ফন্ট সাইজ:
থিম:
রক্তমুকুট

27

লেখক: জান্নাতুল ফেরদৌস

দেওয়ান বাবু প্রবীণ মানুষ। হাঁটে থেকে ফিরতে তার রাত হয়ে গেছে। বাড়িতে ছেলে ছেলের বউরা ঘুমিয়ে পড়েছে। জেগে আছেন তার স্ত্রী। উঠোনের কলসিতে রাখা পানি থেকে হাত-মুখ ধুয়ে ঘরে ঢুকলেন। স্ত্রী গেলেন খাবার গরম করতে। রসুইঘর টা শোবার ঘর থেকে বেশ দূরেই। বড় উঠানের এপাড় ওপার বলতে গেলে। তরকারির পাত্রটা হাতে নিয়ে আরেক হাতে হারিকেন ধরে গেল রসুইঘরের দিকে। পাটকাঠির বেড়া ঘরটায়। সামনে পাটকাঠি দিয়ে তৈরি ঝাপের দরজা। ঝাপ সরাতেই আঁতকে ওঠেন দেওয়ান গিন্নি। বাবা গো বলেই বুকো হাত দেন। রসুই ঘরের মেঝেতে টানটান হয়ে শুয়ে আছে এক পাগলী। হারিকেন ধরতেই পরিচিত ঠেকল মুখখানা। এ যে সেই বিশ্বাসঘাতিনী খুনী জমিদার কন্যা। আচমকা দেখায় ভয় পেয়ে গেছেন ভদ্রমহিলা। রাগ হলো তার বড্ড।

“তুই সেই খু'নী মহিলা চন্দ্রপ্রভা না? তুই আমার রসুই ঘরে ঢুকেছিস? এতবড় সাহস তোর? আজ তোর একদিন কি আমার একদিন দাঁড়া”

পিড়ির ওপর তরকারির পাত্র নামিয়ে রেখে হারিকেন হাতে রসুইঘরে ঢুকল সে। হাত ধরে টেনে তুলল চন্দ্রা কে।

“অ্যাই ওঠ, ওঠ বলছি। তোর মত অপয়ার জায়গা আমার বাড়ির ত্রিসীমানায় নেই। ওঠ বলছি”

পাগলী মাথা চুলকাতে চুলকাতে মহিলার টানে উঠে বসে। টেনে হিঁচড়ে ঘর থেকে বের করে তাকে।

“যা বেরো বলছি। নিজের বাপ-ভাই স্বামী সন্তান সব্বাই কে যে খুন করতে পারে সে আমাদের ও খুন করতে পারে। আহারে, পোলাডা কত্ত ভালো ছিল। ইশশশশ। আবিদের মুখ খান চোখে চোখে ভাসে। এই ডাইনি খুন করছে এত ভালো স্বামী ডারে আরেক নাগরের পাল্লায় পইড়া। বাইর হ নষ্টা আমর ঘর থিকা”

পাগলী যেতে চায় না। মহিলা টা টানে আরও শক্তি খাঁটিয়ে। বয়স বেড়েছে চন্দ্রপ্রভার। আগের মত সৌন্দর্যের ছিটেফোঁটাও নেই। পরনে ময়লা ছেড়া কাপড়। সাহাবাদের অলি-গলিতে ঘুড়ে বেড়ায়। দেওয়ান গিন্নি তাকে ঠেলে নিয়ে আসে বাড়ির বাইরে। কাঠের দরজা খুলে বের করে দেয় রাস্তায়। নগরে যাবার রাস্তার সাথেই দেওয়ান বাড়ি। রাস্তার ওই পাশে সাহাবাদ এর নদী। চন্দ্রপ্রভা যেতে চায়না। গিন্নি টেনে রাস্তায় দিতে গিয়ে কানে আসে নদী থেকে পুরুষালী হাঁক।

“তোমরা কে কোথায় আছো গোওওওওও? নদীতে লা’শ ভাইসা উঠছে এক লা'শ, লা’শ। নতুন বউ এর লাহান দেহা যায় গোওওও। হায় হায় হায় হায় রেএএএএ। মনে হয় বিয়ার আসর থিকা পলায়া নদীতে ঝাঁপ দিছে আত্মহত্যা করবার লাইগ্যা”

দেিয়ান গিন্নির শরীরের রক্ত যেন হিম হয়ে আসে। এগিয়ে যায় রাস্তার ওপাড়। জোৎস্নার আলোয় নদীর মাঝামাঝি দেখায় যায় ছোট্ট একটা নৌকা। তাতে জ্বলছে সোনালী মশাল। একজন জেলে দাঁড় বাইছে আর সমানে হাঁক-ডাক করে যাচ্ছে।

“তোমরা আগাই আসো গোওওও, কার জানি সব্বোনাশ হইছে। কার কন্যা জানি নদীতে ঝাপ দিলে গোওওওওও”

দেওয়ান গিন্নির চোখে পড়ল নৌকায় লাল পোশাক পড়া এক নিথর অবয়ব। ভাড়ি লাল পোষাকে নৌকার কোনায় লুটিয়ে আছে। আঁচল ভাসছে পানিতে। আঁচল মুখে চেপে আতঙ্কিত হয়ে বলল

“ইয়া মাবুদ! আজ তো জমিদার কন্যার বিয়ে ছিল”

পাগল চন্দ্রা কি ভেবে ছুটে চলল নদীর দিকে। গিন্নি দৌড়ে ভিতরে ঢুকে দেওয়ান কে খবর জানানোর জন্য

“ওগো শুনছোওওওও? সব্বোনাশ হয়ে গেছে গোওও”

***

সারাটা রাত কারও চোখে ঘুম নেই। সাহাবাদ মহলের প্রতিটি প্রহর কেটেছে উৎকণ্ঠায়। মিশরের রাজপরিবারের কেউই বুঝে উঠতে পারছে না কীভাবে এমন ঘটনা ঘটল। বিয়ের আগ মুহূর্তে একজন শাহজাদী মহল থেকে নিখোঁজ হয়ে গেল!

মেহেরুন্নেসা একবার জান্নাতের কক্ষের দিকে তাকাচ্ছেন, আবার দরজার দিকে। সুনেহেরা জায়নামাজে বসে হাত তুলে দোয়া করছেন।

শাখার কোনো খোঁজ নেই। সাহারাও স্থির হয়ে বসে থাকতে পারছে না। মুয়াজ অনেক আগেই সৈন্যদল নিয়ে বেরিয়ে গেছে। তার একটাই লক্ষ্য জান্নাতকে খুঁজে বের করা।

রাত তখন তৃতীয় প্রহর। আকাশে চাঁদ থাকলেও নদীর ওপর ঘন কুয়াশা নেমেছে। দূরের গাছপালাগুলো কেবল কালো ছায়ার মতো দেখা যাচ্ছে। অনেকটা পথ পেরিয়ে অবশেষে মুয়াজ ও তার সৈন্যদল নদীর তীরে এসে পৌঁছাল। সামনে বিশাল নদী। অন্ধকার পানির বুক যেন সীমাহীন।

মুয়াজ ঘোড়া থেকে নামল। সৈন্যদের দিকে তাকিয়ে বলল,

"নৌকা প্রস্তুত করো।"

কিছুক্ষণের মধ্যেই নদীর ঘাটে তিনটি বড় নৌকা প্রস্তুত হয়ে গেল। প্রতিটি নৌকায় মশাল জ্বলছে।

মুয়াজ নিজে মাঝের নৌকায় উঠল। তার সঙ্গে পাঁচজন মিশরীয় সৈন্য। বাকি সৈন্যদের দুই দলে ভাগ করে অন্য দুই নৌকায় পাঠানো হলো।

নৌকা ছাড়ার আগে মুয়াজ বলল,

"আমরা তিনদিকে যাব।"

একজন সৈন্য জিজ্ঞেস করল

"এভাবে ভাগ হয়ে গেলে যদি বিপদ হয়?"

মুয়াজ নদীর অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,

"এক জায়গায় সবাই খুঁজলে সময় নষ্ট হবে। নদীর ওপারে পথ তিনদিকে ভাগ হয়েছে। যে কোনো একটি পথে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়ে থাকতে পারে।"

তার কণ্ঠে দৃঢ়তা।

"যতক্ষণ না শাহজাদীকে পাওয়া যাচ্ছে, ততক্ষণ অনুসন্ধান বন্ধ হবে না।"

তিনটি নৌকা একসঙ্গে নদীর বুক চিরে এগিয়ে গেল। মাঝির বৈঠার শব্দ ছাড়া চারপাশে কোনো শব্দ নেই। ছলাৎ ছলাৎ করে পানি কেটে এগিয়ে যাচ্ছে নৌকা। মুয়াজ স্থির চোখে চারপাশ দেখছে।

কোথাও কোনো মানুষের চিহ্ন নেই। কিছুদূর যাওয়ার পর ডান পাশের নৌকাটি কুয়াশার আড়ালে চলে গেল। আরেকটু পর বাঁ পাশের নৌকাটিও দৃষ্টির বাইরে। এখন নদীর বিশাল অন্ধকারের মধ্যে শুধু মুয়াজের নৌকাটিই এগিয়ে চলছে। একজন সৈন্য মশালটা একটু উঁচু করে ধরল

"যুবরাজ..."

মুয়াজ তার দিকে তাকাল। সৈন্যটি নদীর সামনের দিকে আঙুল তুলল।

"ওদিকে কিছু একটা দেখা যাচ্ছে।"

মুয়াজ সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল।

"কোথায়?"

"ওই যে”

সবাই তাকাল। অন্ধকারের বুক চিরে ক্ষীণ একটা আলো দেখা গেল। খুব ছোট। নদীর মাঝামাঝি কিংবা ওপারের দিকে একটা ছোট্ট নৌকা। তার ভেতর একটা মশাল জ্বলছে। মুয়াজের চোখ সরু হয়ে গেল।

"মাঝি, নৌকাটা ওদিকে নাও।"

মাঝি বৈঠার গতি বাড়িয়ে দিল। ছোট্ট আলোটা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে লাগল। নৌকাটা খুব সাধারণ। মুয়াজ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল। এত রাতে নদীর মাঝখানে একটা ছোট নৌকা? তার ওপর আলো জ্বলছে? কেউ কি আছে সেখানে?

মুয়াজ হাত তুলে সৈন্যদের থামার ইশারা করল।

"সাবধান।"

পাঁচজন সৈন্য সঙ্গে সঙ্গে অস্ত্র হাতে নিল। মুয়াজ নিজের তরবারির হাতলে হাত রাখল। নৌকাটা ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে। দূরের ছোট নৌকার আলোটাও যেন তাদের দিকে এগিয়ে আসছে।

কিন্তু নদীর কুয়াশার কারণে ভেতরে কে আছে, কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। মুয়াজের বুকের ভেতর অজানা এক আশঙ্কা জমতে শুরু করল। নৌকা আরও কাছে এগিয়ে গেল। এখন আলোটা স্পষ্ট। মশালের নিচে একটি মানুষের অবয়ব দেখা গেল।

মুয়াজের হাত তরবারির বাঁটে আরও শক্ত হয়ে চেপে বসল।

"কে ওখানে?"

নদীর কালো বুকের ওপর তার কণ্ঠ প্রতিধ্বনিত হলো। কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো উত্তর এলো না।

শুধু নৌকার গায়ে নদীর ঢেউ আছড়ে পড়ার শব্দ।

ছোট্ট নৌকাটা থামল না। মুয়াজের নৌকাও তার পেছন পেছন এগিয়ে চলল। তবে সরাসরি কাছে গেল না। সমান দূরত্ব বজায় রেখে অনুসরণ করতে লাগল। ছোট নৌকাটার ভেতরে কেবল একটা ক্ষুদ্র লণ্ঠন জ্বলছে। সেই হলুদাভ আলোটুকুই অন্ধকার নদীর বুকের একমাত্র চিহ্ন।

মুয়াজ চোখ সরাচ্ছে না।

"ওদের চোখের আড়াল হতে দিও না।"

মাঝি মাথা নেড়ে আবার বৈঠায় জোর দিল। সৌভাগ্যবশত নদীর ঢেউও সেদিকেই বইছে। ফলে নৌকা বেশ দ্রুত এগিয়ে চলেছে। পেছনে সাহাবাদের তীর ক্রমশ দূরে সরে গেল। নদীর দুপাশের গাছপালাও কালো ছায়ার মত লাগছে।

কতটা পথ তারা পেরিয়ে এসেছে কেউ হিসাব রাখতে পারল না। মুয়াজের চোখ তখনও সেই ছোট্ট লণ্ঠনের আলোয় আটকে।

হঠাৎ আলোটা নিভে গেল। মুয়াজ সোজা হয়ে দাঁড়াল।

"থামাও!"

নৌকা ধীরে ধীরে গতি কমাল। চারপাশে তাকিয়ে কেউ কিছু দেখতে পেল না। মাত্রই তো নৌকাটায় আলো জ্বলছিল, সেখানে এখন শুধু ঘুটঘুটে অন্ধকার। মুয়াজ বলল,

"ওদিকে নাও।"

নৌকা ঘুরিয়ে পুরো জায়গাটা খুঁজে দেখা হলো।

কিন্তু ছোট নৌকার কোনো চিহ্ন নেই। না বৈঠার শব্দ না মশালের আলো। কিছুই নেই। একজন সৈন্য উদ্বিগ্ন স্বরে বলল,

"যুবরাজ, নৌকাটা যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেল।"

মুয়াজ কোনো উত্তর দিল না। তার চোখ তখন নদীর কালো পানির ওপর স্থির। এমন সময় মাঝি বলল,

"আর কতদূর যাবেন যুবরাজ? আমরা কিন্তু অনেকটা পথ চলে এসেছি।"

মুয়াজ তাকাল।

"কতটা?"

"যতদূর বুঝতে পারছি... আমরা সাহাবাদ সীমানার বাইরে চলে এসেছি।"

আরেকজন সৈন্য চারপাশ দেখে বলল,

"ঠিকই বলছে। এই অংশ থেকে নদী নাসিরাবাদ সীমান্তের দিকে পড়ে।"

মুয়াজ কিছুক্ষণ নীরব রইল। নাসিরাবাদ। নামটা তার মাথায় অদ্ভুতভাবে ধাক্কা দিল।

জান্নাত কি তবে……. তার চিন্তা শেষ হওয়ার আগেই একজন সৈন্য সামনে আঙুল তুলল।

"যুবরাআআআজ, ওদিকে দেখুন!"

মুয়াজ ঘুরে তাকাল। দূরে অন্ধকারের বুকের ওপর একটা অদ্ভুত অবয়ব দেখা যাচ্ছে। প্রথমে মনে হলো কোনো পুরোনো মিনার। কিন্তু নৌকা একটু এগোতেই অবয়াটা স্পষ্ট হলো। একটি উঁচু, সরু ভবন। চারপাশে কিছুই নেই। নদীর তীর ঘেঁষে একা দাঁড়িয়ে আছে। আর তার একেবারে মাথায় একটা আলো জ্বলছে। আলোটা স্থির নয়।

মাঝে মাঝে যেন ঘুরে চারপাশের অন্ধকার নদীকে আলোকিত করে আবার সরে যাচ্ছে। মুয়াজের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। তারপর আচমকা মনে পড়ল। বিলেত ভ্রমণের সময় এমনই কিছু স্থাপনা সে দেখেছিল। সমুদ্রের তীর ঘেঁষে উঁচু সরু ভবন। তার মাথায় আলো। জাহাজকে পথ দেখানোর জন্য নির্মিত। মুয়াজ খুব আস্তে বলল,

"লাইট হাউস..."

সৈন্যটি অবাক হয়ে তাকাল।

"লাইট... কী?"

মুয়াজ চোখ সরাল না।

"ইংরেজরা একে লাইট হাউস বলে।"

তার দৃষ্টি এবার আরও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল।

"কিন্তু এখানে এটা কে বানাল?"

কেউ উত্তর দিতে পারল না। কারণ নাসিরাবাদের এই অংশে এমন কোনো ভবনের কথা তাদের কারও জানা নেই। মুয়াজ দাঁড়িয়ে গেল। তার মনে হলো যে ছোট্ট নৌকাটাকে অনুসরণ করে এতদূর এসেছে, সেটি হঠাৎ অদৃশ্য হয়নি। ইচ্ছা করেই এই অন্ধকার জায়গায় এসে আলো নিভিয়েছে। এ একটা ফাঁদ ছিল। তারা ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেছে।

মস্তিষ্ক বিপদ সংকেতের আভাস দিতেই মুয়াজ ব্যস্ত হয়ে পড়লো

“মাঝিইইই, দ্রুত নৌকা ঘোরাও। জলদি জলদি। ওহহোওওও। এমন ভুল আমি কী করে করলাম? এরা কোথায় নিয়ে আসলো আমাদের”

মাঝি দ্রুত নৌকা বিপরীত দিকে চালানো শুরু করল। মুয়াজ চারিদিকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। কোথায় গেল লা'শ টা? ভেসে কি অনেকদূর চলে গেছে? বোধহয় সাহাবাদ সীমানার বাইরে। নয়তে এদিকেই তো থাকার কথা। মুয়াজের খাস কর্মচারী জাফরান বলল

“যুবরাজ, লা’শ টা তো এদিকেই থাকা উচিত ছিল। কেনো কুমির টুমিরে খেয়ে নিল নাকি?”

মুয়াজের ঠোঁটে ফুটল ফিচেল হাসি

“খেতে পারে। নারী শরীর সবারই তো পছন্দ”

মাঝির গা ঘেন্নায় রি রি করে ওঠে মুয়াজের কথা শুনে। কিন্তু মুয়াজ সত্যি সত্যিই ভাবছে এত পথে একবারও চোখে পড়ল না কেন? তার মানে সত্যিই কি কিছুতে খেয়ে নিল নাকি? নিলে নিক। আপদ টা জ্বালাচ্ছিল খুব। সব টা সবাই কে বলে দিলে কি কেলেঙ্কারিই না হতো।

অবশেষে উজানের প্রবল স্রোত কেটে নৌকাটি ধীরে ধীরে পাড়ের দিকে এগিয়ে এলো। রাতের অন্ধকার তখন আর আগের মতো ঘন নেই। পূর্ব আকাশে ফিকে আলো ফুটতে শুরু করেছে। ভোরের আগমনী বার্তা যেন চারদিকের কালো আকাশটাকে ধীরে ধীরে ধূসর করে তুলছে। মুয়াজ নৌকার একেবারে সামনের দিকে দাঁড়িয়ে। চোখ দুটো স্থির নদীর পাড়ে। হঠাৎ একজন সৈন্য উৎকণ্ঠিত স্বরে বলল,

“শাহজাদা…”

মুয়াজ তাকাল। পাড়ের কাছে অস্বাভাবিক ভিড়।

এত ভোরে নদীর ধারে এত মানুষ কেন?

নৌকা আরও কাছে আসতেই দৃশ্যটা পরিষ্কার হলো। গ্রামের কিছু মানুষ নদীর কিনারে দাঁড়িয়ে আছে। সবাই একে অপরের সাথে কি কি যেন বলাবলি করছে। কয়েকজন আবার আতঙ্কিত মুখে একে অপরের সঙ্গে কথা বলছে আর ছুটাছুটি করছে। মুয়াজের চোখ সরু হয়ে আসে।

“পাড়ে নিয়ে নৌকা থামাও।”

সৈন্যরা দ্রুত দাঁড় টেনে নৌকাটি পাড়ের কাছাকাছি নিয়ে এলো। মুয়াজ আর অপেক্ষা করল না। নৌকা পাড়ে ঠেকার আগেই লাফিয়ে নেমে গেল। তার চোখ আটকে গেল নদীর কিনারে। লাল পোশাক দেখা যাচ্ছে। একজন নারীকে নদীর স্রোত ভাসিয়ে এনে পাড়ের কাছে ফেলেছে। মুয়াজের পা যেন মাটিতে আটকে গেল। পেছন থেকে সৈন্যরা ছুটে এলো।

“শাহজাদা…”

মুয়াজ কোনো উত্তর দিল না। তার দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে সেই লাল পোশাকের দিকে। এগিয়ে গেল কাছে। চারপাশের মানুষের গুঞ্জন যেন ক্রমশ দূরে সরে যেতে লাগল। কেবল নিজের হৃদস্পন্দনটুকুই শুনতে পাচ্ছে সে। একজন বৃদ্ধ বলল,

“ভোরের একটু আগে নদীর স্রোতে ভেসে আসছিল। আমরা দেখে এখানে টেনে তুলেছি। মনে হয় কোনো নববধূ…”

মুয়াজের চোখ কঠিন হয়ে উঠল।

“মুখটা দেখা হয়েছে?”

লোকটি মাথা নাড়ল।

“না হুজুর। আমরা স্পর্শ করিনি।”

মুয়াজ আর কিছু বলল না। একজন সৈন্য এগিয়ে এসে তার দিকে তাকাল। শাহজাদার মুখের পরিবর্তন দেখে সেও থমকে গেল। মুয়াজ নিচু স্বরে বলল

“কেউ কাছে যাবে না।”

তারপর নিজের চোখে দেখার জন্য আরও এক পা এগিয়ে গেল। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে তার দৃষ্টি আটকে গেল নদীর স্রোতের দিকে। লাল পোশাকের নিচে যে কাপড়ের অংশটি ভেসে আছে, সেটার নকশা অদ্ভুতভাবে পরিচিত। প্রহরী দিয়ে খবর পাঠানো হয়েছে জমিদার মহলে। ভেসে আসা নারীর বর্ণনা শুনে তারা পাগল প্রায়। একে ভিড় জমতে দেখা গেল নদীর পাড় জুড়ে। এসে উপস্থিত হলো জমিদার পরিবারের লোকজনও। মুয়াজ কে এখানে দেখে তারা আরও আশ্চর্য হলো। বাইজিদ শাহ্ মুয়াজ কে বলল

“বাবা, তুমিও এখানে? ক..কে? কে এই মেয়ে।”

মুয়াজ বলল

“আমিও দেখিনি। মাত্রই আসলাম”

সাহারার এদের কথা শোনার ধৈর্য নেই। দ্রুত গিয়ে উপুর হয়ে থাকা নারীটিকে টেনে চিত করে শোয়ালো। দেহ নিথর, প্রাণহীন। উল্টে মুখ থেকে চুল সরাতেই মুয়াজের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। চিৎকার করে এসে ধরতে নিলেই তাকে ধমক দিল এক বজ্রকন্ঠ।

“দাঁড়াও”

লোকজন সরে যেতেই দেখা গেল এক হৃষ্টপুষ্ট শক্তিশালী পুরুষকে। বাইজিদ শাহ্ এর জোখ জোড়া চিকচিক করে উঠল

“মাহাদি! বন্ধু?”

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে 27 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন