সীমান্তের যুদ্ধ থেকে ফিরে আসার পর থেকেই মেহরাবের অবস্থা ভালো নয়। সাধারণত মানুষটাকে সাধারণত অসুস্থতা স্পর্শও করতে পারে না, শক্তপোক্ত শিকারী যুবরাজটিই এবার কয়েকদিন ধরে শয্যাশায়ী। শরীরজুড়ে জ্বরের তাপ। কপালে হাত রাখলেই বোঝা যায় আগুনের মতো গরম। কখনো ঘোরের মধ্যে চোখ মেলে তাকাচ্ছে, আবার ক্লান্তিতে চোখ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
বহু বছর পর এমন অসুখে পড়েছে মেহরাব।
আয়েশা বেগম ছেলের মাথার কাছে প্রায় সারাক্ষণ বসে থাকেন। কপালে ঠান্ডা পানির কাপড় দিয়ে দেন, হাকিমের দেওয়া ওষুধ খাওয়ান। মায়ের চোখেমুখেও দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট।
সাহারাও কম সময় দিচ্ছে না। মেহরাবের সঙ্গে তার বিয়ের আগে থেকেই দুজনের মধ্যে কথায় কথায় ঠোকাঠুকি লেগেই থাকে। একবার কথা কাটাকাটি, আরেকবার তর্ক কোনো কিছুতেই যেন দুজনের বনিবনা হতে চায় না। কিন্তু মানুষটা অসুস্থ হওয়ার পর সাহারা যেন নিজের সব অভিমান পাশে সরিয়ে রেখেছে। মেহরাব কখন ওষুধ খাবে, কখন পানি চাইবে, কখন জ্বর বাড়ছে সবকিছুর দিকেই তার নজর।
কয়েকবার অবশ্য অসুস্থ অবস্থাতেও দুজনের মধ্যে ছোটখাটো তর্ক বেঁধেছে। গতকাল রাতেও ওষুধ খেতে গিয়ে বাধলো যুদ্ধ। সাহারা চামচে করে তরল ওষুধ টা দিয়ে বলল
“ওষুধটা খেয়ে নিন।”
“সরাও তো, খাব না।”
“ওমা, কেন?”
“তেতো।”
সাহারা বিরক্ত হয়ে তাকিয়ে বলল
“কচি খোকা নাকি? এটুকু তেতো হজম করতে পারেন না?”
মেহরাব খোঁচা মেরে বলল
“তোমাকে হজম করে নিচ্ছি, এ ওষুধ আবার কোন বিশাল ব্যপার। দাও মগারানী, হা”
সাহারা চোখ পাকিয়ে সহ্য করে নিল। মেহরাব অসুস্থ বলেই সাহারা এবার আর তার কথায় তেমন পাল্টা কথা বাড়ায় না। মেহরাব বিশাল খাটটায় শুয়ে থাকে। আর সাহারার জন্য কক্ষের একপাশে থাকা বড় কাউচটাতেই শোয়ার ব্যবস্থা হয়েছে।
রাত গভীর হলে মাঝে মাঝে মেহরাবের কাশির শব্দে সাহারার ঘুম ভেঙে যায়। সে উঠে বসে দূর থেকে তাকিয়ে দেখে মানুষটা ঠিক আছে কি না।
অথচ মেহরাব জানেও না, তার এই চুপচাপ যত্নটুকু সাহারার স্বভাবের কতটা বাইরে।
***
দিনগুলো এভাবেই কাটতে থাকে। একদিন বিকেলে জানালার পাশে বসে সাহারা বাইরে তাকিয়ে ছিল। বুকের ভেতরটা কেমন ভার হয়ে এলো। বাবা-মাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে।
বিয়ের পর এতদিন হয়ে গেল। অথচ সাহাবাদে যাওয়া হয়নি। বড় বোন জান্নাতের কোনো খবর নেই। সেই চিন্তা আলাদা। আর ছোটবেলা থেকে যে মহল, যে মানুষগুলো তার পৃথিবী ছিল তাদের থেকে এত দূরে এসে মাঝে মাঝে নিজের ভেতরটা ভীষণ ফাঁকা লাগে। সাহারা ধীরে চোখ বন্ধ করল।
বাবার মুখটা মনে পড়ল। মায়ের কণ্ঠটা মনে পড়ল। শাখার সঙ্গে শেষ দেখা। আর জান্নাত আপা….? তার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। ওদিকে মেহরাব জ্বরে অচেতন ঘুমে ডুবে আছে। সাহারা উঠে গিয়ে জানালাটা বন্ধ করে দিল। তারপর আবার কাউচে এসে বসে পড়ল।
*****
পরদিন সকাল। আমিরাবাদের প্রাসাদের বাইরের ফটকে আচমকা ঘোড়ার খুরের শব্দ শোনা গেল।
একসঙ্গে অনেকগুলো ঘোড়া। প্রহরীরা ছুটে গিয়ে ফটকের দিকে তাকাল। সামনে একটি সুসজ্জিত অশ্বারোহী দল। তাদের পেছনে কয়েকটি ঘোড়া ও বাহন বিভিন্ন রকমের সিন্দুক, কাপড়ে মোড়া পুঁটলি আর উপঢৌকনে বোঝাই। সৈন্যদের পোশাক দেখেই বোঝা গেল তারা সাহাবাদ থেকে এসেছে। সামনের অশ্বারোহীটি ঘোড়া থামাতেই প্রহরীরা সম্মানের সঙ্গে মাথা নত করল। এসেছেন শাখা নেওয়াজ। প্রয়াত নায়েব নেওয়াজে আবিদের একমাত্র কন্যা। তার সঙ্গে সাহাবাদের কয়েকজন সৈন্য।
শাখা ঘোড়া থেকে নামল। তার সঙ্গে আনা উপঢৌকনের দিকে তাকিয়ে একবার দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এসব তার বোনের শ্বশুরবাড়ির জন্য।
সাহারার জন্য। এতদিন পর বোনের সাক্ষাতে এসেছে, আজ তাকে মুখে হাসি রাখতে হবে। কারণ সে এসেছে নিজের বোনের নতুন সংসারের মানুষগুলোর কাছে সাহাবাদের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা নিয়ে। একজন সৈন্য এগিয়ে এসে বলল,
“শাহজাদী, সব প্রস্তুত।”
শাখা মাথা নাড়ল।
“চলো।”
প্রাসাদের বিশাল দরজা খুলে গেল। শাখা ভেতরে পা রাখল। সে জানে না, তার বোনের স্বামী মেহরাব ঘোর অসুস্থ হয়ে শুয়ে আছে।
শাখা অন্দরে প্রবেশ করতেই সাহারা কে ডাকা হলো। আপার আসার খবরে ছুটে এলো সাহারা। শাখাকে দেখে সাহারার বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল। এতদিন পর নিজের আপন মানুষকে সামনে দেখে কিছু বলতেই পারল না সে। এগিয়ে এসে শাখাকে জড়িয়ে ধরল।
“আপা...”
শাখাও শক্ত করে বোনকে জড়িয়ে ধরল। কিছুক্ষণ দুজনের কেউ কোনো কথা বলল না।
তারপর সাহারা শাখাকে নিজের কক্ষে নিয়ে গেল। দরজা বন্ধ হতেই এতদিনের জমে থাকা কথাগুলো যেন একসঙ্গে বেরিয়ে আসতে চাইল।
শাখা প্রথমেই জিজ্ঞেস করল,
“তুই ভালো আছিস?”
সাহারা মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
“আছি।”
“যুবরাজ কেমন?”
“ভীষণ অসুস্থ। সীমান্ত থেকে ফেরার পর থেকেই জ্বর।”
শাখার চোখে উদ্বেগ ফুটে উঠল।
“হাকিম দেখেছে?”
“হ্যাঁ। এখন একটু কমেছে।”
কিছুক্ষণ চুপ থেকে শাখা বোনের হাতটা ধরে বলল,
“সাহারা... তুই এই বিয়েটা কেন করলি?”
সাহারার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। সে জানালার বাইরে তাকাল।
“করতেই হতো।”
শাখা অবাক হয়ে তাকাল।
“করতেই হতো মানে?”
সাহারা ধীরে বলল,
“নিজের জন্য না হোক, সাহাবাদের জন্য।”
শাখা আরেকটু কাছে সরে এল।
“খোলসা করে বল।”
সাহারা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“আমি যদি এই মহলে না থাকতাম, তাহলে আমিরাবাদের ভেতরে কী হচ্ছে, সম্রাট কী পরিকল্পনা করছেন কিছুই জানতে পারতাম না। বাইরে থেকে আমরা যতটুকু বুঝতে পারি, তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু এই মহলের ভেতরে লুকিয়ে আছে।”
শাখা নিশ্চুপ। সাহারা নিচু স্বরে বলল,
“আমি সম্রাটকে সন্দেহ করি।”
“কেন?”
“এর আগে যখন আমি দুদিন নিখোজ ঋিলাম। তখন এই মহলে এনে আমাকে রাখা হয়েছিল। এখানে আসার পর তার আচরণ আমার চোখ এড়ায়নি। সাহাবাদের ব্যাপারে তার আগ্রহটা স্বাভাবিক নয়। সবকিছুর মধ্যে একটা অদ্ভুত যোগ আছে।”
শাখার চোখে উদ্বেগ ঘনীভূত হলো।
“তুই এসব কথা এখানে কাউকে বলেছিস?”
সাহারা মাথা নাড়ল।
“না। যুবরাজ ছাড়া কাউকেই না।”
তারপর শাখার হাত চেপে ধরে বলল,
“আপা, এখনই কাউকে কিছু বলিস না। সাহাবাদে ফিরে গিয়ে বাবাকে সব বলবি, আমি ভালো আছি সুখে আছি। আর খুব শিগগিরী বাবাকে দেখতেও যাব। আমি যা দেখেছি, যা বুঝেছি সব বলব। এখানে থেকে আরও কিছু জানতে হবে আমাকে।”
শাখা কিছুক্ষণ বোনের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল|
“তুই জানিস তো, এই কাজটা কতটা বিপজ্জনক?”
সাহারা মৃদু হেসে বলল,
“জানি।”
“তবুও?”
“সাহাবাদকে বাঁচানো কি খালি তোর আর বাবার দ্বায়িত্ব? আমি বুঝি কেউ নই? এখন আমার দুটো পরিচয় আপা। আমি সাহাবাদ এর শাহজাদি এবং আমিরাবাদ এর যুবরাণী। আমার সাহাবাদকে বাঁচাতে হলে ঝুঁকি নিতেই হবে।”
শাখা বোনের হাত শক্ত করে ধরে বলল,
“নিজেকে বিপদে ফেলিস না।”
সাহারা এবার আর হাসল না।
“তুমিও না।”
কথা বলতে বলতে অনেকটা সময় পেরিয়ে গেল।
এর মধ্যেই আয়েশা বেগম নিজে এসে শাখার জন্য নানারকম খাবারের আয়োজন করলেন।
“এত দূর থেকে এসেছে, খালি মুখে কী করে যেতে দিই? দুপুরের খাবার খেয়ে তারপর যেও।”
শাখা বিনয়ের সঙ্গে বলল,
“আম্মাজান, আপনি এত আয়োজন করছেন, আমি সত্যিই লজ্জা পাচ্ছি।”
আয়েশা বেগম মমতাভরা কণ্ঠে বললেন,
“তুমি আমার সারার বোন। আমার মেয়ের মত। তোমার জন্য আয়োজন করতে আমার আবার অনুমতি লাগে নাকি?”
সাহারা পাশে বসে মৃদু হাসল। আয়েশা বেগম আবার বললেন,
“আজ রাতটা থেকো। এতদিন পর এসেছ। কাল সকালে যেও।”
শাখা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মাথা নাড়ল।
“না মা। থাকতে পারব না।”
“কেন?”
“বাড়িতে সবাই চিন্তায় আছে। জান্নাত আপার কোনো খবর নেই। আমি বেশি সময় বাইরে থাকলে মামার দুশ্চিন্তা হবে।”
আয়েশা বেগম আর জোর করলেন না। শুধু বললেন,
“তাহলে অন্তত খেয়ে যেও।”
শাখা হেসে বলল,
“এইটুকু কথা রাখতে পারি।”
বিদায়ের সময় সাহারা শাখাকে অনেক দূর পর্যন্ত এগিয়ে দিতে এল। দুজন বোন আবার একবার একে অপরকে জড়িয়ে ধরল। শাখা ফিসফিস করে বলল,
“সাবধানে থাকিস।”
সাহারা উত্তর দিল,
“তুমিও।”
“আর একটা কথা।”
“কী?”
“তুই যা জানিস, সব নিয়ে সাহাবাদে ফিরবি।”
সাহারা মাথা নাড়ল।
“ফিরব।”
শাখা ঘোড়ায় উঠে লাগাম হাতে নিল। সাহারা দাঁড়িয়ে রইল প্রাসাদের সিঁড়িতে। শাখা শেষবারের মতো বোনের দিকে তাকিয়ে বলল,
“নিজের খেয়াল রাখিস।”
তারপর সৈন্যদের সঙ্গে নিয়ে সাহাবাদের পথে রওনা হলো। ঘোড়ার খুরের শব্দ ধীরে ধীরে দূরে মিলিয়ে গেল। সাহারা অনেকক্ষণ সেদিকেই তাকিয়ে রইল। তারপর প্রাসাদের ভেতরে ফিরে এল। মেহরাবের কক্ষের দরজার কাছে এসে থামল। ভেতর থেকে মেহরাবের কাশির শব্দ ভেসে আসছে। সাহারা দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল।
*****
বিকেলের শেষ আলো ফিকে হয়ে আসছিল। বাগানবাড়ির পুরোনো পুকুরটা আজও ঠিক আগের মতোই আছে। চারপাশে নীরবতা। পুকুরের পানিতে অস্তগামী সূর্যের শেষ সোনালি আভা কাঁপছে। পঞ্জিকার পাতায় শীতের আগমনী সময়। বাতাসে ইতিমধ্যেই শীতের মিষ্টি গন্ধ। দূরের গাছগুলোর শুকনো পাতাগুলো মৃদু শব্দে নড়ে উঠছে। পুকুরের ঘাটের শেষ ধাপটায় পাশাপাশি বসে আছে সুনেহেরা আর মাহাদি। কত বছর পর!
এত বছর পর এমন নিরিবিলি সময় যেন তাদের ভাগ্যে আবার ফিরে এসেছে।
সুনেহেরার সোনালি চুলগুলো শীতল বাতাসে বারবার মুখের ওপর এসে পড়ছে। সে হাত বাড়িয়ে চুল সরিয়ে আবার পুকুরের দিকে তাকিয়ে রইল। মাহাদি অনেকক্ষণ কোনো কথা বলল না।
শুধু তাকিয়ে রইল তার দিকে। যে মুখটা একসময় প্রতিদিন দেখত। যে চোখ দুটো তার অপেক্ষায় বছরের পর বছর কেটেছে। সময় তার চেহারায় পরিবর্তন এনেছে, তবুও মাহাদির চোখে সুনেহেরা যেন সেই আগের জাহ্নবীই। হঠাৎ মাহাদি ধীর কণ্ঠে বলল,
“আমাদের সন্তান কোথায়, জাহ্নবী?”
সুনেহেরার হাতটা থেমে গেল। বাতাসে উড়ে আসা চুলগুলো আর সরাল না সে। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মৃদু হেসে বলল,
“আমারও তো সেই একই প্রশ্ন।”
মাহাদি তার দিকে তাকাল। সুনেহেরার কণ্ঠে বহু বছরের জমে থাকা অভিমান।
“যার উত্তর খুঁজতে আমার যৌবনকাল অপেক্ষা করতে করতে কেটে গেল।”
মাহাদি মাথা নিচু করল।
“আমি জানি।”
“না।”
সুনেহেরা ধীরে মাথা নাড়ল।
“আপনি জানেন না।”
তার চোখে পানি জমে উঠল।
“আপনি শুধু জানেন, আমি অপেক্ষা করেছি। জানেন না সেই অপেক্ষার প্রতিটা দিন কেমন ছিল।”
মাহাদি কিছু বলতে গেলেও সুনেহেরা থামিয়ে দিল।
“আপনি একদিন হুট করে ছুটে গেলেন দেশান্তরে। বললেন, ফিরে আসবেন। বললেন, আমাদের সন্তানকে খুঁজে আনবেন।”
তার ঠোঁট কেঁপে উঠল।
“আমি তো আপনাকে বিশ্বাস করেছিলাম। আপনার সন্তানকে নিজের সন্তান করে সংসার করতে চেয়েছিলাম। আমরা এক এক দুই না হয়ে এগারো হতে চেয়েছিলাম, সাহাবাদের ঢাল হতে চেয়েছিলাম। অথচ আপনি ফিরলেন না।”
মাহাদি দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“আমি খুঁজেছি, জাহ্নবী।”
“পেয়েছেন?”
প্রশ্নটা সরল ছিল। মাহাদির বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। সে ধীরে মাথা নাড়ল।
“না।”
সুনেহেরা চোখ বন্ধ করল। এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে। মাহাদি নিচু স্বরে বলল,
“দেশের পর দেশ ঘুরেছি। নগর থেকে নগর, গ্রাম থেকে গ্রাম। যাদের কাছে সামান্য কোনো খবর পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল, তাদের কাছেও গিয়েছি। খোঁজ করেছি। পরিচিত মানুষদের খুঁজেছি। কিন্তু কোনো চিহ্ন পাইনি।”
সুনেহেরা এবার তার দিকে তাকাল।
“একটাও না? তাহলে সে কোথায়?”
মাহাদি উত্তর দিতে পারল না।
পুকুরের পানিতে হঠাৎ একটা মাছ লাফ দিয়ে উঠল। ছোট্ট একটা ঢেউ তৈরি হয়ে আবার মিলিয়ে গেল। সুনেহেরা ফিসফিস করে বলল,
“আমার মনে হয় সে কোথাও আছে। সে মৃত নয় বুঝলেন”
মাহাদি তার দিকে তাকিয়ে রইল। সুনেহেরা চোখ নামিয়ে ফেলল। পাশে রাখা হাতের খুব কাছে নিজের হাত রাখল। স্পর্শ করল না। শুধু অপেক্ষা করল। কিছুক্ষণ পর সুনেহেরাই নিজের আঙুল বাড়িয়ে তার হাতের ওপর রাখল। মাহাদি চমকে তাকাল।
শীতের বাতাস আবার বয়ে গেল। সোনালি চুলগুলো উড়ে গিয়ে সুনেহেরার মুখ ঢেকে দিল।
মাহাদি হাত বাড়িয়ে খুব ধীরে তার মুখের পাশ থেকে চুলগুলো সরিয়ে দিল। দুজনে পুকুরের স্থির পানির দিকে তাকিয়ে রইল।
***
বাগানবাড়ির দিকে যাওয়ার সময় বাইজিদ শাহ আর মেহেরুন্নেসা পাশাপাশি হাঁটছিলেন। শীতের আগমনী বাতাসে বাগানের গাছপালাগুলো কেমন মৃদু শব্দে দুলছিল। দূরে পুকুরপাড়ে দুজন মানুষের অবয়ব দেখা যাচ্ছিল। প্রথমে মেহেরুন্নেসার চোখেই পড়ল। বাইজিদও তার দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকালেন। পাশাপাশি বসে আছে সুনেহেরা আর মাহাদি। এত বছর পরেও দুজনকে পাশাপাশি দেখে বাইজিদের বুকের ভেতর কেমন অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো। যেন সময় হঠাৎ পিছিয়ে গেছে। কত পুরোনো স্মৃতি, কত হারিয়ে যাওয়া মানুষ, কত অসমাপ্ত গল্প সবকিছু একসঙ্গে ফিরে এলো।
মেহেরুন্নেসা কিছু বললেন না। বাইজিদ ধীরে তার হাতটা নিজের হাতে নিলেন।
“চলো।”
দুজন আবার হাঁটতে শুরু করলেন। কিছুদূর এগোতেই বাগানের ভেতরের সরু পথটা গিয়ে মিশেছে এক পদ্মবিলের ঘাটে। প্রাসাদের আঙিনার ভেতরেই এত সুন্দর একটা জলাশয় ছিল, অথচ বহুদিন এখানে আসা হয়নি মেহেরুন্নেসার। পানির ওপর সারি সারি পদ্মফুল ফুটে আছে। কোথাও গোলাপি, কোথাও সাদা। পদ্মপাতার ফাঁকে ফাঁকে স্বচ্ছ পানি দেখা যাচ্ছে। বাতাসে ফুলের মৃদু গন্ধ। মেহেরুন্নেসার পা থেমে গেল। তার মুখের সমস্ত রং যেন এক মুহূর্তে বদলে গেল। বাইজিদ বুঝতে না পেরে তাকালেন।
“কী হলো?”
মেহেরুন্নেসা কোনো উত্তর দিলেন না। তার চোখ স্থির হয়ে আছে ঘাটটার দিকে। এই ঘাট, এই জায়গাটাই তো! কত বছর আগে….. চোখের সামনে যেন অতীতের দরজা খুলে গেল। সেদিনও এমনই বিকেল ছিল। ঘাটের পাশে বসে কাপড় কাচছিল সিমরান। সিমরান ছিল বাইজিদ শাহের পিতার ঘনিষ্ঠ বন্ধুর কন্যা। একসময় মেয়েটি এই মহলেই রাজকন্যার মতো বড় হয়েছিল, ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে মেহেরুন্নেসা সম্রাজ্ঞী হওয়ার পর তাকেই দাসীবৃত্তির শাস্তি দিয়েছিলেন।
মেহেরুন্নেসা তখন ক্ষমতা পেয়ে প্রত্যেক দোষীকে শাস্তি দিতে মড়িয়া। সিমরানকে এই ঘাটেই কাপড় ধোয়ার কাজে পাঠানো হয়েছিল। আর সেদিন হঠাৎ অঙ্কুরের বাহিনী আক্রমণ করেছিল। চারপাশে চিৎকার, ছুটোছুটি, আতঙ্ক। সিমরান পালাতে পারেনি। তীরবিদ্ধ হয়েছিল সিমরান, মেহেরুন্নেসা ছুটে এসেছিলেন তারপর সিমরানকে নিজের কোলে তুলে নিয়েছিলেন তিনি। মেয়েটির শরীর নিস্তেজ হয়ে আসছিল। সিমরানের চোখ দুটো মেহেরুন্নেসার মুখের ওপর স্থির হয়েছিল।
কাঁপতে কাঁপতে সে যেন কিছু বলতে চেয়েছিল।
কিন্তু পারেনি। মেহেরুন্নেসার কোলে মাথা রেখেই সেদিন শেষ নিঃশ্বাস ফেলেছিল সিমরান। বর্তমানে ফিরে এসে মেহেরুন্নেসা আচমকা চোখ বন্ধ করলেন। তার বুকটা ভারী হয়ে উঠল।৷ বাইজিদ তার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝলেন যেন কল্পণার কথা। তিনি জিজ্ঞেস করলেন,
“সিমরানের কথা মনে পড়ছে?”
মেহেরুন্নেসার ঠোঁট কেঁপে উঠল। হ্যা সম্মত মাথা নাড়লেন।
“হ্যাঁ।”
বাইজিদ আর কিছু বললেন না। মেহেরুন্নেসা ঘাটের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললেন,
“শেষবার যখন ওকে দেখেছিলাম... ও আমার কোলে ছিল। এই যে এইখানটায় সিমরান আপা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিল।”
তার চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
“আমি ওকে শাস্তি দিয়েছিলাম।”
কণ্ঠ ভারী হয়ে এলো।
“আজও বুঝি না, এতটা কঠোর কী করে হয়েছিলাম আমি।”
বাইজিদ তার হাতটা আরও শক্ত করে ধরলেন।
মেহেরুন্নেসা চোখ মুছলেন না। পদ্মফুলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“ওর শেষ নিঃশ্বাসটা আমি কোনোদিন ভুলতে পারিনি।”
দূরের বিশাল সেনা টহল টং এর ওপর থেকে মেহেরুন্নেসার ঘাড় বরাবর তাক করা এক সোনালী ফলার তীর টা ক্ষুধার্ত হয়ে আছে। ছেড়ে দিলেই সে তার তৃষ্ণা মেটাবে র'ক্তে ভিজে।