঠিন। উচ্চদেহী, প্রশস্ত কাঁধ, শান্ত গভীর চোখ। মুখে স্বভাবসুলভ সংযত ভাব।
চোখের গভীরে অন্যরকম এক অস্থিরতা। আজ তার বিয়ে। একজন নারীকে সে নিজের জীবনের অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে যাচ্ছে, যাকে সে এখনও ভালো করে দেখেইনি। বাইজিদ শাহ এগিয়ে এসে তাকে আলিঙ্গন করলেন।
"এসো পুত্র। আজ থেকে তুমি শুধু অতিথি নও, এই মহল তোমার নিজের ঘর।"
মুয়াজ সম্মানের সঙ্গে মাথা নত করল।
"আপনার ভালোবাসাই আমার জন্য যথেষ্ট, জমিদার সাহেব।"
বাইজিদ শাহ আবেগে তার কাঁধে হাত রাখলেন।
"আল্লাহ তোমাদের দুজনকে সুখী করুন।"
মহলের নারীরা ফুল ছিটিয়ে তাদের বরণ করে নিল। আতরের সুবাসে চারপাশ ভরে উঠল।
সুলতান হামজা এবং মুয়াজকে রাজকীয় মর্যাদায় অন্দরমহলের অতিথিশালায় নিয়ে যাওয়া হলো।
তাদের জন্য আলাদা করে খাবারের আয়োজন করা হয়েছে। বড় বড় পিতলের থালায় নানা রকম খাবার সাজানো। মিষ্টি, ফল, পোলাও, মাংস, শরবত কোনো কিছুরই কমতি নেই। সবাই ব্যস্ত অতিথিদের আপ্যায়নে। মুয়াজের মন যেন অন্য অন্যমনষ্ক। বারবার তার চোখ চলে যাচ্ছে জান্নাতের কক্ষের দিকে। ওই কক্ষেই এখন তার হবু স্ত্রীকে সাজানো হচ্ছে। গতকাল পর্যন্ত এসব নিয়ে তার কোনো কৌতূহল ছিল না। আজ কেন যেন অপেক্ষাটা শেষ হতে চাইছে না। সুলতান হামজা একবার ছেলের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।
"কী দেখছো?"
মুয়াজ একটু অপ্রস্তুত হয়ে চোখ নামিয়ে ফেলল।
"কিছু না, আব্বা।"
সুলতান মুচকি হাসলেন।
*****
জান্নাতের কক্ষ ফুলের সুবাসে ভরে গেছে। সকাল থেকেই তাকে সাজানো হচ্ছে। আজ প্রথমবার এত ভারী সাজে বসেছে সে। গায়ে লাল রঙের ভারী লেহেঙ্গা। গাঢ় লালের ওপর সোনালি কারুকাজ। ওড়নাটা মাথার ওপর দিয়ে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। কপালে টিকলি। গলায় একের পর এক সোনার হার। কানে ভারী দুল। হাতে সোনার চুড়ি। কোমরে কোমরবন্ধ। চুলের সাজেও ফুল আর সোনালি অলংকার। এত গয়না সে জীবনে একসঙ্গে কখনও পরেনি। আয়নার সামনে বসে নিজেকেই যেন চিনতে পারছে না। লাল পোশাকে তাকে মনে হচ্ছে সদ্য ফুটে ওঠা তাজা গোলাপ।
তারপরও মুখে হাসি নেই। চোখ দুটো বারবার ভিজে উঠছে। শাখা পাশে বসে বোনের দিকে তাকিয়ে রইল। কিছুক্ষণ পর মৃদু হেসে বলল,
"আপা..."
জান্নাত আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়েই বলল,
"হুম?"
"তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে।"
জান্নাত মৃদু হাসল।
"আমাকে কি এত গয়না মানিয়েছে?"
"গয়না তোকে মানিয়েছে নাকি তুই গয়নাকে মানিয়েছিস বুঝতে পারছি না।"
জান্নাত আবার লজ্জায় মাথা নিচু করল। শাখা তার কপালের টিকলিটা ঠিক করে দিতে দিতে বলল,
"আজ কিন্তু কাঁদবি না।"
জান্নাত কিছু বলল না। শুধু জানালার দিকে তাকাল। আস্তে করে বলল,
"সাহারা কি সত্যিই আসবে?"
শাখা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর জোর করে হাসল।
"মণি মা যখন বলেছে, আসবেই।"
কিন্তু নিজের মনের ভেতর ও যে একই প্রশ্নটা ঘুরছে সাহারা কোথায়? তার উত্তর শাখাও জানে না। কিন্তু জান্নাত এর এমন বিশেষ দিনে তাকে সান্ত্বনা দেওয়া টা বড্ড বেশি জরুরি।
মহলের অতিথিশালায় বসে থাকা মুয়াজ আবারও জান্নাতের কক্ষের দিকে তাকাল। চোখে অপেক্ষা।
দেখার জন্য যেন আর তর সইছে না। কিন্তু সে নিজেকে সংযত রাখছে। অবশেষে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজনকে জিজ্ঞেস করল,
"বিয়ের প্রস্তুতি কেমন? সব ঠিকঠাক চলছে তো?"
লোকটি মাথা নত করল।
"জি, যুবরাজ।"
মুয়াজ আবার চুপ করে গেল। জান্নাতের কক্ষ থেকে নারীদের হাসির শব্দ ভেসে আসছে। তার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা ধাক্কা লাগল। ওই কক্ষেই এখন বসে আছে জান্নাত। তার জন্যই সাজছে। তারই জন্য আজ এই মহলে এত আয়োজন। মুয়াজ অজান্তেই মৃদু হাসল।
*****
ফাইয়াজের চোখ স্থির হয়ে গেল। এতক্ষণ সে অন্দরমহলের এক কোণে দাঁড়িয়ে চারপাশের গতিবিধি লক্ষ্য করছিল। মুখের নিচের অংশ সাদা-কালো চেক কাপড়ে ঢাকা। রাজকীয় বরযাত্রীর ভিড়ে তাকে আলাদা করে চেনার কোনো উপায় নেই। বরং এই বেশে তাকে দেখে যে কেউ রাজপরিবারের কোনো সৈনিক কিংবা দূরদেশের কোনো অভিজাত যুবক বলেই মনে করবে। কিন্তু পরমুহূর্তেই তার দৃষ্টি গিয়ে আটকে গেল সামনের দিকে। একটা সোনালি থালা হাতে কয়েকজন নারীর সঙ্গে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে একটি মেয়ে। থালার ওপর সাজানো তাজা ফুলের মালা। চারপাশে গোলাপের পাপড়ি। মেয়েটির চলনে কোনো তাড়াহুড়ো নেই। তার চোখ জোড়া নজরে আসতেই ফাইয়াজের বুকের ভেতরটা যেন আচমকা কেউ মুঠো করে চেপে ধরল। ওই চোখ সে ভুলতে পারে? অসম্ভব। তার দৃষ্টি থেমে গেল মেয়েটির চোখে। মুখটা পুরোপুরি দেখা যাচ্ছে না। ঘোমটা আর পাশের নারীদের আড়ালে ঢাকা। কিন্তু চোখ দুটোই যথেষ্ট। চলনের ভঙ্গি। হাঁটার সময় এক হাত দিয়ে থালাটা সামলে রাখার অভ্যাস। আর সেই তেজী চোখ। ফাইয়াজের ঠোঁটের নিচে চাপা স্বরে বেরিয়ে এলো
"শাখা...!"
শব্দটা আস্তে বলল, আশপাশের কেউ শুনল না।
তার নিজের কানে যেন বজ্রপাত হলো। শাখা এখানে কী করছে? এই মহলে? এই বিয়ের অনুষ্ঠানে? ফাইয়াজের চোখ আরও সরু হয়ে এলো। কয়েকদিন ধরে যার দেখা পাওয়ার জন্য সে রাতের পর রাত জঙ্গলে ছুটে এসেছে। ঝড়-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে নগরের দিকে ছুটেছে, সেই মেয়েটাই আজ তার সামনে দাঁড়িয়ে। অথচ শাখা তাকে দেখছে না। সে জানেই না, মাত্র কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে আছে সেই মানুষটি, যার কথা সে নিজেও গত কয়েকদিনে ভুলতে পারেনি। ফাইয়াজের বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো। আনন্দ অভিমান নাকি বিস্ময় সে নিজেও বুঝতে পারল না। শাখা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। তার হাতে থাকা সোনালি থালার ফুলগুলো হালকা বাতাসে দুলছে। মুখে গাম্ভীর্য। বিয়ের বাড়ির ব্যস্ততায় সে যেন নিজের চিন্তাগুলোও ভুলে গেছে। ফাইয়াজের চোখ এবার থালার দিকে গেল। বিয়ের মালা। তারপর আবার শাখার দিকে। হঠাৎ তার মনে হলো এই মেয়ে কি তবে সবসময়ই এই মহলের মানুষ ছিল?
কিন্তু এতদিন সে তাকে জঙ্গলে, পুরোনো বাঙলোর আশেপাশে, ছদ্মবেশে দেখেছে। ফারিস নামে যে বণিকের পরিচয় শুনেছে, সেই রহস্যও তার মনে পড়ে গেল। ফাইয়াজের চোয়াল শক্ত হলো।
"তাহলে তুমি আসলে কে, শাখা?"
প্রশ্নটা মনে উঠতেই তার দৃষ্টি আচমকা শাখার পায়ের দিকে গেল। সেই একই পা। কয়েকদিন আগে যার ক্ষত সে নিজের হাতে কাপড় দিয়ে বেঁধে দিয়েছিল। আজও কি সেই কাপড়ের কোনো চিহ্ন আছে? ফাইয়াজের বুকের ভেতর কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। সে আরেকটু আড়ালে সরে দাঁড়াল। শাখা তখন একেবারে তার পাশ দিয়ে চলে যাওয়ার পথে। এক মুহূর্তের জন্য দুজনের দূরত্ব এতটাই কমে এলো যে ফাইয়াজ চাইলে হাত বাড়ালেই তাকে থামাতে পারত। কিন্তু সে কিছু করল না। শুধু স্থির চোখে তাকিয়ে রইল। শাখাও তাকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল। তারপর হঠাৎ শাখা এক পা এগিয়ে থেমে গেল। কেন যেন অজান্তেই মাথাটা সামান্য ঘুরল তার। ফাইয়াজের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। দুজনের চোখ এবার মুখোমুখি হওয়ার উপক্রম। কিন্তু শাখা পুরোপুরি তাকানোর আগেই পাশের একজন নারী তাকে ডেকে উঠল,
"শাখা, এদিকে আয় মা। অতিথিরা অপেক্ষা করছেন।"
শাখা সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে গেল। ফাইয়াজ দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখে কৌতূহল। এতদিন সে ভেবেছিল শাখা এই রাজ্যের কোনো প্রজা। হ্যা অসীম সাহসী, তবে সাধারণ। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে এই মেয়ের পরিচয়ের আড়ালে আরও বড় কোনো রহস্য লুকিয়ে আছে।সেই রহস্যের সঙ্গে সাহাবাদ মহল, এই বিয়ে এবং হয়তো তার নিজের জীবনও জড়িয়ে আছে। ফাইয়াজ মুঠো শক্ত করল। আজ সে শাখাকে অনুসরণ করবে না। তার উদ্দেশ্য ভিন্ন। সে এসেছে মহল ঘুরে দেখতে। আজ হোক কাল আক্রমণ হবেই। সম্রাটপুত্র ফিরে এলেই আক্রমণ হবে। নগরে প্রবেশের সাথে সাথে বরযাত্রী মহরা দেখে তাদের সাথেই ঢুকে পড়েছে।
এরই মধ্যে অন্দরে পা রাখলো সাহারা। তাকে দেখে মহলে হৈচৈ লেগে গেল। প্রথমে শাখা ছুটে এলো। তারপর জান্নাত। সুনেহেরা তো মেয়েকে দেখেই কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।
সাহারার চেহারায় ক্লান্তির ছাপ আছে ঠিকই, কিন্তু মলিন পোশাক বদলে পরিষ্কার পোশাক পরে, চুল গুছিয়ে, মুখে সামান্য প্রসাধন করে পরিপাটি হয়ে এসেছে। শাখা ছুটে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল।
“তুই কোথায় ছিলি এতদিন? জানিস আমরা কী অবস্থার মধ্যে ছিলাম?” সাহারা মৃদু হেসে বলল,
“এখন আর ভেবো না, আমি তো ফিরে এসেছি।”
“ফিরেছিস তো! কিন্তু কোথায় ছিলি সেটা বলবি না?”
সাহারা চোখ টিপে বলল,
“সব কথা কি এখনই বলতে হয়?”
শাখা বিরক্ত হয়ে তার পিঠে এক চাপড় দিল।
“তোর এই দূরন্তপনার ফল এসব সারা। একদিন আমার মাথাই খারাপ করে দেবে।”
সাহারা জান্নাতের সাথে দেখা করার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়বে। দূরে দাঁড়িয়ে সুনেহেরা মেয়েদের দেখছিলেন। এতদিনের উৎকণ্ঠার পর আজ তার বুকটা একটু হালকা লাগছে। তবুও চোখ দুটো বারবার যেন কাউকে খুঁজছে। অবশেষে আর থাকতে না পেরে সাহারার কাছে এগিয়ে এলেন।
“মা...”
সাহারা ঘুরে তাকাল।
“জি মণি মা?”
সুনেহেরা চারপাশে একবার তাকিয়ে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করলেন,
“উনি কোথায়?”
সাহারার চোখে এক ঝলক রহস্য খেলে গেল। বুঝল মাহাদির কথা বলেছে। তারপর খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
“সময় হলে আসবে।”
“তুমি নিশ্চিত?”
“হু।”
সুনেহেরা আর কিছু বললেন না। শুধু মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। যেন কথাটার ভেতর আরও অনেক কথা লুকিয়ে আছে।
****
মহলের ভেতর বিয়ের ব্যস্ততা তুঙ্গে। অতিথিদের আপ্যায়ন চলছে। অন্দরমহলের নারীরা কাজ নিয়ে ছুটোছুটি করছে। কিন্তু জান্নাতকে কক্ষে দেখা যাচ্ছে না। কেউ বিষয়টাকে তেমন গুরুত্ব দিল না। হয়তো পাশের কক্ষে গেছে। হয়তো মেহেরুন্নেসার কাছে। কিংবা বিয়ের কোনো কাজে অন্দরমহলের অন্য কোথাও। কিন্তু বেশ সময় পরেও যখন তার কোনো সন্ধান পাওয়া গেল না, তখনই ব্যাপারটা সন্দেহের জানান দিল।
দাসীর মুখে শুনে শাখা ছুটে এলো জান্নাতের কক্ষে।
"আপা?"
বিছানার ওপর সাজানো কিছু গয়না পড়ে আছে। আয়নার সামনে এখনও কয়েকটি প্রসাধনীর বাক্স খোলা। অথচ জান্নাত নেই। শাখার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
"আপা!"
সে ঘরের প্রতিটি কোণ দেখে নিল। বারান্দা ও দেখল। ডাকতে গিয়েও গলা কাঁপছে ভয়ে।
"মণি মা!"
চিৎকার শুনে একে একে সবাই ছুটে এলো।
মেহেরুন্নেসা এসে আহাজারি করে বলল
"জান্নাত কোথায়?"
কেউ উত্তর দিতে পারল না। সুনেহেরা ছুটে এসে মেয়ের ঘরের দিকে তাকালেন।
"কিছুক্ষণ আগেও তো এখানে ছিল!"
একজন দাসি বলল,
"আমি নিজ চোখে দেখেছি শাহজাদীকে এই কক্ষেই বসে থাকতে।"
"তাহলে গেল কোথায়?"
"মহলের বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ তো নেই!"
"কেউ কি তাকে বের হতে দেখেছে?"
চারপাশের সবাই মাথা নাড়ল। কেউ দেখেনি।
প্রহরীদের জিজ্ঞেস করা হলো। কেউ কোনো শাহজাদীকে ফটক দিয়ে বের হতে দেখেনি।
সুনেহেরার মুখ ক্রমশ ফ্যাকাসে হয়ে গেল।
"আমার মেয়ে নিজের ইচ্ছায় কোথাও যাবে না "কাউকে না জানিয়ে তো নয়ই।"
শাখা দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
"তাহলে আপা গেল কোথায়?"
কেউ উত্তর দিতে পারল না। মহলের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে খবর ছড়িয়ে পড়ল। বড় শাহজাদী নিখোঁজ। বিয়ের আগ মুহূর্তে নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টা যেন অন্য ইঙ্গিত দেয়। মুয়াজের পরিবারের লোকজনের মধ্যেও অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ল।
কেউ কিছু বুঝে উঠতে পারছে না। এমন সময় পেছনের দিকের একজন প্রহরী দৌড়ে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
"হুজুর, পিছনের পথে কিছু একটা পাওয়া গেছে!"
সকলেই তার দিকে তাকাল।
"কী?"
"শাহজাদীর পোশাকের অংশ মনে হচ্ছে।"
শাখা আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। দৌড়ে বেরিয়ে গেল মহলের পেছনের দিকে। মাটিতে কিছুটা দূরে পড়ে আছে লাল কাপড়ের ছেঁড়া অংশ। শাখা নিচু হয়ে সেটা তুলে নিল। কাপড়টা হাতে নিতেই তার চোখের সামনে অন্ধকার নেমে এলো। এটা জান্নাতের পোশাক। সেই লাল লেহেঙ্গারই অংশ।
বুকের ভেতর কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল।
"আপা..."
তারপর আর কোনো কথা না প সে ছুটে গেল আস্তাবলের দিকে।
এক লাফে ঘোড়ার পিঠে উঠে লাগাম টেনে ধরল।
"পথ ছাড়ো!"
প্রহরীরা সরে গেল। পরক্ষণেই ঘোড়াটা ছুটে বেরিয়ে গেল মহলের পেছনের পথ ধরে। শাখার মাথায় তখন একটাই চিন্তা, জান্নাত বিপদে পড়েছে নিশ্চই। আর তাকে খুঁজে বের করতেই হবে।
মহলের ভেতরের সেই বিশৃঙ্খলার সবকিছু লক্ষ্য করছিল ফাইয়াজ। শাখা ঘোড়ায় চড়ে কোন পথে যাচ্ছে, সেটাই তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মাটিতে পড়ে থাকা লাল কাপড়ের টুকরোটার দিকে একবার তাকাল। তারপর শাখার ছুটে যাওয়ার পথের দিকে। তার চোখ মুহূর্তেই কঠিন হয়ে উঠল। কিছু একটা ঘটেছে। ভয়ংকর কিছু।
ফাইয়াজ আর দেরি করল না। ভিড় থেকে সরে গেল। কিছুদূর গিয়ে নিজের অশ্বের কাছে পৌঁছে এক লাফে পিঠে উঠে বসল। মুখের কাপড়টা আরও শক্ত করে বাঁধল। তারপর শাখার পেছনে ছুটল। শাখা তখন অনেকটা দূরে চলে গেছে।
কিন্তু ফাইয়াজের অশ্বের গতি কম নয়। দূর থেকে শুধু শাখার ঘোড়ার ক্ষীণ শব্দ শোনা যাচ্ছে।
ফাইয়াজ চোখ সরু করে সেই পথের দিকে তাকাল।
"তুমি কোথায় যাচ্ছো শাখা?"
শাখার ঘোরার গতি কমে
“আপনি? আবারও? কোথ থেকে এলেন আপনি? দেখুন আজ আমার আড্ডা দেওয়ার সময় নেই। আমার আপার আজ বিয়ে, তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না”
শাখার অতকিছু মাথায় নেই যে সে পরিচয় গোপন করছে। ফাইয়াজের অশ্বের লাগাম ছুটে গেল হাত থেকে। থমকে গেল তার দুনিয়া। শাখা জমিদার পরিবারের কন্যা?