বেলা গড়িয়ে বিকেল নামতে শুরু করেছিল।
দূর থেকে আমিরাবাদ প্রাসাদের উঁচু মিনারগুলো দেখা যেতেই সাহারা আর মেহরাব দুজনেরই চোখে স্বস্তির ছাপ ফুটে উঠল। এতক্ষণ জঙ্গলের আঁকাবাঁকা পথ, পরিত্যক্ত বাড়ি আর সেই অদ্ভুত লোহার ঘেরা ভবনের পর পরিচিত প্রাসাদটা থেকে অবশেষে নিজ গৃহের দেখা পেল। নিজেদের যেন নিরাপদ মনে হচ্ছিল। প্রাসাদের ফটক পেরিয়ে ঘোড়া থামাতেই প্রহরীরা ছুটে এলো।
মেহরাব ঘোড়া থেকে নেমে প্রথমেই জিজ্ঞেস করল,
“আব্বা কোথায়?”
একজন প্রহরী মাথা নত করে বলল,
“সম্রাট মহোদয় বৈঠকখানায় আছেন, যুবরাজ। সেনাপতি আর কয়েকজন নায়েবকে নিয়ে বৈঠকে বসেছেন।”
মেহরাব এক মুহূর্ত চিন্তা করল। তারপর হাতে থাকা কাপড়ের পুঁটলিটার দিকে তাকিয়ে বলল,
“এই জিনিসগুলো আমার কক্ষে নিয়ে যাও। কেউ যেন স্পর্শ না করে।”
“জি, যুবরাজ।”
সাহারা পাশে দাঁড়িয়ে আছে। মুখে ক্লান্তি থাকলেও চোখে কৌতূহল। মেহরাব তার দিকে তাকিয়ে বলল,
“মহারানী, আপনি আগে বিশ্রাম নিন।
সাহারা ভ্রু কুঁচকে বলল,
“আমি বিশ্রাম নেব, আর আপনি?”
“আমি গোসল করে আসছি।”
“এতক্ষণ জঙ্গলে ঘুরে এসে এখনো আপনার মাথায় গোসলের চিন্তা? আর আমি বুঝি কেউ না? আমার তো গোসলের দরকার নেই তাই না মহোদয়। গোসলে আমি আগে যাচ্ছি”
মেহরাব মৃদু হেসে বলল,
“আপনি কি চান আমি এই অবস্থাতেই বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়াই?”
সাহারা মুখ বাঁকিয়ে বলল,
“আপনি তো এমনিতেই যুবরাজ। আপনার পোশাক কেমন, চেহারা কেমন এসব দেখে কে কী বলবে?”
“আপনি বলবেন।”
সাহারা থমকে গেল।
“আমি কেন বলব?”
“এমনেই কাছে ঘেঁষেন না। আর যদি গোাল না করি তবে তো এক কক্ষে….”
মেহরাব এর কথা শেষ হওয়ার আগেই সাহারা মুখ চেপে ধরল মেহরাব এর
“এই চুপ চুপ। চারিদিকে রক্ষীরা রয়েছে। কি সব বলছে”
মেহরাব কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
“তবে যাই বন বিড়াল। আমি তাড়াতাড়ি গোসল করে আসি, যাতে আবার আপনাকে বিরক্ত করতে পারি”
সাহারা সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঘুরিয়ে নিল।
“অসাধারণ! নিজের প্রশংসা নিজেই করতে শিখেছেন আপনি”
মেহরাব হেসে নিজের কক্ষের দিকে চলে গেল।
সাহারা তাকিয়ে রইল তার চলে যাওয়ার দিকে।
তারপর ফিসফিস করে বলল,
“বড্ড বেশি কথা বলতে শিখেছেন যুবরাজ। চালাকও হয়ে যাচ্ছেন। ব্যাটা ছেলেদের এত চালাক হতে নেই”
****
কিছুক্ষণ পর মেহরাব ফিরে এলো। পরিষ্কার পোশাক, ভেজা চুল, মুখে আগের ক্লান্তির ছাপ কিছুটা কমেছে। হাতে সেই পুঁটলি। তার সঙ্গে কয়েকজন বিশ্বস্ত সৈন্যও ছিল। সাহারা তখন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে। মেহরাব কাছে এসে বলল,
“চলুন মহারানী”
সাহারা ঘুরে তাকাল।
“কোথায়?”
“আব্বার কাছে”
“আমি যাব?”
“ইশশশশ আমি একা বলব কেন? আপনিও তো সব দেখেছেন। আপনিও সাক্ষী চলুন চলুন”
সাহারা বের হতে হতে বলল
“কি আপনি আপনি শুরু করলেন”
“যুবরানী বলে কথা। সম্মান না দিলে হয়?”
সাহারা আর কিছু বলল না। চুপচাপ তার সঙ্গে চলল।
বৈঠকখানার দরজার সামনে পৌঁছাতেই প্রহরীরা পথ ছেড়ে দিল। ভেতরে সম্রাট হারুন ওয়াসেম বসে ছিলেন। তার চারপাশে কয়েকজন সেনাপতি, নায়েব এবং রাজকর্মচারী। মেহরাব প্রবেশ করতেই সবাই উঠে দাঁড়াল। হারুন ওয়াসেম ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“এসো মেহরাব। এত দেরি হলো কেন?”
মেহরাব উত্তর দেওয়ার আগে দরজা বন্ধ করার ইঙ্গিত দিল। তারপর নিজের হাতে থাকা পুঁটলিটা টেবিলের ওপর রাখল। হারুন ওয়াসেমের চোখ সঙ্গে সঙ্গে সেদিকে গেল।
“ওগুলো কী?”
মেহরাব একে একে বের করতে শুরু করল মানচিত্র, কয়েকটি নথি, সিলমোহরযুক্ত কাগজ, হিসাবের খাতা এবং কিছু চিঠি। সম্রাটের যেন মুখের রং বদলে গেল। তিনি একটি কাগজ তুলে নিলেন। চোখ বুলালেন। আরেকটি নথি নিলেন। সব দেখে তো তার মাথায় হাত। মেহরাবের দিকে তাকিয়ে বললেন
“এসব কোথায় পেয়েছ?”
মেহরাব শান্ত গলায় বলল,
“জঙ্গলের ভেতরের সেই পরিত্যক্ত বাড়িতে।”
হারুন ওয়াসেমের হাত স্থির হয়ে গেল। কপালে তর্জনি ঠেকিয়ে কয়েক মুহূর্ত তিনি চোখ বন্ধ করে শ্বাস নিলেন বড় করে।
মেহরাব বলল,
“আব্বা, ওই বাড়িটা মোটেও পরিত্যক্ত নয়। সেখানে ইংরেজদের লোকজন আসা-যাওয়া করে। তাদের সামরিক সরঞ্জাম তৈরির চিহ্ন পেয়েছি। বিভিন্ন রাস্তার মানচিত্র, সরবরাহের হিসাব, চিঠিপত্র সবই আছে। তারা গোপন সুরঙ্গ পথ ও তৈরি করছে আমাদের রাজ্যে। আর এতকিছুর কিচ্ছু আমরা টের পাই নি এত দিন। এটা কিছু হলো?”
হারুন ওয়াসেম গভীর দৃষ্টিতে ছেলের দিকে তাকালেন। তার মনের ভেতর তখন একটাই প্রশ্ন, মেহরাব কীভাবে তার গোপন ডেরার সন্ধান পেল?
কিন্তু মুখে সে বিস্ময় প্রকাশ করলেন না। বরং ধীরে ধীরে বললেন,
“সাবাশ মেহু, তুমি খুব ভালো কাজ করেছ।”
মেহরাব মুচকি হাসলো। হারুন ওয়াসেম নথিগুলো আবার গুছিয়ে রাখলেন।
“বিষয়টা আমি দেখছি। তুমি এখন এসব নিয়ে আর মাথা ঘামিও না।”
মেহরাব বলল,
“কিন্তু আব্বা……
“আহহহহহ, আমি বলেছি তো বিষয়টা আমি দেখব।
তার কণ্ঠ এবার একটু দৃঢ়। মেহরাব চুপ করে গেল। সাহারা এতক্ষণ নীরবে সব লক্ষ্য করছিল।
হারুন ওয়াসেম এবার তার দিকে তাকালেন।
“তুমিও সঙ্গে ছিলে?”
সাহারা মাথা নত করল।
“জি।”
“বাড়ির মেয়ে বউ দের নিয়ে অভিযান করার বিষয়টা তোমাকে কে শিখিয়েছে মেহু? ওসব সাহাবাদে হয়। এটা আমিরাবাদ। কোনো অঙ্গরাজ্য নয়। তুমিও কোনো জমিদার পুত্র নও, সম্রাট পুত্র তুমি। বউ নিয়ে অভিযানে যাওয়া টা ভালো চোখে দেখলাম না মোটেও”
সাহারা কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু মেহরাব আগে বলে উঠল,
“ওই বাড়ির পাশের আরেকটি ভবনেও কিছু মানুষকে বন্দি অবস্থায় পেয়েছি।”
হারুনের ভ্রু কুঁচকে গেল। এ ছেলে সব ঠিকুজি উদ্ধার করেই এসেছে। তবুও অবাক হওয়ার ভান করে বলল
“মানুষ?”
“হ্যাঁ। তবে তাদের অবস্থা স্বাভাবিক ছিল না। তারা লোহার ঘেরের ভেতরে ছিল। আমাদের দেখেই অদ্ভুত আচরণ করছিল।”
হারুন ওয়াসেম বললেন,
“তোমরা সেখান থেকে চলে এসেছ, এটাই ভালো হয়েছে।”
তারপর তিনি সৈন্যদের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“এই নথিগুলো আমার কাছে থাকবে। কেউ এর বাইরে একটিও কথা বলবে না।”
সবাই মাথা নত করল। মেহরাব বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আর একটা কথা আছে”
“কী?”
“কিছুদিন আগে আমাদেরও ওই জঙ্গলের ভেতর বন্দি করা হয়েছিল।”
হারুন ওয়াসেম এবার সত্যিই চমকে উঠলেন।
“তোমাদের?”
“জি। আমি, সাহারা আর আলীরাজ। ইংরেজরাই আমাদের ধরে নিয়ে গিয়েছিল।”
হারুন কিছুক্ষণ ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর শান্ত গলায় বললেন,
“আমি খোঁজ নেব।”
*****
সেদিন রাতেই সম্রাটের গোপন কক্ষে একটি পত্র লেখা হলো। পত্রটি পাঠানো হলো তার বিশ্বস্ত এক ব্যক্তির কাছে। ইংরেজদের দলনেতা ক্লেভার লর্ড। সম্রাট লিখলেন সব কিছু। শেষে লিখলেন।
“ডেরার লোকজনকে সতর্ক করো। সব নথি প্রমাণ সরিয়ে ফেলো। আর মেহরাব যে জায়গার কথা জেনে গেছে, সেখানে আপাতত কোনো কার্যক্রম রেখো না।”
পত্রটি সিলমোহর করা হলো। কিন্তু হারুন ওয়াসেমের দুশ্চিন্তা এখানেই শেষ হলো না। কারণ মেহরাব যে কথাটি বলেছিলো ওদেরও বন্দি করা হয়েছিল। সেটার সত্যতা তিনি জানতে চান। তিনি রাতেই গুপ্তচরদের নির্দেশ দিলেন ঘটনাটি খুঁজে দেখতে। পরদিন ভোরের আগেই উত্তর এসে পৌঁছাল। হারুন ওয়াসেম পত্রটি খুললেন। প্রথম কয়েকটি লাইন পড়েই তার চোখ স্থির হয়ে গেল।
তারপর ধীরে ধীরে পুরো পত্রটি পড়লেন। শেষ লাইনে এসে তার মুখে বিস্ময় ফুটে উঠল। নায়েব তার অভিব্যক্তি বোঝার আশায় মুখের দিকে চেয়ে। তিনি ফিসফিস করে বললেন,
“ইংরেজরা ওদের বন্দি করেনি?”
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বিশ্বস্ত নায়েব মাথা নত করে বলল,
“না, সম্রাট।”
“তাহলে?”
নায়েব উত্তর দিল,
“আমাদের অনুসন্ধানে জানা গেছে, ইংরেজদেরই ওই জঙ্গলের বাড়িতেই বন্দি করে রাখা হয়েছিল।”
হারুন ওয়াসেমের চোখ সরু হয়ে এলো।
“কে করেছিল?”
নায়েব একটু থেমে বলল,
“কেউ জানে না। ওদের যারা বন্দি করেছিল, তারা ইংরেজদের লোক ছিল না। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, তারা সবাই বর্ম পরা সৈন্য।
হারুন ওয়াসেমের কপালে ভাঁজ পড়ল।
“কতজন?”
“এক ঝাঁক। সংখ্যাটা নিশ্চিত নয়।”
সম্রাট ধীরে ধীরে আসনে হেলান দিলেন। মেহরাব যাদের ইংরেজ ভেবেছিল, তারা আসলে বন্দি ছিল। আর যারা তাদের বন্দি করেছিল তারা কারা?
****
প্রাসাদের দুপুরের ব্যস্ততা তখন কিছুটা কমে এসেছে। মেহরাব বাবার বৈঠকখানায় ব্যস্ত। আর সাহারার মনটা পড়ে আছে আয়েশা বেগমের কাছে। বিয়ের পর শাশুড়ির সঙ্গে খুব বেশি সময় কাটানো হয়নি তার। তাই খবর নিতে সরাসরি চলে গেল হেঁশেলের দিকে। ভেতরে ঢুকতেই দেখা গেল আয়েশা বেগম বসে আছেন। কয়েকজন দাসী রান্নার কাজে ব্যস্ত। আর তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে জাহিদা। জাহিদা বিধবা। সম্পর্কে সাহারার ছোট জা। সাহারা ঢুকতেই জাহিদা একবার তাকিয়ে আবার নিজের কাজে মন দিল।
সাহারা এগিয়ে গিয়ে আয়েশা বেগমের পাশে বসল।
“আম্মা, শরীর কেমন আছে আপনার?”
আয়েশা বেগম মৃদু হেসে বললেন,
“ভালো আছি মা। তুমি এতক্ষণ কোথায় ছিলে?”
“যুবরাজের সঙ্গে বাইরে গিয়েছিলাম।”
জাহিদা পাশ থেকে হঠাৎ বলে উঠল,
“তা বুঝি এখন প্রাসাদের বউরা রান্নাঘর ফেলে নাড়াই-যুদ্ধ করতে যায়?”
সাহারা তার দিকে তাকাল।
“আপনি কথাটা আমাকে বললেন?
জাহিদা কাঁধ ঝাঁকাল।
“সাহারা। নামটা তো সুন্দরই।”
সাহারার ভ্রু কুঁচকে গেল।
“আপনি ভুলে যাচ্ছেন, সম্পর্কে আমি আপনার বড়।”
জাহিদা হেসে বলল,
“বড় হলে কি নাম ধরে ডাকা যাবে না?”
সাহারা শান্ত গলায় বলল,
“সম্মান করে ডাকতে হয়।”
আয়েশা বেগম এবার দুজনের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“সাহারা ঠিকই বলেছে। সম্পর্কে সে তোমার বড়। তুমি তাকে সম্মান করেই কথা বলবে।”
জাহিদার মুখটা একটু গম্ভীর হয়ে গেল।
“জি, বড় জা।”
সাহারা চারপাশে চোখ বুলিয়ে বলল,
“আমি আম্মার সাথে বসে গল্প করি।আপনি একটু কাজগুলো গুছিয়ে দিন।”
জাহিদা তাকাল।
“কী কাজ?”
“ওই মসুর ডালটা বেছে দিন। তারপর সবজিগুলো ধুয়ে রাখবেন। আর ওদিকে যে বাসনগুলো আছে, সেগুলোও পরিষ্কার করে রাখবেন।”
জাহিদা অবিশ্বাসের চোখে তাকাল।
“সব আমি করব?”
সাহারা আয়েশা বেগমের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি গলায় বলল,
“আমি আম্মার সঙ্গে বসে একটু গল্প করি।”
আয়েশা বেগম মুখ লুকিয়ে হাসলেন। জাহিদা দাঁতে দাঁত চেপে ডালের বাটি হাতে তুলে নিল।
“জি, বড় জা।”
সাহারা মৃদু হেসে বলল,
“এই তো। এবার ঠিক হয়েছে।”
কিছুক্ষণ পর হেঁশেলের বাইরে থেকে মেহরাবের কণ্ঠ শোনা গেল।
“সাহারা?”
সাহারা তখন আয়েশা বেগমের পাশে বসে কথা বলছিল। মেহরাব ভেতরে ঢুকেই চারদিকে তাকাল।
“তুমি এখানে?”
সাহারা বলল,
“আম্মার খোঁজ নিতে এসেছিলাম।”
মেহরাব মাথা নেড়ে বলল,
“আমি তোমাকে অনেকক্ষণ ধরে খুঁজছি।”
জাহিদা তখন পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। মেহরাবের দিকে তাকিয়ে সে হঠাৎ নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে মিষ্টি করে হাসলো। সাহারার চোখে বিষয়টি পড়ে গেল। জাহিদা কথা বলার অজুহাতে মেহরাবের একেবারে কাছে এগিয়ে গেল।
“যুবরাজ, আপনি কি কিছু খাবেন? আমি এনে দিচ্ছি।”
মেহরাব স্বাভাবিকভাবেই এক পা সরে দাঁড়াল।
“না, প্রয়োজন নেই।”
কিন্তু সাহারার মুখের ভাব বদলে গেল। তার চোখ জাহিদার দিকে স্থির। জাহিদা যেন বিষয়টি বুঝেও আবার বলল,
“আপনি এতক্ষণ বাইরে ছিলেন। নিশ্চয়ই ক্লান্ত হয়ে গেছেন। আমি নিজ হাতে শরবত করে দিচ্ছি”
সাহারার ভেতরে যেন আগুন জ্বলে উঠল। সে ধপ উঠে দাঁড়াল।
“এই মুখপুড়ি! কি যুবরাজ, যুবরাজ বলছিস তখন থেকে। ভাসুর হয় তোর ভাসুর। ভাইজান বল।”
জাহিদার হেলদোল নেই। সাহারা এবার চেচিয়ে ডাকল
“জাহিদা”
জাহিদা ফিরে তাকাল।
“জি, বড় জা?”
সাহারা ঠান্ডা গলায় বলল,
“ডাল বাছা শেষ হয়েছে?”
জাহিদা একটু থমকাল।
“না।”
“সবজি?”
“সেটাও…..”
!তাহলে দাঁড়িয়ে আছেন কেন?”
জাহিদা কিছু বলতে পারল না। আয়েশা বেগম সাহারার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝলেন, মেয়েটার রাগের কারণ শুধু কাজ নয়, জাহিদার এমন গা ঘেষা স্বভাব। মেহরাবও বিষয়টি বুঝতে পেরে সাহারা কে আরও রাগাতে বলল,
“আহহা তুমি এত রাগ করছ কেন?”
সাহারা সঙ্গে সঙ্গে তার দিকে তাকাল। চিবিয়ে চিবিয়ে বলল
“আমি রাগ করছি না, যুবরাজ। চলুন ঘরে চলুন”
মেহরাব ভ্রু তুলল। সাহার জাহিদার দিকে তাকিয়ে বলল,
“কাজ শেষ করে আসবেন। আম্মার সামনে অগোছালো হেঁশেল আমার ভালো লাগে না।”
জাহিদা চুপচাপ কাজে ফিরে গেল। মেহরাব সাহারার দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখে রাগ, অভিমান আর চাপা ঈর্ষা একসঙ্গে। মেহরাব কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে মৃদু হেসে ফেলল। জাহিদা দূর থেকে সেই দৃশ্যটা দেখল।
সাহারার চোখও তা এড়িয়ে গেল না। তার ভেতরের অস্বস্তিটা যেন আরও একটু বেড়ে গেল। হেঁশেল থেকে বেরিয়ে নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে চলল। পায়ের গতি স্বাভাবিকের চেয়ে দ্রুত। মুখটা রাগে টকটকে হয়ে আছে। মনের ভেতর যেন একসঙ্গে কতগুলো কথা ঘুরপাক খাচ্ছে।
জাহিদার সেই অকারণ মেহরাবের কাছে গিয়ে দাঁড়ানোটা কিছুতেই ভুলতে পারছে না সে।
ঘরে ঢুকেই দরজাটা বন্ধ করে দিল সাহারা।
তারপর বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,
“কী দরকার ছিল এত কাছে…..
নিজের কথাতেই থেমে গেল। চোখ দুটো জ্বালা করতে শুরু করেছে। সাহারা জেদ করে চোখ মুছে ফেলল।
“আমি কেন কাঁদব?”
কিন্তু যতই নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল, চোখের পানি ততই জমে উঠল। শেষ পর্যন্ত অভিমানে বসে পড়ল বিছানার কিনারায়।
“উনি তো কিছুই করেননি, তাহলে আমার এত রাগ হচ্ছে কেন?
***
মেহরাব সাহারার ঘরের দিকে যেতে গিয়েও থেমে গেল। আলীরাজের খোঁজ করল প্রহরীদের কাছে।
“আলীরাজ কোথায়?”
একজন সৈন্য মাথা নত করে বলল,
“যুবরাজ, ভোর রাতের দিকে তাকে প্রাসাদের পেছনের জলাশয়ের পাড়ে অজ্ঞান অবস্থায় পাওয়া গেছে।”
মেহরাবের মুখ কালো হয়ে গেল
“কী বললে?”
“জি। পাহারারত সৈন্যরা তাকে দেখতে পায়। তারপর লোকজন নিয়ে এসে কক্ষে পৌঁছে দেয়।”
মেহরাব আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। সোজা আলীরাজের কক্ষে চলে গেল। দরজা খুলতেই দেখা গেল আলীরাজ বিছানায় শুয়ে আছে।
মেহরাব কাছে গিয়ে বসে বলল,
“মামা!”
আলীরাজ ধীরে চোখ খুলল।
“মেহু”
“কী হয়েছিল তোমার?”
আলীরাজ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। মেহরাব আবার জিজ্ঞেস করল,
“তুমি জলাশয়ের পাড়ে কী করছিলে?”
আলীরাজ এর কাছে কোনো উত্তর নেই।
“কে তোমাকে সেখানে নিয়ে গিয়েছিল?”
আলীরাজ চোখ বন্ধ করল। তার চোখের সামনে আবার ভেসে উঠল সেই দৃশ্য। কালো অন্ধকারের মধ্যে লাল পোশাক। মুখ ঢাকা। সেই নৃত্য। পায়ের নূপুরের ক্ষীণ শব্দ। জলের ওপর চাঁদের আলো।
আর সেই অদ্ভুত ভঙ্গি আলীরাজের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। মেহরাব তার কাঁধে হাত রাখল।
“কী কিছু দেখেছিলে?”
আলীরাজ চোখ মেলে তাকাল। কিন্তু উত্তরটা তার নিজের কাছেও নেই।
“জানি না।”
মেহরাব আরও কয়েকটি প্রশ্ন করল। কিন্তু আলীরাজ কোনো প্রশ্নেরই ঠিকমতো উত্তর দিতে পারল না। তার মাথার ভেতর শুধু একই দৃশ্য ঘুরে ফিরে আসছে। লাল পোশাকের নারী আর তার নৃত্য। আর জলাশয়ের কালো পানি। শেষে মেহরাব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“এখন আর কিছু ভাববে না। বিশ্রাম নাও।”
আলীরাজ মাথা নেড়ে চোখ বন্ধ করল। মেহরাব উঠে দাঁড়াল। তারপর মনে পড়ল সাহারার কথা।
“এবার আমাকে মহারানীর রাগ ভাঙাতে হবে।”
*****
রাত আরও গভীর হলো। প্রাসাদের অধিকাংশ আলো নিভে গেছে। আলীরাজ কিছুক্ষণ পর বিছানা থেকে উঠে বসল। শরীর এখনো দুর্বল।
তবু তার মনে অদ্ভুত একটা টান। সে কাঁধে শাল জড়িয়ে নিজের কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলো।
প্রাসাদের পেছনের ভবনগুলো দিনের বেলায় যেমন সাধারণ দেখায়, রাতের অন্ধকারে সেগুলোই যেন অন্য রূপ নেয়। আলীরাজ ধীর পায়ে বারান্দার দিকে এগিয়ে গেল। হঠাৎ তার পা থেমে গেল। নিচে প্রাসাদের পেছনের সেই নির্জন প্রাঙ্গণে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। আলীরাজ চোখ কুঁচকে তাকাল। চাঁদের আবছা আলোয় স্পষ্ট হলো সেই লাল পোশাক। একই রঙ। একইভাবে মুখ ঢাকা। নারীটি ধীরে ধীরে ঘুরল। তারপর আবার নাচ শুরু করল। নূপুরের শব্দ খুব ক্ষীণ ভাবে বাজতে লাগল। কিন্তু নিস্তব্ধ রাতের মধ্যে সেটাই যেন সবচেয়ে স্পষ্ট শব্দ। আলীরাজের মুখ শুকিয়ে গেল। তার হাত থেকে শালের একাংশ মাটিতে পড়ে গেল। নারীটি যেন তার উপস্থিতি টের পেল। কয়েক মুহূর্ত নৃত্য থামিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে মাথা তুলল।
মুখ এখনো আবৃত। দূরত্ব অনেক। তবু আলীরাজের মনে হলো ওই নারী সরাসরি তার দিকেই তাকিয়ে আছে। আলীরাজ এক পা পিছিয়ে গেল। আর ঠিক তখনই নারীটি আবার নাচতে শুরু করল। যেন এতক্ষণ সে অপেক্ষাই করছিল আলীরাজ তাকে আবার দেখতে আসবে বলে।