ফন্ট সাইজ:
থিম:
রক্তমুকুট

31

লেখক: জান্নাতুল ফেরদৌস

ইয়ামিন আর এক মুহূর্তও দেরি করল না।

“দাদি, তুমি ওর পাশে থাকো। আমি হাকিম ডেকে আনতেছি।”

দাদিমা মাথা নাড়লেন।

“তাড়াতাড়ি যা ভাই। মেয়েটার মাথার অবস্থা ভালো না।”

ইয়ামিন ঘর থেকে বেরিয়ে পাহাড়ি পথ ধরে ছুটে গেল। পাহাড়ি গ্রামে পথ বলতে পাথুরে সরু গলি। একদিকে খাড়া পাহাড়, অন্যদিকে গভীর খাদ। কোথাও ঝরনার পানি রাস্তা কেটে চলে গেছে। তবুও এই পথ ইয়ামিনের চেনা। কিছুক্ষণের মধ্যেই গ্রামের বৃদ্ধ হাকিমকে সঙ্গে নিয়ে ফিরে এলো সে।

হাকিম এসে জান্নাতের মাথার ক্ষতটা ভালো করে দেখলেন। পুরোনো ক্ষত আবার খুলে গেছে। তিনি কিছু ভেষজ ওষুধ বের করে ক্ষত পরিষ্কার করে দিলেন। তারপর মাথায় ওষুধ লাগিয়ে কাপড় দিয়ে আলতো করে বেঁধে দিলেন।

“ভয়ের কিছু নাই। আঘাতটা গভীর না। কিন্তু মাথায় আঘাতের কারণে স্মৃতি কিছুদিনের জন্য ঝাপসা হইতে পারে।”

ইয়ামিন সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করল,

“স্মৃতি ফিরবে তো?”

হাকিম তার দিকে তাকিয়ে বললেন,

“আল্লাহ চাইলে ফিরবেই। জোর করে কিছু মনে করার চেষ্টা করতে দিও না। যত বেশি চাপ দিবা, মাথার ব্যথা তত বাড়বে।”

জান্নাত চুপচাপ শুয়ে রইল। তার চোখে অদ্ভুত এক শূন্যতা। নিজের নামটাও মনে নেই।

নিজের বাড়ি কোথায়, বাবা-মা কারা, কীভাবে নদীতে পড়ল কিছুই মনে নেই। শুধু মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে কোথাও কেউ তাকে খুঁজছে। কেউ একজন খুব আপন করে ডাকছে। কিন্তু সেই মুখটা মনে পড়ছে না। হাকিম চলে যাওয়ার পর দাদিমা নিজ হাতে তাকে একটু ভাত, ডাল আর পাহাড়ি শাক দিয়ে খাইয়ে দিলেন।

“এই যে ভাই, মুখ খোল।”

জান্নাত অনিচ্ছা সত্ত্বেও কয়েক লোকমা খেল। তারপর দাদিমা ওষুধ এগিয়ে দিলেন।

“এইডা খাও। তারপর ঘুমাইয়া পড়বা।”

জান্নাত ওষুধটা খেয়ে আবার চোখ বন্ধ করে শুয়ে পড়ল। বাইরে গ্রামের কয়েকজন নারী দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাদের বাড়িটার দিকে তাকাচ্ছিল। একজন আরেকজনের কানে কানে বলল,

“শুনছস? ইয়ামিনের ঘরে নাকি এক পরপুরুষের মাইয়া আইছে!”

অন্যজন চোখ বড় বড় করে বলল,

“হ, নদী থেইকা কুড়াইয়া আনছে নাকি!”

“কুড়াইয়া আনছে তো আনছে। ঘরে জায়গা দিছে ক্যান?”

আরেকজন মুখ বাঁকিয়ে বলল,

“ঘরে তো বিয়ের যোগ্য যুবক ছেলে আছে। এইডা কি ভালো দেখায়?”

আরেকজন ফিসফিস করে বলল,

“বেগানা নারী। মানুষ কী কইব?”

