রাত অনেক গভীর। পাহাড়ের গায়ে চাঁদের আলো ঠিকমতো পৌঁছায় না। ঘন গাছপালার ফাঁকে ফাঁকে অন্ধকার জমে আছে। দূরে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যায়। শুকনো পাতার ওপর বাতাসের মৃদু শব্দ। জান্নাত ধীরে ধীরে হাঁটছিল। ইশশশশ বডৃড দেরি হয়ে গেল ফিরতে। হাতে ছোট একটা প্রদীপ। বাতাসে শিখাটা বারবার কেঁপে উঠছে।
জান্নাত চারপাশে তাকাল।
সামনের পথটা দিনের বেলায় যতটা পরিচিত মনে হয়, রাতে যেন একেবারেই অন্যরকম। বিশাল গাছগুলোর ছায়া মাটির ওপর এমনভাবে পড়ে আছে যেন একেকেটা দানব। জান্নাত একটু দ্রুত হাঁটতে শুরু করল। ঠিক তখনই তার পা কারও পায়ের সঙ্গে লেগে গেল।
“আহ!”
সে ভারসাম্য হারিয়ে সামনের দিকে পড়ে গেল। প্রদীপটা হাত থেকে ছিটকে মাটিতে পড়ল। সৌভাগ্যবশত শিখাটা নিভল না, তবে আলোটা একদিকে হেলে রইল। জান্নাত আতঙ্কে উঠে বসতে গিয়ে থেমে গেল। অন্ধকারের ভেতর থেকে একটি পুরুষালী কণ্ঠ ভেসে এল
“সাবধানে।”
জান্নাতের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। সে হাত বাড়িয়ে প্রদীপটা তুলে নিল। আলোটা একটু উঁচু করতেই সামনে একজন পুরুষের অস্পষ্ট অবয়ব দেখা গেল। মুখটা পুরোপুরি বোঝা যাচ্ছে না। গাছের ছায়ার নিচে দাঁড়িয়ে থাকা লম্বা শরীরটা দেখা যাচ্ছে। জান্নাত ধীরে ধীরে পিছিয়ে গেল।
“আপনি, আপনি কে?”
পুরুষটি উত্তর দিল না। বরং শান্ত গলায় বলল
“পথটা অন্ধকার, বিভীষিকাময়”
জান্নাত কিছু বলল না। পুরুষটি এবার এক পা এগিয়ে এসে হাত বাড়িয়ে দিল।
“হাত ধরো। পার করে দিই।”
জান্নাতের চোখ হাতটার দিকে স্থুর হলো। অচেনা একজন মানুষ। এই গভীর রাতে, জঙ্গলের মাঝখানে। তার হাত ধরতে বলছে। সে ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।
“না… আমি নিজেই যেতে পারব।”
পুরুষটি মৃদু হেসে বলল
“পারবে তা জানি। তবুও”
জান্নাত পেছনে তাকাল। যে পথ দিয়ে এসেছে, সেটাও এখন অন্ধকারে ডুবে গেছে। সামনে যাওয়ার পথটাও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না।
পুরুষটি আবার বলল
“ভয় পেয়ো না। আমি পথ চিনি।”
জান্নাতের বুকের ভেতর অস্বস্তি হচ্ছিল। তবু অন্ধকারের মধ্যে একা দাঁড়িয়ে থাকার চেয়ে তার সঙ্গে যাওয়াটাই হয়তো নিরাপদ মনে হলো। সে হাত বাড়াল। কিন্তু পুরুষটি তার হাত ধরল না। বরং একটু দূরত্ব রেখে হাঁটতে শুরু করল।
“পেছনে এসো।”
জান্নাতও হাঁটতে লাগল। তার প্রদীপের আলোয় পুরুষটির ছায়া লম্বা হয়ে মাটিতে পড়ছে। গাছের গায়ে মিলিয়ে যাচ্ছে। সে একবারও পেছনে তাকাচ্ছে না। জান্নাত বলল
“আপনি কি এই গ্রামের?”
“হা হা। আমি সব খানের ই”
“আপনাকে আগে দেখেছি?”
পুরুষটি এবার একটু থামল।
“হয়তো।”
জান্নাত আর কিছু বলল না। কিছুদূর যাওয়ার পর জঙ্গলের পথটা একটু পরিষ্কার হয়ে এল। দূরে পাহাড়ের চূড়ায় ইয়ামিনদের বাড়ির সামনে জ্বলতে থাকা মশালের আলো দেখা গেল।
জান্নাতের বুক থেকে যেন একটা ভার নেমে গেল।
পুরুষটি থেমে গেল।
“ওই তো তোমাদের বাড়ি।”
জান্নাত সামনে তাকিয়ে বলল
“হ্যাঁ। আপনাকে ধন্যবাদ।”
পুরুষটি কোনো উত্তর দিল না। জান্নাত একটু দ্বিধা করে আবার বলল
“আপনার নামটা জানতে পারি?”
অন্ধকারের ভেতর থেকে কণ্ঠটা ভেসে এল
“নাম জানলে কী করবে?”
জান্নাত চুপ করে গেল। পুরুষটি মৃদু হেসে বলল
“যাও। রাত অনেক হয়েছে।”
জান্নাত আর দাঁড়াল না। প্রদীপটা শক্ত করে ধরে দ্রুত বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগল।
ইয়ামিন তখন বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে ছিল।
তার হাতে একটা লাঠি। চোখে ঘুম নেই। মশালের আলোয় তার মুখটা বেশ কঠিন দেখাচ্ছিল।
জান্নাতকে দূর থেকে দেখেই সে সোজা হয়ে দাঁড়াল।
“এত রাতে কোথায় গিয়েছিলেন?”
জান্নাত থেমে গেল। তার মনে হলো, এবার বুঝি ইয়ামিন তাকে বকবে। সে ধীরে ধীরে বলল
“আমি… একটু দূরে গিয়েছিলাম।”
ইয়ামিনের চোখ এবার তার পেছনের অন্ধকারের দিকে গেল।
“একা?”
জান্নাত মাথা নাড়ল।
“হ্যাঁ।”
ইয়ামিনের মুখ আরও কঠিন হয়ে উঠল।
“আপনি জানেন না, জঙ্গলে রাতে একা যাওয়া কতটা বিপজ্জনক?
জান্নাতের বুক ধক করে উঠল। সে মাথা নিচু করে ফেলল। ইয়ামিন কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎ মুখের কঠিন ভাবটা বদলে গেল। সে হেসে ফেলল। জান্নাত অবাক হয়ে তাকাল।
“আপনি হাসছেন কেন?”
ইয়ামিন মাথা নেড়ে বলল
“কিছু না। আপনি এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছেন, যেন আমাকে দেখে ভয় পেয়ে গেছেন”
জান্নাত একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেল।
“আপনি তো বকছিলেন।”
“বকছিলাম না। ভয় পেয়েছিলাম। আপনার গায়ে কাদা লেগেছে মনে হচ্ছে”
“হ্যা আে, আমি পড়ে গিয়েছিলাম।”
ইয়ামিন সঙ্গে সঙ্গে তার দিকে তাকাল।
“কি নলপন, কোথায়?”
“জঙ্গলের ভেতর।”
“কীভাবে?”
“কারও পায়ে পা লেগেছিল।”
ইয়ামিনের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
“কার?”
জান্নাত একটু ভেবে বলল
“জানি না। একজন পুরুষ। আমাকে পথ দেখিয়ে এখানে পর্যন্ত নিয়ে এসেছে।”
ইয়ামিনের চোখ এবার স্থির হয়ে গেল।
“কী বলেন?”
“হ্যা, সে এও বলল, পথটা অন্ধকার। হাত ধরো, পার করে দিই। তারপর আমাকে এখানে পৌঁছে দিয়ে চলে গেল।”
ইয়ামিন কোনো কথা বলল না। তারপর ধীরে ধীরে জিজ্ঞেস করল
“আপনি তার হাত ধরেছিলেন?”
জান্নাত মাথা নাড়ল।
“না। সে নিজেও আমাকে ধরেনি।”
ইয়ামিনের মুখে আবার সামান্য স্বস্তি ফুটে উঠল।
সে নিচু গলায় বলল
“ভেতরে যান।”
জান্নাত তার দিকে তাকাল।
“আপনি রাগ করেননি?”
ইয়ামিন এবার হেসে বলল
“রাগ করে আর কী হবে? আপনি তো ফিরে এসেছেন
জান্নাতের মুখে অল্প হাসি ফুটে উঠল।
“তাহলে আমি ঘরে যাই?
“হ্যাঁ। ঠান্ডা লাগবে।”
জান্নাত ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। দরজার কাছে পৌঁছে আবার ফিরে তাকাল।
“ইয়ামিন?”
“হুম?”
“আপনি কি ওই লোকটাকে চেনেন?”
ইয়ামিন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল
“না।”
জান্নাত মাথা নাড়িয়ে ঘরে ঢুকে গেল। দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হলো। উঠোনে ফের নীরবতা।
ইয়ামিন কিছুক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর মশালটা হাতে তুলে জঙ্গলের পথের দিকে এগিয়ে গেল। বাড়ির পেছনের গাছের আড়ালে তখনও কেউ দাঁড়িয়ে ছিল। অন্ধকারের মধ্যে তার মুখ দেখা যাচ্ছিল না।
ঘরের ভেতর জান্নাত জানালার পাশে দাঁড়িয়ে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল। মনে হচ্ছে কেউ যেন এখনো তাকে দেখছে।
****
রাতের দ্বিতীয় প্রহর। আমিরাবাদের প্রাসাদ নিস্তব্ধ। উঁচু প্রহরী মিনার থেকে মাঝে মাঝে ঘণ্টার শব্দ ভেসে আসছে। প্রবেশদ্বারের মশালগুলো একে একে নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে, শুধু আস্তাবলের দিকের পথটায় ক্ষীণ আলো জ্বলছে।
সাহারা ও মেহরাব দুজনেই নিঃশব্দে এগিয়ে গেল।
সারার পরনে কালো রঙের পোশাক। মাথার ওড়নাটা শক্ত করে বাঁধা। মেহরাবের কোমরে অস্ত্র, কাঁধে ছোট একটি চামড়ার ব্যাগ। আস্তাবলের কাছে পৌঁছাতেই মেহরাব থেমে গেল।
“কেউ দেখেছে?”
সাহারা চারপাশে তাকাল।
“না। তবে বেশি সময় নষ্ট করা যাবে না।”
মেহরাব নিজের ঘোড়ার পিঠে হাত রাখল। ঘোড়াটা নাক ঝেড়ে মাথা নাড়ল। সারা নিচু গলায় বলল
“ওরা আজ ফরেস্ট হাউসে নেই। আমাদের লোক নিশ্চিত করেছে।”
“নিশ্চিত?”
“দুবার খবর পাঠিয়েছে। সন্ধ্যার পর শেষ প্রহরী দলটাও বেরিয়ে গেছে।”
“তাহলে আজই যেতে হবে।”
সাহারা ঘোড়ায় উঠে বসল। মেহরাবও নিজের ঘোড়ার লাগাম হাতে নিল। দুজনের চোখ একবার মিলল। তারপর আস্তাবলের পেছনের ছোট পথ দিয়ে তারা বেরিয়ে গেল।
প্রাসাদের আলো পেছনে ফেলে জঙ্গলের পথ ধরতেই চারপাশ অন্যরকম। ঘন গাছের ডালপালা মাথার ওপর ঝুঁকে আছে। কোথাও চাঁদের আলো মাটিতে পৌঁছেছে, কোথাও আবার অন্ধকার এত ঘন যে পথ চিনতে ঘোড়ার পায়ের শব্দই ভরসা।
সাহারা সামনে এগিয়ে যাচ্ছিল। মেহরাব কিছুটা পেছনে। কিছুদূর পর সে নিচু গলায় বলল
“ধীরে। ডানদিকে নিচু জমি আছে।”
সাহারা লাগাম টেনে ঘোড়াকে সামলাল।
“আপনি পথটা মনে রেখেছেন”
“আগেরবার যে পথে ফিরেছিলাম, সেটা নয়। এই পথটা পাহাড়ের পাশ দিয়ে গেছে।”
“তাহলে আমরা কোন দিকে যাচ্ছি?”
মেহরাব সামান্য হাসল।
“আজ আমাদের পথ দেখানোর জন্য লোক আছে।”
সামনের অন্ধকার থেকে পাখির ডাকের মতো একটি শব্দ ভেসে এল। সারা সঙ্গে সঙ্গে ঘোড়া থামাল। কিছুক্ষণ পর গাছের আড়াল থেকে দুজন লোক বেরিয়ে এল। তাদের মুখও কাপড়ে ঢাকা।
একজন এগিয়ে এসে মাথা নত করল।
“যুবরাজ। পথ পরিষ্কার।”
মেহরাব ঘোড়া থেকে নামল না।
“ফরেস্ট হাউসের আশপাশে?”
“কেউ নেই। তবে মূল ফটকে শিকল আছে।”
“আমরা পৌঁছানোর আগেই সেটা খুলে রাখবে?”
“জি।”
লোক দুজন আবার অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। সারা মেহরাবের দিকে তাকাল।
“আপনার কি মনে হয়, ওরা শুধু অস্ত্র জমাচ্ছে?
মেহরাবের মুখ কঠিন হয়ে উঠল।
“আগেরবার যা দেখেছি, তাতে মনে হয় না।”
“আর যদি তারা আমাদের আগেই টের পেয়ে থাকে?”
“ব্যাস সচেতন থাকো”
ফরেস্ট হাউসের কাছে পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত আরও গভীর হলো। দূর থেকে পুরোনো ভবনটার কালো অবয়ব দেখা গেল। চারপাশে উঁচু গাছ, ভাঙা পাথরের দেয়াল আর আগাছায় ঢাকা পথ। জানালাগুলো অন্ধকার। কোথাও কোনো আলো নেই। সাহারা ঘোড়া থামিয়ে নিচু গলায় বলল
“এ তো সত্যিই ফাঁকা”
মেহরাব চারপাশে তাকাল।
“ফাঁকা দেখালেই ফাঁকা হয় না। আশেপাশে শত্রু লুকিয়ে থাকতে পারে মগারানী। সচেতন হোন”
“আপনি আবার ওই নামে ডাকলেন?”
সে ঘোড়া থেকে নামল। সাহারাও নামল। দুজনেই মুখে কাপড় বেঁধে নিল। সামনের মূল ফটকে মোটা লোহার শিকল ঝুলছে। তার ওপরে পুরোনো ইংরেজি অক্ষরে লেখা একটি সতর্কবার্তা। অক্ষরগুলো জং ধরে প্রায় মুছে গেছে। মেহরাব হাত বাড়িয়ে শিকলটা পরীক্ষা করল।
“এটা বাইরে থেকে লাগানো হয়নি। ভেতর থেকে বন্ধ করা হয়েছিল। পরে কেউ তাড়াহুড়ো করে বেরিয়েছে। এভাবে রেখেই চলে গেছে”
ঠিক তখনই অন্ধকারের ভেতর থেকে তাদের লোকেরা এসে দাঁড়াল। একজন কোমর থেকে চাবির গোছা বের করল।
“শিকল খুলে দিচ্ছি, যুবরাজ”
মেহরাব মাথা নাড়ল। লোহার শিকল খুলতেই ফটকটা করকর শব্দে খুলে গেল। রাতের নীরবতায় অস্বাভাবিক জোরে শোনা গেল। সাহারা একবার পেছনে তাকাল।
“চলো।”
তারা ভেতরে ঢুকে পড়ল। ফটক আবার বন্ধ হয়ে গেল। ফরেস্ট হাউসের ভেতরের বাতাসে এক ধরনের ভারী গন্ধ। পুরোনো কাঠ, ধাতু, তেল আর অচেনা রাসায়নিকের মিশ্র গন্ধ যেন দেয়ালেও লেগে আছে। মেহরাব মশাল জ্বালাল না। তার বদলে ছোট ঢাকনাওয়ালা আলো বের করল। আলোটা খুব বেশি দূর পর্যন্ত যায় না, কিন্তু কাছের জিনিসগুলো দেখা যায়। প্রথম ঘরটা প্রায় ফাঁকা। এক পাশে কাঠের বাক্স। অন্য পাশে ভাঙা টেবিল। দেয়ালে কয়েকটি মানচিত্র ঝোলানো। মানচিত্রে আমিরাবাদ, সাহাবাদ এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলো লাল ও কালো চিহ্নে চিহ্নিত। সাহারা কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
“এগুলো পথের মানচিত্র?”
মেহরাব মানচিত্রের ওপর ঝুঁকে পড়ল।
“না। এখানে নদীর ঘাট, পাহাড়ি গিরিপথ আর প্রহরী চৌকিগুলোও চিহ্নিত করা হয়েছে”
“মানে তারা সামরিক চলাচল পর্যবেক্ষণ করছে।”
“আর সম্ভবত কাছ দিয়ে পৌছানোর পথ খুঁজছে। এগুলো বাবাকে দেখাতে হবে।”
মেহরাব মানচিত্রটা সাবধানে খুলে নিল। থলে থেকে ভাঁজ করার জন্য পাতলা কাপড় বের করে সেটার মধ্যে রাখল।
“আগে প্রমাণ করতে হবে, এই ভবনটা তাদের গোপন ঘাঁটি।”
দ্বিতীয় ঘরে ঢুকতেই সামনে পেল কয়েকটি লম্বা কাঠের টেবিল। টেবিলের ওপর কাচের পাত্র, ধাতব যন্ত্র, মাপজোখের সরঞ্জাম এবং নানা ধরনের সিল করা বোতল রাখা। কিছু বোতলের গায়ে ইংরেজি অক্ষরে সতর্কবার্তা লেখা। সাহারা এগিয়ে গেল।
“এগুলো কী?”
মেহরাব একটি বোতলের গায়ে লেখা চিহ্ন দেখল।
“রাসায়নিক পদার্থ। নামগুলো সব বুঝতে পারছি না। তবে এগুলো ওষুধ বা রং নয় তা ঢের বুঝেছি”
টেবিলের পাশে কয়েকটি মোটা খাতা রাখা ছিল। মেহরাব একটি খাতা তুলে নিল।
“এখানে দেখো।”
সাহারা তার পাশে এসে দাঁড়াল। পাতার এক জায়গায় আমিরাবাদের একটি সীমান্তচৌকির নাম লেখা। তার পাশে কিছু সংখ্যা, তারিখ এবং সরবরাহের চিহ্ন। সারা ফিসফিস করে বলল
“ওরা সীমান্তে কী পাঠাচ্ছে?”
মেহরাব খাতার কয়েকটি পাতা আলাদা করে নিল।
গেল পাশের ঘরটায়। ঘরটা বড়। মাঝখানে কাঠের বাক্সের সারি। কাঠের খাঁচার মতো কিছু কাঠামো এবং ঢেকে রাখা যন্ত্রপাতি। সাহারা এগিয়েও থেমে গেল।
“এখানে গোলাবারুদ রাখা হয়েছে?”
সে দেয়ালের পাশে রাখা ঢাকনাগুলোর দিকে তাকাল।
“ওগুলো বিস্ফোরক তৈরির কাজে ব্যবহৃত সরঞ্জাম হতে পারে।”
“এরা এখানে বিস্ফোরক আর ক্ষেপনাস্ত্র বানানোর চেষ্টা করছে।”
মেহরাবের চোখ কঠিন হয়ে উঠল।
“যদি এই জায়গাটা চালু থাকে, তাহলে আমিরাবাদ এর সাথে অন্যান্য রাজ্যের জন্যও তা অনেক বড় বিপদ”
সে নিজের লোকদের দিকে তাকাল।
“কেউ কিছু স্পর্শ করবে না। শুধু যা পাওয়া যাচ্ছে, তার প্রমাণ রাখবে।”
মেহরাব এর পরিকল্পনা এ সকল কিছু তার বাবাকে দেখাবে এবং এই ভবন টা দখল আর ইংরেজ দের উচ্ছেদ করাবে।
“চলো। ভোর হওয়ার আগেই ফিরতে হবে।”
ফরেস্ট হাউসের দরজা পেরিয়ে বাইরে আসতেই সারা প্রথমে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল। এতক্ষণ ধরে বুকের ভেতর জমে থাকা চাপটা যেন একটু কমে গেল। মেহরাবের কাঁধে ঝোলানো থলে টা ভারী। দুজন দ্রুত উঠোন পেরিয়ে ঘোড়ার কাছে এগিয়ে গেল। ঠিক তখনই গড়ররর করে কেমন শব্দ হলো। শব্দটা এত নিচু, ভারী যে মনে হলো মাটির নিচে কোথাও যেন পাথর গড়িয়ে যাচ্ছে।
সাহারা থেমে গেল। মেহরাবও ঘোড়ার লাগাম ধরেই দাঁড়িয়ে পড়ল। আবার শব্দ হলো।
“গড়রর… গড়রর…”
এবার তার সঙ্গে মিশে গেল ধাতব কিছু ঘষটে যাওয়ার আওয়াজ। সাহারা ভয়ে ভয়ে মাথা ঘুরিয়ে তাকাল। ফরেস্ট হাউসের পাশেই দাঁড়িয়ে আছে আরেকটি পরিত্যক্ত ভবন। জানালাগুলো কাঠ দিয়ে বন্ধ। দেয়ালের বেশিরভাগ অংশ লতাপাতায় ঢাকা। ছাদের এক কোণ ভেঙে পড়েছে। দরজার সামনে আগাছা এমনভাবে বেড়ে উঠেছে, যেন বহুদিন কেউ সেখানে পা রাখেনি।
কিন্তু শব্দটা আসছে সেখান থেকেই। সারা নিচু গলায় বলল
“যু…যুবরাজ!”
“শুনেছি। চলো। এখনই বের হতে হবে।
সারা তার হাতার কাছে হাত রাখল।
“না। আগে দেখে যাই।”
মেহরাব কঠিন চোখে তাকাল।
“সারা, আমরা এখানে প্রমাণ সংগ্রহ করতে এসেছি। অকারণে আরেকটা বিপদে যাব না।”
“আমি জানি……”
আবার ভেতর থেকে গড়গড় আওয়াজ ভেসে এল। যেন কেউ ধাতব দরজায় হাত ঘষল।
সারা এবার এক পা এগিয়ে গেল।
“শুধু বাইরে থেকে দেখব।”
মেহরাব কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল
“ঠিক আছে। কিন্তু আমার কাছ থেকে এক পা দূরে যাবে না।”
দুজন ভবনটার দিকে এগিয়ে গেল। পরিত্যক্ত ভবনের সামনে এসে সাহারা থেমে গেল।
দরজাটা বাইরে থেকে বন্ধ। মোটা লোহার শিকল ঝুলছে। জানালার কাঠ পচে গেছে, কিন্তু এক পাশে দেয়ালের কাছে সরু একটি জানালা আছে যার লোহার শিকগুলোর মাঝখান দিয়ে ভেতরে তাকানো যায়। মেহরাব হাতের আলোটা ঢেকে রাখল।
“সাবধানে।”
সারা ধীরে ধীরে শিকের কাছে মুখ এগিয়ে দিল।
প্রথমে কিছুই দেখা গেল না। শুধু অন্ধকার।
তারপর আলোটা একটু ঘুরতেই ভেতরের দৃশ্য ধীরে ধীরে স্পষ্ট হলো। সারা নিঃশ্বাস আটকে ফেলল। ঘরের ভেতর কয়েকজন মানুষ। কিন্তু তাদের আচরণ স্বাভাবিক নয়। কেউ মেঝেতে বসে শরীর দোলাচ্ছে। কেউ দেয়ালের সঙ্গে কপাল ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ আবার লোহার শিক ধরে বারবার টানছে।
“গড়রর… গড়রর…”
শব্দটা তাদের গলা থেকেই আসছে। একজন হঠাৎ মাথা তুলল। তার চোখ দুটো অস্বাভাবিক স্থির। মুখের পেশি কাঁপছে। সে শিকের দিকে এগিয়ে এসে দাঁত চেপে এমনভাবে তাকাল, যেন ওপাশে থাকা মানুষটাকে চিনতে না পারলেও তার উপস্থিতি অনুভব করছে। সারা এক পা পিছিয়ে গেল। মেহরাব তার কাঁধের কাছে এসে দাঁড়াল।
“কী দেখছ?”
সাহারা উত্তর দিতে পারল না। শিকের ফাঁক দিয়ে ভেতরের দিকে তাকিয়ে রইল। আরেকজন মানুষ মেঝে থেকে উঠে দরজার দিকে ছুটে গেল। শিকল ধরে ঝাঁকাতে লাগল। তার গলা থেকে কর্কশ শব্দ বের হলো। কিন্তু সে বাইরে আসতে পারল না। ভেতরে থাকা অন্যরা যেন সেই শব্দে আরও অস্থির হয়ে উঠল। কেউ দেয়ালে আঘাত করছে। কেউ মেঝেতে হাত ঠুকছে। সাহারা খুব নিচু গলায় বলল
“ওওও..ওরা…ওরা মানুষ তো?
মেহরাব কিছুক্ষণ চুপ তাকিয়ে করে রইল।
“দেখতে তো মানুষই।”
“তাহলে এমন করছে কেন?”
মেহরাব আলোটা আরও একটু সরিয়ে ধরল।
ঘরের এক পাশে কয়েকটি কাঠের খাট। কিছু খাটে মোটা চাদর। দেয়ালে লোহার রিং। মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা কাঠের বাটি, পানির পাত্র আর পুরোনো কাপড়। এ কোনো থাকার ঘর নয়।
সারা ধীরে ধীরে বলল
“ওরা বন্দি? মানে ওরা সুস্থ মানুষ ধরে ধরে এমন বানাচ্ছে?”
আচমকা কেউ সাহারার কাঁধে ঠান্ডা হাত রাখলো। সাহারা পিছন ফিরতেই
“আআআআআআআআ”