ফন্ট সাইজ:
থিম:
রক্তমুকুট

34

লেখক: জান্নাতুল ফেরদৌস

আলীরাজের বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধকধক করতে লাগল। চোখের সামনে তখনও সেই নারী।

কালো পোশাক। মাথায় লাল ওড়না। পায়ের ঘুঙুরের ঝনঝন শব্দ। সেই অস্বাভাবিক জলাশয়ের দিকে আলীরাজ এক পা এগোতে গিয়েও থেমে গেল। তার মনে হলো, পা দুটো যেন নিজের ইচ্ছায় চলছে না। চারপাশের গাছপালা, চাঁদের আলো, ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক সবকিছু দূরে সরে যাচ্ছে। শুধু সেই গুনগুন সুরটা কানে বাজছে। মনে হচ্ছিল নারীটি এখনো জলের নিচে দাঁড়িয়ে গাইছে। আলীরাজের বুকটা ভার হয়ে এলো। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। কপাল বেয়ে ঘাম নেমে এল। অথচ রাতের বাতাস ছিল হিমশীতল।

সে নিজের মাথা ঝাঁকাল।

“না... এসব কী ভাবছি আমি?”

কিন্তু চোখ বন্ধ করলেই আবার সেই অবয়বটা ভেসে উঠছে। নারীটি কি সত্যিই মানুষ? নাকি এতক্ষণ যা দেখেছে, তার কিছুই সত্যি নয়?

আলীরাজ আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। পেছনে ফিরে ছুটতে শুরু করল। কতটা পথ পেরিয়েছে, সে নিজেও জানে না। ঘোড়ার কাছে পৌঁছে একবারও পেছনে তাকাল না। দ্রুত ঘোড়ায় উঠে লাগাম টেনে ছুটিয়ে দিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় পুরো পথজুড়ে তার কানে সেই ঘুঙুরের শব্দ বাজতেই থাকল। মাঝেমধ্যে মনে হচ্ছিল, তার ঘোড়ার পেছনেই কেউ দৌড়ে আসছে। একবার সাহস করে পেছনে তাকাল। কেউ নেই। শুধু অন্ধকার জঙ্গল।

তবুও আলীরাজের বুকের ভেতর থেকে অস্বস্তিটা আর গেল না।

****

মাঝরাতে আলীরাজ আমিরাবাদে ফিরে এলো।

প্রাসাদের ফটক পেরিয়ে ঘোড়া থেকে নামতেই প্রহরী তাকে দেখে অবাক হয়ে তাকাল।

“যুবরাজের মামা, এত রাতে ফিরলেন?”

আলীরাজ শুনলেও কোনো উত্তর দিল না। ঘোড়ার লাগাম এক সৈন্যের হাতে দিয়ে সোজা নিজের কক্ষে চলে গেল। তার মুখের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, সে ঠিক নেই। শরীরটা শুধু এখানে ফিরে এসেছে। মন পড়ে আছে সেই জঙ্গলের জলাশয়ের ধারে। কালো পোশাকের সেই নারী। আর জলের নিচে হারিয়ে যাওয়া অবয়ব। হঠাৎ পাশের কক্ষ থেকে হাসির শব্দ ভেসে এলো। আলীরাজ থেমে গেল।

মনে পড়ল আজ তো মেহরাবের সঙ্গে কথা বলার কথা ছিল। কিন্তু তার মাথায় তখন অন্য কিছুই ঢুকছে না। তখনই এক পরিচারক দৌড়ে এসে বলল,

“মামা সাহেব, শুনেছেন?”

আলীরাজ অন্যমনস্কভাবে তাকাল।

“কী?”

“যুবরাজ মেহরাব...”

“কী করেছে?”

পরিচারক মুচকি হেসে বলল,

“বিয়ে করে বউ নিয়ে এসেছেন।”

আলীরাজ কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল।

“কীহহহহ? কাকে?”

“সাহাবাদের ছোট শাহজাদী সাহারা জাহ্নবীকে।”

এক মুহূর্তের জন্য আলীরাজের চোখে বিস্ময় ফুটে উঠল। সাহারা! তবুও আশ্চর্যভাবে তার ভেতরে কোনো বড় প্রতিক্রিয়া হলো না। যেন এই সংবাদটাও সেই রহস্যময় নারীর ছায়ার কাছে ম্লান হয়ে গেল।

“হুম।”

শুধু এইটুকুই বলে নিজের কক্ষে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। পরিচারক অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

এই খবর শুনে যে মানুষটা সাধারণত প্রাসাদ মাথায় তুলত, সে আজ এত নির্লিপ্ত কেন?

কিছুক্ষণ পর আলীরাজ গোসল করতে গেল।

ঠান্ডা পানি মাথায় ঢালল। তবুও মাথার ভেতরের দৃশ্যগুলো সরল না। চোখ বন্ধ করলেই সিঁড়ি বেয়ে নামছে নারীটি। ঘুঙুর বাজছে। লাল ওড়না পানিতে ভেসে উঠছে। তারপর অদৃশ্য হয়ে তলিয়ে যাচ্ছে পানিতে। আলীরাজ চোখ খুলে ফেলল।

“কে তুমি? আর আমাকে কেন এমন করে ভাবাচ্ছ?”

গোসল শেষ করে পোশাক পরে অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে রইল আলীরাজ। শেষ পর্যন্ত আর থাকতে না পেরে উঠে দাঁড়াল। মেহরাবের কক্ষের দিকে হাঁটতে শুরু করল।

মেহরাব তখন নিজের কক্ষে সাহারার সাথে ধ্বস্তাধস্তি তে ব্যস্ত। দুটোতে যুদ্ধ চালাচ্ছে ঘরেী ভিতর। এদের বাক-বিতন্ডা দেখে কেউ আর কোনো নিয়ম পালনের কথা বলেনি। দরজার বাইরে দাঁড়িয়েই আলীরাজ কয়েকবার কড়া নাড়ল। কোনো উত্তর নেই। আরেকবার ধাক্কা দিল।

“মেহরাব!”

ভেতর থেকে বিরক্ত কণ্ঠ ভেসে এলো,

“কে?”

“আমি।”

“মামা?”

“দরজা খোল।”

ভেতর থেকে কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর দরজা খুলে গেল। মেহরাবের চেহারায় বিরক্তি স্পষ্ট।

“এই অবেলায়?”

আলীরাজ ভেতরে ঢুকে পড়ল।

“তুই ঘুমাচ্ছিলি?”

জড়তা ছাড়াই যেমন মেহরাবের কক্ষে অকপটে ঢুকে পড়ে সেভাবেই ঢুকল। কিন্তু বিছানায় চোখ পড়তেই লাফিয়ে উঠল আলীরাজ। সাহারার দুই হাত বেঁধে মুখ বেধে বিছানায় ফেলে রেখেছে। আলীরাজ নিজের বুকে থুতু নিয়ে দৌড়ে দরজার সামনে চলে এলো

“এ কি করছিস বাপ? মান ইজ্জতের বালাই নেই? আরে মামা হই তোর মামা”

মেহরাব চোখ সরু করে তাকাল।

“মামা হয়ে ভাগ্নের বাসর ঘরে অনুমতি না নিয়েই হুড়মুড় করে ঢুকে পড়লে। কেমন মামা তুমি?”

“আবে আমি কি জানি নাকি তুই বিয়ে করে…..এই এই। তুই সাহারা কে বিয়ে করেছিস?”

মেহরাব দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

“শ্রদ্ধেয় মামা, একটু আগে বিয়ে করেছি। আজকে অন্তত আমাকে শান্তিতে থাকতে দিন।”

আলীরাজ ভ্রু কুঁচকাল।

“বিয়ে করেছিস, ভালো কথা। কিন্তু একটা কথা বল তো, সাহারা কি জানে তুই কেমন পাগল?”

মেহরাব সঙ্গে সঙ্গে বলল,

“তুই কি করতে এসেছিস সেটা বলে বিদেয় হ বাপ?”

“না। একটা অদ্ভুত ঘটনা দেখেছি।”

মেহরাবের বিরক্ত মুখটা এবার একটু বদলে গেল।

“কী ঘটনা?”

আলীরাজ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল,

“জঙ্গলের ভেতর একটা জলাশয় আছে।”

“জানি।”

“সেখানে একটা নারীকে দেখেছি।”

ফিক করে হেসে ফেলল মেহরাব

“কোন কুমির টুমির কে নারী ভেবে প্রেমে পড়ে গেলি তাই দেখ। তের তো আবার রাতকানা রোগ আছে। রাতে ভালো দেখিস না চোখে”

“আরে নাআআআ”

মেহরাব থমকে গেল।

“তাহলে কেমন?”

আলীরাজের চোখে আবার সেই দৃশ্য ভেসে উঠল।

“কালো পোশাক পরা। মাথায় লাল ওড়না। পায়ে ঘুঙুর।”

মেহরাব এবার পুরোপুরি মনোযোগী।

“তারপর?”

আলীরাজ নিচু গলায় বলল,

“সে পানিতে নেমে গেল।”

“তারপর?”

“ডুবে গেল।”

মেহরাব কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

“মারা গেল? মানে তুই বাঁচালি না?”

আলীরাজ মাথা নাড়ল।

“জানি না। কারণ... অনেকক্ষণ পরও উঠল না।”

মেহরাবের কপালে ভাঁজ পড়ল।

“তুই নিশ্চিত দেখেছিস?”

আলীরাজ বিরক্ত হয়ে বলল,

“আমি কি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে গল্প বানাচ্ছি?”

“তোর মাথায় আজকাল অনেক কিছুই ঘুরছে।”

“মেহরাব!”

“আচ্ছা আচ্ছা। রাগ করিস না।”

মেহরাব একটু থেমে আবার বলল,

“তুই কি তাকে অনুসরণ করেছিলি?”

আলীরাজ চুপ। মেহরাব বুঝে গেল।

“করেছিলি।”

“হ্যাঁ।”

“তাহলে?”

“তারপর আর কিছু মনে নেই। শুধু মনে আছে, আমি ফিরে এসেছি। কিন্তু সারাটা পথ মনে হচ্ছিল কেউ যেন আমার পেছনে আসছে।”

মেহরাব এবার আর হাসল না। দুজনের মাঝখানে কয়েক মুহূর্ত নীরবতা নেমে এলো। হঠাৎ আলীরাজ বলল,

“আরেকটা কথা।”

“কী?”

“তুই সত্যিই সাহারাকে বিয়ে করেছিস?”

মেহরাবের মুখে এবার বিরক্তির বদলে মৃদু হাসি ফুটল।

“এই কথা জিজ্ঞেস করতে মাঝরাতে আমার বাসর ভাঙলি? আব্বে কানাচু*দা ওকে দেখেও কি বুঝতে পারছিস না?”

আলীরাজ চোখ পাকাল।

“আমি তো জানতাম না।”

“এখন জানলি।”

“সাহারা রাজি ছিল?”

মেহরাব একটু থেমে বলল,

“রাজি ছিল কি না সেটা এখনো পুরোপুরি বুঝিনি। তবে বিয়ের পর পালিয়ে যায়নি, এটুকু বলতে পারি।”

আলীরাজ বিরস মুখে বলল

“হ্যা সে তো দেখতেই পাচ্ছি। বেঁধে রাখলে পালাবে টা কি করে?”

আলীরাজ তাকিয়ে রইল তার দিকে। মেহরাব দরজার দিকে ইশারা করল।

“এবার যাও। আমাকে একটু শান্তিতে থাকতে দাও।”

আলীরাজ বেরিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ থেমে গেল।

“মেহরাব।”

“আবার কী? আমি কিচ্ছু শুনব না। তুই যা তো”

এমন সময় দরজার বাইরে হঠাৎ দ্রুত পায়ের শব্দ শোনা গেল। একজন প্রহরী প্রায় ছুটে এসে দরজার সামনে থামল।

“যুবরাজ!”

মেহরাব বিরক্ত মুখে তাকাল।

“ভাই সবাই আমার ঘরের সামনে এসে মরছে কেন? কী হয়েছে?”

প্রহরী হাঁপাতে হাঁপাতে মাথা নত করল।

“সম্রাট আপনাকে এখনই ডেকেছেন।”

মেহরাব আর কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই প্রহরী বলল,

“সীমান্তে অচেনা একদল লোক হানা দিয়েছে। তারা কারা, কোন দিক থেকে এসেছে কেউ কিছু বুঝতে পারছে না। সম্রাট সৈন্যদল প্রস্তুত করার নির্দেশ দিয়েছেন। আপনাকেই নেতৃত্ব দিয়ে যেতে হবে।”

মেহরাবের মুখের ভাব মুহূর্তেই বদলে গেল।

“কতজন?”

“এখনও নিশ্চিত নয়। সীমান্তের প্রহরীরা বলেছে সংখ্যায় অনেক।”

মেহরাব কোমরের তরবারিটা তুলে নিল। আলীরাজও উঠে দাঁড়াল।

“আমি যাব?”

মেহরাব মাথা নাড়ল।

“না। তুমি এখানেই থাকো।”

তারপর দরজার বাইরে পা বাড়াতে গিয়ে হঠাৎ থেমে গেল।

পেছনে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,

“আর হ্যাঁ, সাহারাকে বলে দিস। আজ ওর ভাগ্যটা বেশ ভালো।”

আলীরাজ ভ্রু কুঁচকে তাকাল।

“কেন?”

মেহরাবের ঠোঁটে দুষ্টু হাসি।

“সীমান্তে গোলমাল না হলে আজ ওকে ছাড়তাম না।”

আলীরাজ হেসে ফেলল। মেহরাব দরজার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে পেছন ফিরে বলল,

“তবে বেশি খুশি হওয়ার কারণ নেই। কাল কিন্তু ছাড়ব না।”

কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রাসাদের বাইরের প্রাঙ্গণে শোনা গেল ঘোড়ার খুরের শব্দ। একের পর এক সৈন্য এসে সারিবদ্ধ হচ্ছে। বর্মের ঠকঠক শব্দ, অস্ত্রের ঝনঝনানি আর ঘোড়ার হ্রেষাধ্বনিতে নিস্তব্ধ রাতটা মুহূর্তে বদলে গেল। বিশাল সৈন্যদল নিয়ে মেহরাব সীমান্তের উদ্দেশে রওনা হলো।

প্রাসাদের উঁচু বারান্দা থেকে সাহারা কিছুই জানল না। সে তখন গভীর ঘুমের মতো এক অদ্ভুত তন্দ্রায় ডুবে ছিল।

****

রাত আরও গভীর হলো। আমিরাবাদের প্রাসাদ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সাহারার চোখ দুটো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ঘুম আসছিল, আবার আসছিল না। অকারণেই বুকের ভেতর একটা অস্বস্তি হচ্ছিল।

হঠাৎ নাকে এসে লাগল এক তীব্র গন্ধ। সাহারা সঙ্গে সঙ্গে চোখ খুলে ফেলল। গন্ধটা অদ্ভুত ঝাঁঝালো। কেমন যেন ধাতব আর পোড়া কিছুর মিশ্র গন্ধ। সে বিছানায় উঠে বসল।

“এটা কীসের গন্ধ?”

কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে থাকতেই কেমন একটা শব্দ শুনতে পেল। খুব দূর থেকে আসছে। সাহারার চোখ সরু হয়ে গেল। সে ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নামল। আবার শব্দ হলো। মনে হলো কাঠের কোনো কিছুর ওপর ভারী ধাতব বস্তু আঘাত করছে। সাহারা দরজার কাছে গিয়ে কান পাতল। কিছুই নেই। কিন্তু গন্ধটা আরও স্পষ্ট।

সে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলো। প্রাসাদের করিডোর অন্ধকার। কয়েকটি প্রদীপ জ্বলছে, কিন্তু বাতাসে সেগুলোর আলোও কাঁপছে।

সাহারা ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করল। খেয়াল করল শব্দটা প্রাসাদের ভেতরের দিক থেকে আসছে। যেদিকে সাধারণত কেউ যায় না।

সাহারা চারপাশে তাকাল। কোনো প্রহরী নেই। কোনো দাসী নেই। পুরো পথটা অস্বাভাবিকভাবে ফাঁকা। সে আবার এগোল। একটা করিডোর পেরিয়ে আরেকটা। তারপর আরও সরু একটা পথ। যত এগোচ্ছে, গন্ধটা তত তীব্র হচ্ছে।

সাহারার হাত অজান্তেই কোমরের কাছে চলে গেল। অস্ত্র নেই। তবুও থামল না। হঠাৎ দূর থেকে ক্ষীণ একটা আওয়াজ ভেসে এলো। মানুষের কণ্ঠ। সাহারা থমকে দাঁড়াল। কেউ যেন চিৎকার করছে।

“আঃ...!”

তারপরই শব্দ থেমে গেল। সাহারার বুকের ভেতর ধক করে উঠল। এখানে কেউ আছে! সে আরও দ্রুত পা বাড়াল। সামনে এখন প্রাসাদের একেবারে শেষ প্রান্ত। দেয়ালের সঙ্গে মিশে থাকা একটা পুরোনো দরজা। দরজাটা অন্য সব দরজার চেয়ে আলাদা। কাঠ কালচে হয়ে গেছে। লোহার পেরেকগুলোতে মরচে ধরেছে। সাহারা দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। ভেতর থেকে আবার শব্দ এলো। তারপর কারও গলা

“না... থামো!”

সাহারার চোখ বড় হয়ে গেল। সে দরজার হাতলে হাত রাখল। ঠিক তখনই পেছন থেকে কেউ তার কাঁধে হাত রাখল। সাহারা আচমকা ঘুরে দাঁড়াল।

“আহ্!”

তার মুখ থেকে চিৎকার বেরিয়ে আসার আগেই পরিচিত কণ্ঠ ফিসফিস করে উঠল,

“চুপ!”

সাহারার চোখ স্থির হয়ে গেল। পেছনে দাঁড়িয়ে জাহিদা। চোখেমুখে তারও আতঙ্ক।

জাহিদা নিচু গলায় বলল,

“আপনি এখানে কী করছেন?”

সাহারা দরজার দিকে তাকিয়ে আবার জাহিদার দিকে ফিরল।

“আপনিই বা এখানে কী করছ?”

জাহিদা উত্তর দিল না। তার দৃষ্টি গিয়ে আটকে রইল দরজার ওপরে। ভেতর থেকে আবার সেই শব্দটা এলো। ঠক! ঠক

তারপর কয়েকজন মানুষের চাপা চিৎকার। দুজনেই স্থির হয়ে গেল। জাহিদা সাহারার হাত চেপে ধরল। দুজনের চোখাচোখি হলো।

তখনই দরজার ওপাশ থেকে একটি শব্দ এলো, যা শুনে সাহারার বুকের ভেতরটা বরফ হয়ে গেল

“ওরা বাইরে এসেছে। ধরো ওদের নয়তো সর্বনাশ হয়ে যাবে”

****

জঙ্গলের ভেতর বিকেলের আলো ফিকে হয়ে আসছে। উঁচু উঁচু গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে সূর্যের শেষ আলো মাটিতে এসে পড়েছে ছায়া-আলোর বিচিত্র নকশা এঁকে। দূরে কোথাও পাখিরা নীড়ে ফেরার ডাক দিচ্ছে। বাতাসে ভেসে আসছে ভেজা মাটির গন্ধ। চারপাশে এমন এক শান্তি, যেন সাহাবাদের সমস্ত অস্থিরতা থেকে এই জায়গাটা বহু দূরে। শাখা ঘোড়ার লাগাম টেনে থামল। সামনেই দাঁড়িয়ে আছে ফাইয়াজ। আজ তাকে দেখেই শাখার মুখে অজান্তে হাসি ফুটে উঠল।

“এতক্ষণ কোথায় ছিলেন?”

ফাইয়াজ মৃদু হেসে বলল,

“তুমি আসবে বলে অপেক্ষা করছিলাম।”

শাখা ঘোড়া থেকে নামল। ফাইয়াজও নিজের ঘোড়া থেকে নেমে তার কাছে এগিয়ে এলো।

কিছুক্ষণ দুজনেই কোনো কথা বলল না। ফাইয়াজের চোখ আটকে রইল শাখার মুখে।

এই নিয়ে দ্বিতীয়বার সে শাখার মুখ দেখছে।

প্রথমবার মহলের সেই ভিড়ের মধ্যে তাকে দেখেছিল। চারপাশে তখন এত হৈচৈ, এত মানুষ, এত ঘটনা যেন শাখার মুখটা ঠিকমতো দেখার সুযোগই হয়নি। শুধু চোখ দুটো আর হাঁটার ভঙ্গি দেখেই চিনে ফেলেছিল সে।

কিন্তু আজ আজ কোনো ভিড় নেই। কোনো মানুষের কোলাহল নেই। শুধু সে আর শাখা।

ফাইয়াজ যেন প্রথমবারের মতো মন ভরে তাকাল। শাখা একটু অস্বস্তিতে চোখ নামিয়ে ফেলল।

“এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন?”

ফাইয়াজ মৃদু হেসে বলল,

“তোমাকে দেখছি।”

“আগে দেখেননি?”

“দেখেছি।”

“তাহলে?”

“আগে দেখার মতো করে দেখা হয়নি।”

শাখা আর কিছু বলল না। তার গালের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। দুজন জঙ্গলের আরও ভেতরের দিকে এগিয়ে গেল। কিছুদূর গিয়ে বিশাল এক গাছের নিচে থামল তারা। গাছটার শিকড় মাটির ওপর ছড়িয়ে আছে। পাশে শুকনো পাতার স্তর।

শাখা ক্লান্ত হয়ে বসে পড়ল। ফাইয়াজও তার পাশে বসল। কিছুক্ষণ পর শাখা ধীরে ধীরে মাথাটা ফাইয়াজের কাঁধে ঠেকিয়ে দিল। ফাইয়াজ এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল। তার বুকের ভেতর যেন অকারণে ঢেউ উঠল। এতটা কাছে শাখাকে সে আগে কখনো পায়নি। সে নড়ল না।

পাথরের ন্যায় বসে রইল। শাখার চুলে জঙ্গলের বাতাস লাগছে। কয়েকটা চুল এসে তার মুখের পাশে উড়ে পড়ছে। ফাইয়াজের ইচ্ছে হলো হাত বাড়িয়ে সেগুলো সরিয়ে দেয়। কিন্তু সাহস হলো না।

বরং নিজের হাতটা মাটির ওপর রেখেই বসে থাকল। তারপর শাখার আঙুলগুলো ধীরে ধীরে তার হাতের কাছে এসে থামল। ফাইয়াজ তাকাল।

শাখা কোনো কথা না বলে নিজের হাতটা তার হাতের ওপর রাখল। ফাইয়াজের আঙুলগুলো শাখার আঙুলের সঙ্গে জড়িয়ে গেল। দুজনেই চুপ। কিন্তু সেই নীরবতার মধ্যেও যেন অনেক কথা হয়ে গেল। ফাইয়াজের মনে তখন একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। এই মেয়েটা আসলে কে?

শাখা জমিদার পরিবারের সঙ্গে কীভাবে জড়িত?

সে কি সত্যিই কেবল একজন সাধারণ নগরবাসী?

নাকি তার পরিচয়ের আড়ালে এমন কিছু আছে, যা ফাইয়াজ এখনো জানে না?

শাখার কথা বলার ধরন, মহলে তার চলাফেরা, সবাই তাকে যে সম্মান করে সবকিছু মিলিয়ে ফাইয়াজের সন্দেহ আরও গভীর হচ্ছে। তবুও সে কিছু জিজ্ঞেস করল না। কারণ আজকের এই সময়টুকু সে নষ্ট করতে চায় না। রাজনীতি, পরিচয়, প্রতিশোধ, উদ্দেশ্য সবকিছু থেকে দূরে থাকতে চায় সে। শুধু এই মেয়েটার পাশে বসে থাকতে চায়। শাখা ধীরে বলল,

“আজ অনেক শান্ত লাগছে।”

ফাইয়াজ নিচু স্বরে বলল,

“হুম।”

“মনে হচ্ছে সবকিছু থেকে একটু দূরে চলে এসেছি।”

“তুমি চাইলে প্রতিদিনই এমন জায়গায় নিয়ে আসব।”

শাখা মৃদু হেসে বলল,

“প্রতিদিন?”

“হ্যাঁ।”

“আপনার তো অনেক কাজ।”

ফাইয়াজ একটু থেমে বলল,

“কাজ থাকবেই। কিন্তু তোমার জন্য সময় বের করা যাবে।”

শাখা তার হাতটা আরও শক্ত করে ধরল।

“আপনি খুব অদ্ভুত।”

“কেন?”

“কখনো মনে হয় আপনি খুব সাধারণ একজন মানুষ। আবার কখনো মনে হয়...”

“কী?”

শাখা মাথা তুলে তাকাল।

“আপনার মধ্যে অনেক কিছু লুকানো আছে।”

ফাইয়াজের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, আজই সব বলে দেবে।

নিজের পরিচয়। নিজের অতীত। কেন সে শাখার কাছে এসেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছুই বলল না।

শুধু মৃদু হেসে বলল,

“হয়তো একদিন সব জানতে পারবে।”

শাখা আবার তার কাঁধে মাথা রাখল।

“আমি অপেক্ষা করব।”

ফাইয়াজ আকাশের দিকে তাকাল। সূর্যের শেষ আলোটুকুও তখন গাছের আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে।

শাখার হাত ছাড়ল না। আজকের এই মুহূর্তটুকু তার কাছে অমূল্য। ভবিষ্যতে যা হবে দেখা যাবে। কত ডাকাতি করেছে, কত টাকা পয়সা, অর্থ কড়ি লুট করেছে। এত শান্তি তো মেলেনি যতটা শাখার পাশে বসে মিলছে

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে 34 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন