সাহাবাদ প্রাসাদের নিরিবিলি পদ্ম পুকুর টার পাড় এ বসে ছিলেন মেহেরুন্নেসা। বিকেলের আলো ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে। দূরের বাগান থেকে পাখির ডাক ভেসে আসছিল। পুকুর পাড়টা একদম নীরব। মেহেরুন্নেসা বেশ কিছুক্ষণ ঘাটের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর একজন দাসীকে ডেকে বললেন,
“সুনেহেরা আপাকে আমার কাছে পাঠাও।”
কিছুক্ষণ পর সিড়ির ধারে পায়ের মৃদু শব্দ হলো।
“ভাবি, ডাকছিলে?”
সুনেহেরা এগিয়ে আসতেই মেহেরুন্নেসা উঠে দাঁড়ালেন।
“আপা, আসো। বসো এখানে।”
সুনেহেরা মেহেরুন্নেসার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝলেন, এ ডাকে সাধারণ কোনো কথা নেই। নিশ্চিত গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়। বসে বলল
“কী হয়েছে, ভাবি?”
মেহেরুন্নেসা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর নরম স্বরে বললেন,
“আপা, তোমাদের সত্যিটা আমাকে বলবে?”
সুনেহেরার মুখের ভাব বদলে গেল।
“কোন সত্যি?”
“মাহাদি ইকরামের সঙ্গে তোমার সম্পর্কের সত্যি। আপা আমার কেন জানি মনে হয় মাহাদির হুট করে হারিয়ে যাওয়া আবার ফিরে আসা এমনি এমনি নয়। আর কারণটাও ”
কথাটা শুনে সুনেহেরা চোখ নামিয়ে ফেললেন।
মেহেরুন্নেসা তার পাশে এসে বসলেন।
“আমি অনেক কিছু দেখেছি। অনেক কিছু বুঝতেও পেরেছি। কিন্তু তোমাদের মুখ থেকে না শুনলে যেন সবকিছু অসম্পূর্ণ থেকে যায়।”
সুনেহেরা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“তুমি সবটা শুনতে চাও?”
“হ্যাঁ, আপা। তবে আমি তাকে বিচার করতে চাই না। শুধু সত্যিটা জানতে চাই।”
সুনেহেরা কিছুক্ষণ পুকুরের তাকিয়ে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন,
“মাহাদি ইকরাম সাহাবাদে শুধু একজন সেনাপতি হয়ে আসলেও তার পরিচয় তা নয় ভাবি।”
মেহেরুন্নেসা স্থির হয়ে গেলেন।
“তাহলে?”
“সে ছিল আমিরাবাদের সম্রাট হারুন ওয়াসেমের বোন খাদিজা মোর্শেদার স্বামী।”
মেহেরুন্নেসার মাথায় যেন বাজ পড়লো। বিস্মিত হয়ে বলল
“কী বলছ, আপা?”
সুনেহেরা মাথা নাড়লেন।
“হ্যাঁ। খাদিজা মোর্শেদা। আর তাদের একটি পুত্রও ছিল।”
“তাহলে...”
“তাদের সংসার ছিল। ছোট্ট একটা ছেলে ছিল। মাহাদি তার স্ত্রী আর সন্তানকে নিয়ে নিজের মতো করে বাঁচতে চেয়েছিল।”
সুনেহেরার কণ্ঠ ভারী হয়ে উঠল।
“কিন্তু হারুন ওয়াসেম তাদের সেই জীবন সহ্য করতে পারেনি।”
মেহেরুন্নেসা ফিসফিস করে বললেন,
“কেন?”
“কারণ মাহাদি তার বোনকে বিয়ে করেছিল, কিন্তু সম্রাটের ইচ্ছেমতো চলেনি। আর তাদের পুত্র...”
সুনেহেরা থেমে গেল। মেহেরুন্নেসা তার হাত চেপে ধরলেন।
“আপা, বলো।”
সুনেহেরা চোখ বন্ধ করলেন।
“হারুন ওয়াসেম তাদের সন্তানকে কেড়ে নেয়।”
মেহেরুন্নেসার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
“নিজের বোনের কাছ থেকে?”
“হ্যাঁ।”
“আর মোর্শেদা?”
সুনেহেরা বললেন,
“তাকে হত্যা করা হয়।”
বিলের নীরবতা আরও গভীর হয়ে উঠল। মেহেরুন্নেসা অবিশ্বাসের স্বরে বললেন,
“সম্রাট নিজের বোনকে হত্যা করেছে?”
“মাহাদি তা ই তাই বলে। তারপর মাহাদির কাঁধে স্ত্রীর খুনের তকমা চাপিয়ে দেওয়া হয়। বলা হয়, সে নাকি নিজের স্ত্রীকে হত্যা করেছে।”
মেহেরুন্নেসা চোখ বড় বড় করে তাকালেন।
“কিন্তু সে তো...”
“সে করেনি।”
সুনেহেরা দৃঢ় গলায় বললেন,
“মাহাদি তার স্ত্রীকে ভালোবাসত। নিজের সন্তানকে ভালোবাসত। কিন্তু স্বার্থের লোভে তাকে সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। আর তার সঙ্গী ছিল মোর্শেদা স্বয়ং”
মেহেরুন্নেসা বললেন,
“তাহলে সে পালিয়ে সাহাবাদে এসেছিল?”
“হ্যাঁ। বাধ্য হয়ে। বিচারের জন্য। আর নিজের পুত্রকে খুঁজে পাওয়ার জন্য।”
সুনেহেরা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
“সে ভেবেছিল, একদিন সত্যিটা প্রকাশ পাবে। সে তার স্ত্রী হত্যার বিচার পাবে। নিজের সন্তানকে ফিরে পাবে।”
“পায়নি?”
“না।”
সুনেহেরার কণ্ঠে তিক্ততা ফুটে উঠল।
“একসময় সে বুঝে যায়, হারুন ওয়াসেমের সঙ্গে সরাসরি লড়াই করে সে জিততে পারবে না। সম্রাটের ক্ষমতা ছিল অনেক বড়। তার হাতে ছিল সেনাবাহিনী, রাজনীতি, মানুষের মুখ বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা। তাই মাহাদি সাহাবাদ ছেড়ে চলে যায়?”
“কোথায়?”
“বিভিন্ন দেশে। এক দেশ থেকে আরেক দেশ। বন্দরের শহরে, দূর পাহাড়ে, অপরিচিত মানুষের ভিড়ে। একে একে পৌছায় সেই দাই এর কাঋে যে তার সন্তান কে লালন করছিলো। সেখানেও লাভ হয়না। সে বৃদ্ধাও দিতে পারে না মাহাদির পুত্রের খোঁজ”
সুনেহেরার চোখে তখন বহু বছরের অপেক্ষার ছায়া।
“সে শুধু নিজের পুত্রকে খুঁজেছে। আর মোর্শেদার চিহ্ন।”
মেহেরুন্নেসা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ধীরে জিজ্ঞেস করলেন,
“কিন্তু আপা... একটা কথা বুঝতে পারছি না।”
সুনেহেরা তাকালেন।
“মোর্শেদা তো মৃত। তাহলে মাহাদি এত বছর ধরে তাকে খুঁজছে কেন?”
সুনেহেরা মৃদু হাসলেন। সেই হাসিতে আনন্দ ছিল না। ছিল দীর্ঘদিনের এক অসমাপ্ত সন্দেহ।
“এই প্রশ্নটাই তো সবকিছুর শুরু, ভাবি।”
মেহেরুন্নেসা স্থির হয়ে শুনতে লাগলেন। সুনেহেরা বললেন,
“মাহাদি প্রথমে বিশ্বাস করেছিল, মোর্শেদা মারা গেছে। সে নিজেকেই দোষ দিত। ভাবত, সে যদি সেদিন আরও শক্ত হয়ে দাঁড়াত, যদি স্ত্রীকে রক্ষা করতে পারত...”
বলতে বলতে থেমে গেল
“কিন্তু বছর কেটে যাওয়ার পর কিছু ঘটনা তার সন্দেহ তৈরি করে।”
“কী ঘটনা?”
“কিছু সাক্ষ্য মিলছিল না। দরবারের মানুষের কথা একে অপরের সঙ্গে মেলেনি। মোর্শেদার মৃত্যুর খবর যেভাবে ছড়ানো হয়েছিল, তার মধ্যে অনেক ফাঁক ছিল।”
মেহেরুন্নেসার চোখে উদ্বেগ ফুটে উঠল।
“তাহলে?”
“মাহাদি আন্দাজ করতে শুরু করে, মোর্শেদা হয়তো মারা যায়নি।”
মেহেরুন্নেসা নিঃশ্বাস আটকে বললেন,
“জীবিত?”
“হয়তো। তার সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছিল?”
সুনেহেরা মাথা নাড়লেন।
“মাহাদির ধারণা, তাকে বিশ্বাস করানো হয়েছিল যে তার স্ত্রী মারা গেছে। অথচ সত্যিটা বিপরীত”
মেহেরুন্নেসা ফিসফিস করে বললেন,
“তাহলে সে এত বছর ধরে একজন মৃত নারীকে খুঁজছিল?”
“সে খুঁজছিল তার জীবিত থাকার সম্ভাবনাকে।”
সুনেহেরার চোখে জল চিকচিক করল।
“সে খুঁজছিল সেই মানুষটাকে, যার জন্য তার পুরো জীবন থেমে গিয়েছিল।”
মেহেরুন্নেসা ধীরে সুনেহেরার হাত ধরলেন।
“আপা, তুমি কি বিশ্বাস করো মোর্শেদা বেঁচে আছে?”
সুনেহেরা কিছুক্ষণ উত্তর দিলেন না। তারপর হাতের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“আমি জানি না।”
“তবুও?”
“তবুও মাহাদির বিশ্বাসকে আমি মিথ্যে বলতে পারি না।”
মেহেরুন্নেসা নিচু স্বরে বললেন,
“আর তাদের সন্তান?”
সুনেহেরার মুখ কেঁপে উঠল।
“সেটাও সে খুঁজেছে।”
“পেয়েছে?”
“না।”
“তাহলে এখনো তার হদিস মেলেনি?”
সুনেহেরা বললেন,
“এখনো খুজেই চলেছে।”
দূরে প্রাসাদের আঙিনায় পাহারারত সৈন্যদের দেখা যাচ্ছে। মেহেরুন্নেসা খুব নিচু স্বরে বলল
“তাহলে মাহাদি এমনি এমনি সাহাবাদে ফিরে আসেনি। সে তার অতীতের বিচার নিতে ফিরে এসেছে। আপা, এতদিন তুমি এই সত্যিটা বয়ে বেড়িয়েছ?”
সুনেহেরা মৃদু হেসে বলল,
“কিছু সত্যি আছে, ভাবি যেগুলো মুখে আনলেই মানুষকে আবার সেই পুরোনো যন্ত্রণার মধ্যে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।”
মেহেরুন্নেসা এগিয়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরলেন।
“এখন থেকে একা বয়ে বেড়াতে হবে না।”
সুনেহেরা চোখ বন্ধ করলেন। সন্ধ্যা নামায় তারা ফিরে এলো মহলে। দুজনেই গেল মেহেরুন্নেসার কক্ষে। ঘরের ভেতর প্রদীপের শিখাটা কাঁপছে। জানালার পর্দা রাতের বাতাসে বারবার নড়ে উঠছে। মেহেরুন্নেসা এতক্ষণ স্থির হয়ে বসে ছিলেন। কিন্তু এবার তাঁর আঙুলের মুঠো শক্ত হয়ে উঠল।
“তুমি বললে, মোর্শেদা বেঁচে ছিল?”
সুনেহেরা মাথা নাড়লেন।
“হ্যাঁ। মাহাদি যে মৃত্যুর খবর শুনেছিল, সেটা পুরোপুরি মিথ্যা ছিল না। কিন্তু সে জানত না, তার স্ত্রী তখনও জীবিত।”
মেহেরুন্নেসার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
“তাহলে এতদিন মাহাদি কেন ভাবত, মোর্শেদা মারা গেছে?”
“গোটা রাজ্যকেই সেভাবে বিশ্বাস করানো হয়েছিল।”
“আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছি না আপা। সবটা গুছিয়ে বলো আমাকে”
সুনেহেরা জানালার দিকে তাকালেন। তাঁর চোখের সামনে বহু বছর আগের দৃশ্য ভেসে উঠল।
“মাহাদি যখন আমিরাবাদ ছেড়ে সাহাবাদে এসেছিল, তখন তার কাছে এটাই সত্যি ছিল যে মোর্শেদা মারা গেছে। তাদের সন্তানকে হারুন ওয়াসেম নিজের কাছে রেখেছে। আর মাহাদিকে হত্যার দায়ে অভিযুক্ত করা হয়েছে।”
“কিন্তু মোর্শেদা তখন কোথায় ছিল?”
“আমিরাবাদেই। তবে রাজপ্রাসাদে নয়।”
সুনেহেরা একটু থামলেন।
“হারুন তাকে এমন এক জায়গায় লুকিয়ে রেখেছিল, যেখানে তার অস্তিত্বের কথা কেউ জানত না। মোর্শেদা তখনও বেঁচে ছিল। নিজের সন্তানকে ফিরে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিল।”
মেহেরুন্নেসা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন।
“তাহলে মাহাদি যদি ফিরে যেত?”
“সে কখনোই তার কাছে পৌঁছাতে পারত না। কারণ হারুন ওয়াসেম তখন নিঃসন্তান ছিল। আর সেই কারণেই মাহাদির পুত্রকে সে তার বাবার কাছে ফিরিয়ে দেয়নি। একজন পিতা তার সন্তানকে ফিরে পেলে কী হবে, সেটা হারুন জানত। কিন্তু একজন নিঃসন্তান সম্রাটের হাতে যদি অন্যের সন্তান থাকে, তবে সেই সন্তানই তার ক্ষমতার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।”
মেহেরুন্নেসা বলল
“সে কি শিশুটিকে নিজের উত্তরাধিকারী করতে চেয়েছিল?”
“সম্ভবত। অথবা তার চেয়েও ভয়ংকর কিছু।”
সুনেহেরা সরাসরি তাঁর দিকে তাকালেন।
“হারুন দ্বিতীয় বিয়ে করেছিল উত্তরাধিকারী পাওয়ার জন্য। সে চেয়েছিল নিজের রক্তের সন্তান। কিন্তু ভাগ্য তার পরিকল্পনাকে অন্যদিকে নিয়ে যায়। দ্বিতীয় বিয়ের মাত্র দুই মাস পরেই তার প্রথম স্ত্রী আয়েশার গর্ভে সন্তান আসে।”
মেহেরুন্নেসা স্তব্ধ হয়ে গেলেন।
“মেহরাব?”
“হ্যাঁ। মেহরাব ওয়াসেম।”
ঘরের নীরবতা আরও গভীর হলো। সুনেহেরা ধীরে ধীরে বলতে লাগল
“হারুন তখনও জানত না, তার প্রথম স্ত্রী গর্ভবতী। আর মোর্শেদা জানত না, তার সন্তানকে নিয়ে হারুন কী পরিকল্পনা করছে। সেই সময় মাহাদির পুত্র কোথায় ছিল, সেটাও কেউ জানত না। হারুন তাকে নিজের কাছে রেখেছিল। কিন্তু শিশুটির পরিচয় প্রকাশ করেনি।”
“তাহলে মেহরাব জন্মানোর পর?”
“পরিস্থিতি বদলে গেল। হারুনের নিজের রক্তের সন্তান জন্ম নিল। সে আর নিঃসন্তান রইল না। কিন্তু মাহাদির পুত্রের অস্তিত্ব তার জন্য তখনও বিপজ্জনক ছিল। সে জানত, মাহাদির পুত্রই আসল উত্তরাধিকারী?”
মেহেরুন্নেসার চোখে আতঙ্ক ফুটে উঠল।
“কিন্তু মেহরাব তো হারুনের নিজের সন্তান।”
“রক্তের দিক থেকে, হ্যাঁ।”
“তাহলে সমস্যা কোথায়?”
সুনেহেরা এবার নিচু স্বরে বললেন
“সমস্যা হলো, হারুন ওয়াসেম নিজেই তার পিতার পালিত পুত্র ছিল। মোর্শেদা ছিল নিজ কন্যা”
মেহেরুন্নেসা যেন কথাটা বুঝতে একটু সময় নিলেন।
“মানে?”
“হারুনের জন্মসূত্রের পরিচয় আর সিংহাসনের পরিচয় এক নয়। সে নিজে রক্তের উত্তরাধিকারী ছিল না। তাকে লালন-পালন করে সিংহাসনের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছিল। সেই কারণে তার নিজের সন্তান জন্মালেই যে সে সিংহাসনের প্রকৃত উত্তরাধিকারী হয়ে যাবে, এমন নয়।”
“তাহলে মাহাদির পুত্র?”
“মাহাদির পুত্র ছিল মোর্শেদার রক্তের সন্তান। আর মোর্শেদা ছিল আমিরাবাদের রাজপরিবারের রক্তের উত্তরাধিকারী।”
মেহেরুন্নেসা ধীরে ধীরে ফিসফিস করে বললেন
“তাহলে সিংহাসনের আসল উত্তরাধিকারী তো মাহাদি পুত্র”
মেহেরুন্নেসা উঠে দাঁড়ালেন।
“কিন্তু মোর্শেদা? সে কীভাবে মারা গেল? নাকি এখনও বেঁচে আছে?”
সুনেহেরার চোখের দৃষ্টি দূরে গেল। এতক্ষণ যে স্মৃতির কথা বলছিলেন, এবার সেই স্মৃতির ভেতর যেন রক্তমাখা অন্ধকার নেমে এল।
“মোর্শেদা বেঁচে ছিল ঠিকই তবে তা স্থায়ী হয়নি বেশিদিন। এমন না যে হারুন তাকে হত্যা করেছিল। তার প্রাণ যায় একজন ইংরেজ প্রতিনিধির হাতে।”
“ইংরেজ প্রতিনিধি?”
“হ্যাঁ। সে আমিরাবাদে এসেছিল অন্য একটি রাজনৈতিক চুক্তির নামে। কিন্তু তার আসল উদ্দেশ্য ছিল রাজপরিবারের গোপন তথ্য সংগ্রহ করা। মোর্শেদা তখন নিজের সন্তানকে ফিরে পাওয়ার চেষ্টায় মড়িয়া। বিদেশি লোকটা সাহায্যের কথা বলে প্রতারণা করে। সে জানতে পেরেছিল, মাহাদির পুত্রকে কোথাও লুকিয়ে রাখা হয়েছে।”
“সে কি সেই তথ্য প্রকাশ করতে চেয়েছিল?”
“সম্ভবত। আর সেই কারণেই তাকে চুপ করিয়ে দেওয়া হয়।”
মেহেরুন্নেসার কণ্ঠ কেঁপে উঠল।
“মোর্শেদা কি জানত, তার সন্তান কোথায়?”
“সে কিছু একটা জানতে পেরেছিল। কিন্তু পুরো সত্য জানার আগেই ইংরেজ প্রতিনিধির হাতে তার প্রাণ যায়।”
“তাহলে আর তার সন্তান কোথায়?”
সুনেহেরা চোখ নামিয়ে ফেললেন।
“সেটাই তো সবচেয়ে বড় রহস্য।”
মেহেরুন্নেসা ধীরে ধীরে বললেন
“হারুন কি জানতে পেরেছিল মোর্শেদা মারা গেছে?”
“জানতো ভালো করেই”
“তাহলে তখন সে মাহাদিকে কেন সত্যিটা জানাল না?”
সুনেহেরা তিক্ত হাসলেন।
“কারণ সত্যিটা জানালে মাহাদি ফিরে আসত। আর মাহাদি ফিরে এলে হারুনের বহু বছরের সম্রাজ্য ভেঙে পড়ত। তার সিংহাসন হারাতো। জোচ্চর কোথাকার। কিন্তু পরে মাহাদির সন্দেহ জাগে। সে বুঝতে পারে, মোর্শেদার মৃত্যুর খবরের মধ্যে অসংগতি আছে। তথ্য মিলছিল না। কিছু সাক্ষী নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিল।”
মেহেরুন্নেসা ধীরে ধীরে বললেন
“তাহলে মাহাদি ঠিকই সন্দেহ করেছিল। মোর্শেদা বেঁচে ছিল।”
“হারুন ওয়াসেমের মুখ থেকে সত্যি বের করা সহজ নয়। সে নিজের অতীতকেও নিজের মতো করে সাজিয়ে নিয়েছে। তার পিতার পালিত পুত্র হয়েও সে সিংহাসনে বসেছে। আর মাহাদির পুত্রের অস্তিত্ব তার জন্য এক মর্মান্তিক সত্য, যা প্রকাশ পেলে তার নিজের উত্তরাধিকার প্রশ্নের মুখে পড়বে।”
মেহেরুন্নেসা ধীরে ধীরে বললেন
“মেহরাবের বয়স যখন চার বছর, তখন প্রতীক জন্মেছিল, তাই না?
“হ্যাঁ।”
“আর প্রতীকের জন্মের সময় তার মা মারা যায়।”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে হারুনের দুই সন্তান। মেহরাব আর প্রতীক।”
সুনেহেরা মাথা নাড়লেন।
“কিন্তু দুজনের কেউই সিংহাসনের প্রকৃত উত্তরাধিকারী নয়। আর প্রতীক ও মারা যায় কয়েক বছর আগে”
মেহেরুন্নেসার চোখ স্থির হয়ে গেল।
“তাহলে মেহরাব আছে শুধু”
“মেহরাব হারুনের রক্তের সন্তান। কিন্তু সিংহাসনের রক্তের উত্তরাধিকারী নয়। তাহলে মাহাদির পুত্রই আসল উত্তরাধিকারী।”
সুনেহেরা বিছানায় গা এলিয়ে দিল
“মারাত্মক বাজে ভাবে ঠকানো হয়েছে মাহাদি কে। মাহাদি তুরস্কের একজন সম্রান্ত বণিক পরিবারের সন্তান ছিল। অর্থলোভে তার সাথে মোর্শেদা কে বিয়ে দেন হারুন ওয়াসেম। পরবর্তী তে তাকে বাজে ভাবে লুটে নেওয়া হয় আর মোর্শেদা কে উস্কানো হয় মাহাদি কে ত্যাগ করতে। তাদের সংসার টাই ছিল ছলনার সংসার পুরোপুরি। কেবল স্বার্থের জন্য মোর্শেদা মাহাদি কে বিবাহ করে। পরবর্তী তে যখন পুত্র জন্ম নেয়। তখন হারুন এই নোংরা পরিকল্পনা করে। মোর্শেদা হত্যার দায়ে মাহাদি কেও হত্যা করবে আর তাদের পুত্রকে লোক সমাজে বানাবে নিজের পুত্র। কিন্তু যখন তার নিজেরই পুত্র হলে। তখন ইয়ামিন কে ছুড়ে ফেলেছে কোনো আবর্জনায়। আদৌ বাঁচিয়ে রেখেছে কিনা জানা নেই”