“মানুষ তো কথা কইবই। কাল দেখি এই মাইয়া আবার ইয়ামিনের বউ হইয়া বসে!”

“কি কস! বউ করব না? মাইয়াডার গতরে কত সোনা দেখছস? পা থিকা মাথা পর্যন্ত গয়নায় মোড়ানো। সব স্বর্ণের। এই পাখি কি আর হাত ছাড়া করণ যায় রে?”

কথাটা শুনে কয়েকজন চাপা হাসি দিল। তাদের কথাগুলো দূর থেকেই শুনতে পেল ইয়ামিনের দাদিমা। তিনি দরজার কাছে এসে বিরক্ত চোখে তাদের দিকে তাকালেন।

“তোদের আর কোনো কাম নাই? একটা অসুস্থ মাইয়া নদী থেইকা উদ্ধার হইছে। আল্লাহর বান্দারে বাঁচানোর চেষ্টা করছে আমার নাতি। তাতেও তোদের এত কথা!”

নারীরা মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে সরে গেল। কিন্তু কথা থামল না। পাহাড়ি গ্রামে একটা কথা বের হলে তা পাহাড়ি ঝরনার পানির মতোই দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ইয়ামিন এসবের কিছুই পাত্তা দিল না। সন্ধ্যা নামার আগেই সে নিজের মাছ ধরার সরঞ্জাম গুছিয়ে নিল। দাদিমা জিজ্ঞেস করলেন,

“কই যাস?”

“নদীতে।”

“এখন?”

“ঘুনি পাততে যাই। রাতের মধ্যে মাছ পড়লে সকালে নিয়া আসব।”

দাদিমা মাথা নাড়লেন।

“বেশি দূরে যাস না।”

ইয়ামিন হেসে বলল,

“চিন্তা কইরো না।”

কাঁধে বাঁশের তৈরি ঘুনি আর হাতে দড়ি নিয়ে সে বেরিয়ে পড়ল। সূর্য তখন পাহাড়ের পেছনে ডুবে যাচ্ছে। আকাশের শেষ আলো পাহাড়ের চূড়ায় লেগে আছে। নদীটা গোধূলির আলোয় কালচে হয়ে এসেছে। চারপাশে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। দূরের পাহাড় থেকে ভেসে আসছে অচেনা পাখির ডাক। নদীটা পাহাড়ের কোল ঘেঁষে আঁকাবাঁকা হয়ে বয়ে গেছে। ইয়ামিন নদীর একটা নিরিবিলি জায়গা বেছে নিল। পানির স্রোত যেখানে একটু কম। সেখানেই ঘুনিটা সাবধানে পানিতে বসিয়ে দিল। দড়িটা শক্ত করে বাঁধল পাশের গাছের শিকড়ের সঙ্গে। তারপর কিছুক্ষণ পানির দিকে তাকিয়ে রইল। অন্ধকার নামছে ধীরে ধীরে।

হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল সেই অচেনা মেয়েটার কথা। কী অদ্ভুত মেয়েটা! নিজের নামও জানে না।

কোথা থেকে এসেছে সেটাও জানে না। ইয়ামিন দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

“আল্লাহ জানে কার মাইয়া...”

তারপর উঠে দাঁড়াল।

“কাল সকালে মাছ নিয়া যাই। দাদি রান্না করলে মেয়েটাও একটু ভালো করে খাইতে পারব। পোষাক আশাক দেখে তো ভালো ঘরের মাইয়া মনে হয়”

নদীর ওপর রাত নেমে আসছে। পাহাড়গুলো অন্ধকারে আরও বিশাল হয়ে উঠেছে।

*****

সকাল হতেই পাহাড়ি গ্রামের ওপর নরম রোদ নেমে এলো। রাতের কুয়াশা এখনও পুরোপুরি কাটেনি। পাহাড়ের গায়ে গায়ে সাদা মেঘের মতো কুয়াশা আটকে আছে। দূরের নদীটা সকালের আলোয় ঝিকমিক করছে। পাখিদের ডাক আর ঝরনার পানির শব্দে চারপাশ জেগে উঠেছে।

