সাহাবাদ যেন কয়েকদিন ধরে নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেছে। অথচ এই নগরী কিছুদিন আগেও বড় শাহজাদীর বিবাহ উপলক্ষে সাজসজ্জা আর উৎসবের প্রস্তুতিতে মুখর ছিল, সেই নগরীর প্রতিটি গলি, প্রতিটি পথ এখন একটি প্রশ্নে উত্তাল শাহজাদী জান্নাত কোথায়?
ভোর থেকে সন্ধ্যা, সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত সৈন্যরা দল বেঁধে বের হচ্ছে। জঙ্গলের পথ তন্নতন্ন করে খোঁজা হচ্ছে। নদীর ঘাট, পাহাড়ি পথ, পুরোনো বাগানবাড়ি, পরিত্যক্ত স্থাপনা কোথাও বাদ যাচ্ছে না। কিন্তু জান্নাতের কোনো সন্ধান নেই। কোনো চিহ্ন নেই। কোনো সংবাদ আসছে না।
যেন রাতারাতি মেয়েটা এই পৃথিবী থেকেই হারিয়ে গেছে। মহলের অন্দরমহলেও একই অবস্থা।
সুনেহেরা প্রায় সারাক্ষণ অস্থির হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। মেহেরুন্নেসার চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ। শাখা এক মুহূর্তের জন্যও স্থির থাকতে পারছে না। নিয়ম করে প্রহরীদের কাছে ছুটে যায় খবর নিতে।
“জঙ্গলে খোঁজ হয়েছে?”
“হয়েছে শাহজাদী।”
“নদীর ওপারের পথ?”
“সেখানেও লোক পাঠানো হয়েছে।”
“কোনো চিহ্ন, প্রমাণ কিচ্ছু পাওনি?”
প্রহরী মাথা নিচু করে বলল,
“না।”
শাখা দাঁতে দাঁত চেপে চোখ বন্ধ করল।
“আরও লোক পাঠাও।”
সে নিজেও বহুবার জঙ্গলে গেছে। পরিচিত পথ ছেড়ে অপরিচিত পথেও ঢুকেছে। যে জায়গা গুলোতে সাধারণত কেউ যায় না, সেখানেও খুঁজেছে। কিন্তু প্রতিবারই খালি হাতে ফিরতে হয়েছে। সবচেয়ে বেশি যন্ত্রণার বিষয় ছিল জান্নাতের কোনো চিহ্নই নেই। কোনো সূত্রই পাচ্ছে না। আর না মুয়াজ মুখ খুলছে। একটা কাপড়ের টুকরো পর্যন্ত নেই। যেন কেউ অত্যন্ত হিসাব করে তাকে সরিয়ে নিয়েছে।
মহলের কারাগারে দিন-রাত জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।
মুয়াজকে ঘিরে বসেছে কয়েকজন অভিজ্ঞ সৈন্য ও কর্মকর্তা। একই প্রশ্ন বারবার করা হচ্ছে।
“জান্নাত কোথায়?”
মুয়াজ নীরব।
“শাহজাদীকে শেষ কোথায় দেখেছিলেন?”
নীরবতা।
“সেদিন রাতে আপনি কোথায় ছিলেন?”
মুয়াজ শুধু তাকিয়ে থাকে। কখনো চোখ বন্ধ করে। কখনো দেয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকে।
তার মুখে কোনো উত্তর নেই। একজন কর্মকর্তা বিরক্ত হয়ে টেবিলে হাত চাপড়াল।
“আপনি মিশরের যুবরাজ হতে পারেন, কিন্তু এখানে আপনি বন্দি। সাহাবাদের শাহজাদী নিখোঁজ। আপনার নাম সেই রাতের ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে। সত্যিটা বলুন!”
মুয়াজ চোখ তুলল। তার চোখে ক্লান্তি। কিন্তু ঠোঁট বন্ধ।
“আমি যা জানি না, তা কীভাবে বলব?”
“আপনি কিছুই জানেন না?”
“না।”
“তাহলে নদীর পাড়ে পাওয়া সেই নারী কে ছিল?”
প্রশ্নটা শুনতেই মুয়াজের মুখ শক্ত হয়ে গেল।
সে উত্তর দিল না। কিছুক্ষণ পর শুধু বলল
“সৌদামিনী।”
অন্য কেউ সেই নাম শুনে বিস্মিত হলেও মুয়াজ আর কোনো ব্যাখ্যা দিল না।
“জান্নাত কোথায়?”
মুয়াজ এবার চোখ বন্ধ করল।
“আমি জানি না।”
তারপর আর একটি শব্দও মুখ থেকে বের হলো না।
*****
বাইজিদ শাহ নিজের কক্ষে একা বসে ছিলেন।
সামনে ছড়িয়ে আছে সাহাবাদের বিভিন্ন প্রান্তের নকশা। জান্নাতকে খুঁজতে কোথায় কোথায় সৈন্য পাঠানো হয়েছে, তার চিহ্ন দেওয়া। কিন্তু কোনো ফল ই মিলছে না। বাইজিদ শাহ দুই হাত দিয়ে কপাল চেপে ধরলেন। একজন পিতা হিসেবে তার বুকের ভেতরটা প্রতিনিয়ত কেঁপে উঠছে। মেয়েটা কোথায়? বেঁচে আছে তো? কেউ কি তাকে নিয়ে গেছে? নাকি...তিনি আর ভাবতে পারলেন না।
সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ালেন।
“না। আমার মেয়ে বেঁচে আছে।”
দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা সৈন্যের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“খোঁজ বন্ধ হবে না। যতদিন না আমার মেয়েকে পাওয়া যাচ্ছে, ততদিন কেউ বিশ্রাম নেবে না।”
সৈন্য মাথা নত করল।
“জি, জমিদার সাহেব।”
শাখার অবস্থাও দিন দিন অস্থির হয়ে উঠছিল।
জান্নাত শুধু তার বড় বোন নয়। তার কাছে সে আশ্রয়, বন্ধু, মায়ের মতো। জান্নাতকে ছাড়া মহলটা তার কাছে অচেনা লাগছে। রাতে নিজের কক্ষে থেকেও সে ঘুমাতে পারে না।
বারবার মনে পড়ে সেই রাতের কথা। জান্নাত কোথায় গেল? কীভাবে গেল? কেউ তাকে দেখল না কেন? মহলের পেছনে পাওয়া পোশাকের ছেঁড়া অংশটুকুই এখন পর্যন্ত একমাত্র সূত্র। শাখা সেটাও নিজের কাছে রেখে দিয়েছে। মাঝেমধ্যে কাপড়ের টুকরোটার দিকে তাকিয়ে তার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা ভয় জেগে ওঠে। এটা যদি কারও হাত থেকে ছিঁড়ে পড়ে থাকে? তাহলে সেই হাত কার? আর জান্নাতকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে? কোনো উত্তর নেই। শুধু অন্ধকার।
শাখা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকাল।
দূরে পাহাড়ের কালো অবয়ব। তার মনে হলো জান্নাত কোথাও আছে, হয়তো খুব দূরে।
হয়তো এমন কোনো জায়গায়, যেখানে সাহাবাদের কোনো মানুষ এখনো পৌঁছাতে পারেনি।
সে চোখ বন্ধ করে ফিসফিস করে বলল,
“আপা... তুমি যেখানে আছো, শুধু বেঁচে থেকো।”
তার চোখ বেয়ে নেমে এলো অশ্রুকণা।
“আমি তোমাকে খুঁজে বের করবই”
কিন্তু শাখা তো আর জানে না জান্নাত সাহাবাদে নেই ঠিকই, কিন্তু সে বেঁচে আছে। অনেক দূরের এক পাহাড়ি গ্রামের ছোট্ট কাঠ-পাথরের বাড়িতে।
জান্নাতের নিখোঁজ হওয়ার ধাক্কাই সামলাতে পারছিল না সাহাবাদ। তার ওপর নতুন এক সংবাদ এসে যেন পুরো রাজ্যের বুকের ওপর আরেকটি পাথর চাপিয়ে দিল। ছোট শাহজাদী সাহারা জাহ্নবী মেহরাব ওয়াসেমকে বিবাহ করেছেন। মেহরাব!বআমিরাবাদের সম্রাটের একমাত্র পুত্র। আর সাহারা বাইজিদ শাহের কন্যা।
যে দুই রাজ্যের সম্পর্কের আড়ালে এতদিন ধরে জমে ছিল রাজনীতি, সন্দেহ আর পুরোনো হিসাব-নিকাশ, সেই দুই পক্ষের মাঝখানে হঠাৎ করে বিবাহের বন্ধন তৈরি হয়ে গেছে। কিন্তু এ বন্ধন শান্তির বার্তা বয়ে আনবে, নাকি আরও ভয়ংকর কোনো ঝড়ের সূচনা করবে তা কেউ জানে না। বাইজিদ শাহ সংবাদটি শুনে অনেকক্ষণ নিশ্চুপ বসে ছিলেন। তার চোখের সামনে যেন একসঙ্গে দুটি দৃশ্য ভেসে উঠছে।
একদিকে নিখোঁজ বড় মেয়ে জান্নাত। অন্যদিকে ছোট মেয়ে সাহারা নিজের ইচ্ছায় আমিরাবাদের যুবরাজকে বিয়ে করে ফেলেছে।
তিনি ধীরে চোখ বন্ধ করলেন।
“একসঙ্গে এত কিছু কেন হচ্ছে?”
কণ্ঠে ক্লান্তি। মেহেরুন্নেসা পাশে বসে বললেন,
“সাহারা অন্তত বেঁচে আছে। নিজের ইচ্ছায় বিয়ে করেছে। ওকে নিয়ে এখন আর চিন্তা করে কী হবে?”
বাইজিদ শাহ কোনো উত্তর দিলেন না। কারণ তার ভয়টা অন্য জায়গায়। সম্রাট হারুন ওয়াসেম।
তিনি এই বিয়েকে কীভাবে দেখবেন? সাহারা যদি আমিরাবাদের পুত্রবধূ হয়ে যায়, তবে সাহাবাদের সঙ্গে মেহরাবের সম্পর্ক সরাসরি পারিবারিক হয়ে গেল। কিন্তু রাজনীতি কখনো শুধু রক্তের সম্পর্ক বোঝে না। আর সম্রাটের বহুদিনের দৃষ্টি যে সাহাবাদের দিকে, সেটা বাইজিদ শাহ জানেন।
এই বিয়ে তার পরিকল্পনাকে থামিয়ে দেবে, নাকি আরও ভয়ংকর করে তুলবে সেটাই এখন প্রশ্ন।
***
আমিরাবাদেও পরিবেশ স্বাভাবিক ছিল না। সম্রাট হারুন ওয়াসেম মুখে কিছু প্রকাশ করলেন না। পুত্রের সামনে তিনি সাহারাকে অস্বীকার করেননি। বরং রাজকীয় নিয়ম মেনে পুত্রবধূ হিসেবে তাকে গ্রহণ করার আয়োজনও হলো।
কিন্তু তার চোখের গভীরে জমে থাকা কঠোরতা কেউ বুঝতে পারল না। একান্তে দাঁড়িয়ে তিনি সাহাবাদের দিকে পাঠানো পুরোনো নকশাটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বিরবির করে বললেন,
“সাহাবাদ...”
ঠোঁটে ক্ষীণ, কঠিন হাসি ফুটল।
“তোমাদের ভাগ্য যেন নিজেরাই আমার হাতে তুলে দিচ্ছ।”
সাহারা এখন তার পুত্রবধূ। অর্থাৎ সাহাবাদের সঙ্গে যুদ্ধ হলে সেই যুদ্ধের প্রথম আঘাত গিয়ে পড়বে তার নিজের ছেলের সংসারের ওপরও।
তবুও সম্রাটের মনে মায়া জাগল না। বরং তার কাছে বিষয়টি হয়ে উঠল আরও জটিল এক রাজনৈতিক হিসাব। কারণ সাহাবাদকে দুর্বল করার যে পরিকল্পনা বহুদিন ধরে তৈরি হচ্ছে, সেটি এখন আর আগের মতো সহজ নয়। সাহারা স্বয়ং এই মহলে থাকবে। মেয়েটি ভীষণ ধূর্ত তা বুঝে গেছে সম্রাট। ভীষণ পরিকল্পণা করে করতে হবে এই আক্রমণ। সেই কারণেই সাহাবাদের ওপর আঘাত আরও ভয়ংকর হতে পারে।
***
সাহাবাদের প্রতিটি প্রহর যেন দুশ্চিন্তায় কাটছে।
জান্নাতের কোনো সন্ধান নেই। সাহারাও মহলে নেই। আর চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে অদ্ভুত সব গুজব। কেউ বলছে জান্নাতকে অপহরণ করা হয়েছে। কেউ বলছে নদীর ঘটনার সঙ্গে তার সম্পর্ক আছে। আবার কেউ কেউ ধারণা করে দুই যুগ আগের সেই অশুভ সময় নাকি ফিরে এসেছে। শাখা এসব কথায় কান দেয় না।
তার কাছে একটাই সত্য জান্নাতকে খুঁজে বের করতে হবে। দিনের পর দিন সে নিজে খোঁজ চালাবে। তবুও আপাকে আনবেই ফিরিয়ে।
কিন্তু রাজ্যের বাইরে গিয়ে অনুসন্ধান করার মতো ক্ষমতা তার হাতে নেই। ঠিক তখনই অদৃশ্যভাবে একজন মানুষ তার পাশে দাঁড়িয়ে গেল। ফাইয়াজ। তবে শাখা তাকে এখনো চেনে ফারিস নামে। কোথাকার বণিক, কী তার আসল পরিচয় সেটা এখনো জানে না শাখা। তবুও জান্নাতের খোঁজে লোকটাকে পাশে পেয়ে তার মনে কিছুটা সাহস জাগে। সন্ধ্যায় নগরের এক নির্জন পথে দুজন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। শাখার হাতে জান্নাতের পুরোনো একটি ওড়নার টুকরো।
সে বলল,
“কোথাও কিছু পাওয়া গেল না?”
ফাইয়াজ মাথা নাড়ল।
“না।”
শাখার মুখ মলিন হয়ে গেল।
“আপনি এত জায়গায় লোক পাঠাচ্ছেন কীভাবে?”
ফাইয়াজ একটু থেমে বলল,
“আমার কিছু পরিচিত মানুষ আছে। তারা বিভিন্ন পথে খোঁজ নিচ্ছে।”
“আপনি আসলে কে, ফারিস?”
প্রশ্নটা শুনে ফাইয়াজের চোখে এক মুহূর্তের জন্য অস্বস্তি ফুটে উঠল। কিন্তু সে সামলে নিল।
“বলেছিই তো প্রিয়তমা, আমি একজন অতি সাধারণ বণিক।”
শাখা সন্দেহের চোখে তাকাল।
“সাধারণ বণিকদের এত লোক থাকে?”
ফাইয়াজ মৃদু হাসল।
“কখনো কখনো কিছু মানুষের পরিচয় তাদের পেশার চেয়ে একটু বড় হয়।”
শাখা আর কিছু বলল না। তার মাথায় তখন কেবল জান্নাত।
“আপনার অনেক ঝামেলা হয়ে যাচ্ছে তাই না?”
ফাইয়াজ নিচু স্বরে বলল,
“তবুও আমি খুঁজে যাব।”
“কেন?”
শাখা তাকাল তার দিকে। ফাইয়াজ নীরব থেকে বলল,
“কারণ আপনাকে একা এই বোঝা বইতে দেখতে ভালো লাগে না।”
শাখার চোখ দুটো নরম হয়ে এলো। ফাইয়াজ ঘোড়ার লাগাম ধরে বলল
“একটা আবদার আছে আপনার কাছে”
“বলুন”
“আপনি থেকে কি তুমি হওয়া যায়? আপনি শব্দটা ভীষণ পরপর লাগছে”
“আমরা বুঝি আপন?”
ফাইয়াজ ভরকে যায় শাখার প্রশ্নে। আশাবাদী হয়ে তাকিয়ে বলে
“নয় কি? আমার কাছে তো তাই লাগে”
শাখা ওপর নিচ মাথা নাড়ল। অর্থাৎ হ্যা, আমরা আপন। ফাইয়াজ এর বুক ভরে গেল খুশিতে। হেসে বলল
“আসছি আমি, সাবধানে থেকো হু?”
শাখা লাজ টুকু লুকিয়ে বলল
“যাও”
****
আমিরাবাদের প্রাসাদে আজ মেহরাব আর সাহারার প্রথম রাত। তবে রাজপরিবারের পুরোনো রীতি অনুযায়ী প্রথম রাতে বর-কনে আলাদা কক্ষে থাকবে। মেহরাব কথাটা শুনেই ভ্রু কুঁচকে ফেলল।
“এ আবার কেমন নিয়ম?”
সাহারা নির্বিকারভাবে বলল,
“রাজপরিবারের নিয়ম।”
“নিয়ম নয়, কুসংস্কার। এসবের কোনো ভিত্তি নেই।”
সাহারা এবার তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
“এমনিতে তো খুব ফটফট করেন। এখন বলছেন না কেন, এসব কুসংস্কার?”
মেহরাব বিরক্ত চোখে তাকাল।
“কারণ আমি এসব মানি না।”
“আমি মানি কি না, সেটাও তো জিজ্ঞেস করলেন না।”
“হ্যা সেটাই তো। তুমি আপত্তি করছ না কেন?”
সাহারা কাঁধ ঝাঁকাল।
“এমনিতেও আপনার সঙ্গে থাকার কোনো ইচ্ছে আমার নেই। তারা যা করছে, ভালোই করছে।”
মেহরাব যেন কথাটা সহ্য করতে পারল না
“তাহলে আমাকে বিয়ে করলে কেন?”
সাহারা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
“কারণ এত এত রহস্যগুলো একা উদ্ধার করা আপনার পক্ষে সম্ভব নয়।”
মেহরাবের চোখ সরু হয়ে এল। কোমরে হাত দিয়ে বলল
“হ্যা অনেক বড় দয়া করে ফেলেছেন মহারানী? মানে, আপনাকে ভীষণ দরকার ছিল। তা কিনশুধু গোয়েন্দাগিরির জন্য আমাকে বিয়ে করেছ?”
“আপনি নিজেই তো বলেছিলেন, আমাকে সাহায্য করবেন।”
মেহরাব কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর মৃদু হেসে বলল,
“তুমি সত্যিই অসহ্য। এবার আর ছাড়ারও উপায় নেই”
সাহারা ঘুরে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
“কাল থেকে রহস্যের খোঁজ শুরু হবে।”
পেছন থেকে মেহরাবের কণ্ঠ ভেসে এল,
“সে না হয় হবে। এখন কক্ষে চলো”
সাহারা খানিকটা তেতে উঠে বলে
“আমি কেন আপনার কক্ষে যাব হ্যা? এই আপনি কিন্তু ভুলে যাচ্ছেন আমাদের শর্ত। মনে নেই কি কি কথা হয়েছিল?”
মেহরাব এগিয়ে এসে খপ করে সাহারার হাত ধরল
“ওসব রহস্যের গুষ্টি আমি একাই মারতে পারি বুঝছো? চুপচাপ ঘরে চলো”
“তাহলে আমাশ কেন বিয়ে করেছেন?”
“চলো বোঝাচ্ছি”
মেহরাব টানতে টানতে নিয়ে যাচ্ছে সাহারা কে
“আপনি কিন্তু কথার খেলাপ করছেন যুবরাজ। এ কিন্তু অন্যায়। আপনি আমাকে বিয়ে করেছেন নিজের সহযোদ্ধা বানিয়ে এই রহস্য একসাথে উদঘাটন করবেন বলে”
“ওসব ভুজুংভাজুং। আগে বাসর, তারপর সব। তোমাকে ভুলভাল বুঝিয়ে বিয়ে করেছি বুঝছো? আসল উদ্দেশ্য এটাই ছিল”
“কি খারাপের খারাপ। যুবরাজ ভালো হচ্ছে না কিন্তু। আমি কিন্তু আপনার গর্দান নিয়ে নিব”
“আমিও তো তাই চাই। মেরে ফেলো আমায়”
“যুবরাজ ছাড়ুন বলছি আমায়। আমি বাড়ি যাবোওওওও”
***
রাত নিশুতি। মেহরাবের বলা নির্দেশনা অনুযায়ী আলীরাজ পৌঁছে গেছে জঙ্গলে। যার দেখা করার কথা ছিল সে উপস্থিত। কুশলাদি বিনিময়ের পরে নথি বুঝে নিলো আলীরাজ। বিনিময়ে অপরপক্ষকে দিলো পাঁচ’শ স্বর্ণমুদ্রা। সে তার প্রাপ্য নিয়ে চলে গেল। আলীরাজও ফিরছে মহলের দিকে। গভীর জঙ্গল। দুই পাশে বাঁকানো অশ্বত্থ গাছ। গা ছমছমে পরিবেশ। আলীরাজ ভয় না পেলেও কেমন অস্বস্তি হচ্ছে এমন নিরব পরিবেশে। চাঁদের আলোয় চারিদিক দিনের বেলার মত লাগছে। সামনে কোথাও ঝর্ণা বা দীঘি হবে হয়তো। পানির কলকল শব্দ শুনতে পাচ্ছে আলীরাজ। আচমকা ঘুঙুরের শব্দ যেন গন্ডি কোটে গেল আলীরাজের পাশ ঘেঁষে। অবাক হলো ভীষণ। এত রাতে ঘুঙুরের ঝপঝপ শব্দ যেন গায়ে কাটা দিয়ে উঠতে বাধ্য করল।
এখন ও সেই ঝপঝপ শব্দ শোনা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে গায়ে ভারি গয়না আর মোটা ঘুঙুর পরে কোনো নারী হেঁটে যাচ্ছে। কিন্তু কোথায়? চাদের চকচকে আলোয় আলীরাজ স্পষ্ট দেখলো এক নারী অবয়ব। পরনে কালো পোষাক। মাথা ঢাকা লাল টকটকে ওড়নায়। নারীটি হেটে যাচ্ছে ওড়না মাটিতে লুটিয়ে যাচ্ছে। চাঁদের আলোয় সিঁদুর লাল বিশাল বয়ে যাওয়া ওড়নাটা যেন র’ক্তের নদীর মতন লাগছে। কেবল মাথা আর মুখ টুকুই ঢাকা। বাকি অংশ মাটিতে লেপ্টে যাচ্ছে। পায়ে ঝনঝন শব্দ করছে ঘুঙুর। মনে হচ্ছে কোনো পরি অথবা লোক কথার জঙ্গল দেবী। হাটছে নিজ ছন্দ। যেন হাটার গতিতে বাজা পায়ের ঘুঙুরও সুর তুলছে নির্দিষ্ট ছন্দে। তার গন্তব্য ঢালের দিকে দেখা যায়। ধীরে ধীরে নিচের দিকে নামছে। আলীরাজ শীত শীত আবহাওয়াতেও ঘেমে জুবুথুবু।
কি এক অদৃশ্য টানে পিছু নেয় নারীটির। নারীটি হেঁটে হেঁটে আস্তে আস্তে জলাশয়ের দিকে যাচ্ছে। চাঁদের আলোয় কুটকুটে কালো লাগছে জলাশয়ের পানি। কেমন ভূতুড়ে জলাশয়। ওানি দিয়ে যেন ধোঁয়া উঠছে। পুরনো সিঁড়িটা জলাশয়ের পানিতে নেমে গেছে। দু ধারে ঝুলে আছে গাছের বাকল। নারীটি ধীরে ধীরে পানিতে নেমে যাচ্ছে দ্বিধা ছাড়াই। আর না মুখের কাপড় সরাচ্ছে। নামতে নামতে ডুবে গেল আস্তে আস্তে। তলিয়ে গেল সম্পূর্ণ দেহ জলাশয়ে। মাথা টুকুও পানির তলায় চলে গেল। আলীরাজ শ্বাসরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে একদৃষ্টে। দীর্ঘ সময় পেরিয়েও নারীটি উঠলো না পানি থেকে। এ যে অসম্ভব। একজন মানুষ এতক্ষণ কী করে পানির তলায় ডুব দিয়ে থাকতে পারে শ্বাস না নিয়ে? আচমকা আলীরাজের কানে ভেসে আসে নারী কন্ঠের গুনগুন সুর।