ভোরের আলো ফোটার আগেই ইয়ামিন ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। কাঁধে বাঁশের তৈরি ছোট ঝুড়ি, হাতে মাছ ধরার সরঞ্জাম। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে বয়ে যাওয়া নদীর দিকে এগিয়ে যেতে যেতে একবার পেছন ফিরে তাকাল। কাঠ-পাথরের ছোট্ট বাড়িটার দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে জান্নাত। মেয়েটা এখনো এই পাহাড়ি জীবনের সঙ্গে পুরোপুরি মানিয়ে উঠতে পারেনি।
ইয়ামিন কিছু না বলে চলে গেল। ঘরে ফিরে জান্নাত দেখল দাদিমা বেশ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। রাত থেকেই শরীরটা ভালো ছিল না, সকালে আরও দুর্বল লাগছে। জান্নাত দ্রুত তার কাছে গিয়ে বসল।
“দাদিমা, শরীর খারাপ লাগছে?”
বৃদ্ধা মৃদু হেসে বললেন,
“কিছু না রে ভাই। বুড়ো শরীর। দুদিন পরপর একটু-আধটু অসুখ করবেই।”
জান্নাত কিছুতেই কথাটা মানল না। পানি এনে দিল, কপালে ভেজা কাপড় রাখল। দাদিমাকে ওষুধ খাইয়ে বিছানায় শুইয়ে দিল।
“আপনি ঘুমান। আমি পানি নিয়ে আসছি।”
“কোথায় যাবি?”
“পাহাড়ের ওপাশে যে ঝরনার পানি জমে থাকে, সেখান থেকে নিয়ে আসব।”
দাদিমা কিছু বলতে চাইলেন, কিন্তু জান্নাত ইতিমধ্যেই কলসিটা হাতে তুলে নিয়েছে।
পাহাড়ি পথ ধরে একা হাঁটতে হাঁটতে তার মনে হচ্ছিল, এই জায়গাটা যেন পৃথিবীর অন্য কোনো অংশ। চারদিকে উঁচু পাহাড়। সবুজে ঢাকা ঢাল বেয়ে সরু সরু পথ নেমে গেছে নিচে। কোথাও বুনো ফুল, পাথরের ফাঁক দিয়ে ঝিরঝির করে পানি নামছে। দূরে পাখির ডাক। কিন্তু পথের এক জায়গায় কয়েকজন পাহাড়ি নারী বসে নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল। জান্নাতকে দেখেই তাদের কথাবার্তা থেমে গেল। একজন অন্যজনের কানে কানে বলল,
“এই মেয়েটা কে রে?”
“জানি না। ইয়ামিনদের বাড়িতে থাকে শুনছি।”
আরেকজন জান্নাতের দিকে তাকিয়ে মুখ বাঁকাল।
“কী রূপ দেখেছিস? নগরের মেয়ে মনে হয়।”
একটু তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল,
“রূপ থাকলেই কী হয়? কার ঘরে গিয়ে উঠেছে সেটাই তো আসল কথা।”
জান্নাত তাদের কথা শুনতে পেলেও কিছু বলল না। অপরিচিত মানুষ। অযথা কথা বাড়াতে চাইল না। কলসি ভরে সে ফিরে আসার জন্য ঘুরতেই দূর থেকে কয়েকজন যুবককে আসতে দেখা গেল। তাদের সামনে হাঁটছিল গ্রামের মোড়লের ছেলে। জান্নাতের দিকে চোখ পড়তেই তার পা থেমে গেল। কিছুক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে সে পাশে থাকা একজনকে জিজ্ঞেস করল,
“ও মেয়েটা কে?”
“চিনি না।”
“কোথায় থাকে?”
“ইয়ামিনদের বাড়িতে।”
মোড়লপুত্রের ভ্রু কুঁচকে গেল।
“ইয়ামিনদের বাড়িতে?”
তার চোখে এবার কৌতূহলের সঙ্গে অন্যরকম একটা ভাব ফুটে উঠল।
“ইয়ামিনের সঙ্গে সম্পর্ক আছে নাকি?”
লোকটা কাঁধ ঝাঁকাল।
“তা জানি না। তবে কয়েকদিন হলো মেয়েটাকে ওদের বাড়িতে দেখা যাচ্ছে।”
মোড়লপুত্র আর কিছু বলল না। মনে মনে হিসাব করতে লাগল। মেয়েটা কে, কোথা থেকে এসেছে এসব জানার আগ্রহের সঙ্গে সঙ্গে তার মনে বিয়ের কথাটাও উঁকি দিল। আব্বা অনেকদিন হলো বিয়ে করতে বলছে। এমন মেয়ে তাদের গ্রামে সচরাচর দেখা যায় না। কিন্তু ইয়ামিনের বাড়িতে কেন? এই প্রশ্নটাই তাকে অস্বস্তিতে ফেলল। জান্নাত তখন কলসি হাতে পাহাড়ি পথ ধরে ফিরছে। কিছুদূর যেতেই পেছন থেকে পায়ের শব্দ শুনতে পেল। সে একবার ফিরে তাকাল। মোড়লপুত্র কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে। জান্নাত ভ্রু কুঁচকে আবার হাঁটতে শুরু করল। পেছনের পায়ের শব্দ তবুও থামল না।
“শুনছো?”
জান্নাত থামল
“জি?”
লোকটা একটু কাছে এসে হাসল।
“নতুন এসেছো বুঝি?”
“হ্যাঁ।”
“কোথা থেকে এসেছো?”
জান্নাত শান্ত গলায় বলল,
“আমি ঠিক মনে করতে পারছি না।”
লোকটা অবাক হলো।
“মানে?”
জান্নাত আর কিছু না বলে হাঁটতে শুরু করল।
কিন্তু লোকটিও পিছু নিল।
“আরে শোনো, তোমার র নাম কী?”
জান্নাত থেমে বলল,
“মায়া।”
ইয়ামিন এর দেওয়া নামটাই সে ব্যবহার করল।
মোড়লপুত্র মৃদু হেসে বলল,
“মায়া... নামটা তোমার মতোই সুন্দর।”
জান্নাতের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। আগেই আন্দাজ করেছিলো লোকটির উদ্দেশ্য শুধু কথা বলা নয়। কলসিটা আরও শক্ত করে ধরে দ্রুত পা বাড়াল সে। পেছন থেকে আবার কণ্ঠ ভেসে এলো,
“এত তাড়া কেন? ভয় পাচ্ছোনাকি?”
জান্নাত কোনো উত্তর দিল না। দ্রুত বাড়িতে ফিরতে হবে। কলসিটা হাতে নিয়ে দ্রুত পা বাড়াচ্ছিল।
“আরে আরে, এত তাড়াহুড়ো করছো কেন?”
জান্নাত থেমে গেল।
“অপরিচিত মানুষকে আপনি সম্মোধন করার ভদ্রতা টুকুও শিখেন নি দেখছি”
দেখল মোড়লপুত্র এসে দাঁড়াল পথের মাঝখানে। জান্নাত শান্ত গলায় বলল,
“আমার বাড়িতে ফিরতে হবে।”
মোড়লপুত্র এক পা এগিয়ে এল।
“বাড়ি?”
তার ঠোঁটের কোণে বিদ্রূপ ফুটল।
“ইয়ামিনের বাড়িকে নিজের বাড়ি ভাবতে শুরু করেছেন নাকি?”
জান্নাত অবাক হয়ে তাকাল।
“আপনি কী বলতে চাইছেন?”
“যেটা জানতে চাইছি, সেটার উত্তর দিন।”
কণ্ঠটা এবার কঠিন।
“ইয়ামিনের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কী?”
“কোনো সম্পর্ক নেই।”
উত্তর শুনে লোকটা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল।
তারপর ফিক করে হাসল।
“ভালো।”
জান্নাত বুঝতে পারল না, এতে ভালো লাগার কী আছে। মোড়লপুত্র বলল,
“কারণ ইয়ামিনের সঙ্গে সম্পর্ক থাকলে ব্যাপারটা আমার পছন্দ হতো না।”
জান্নাতের ভ্রু কুঁচকে গেল।
“আপনার পছন্দ-অপছন্দের সঙ্গে আমার কী সম্পর্ক?”
লোকটির চোখ মুহূর্তেই কঠিন হয়ে গেল।
“আপনি এই পাহাড়ে নতুন। এখানকার নিয়মকানুন এখনো জানেন না। এই গ্রামের মানুষ আমার বাবার কথা শোনে। আর আমার কথা……”
একটু থামল সে।
“আমার কথা না শুনে এখানে কেউ বেশিদিন শান্তিতে থাকতে পারে না।”
জান্নাত এবার স্পষ্ট অস্বস্তি বোধ করল।
“আমাকে যেতে দিন।”
“যাবেন।”
লোকটা সরে দাঁড়াল না।
“তবে তার আগে একটা কথা শুনে যান। আমি আপনাকে পছন্দ করেছি।”
সরাসরি কথাটা শুনে জান্নাত হতভম্ব। মোড়লপুত্র আবার বলল,
“আপনার মতো মেয়েকে এই পাহাড়ে আমি আগে কখনো দেখিনি। তাই আপনার সম্পর্কে জানতে চেয়েছি।”
“আমার সম্পর্কে জানার প্রয়োজন নেই আপনার।”
“প্রয়োজন আছে।”
কণ্ঠে এমন দৃঢ়তা যেন কথাটা প্রশ্ন নয়, সিদ্ধান্তের মতো শোনাল।
“আমি আমার বাবার সঙ্গে কথা বলব। আপনার ব্যাপারে।”
জান্নাতের চোখে উদ্বেগ ফুটে উঠল।
“কেন?”
মোড়লপুত্র মৃদু হাসল।
“বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে।”
জান্নাত কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইল।নতারপর দৃঢ় গলায় বলল,
“দুঃখীত, আমি রাজি নই।”
লোকটির মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
“রাজি নন?”
“না।”
সে মাথা একটু কাত করে জান্নাতের দিকে তাকাল।
“আপনি আমাকে চেনেন না। তাই হয়তো এত সহজে না বলছেন।”
জান্নাত আর কথা না বাড়িয়ে পাশ কাটিয়ে যেতে চাইল। মোড়লপুত্র এবার পথ ছেড়ে দিল ঠিকই, কিন্তু পেছন থেকে বলল,
“মনে রাখবেন, মায়া, এই পাহাড়ে আসা নতুন মানুষটাকে আমি মন দিয়ে ফেলেছি।”
জান্নাত থেমে গেল।
“আর একটা কথা।”
সে ফিরে তাকাল। মোড়লপুত্রের চোখে তখন অদ্ভুত এক আত্মবিশ্বাস।
“আপনি ইয়ামিনের বাড়িতে থাকেন, এটা আমি ভুলিনি।”
জান্নাত কিছু বলল না। লোকটা ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল।
“আপনার উত্তর আজ না হলেও চলবে। কিন্তু শেষ উত্তরটা আমি শুনেই ছাড়ব।”
জান্নাত কলসি হাতে দ্রুত পাহাড়ি পথ ধরে বাড়ির দিকে আসে। মোড়লপুত্র তবুও আসছে পিছুপিছু
“আমাকে আর অনুসরণ করবেন না।”
মোড়লপুত্রের ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটল।
“আপনি এখনো বুঝতে পারেননি, আপনি কার সঙ্গে কথা বলছেন।”
মোড়লপুত্র এগিয়ে এসে তার সামনে দাঁড়াল।
“এই পাহাড়ের তিনটা পথ আছে। কোন পথে কে যাবে, কোন পথে কার ঘর, কার জমি, কার ব্যবসা সবকিছুর খবর আমার কাছে আসে।”
সে আঙুল তুলে দূরের পাহাড়ি পথটা দেখাল।
“ওই পথ দিয়ে কাঠ নামে, আমার লোকজন দেখে। আর ওই যে নিচের বাজার, সেখানকার ব্যবসায়ীরা আমার বাবার অনুমতি ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত নেয় না।”
তারপর জান্নাতের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আর এই গ্রামের মানুষ? তারা আমার বাবাকে মোড়ল বলে। কিন্তু ভয় পায় আমাকে।”
জান্নাত নির্বিকার চোখে তাকিয়ে রইল। এই ছেলে সামান্য মোড়লের পুত্র হয়ে জান্নাত কে ক্ষমতা দেখাচ্ছে? জান্নাত চুপচাপ সহ্য করে নিলে। মোড়লপুত্র নিচু স্বরে বলল,
“তাই আমার সঙ্গে বিবাদে গিয়ে কেউ আপনার পাশে দাঁড়াবে, এমন আশা করবেন না।”
জান্নাত শান্ত গলায় বলল,
“আপনার ক্ষমতার কথা শেষ হয়েছে?”
লোকটি ভ্রু কুঁচকাল।
“কী বললেন?”
“বললাম, আপনার ক্ষমতার কথা শেষ হয়েছে?”
জান্নাত কলসিটা একটু শক্ত করে ধরে বলল,
“এতক্ষণ ধরে শুনছি এই পথ আপনার, বাজার আপনার, মানুষ আপনার। কিন্তু একটা জিনিস ভুলে যাচ্ছেন।”
মোড়লপুত্র স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল। জান্নাত এবার এক পা এগিয়ে গেল।
“আমি কে, সেটা আপনি জানেন না।”
“আপনি নিজেই তো বলেছেন, আপনার নাম মায়া।”
“হ্যাঁ।”
জান্নাতের চোখে এবার অদ্ভুত দৃঢ়তা ফুটে উঠল।
“কিন্তু মায়া নামটা আমার স্মৃতির। আমার পরিচয় নয়।”
মোড়লপুত্রের মুখের হাসি একটু একটু করে মিলিয়ে গেল। জান্নাত বলল,
“আমি কোথা থেকে এসেছি জানি না। আমার পরিবার কে, জানি না। আমার অতীতের কিছুই মনে নেই।”
তারপর স্পষ্ট স্বরে যোগ করল,
“কিন্তু একটা জিনিস আমি জানি, আমাকে ভয় দেখিয়ে আমার সিদ্ধান্ত বদলানো যাবে না।”
মোড়লপুত্র কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ঠান্ডা হাসি দিয়ে বলল,
“আপনি আমাকে হুমকি দিচ্ছেন?”
“না৷ অত ছোটলোকি কাজ করি না। শুধু আপনার সীমাটা মনে করিয়ে দিচ্ছি।”
“আমার সীমা?”
“আপনি এই গ্রামের মোড়লের ছেলে। তাই এই গ্রামের মানুষ আপনার কথা শুনতে পারে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, এই গ্রামের বাইরের পৃথিবীও আপনার কথায় চলে।”
মোড়লপুত্রের চোখ সরু হয়ে এলো। জান্নাত তখনও স্থির।
“আপনি হয়তো জানেন না আমি কে। যেদিন জনসম্মুখে নিজস্ব পরিচয়ে আসব। তখন এই পাহাড়ের কোনো ক্ষমতাই আপনাকে রক্ষা করতে পারবে না।”
মোড়লপুত্র একটু থমকাল বটে। তবু দম্ভ ছাড়ল না।
“আপনি ভাবছেন, আপনি আমাকে ভয় দেখিয়ে চলে যাবেন?”
জান্নাত মৃদু হেসে বলল,
“ভয় দেখাচ্ছি না।”
তার চোখে এবার জমিদার-কন্যার সেই ঔদ্ধত্য যেন এক মুহূর্তের জন্য ফিরে এলো।
“আমি শুধু আপনাকে সতর্ক করছি।”
মোড়লপুত্র আর কোনো কথা বলল না। জান্নাত তাকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গেল। কয়েক পা যাওয়ার পর থেমে পেছন ফিরে তাকাল।
“আর একটা কথা। ইয়ামিনের বাড়িতে আমি আশ্রয় নিয়েছি। সে আমাকে আশ্রয় দিয়েছে। এই নিয়ে কারও কাছে জবাবদিহি করার প্রয়োজন আমি বোধ করি না। আপনার ক্ষমতা যতটুকু, সেটুকুই রাখুন। আমার জীবনের ওপর সেটা প্রয়োগ করার চেষ্টা করবেন না।”
কথাটা বলে জান্নাত চলে গেল। মোড়লপুত্র স্থির দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখে এবার রাগের সঙ্গে মিশে গেল কৌতূহল। মেয়েটা সাধারণ কেউ নয়।
তার কথা বলার ধরন, চোখের সেই দৃঢ়তা, আর নিজের পরিচয় না জেনেও এমন আত্মবিশ্বাস!
হুট করে সামনে পড়ল ইয়ামিন। কাঁধে মাছ ধরার ঝুড়ি ঝোলানো। হাতে কয়েকটা তাজা মাছ। জান্নাতকে দেখে তার মুখের ভাব বদলে গেল।
চোখ প্রথমে গেল জান্নাতের মুখে। তারপর হাতে থাকা পানির পাত্রটার দিকে। ইয়ামিনের হাঁটার গতি হঠাৎ বেড়ে গেল।
“আপনি!”
জান্নাত একটু অবাক হয়ে তাকাল। ইয়ামিন কাছে এসেই অপ্রস্তুত হয়ে গেল।
“আপনি এখানে কেন এসেছেন?”
“পানি আনতে।”
জান্নাত স্বাভাবিকভাবেই উত্তর দিল। কিন্তু ইয়ামিন যেন উত্তরটা মেনে নিতে পারল না।
সে অস্থির হয়ে বলল,
“আমাকে বলতেন!”
“কী?”
“পানি লাগবে, সেটা আমাকে বলতেন।”
জান্নাত কিছু বলার আগেই ইয়ামিন হাত বাড়িয়ে দিল।
“ইশশ... দিন, দিন আমাকে দিন।”
জান্নাত কলসিটা নিজের হাতেই ধরে রাখল।
“আমি নিতে পারব।”
“জানি আপনি নিতে পারবেন।”
ইয়ামিন আরও ইতস্তত করে বলল,
“তবুও... আপনাকে এত দূর আসতে হবে কেন?”
জান্নাত মৃদু হেসে বলল,
“আপনি তো মাছ ধরতে গিয়েছিলেন। আপনাকে কীভাবে ডাকতাম?”
ইয়ামিন মাথা চুলকে বলল,
“তাহলে আমি যাওয়ার আগে বলতেন। এখন দিন।”
জান্নাত এবার কলসিটা এগিয়ে দিতেই ইয়ামিন দুহাতে সেটা নিয়ে নিল।
“এটা আপনি বহন করবেন না।”
এমন আন্তরিকতা ছিল যে জান্নাত আর আপত্তি করল না।
“আমি তো এতক্ষণ বহন করেই এনেছি।”
“এখন থেকে আর না।”
ইয়ামিন কলসিটা হাতে নিয়ে হাঁটা শুরু করল।
দু-এক পা গিয়েই আবার ফিরে তাকাল।
“আর কোনো কিছু আনতে হলে আমাকে বলবেন।”
জান্নাত মাথা নেড়ে বলল,
“আচ্ছা।”
ঠিক তখনই ইয়ামিনের চোখ পড়ল একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা মোড়লপুত্রের দিকে। লোকটি এতক্ষণ কটমট করে তাদের দুজনকে দেখছিল। ইয়ামিনের মুখের হাসি মুহূর্তেই একটু ম্লান হলো।
তবুও সে ভদ্রতা বজায় রেখে মাথা নত করল।
“সালাম, ভাইজান।”
মোড়লপুত্র কোনো উত্তর দিল না। শুধু শক্ত চোখে তাকিয়ে রইল ইয়ামিনের হাতে থাকা পানির পাত্রটার দিকে। তারপর জান্নাতের দিকে। তারপর আবার ইয়ামিনের দিকে। ইয়ামিন পরিস্থিতিটা বুঝেও কিছু বলল না। শুধু জান্নাতকে বলল
“চলুন। দাদি অপেক্ষা করছেন।”
জান্নাত ইয়ামিনের পাশে হাঁটা শুরু করল। পেছনে দাড়িয়ে রইল মোড়লপুত্র। চোখের দৃষ্টি তখনও তাদের দুজনের ওপর স্থির।
******
প্রাসাদের সবচেয়ে উঁচু মিনার। যেখানে সর্বক্ষণ প্রহরী দাঁড়িয়ে আমিরাবাদের চারপাশে নজর রাখে, সেই মিনারের কিনারায় একা বসে আছে আলীরাজ। রাত মধ্য। তার নিচে বিস্তৃত আমিরাবাদ। দেখা যাচ্ছে পাহাড়ের কালো রেখা। তারও ওপারে ঘন জঙ্গল। আলো অনেক আগেই মিলিয়ে গেছে। এত উঁচুতে ওঠার দরুন ফুরফুরে বাতাসে কাপিয়ে দিচ্ছে সর্বাঙ্গ। আলীরাজ হাঁটুর ওপর হাত রেখে অন্যমনস্ক হয়ে বসে ছিল। কিছুই ভালো লাগছে না তার। কেন লাগছে না, সেটাও জানে না। এক ঝাপটা বাতাস এসে তার চুল এলোমেলো করে দিল। বাতাস যেন মিনারের মাথা পেরিয়ে তার সর্বাঙ্গ ছুঁয়ে গেল।
আলীরাজ চোখ বন্ধ করল।
“ইশশ...”
দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। ঠিক তখনই খুব ক্ষীণ একটা শব্দ। আলীরাজ চোখ মেলে তাকাল। সে কারও গুণগুণ শুনছে। বাতাসের শব্দের সঙ্গে মিশে কোথা থেকে যেন কারও গুনগুন গান ভেসে আসছে। প্রথমে এতটাই ক্ষীণ ছিল যে সে ভাবল, হয়তো ভুল শুনেছে। কিন্তু পরক্ষণেই ঝনঝন করে ভেসে আসলো ঘুঙুরের শব্দ। আলীরাজের শরীর কেঁপে উঠল। সে উঠে দাঁড়াল।
ঘুঙুরের শব্দ যেন দূর জঙ্গল থেকে ভেসে আসছে। ঝন ঝন ঝন ছন্দ তোলা শব্দ। তার সঙ্গে সেই গুনগুন গান। আলীরাজ আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। মিনার থেকে নেমে দ্রুত পা বাড়াল জঙ্গলের দিকে। কেউ তাকে ডাকল না। কেউ দেখলি না। সে শুধু শব্দের পিছু ছুটতে লাগল।
কোনো এক অদৃশ্য টান তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে সেই মোহনীয় শব্দের খোজে। প্রাসাদের পেছনের পথ পেরিয়ে পুরোনো বাগান তারপর সেই নির্জন জঙ্গল। যতই ভেতরে যাচ্ছে, ততই শব্দটা স্পষ্ট হচ্ছে। ঘুঙুরের ঝংকার আর সেই অচেনা সুর।
আলীরাজ হাঁপাতে হাঁপাতে থামল। সামনে ঝোপঝাড়ের ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো দেখা যাচ্ছে। আর তার নিচে জল। এটা তো সেই জলাশয়। যেটার কাছে সে এর আগেও এক অদ্ভুত নারীকে দেখেছিল। আলীরাজের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
“অসম্ভব, আমি ওদিকে আর যাব না”
মুখে বলল ঠিকই তবুও পা থামল না। সে জলাশয়ের দিকে এগিয়ে গেল। পাথরের ওপর পা রাখল। স্বচ্ছ পানি তার পায়ের পাতাকে ছুঁয়ে গেল। জল অল্প গভীর। কুচি কুচি পাথরের ওপর দিয়ে চাঁদের আলোয় পানি বয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ সামনে দৃশ্যটা স্পষ্ট হলো। একজন নারী। জলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে নাচছে। পুরো সাজসজ্জা তার।
পায়ে ঘুঙুর। কিন্তু মাথা থেকে নেমে আসা ঘোমটা মুখটাকে সম্পূর্ণ আড়াল করে রেখেছে।
তার পায়ের ছন্দে অল্প পানিটুকু কেঁপে উঠছে।
ঝন ঝন ঝন ঝন।
নারীটি কখনো এক পাথর থেকে আরেক পাথরে পা রাখছে, কখনো ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। ঘোমটার প্রান্ত বাতাসে দুলছে। মুখ দেখা যাচ্ছে না। শুধু সেই গুনগুন গান। কোনো বাদ্যযন্ত্র নেই। কেউ নেই আশেপাশে। তবুও গান থামছে না। আলীরাজ স্থির হয়ে গেল। তার চোখের পাতা পর্যন্ত যেন নড়ছে না। সে বুঝতে পারছে না সে যা দেখছে, সেটা সত্যি?
নাকি আবারও সেই অদ্ভুত বিভ্রম? নারীটি হঠাৎ থেমে গেল। পানি থেমে গেল। ঘুঙুরও থেমে গেল।
পুরো জঙ্গল নিস্তব্ধ। আলীরাজের বুকের ভেতর শুধু নিজের হৃদস্পন্দন শুনতে পেল। তারপর নারীটি ধীরে ধীরে মাথা তুলল। ঘোমটার আড়াল থেকে মুখ দেখা গেল না। কেবল দুটো চোখের অস্পষ্ট ছায়া। আলীরাজের মনে হলো এই চোখ সে আগে কোথাও দেখেছে। কোথায়? মনে পড়ছে না। নারীটি আবার এক পা পিছিয়ে গেল। ঝনাৎ
করে একবার ঘুঙুর বাজল। আলীরাজকে যেন সেই শব্দেই আরও গভীরে টেনে নেওয়া হলো। আবারও সামনে পা বাড়াল। জল তার গোড়ালি ছুঁয়ে গেল। কিন্তু সে থামল না। নারীটি তখনও তাকিয়ে আছে।
পাতা সমান পানিতে নারীটির ঘাগড়ার নিচের অংশ ভিজে গেছে। কেমন গা কাঁপানো শব্দে হাসলো সে। সাথে সাথে দোড় দিতো জঙ্গলের গভীর দিকে।