জান্নাত কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল। পাহাড়ি বাতাস তার চুলের ফাঁক গলে চলে যাচ্ছে। হঠাৎ মনে হলো, এতক্ষণ ধরে শুধু নিজের কথাই ভাবছে। অথচ যে মানুষগুলো তাকে আশ্রয় দিয়েছে, তাদের সম্পর্কেও তো কিছুই জানা হয়নি। ইয়ামিনের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“আচ্ছা আপনারা কি দুজনই থাকেন এই বাড়িতে? আর কাওকে দেখি না যে। মানে আপনার বাবা-মা?”
ইয়ামিনের মুখের হাসিটা মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। কিছুক্ষণ নীরব রইল। তারপর দৃষ্টি নামিয়ে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
“আমার বাবা-মা কেউ নেই।”
জান্নাত অবাক হলো।
“কেউ নেই মানে? কিছু মনে করবেন না, তারা কি মারা গেছেন?”
ইয়ামিন মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
“নাহহহ, আমি জানিই না তারা কারা।”
জান্নাতের বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল।
ইয়ামিন দাওয়ার নিচে অন্ধকার হয়ে থাকা উঠোনের দিকে তাকিয়ে বলল
“খুব ছোট ছিলাম তখন। এতটাই ছোট যে নিজের নামটাও মনে রাখার বয়স হয়নি।”
কণ্ঠটা ভারী হয়ে এলো।
“দাদি আমাকে পেয়েছিল একটা কুয়োর পাশে।”
জান্নাত চুপচাপ শুনতে লাগল।
“সেদিন নাকি খুব ভোরে দাদি কাঠ কুড়াতে বেরিয়েছিল। পাহাড়ের নিচের দিকে একটা পুরোনো কুয়ো ছিল। সেই কুয়োর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় নাকি আমার কান্নার শব্দ শুনতে পায়।”
ইয়ামিন একটু থেমে দীর্ঘশ্বাস ফেলল
“দাদি ভয় পেয়েছিল। ভাবছিল, এই নির্জন জায়গায় এত ছোট একটা শিশু এলো কোথা থেকে? তারপর কাছে গিয়ে দেখে, আমি একা পড়ে আছি।”
তার ঠোঁটে অদ্ভুত এক হাসি ফুটল। তাচ্ছিল্যের বোধহয়
“কীভাবে সেখানে এলাম, কে রেখে গেল, আমার মা কোথায়, বাবা কোথায় কিছুই জানে না দাদি। আশপাশের গ্রামেও অনেক খোঁজ করেছিল। কেউ আমাকে চিনল না।”
“তারপর?”
জান্নাতের কণ্ঠ খুব নরম হয়ে এলো । ইয়ামিন বলল,
“তারপর দাদি আমাকে বাড়ি নিয়ে এলো।”
একটু হেসে বলল,
“দাদি তখনও একা মানুষ। নিজের পেট চালাতেই কষ্ট হতো। কিন্তু আমাকে দেখে নাকি বলেছিল ‘আল্লাহ যখন দিছে, তখন এই পেটটাও তিনিই চালাবেন।’ আমার মত অভাগার দ্বায়িত্ব নিয়ে বসল সে”
জান্নাতের চোখে পানি জমতে শুরু করল। ইয়ামিন বলতে লাগল,
“দাদি কাঠ কাটত। ভোরে বের হতো, কাঁধে দড়ি আর ছোট্ট কুড়াল নিয়ে। পাহাড়ের ঢালে ঘুরে ঘুরে শুকনো কাঠ সংগ্রহ করত। সেগুলো বাজারে বিক্রি করে যা পেত, তা দিয়ে চাল-ডাল কিনত। আমাকে রেখে যেত একা বাড়ি। তখন বয়স ৩-৪ বছর হবে। কতদিন ফিরতে সন্ধ্যা হতো দাদির। কি যে ভয় পেতাম একা একা এই নির্জন বাড়িতে। তখন ঘরটা ছিল ছনের। ওই পাশের বাড়ির নবীন রা ছিল দুই ভাই। আমার থেকে অনেক বড়। বাড়ি ফাঁকা পেলেই ওরা আমাকে মারত। সেই ভয়ে দোর টেনে ঘরেই থাকতাম বের হতাম না ঘর থেকে। দাদি নদীতে ঘুনি পাতত। মাছ পেলে সেদিন আমাদের ঘরে একটু ভালো রান্না হতো। মাছ না পেলে...”
ইয়ামিন হেসে ফেলল, কিন্তু হাসির মধ্যে কোনো আনন্দ ছিল না। ওই যে বলে না,অতি দুঃখে মানুষ হাসে। তেমন হাসি
“ভাতের সঙ্গে লবণ আর কাঁচামরিচ দিয়েই দুজনের পেট চলত।”
জান্নাত আর চোখের পানি ধরে রাখতে পারল না।
এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে। ইয়ামিন সেটা খেয়াল করেও যেন না দেখার ভান করল।
“দাদি আমাকে কখনো বুঝতে দিতে চায়নি আমরা গরিব। ছোটবেলায় আমি যখন নতুন জামা চাইতাম, সে বলত ‘পরের হাটে নিয়ে আসব।’ তারপর নিজের জন্য কিছু না কিনে আমার জন্য একটা জামা নিয়ে আসত। আমি বড় হতে হতে বুঝেছি, ওই ‘পরের হাট’ কথাটার পেছনে দাদির কত রাতের না খেয়ে থাকা ছিল। এক হাট থেকে পরের হাট আসার দিনগুলি দাদি কীভাবে অর্থ সঞ্চয় করত।”
জান্নাত ইয়ামিনের অগোচরে চোখ মুছল। ইয়ামিন কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর বলল,
“পড়াশোনার খুব ইচ্ছে ছিল আমার।”
“করতে পারেননি?”
“নাহহহ।”
মাথা নাড়ল সে।
“কয়েক বছর একটা পাঠশালায় যেতাম। তারপর বই-খাতা কেনার টাকা থাকত না। অন্য ছেলেদের নতুন বই থাকত, নতুন কাপড় থাকত। আমার থাকত পুরোনো একটা খাতা। তারও পৃষ্ঠা ছেঁড়া।”
ইয়ামিনের চোখে তখন পুরোনো কষ্টের দাগ দগদগ করে উঠল
“ওরা আমাকে নিয়ে হাসত।”
“কেন?”
“বাবার টাকা তো দূর, বাবাও নেই আমার। বাবা নেই, মা নেই বলে। কেউ বলত আমি কুড়িয়ে পাওয়া ছেলে। কেউ বলত আমার কোনো বংশ নেই। ওরা আমাকে দিয়ে কাজ করাতো ওদের। রোজ মারত। কাঁদতে কাঁদতে বাড়িতে ফিরতাম”
কথাগুলো বলতে বলতে ইয়ামিনের গলা ভারী হয়ে গেল।
“আমি প্রথমে বুঝতাম না। পরে বুঝতে শিখলাম।”
নিচের দিকে তাকাল সে
“একদিন কয়েকজন ছেলে সবার সামনে আমাকে বলেছিল, ‘তুই কার ছেলে সেটাই তো জানিস না, তুই আবার আমাদের সঙ্গে পড়বি?’”
ইয়ামিনের চোখের কোণে পানি চিকচিক করল।
“সেদিন বাড়ি ফিরে দাদির সামনে কাঁদিনি। দাদি কষ্ট পাবে বলপ। ঘরের পেছনে গিয়ে লুকিয়ে কেঁদেছিলাম।”
জান্নাতের চোখ দিয়ে অবিরত পানি পড়ছে। ইয়ামিন বলল,
“দাদি পরে বুঝে ফেলেছিল। কিছু জিজ্ঞেস করেনি। রাতে আমার মাথায় হাত রেখে বলেছিল, ‘মানুষের কথায় নিজের দাম কমাইস না রে। তুই আমার কাছে আল্লাহর দেওয়া আমানত।’”
কথাটা বলতে গিয়ে ইয়ামিনের গলা কাপলো যেন
“সেদিন মনে হয়েছিল,আমার কেউ একজন আছে।”
পাহাড়ি বাতাস হঠাৎ আরও জোরে বয়ে গেল। জান্নাত চোখ মুছে ধীরে বলল,
“আপনি খুব কষ্ট পেয়েছেন।”
ইয়ামিন মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
“কষ্ট তো পেয়েছি।”
তারপর চাঁদের দিকে তাকিয়ে বলল,
“কিন্তু দাদির জন্য কখনো জীবন নিয়ে আফসোস করিনি। কারণ আমার জন্মদাতা বাবা-মা আমাকে রেখে গেছে কি না, জানি না। কিন্তু যে নারীটা আমাকে কুয়োর পাশ থেকে তুলে এনে নিজের সন্তান করে বড় করেছে”
ইয়ামিনের চোখ এবার সত্যিই ভিজে উঠল।
“সে আমার জন্য নিজের পুরো জীবনটা দিয়ে দিয়েছে।”
জান্নাত আর কিছু বলতে পারল না। তার চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়তেই থাকল। কেন জানে না। ইয়ামিনের গল্প শুনে তার বুকের ভেতর এমন ব্যথা হচ্ছে যেন এই কষ্টের সঙ্গে তার নিজেরও কোনো সম্পর্ক আছে। সে ধীরে ধীরে বলল,
“আপনার দাদি খুব ভালো মানুষ।”
ইয়ামিন মৃদু হাসল।
“হ্যাঁ। আমার পৃথিবীতে উনিই সব।”
দুজনেই নীরব হয়ে গেল। উপরে পূর্ণিমার চাঁদ। নিচে পাহাড়ি নদীর অবিরাম শব্দ। নির্জন দাওয়ায় বসে অচেনা এক মেয়ের চোখের জল নীরবে সাক্ষী হচ্ছে এক অনাথ ছেলের দীর্ঘ জীবনের গল্প। ইয়ামিন কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর ঠোঁটের কোণে অল্প হাসি ফুটিয়ে বলল,
“তবে একটা সময়ের পর দাদিকে আর কাজ করতে দিইনি।”
জান্নাত চোখ মুছে তাকাল।
“আমি একটু বড় হয়ে গিয়েছিলাম তখন। বুঝতে শিখেছি, সারাজীবন দাদি এভাবে কষ্ট করতে পারে না।”
ইয়ামিন দাওয়ার কাঠের ওপর হাত রেখে ধীরে ধীরে বলল,
“এখন ঘরের বাইরের সব কাজ আমি করি। কাঠ কাটি, মাছ ধরি, জঙ্গলে যাই, বাজারে যাই, যা লাগে সব। দাদি শুধু ঘরে থাকে। রান্নাবান্না করে, ঘরটা সামলায়। এইটুকুই।”
তার চোখে এবার অদ্ভুত তৃপ্তি।
“দাদির হাতে এখন আর কুড়াল দেখতে ভালো লাগে না।”
জান্নাত মৃদু হেসে বলল,
“আপনি খুব ভালো।”
ইয়ামিনের হাসিটা এবার একটু মলিন হয়ে গেল।
“জানি না ভালো কিনা। তবে একটা কথা জানি যারা আমাকে জন্ম দিয়েছে, তাদের ওপর আমার ভীষণ রাগ।”
জান্নাত চুপ হয়ে গেল। ইয়ামিন দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“অনেক রাগ।”
কিছুক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকল সে।
“কেন আমাকে ফেলে গেল তারা? আমি কি এতটাই খারাপ ছিলাম? এতটুকু একটা শিশুকে কুয়োর পাশে ফেলে রেখে যাওয়ার মতো কী অপরাধ করেছিলাম আমি?”
জান্নাতের চোখ আবার ভিজে উঠল। ইয়ামিন হেসে কথাটা হালকা করার চেষ্টা করল।
“ছোটবেলায় এসব বুঝতাম না। বড় হয়ে যখন বুঝলাম, তখন অনেক প্রশ্ন জমে গেল। কখনো কখনো ভাবি, তারা যদি একবার ফিরে এসে বলত কেন রেখে গিয়েছিল, আমার অপরাধ টা আসলে কি। হয়তো এত রাগ থাকত না। কিন্তু তারা আসেনি।”
কয়েক মুহূর্ত নীরব থেকে ইয়ামিন নিজেই আবার বলতে শুরু করল,
“দাদি একবার খুব অসুস্থ হয়েছিল, তখন আমার বয়স দশ বছর। দাদির তখন অনেক জ্বর। শরীর এত দুর্বল হয়ে গিয়েছিল যে বিছানা থেকে উঠতেও পারত না। ঘরে খাবার নেই, ওষুধ নেই আমি তো তখন বাচ্চা।”
ইয়ামিনের চোখে সেই পুরোনো দিনগুলো যেন আবার ভেসে উঠল।
“পাহাড়ে তখন শিকারিরা আসত। কেউ হরিণের, কেউ বুনো শুয়োরের খোঁজে। তাদের সঙ্গে থাকত ধনুক, তীর, খাবারের পোটলা, নানা জিনিস।”
সে মৃদু হেসে বলল,
“আমি তাদের কাছে গিয়ে বলতাম, ‘আমি এগুলো উপরে তুলে দিতে পারি। বিনিময়ে আমাকে কিছু দিতে হবে”
জান্নাত বিস্ময়ে তাকাল।
“দশ বছর বয়সে?”
“হ্যাঁ।”
ইয়ামিন কাঁধ ঝাঁকাল।
“ওরা হাসত। বলত, ‘তুই পারবি?’ আমি বলতাম, ‘পারব। তারপর পিঠে তাদের পোটলা তুলে নিতাম। কখনো ধনুক-তীরও। পাহাড়ের খাড়া পথ বেয়ে ওপরে উঠতাম। আবার নিচে নেমে আসতাম।”
“একবারে কত পেতেন?”
“টাকা না। বেশিরভাগ সময় কিছু খাবার।”
জান্নাতের চোখ বড় হয়ে গেল।
“খাবার?”
“হ্যাঁ। কেউ শুকনো মাংস দিত, কেউ রুটি। কখনো ফল, কখনো একটু চাল-ডাল। যা পেতাম, আঁকড়ে ধরে বাড়ি ফিরতাম।”
ইয়ামিনের কণ্ঠে অদ্ভুত শান্তি।
“সারাদিন এভাবেই কাটত।”
তারপর নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
“পাহাড়ের পাথর তো আর দয়া করে না।”
“পায়ে ফোসকা পড়ত?”
“অনেক।”
সে হাসল।
“পায়ের তালুতে ফোসকা পড়ে যেত। কোনো কোনো দিন এত ব্যথা করত যে মনে হতো আর এক পা-ও হাঁটতে পারব না।”
জান্নাত নিঃশব্দে শুনছে।
“কিন্তু বাড়িতে দাদি অপেক্ষা করত। তাই ফিরতেই হতো। পাথরে পা কাটত। শরীর ব্যথায় টনটন করত। তবুও খাবারের পোটলাটা বুকে চেপে ধরে পাহাড় থেকে নামতাম।”
জান্নাতের গাল বেয়ে টুপটাপ পানি পড়তে লাগল।
সে আর লুকানোর চেষ্টা করল না। ইয়ামিন তার চোখের পানি দেখে হেসে ফেলল।
“আপনি কাঁদছেন কেন? আমার জন্য কাঁদার কিছু নেই। এ তো আরও দুঃখ। জীবনে যত কষ্টই করি, কখনও অন্যকে কষ্ট দিইনি বুঝলেন। আমার জন্য কখনও কেউ কাঁদেনি। আপনি কাঁদলে নিজেকে অপরাধী মনে হবে মায়ারানী”
দুহাত মাচালে ভর করে পিছন দিকে হেলে বলল
“এখন আর দাদিকে কষ্ট করতে হয় না। নিজের মতো করে রোজগার করতে পারি। দুবেলা ভালো খাবার দিতে পারি। দাদির জন্য কাপড় কিনতে পারি। অসুখ হলে ওষুধ আনতে পারি।”
সে গর্বের সঙ্গে বলল,
“এখন দাদির কষ্ট অনেকটাই ঘুচেছে।”
জান্নাত চোখ মুছতে মুছতে তাকিয়ে রইল।
ইয়ামিন আকাশের দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলল,
“ছোটবেলায় ভাবতাম, আমার বাবা-মা কেন আমাকে রেখে গেল এই প্রশ্নের উত্তর একদিন না একদিন পাব। এখন আর উত্তরটা তেমন দরকার হয় না।”
“কেন?”
ইয়ামিন মৃদু হাসল।
“কারণ আমাকে যারা ফেলে গিয়েছিল, তারা আমাকে কী দিতে পারত জানি না। কিন্তু আমার দাদি আমাকে একটা জীবন দিয়েছে। আমি জীবনের মানে টা বুঝেছি”
তার চোখে চাঁদের আলো পড়ল।
“তাই এখন শুধু একটা জিনিস চাই দাদিটা যেন যতদিন বাঁচে, কষ্ট ছাড়া বাঁচে। মানুষটাকে সুখী করাই আমার সবচেয়ে বড় অর্জন হবে।
জান্নাত কিছু বলতে পারল না। জান্নাতের চোখের পানি দেখে ইয়ামিন কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। এতক্ষণ নিজের জীবনের কথা বলতে বলতে যে ভারী হয়ে উঠেছিল পরিবেশ, সেটাকে হালকা করার চেষ্টা করে মৃদু হেসে বলল,
“আরে, আপনি এখনও কাঁদছেন কেন?”
জান্নাত চোখ মুছে বলল,
“আপনার দাদি সেদিন একটা কথা বলেছিল।”
ইয়ামিন ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
“কী কথা?”
“বলেছিল আপনার নাকি একজন প্রেমিকা ছিল।”
কথাটা শুনেই ইয়ামিনের মুখে অস্বস্তির ছাপ ফুটে উঠল। সে একটু ইতস্তত করে হেসে ফেলল।
“আহা... দাদি আপনাকে এসবও বলে দিয়েছে?”
জান্নাতের ঠোঁটে ক্ষীণ হাসি ফুটল।
“বলেছে তো।”
ইয়ামিন মাথা নিচু করে বলল,
“আর লজ্জা দিয়েন না।”
“কেন? সত্যি নাকি?”
“না, তেমন কিছু না। পাশের বাড়ির চম্পা আমাকে পছন্দ করত। কথাবার্তাও হয়েছিল। ওর ইচ্ছা ছিল আমাকে বিয়ে করবে।”
জান্নাত মন দিয়ে শুনছিল। ইয়ামিন মৃদু হেসে বলল,
“কিন্তু ওর বাবা-মা আমার চেয়ে ভালো পাত্র পেয়ে গেল। মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দিল।”
“তারপর?”
“তারপর আর কী? চম্পা নিজের সংসারে চলে গেল। আমি নিজের জীবনে।”
একটু হেসে বলল,
“দাদি মাঝে মাঝে এখনো আমাকে ওই কথা শুনিয়ে খোঁটা দেয়। বলে, ‘তোর জন্য একটা মাইয়া ছিল, তুই রাখলি না। এখন বুড়ো হইয়া একা বসে থাক।’”
জান্নাত হেসে ফেলল।
“আপনি সত্যিই প্রেম করেননি?”
ইয়ামিন তার দিকে তাকাল।
“কখনো না।”
“কাউকে ভালো লাগেনি?”
কিছুক্ষণ চুপ করে রইল ইয়ামিন। তারপর ধীর স্বরে বলল,
“ভালো লাগা তো অনেকের প্রতিই হতে পারে। কিন্তু আমি সেই ভালো লাগাকে কখনো নিজের জীবনের সঙ্গে জড়াইনি।”
জান্নাত কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কেন?”
ইয়ামিনের চোখ চলে গেল দূরের পাহাড়ের দিকে।
“কারণ আমার মনে হয়, একজন পুরুষের সত্যিকারের ভালো লাগা, সত্যিকারের মায়া এসব তার অর্ধাঙ্গিনীর জন্যই জমিয়ে রাখা উচিত।”
মৃদু হাসল ইয়ামিন।
“আমি পরনারীর দিকে চোখ দেওয়া পছন্দ করি না।”
জান্নাত মুগ্ধ হলো তার কথায়। তারপর জিজ্ঞেস করল,
“দাদিমা তো বিয়ের কথা বলেন?”
“রোজ।”
ইয়ামিন হেসে ফেলল।
“সকাল-বিকেল সুযোগ পেলেই বলেন। কখনো বলেন, ‘বউ আন, আমার হাতে আর কত দিন আছে? আমি আর রাইন্ধা খাওয়ামুনা তোরে’। ‘এই বাড়িতে আরেকজন মানুষের পায়ের শব্দ শুনতে চাই।’”
জান্নাতের মুখে এবার মায়ামাখা হাসি ফুটল।
“তাহলে বিয়ে করেন না কেন?”
ইয়ামিন একটু চুপ করে থেকে বলল,
“মনের মতো কাউকে পাইনি।”
“কেমন মেয়ে আপনার পছন্দ?”
প্রশ্নটা শুনে ইয়ামিন কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে রইল।
তারপর চোখ ছোট ছোট করে বলল,
“খুব বেশি কিছু চাই না।”
ইয়ামিনের কণ্ঠে অদ্ভুত রকম কোমলতা।
“আমি চাই এমন একজন মানুষ, যে আমার এই ছোট্ট বাড়িটাকে নিজের বাড়ি মনে করবে।”
সে চারপাশের কাঠ-পাথরের ছোট্ট ঘরটার দিকে তাকাল।
“যে এই কাঠ-পাথরের ঘরটাকে নিজের হাতে গুছিয়ে নেবে। উঠোনে নিজের মতো করে বেলী ফুল গাছ লাগাবে। দাদির সঙ্গে গল্প করবে। এই পাহাড়, এই নদী, এই অল্প কিছু নিয়ে সুখী হতে পারবে।”
জান্নাত মুগ্ধ হয়ল শুনছিল। ইয়ামিন মৃদু হেসে বলল,
“আমার কাছে বড় বাড়ি নেই। অনেক সম্পদ নেই। নগরের মতো জীবনও দিতে পারব না। তাই চাওয়াটাও খুব ছোট।”
“আচ্ছা! কী চাওয়া?”
ইয়ামিন চাঁদের দিকে তাকিয়ে বলল,
“সে যেন এই অভাগা মানুষটাকে ভালোবাসে। আমার চেয়েও বেশি। এতটুকুই চাওয়া আমার। তাকে আহামরি রুপবতী হতে হবে না। কেবল আমাকে আমার চাইতে বেশি ভালোবাসবে।”
জান্নাত আঁচলে চোখ মুখ মুছে বলল
“আপনার অনেক বড় একটা পরিচয় আছে!