ফন্ট সাইজ:
থিম:
রক্তমুকুট

30

লেখক: জান্নাতুল ফেরদৌস

“সাহারা, ঘুমিয়ে পড়েছিস?”

সাহারা ফিসফিস করে বলল,

“এই রে! মণি মা। এবার কি হবে?”

তারপর মেহরাবের দিকে তাকিয়ে চোখ বড় বড় করে বলল,

“আপনি এখন কোথায় যাবেন?”

মেহরাব নির্বিকার।

“যেখান দিয়ে এসেছি।”

“জানালা দিয়ে?”

“হ্যাঁ।”

সাহারা তাড়াতাড়ি জানালার দিকে তাকাল। তারপর ঘরের দিকে।

“কিন্তু আপনাকে যদি কেউ দেখে ফেলে?”

মেহরাব ভ্রু কুঁচকাল।

“তাহলে?”

সাহারা প্রায় ফুঁসে উঠল।

“তাহলে কী! এভাবে মাঝরাতে আমার ঘরে একজন পুরুষকে দেখলে সবাই কী ভাববে?”

মেহরাব কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর শান্ত স্বরে বলল,

“কম খারাপ বলো নি। তোমার কথাই ঠিক।”

“তাহলে তাড়াতাড়ি যান! এই? মানে? কম খারাপ মানে? মানে বেশি খারাপ?”

“কম খারাপ কখন বললাম? আমি তো না ই বললাম”

বাইরে আবার কড়া নাড়ার শব্দ হলো।

“সারা, দরজা খোল মা।”

সাহারা ছুটে গিয়ে জানালাটা খুলে দিল।

“যান!”

মেহরাব একবার তার দিকে তাকাল। তারপর চুপচাপ জানালা দিয়ে বাইরে নেমে গেল। সাহারা দ্রুত জানালাটা বন্ধ করে দিল। কিন্তু ঠিক তখনই তার চোখ আটকে গেল মেঝের ওপর। মেহরাবের মুখ ঢেকে রাখা কালো কাপড়টা সেখানে পড়ে আছে। সাহারা সেটা হাতে তুলে নিল।

“এই লোকটাও না!”

বাইরে আবার সুনেহেরার ডাক।

“দরজা খুলবি?”

সাহারা তাড়াতাড়ি কাপড়টা বালিশের নিচে গুঁজে দিল। তারপর মুখে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক ভাব এনে দরজা খুলল। সুনেহেরা হাতে একটা পিতলের পেয়ালা নিয়ে দাঁড়িয়ে।

“এতক্ষণ লাগল কেন?”

সাহারা হাই তোলার ভান করে বলল,

“ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।”

সুনেহেরা কক্ষে ঢুকে চারদিকে একবার তাকালেন। মেঝেতে পড়ে থাকা ভাঙা ফুলদানির দিকে চোখ যেতেই ভ্রু কুঁচকে গেল।

“এটা আবার কী?”

সাহারা এক মুহূর্ত থমকাল।

“আমি... ঘুমের মধ্যে হাত লেগে ফেলে দিয়েছি।”

সুনেহেরা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“তোর কাণ্ডকারখানা একদিন আমাকে পাগল করে ছাড়বে।”

তারপর পেয়ালাটা এগিয়ে দিয়ে বললেন,

“এই দুধটা খেয়ে নে। সারাদিন কিছু ঠিকমতো খাসনি।”

সাহারা পেয়ালাটা হাতে নিয়ে মাথা নাড়ল।

“আচ্ছা মণি না।”

সুনেহেরা আর কিছু বললেন না। মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বেরিয়ে গেলেন। দরজা বন্ধ হতেই সাহারা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। তারপর সঙ্গে সঙ্গে জানালার দিকে ছুটে গেল। আস্তে করে পর্দাটা সরিয়ে বাইরে উঁকি দিল। দূরে মহলের পেছনের অন্ধকার পথ। তার একটু পরেই একটা কালো ঘোড়া দাঁড়িয়ে। ঘোড়ার পিঠে মেহরাব।

চাঁদের আবছা আলোয় তার অবয়ব স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। সাহারা জানালার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে রইল। মেহরাবও যেন কোনোভাবে বুঝতে পারল সে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ সে ঘোড়ার লাগাম টেনে ঘুরে দাঁড়াল। তারপর একবার হাত তুলে বিদায়ের ইশারা করল। সাহারার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল। সেও খুব আস্তে করে হাত নাড়ল। মেহরাব আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না।

ঘোড়ার পিঠে চেপে ধীরে ধীরে অন্ধকারের ভেতর মিলিয়ে গেল। সাহারা জানালার ধারে দাঁড়িয়েই রইল। তার হাতে তখনও মেহরাবের মুখ ঢেকে রাখা কালো কাপড়টা। অজান্তেই কাপড়টার দিকে তাকিয়ে সাহারা বিড়বিড় করে বলল,

“দুদিন আমাকে না দেখে থাকতে পারছিলেন না...”

মুখে আবার সেই চাপা হাসি ফুটে উঠল।

“বড্ড অদ্ভুত মানুষ। ভালোবেসে শহীদ হয়ে যাবে কিন্তু স্বীকার কীরবে না”

*****

রাতের অন্ধকার ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে।

পূর্ব আকাশে ভোরের আভা ফুটতে শুরু করেছে। পাহাড়ের গায়ে জমে থাকা কুয়াশা সরে যাচ্ছে। কোথাও সাদা মেঘের মতো কুয়াশা পাহাড়ের ঢালে লেপ্টে আছে, কোথাও আবার নিচের উপত্যকাকে পুরোপুরি ঢেকে রেখেছে।

দূরে পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে গেছে সরু এক নদী। ভোরের আলোয় তার জল রুপোর ফিতের মতো ঝিকমিক করছে। নদীর ওপারে সারি সারি সবুজ পাহাড়। পাহাড়ের গায়ে গায়ে বুনোফুল। ওপাড়ে পাইন গাছের সারি, বিশাল পুরনো বৃক্ষের ডালপালা কুয়াশার ভেতর হারিয়ে গেছে। পাখিদের ডাক ভেসে আসছে চারদিক থেকে।

এই শান্ত সৌন্দর্যের মাঝেই কাঠে কুড়ালের আঘাত পড়ছে ধুপধাপ।

পাহাড়ের চূড়ার কাছাকাছি দাঁড়িয়ে কাঠ কাটছে এক যুবক। গায়ে সাদামাটা ফতুয়া। পরনে ঢিলেঢালা পায়জামা। কোমরের কাছে নিজের গায়ের শালটা শক্ত করে বেঁধে নিয়েছে। মাথায় মোটা মাফলার প্যাঁচানো। ভোরের ঠান্ডায় নিঃশ্বাস ছাড়লেই মুখের সামনে ধোঁয়ার মতো বাষ্প দেখা যাচ্ছে। তবুও তার কপালে বিন্দুমাত্র বিরক্তি নেই।

শক্ত হাতে কুঠার চালিয়ে চলেছে নিজের মনে।

চেহারায় অদ্ভুত এক সৌন্দর্য। পাহাড়ি রোদে পুড়ে যাওয়া তামাটে আভা। এলোমেলো কালো চুলের কিছু অংশ মাফলারের নিচ থেকে বেরিয়ে এসেছে। চোখ দুটো গভীর আর শান্ত। মুখে সারল্যের ছাপ থাকলেও শরীরের গড়ন দেখে বোঝা যায় পাহাড়ি জীবনের কঠিন পরিশ্রম তার কাছে নতুন কিছু নয়। ছেলেটার নাম ইয়ামিন।

এই পাহাড়েরই ছেলে। জন্ম থেকে এই পাহাড়, নদী আর জঙ্গলই তার পৃথিবী। হঠাৎ পেছন থেকে একটা কর্কশ অথচ স্নেহভরা কণ্ঠ ভেসে এলো,

“ও ইয়ামিন!”