ছোট্ট কাঠের ঘরটার ভেতরেও দিনের আলো ঢুকে পড়েছে। জান্নাত ধীরে ধীরে চোখ মেলল। কিছুক্ষণ ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল। কোথায় আছে? কীভাবে এখানে এলো? কিছুই মনে পড়ছে না। মাথার পাশে বাঁধা কাপড়টার কথা মনে হলো। হাত বাড়িয়ে আলতো করে ছুঁয়ে দেখল। ব্যথাটা এখনও আছে, তবে আগের মতো তীব্র নয়। ঠিক তখনই দাদিমার কণ্ঠ শোনা গেল,

“দিদিভাই, ঘুম ভাঙছে?”

জান্নাত উঠে বসতেই দাদিমা হাসিমুখে এগিয়ে এলেন।

“এই যে, আজ তো মুখখান একটু ভালো লাগতেছে।”

জান্নাত মৃদু হাসল। দাদিমা তার পাশে একটা পরিষ্কার কাপড় রেখে বললেন,

“এইডা পরো ভাই। তোমার ওই কাপড় তো ভিজা আর নোংরা হইয়া গেছে।”

জান্নাত কাপড়টার দিকে তাকাল। সাদামাটা হলেও পরিষ্কার। পাহাড়ি গ্রামের নারীরা যে ধরনের পোশাক পরে, তেমনই। দাদিমা বাইরে চলে গেলেন। কিছুক্ষণ পর ফিরে এলেন ধোঁয়া ওঠা খাবার নিয়ে। বাঁশের তৈরি একটি ছোট পাত্রে মাছের রান্না। তার সঙ্গে সিদ্ধ করা কয়েক রকম সবজি। আর মাটির থালায় ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত। জান্নাত খাবারের দিকে তাকিয়ে রইল।

তিন দিন ধরে প্রায় কিছুই খাওয়া হয়নি তার।

দাদিমা পাশে বসে বললেন,

“খাও ভাই। কয়দিন ধইরা তোমার পেটে ঠিকমতো কিছু যায় নাই।”

জান্নাত প্রথমে একটু ইতস্তত করলেও দাদিমা নিজ হাতে ভাত মেখে মুখের কাছে তুলে ধরলেন।

“আহা, মুখ খোলো।”

জান্নাত চুপচাপ খেতে শুরু করল। প্রথম কয়েক লোকমার পর যেন ক্ষুধাটা আরও বেড়ে গেল।

দাদিমা খুশি হয়ে বললেন,

“এই তো! আস্তে আস্তে খাও। গলায় আটকা দিও না।”

মাছের ঝোল, গরম ভাত আর সিদ্ধ সবজি সাধারণ খাবার। কিন্তু এতদিন পর জান্নাতের কাছে যেন এটাই পৃথিবীর সবচেয়ে সুস্বাদু খাবার।

পেট ভরে খাওয়া শেষ হলে দাদিমা তাকে হাকিমের দেওয়া ওষুধ খাইয়ে দিলেন।

“এইডা খাইয়া একটু বিশ্রাম নিও।”

জান্নাত মাথা নাড়ল। ঠিক তখনই বাইরে কারও পায়ের শব্দ শোনা গেল। ইয়ামিন ফিরেছে।

সকালের অনেকটা সময় পাহাড়ের ওপাশে গিয়েছিল সে। ঘরে ঢুকেই স্বাভাবিক অভ্যাসে একবার চারপাশে তাকাল। তারপর জান্নাতকে দেখেও যেন দেখল না। মাথায় ক্লান্তি। শরীর ঘামে ভেজা। রোদে আর পাহাড়ি পথের পরিশ্রমে ফর্সা মুখটা লালচে হয়ে উঠেছে। চুল এলোমেলো। কাঁধে এখনও কাজের ঝুড়ি। প্রতিদিনের মতো ঘরে ঢুকে সে সোজা বেরিয়ে গেল বাইরের দাওয়ায়। এক মুহূর্তের জন্যও তার মাথায় এলো না ঘরের ভেতর তার দাদিমা ছাড়াও আরেকজন বসে আছে। দাওয়ায় বসে হাঁফ ছাড়ল ইয়ামিন।

তারপর গলা উঁচু করে হাঁক দিল,

“দাদি!”

কোনো উত্তর এলো না।

আবার ডাকল,

“দাদি, পানি দাও তো!”

জান্নাত চুপচাপ বসে রইল। কিছুক্ষণ পর তার চোখ পড়ল পাশে রাখা পানির কলসটার দিকে।

উঠে কলস থেকে এক গ্লাস পানি নিল। দাওয়ার দিকে এগিয়ে গেল। ইয়ামিন তখন মাথা নিচু করে বসে আছে। ক্লান্তিতে চোখ বন্ধ করে রেখেছে।

জান্নাত তার সামনে এসে দাঁড়াল। নরম স্বরে বলল,

“পানি।”

ইয়ামিন চোখ না খুলেই হাত বাড়িয়ে দিল।

“দাও।”

গ্লাসটা হাতে নিয়ে এক ঢোকে প্রায় অর্ধেক পানি খেয়ে ফেলল। তারপর হঠাৎ থেমে গেল। এটা তো তার দাদিমার হাত নয়। ফট চোখ খুলে সামনে তাকাল। জান্নাত দাঁড়িয়ে আছে। সাদামাটা পোশাকে। মাথায় সাদা কাপড় বাঁধা। চোখ দুটো শান্ত, অচেনা এক বিষণ্ণতায় ভরা। ইয়ামিন কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইল। মেয়েটাও চুপ।

তারপর জান্নাত ধীরে বলল,

“দাদি মা পাশের বাড়ি গেছে।”

ইয়ামিন যেন আচমকা বাস্তবে ফিরল।

“ওহ্...”

কী বলবে বুঝতে পারল না। তারপর গ্লাসটার দিকে তাকিয়ে আবার জান্নাতের দিকে তাকাল।

“আপনি…..?”

কথাটা শেষ করতে পারল না। জান্নাত মৃদু স্বরে বলল,

“আপনি পানি চেয়েছিলেন।”

ইয়ামিন মাথা নাড়ল।

“হ্যাঁ কিন্তু অসুস্থ অবস্থায় আপনার ওঠা একদম ই ঠিক হয় নি”

জান্নাত কিছু বলল না। পাহাড়ি বাতাস এসে দাওয়ার পাশ দিয়ে বয়ে গেল। ইয়ামিন বাশ দিয়ে বানানো চৌকিটার একেবারে কোণায় গিয়ে বসলো। অর্থাৎ জান্নাত কে সেখানে বসার ইঙ্গিত করল। জান্নাত বসল। ইয়ামিন মাথা নিচু রেখেই বলল

“আচ্ছা আপনি কি কিছুই মনে করতে পারছেন না? না মানে আপনার বাড়ির সবাই তো বোধহয় চিন্তা করছে। আপনাকে নাসিরাবাদ এর নদী সীমানায় পেয়েছি। অর্থাৎ আপনি যে নৌকা টিতে ছিলেন সেটা সাহাবাদ থেকে ভেসে এসেছে”

জান্নাত ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে শুনল তার কথা। ইয়ামিন মনে মনে ভাবল কাল একবার যাবে সাহাবাদ অঞ্চলে। জিজ্ঞাসা করবে মেয়েটার ব্যাপারে। প্রাপ্তবয়স্ক নারী এভাবে কতদিন ঘরে রাখবে? তার বাড়ির লোকই বা কি ভাবছে।

****

সন্ধ্যা নামতেই সাহাবাদ মহলের চারপাশে নীরবতা নেমে এলো। দিনের আলো পাহাড়ের আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে। পশ্চিম আকাশে শেষ সূর্যের রঙটুকুও মুছে যাচ্ছে ক্রমশ। মহলের একের পর এক প্রদীপ জ্বলে উঠছে। অথচ শাখার মনটা আজ কেমন অস্থির। কয়েকদিন, পুরো কয়েকটা দিন হয়ে গেল ফারিসের দেখা নেই। লোকটাকে কেন যেন ভীষণ মনে পড়ছে তার। কখনো তো এমন হয়নি। ফারিস কে?

একজন বণিক মাত্র। অথচ তার দেখা না পেলে বুকের ভেতরটা কেন এমন শূন্য লাগে? শাখা নিজেকেই প্রশ্ন করে কোনো উত্তর পায় না।

জানালার কাছে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ বাইরে তাকিয়ে রইল সে। শেষমেশ আর থাকতে পারল না। চুপিচুপি নিজের পোশাক বদলে নিল। কোমরে ছোট্ট ছুরিটা গুঁজে নিল। তারপর ঘোড়ার কাছে গিয়ে লাগাম হাতে তুলে নিল। মহলের প্রহরীদের চোখ এড়িয়ে বেরিয়ে পড়ল সে। মনের ভেতর শুধু একটা কথাই ঘুরছে, ফারিসকে একবার দেখতে হবে।

জঙ্গলের পথ যত গভীর হতে লাগল, ততই তার বুকের ধুকপুকানি বাড়তে লাগল। নিজের এই অদ্ভুত টানকে আর অস্বীকার করার উপায় নেই।

সে লোকটাকে দেখতে চায়। শুধু একবার।

জঙ্গলের সরু পথ ধরে ঘোড়া ছুটিয়ে অনেকটা পথ চলে এলো শাখা। হঠাৎ সামনে থেকে আরেকটি ঘোড়ার ক্ষীণ শব্দ ভেসে এলো। শাখা লাগাম টেনে ধরল। অন্ধকারের ভেতর থেকে একজন অশ্বারোহী বেরিয়ে এলো। কালো পোশাক। মুখের একাংশ কাপড়ে ঢাকা। শাখার বুকটা ধক করে উঠল। সে চিনতে ভুল করল না।

ফারিস! ওদিকে ফাইয়াজও ঘোড়া থামিয়ে তাকিয়ে রইল। কয়েক মুহূর্ত দুজনেই কোনো কথা বলল না। তারপর দুজনেই ঘোড়া থেকে নেমে এলো। ফাইয়াজের চোখে বিস্ময়।

“তুমি এখানে?”

শাখা মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলল,

“আপনাকে খুঁজতে এসেছিলাম।”

শাখার অকপট উত্তর। অনুভূতি প্রকাশে মিথ্যার আশ্রয় সে নিতে চায় না। ফাইয়াজের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

“আমাকে?”

শাখা এবার তার দিকে তাকাল।

“কয়েকদিন ধরে দেখা নেই আপনার। ভাবলাম...”

কথাটা শেষ করল না। ফাইয়াজ মৃদু হেসে বলল,

“ভাবলে আমি হারিয়ে গেছি?”

“তা না।”

“তাহলে?”

শাখা কিছু বলল না। দুজন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রইল। চারপাশে গাঢ় অন্ধকার। দূরে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো এসে মাটিতে ছায়া ফেলছে। ফাইয়াজ অনেকক্ষণ শাখার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর বলল,

“তুমি জানো, কয়েকদিন তোমাকে না দেখে আমি কেমন ছিলাম?”

শাখা চুপ।

“আমি নিজেকেই চিনতে পারছিলাম না।”

শাখার চোখ তার দিকে উঠল। ফাইয়াজ এবার আর নিজের ভেতরের কথাগুলো আটকে রাখতে পারল না।

“আমি জানি না কখন থেকে তুমি আমার কাছে এতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেলে।”

তার গলা ভারী হয়ে এলো।

“শুধু জানি, তোমাকে না দেখলে আমার দিন কাটে না। রাত কাটে না। তোমার কথা মাথা থেকে সরাতে পারি না।”

শাখার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। ফাইয়াজ আরও এক পা এগিয়ে এলো।

“আমি সাধারণ একজন বণিক। আমার বড় কোনো পরিচয় নেই। রাজপ্রাসাদ নেই। অঢেল সম্পদ নেই। হয়তো তোমার জন্য অনেক কিছু দিতে পারব না।”

কণ্ঠে অসহায়ত্ব।

“কিন্তু একটা কথা দিতে পারি।”

শাখার চোখ ছলছল করে উঠল। ফাইয়াজ বলল,

“তোমাকে যতটা পারি সুখে রাখব। তোমার মুখের হাসিটা যেন কোনোদিন আমার কারণে হারিয়ে না যায়, সেই চেষ্টা করব। তোমার পাশে থাকব। তুমি চাইলে সারাজীবন।”

শাখা ঠোঁট কামড়ে চোখ নামিয়ে নিল। চোখের কোণে জমে থাকা পানিটুকু আর লুকানো গেল না। এক ফোঁটা গড়িয়ে পড়ল গালে। ফাইয়াজ অস্থির হয়ে বলল,

“কেঁদো না।”

শাখা মাথা নাড়ল।

“আমি কাঁদছি না।”

“তাহলে চোখে পানি কেন?”

শাখা মৃদু হেসে ফেলল। কিন্তু সেই হাসির মধ্যেও কেমন বিষণ্ণতা।

“ আপনাকে একটা কথা বলা দরকার।”

ফাইয়াজ চুপ করে গেল। শাখা ধীরে ধীরে মাথা তুলল চোখে কোনো লজ্জা নেই। আছে সত্যি বলার সাহস।

“আমি সাধারণ কোনো নারী নই। আমি একজন যোদ্ধা।”

ফাইয়াজ স্থির হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল।

শাখা আবার বলল,

“তলোয়ার চালাতে জানি। ঘোড়ায় চড়তে জানি। যুদ্ধ করতে জানি। আমার জীবন হয়তো আপনার কল্পনার মতো শান্ত হবে না।”

কণ্ঠটা কেঁপে উঠল।

“আমাকে ভালোবাসলে হয়তো অনেক বিপদের মধ্যেও পড়তে হবে।”

ফাইয়াজ কিছুক্ষণ কোনো কথা বলল না। তারপর এগিয়ে এসে বলল,

“তবুও আমি তোমাকে ভালোবাসি।”

শাখার চোখ থেকে আবার পানি গড়িয়ে পড়ল।

ফাইয়াজ মৃদু স্বরে বলল,

“তুমি যোদ্ধা হও, বণিক হও, রাজকন্যা হও কিংবা এই জঙ্গলের কোনো অচেনা পথিক হও আমার কাছে তুমি শুধু শাখা।”

দুজন ভিন্ন পরিচয়ে পরিচিত হয়েও নিজের পরিচয় ভুলে একে অপরকে ভালোবাসতে শুরু করেছে। কিন্তু পরিচয় জানলে দুজন দুজনের জাত শত্রুতে পরিণত হবে। সেদিন কি করে মোকাবিলা করবে একে অপরের?

****

ভোরের আলো পুরোপুরি ফুটেনি। আমিরাবাদ প্রাসাদের চারপাশে কুয়াশার পাতলা আস্তরণ। প্রহরীরা নিজেদের জায়গায় দাঁড়িয়ে। প্রাসাদের ভেতর সকালের ব্যস্ততাও এখনও শুরু হয়নি ঠিকমতো। সেই সময় দূর থেকে একসঙ্গে কয়েকটি ঘোড়ার খুরের শব্দ শোনা গেল।

প্রহরীরা সতর্ক হয়ে উঠল। প্রাসাদের মূল ফটকের সামনে এসে থামল কয়েকটি ঘোড়া। সবার সামনে মেহরাব। তার পাশে আরেকটি ঘোড়া।নঘোড়াটির পিঠে বসে আছে মাথা থেকে পা পর্যন্ত ঘোমটায় ঢাকা এক নারী। মেহরাব ঘোড়া থেকে নামল।

প্রহরীদের দিকে তাকিয়ে বলল,

“ফটক খোলো।”

প্রহরীরা একে অপরের মুখের দিকে তাকাল।

এই ভোরবেলায় যুবরাজের এমন আগমন তাদের কাছেও অস্বাভাবিক। তবুও আদেশ অমান্য করার সাহস কারও নেই। ফটক খুলে গেল। মেহরাব ঘোড়ার লাগাম ধরে ভেতরে ঢুকল। তার পেছনে ধীর পায়ে এগিয়ে এলো সেই নারী। কিছুক্ষণের মধ্যেই খবর পৌঁছে গেল সম্রাটের কাছে।

“মহামান্য, যুবরাজ মেহরাব প্রাসাদে ফিরেছেন।”

সম্রাট তখন সকালের সভায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

“এত ভোরে?”

প্রহরী মাথা নত করল।

“জি। আর তার সঙ্গে একজন নারীও আছেন।”

সম্রাটের হাত থেমে গেল।

“নারী?”

“জি।”

কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই মেহরাবকে ডেকে পাঠানো হলো। সম্রাটের সামনে এসে মেহরাব মাথা নত করল।

“আসসালামু আলাইকুম, আব্বা।”

সম্রাট গভীর দৃষ্টিতে ছেলের দিকে তাকালেন।

“ওয়া আলাইকুমুস সালাম। এই ভোরবেলায় কোথা থেকে এলে?”

মেহরাব শান্ত স্বরে বলল,

“একটা কথা জানানোর ছিল।”

“কী কথা?”

মেহরাব একবার পেছনে তাকাল। ঘোমটা টানা নারীটি কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে।

তারপর মেহরাব বলল,

“আমি একজনকে ভালোবাসি।”

সম্রাটের ভ্রু কুঁচকে গেল।

“কী বললে?”

“আমি একজনকে ভালোবাসি।”

মেহরাব দ্বিতীয় বারও আত্মবিশ্বাস এর সাথে বলে ফেলল কথাটা। সম্রাট আশ্চর্য হলো বেশ।

“তারপর?”

মেহরাব এবার একেবারে স্থির কণ্ঠে বলল,

“তাকে বিয়ে করে এনেছি।”

কক্ষের ভেতর যেন বড়সড় একটা বাজ পড়ল।

সম্রাটের মুখের ভাব এমন হলো, যেন সকালের শান্ত আকাশে আচমকা বজ্রপাত হয়েছে।

“তুমি? বিয়ে করে এনেছ?”

“জি।”

“কখন?”

“গত রাতেই।”

সম্রাট কিছুক্ষণ ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর ধীরে ধীরে বললেন,

“তুমি আমাকে কেন জানালে না?”

মেহরাব চুপ। সম্রাটের কণ্ঠে ক্ষোভের সাথে অভিমান মিশে গেল।

“আমি কি তোমার বাবা নই? তুমি কাউকে ভালোবাসো, আমাকে একবার বলতেও পারলে না? আমিই তো তোমার বিবাহের ব্যবস্থা করতাম।”

মেহরাব মাথা নিচু করল।

“দোষ হয়েছে আমার।”

সম্রাট দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“আচ্ছা। যা হওয়ার হয়েছে। এখন বলো, বউ কোথায়?”

মেহরাব পেছনে তাকিয়ে বলল,

“ওখানে।”

সম্রাটের দৃষ্টি গিয়ে থামল ঘোমটায় ঢাকা নারীর ওপর।

“তাকে সামনে নিয়ে এসো।”

মেহরাব তার কাছে এগিয়ে গেল।

“এসো।”

নারীটি সামনে এগিয়ে এলো। সম্রাট বললেন,

“ঘোমটা সরাও মা।”

নারীটির হাত কাঁপল না। আত্মবিশ্বাস এর সাথে ঘোমটা তুলে ফেলল। যেন ঘোমটার ভিতর হাসফাস লাগছিল তার। ঘোমটা সরে গেল।

সম্রাটের চোখ বিষ্ময়ে স্থির হয়ে গেল। মুখের সমস্ত রক্ত যেন মুহূর্তে শুকিয়ে গেল তার। যতটা না অবাক হয়েছিল পুত্রের বিয়ের খবর শুনে, তার চেয়েও বেশি আমকে উঠলো পুত্রবধূর রুপে এই নারী কে দেখে।

“তুমি...!”

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে 31 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন