পুরনো স্মৃতি দগদগ করে উঠেছে সুনেহেরার মস্তিষ্কে। যাকে ভালোবেসে গোটা জীবন পার করলো অপেক্ষাতে, সঙ্গীবিহীন। সে পূর্ব বিবাহিত। তার সন্তান ও আছে। এটা মেনে নেওয়া এতটাও সহজ ছিল না। কিন্তু মাহাদি কেন কখনো বলেনি তাকে এত কিছু হয়েছে যে। মাহাদি কি এমন ভেবেছিল যে সবটা বলে দিলে সুনেহেরা তাকে ঘৃণা করবে? তাহলে কেন মাহাদি বলেনি এসব কিছু। এবার ভাবিকে কি করে বলবে সে এসব কথা মাহাদি তাকে বলেনি, বলেছে তারই……
সুনেহেরার ভাবনার মাঝখানেই সেখানে উপস্থিত হলো মাহাদি। রাত নেমে গেছে চারিদিকে। সুনেহেরা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। ব্যস্ত হয়ে চোখ মুখ মুছে সরে বসলো কিছুটা। মাহাদি কে বসার জায়গা দিল। মাহাদি পাশ ঘেঁষে বসে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল
“কাঁদছেন শাহজাদি?”
সুনেহেরা ফিচেল হাসলো
“নাহহহ আমি কেন কাঁদবো?”
মাহাদি বুঝল প্রিয়তমার অভিব্যক্তি। হাত রাখলো বাহুতে।
“বলুন না কি হয়েছে?”
সুনেহেরা কেঁদে ফেলল এবার। কান্নারত স্বরে বলল
“আপনার অতীত এর জন্য আমার ভালোবাসা কমবে না মোটেও। তবে আপনি অতীতে অন্য কাওকে ভালোবেসেছেন, তাকে স্ত্রী রুপে গ্রহণ করেছেন এই ভাবনা ই আমাকে পোড়াচ্ছে পাথর মানব।”
মাহাদির কপাল কুঁচকে আসে
“কি বললেন? বুঝলাম না!”
"মোর্শেদা কে ভালোবাসতেন খুব তাই না?"
মাহাদি ভ্রু কুচকে তাকালো সুনেহেরার কথায়
"কি বলছেন জাহ্নবী? পর-স্ত্রী কে আমি কেন ভালোবাসবো?"
"পরস্ত্রী কাকে বলছেন সেনাপ্রধান? সে তো আপনার প্রয়াত স্ত্রী, আর তার সন্তানকেই তো আপনি খুঁজছেন"
মাহাদি কপাল কুঁচকায়।
"দেখুন শাহজাদি, আমার জীবনের প্রথম এবং একমাত্র নারী আপনি। খাদিজা মোর্শেদা ছিলেন সম্রাট হারুন ওয়াসেম এর প্রথম স্ত্রী। সম্রাট কে জিম্মি করে ডাকাত হারুন বিয়ে করেন মোর্শেদা কে। হয়ে যায় হারুন ওয়াসেম। এসব ভুলভাল কথা আপনি কোথ থেকে শুনেছেন?"
সুনেহেরার চোখ কোটর ছেড়ে বেড়িয়ে আসার উপক্রম
"হারুণ ওয়াসেম সম্রাটের পালিত পুত্র ছিল না?"
"একদম ই না, সে ছিল কাটাগিরির ডাকাত। জোরপূর্বক সম্রাটের গলায় তলোয়ার ধরে বিয়ে করেছিলেন মোর্শেদা কে। আমার পিতা ছিলেন মোর্শাদার পিতা অর্থাৎ সম্রাটের বাল্যবন্ধু। কিন্তু এসব আপনি কি করে জানলেন?"
সুনেহেরা কিছুক্ষণ নিরব থেকে সমনের দিকে আঙুল তুলে বলল
"ও বলেছে”
মাহাদি তাকাতেই দেখলো জান্নাত দাঁড়িয়ে আছে। চোখ মুখ কঠিন। মাহাদি উঠে দাঁড়ালো সাথে সাথে
“বড় মা! তুমি? তুমি এসব বলেছো শাহজাদি কে?”
জান্নাত বড় বড় পা ফেলে এগিয়ে এলো
“হ্যা আমিই বলেছি। এসব তো মিথ্যা নয় মামাবাবু। বলুন, মিথ্যা এসব? মণি মা, আমার মুখের কথা মিথ্যা হতেই পারে। তোমরা বিশ্বাস না ই করতে পারো। তবে ইতিহাস ভুল বলে না। সে রাতে সারা আর যুবরাজ মেহরাব নাসিরাবাদ থেকে যে নথি উদ্ধার করে তা সরিয়েছিলাম আমি। অন্য কেউ না। আমিরাবাদ এর উত্থান-পতনের সমস্ত ঘটনা সেখানে লিপিবদ্ধ ছিল।”
মাহাদি চুপচাপ শুনছে জান্নাতের কথা
“সেখানে স্পষ্ট বর্ণিত আছে। তৎকালীন সম্রাট শিহাবুদ্দিন ওয়াসেম এর কন্যা ছিলেন খাদিজা মোর্শেদা। তার একটা কন্যা থাকায় সে একজন পুত্র দত্তক নেয় সে ই বর্তমান সম্রাট হারুন ওয়াসেম। আর তার কণ্যা খাদিজা মোর্শেদার সাথে বিবাহ হয় সনাম ধন্য বনিক মাহফুজ ইকরাম এর একমাত্র ছেলে মাহাদি ইকরাম এর। তাদের সন্তান বিন ইয়ামিন ইকরাম। পরবর্তী তে মাহাদি ইকরাম তার স্ত্রী কে হ” ত্যা করে এবং আমিরাবাদ থেকে পালায়। ধারণা করা হয় তার সন্তান কেও মাহাদি ইকরাম ই কোথাও পাঠিয়ে দেয় অথবা স্ত্রীর সাথেই তাকে হ*ত্যা করে”
সুনেহেরা থরথর করে কাঁপছে। পা দুটো দুলছে তার। আর নিতে পারছে না এসব কথা। মাহাদি তলোয়ার টা তরবারি কোষে গুজে বলল
“তোমার বলা শেষ? এবার আমি কি বলতে পারি?”
জান্নাত শুনতে নারাজ হলেও। সুনেহেরা অনুমতি দিল। মাহাদি বলতে শুরু করে
“সময় তখন শিহাব্বুদিন ওয়াসেম এর শাসনকাল। রাজ্য চলছিলো বেশ শান্তিতে। আমিরাবাদ এর অধিনে ছিল পাঁচটি অঙ্গরাজ্য। যথাক্রমে সাহাবাদ, নাসিরাবাদ, অন্বয়নগর, গহেরগঞ্জ আর কলিয়া। পাঁচ অঙ্গরাজ্যের জমিদার দের পরিচালনা করতেন সম্রাট শাহাবুদ্দিন ওয়াসেম। তার ছিল একটা মাত্র কন্যা। বিবি খাদিজা মোর্শেদা। মোর্শেদা ছিল তৎকালীন সময়ে উচ্চশিক্ষিত। মেয়ে হওয়ার পরও সম্রাট কোনো কমতি রাখেনি তাকে যোগ্যতাসম্পন্ন করে গড়ে তুলতে। ইংরেজরা আমিরাবাদ এর মরুভূমির শেষে ভাগে একটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার অনুমতি পেয়েছিল সম্রাটের থেকে। মোর্শেদাও সেখানেই পড়েছে। সেসময় কাটাগিরির জঙ্গল ছিল আরও গভীর। এখন তো বন উজার হয়ে পাতলা হয়ে গেছে বললেই চলে। সেখানে ঘাটি গেড়েছিল কুখ্যাত ডাকাত দল। তাদের সর্দার ছিল হারুন তাজদার। তারা বিভিন্ন সমৃদ্ধ দেশগুলোতে ডাকাতি করতো।”
মাহাদি দম নিলো। বসলো পাথরটার ওপর। জান্নাত আর সুনেহেরা মনোযোগ দিয়ে শুনছে।
“আমার পিতা ছিলেন একজন বণিকের। বানিজ্যপথে সে নিজেও বহুবার ডাকাতির শিকার হন। ডাকাতের কবলে বহু সজন হারান। তখন থেকেই যুদ্ধ বিদ্যা রপ্ত করায় মনোযোগ দিয়েছিলাম। সেদিন রাজ দরবারে অনুষ্ঠান ছিল। রাজ্যের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকির জন্য মিলাদ-মাহফিল। আমন্ত্রিত ছিলাম আমরাও। দোয়া পাঠ শেষে অন্দর জুড়ে যখন খানা-পিনার ব্যস্ততা। সেসময় আক্রমণ করে বসে তাজদার বাহিনী। হ’ত্যা করে সব দেহরক্ষী থেকে শুরু করে মহল পাহারা দেওয়া বহু সৈনিক।”
মাহাদি এ পর্যায়ে ফিচেল হাসলো
“প্রাণ দিল আমার পিতা ও। সবাই বলে মাহফুজ ইকরাম বানিজ্যে গিয়ে ডাকাতের কবলে মারা গেছেন। নাহহ। সব ভুল। এগুলো সাজানো, হারুনের পরিকল্পিত গুজব যা সে নিজের লোকেদের মাধ্যমে রাজ্যে প্রচার করে বেড়ায়। সম্রাট কে বন্দি করে সে ক্ষমতা আহরণ করে ঠিকই। কিন্তু বহিরাগত পাঁচ অঙ্গরাজ্য তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলে তার টেকা অসম্ভব। তাই সে সম্রাট কে জিম্মি করে বিবাহ করেন মোর্শেদা কে। এতে রাজ্যে প্রচার হয় সম্রাট স্বেচ্ছায় তার কন্যাকে হারুনের সহিত বিবাহ দিয়েছেন এবং স্বেচ্ছায় নিজের জামাতা কে সিংহাসন দিয়েছেন।”
জান্নাত ঢোক গিলল। এই শীতেও দরদড করে ঘামছে সে
“তারপর?”
“তারপর রাজ্য চালাতে লাগলো হারুণ। সেদিন মহলে উপস্থিত যারা বেঁচে গেছিলো তাদের প্রত্যেককে বন্দি করা হয় কারাগারে। বন্দি ছিলাম আমিও। রাজ্য ভুল ভাবে পরিচালনা আর অপরিপক্ব সিদ্ধান্তে মাস না পেরোতেই রাজ্যের হাল বেহাল হতে শুরু করে। বিশেষ করে বানিজ্যিক খাতে তার মারাত্মক প্রভাব পড়ে। প্রজারা সম্রাটের সাথে দেখা করতে চায় কিন্তু দেখা পায় না। বিভিন্ন রাজ্য থেকে ব্যাবসা সংক্রান্ত অসন্তুষ্টি নিয়ে পত্র সহ দূত আসতে শুরু করে। সবাই শিহাবুদ্দিন এর সাক্ষাৎ চায় কিন্তু পায় না। হারুণ তখন ভাবলো এদের বাঁচিয়ে না রাখাই উত্তম। সে রাতেই শ্বাসরোধ করে হত্যা করে সম্রাট কে।”
কিছুক্ষণ দম নেয় মাহাদি। ফের বলতে শুরু করে
“তার বছর খানিক পর জন্ম নেয় তাদের পুত্র সন্তান। বিন ইয়ামিন ওয়াসেম। রাজ্যের অবস্থা তখন যা তা। মোর্শেদা নামেই তার স্ত্রী। মূলত সে ছিল বন্দিনী। জীবন যখন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে তখন মোর্শেদা পুত্র নিয়ে পালানোর সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু পলায়ন কালে সে ধরা পড়ে হারুনের সৈন্যদের কাছে। হারুনের ক্ষমতার জাল পেরিয়ে পালানো ছিল অসম্ভব প্রায়। ধরা পরার পর তাকে হত্যা করা হয়। এ নিয়ে সারা রাজ্য তখন তোলপাড়। প্রজারা বিদ্রোহ ঘোষণা করে সম্রাটের বিরুদ্ধে। তখন হারুন ব্যবহার করে আমাকে। রাজ্য ব্যাপি রটিয়ে দেয় আসলে সে সম্রাটের পালিত পুত্র, মোর্শেদার স্বামী ছিলাম আমি যা সম্রাট গোপন রেখেছিল। আমিই নিজের স্ত্রী মোর্শেদা কে হ'ত্যা করে পালিয়েছি রাজ্য ছেড়ে। তারা আমাকে হত্যার চেষ্টা করলেও আমি পালাতে সক্ষম হই।”
“আর তাদের সন্তান?”
“রহস্য টা এখানেই। সেদিন মোর্শেদা ইয়ামিন কে সঙ্গে করে বেড়িয়েছিলেন। মোর্শেদা ধরা পড়লে ইয়ামিন কোথায় গেল? এখানে দুইটা বিষয় হতে পারে। হয়তো সেদিন ইয়ামিনকেও হ*ত্যা করা হয়েছিল। নয়তো মোর্শেদা ধরা পড়বে এটা বুঝেই তার কাছের কারও কাছে ইয়ামিন কে দিয়ে দেয় তাকে নিয়ে দূরে চলে যেতে। মৃত'দেহ উদ্ধারের সময় তার গয়ে কোনো গয়না ছিল না। এ ও হতে পারে সব কিছু সে কাওকে দিয়ে দিয়েছিলো। আর রাজ্য ব্যাপি জানানো হলো মাহাদি ইকরাম তার স্ত্রী কে হ’ত্যা করে পুত্রকে নিয়ে পালিয়েছে। প্রজাদের ডেকে কান্নাকাটির নাটক করে এই কথা প্রচার করে ফেলেন দেশব্যাপী। সেসময় সাহাবাদে বাকের শাহ্ ক্ষমতায়। তার ছিল গোপন ব্যাবসা। বিদেশি চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের বন্দি করে তৈরি করতো বিভিন্ন ওষুধ। সেসব ইংরেজ দের পাচার করতো গোপনে। আমার মত সাহসী দাগী অপরাধী তারও প্রয়োজন ছিল। সে আমাকে সেনাপ্রধান নিযুক্ত করেন। কেউ যাতে আমাকে না চিনতে পারে তার জন্য পরানো হলো বর্মের খোলস।”
জান্নাতের চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। সেই সাথে সুনেহেরার ও। মাহাদি সুনেহেরার দিকে তাকিয়ে বলল
“এক পর্যায়ে আমি ইয়ামিন কে খুজে পেয়েছিলাম প্রায়। তখন আমি আপনাকে জানাই আমি একটা শিশু আনবো। এতিম শিশু। তাকে কিন্তু নিজের সন্তান করে বড় করবেন আপনি। জাহ্নবী সেদিন খুশু হয়ে বলেছিলো আমারও শিশু পছন্দ। মনে করব ওটা আমাদেরই সন্তান।”
সুনেহেরা ঝড়ঝড় করে কেঁদে ফেলল। মাহাদির চোখ চিকচিক করছে
“আমাদের সন্তান কোথায় গেল জাহ্নবী? তাকে কি আমরা ন্যায় দিতে পারব না? সেদিন পেতে গিয়েও হারিয়ে ফেললাম ইয়ামিন কে।”
সুনেহেরা কাঁদতে কাঁদতে বলল
“আমাদের ইয়ামিন এর খোঁজ পেয়েছি প্রধান বাবু। ও নাসিরাবাদ এর পাহাড়ি সীমান্তে আছে”
মাহাদি চোখ মুছল
“কি করে বুঝলে ও ইয়ামিন?”
জান্নাত বলল
“বিবাহের দিন যেদিন আমাকে অপহরণ করা হয়। সেদিন মুয়াজের সাথে সঙ্গ দেয় আমিরাবাদের কিছু সৈন্য ও। ওদের উদ্দেশ্য ছিল আমাকে হত্যা করে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া। কারণ অবশ্য আমি জানি না। সেসময় হঠাৎ দেবদূত এর মতন হাজির হয় ইয়ামিন। সে নদীতে মাছ ধরতে এসেছিল। কিন্তু তার ঘাড়ে বাহুতে থাকা উল্কি চিহ্ন দেখে আমিরাবাদ এর সৈন্যরা ঘাবড়ে যায়। তাদের বংশ পরম্পরায় পরবর্তী উত্তরসূরীর জন্য বাহুতে নির্দিষ্ট চিহ্ন উল্কি করে বংশমুদ্রা আঁকা হতো। যা ইয়ামিনের বাহুতে ছিল। তারপর সে বাড়িতে আমাকে নিয়ে যাওয়া হয়। ইয়ামিন কিছু না জানলেও তার দাদিমা সবটা জানে। সে রাতে তার দাদিমার থেকে সবটা শুনি আমি। ভদ্রমহিলা মোর্শেদা বিবির কাছে বিভিন্ন হস্তশিল্প বিক্রি করতো। তার কাছেই দিয়ে দিয়েছিলেন ইয়ামিন কে।”
*****
ডেরার দরজা খুলতেই ভেতরের সবাই চমকে উঠল। ফাইয়াজ একবারও কারও দিকে তাকাল না। সোজা ভেতরে ঢুকে টেবিলের ওপর রাখা নথিপত্র গুলো মুঠোয় তুলে মেঝেতে ছুড়ে ফেলল। কাগজের সঙ্গে কয়েকটা ছোট কাঠের চিহ্নও ছিটকে গেল চারদিকে।
“এ আমার কোন শনি লাগলো কপালে? কিছুই পারছি না! কিছুই হচ্ছে না”
তার রাগ দেখে চ্যালাপ্যালারাও নড়েচড়ে বসল।
ফাইয়াজ টেবিলের ওপর রাখা পানির পাত্রটা তুলে দেয়ালে ছুড়ে মারল। মাটির পাত্রটা ভেঙে টুকরো হয়ে গেল।
“সে ঘুরে দাঁড়িয়ে তাকাল সবার দিকে।”
“তোমাদের কাছে কি কোনো খবর আছে? কোনো খবর? কোন শক্তি এভাবে ঢাল হয়ে আছে সাহাবাদ এর? কেন কিচ্ছু তে সফল হতে পারছি না আমি?”
একজন চ্যালা ভয়ে ভয়ে গলা পরিষ্কার করল।
“সর্দার, আমরা চেষ্টা করছি”
“হারুন ওয়াসেমের কাছে গিয়ে বলো, তার লোকেরা চেষ্টা করছে। বলো, এতদিন ধরে চেষ্টা করেও একটা কাজ শেষ করতে পারেনি। যাও না, আহা কত সম্মানের কথা”
লোকটা মাথা নিচু করে ফেলল। ফাইয়াজ কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইল। নিজের কপালে হাত রাখল। সম্রাটের আদেশ ছিল গুরুতর। সম্রাজ্ঞী মেহেরুন্নেসাকে সরিয়ে দিতে হবে। কিন্তু সেই কাজও শেষ হয়নি। প্রতিবারই কোনো না কোনো বাধা এসে দাঁড়াচ্ছে। কালকের ব্যর্থতার পর হারুন ওয়াসেমের সামনে দাঁড়ানোর কথা মনে হতেই তার বুকের ভেতরটা আরও জ্বলে উঠল।
“সবাই বের হও।”
কেউ নড়ল না। ফাইয়াজ এবার নিচু গলায় বলল
“বলেছি, বের হও।”
এক এক করে সবাই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
দরজা বন্ধ হওয়ার পর ফাইয়াজ কিছুক্ষণ একা দাঁড়িয়ে রইল। আজ আর কাউকে কিছু বোঝানোর ইচ্ছে নেই তার। চোখের সামনে ব্যার্থতার দৃশ্য ভাসছে তার। বিলের পাড়ে তখন সন্ধ্যা নামছে। ফাইয়াজ গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে বিলের ওপারের পথটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তার হাতে ধরা ধনুকের তার টানটান। কিছুক্ষণ পর দেখা গেল জমিদারের সাথে পায়ে এগিয়ে আসছেন সম্রাজ্ঞী মেহেরুন্নেসা। ফাইয়াজের চোখ সরু হয়ে গেল। সে নিশানা স্থির করল। আর ঠিক সেই মুহূর্তে সামনে গিয়ে একটা তীর ছুটে গেল। তার শরীরের ভেতর যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। সে ঘুরে তাকানোর আগেই বিলের অন্য পাশ থেকে আরেকটা তীর ছুটে এল। একটা তীর তার পাশের গাছের গায়ে গিয়ে বিঁধল। আরেকটা মাটিতে।
তারপর পরপর আরও কয়েকটি তীর এসে পড়ল তার আশপাশে। ফাইয়াজ ঝুঁকে গেল। ধনুকের টান ছেড়ে দিয়ে দ্রুত গাছের আড়ালে সরে দাঁড়াল। দূরে মাহাদি ইকরাম ঘোড়ার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর হাতে ধনুক। চোখ স্থির, মুখ কঠিন।
“অস্ত্র নামাও!”
মাহাদি তাকে চিনে ফেলেছেন। সে আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে পাশের ঝোপের দিকে ছুটল। পেছন থেকে আবার তীর ছুটে এল। একটি তীর তার কাঁধের পাশ দিয়ে চলে গেল। ফাইয়াজ দাঁত চেপে দৌড়াতে লাগল।
আজও ব্যর্থ। আজও সে কিছু করতে পারল না।
কিন্তু এবার ব্যর্থতার সঙ্গে আরেকটা ভয় যোগ হয়েছে। মাহাদি ইকরাম তাকে দেখেছেন। হারুন ওয়াসেমের কাছে ফিরে গিয়ে সে কী বলবে? হারুন ওয়াসেম এবার তাকে ক্ষমা করবেন না।
এতদিনের ব্যর্থতা, আজকের ব্যর্থতা, আর মাহাদির হাতে ধরা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা সব মিলিয়ে তার মাথার ভেতরটা যেন অসহ্য শব্দে ভরে উঠল। সে মুঠো শক্ত করল। ঠিক তখনই পেছন থেকে কেউ তাকে জড়িয়ে ধরল। ফাইয়াজের শরীর মুহূর্তের মধ্যে শক্ত হয়ে গেল।
তার হাত স্বতঃস্ফূর্তভাবে অস্ত্রের দিকে উঠেছিল। কিন্তু পরের মুহূর্তেই পরিচিত কণ্ঠটা কানে এল
“ফারিস!”
“শাখা!”
ফাইয়াজ যেন পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। শাখা তাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে আছে। তার নিঃশ্বাস ফাইয়াজের কাঁধের কাছে এসে লাগছে। এতটা কাছে কেউ তাকে কখনো এভাবে ধরেনি।
তার হৃৎস্পন্দন হঠাৎ অস্বাভাবিক দ্রুত হয়ে উঠল। সে নড়তে পারল না। শাখা কিছুই বুঝতে না পেরে আরও শক্ত করে ধরে বলল
“আপনি কোথায় হারিয়ে গেলেন? আমি কতদিন ধরে আপনাকে খুঁজছি!”
ফাইয়াজের ঠোঁট সামান্য নড়ল। কোনো শব্দ বের হলো না। শাখা তাকে ছেড়ে সামনে এসে দাঁড়াল। তার চোখে উদ্বেগ।
“আপনার কী হয়েছে?”
ফাইয়াজ তাকিয়ে রইল। শাখার মুখে সন্ধ্যার শেষ আলো পড়েছে। চোখ দুটো অস্থির, কণ্ঠে অভিমান।
“আমি কতবার ডাকলাম, শুনতে পাননি?”
ফাইয়াজ গলা পরিষ্কার করল।
“তুমি? তুমি এখানে কেন?
“আপনাকে খুঁজতে”
“আমাকে?”
“হ্যাঁ, আপনাকে। আর কাকে?”
শাখা ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
“আপনি এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? অসুস্থ লাগছে?
ফাইয়াজ চোখ সরিয়ে নিল।
“না।”
“তাহলে?”
“কিছু না।”
শাখা এগিয়ে গিয়ে ফাইয়াজ এর কপালে হাত রাখলো
“জ্বর টর বাধালেন নাকি?”
ফাইয়াজের বুকের ভেতর আবার ধক করে উঠল।
এই মুহূর্তে তার সমস্ত চিন্তা আটকে আছে শাখার হাতের স্পর্শে। সে নিজের অজান্তেই কাঁধের কাছে হাত রাখল যেখানে কিছুক্ষণ আগেও শাখার হাত ছিল। শাখা সেটা লক্ষ করল।
“কী হলো?”
ফাইয়াজ দ্রুত হাত নামিয়ে ফেলল।
“কিছু হয়নি।”
“আমার দিকে তাকিয়ে বলুন তো”
ফাইয়াজ তাকাল। শাখার চোখের দিকে তাকাতেই তার ভেতরের সমস্ত অস্থিরতা যেন আরও বেড়ে গেল। সে চোখ সরিয়ে নিল। শাখা এবার একটু নরম গলায় বলল
“ফারিস, কোনো সমস্যা হলে আমাকে বলতে পারেন”
ফাইয়াজ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল
“তুমি আমাকে এভাবে আর কখনো জড়িয়ে ধরবেন না।”
শাখা থমকে গেল। সাথে মনটা ও খারাপ হলো বড্ড
“আচ্ছা। কিন্তু কেন?”
ফাইয়াজ উত্তর দিল না। তার মুখে কঠিন ভাব আনার চেষ্টা করল। কিন্তু কণ্ঠে কঠোরতা এল না।
শাখা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল
“আমি কি আপনাকে কষ্ট দিয়েছি?”
ফাইয়াজ চোখ বন্ধ করল
“ও তুমি বুঝবেন না”
শাখার ভ্রু আরও কুঁচকে গেল। ফাইয়াজ তার দিকে তাকাল। চোখে অস্বস্তি।
“কিছু স্পর্শ মানুষকে দুর্বল করে দেয়।”