মাহাদির কণ্ঠে বজ্রের মতো গর্জে উঠল। বাইজিদ শাহ বিস্ময়ে মাহাদির দিকে তাকিয়ে রইলেন। সুনেহেরা, মেহেরুন্নেসা, শাখা কারও মুখে কোনো কথা নেই। এমনকি সুলতান হামজা আল নাসিরও স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। বিশ্বাসঘাতক? কাকে বলছে মাহাদি? সৈন্যরা ইতস্তত করে মুয়াজের দিকে এগিয়ে গেল। মুয়াজ সম্পূর্ণ হুশে নেই। চোখ দুটো আধখোলা। শরীরের সমস্ত শক্তি যেন নিঃশেষ হয়ে গেছে। তবুও মাহাদির কথা কানে যেতেই সে মাথা তুলল। চোখাচোখি হলো দুজনের। মাহাদির চোখে আগুন। মুয়াজের চোখ জোড়া স্থির।
মুয়াজ নিজেই উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল। সৈন্যরা তাকে ধরে ফেলল।
“ছাড়ো।”
কণ্ঠটা দুর্বল হলেও আদেশের মতো শোনাল। একজন সৈন্য হাত সরিয়ে নিল। মুয়াজ সোজা হয়ে দাঁড়াল। তারপর মাহাদির দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপনি আমাকে বিশ্বাসঘাতক বললেন?”
মাহাদি এক পা এগিয়ে এলো।
“হ্যাঁ।”
“কিসের ভিত্তিতে?”
মাহাদির চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।
“কারণ আমি জানি ওই নারী কে।”
চারপাশে ফিসফাস শুরু হয়ে গেল। সুলতান হামজা এবার আর চুপ করে থাকতে পারলেন না।
“একজন সাবেক সেনাপ্রধান আমার ছেলের চরিত্রে কালি লাগাচ্ছে? এত বড় স্পর্ধা?”
মাহাদি তার দিকে তাকাল।
“তাহলে আপনার ছেলেকেই বলতে বলুন, কে হয় তার।”
সুলতান মাহাদিকে বলল
“তুমি কি এই মেয়েটিকে চেনো?”
“চিনি।”
সুলতানের কণ্ঠ আরও ভারী হলো।
“কে সে?”
মাহাদি নদীর পাড় থেকে উদ্ধার করা মেয়েটির দিকে তাকাল। তারপর বলল,
“সে মিশরের যুবরাজ মুয়াজ ইবনে হামজার স্ত্রী।”
কথাটা যেন পুরো মহলের ওপর বজ্রপাত করল।
“কি?!”
সুনেহেরার মুখ থেকে অনিচ্ছাকৃতভাবে বেরিয়ে এলো। মেহেরুন্নেসা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলেন।
বাইজিদ শাহ যেন নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছেন না।
“মুয়াজের স্ত্রী?”
সুলতান হামজা আল নাসিরও পাথরের মতো দাঁড়িয়ে গেলেন।
“তুমি কী বললে মাহাদি?”
মাহাদি এবার স্পষ্ট কণ্ঠে বলল,
“সৌদামিনী শেখ। মুয়াজের স্ত্রী।”
চারপাশ নিস্তব্ধ। উপস্থিতরা নিঃশ্বাস নিতেও ভুলে গেছে। সুলতান সন্দুহান চোখে ছেলের দিকে তাকালেন।
“মুয়াজ...”
মুয়াজ চোখ নামিয়ে ফেলল। সুলতানের কণ্ঠে এবার পিতার রাগের চেয়ে বিস্ময় বেশি।
“কি বলছে ও এসব? এটা কি সত্যি?”
মুয়াজ কোনো উত্তর দিল না।
“আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করছি, মুয়াজ। এই নারী কি সত্যিই তোমার স্ত্রী?”
দীর্ঘ নীরবতার পর মুয়াজ মাথা তুলল।
“জি।”
সুলতান যেন আকাশ থেকে পড়ল। বাইজিদ শাহ এগিয়ে এলেন।
“তাহলে আমার মেয়ের সাথে কি করেছো তাই বলো বেয়াদব”
মুয়াজের চোখে অপরাধবোধ নেই। অদ্ভুত ভারি চোখ জোড়া
“আমি জানি না। আমি কিছু করিনি”
বাইজিদ শাহের চোখ লাল হয়ে উঠল।
“জানো না?”
তিনি কাঁপা কণ্ঠে বললেন,
“আমার মেয়ের বিয়ের দিন তোমার সঙ্গে ঠিক হয়েছে। তুমি তাকে বিয়ে করতে সম্মত হয়েছ। তারপর আজ ভোরে নদীর পাড়ে তোমার স্ত্রীকে পাওয়া গেল। আর তুমি তাকে নিজের হাতে তুলে নিয়ে কাঁদছো!”
মুয়াজ চুপ। বাইজিদ শাহ্ এবার রেগে ওঠেন
“জান্নাত কোথায়? বলো মুয়াজ কি করেছো আমার মেয়ের সাথে?”
নিজের স্ত্রীর লা'শের সামনে এত কৈফিয়ত তার আসছে না।
“আমি জানি না বললাম তো।”
মাহাদি কঠিন স্বরে বলল,
“মিথ্যা বলো না। তোমার স্ত্রীকে লুকিয়ে রেখে সাহাবাদের শাহজাদীকে বিয়ে করতে এলে কেন?”
মুয়াজ চুপ করে রইল। মুয়াজ কোনো উত্তর দিল না। মাহাদি সৈন্যদের দিকে ফিরে বলল,
“ওকে কারাগারে নিয়ে যাও।”
সুলতান সঙ্গে সঙ্গে বললেন,
“থামো।”
সবাই তার দিকে তাকাল। সুলতান মুয়াজের কাছে এগিয়ে গেলেন। ওপর নিচ ভালো করে দেখে বলল
“নিয়ে যাও ওকে।”
মুয়াজ বিস্মিত হয়ে পিতার দিকে তাকাল।
“আব্বা…”
“আমিও জানতে চাই এই নোংরা খেলার পেছনে সত্যিটা কী।”
মুয়াজ মাথা নিচু করল। সুলতান বললেন,
“তুমি যদি নির্দোষ হও, সত্যি তোমাকেই মুক্ত করবে। আর যদি তুমি কোনো ষড়যন্ত্রের অংশ হয়ে থাকো...”
তিনি বাকিটা শেষ করলেন না। মাহাদি সৈন্যদের ইশারা করল। দুজন সৈন্য এসে মুয়াজের দুই পাশে দাঁড়াল। মুয়াজ আর কোনো প্রতিবাদ করল না। শুধু যাওয়ার আগে একবার সৌদামিনীর দিকে তাকাল। বুকে তীব্র ব্যথা অনুভূত হ। কারাগারের দিকে নিয়ে যাওয়া হলো তাকে।
****
সুনেহেরা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। চোখের সামনে শুধু জান্নাতের মুখটা ভাসে।
বিয়ের সাজে বসে থাকা সেই মেয়েটা কোথায়?
কীভাবে হারিয়ে গেল? শাখা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখে পানি।
“মনি মা...”
সুনেহেরা তাকালেন।
“জান্নাত আপা কোথায়? কোথায় গেল আমার আপা? প্রথমে সারা, তারপর আপা। কেউ কিছু বলছে না। না সারা আর না মাহাদি মামা”
দুপুরের আগেই নদীর পাড় থেকে উদ্ধার করা সৌদামিনীর জন্য স্থানীয় কবরস্থানে দাফনের ব্যবস্থা করা হলো। মেয়েটিকে কেউ চিনত না।
কেউ জানে না তার বাড়ি কোথায়। এমনকি কেউ এটাও জানেনা কীভাবে সে নদীতে এলো। শুধু এতটুকুই জানা গেল সে মুয়াজের স্ত্রী। আর তার নাম সৌদামিনী। মহলের কয়েকজন নারী তাকে শেষবারের মতো গোসল করিয়ে কাফনে জড়িয়ে দিল। কবরস্থানের দিকে যখন তাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন দূরে দাঁড়িয়ে ছিল শাখা। তার বুকের ভেতর কেমন একটা অস্বস্তি হচ্ছিল। এই মেয়েটির মৃত্যু কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। আর তার বোনের নিখোঁজ হওয়াও নয়। দুটো ঘটনা একই রাতের। সব কেমন গোলমাল লাগছে। একটা রাতে কত গুলো ঘটনা ঘটল।মাহাদি ইকরাম এত বছর পর ফিরে এসেছে। মুয়াজ বন্দি। সৌদামিনী মৃত। জান্নাত নিখোঁজ।
সৌদামিনির খাটিয়া বহন করঋে সাহাবাদ এর সৈন্যরা। বাইজিদ শাহ্ জানিয়ে ছিলেন সুলতান কে, সে পুত্রবধূর লা'শ নিজ রাজ্যে দাফন করতে চান কিনা। সুলতান অসম্মতি জানিয়েছেন।
কবরের মাটি চাপা দেওয়া শেষ হলো।
অচেনা এক নারীর জন্য এত মানুষের উপস্থিতি। সাহাবাদে এমন দৃশ্য অস্বাভাবিকতার অংশ হয়ে গেছে। মাটি থেকে উঠে দাঁড়ালেন বাইজিদ শাহ। মুখটা ভার হয়ে আছে। পাশে মেহেরুন্নেসা। সুনেহেরা বারবার আঁচল দিয়ে চোখ মুছছেন। শাখাও নিশ্চুপ। আর সাহারা একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে। অস্বাভাবিক রকম চুপ। সৌদামিনীকে মাটির নিচে রেখে আসা হলো। কোনো কিছুই তার মাথায় ঠিকমতো ঢুকছে না।
কবরস্থান থেকল সবাই মহলের দিকে ফিরতে শুরু করল। সাহারা পরিবারের সবার সঙ্গে হাঁটছিল। হঠাৎ তার দৃষ্টি গিয়ে আটকে গেল নগরের প্রবেশপথের দিকে। দুজন অশ্বারোহী। একটি ঘোড়ার পিঠে পাশাপাশি বসে আছে দুজন পুরুষ। পোশাক দেখে সাধারণ পথিক মনে হলেও তাদের চেহারায় একটা অদ্ভুত অপরিচিত ভাব। মাথায় টুপি, গায়ে ভিন্ন ধরনের পোশাক।
সাহারা হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ থেমে গেল। এই দুজনকে সে চিনেছে। ওদেরই তো সেই বনবাংলোয় দেখেছিল। ওদের হাতেই তো সে, মেহরাব আর আলীরাজ বন্দি হয়েছিল। এরা ইংরেজ সৈনিক। সাহারার চোখে মুহূর্তেই আগের দিনের সমস্ত ঘটনা ভেসে উঠল। আর পালিয়ে আসার পরও তাদের আবার বন্দি হওয়ার বিষয়টা যেন আরও ঘেনৃনা ধরিয়ে দেয় তার মনে।
ঠোঁটের কোণে অতি সামান্য একটা বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। কেউ খেয়াল করার আগেই সাহারা পরিবারের লোকজনের ভিড় থেকে সরে গেল।
তারপর সুনিপুনভাবে পথ বদল করল। বিকল্প পথে এসে একটা পুরনো দেয়ালের আড়ালে গিয়ে দাঁড়াল। সেখান থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল ইংরেজ দুজনকে।
“আজ এই হনুমান দুটোকে আচ্ছা করে শিক্ষা দিব।”
তারা নগরের বাজারের দিকে ঢুকল। কিছুক্ষণ পর দুজনের একজন কয়েকটা ফলমূল কিনে নিল। ঝুড়িতে করে আম, পেয়ারা আর আরও কিছু ফল তুলে নিল তারা। সাহারা দূর থেকে সব দেখল।
চোখ গেল সামনের রাস্তার দিকে। রাস্তার পাশে পুরনো একটা বাগানবাড়ি। বাড়িটা বহুদিন ধরে পরিত্যক্ত। চারপাশে ঝোপঝাড়। তার পাশেই একটা পুরনো কুয়ো। কুয়োটার মুখ প্রায় আগাছায় ঢাকা। সাহারার চোখে দুষ্টু ঝিলিক দেখা দিল। কয়েকদিন আগেই জায়গাটা সে দেখেছিল। আর তখনই মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছিল। আজ বোধহয় সেই বুদ্ধির সময় এসেছে। সাহারা আর দাঁড়াল না। চুপচাপ অন্য একটা পথ ধরে এগিয়ে গেল।
কিছুক্ষণ পর ইংরেজ দুজন বাজার থেকে বেরিয়ে এলো। ঘোড়ায় আবার চড়ে বসল তারা। একজন হাতে ফলের ঝুড়ি সামলে বসেছে। অন্যজন লাগাম ধরে আছে। নগর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য তারা সেই পথেই এগোতে লাগল। সবকিছু স্বাভাবিক। কেউ জানে না সামনে কী অপেক্ষা করছে। বাগানবাড়ির কাছাকাছি আসতেই ঘোড়াটা হঠাৎ অস্বাভাবিকভাবে গতি কমিয়ে দিল। আর ঠিক পরের মুহূর্তেই হড়কে গেল ঘোড়ার পা!
“আউহহ শিট!”
চিৎকার করে লাগাম টানল অশ্বারোহী। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ঘোড়াটা আচমকা লাফ দিয়ে একপাশে সরে গেল। দুজন আর নিজেদের সামলাতে পারল না।বএকজনের হাত থেকে ফলের ঝুড়ি ছিটকে গেল।
“আহ্!”
দুজনই ভারসাম্য হারিয়ে পাশের ঝোপের দিকে গড়িয়ে পড়ল। ধপাস! করে ঝোপের আড়ালে থাকা পুরনো পরিত্যক্ত কুয়োর মুখের ওপর পড়ল তারা। মুহূর্তের মধ্যেই দদুজন গভীল কূয়োয় পঠে গেল। ঘোড়াটা ভয় পেয়ে হ্রেষাধ্বনি করে দৌড়ে পালিয়ে গেল।
কিছু দূরে একটা গাছের আড়াল থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে এলো সাহারা। মুখে অদ্ভুত সন্তুষ্টি। হাতে এক খানা ডাসা পেয়ারা। সে কুয়োর দিকে ঝুকে বলল
“লাল বানর দুটো কি নেআে আঋিস? নাকি পড়েই অক্কা পেলিরে। এবার বুঝবি আমাকে বন্দি করে রাখার মজা”
খিলখিলিয়ে হেসে নিজের ওড়নাটা ঠিক করতে করতে বলল,
“মরিস নি তো?”
কুয়োর ভেতর থেকে কোনো উত্তর এলো না। সাহারা একটু ঝুঁকে নিচে তাকাল। অন্ধকার।
কিছু দেখা যাচ্ছে না। সে আবার সোজা হয়ে দাঁড়াল।
“বেঁচে থাকলে নিজে নিজেই বের হবে।”
বলেই ঘুরে দাঁড়াল। দুই পা এগিয়ে আবার থামল।
পেছন ফিরে কুয়োটার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,
“তাহলে সাহাবাদে এসে আজকের দিনটা মনে রাখার মতোই হয়েছে তোমাদের।”
তারপর একেবারে নিরীহ মুখ করে পরিবারের লোকজনের কাছে ফিরে গেল সাহারা। যেন কিছুই হয়নি, সারাক্ষণ সবার সঙ্গেই ছিল। কিন্তু তার মুখের সেই চাপা হাসিটা দেখে শাখা একবার কপাল কুঁচকে তাকাল।
“তুই কোথায় গিয়েছিলি?”
সাহারা চোখ বড় বড় করে বলল,
“আমি? কোথাও না তো!”
শাখা সন্দেহের চোখে তাকিয়ে রইল।
“তোর কি এমন সময়েও বাদড়ামো যাবে না সারা?”
সাহারা সঙ্গে সঙ্গে মুখ গম্ভীর করে ফেলল।
“কই?”
“কিছু একটা করেছিস।”
“আমি?”
সাহারা নিজের বুকের দিকে আঙুল তুলে এমন ভঙ্গি করল যেন পৃথিবীর সবচেয়ে নিরীহ মানুষটি সে।
“আমি তো কবরস্থান থেকেই সোজা আসছি।”
শাখা আর কিছু বলল না। তর্ক করতে মন চাচ্ছে না তার। কিন্তু সাহারার মুখের কোণে আবারও যে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। সেটা তার চোখ এড়াল না।
রাত অনেক গভীর হয়েছে। সাহাবাদ মহলের চারপাশে নেমে এসেছে নিস্তব্ধতা। দূরে কোথাও প্রহরীর পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে মাঝে মাঝে। বাতাসে রাতের শীতলতা। অথচ সাহারার চোখে ঘুম নেই। জান্নাত আপার কথা বারবার মনে পড়ছে। কোথায় আছে সে? কেউ কি তাকে নিয়ে গেছে? নাকি নদীর পাড়ে থেকে সেই জেলে কোথাও নিয়ে গেছে। সাহারা সঙ্গে সঙ্গে মাথা ঝাঁকাল।
“না না। ওটা আপা না।”
নিজেকেই যেন বোঝালো সে। কিন্তু মন তো আর যুক্তি বোঝে না। কিছুক্ষণ পরপরই বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠছে। চোখ বন্ধ করলেই আপার মুখটা ভেসে উঠছে। বিয়ের সাজে বসে থাকা সেই শান্ত মুখ। তারপর হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যাওয়া। সাহারা এপাশ-ওপাশ করতে করতে একসময় বিরক্ত হয়ে চাদরটা সরিয়ে ফেলল।
“উফফ! ঘুম ও আসছে না”
দীর্ঘক্ষণ এমন করেই কেটে গেল। অবশেষে ক্লান্ত শরীরের কাছে মন হার মানল। চোখের পাতা ভার হয়ে এলো। মাত্র ঘুমটা একটু গভীর হতে শুরু করেছে ওমনি ধপাস! করে কক্ষের ভেতর বিকট শব্দ হলো। সাহারা মুহূর্তেই ধড়মড় করে উঠে বসল। চোখ বড় বড় হয়ে গেল। ফুলদানি মেঝেতে পড়ে ভেঙে ছড়িয়ে আছে। তার ঘুম মুহূর্তেই উধাও। কক্ষের অন্ধকারে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে। সাহারার হাত স্বভাবতই পাশে রাখা ছোট ছুরিটার দিকে চলে গেল। এত রাতে তার কক্ষে কেউ ঢুকেছে! এক মুহূর্তও দেরি করল না সাহারা। বিছানা থেকে লাফ দিয়ে উঠে লোকটার দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। কিন্তু তার আগেই একটি শক্ত হাত এসে তার মুখ চেপে ধরল। সাহারা ছটফট করে উঠল।
“উমমমম!”
লোকটা তাকে শক্ত করে ধরে ফিসফিস করে বলল,
“চুপ!”
সাহারার চোখ ক্রোধে জ্বলে উঠল। হাতটা সরিয়ে নেওয়ার জন্য ধস্তাধস্তি করতে করতে হঠাৎ তার চোখ পড়ল লোকটার মুখের দিকে। অন্ধকারের মধ্যেও পরিচিত সেই চোখ দুটো চিনতে তার এক মুহূর্তও লাগল না। সাহারার চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল।
“যুবরাজ! আপনি?”
মেহরাব তার মুখ থেকে হাত সরিয়ে নিল।
সাহারা কয়েক মুহূর্ত নির্বাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ফিসফিস করে বলল,
“আপনি এত রাতে এখানে…..!”
মেহরাব ঠোঁটে আঙুল রাখল।
“আস্তে।”
সাহারা এবার রাগে ফুঁসতে লাগল।
“আপনি আমার ঘরে ঢুকলেন কীভাবে?”
“জানালা দিয়ে।”
“এই গভীর রাতে?”
“হ্যাঁ।”
“মানে কি? কেন?”
মেহরাব কোনো উত্তর দিল না। সাহারা চোখ সরু করে তাকিয়ে রইল। লোকটার মতিগতি ভালো ঠেকছে না
“কী চান?”
মেহরাব এবার সাহারার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে।
কঠিন মুখটা আজ অদ্ভুত ক্লান্ত দেখাচ্ছে।
“সেই যে মহলে ছেড়ে গেলাম। দুইটা দিন পেরিয়ে গেল। কই খোঁজও তো নাও নি একবারও”
সাহারা ঘোরের মধ্যে আছে যেন
“দুদিন ধরে তোমাকে দেখিনি।বভেবেছিলাম হয়তো বেরোবে। অনেকক্ষণ অপেক্ষাও করলাম। আসলে না”
সাহারা এবার আস্তে করে জিজ্ঞেস করল,
“তাই?”
মেহরাব মুখ ফিরিয়ে নিল।
“তাই থাকতে পারছিলাম না।”
সাহারা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। মেহরাব এর এমন রুপ প্রথম দেখল। সাহারা ধীরে ধীরে বলল,
“আমার জন্য?”
মেহরাব তার দিকে তাকাল। কিছু বলল না। সাহারার বুকের ভেতর অকারণে কেমন একটা শব্দ হলো। সে তাড়াতাড়ি মুখ ঘুরিয়ে নিল।
“আপনি একদম পাগল। কেউ এভাবে মাঝরাতে অন্যের ঘরে আসে?”
মেহরাব মেঝেতে পড়ে থাকা ফুলদানির টুকরোগুলোর দিকে তাকিয়ে বলল,
“তুমি আমাকে আক্রমণ করতে এসেছিলে।”
সাহারা গম্ভীর মুখে বলল,
“শত্রু ভেবেছিলাম।”
“তাই?”
“হ্যাঁ।”
মেহরাবের ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি ফুটল।
“ভালোই হয়েছে। আগের মতোই আছো।”
সাহারা ভ্রু কুঁচকাল।
“আগের মতো মানে?”
মেহরাব আর কিছু বলল না। শুধু কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল সাহারার দিকে। তারপর বলল,
“জান্নাতের কোনো খবর পেয়েছ?”
প্রশ্নটা শুনেই সাহারার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
সে মাথা নাড়ল।
“না।”
মেহরাব সাহারার পালঙ্কে বসলো। সাহারাকে ও বসার জন্য ইশারা করল। সাহারা বসতেই বলতে শুরু করল
“আমাদের দুজনকে এক হয়ে খুঁজতে হবে। কী কী তথ্য আছে আমাকে জানাও”
“দেওয়ান গিন্নি দেখেছে এক জেলে নববধূর লা…..মানে লা'শ কিনা নিশ্চিত না। তো, নিয়ে যেতে দেখেছে। সে আবার চেঁচিয়ে বলছিলো নদীতে নববধূর লা’শ পাওয়া গেছে।”
মেহরাব ভেবে বলল
“নদীর ওইপাড় টা নাসিরাবাদ সীমান্তে পড়ে। তার শেষের দিকে পাহাড়ি এলাকা। ওদিকে অল্প কিছু জনসমাগম আছে, না থাকার মতই আরকি। কাল একবার সেদিকে যাব বরং তুমি আর আমি। কি বলো?”
সাহারা কিছু বলতে যাবে ওমনি দরজা ধাক্কা দেয় কেউ একজন। ওপাশ থেকে ভেসে আসে সুনেহেরার গলা
“সারা মা দরজা খোল!”