কুঠারের আঘাত থেমে গেল। ইয়ামিন ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। পেছনে দাঁড়িয়ে তার দাদিমা। মাথায় পুরোনো চাদর জড়ানো। হাতে একটা বাঁশের ঝুড়ি। হাঁটতে হাঁটতে হাঁপিয়ে উঠেছেন বটে, কিন্তু মুখে উত্তেজনার কমতি নেই।

“দাদি, এত সকালে এখানে আইছো ক্যান?”

দাদিমা চোখ বড় বড় করে বললেন,

“তুই আবার কাঠ কাটসোস! আর আমি নিচে যাইয়া ওই মাইয়ারে দেইখা আইলাম।”

ইয়ামিন ভ্রু কুঁচকাল।

“কোন মাইয়া?”

দাদিমা এবার মুখে বিরক্তি এনে বলল

“ওই যে নদী থেইকা তুই যেই মাইয়াডারে কুড়াইয়া আনছোস!”

ইয়ামিন দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

“দাদি, কুড়াইয়া আনি নাই। নদীতে নৌকা উল্টাইছিল। মাইয়াডা ভাসতেছিল। আমি না আনলে….”

“হ, হ, বুঝছি বুঝছি।”

দাদিমা হাত নেড়ে তাকে থামিয়ে দিলেন।

“কিন্তু মাইয়াডা যে কী সুন্দর!”

ইয়ামিন চুপ করে গেল। দাদিমা এবার একেবারে মুগ্ধ হয়ে বলতে লাগলেন,

“আল্লাহ গো! এমন চেহারা আমি জীবনে কয়জনের দেখছি ক? মুখখান একেবারে চাঁদের মতো। চুলগুলা কালো, এত লম্বা! চোখ দুইটা দেখলে মনে হয় ঘুমের মধ্যেও মানুষরে তাকাইয়া দেহে।”

ইয়ামিন বিরক্ত মুখে বলল,

“ঘুমের মধ্যে চোখ দেখলা কেমনে?”

দাদিমা সঙ্গে সঙ্গে বললেন,

“আরে চোখ তো বন্ধ আছিল। তবু বুঝছি!”

ইয়ামিন হেসে ফেলল|

“তুমি আবার শুরু করছো।”

দাদিমা এবার একটু নিচু স্বরে বললেন,

“কিন্তু জ্ঞান তো ফেরে নাই এখনও।”

ইয়ামিনের হাসি মিলিয়ে গেল।

“কবিরাজ দেখান লাগব মনে হয়”

“আমাদের গ্রামে কবিরাজ কই দাদি?”

“হাকিমরে খবর দিছোস?”

“দিছি। আসবে দুপুরের দিকে।”

দাদিমা মাথা নাড়লেন।

“আল্লাহ যেন মেয়েডারে বাঁচায়।”

কিছুক্ষণ নীরব থেকে আবার চোখ সরু করে ইয়ামিনের দিকে তাকালেন।

“তবে একটা কথা ক।”

ইয়ামিন বুঝে গেল। তবুও বলল

“আবার কী?”

“তুই কিন্তু কোনো কাণ্ড করিস নাই তো?”

“কী কাণ্ড?”

দাদিমা সন্দেহভরা চোখে তাকিয়ে বললেন,

“নিজের ওই প্রেমিকার লগে ঝগড়া কইরা আবার বিয়া থেইকা পালাইয়া কোনো মাইয়া ভাগাইয়া আনছোস নাকি?”

ইয়ামিনের কপালে ভাঁজ পড়ল।

“দাদি!”

“কী হইছে? আগেও তো করছিলি।”

“আমি কোনো মাইয়া ভাগাইয়া আনি নাই।”

“ওই ছেড়িরে ভুলবার না পাইরা আবার অন্য কাওরে ভাগাই আনতে পারস।”

দাদিমা বিশ্বাস করলেন কি না বোঝা গেল না।

“দেখ, আমি কিন্তু সব বুঝি। তোর ওই প্রেমিকার কথা আমি জানি।”

“ওসব অনেক পুরোনো কথা।”

“পুরোনো হইলেও প্রেম তো পুরোনো হয় না!”

ইয়ামিন এবার কুঠারটা মাটিতে রেখে দাদির দিকে তাকাল।

“দাদি, তুমি নিচে যাও। আমি একটু পরেই আসছি।”

দাদিমা যাওয়ার আগে আবার বললেন,

“মাইয়াডারে কিন্তু খুব সুন্দর লাগতেছে। জ্ঞান ফিরলে নাম জিগাইস। কোন বাড়ির মাইয়া কে জানে!”

ইয়ামিন মাথা নাড়ল। দাদিমা ধীরে ধীরে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচে নেমে গেলেন। ইয়ামিন কিছুক্ষণ তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর চোখ চলে গেল নিচের ছোট্ট কাঠের বাড়িটার দিকে। সেখানেই শুয়ে আছে সেই অচেনা নারী।

গতরাতে নদীতে নৌকা নিয়ে মাছ ধরতে গিয়েছিল সে। হঠাৎ নদীর স্রোত অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। প্রচণ্ড ঢেউয়ে নৌকাটা একসময় উল্টে যায়।

সাঁতরে কোনোমতে তীরে ওঠার পরই তার চোখে পড়ে নদীর স্রোতে ভেসে থাকা এক নারী। লাল পোশাক পানিতে ছড়িয়ে ছিল। আর কোনো চিন্তা না করেই নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিল ইয়ামিন।

অনেক কষ্টে মেয়েটিকে টেনে তুলেছিল নৌকার অবশিষ্ট অংশের কাছে। তারপর নিজের জীবন বিপন্ন করে তাকে নিয়ে এসেছিল তীরে। মেয়েটি তখনও অচেতন। এখনও জ্ঞান ফেরেনি। কে সে? কোথা থেকে এসেছে? কীভাবে নদীতে পড়ল?

কেউ জানে না। ইয়ামিনও না।

পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ইয়ামিন আবার নিচের বাড়িটার দিকে তাকাল। কুয়াশার পর্দার আড়ালে বাড়িটা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আর সেই বাড়ির ছোট্ট একটি কক্ষে জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে বেহুশ হয়ে পড়ে আছে সাহাবাদের শাহজাদী জান্নাত। তার পরিচয় এখনও কেউ জানে না। তারা জানে না, যে মেয়েটিকে নদী এত দূরে এনে ফেলেছে, তার জন্য এক রাজ্য তখনও অস্থির হয়ে আছে। আর জান্নাত নিজেও জানে না তার ভাগ্য তাকে কোন অচেনা পাহাড়ি গ্রামে এনে ফেলেছে।

পাহাড়ের চূড়া থেকে নেমে কিছুক্ষণ পরেই ইয়ামিন আর তার দাদিমা নিজেদের ছোট্ট বাড়িটার সামনে এসে দাঁড়াল। কাঠ আর মাটির তৈরি পুরোনো বাড়ি। চারপাশে বুনো লতা-পাতা জড়িয়ে আছে। সামনে ছোট্ট উঠান। একপাশে শুকনো কাঠের স্তূপ, অন্যপাশে মাটির চুলা। পাহাড়ি বাতাসে শুকনো পাতাগুলো মাটির ওপর ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

ইয়ামিন কুঠারটা একপাশে রেখে ঘরের দরজার কাছে দাঁড়াল।

“দাদি, আমি হাত-মুখ ধুইয়া আসি।”

“যা ভাই। গরম খিচুড়ি আর শাক সিদ্ধ করছি। খাবি আইসা”

ইয়ামিন পাশের দিকে এগিয়ে গেল। একটু পরেই হঠাৎ দাদিমার চিৎকারে পুরো উঠান কেঁপে উঠল।

“ইয়ামিন!”

ইয়ামিন ছুটে এলো।

“কী হইছে?”

দাদিমা কাঁপতে কাঁপতে বললেন,

“মাইয়াডা ঘরে নাই!”

ইয়ামিন থমকে গেল।

“কী?”

“আমি একটু রান্নাঘরের দিকে গেছিলাম। আইসা দেখি বিছানা খালি! কোথায় গেল মাইয়াডা?”

ইয়ামিনের মুখ মুহূর্তেই গম্ভীর হয়ে গেল।

“দরজা তো বন্ধ আছিল?”

“ছিল।”

“তাহলে গেল কই?”

দুজনেই চারদিকে তাকাতে লাগল। বাড়ির সামনে নেই। পেছনের দিকেও নেই। ইয়ামিন দ্রুত চারপাশে চোখ বুলাল।

“দাদি, তুমি এইদিকে খুঁজো। আমি ওপাশে দেখি।”

“ওরে বাবা, মেয়েটা তো এখনও দুর্বল! পাহাড়ের রাস্তা চিনে না, কোথায় যে গেছে!”

ইয়ামিন আর দেরি করল না। ঠিক তখনই দূর থেকে পানির টুপ টুপ শব্দ কানে এলো।

পাহাড়ি অঞ্চলে বাড়ির কাছাকাছি বড় মাটির কলস বা পুকুর সবসময় পাওয়া যায় না। অনেক জায়গায় পাহাড়ের বুক থেকে বের হওয়া প্রাকৃতিক ঝরনার পানি বাঁশ কেটে বানানো সরু নল দিয়ে নিচে নামিয়ে একটি কাঠের বা পাথরের জলাধারে জমিয়ে রাখা হয়। গ্রামের মানুষ সেখান থেকেই পানি সংগ্রহ করে। তাদের বাড়ির একটু নিচেও তেমনই একটা জায়গা ছিল। ইয়ামিন সেদিকেই তাকাল। তার চোখ স্থির হয়ে গেল।

জলাধারের পাশে একজন দাঁড়িয়ে আছে। লাল পোশাক ভিজে শরীরের সঙ্গে লেগে আছে। দীর্ঘ কালো চুল পিঠ বেয়ে নেমে এসেছে। এক হাতে কাঠের কিনারা ধরে অন্য হাত দিয়ে পানি তুলে মুখে দিচ্ছে। ইয়ামিন কেবল পিছন থেকে দেখতে পেল তাকে। মুহূর্তের জন্য বুকের ভেতর থেকে যেন একটা ভার নেমে গেল। মেয়েটাকে পাওয়া গেছে। সে দাদির দিকে ফিরে বলল,

“দাদি! পাইছি।”

দাদিমা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন।

“কই?”

“ওই ঝরনার পানির কাছে।”

ইয়ামিন মেয়েটার দিকে এগিয়ে যেতে চাইতেই দাদিমা তাড়াতাড়ি তার হাত ধরে ফেললেন।

“যাস না!”

ইয়ামিন অবাক হয়ে তাকাল।

“ক্যান?”

“বেগানা নারীর মুখ দেখতে নাই বাবা। তুই এখানেই থাক। আমি যাই।”

“কাইল যে কোলে কইরা নিয়া আইলাম। তহন পাপ লাগে নাই?”

“সে তো বাঁচানোর লাইগ্যা। স্বেচ্ছায় তে আর কোলে লস নাই। নাকি ইচ্ছা কইরা…..”

ইয়ামিন দুই হাত তালি বাজানোর মত করে জড় করে মাথায় ঠেকালো ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গিতে। চলে গেল দ্রুত সেখান থেকে।

দাদিমা জলাধারের দিকে এগিয়ে গেলেন। মেয়েটা তখনও পানি পান করছে। দাদিমা কাছে গিয়ে নরম গলায় বললেন,

“দিদিভাই?”

জান্নাত ধীরে ধীরে ঘুরে তাকাল। দাদিমা একটু থমকে গেলেন। ভোরের আলোয় মেয়েটার মুখ আরও স্পষ্ট। সত্যিই যেন অসম্ভব সুন্দর।

যদিও সৌন্দর্যের ওপর এখন ক্লান্তি আর অসহায়ত্বের ছাপ। দাদিমা বললেন,

“এইখানে আইছো কেমনে ভাই? তুমি তো ঘরে আছিলা!”

জান্নাত কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীর কণ্ঠে বলল,

“আমার... জ্ঞান ফেরার পর খুব তেষ্টা পেয়েছিল।”

দাদিমা মাথা নাড়লেন।

“তাই বইলা একা একা এইখানে আইছো?”

জান্নাত চারপাশে তাকাল।

“ঘরে কাউকে দেখিনি। তাই পানি খুঁজতে বের হয়েছিলাম।”

দাদিমা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“চলো তো ভাই । আগে ঘরে চলো। তুমি এখনও ভালো হও নাই।”

জান্নাত আর কোনো আপত্তি করল না। ধীরে ধীরে দাদিমার সঙ্গে হাঁটতে শুরু করল। দূরে দাঁড়িয়ে ইয়ামিন সবটা দেখছিল। ঘরে ফিরে দাদিমা তাকে বিছানায় বসালেন। তারপর এক পেয়ালা গরম দুধ এগিয়ে দিয়ে বললেন,

“এইডা খাও সোনা।”

জান্নাত দুহাতে পেয়ালাটা ধরে রইল। চোখে কেমন একটা শূন্যতা। দাদিমা এবার আস্তে ধীরে জিজ্ঞেস করলেন,

“তোমার নাম কী? ”

জান্নাত চুপ।

“বাড়ি কই? বাবা-মায়ের নাম কী?”

জান্নাত এবার কপালে হাত রাখল।

“আমি...”

চোখ দুটো কুঁচকে গেল তার।

“আমি….আমি জানি না।”

দাদিমা অবাক হয়ে তাকালেন।

“কী? জানো না?”

জান্নাত চোখ বন্ধ করল। মনে করার চেষ্টা করল।

কিছু একটা চোখে ভাসে। অনেক মানুষের মুখ...

একটা বিশাল মহল… কেউ যেন তাকে ডাকছে...

কিন্তু কিছুই স্পষ্ট নয়। শুধু মাথার ভেতর প্রচণ্ড যন্ত্রণা।

“আহ্...”

জান্নাত দুহাতে মাথা চেপে ধরল। দাদিমা ভয় পেয়ে গেলেন।

“কী হইছে দিদিভাই?”

“আমার... মাথা...মাথায় যন্ত্রণা করছে খুউব”

যন্ত্রণায় তার শরীর কেঁপে উঠল। হঠাৎ কপালের চুলের গোড়া বেয়ে লাল র*ক্তের সরু রেখা নেমে এলো। দাদিমার চোখ কপালে উঠে গেল।

“ইয়ামিন!”

ইয়ামিন বাইরে থেকেই ছুটে এলো।

“কী হইছে?”

দাদিমা কাঁপা গলায় বললেন,

“মাইয়াডার মাথা থেইকা আবার র*ক্ত পড়তেছে!”

ইয়ামিন এগিয়ে এসে থমকে দাঁড়াল। জান্নাতের কপালের ক্ষতটা আবার খুলে গেছে। র*ক্ত ধীরে গড়িয়ে তার গালের পাশে নেমে আসছে।

জান্নাত চোখ বন্ধ করে শুধু একটাই কথা বিড়বিড় করছে

“আমি?আমি... কে?”

ইয়ামিন আর দাদিমা একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল। দাদিমা মেয়েটাকে বুকে আগলে নিয়ে ইয়ামিন কে বলল একটা কাপড় আনতে। কাপড় এনে দিলে সেটা মাথায় চেপে ধরল।

“আহারে সোনা রে। কষ্ট হইতেছে ভাই তোমার? ও ইয়ামিন দৌড় দিয়া যা না। হাকিম রে ডাইকা নিয়া আয় জলদি। আহারে, মাইডার কি কষ্ট হইতেছে”

ইয়ামিন ছুটতে শুরু করলো দ্রুত হাকিমের বাড়ির দিকে। জান্নাত ঢলে পড়ে দাদিমার বুকে। অবস্থা ক্রমশ বেগতিক।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে 30 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন