ঘোমটার আড়ালে মুখ দেখা গেল না নারীটির। শুধু তার পায়ের ঘুঙুরগুলো আবার ঝনঝন করে উঠল। কোনো কথা না বলে সে জলাশয়ের অপর প্রান্তের জঙ্গলের দিকে ছুটে গেল। আলীরাজ যেন এতক্ষণ সেই মুহূর্তটারই অপেক্ষায় ছিল।
“এই যে! দাঁড়ান!”
সে দ্রুত পাথর পেরিয়ে জঙ্গলের দিকে ছুটল। কিন্তু নারীটি ততক্ষণে গাছপালার আড়ালে মিলিয়ে গেছে। জঙ্গলটা দিনের বেলাতেও নির্জন। আর এই রাতে তার চেহারাই বদলে গেছে। চারপাশে ঘন কুয়াশা জমে আছে। উঁচু গাছ গুলোর ডালপালা একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে অন্ধকার ছাদ তৈরি করেছে। কোথাও চাঁদের আলো ঢুকছে না। বাতাসে ভেজা মাটি, শুকনো পাতা আর অচেনা বুনো ফুলের গন্ধ। দূরে নিশাচর পাখি ডেকে উঠল। আলীরাজের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
তবুও সে থামল না। সামনে মাঝে মাঝে ঘোমটার সাদা লাল আভা দেখা যাচ্ছে। তারপর আবার অন্ধকার। ঘুঙুরের শব্দটা কখনো ডান দিক থেকে আসছে, কখনো বাঁ দিক থেকে। আলীরাজ দিশেহারা হয়ে ছুটতে লাগল।
“শুনছেন? আপনি কে?”
কুয়াশার ভেতর দিয়ে শব্দটা যেন তাকে আরও গভীরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। একসময় গাছের শিকড়ে পা আটকে আলীরাজ হোঁচট খেল। কোনোমতে নিজেকে সামলে আবার ছুটল।
তার জামায় শুকনো পাতা আর কাদা আটকে গেল। কাঁধে আঁচড় লাগল। কিন্তু সেদিকে তার কোনো খেয়াল নেই। সামনে একটা সরু পথ দেখা গেল। পথের ওপর কুয়াশা এত ঘন যে কয়েক হাত দূরের জিনিসও স্পষ্ট নয়। আলীরাজ সেই পথ ধরে এগিয়ে গেল।
“আপনি কোথায়?”
হঠাৎ যেন ঘুঙুরের শব্দ থেমে গেছে। আলীরাজ দাঁড়িয়ে পড়ল। চারপাশে নিস্তব্ধতা। গানও নেই। বাতাসের শব্দ পর্যন্ত যেন দূরে সরে গেছে। সে দ্রুত চারদিকে তাকাল। কেউ নেই। শুধু কুয়াশায় ঢাকা গাছের সারি।
“এই যে!”
তার কণ্ঠ জঙ্গলের ভেতর প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এলো। কিন্তু কোনো উত্তর এলো না। আলীরাজ আরও কিছুদূর এগিয়ে গেল। মাটিতে পায়ের চিহ্ন খুঁজতে লাগল। কিছুই নেই। মনে হলো, নারীটি কখনো এখানে আসেইনি। আলীরাজের শ্বাস ভারী হয়ে উঠল।
“এতদূর এসে, কোথায় গেলেন?”
ঠিক তখনই পেছন থেকে ভারী কোনো কিছুর আঘাত এলো তার মাথার পেছনে। আলীরাজের চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল। মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বেরোল না। শরীরের সমস্ত শক্তি এক মুহূর্তে নিঃশেষ হয়ে গেল। সে সামনে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল। মাটির ওপর মুখ থুবড়ে পড়ে রইল।
চোখের সামনে কুয়াশা আরও ঘন হয়ে এলো।
সবকিছু ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে গেল।
কতক্ষণ কেটে গেল, আলীরাজ জানে না। অচেতনতার গভীর অন্ধকারে সে যেন কোনো শব্দের পিছু ছুটছিল। প্রথমে খুব ক্ষীণ।
তারপর স্পষ্ট ঝন ঝন ঘুঙুর এর শব্দ। কেউ তার সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। আলীরাজ চোখ খুলতে পারল না। শরীর নড়ল না। শুধু অনুভব করল, ভেজা মাটির ওপর দিয়ে কারও পায়ের শব্দ এগিয়ে যাচ্ছে। ঝন ঝন ঝন। সে মনে মনে চিৎকার করতে চাইল—ল
“কে? কে এই মায়াবিনী?”
কিন্তু ঠোঁট নড়ল না। ঘুঙুরের শব্দটা তার মুখের সামনে এসে থামল। কয়েক মুহূর্ত নিস্তব্ধতার পর
আবার ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে লাগল।
ঝন ঝন ঝন। আলীরাজের অচেতন মন বুঝতে পারল নারীটি এখনো তার কাছেই আছে।
***
রাত্রি তখন বিদায় নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আকাশের পূর্ব দিকটা অন্ধকার থেকে ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে। দূরের কোনো মসজিদ থেকে ফজরের আজান ভেসে এলো।
“আল্লাহু আকবার...”
জান্নাত শালটা ভালো করে গায়ে জড়িয়ে নিল।
ইয়ামিনের দাদি তখনো ঘুমিয়ে। ঘরের এক কোণে কুপিটা জ্বলছে। ছোট্ট সেই আলোয় কাঠের দেয়াল, মাটির মেঝে আর পাশে রাখা পানির ডাবরটা দেখা যাচ্ছে। জান্নাত আড়মোড়া ভেঙে বাইরে বের হলো। রাতের ঠান্ডা বাতাস মুখে লাগতেই তার শরীর শিরশির করে উঠল।
সে ডাবরটা তুলে পানির পাত্রে পানি ঢালল।
ঠান্ডা পানি হাতে পড়তেই অজান্তেই কেঁপে উঠল।
“উফ, কী ঠান্ডা!”
পাত্রটা নামিয়ে রেখে সে চারপাশে তাকাল।
পাহাড়ি ভোরের আগের সময়টা অদ্ভুত নীরব। কোথাও পাখির ডাকও নেই। শুধু গাছের পাতায় জমে থাকা শিশিরের টুপটাপ শব্দ। জান্নাত অযুর জন্য আবার পানি নিতে গেল। ঠিক তখনই কুপির আলোয় ঘরের ভেতরের দেয়ালে একটা ছায়া নড়ল। জান্নাত থেমে গেল। ছায়াটা এক মুহূর্তের জন্য দেখা গেল। তারপর মিলিয়ে গেল। সে ঘুরে তাকাল। ঘরের দরজা খোলা। বাইরে কেউ নেই।
জান্নাত কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইল। তারপর নিজেকে বোঝাল,
“হয়তো বাতাসে কিছু নড়েছে।”
সে আবার পানির পাত্রের দিকে ফিরল। কিন্তু কয়েক মুহূর্ত পর আবার সেই ছায়া। কেউ যেন ঘরের এক পাশ দিয়ে সরে গেল। জান্নাতের হাত থেমে গেল। তার চোখ সরু হয়ে এলো। সে আর কোনো শব্দ করল না। পাত্রটা নামিয়ে রেখে ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। দরজার কাছে এসে থামল।
ভেতরে তাকাল। দাদি ঘুমিয়ে আছেন। কুপির আলো জ্বলছে। কেউ তো নেই। জান্নাতের বুকের ভেতর অস্বস্তি জমল। সে পেছনে তাকাল। পাহাড়ি পথটা কুয়াশায় ঢাকা। গাছের ফাঁকে ফাঁকে অন্ধকার। কেউ তাকে দেখছে কি না, বোঝার উপায় নেই। জান্নাত এবার সতর্ক হলো।
সে ঘরের ভেতরে ঢোকার ভান করে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে রইল। কোমরের কাছে হাত গেল তার। সেখানে কাপড়ের ভাঁজের নিচে রাখা ছিল সেই বাকানো রাজকীয় ছুরিটি। ছুরি টা সে সাথে রাখে।
শজান্নাত ঘরের দিকে এগোল। ঠিক তখনই পেছন থেকে কেউ ঝাঁপিয়ে এসে কাপড় দিয়ে তার মুখ চেপে ধরল। জান্নাতের শরীর শক্ত হয়ে গেল।
আক্রমণকারী তাকে টেনে পেছনে নিতে চাইতেই সে এক মুহূর্তের জন্য ভারসাম্য হারাল। কিন্তু পরক্ষণেই তার হাত কোমরের কাছে চলে গেল।
ছুরিটা যেন নিজের অজান্তেই বেরিয়ে এলো।
ছুরিটা এনেই হাতে এক টান মেরে দিল আগন্তুক এর। আক্রমণকারীর মুখ থেকে চাপা চিৎকার বেরিয়ে এলো।
“আহ্!”
কাপড়ের বাঁধন আলগা হয়ে যেতেই জান্নাত নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। লোকটি পেছনে সরে গিয়ে আহত হাতটা চেপে ধরল। আবার এগিয়ে আসতে চাইলে জান্নাত ছুরিটা সামনে তুলে ধরল।
“আর এক পাও এগোবেন না!”
তার কণ্ঠে এত দৃঢ়তা ছিল যে আক্রমণকারী মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। জান্নাত তাকে চিনতে পারল না। কুয়াশা আর অন্ধকারে মুখটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু লোকটির চলাফেরায় কিছু পরিচিতি লক্ষ্য করলো, যা তাকে আরও সতর্ক করে তুলল।
“কে আপনি?”
লোকটি কোনো উত্তর দিল না। আহত হাত চেপে ধরে আবার তার দিকে ঝাঁপিয়ে আসতে চাইলো।
জান্নাত সরে গিয়ে ছুরির বাঁট দিয়ে তার কাঁধে আঘাত করল। লোকটি টলতে টলতে পেছনে সরে গেল।
“ছাড়ুন আমাকে!”
জান্নাতের চিৎকারে ঘরের ভেতর দাদির ঘুম ভেঙে গেল।
“মায়া?”
সঙ্গে সঙ্গে পাশের ঘর থেকে ইয়ামিনের কণ্ঠ ভেসে এলো।
“কী হয়েছে?”
জান্নাত আরেকবার চিৎকার করে উঠল,
“ইয়ামিন!”
ইয়ামিন ঘর থেকে বেরিয়ে আসতেই দৃশ্যটা দেখে থমকে গেল। জান্নাত দাঁড়িয়ে আছে ছুরি হাতে।
সামনে একজন লোক আহত হাত চেপে ধরে পেছাতে চাইছে। ইয়ামিনের মুখের রং বদলে গেল।
“আপনি!”
সে দ্রুত জান্নাতের সামনে এসে দাঁড়াল।
“মায়া, আপনি ঠিক আছেন?”
জান্নাত মাথা নাড়ল।
“আমি ঠিক আছি।”
ইয়ামিনের চোখ তখন লোকটির দিকে।
“আপনি এখানে কী করছেন?”
লোকটি কোনো উত্তর দিল না।বঠিক তখনই পাশের বাড়ি থেকে কয়েকজন প্রতিবেশী ছুটে এলো।
“কী হইছে কি? তুমগো জ্বালায় কি নামাজ কালাম পড়ুন যাইব না নাকি? রাইত দুপুরে চেচাও ক্যা?”
“ইয়ামিনের বাড়িতে কে ঢুকেছিল?”
দাদি দরজার কাছে এসে কাঁপা গলায় বললেন,
“মায়া, কী হয়েছে রে?”
জান্নাত ছুরিটা নিচে নামাল না। সে শুধু বলল,
“এই লোকটা পেছন থেকে আমার মুখ চেপে ধরেছিল।”
চারপাশে ফিসফাস শুরু হয়ে গেল। ইয়ামিন লোকটির দিকে তাকিয়ে কঠিন গলায় বলল,
“কে আপনি? কে পাঠিয়েছে আপনাকে?”
লোকটি ধীরে ধীরে মাথা তুলল। তার চোখে রাগ।
কিন্তু এত মানুষের সামনে কিছু করার সাহস হলো না। সে জান্নাতের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তোকে আমি দেখে নিব।”
জান্নাত এক পা এগিয়ে গেল।
“তার আগে তোকে আমিই দেখে নিচ্ছি”
ইয়ামিন টেনে ধরে থামালো জান্নাতকে জান্নাতের হাতে ধরা ছুরিটা ভোরের ক্ষীণ আলোয় চকচক করে উঠল।
“আর আজকের পর আমার কাছে আসার আগে একশ বার ভেবে আসবি”
ইয়ামিন জান্নাতের দিকে তাকাল। তার চোখে উদ্বেগ।
“আপনি আহত হয়েছেন?”
“আরে, না।”
ইয়ামিন কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
“আপনি একা বাইরে আসবেন না আর।”
জান্নাত তার দিকে তাকিয়ে বলল
“আমি তো শুধু অযু করতে বের হয়েছিলাম।”
ইয়ামিনের মুখে অস্বস্তি ফুটে উঠল।
“জানি। তবুও... আমাকে ডাকতেন।”
জান্নাত কিছু বলল না। শুধু ছুরিটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎ তার মাথার ভেতর এক ঝলক দৃশ্য ভেসে উঠল অন্ধকার কোনো প্রাসাদের করিডোর। কারও কণ্ঠ
“শাহজাদী, অস্ত্রটা এভাবে ধরবেন না। কবজি সোজা রাখুন।”
জান্নাত চোখ বন্ধ করল। দৃশ্যটা মিলিয়ে গেল।
সে কপালে হাত রাখল। ইয়ামিন সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করল,
“কী হয়েছে?”
জান্নাত মাথা নাড়ল।
“কিছু না।”
কিন্তু তার ভেতরে তখন একটা প্রশ্ন জেগে উঠেছে। সে ছুরি চালাতে জানল কীভাবে?
আর কেন বিপদের মুহূর্তে তার হাত নিজের অজান্তেই সেই অস্ত্রের কাছে চলে গেল? দূরে ফজরের আজান শেষ হয়ে গেছে। পাহাড়ের ওপরে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে।
পাশের বাড়ির এক বৃদ্ধ এগিয়ে এলেন।
“এই লোকটাকে আমি চিনি।”
সবাই তার দিকে তাকাল। বৃদ্ধ ধীরে ধীরে বললেন,
“মোড়লপুত্রের সঙ্গে প্রায়ই থাকে। বাজারের দিকেও দেখেছি।”
ইয়ামিনের মুখ শক্ত হয়ে গেল।
“আপনি মোড়লপুত্রের লোক?”
লোকটি চোখ তুলে তাকাল। তারপর ঠান্ডা গলায় বলল,
“হ্যাঁ। আমি তার লোক।”
চারপাশে ফিসফাস শুরু হয়ে গেল। ইয়ামিন এক পা এগিয়ে গেল।
“তাহলে এখানে কেন এসেছিলেন?”
লোকটি জান্নাতের দিকে তাকাল।
“তাকে নিয়ে যেতে।”
জান্নাতের চোখ সরু হয়ে এলো।
“কোথায়?”
লোকটা তেতে উঠতেই ইয়ামিন তার পেট বরাবর মারল এক ঘুষি। দুমড়ে পড়লো লোকটা
“বলছি বলছি….”
লোকটি তার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আ...আমি, আমি তো খালি আদেশ পালন করি।”
“বল, কার আদেশ?”
“মোড়লপুত্রের।”
কথাটা শুনে চারপাশের কয়েকজন মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। জান্নাত ছুরিটা নিচে নামাল, কিন্তু হাত থেকে ছাড়ল না।
“সে আমাকে কেন নিয়ে যেতে চায়?”
“ভাইজান বলেছে, আপনাকে তার সঙ্গে কথা বলতে হবে।”
জান্নাত তীক্ষ্ণ গলায় বলল,
“কথা বলার জন্য কেউ এভাবে পেছন থেকে মুখ চেপে ধরে অপহরণের চেষ্টা করে?”
ইয়ামিন তার সামনে এগিয়ে গেলে পাশের বাড়ির বৃদ্ধ লোকটা থামায়
“বাপ, বাপ খাড়া। চেতিস না। চারিদিকে মাইয়াডারে নিয়া কটু কথা হইতাছে বুঝছস। এখন আর ঝামেলা বাড়াইস না। ওই, তুই যা তো। যাহহহ”
“হোন বাপ, এই গ্রামের মানুষ জানে, মোড়লপুত্রের সঙ্গে বিরোধে গেলে কী হয়।”
একজন প্রতিবেশী আরেকজনের কানে কানে বলল
“কিন্তু মেয়েটাকে তো আর জোর করে নিয়ে যাওয়া যাবে না। আমার মনে হয় মেয়েটারও সায় আছে”
লোকটি তার দিকে তাকাতেই বৃদ্ধ চুপ করে গেলেন। জান্নাত সবটা দেখছিল। তারপর জোরসে বলল,
“আপনারা সবাই শুনুন।”
চারপাশের মানুষ তার দিকে তাকাল।
“আমি কারও সঙ্গে যেতে চাই না। আর আমাকে জোর করে নিয়ে যাওয়ার অধিকার কারও নেই।”
দাদি কাঁপা গলায় বললেন,
“মায়া, তুই ভেতরে আয়। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকিস না।”
জান্নাত ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। দরজার কাছে এসে থামল। তার মনে হলো মোড়লপুত্র শুধু তাকে পছন্দ করেনি। সে তাকে নিজের অধিকার বলে ভাবতে শুরু করেছে। আর আজকের আক্রমণ ছিল সেই দাবির প্রথম প্রকাশ। ইয়ামিন জান্নাতকে ঘরের ভেতরে নিয়ে যেতে চাইছিল, তখন বাইরে থেকে আরেকটি কণ্ঠ ভেসে এলো
“এত তাড়াতাড়ি আমার লোককে বিদায় করে দিলেন?”
সবাই ঘুরে তাকাল। কুয়াশার ভেতর দিয়ে মোড়লপুত্র এগিয়ে আসছে। তার সঙ্গে আরও দুজন লোক। একজনের হাতে লাঠি, অন্যজন কোমরে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে। মোড়লপুত্রের পরনে ঘি রঙের চাদর, মুখে আত্মবিশ্বাস।
ইয়ামিন সঙ্গে সঙ্গে জান্নাতের সামনে দাঁড়াল।
“আপনি এখানে কেন এসেছেন?”
মোড়লপুত্র তার দিকে তাকালও না। তার চোখ শুধু জান্নাতের ওপর।
“আমি যার সঙ্গে কথা বলতে এসেছি, তার সামনে দাঁড়াতে দে।”
জান্নাত নিজেই এক পা এগিয়ে এলো।
“আমার সঙ্গে আপনার কী কথা?”
মোড়লপুত্র মৃদু হাসল।
“আজ সকালে আমার লোক আপনাকে নিতে এসেছিল। আপনি তাকে আহত করেছেন। মহামায়া”
“সে আমাকে আক্রমণ করেছিল।”
“আক্রমণ?”
মোড়লপুত্রের হাসি আরও ঠান্ডা হলো।
“আপনার সাথে শব্দের অর্থ নিয়ে তো তর্ক করতে পারি না মহামায়া। উপস মায়ারানী”
জান্নাতের চোখ কঠিন হয়ে উঠল।
“ভাবনেন না আপনি শুধু এই গ্রামের মোড়লের ছেলে বলে পাড় পেয়ে যাবেন। ঠ্যাং ভেঙে হাতে ধরিয়ে দেব”
চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজন নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে রইল। মোড়লপুত্রের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
“কী বললেন?”
সে ধীরে ধীরে এক পা এগিয়ে এলো।
“কার ঘরে কে থাকবে, কার সঙ্গে কার বিয়ে হবে সেসব নিয়ে শেষ কথা আমাদের পরিবারই বলে।”
তার কণ্ঠ নিচু, কিন্তু প্রতিটি শব্দ স্পষ্ট।
“আর আপনি?”
সে জান্নাতের দিকে তাকাল।
“আপনি তো এই গ্রামের মানুষই নন।”
জান্নাত স্থির গলায় বলল,
“তাই বলে আমাকে অপহরণ করার অধিকার আপনার হয় না। আপনার সাহস দেখে আমি হতভম্ব”
মোড়লপুত্রের চোখে এবার রাগ ফুটে উঠল।
“অপহরণ?”
“হ্যাঁ। আপনার লোক নিজেই স্বীকার করেছে।”
“আমি তাকে পাঠিয়েছিলাম আপনাকে নিয়ে আসতে।”
“আমার অনুমতি ছাড়া?”
“আপনার অনুমতির কি প্রয়োজন।”
কথাটা শুনে ইয়ামিন আর চুপ থাকতে পারল না।
“ভাইজান আপনি সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছেন।”
মোড়লপুত্র এবার তার দিকে ফিরল।
“তুই চুপ কর ইয়ামিন।”
“না আমি চুপ করব না।”
“তোর দাদি অসুস্থ। ঘরটা তোমার হলেও জমি কিন্তু আমার বাবার। এই পাহাড়ে তোমার যা কিছু আছে, সবই আমার বাবার দয়ার ওপর।”
ইয়ামিনের মুখ শক্ত হয়ে গেল। মোড়লপুত্র ধীরে বলল,
“তাই নিজের ভালো চাইলে এই মেয়েটাকে নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করো না।”
জান্নাতের চোখে আগুন জ্বলে উঠল।
“ইয়ামিনকে ভয় দেখিয়ে আমার সিদ্ধান্ত বদলাতে পারবেন না।”
মোড়লপুত্র তার দিকে তাকাল।
“আপনার সিদ্ধান্ত?”
“হ্যাঁ। আমি কোথায় থাকব, কার সঙ্গে কথা বলব, কার সাহায্য নেব, সেটা আমি ঠিক করব।”
“এই পাহাড়ে এসে নিজের নিয়ম চালাবেন?”
“আমি জানি না আমি কে। কিন্তু এটুকু জানি, অন্যায়ের সামনে মাথা নত করা আমার স্বভাবে নেই।”
মোড়লপুত্রের চোখে অদ্ভুত দৃষ্টি ফুটে উঠল।
“আপনার স্বভাব আমি এক্ষুণি বদলে দিতে পারি।”
জান্নাত এক পা এগিয়ে গেল।
“চেষ্টা করে দেখুন।”
ইয়ামিন উদ্বিগ্ন হয়ে বলল,
“মায়া, ভেতরে চলুন।”
কিন্তু জান্নাত নড়ল না। মোড়লপুত্র এবার খুব নিচু স্বরে বলল,
“আপনাকে শেষবারের মতো বলছি। আমার সঙ্গে স্বেচ্ছায় চলুন। তাহলে আপনার কোনো ক্ষতি হবে না।”
“আর না গেলে?”
মোড়লপুত্র হাসল
“এই কে আছিস, মায়ারনী কে কাঁধে করে নিয়ে আয় তো”
*****
মেহেরুন্নেসা তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে আছে সুনেহেরার দিকে।
“কী হয়েছিল আপা? সেনাপ্রধান এর সাথে তেমার যা অতীত লুকিয়ে রেখেছে সবার থেকে, সবটা বলো”